আমি ধর্মের বাইরের একজন মুক্ত মানুষ

একসময় ধার্মিক মুসলমান ছিলাম। তখন নিজের উপর আমার মোটেও আস্থা ছিল না। আল্লাহ বিধিবিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, পাশাপাশি তিনি আমাকে পরিচালিত করছেন, আবার তিনিই আমার কর্মলিপি নির্ধারিত করে রেখেছেন। কাজেই, আমি ছিলাম কাঠের পুতুল। সেখানে আমার আত্নবিশ্বাসী হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। তাছাড়া, ধর্মে আত্মবিশ্বাসী হওয়া অপরাধ। এখানে সবসময় সৃষ্টিকর্তার ভয়ে ভীত হয়ে কাতরতা প্রকাশ করতে হয়।
এখন আমি ধর্মের বাইরের একজন মুক্ত মানুষ। এবং আমি এখন প্রচণ্ড আত্নবিশ্বাসী। আমার আত্নবিশ্বাস আমাকে স্থবির হয়ে থাকতে দেয় না। এটি আমাকে বলে, সবরকম পরিবর্তন নিজের মধ্যে ধারন করতে। সারা জীবন যা জেনে বা বুঝে বা দাবি করে এসেছি, যদি দেখি এর মধ্যে ভুল আছে, নিঃসংকোচে আমি সেই ভুল জানা বা বোঝা বা দাবি ছুড়ে ফেলে দেবো। এই সাধারণ পরিবর্তনের যুক্তিটি আমি মেনে চলি। আমার আত্নবিশ্বাস আমার মধ্যে এই পরিবর্তন মেনে চলার সাহস সঞ্চার করছে। শক্তিশালী যুক্তি পেয়েছি বলে এই মুহুর্তে নাস্তিকতার পক্ষে কলম ধরেছি। কিন্তু যদি দেখি, ধর্মের পক্ষের অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী যুক্তি আমি ভুলক্রমে এড়িয়ে গেছি, তাহলে তওবা করে আবার ধর্মের পথে ফিরে আসবো। হয়তো তখন ট্র্যাক বদলে ধর্মের পক্ষে কলম ধরবো!
সত্যি কথা বলতে, সবকিছুর পক্ষে ও বিপক্ষে কিছু করে যুক্তি আছে। কয়েকদিন আগে রাজন নামের একটি শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। কেউ চাইলে যুক্তি দেখাতে পারেন, সে চুরি করেছিলো। বড়ো হয়ে সে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হিশেবে বেড়ে উঠতো। কাজেই, তাকে হত্যা করা অন্যায় কিছু নয়। আবার অন্যরা যুক্তি দেখাতে পারেন, সে যে চুরি করেছে, এর স্বপক্ষে উল্লেখযোগ্য কোন প্রমাণ নেই। আর সে চুরি করলেও তাকে হত্যা করার অধিকার ঐ খুনীদের কে দিলো? ভবিষ্যতে সে অপরাধ করবে, এর ভিত্তিতে তাকে হত্যা করাও পৈশাচিক কাজ।
পক্ষের ও বিপক্ষের যুক্তি তুলনা করে আমরা একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারি। একটু মাথা খাটিয়েই আমরা বুঝতে পারি, রাজনের হত্যার পক্ষের যুক্তি নিতান্তই দূর্বল। এই যুক্তিকে অবলম্বন করে রাজনের হত্যাকারীদের শাস্তি থেকে রেহাই দেয়া মোটেও ন্যায়বিচার হবে না। একজন ন্যায়বিচারক তা কখনোই করবেন না।
মোটকথা, আমাদের দেখতে হবে, কোন যুক্তি অধিক গ্রহণযোগ্য। আর কোন যুক্তি পরিত্যক্ত হওয়ার যোগ্য। এভাবে হিশেব করেই আমরা সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে ধারনা নিতে পারি। দু’পাশের যুক্তির তুলনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। বিচারবুদ্ধিকে শিকেয় তুলে রেখে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা নির্বুদ্ধিতা। কখনো কখনো অন্যায়ও বটে।
আর পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে থাকার একটা প্রবণতা আমাদের সবার মধ্যে কমবেশী লক্ষ্য করা যায়। এই প্রবণতা একটা সময়ে সভ্যতার অগ্রগতিকে বাঁধাগ্রস্ত করেছিল। বোধহয় এখনো করছে। প্রাচীন দার্শনিকগণ যা বলেছেন, সেটাই সত্য – এই বিশ্বাসই এককালের বিশ্বসভ্যতার ধারক গ্রীকদের জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। পরবর্তীতে দেখা গেলো, সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল যা বলেছেন, তার অধিকাংশই এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। তাঁদের পরে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জগতে উজ্জ্বলতর আলো নিয়ে উপস্থিত হলেন স্পিনোজা, হিউম, ডেকার্তে, কান্ট প্রমুখ। তাঁরা মানবজাতিকে প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সঠিক তত্ত্ব উপহার দিতে পেরেছিলেন। এখন অবশ্য তাঁদের অনেক তত্ত্বও আর প্রাসঙ্গিক থাকছে না।
সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল প্রদত্ত বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের সামান্যই মানুষের সামগ্রিক জ্ঞানের সাথে যুক্ত হয়েছে। একইভাবে হয়তো স্পিনোজা-হিউম-ডেকার্তে-কান্টের অল্পকিছু অবদান টিকে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সক্রেটিসের সময়ে তিনিই ছিলেন আধুনিক। আধুনিক যুগে তিনি প্রাচীন হয়ে গেছেন। তখন আধুনিক হলেন সমকালীন দার্শনিকগণ। এখন সক্রেটিস আর খুব বেশী রেফারেন্স হিশেবে ব্যবহ্নত হন না। তবু তিনি স্মরণীয়। তিনি যা দিয়েছেন, তখনকার প্রযুক্তিহীন যুগে সেটিই ছিল সর্বোচ্চ।
সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটলের মতো প্রাচীনযুগের যারা বলতেন, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, তাদের খুব বেশী দোষ দেয়া যায় না। দূরবিন জাতীয় এমন কিছুইতাদের হাতে ছিল না, যা পৃথিবীর ঘূর্ণন প্রমাণ করতে পারে। শুধু চোখে দেখাটাই ছিল তাদের যুক্তির মাপকাঠি। তাদের সময়ে সেটিই সত্য। কিন্তু এখন এদের যুক্তি আর প্রাসঙ্গিক নয়। কেউ যদি এখন এদের রেফারেন্স দিতে চায়, সে নির্বোধ হিশেবেই সাব্যস্ত হবে। কেননা সন্দেহাতীত ভাবে সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘোরার ব্যপারটি প্রমাণ করা হয়ে গেছে।
এভাবে, সত্যকে আমরা প্রমাণের উপর নির্ভরশীল বলে দাবী করতে পারি। দর্শনের যুক্তি এবং বিজ্ঞানের পরীক্ষায় যা উত্তীর্ণ হবে, তা মানতে আমার কোন আপত্তি নেই। বিজ্ঞান পিশাচের অস্তিত্ব দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করলে এটি আমি সানন্দে মেনে নেবো। একই ভাবে বিজ্ঞানের সবগুলো পরীক্ষা দ্বারা স্পষ্ট প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত আমি কোন কিছুকে ‘পরম সত্য’ বলে মেনে নেবো না। আমার যুক্তি তাই-ই বলে।
অপ্রমানিত সবকিছুকে আমি অবিশ্বাস করবো। যা প্রমানিত, তা আমি জানবো। কিন্তু কিছুই আমি বিশ্বাস করবো না। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমানিত হলে আমি তাকে জানবো। যাকে জানি, তাকে বিশ্বাস করার দরকার পড়ে না। চন্দ্র-সূর্য-খাতা-কলমের অস্তিত্বে বিশ্বাস আনার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু এখন আমি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে অবিশ্বাসী। অপ্রমাণিত একটা কিছুতে বিশ্বাসী হয়ে সেটার নামে প্রচলিত বিধানের দাসত্ব করে আমি নিজেকে ছোট করতে চাই না।
একইভাবে পঙ্খীরাজ ঘোড়া এবং জ্বীন-পরী এবং পিশাচে আমি অবিশ্বাসী। আমাদের মাঝে যারা বিশ্বাসী, তাদেরই দায়িত্ব এদের অস্তিত্ব প্রমাণ করবার। আমি এদের অস্তিত্ব দাবী করি না। তাই তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করার গুরুদায়িত্ব নিয়েও আমি মাথা ঘামাই না।
বিশ্বাস যুক্তির জন্য ক্ষতিকর, জ্ঞানের জন্য ক্ষতিকর। বিশ্বাস অজ্ঞতার নিদর্শন।

লেখকঃ শাহিনুর রহমান শাহিন

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: