হিন্দু ধর্মে ধর্ষণ

দেবতাদের আমরা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ভাবতেই ভালোবাসি। ভক্ত বিশ্বাস করে, ভগবান কেবলই দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে থাকেন। কিন্তু সেই দেবতাই যদি হয়ে ওঠে শয়তান, লম্পট ও ধর্ষক? তবে কি মানুষ তার বিবেকের কাঠগোড়ায় দেবতাকেও দাঁড় করাবে? নাকি ক্ষমতাবলে ছাড় পেয়ে যাবে ভ্রষ্ট দেবতা? বর্তমান সময়ে নারীদের উপর বেড়ে চলা সহিংসতা,ধর্ষণ আমাদের যখন বিব্রত করে চলেছে তখন ধর্মগ্রন্থগুলোতে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে সত্যযুগ থেকে কলিযুগ অবধি কিছুই বদলায়নি। কলির অধঃপতিত পুরুষের মত সত্যের পরমপূজ্য ঋষি,দেবতারাও ধর্ষণের ন্যায় অপকর্মে জড়িত।

বৃহস্পতি

প্রথমে দেবগুরু বৃহস্পতির কথা দিয়ে শুরু করা যাক।দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি তার ভ্রাতৃবধূ মমতাকে ধর্ষণ করেন। বৃহস্পতির ভাই ছিলেন উতথ্য ঋষি। তার স্ত্রী হলেন মমতা। একদিন বৃহস্পতি কামাতুর মনে মমতার কাছে উপস্থিত হন। তাকে দেখে মমতা জানান তিনি তার স্বামী অর্থাৎ বৃহস্পতির দাদা উতথ্য ঋষির দ্বারা গর্ভবতী হয়েছেন। এক গর্ভে যেহেতু দুই সন্তানের স্থান হওয়া অসম্ভব এবং বৃহস্পতিও অমোঘরেতাঃ তাই মমতা বৃহস্পতির সাথে মিলিত হতে অসম্মতি জানান-

“হে মহাভাগ! আমি তোমার জ্যেষ্ঠের সহযোগে অন্তর্বত্নী হইয়াছি, অতএব রমণেচ্ছা সংবরণ কর। আমার গর্ভস্থ উতথ্যকুমার কুক্ষিমধ্যেই ষড়ঙ্গ বেদ অধ্যয়ণ করিতেছেন। তুমিও অমোঘরেতাঃ ; এক গর্ভে দুইজনের সম্ভব নিতান্ত অসম্ভব।অদ্য এই দুব্যবসায় হইতে নিবৃত্ত হও।”

মমতার অসম্মতি সত্বেও দেবগুরু বৃহস্পতি তাকে ধর্ষণ করেন। বৃহস্পতিকে ধর্ষণ করতে দেখে মমতার গর্ভস্থ শিশু বলে ওঠে, “ভগবন! মদনাবেগ সংবরণ করুন। স্বল্পপরিসরে উভয়ের সম্ভব অত্যন্ত অসম্ভব। আমি পূর্বে এই গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছি, অতএব অমোঘরেতঃপাত দ্বারা আমাকে পীড়িত করা আপনার নিতান্ত অযোগ্য কর্ম হইতেছে, সন্দেহ নাই।”

বৃহস্পতি গর্ভস্থ শিশুটির কথায় কর্ণপাত না করে তার নিকৃষ্ট কাজ করতে থাকেন। গর্ভস্থ শিশু বৃহস্পতির এই অন্যায় আচরণ দেখে নিজের পা দিয়ে শুক্রের পথ রোধ করেন।বীর্য মমতার গর্ভে প্রবেশ করতে না পেরে মাটিতে পতিত হয়। এতে রেগে গিয়ে বৃহস্পতি সেই শিশুটিকে অন্ধ হওয়ার অভিশাপ দেন।পরে ওই শিশুটির নাম হয় দীর্ঘতমা।

[কালিপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদিত মহাভারত / আদিপর্ব / চতুরধিক শততম অধ্যায় (১০৪ অধ্যায়)]

সোম

সোম অথবা চন্দ্র দেবতা বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে ধর্ষণ করেছিলেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এই ঘটনাটি উল্লেখিত আছে –

তারারে হরণ করে দেব শশধর।

তারাদেবী গর্ভবতী হয় অতঃপর।।

সগর্ভা তারারে হেরি গুরু বৃহস্পতি।

ভর্ৎসনা করিল তারে ক্রোধভরে অতি।।

লজ্জিত হইয়া তারা চন্দ্রে দিল শাপ।

শুন শুন চন্দ্র তুমি করিলে যে পাপ।।

কলঙ্কী হইবে তুমি তাহার কারণ।

তোমার দর্শনে পাপ হবে অনুক্ষণ।।“

[ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ/ কৃষ্ণ জন্ম খন্ড/৮০ অধ্যায়,অনুবাদক- সুবোধ চন্দ্র মজুমদার]

অশ্বীনিকুমার

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে অশ্বীনিকুমারের এক ব্রাহ্মণীকে ধর্ষণের ঘটনা উক্ত হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে (ব্রহ্মখণ্ড/১০) বলা হয়েছে,

“শৌনক কহিলা সৌতি না পারি বুঝিতে

অশ্বীনিকুমার কেন রত ব্রাহ্মণীতে।।

সৌতি কহে মুনিবর দৈবের ঘটনা ।

ব্রাহ্মণী তীর্থেতে যায় অতি সুদর্শনা।।

পথশ্রমে ক্লান্ত অতি বিশ্রাম কারণ।

পশিল দেখিয়া এক নির্জন কানন।।

ব্রাহ্মণী বসিয়া আছে বিশ্রামের আশে।

অশ্বীনিকুমার দৈবযোগে তথা আসে।।

তাহারে দেখিয়ে পথে অশ্বীনিকুমার।

সৌন্দর্যবিমুগ্ধ মনে কাম জাগে তার।।

সুন্দরীর রূপ দেখি কাম জাগে মনে।

তাহারে ধরিতে যায় অতি সঙ্গোপনে।।

রূপবতী সতী নারী নিষেধ করিল।

কামার্ত অশ্বীনিপুত্র তাহা না শুনিল।।

নিকটেই মনোহর ছিল পুষ্পোদ্যান।

সবলে আনিয়া সেথা করে গর্ভাধান।।

লজ্জ্বা ভয়ে ব্রাহ্মণী সে গর্ভত্যাগ করে।

তখনি জন্মিল পুত্র ধরার উপরে।।“

[অনুবাদক- সুবোধ চন্দ্র মজুমদার]

বরুণ

মহাভারতে (অনুশাসন পর্ব / ১৫৪)   বরুণদেবকে চন্দ্রের কন্যা উতথ্যের স্ত্রী ভদ্রার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে হরণ করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও বরুণ যখন ভদ্রাকে ফিরিয়ে দিলেন না, উতথ্য তখন সমস্ত জলরাশি পান করতে উদ্যত হলে ,বরুণ ভয় পেয়ে ভদ্রাকে ফিরিয়ে দেন-

“বহুকাল পূর্বে বরুণ নারীটির প্রতি অভিলাষী হয়েছিলেন।উতথ্যের স্ত্রী যখন যমুনায় স্নান করতে যাচ্ছিল তখন  উতথ্য যে বনে বাস করতেন সেখানে উপস্থিত হয়ে বরুণ  তার স্ত্রীকে হরণ করেন। তাকে অপহরণ করে বরুণ তাকে তার ভবনে নিয়ে যান।… বরুণ তার সাথে বিহার করেন।…” [1]

সূর্য

ঘটনাটি কুন্তির বিবাহের আগের। কুন্তির সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা মুনি কুন্তিকে একটি মন্ত্র দিয়েছিলেন, যে মন্ত্রবলে দেবতাদের সঙ্গমের জন্য ডাকা যেত। মন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য কুন্তি মন্ত্রবলে সূর্যকে ডাকেন। সূর্যও সত্যি সত্যি মানুষের রূপ ধরে কুন্তির সামনে এসে উপস্থিত হন। অবিবাহিতা কুন্তি সূর্যকে দেখে ভয় পেয়ে যান এবং  তাকে ফিরে যেতে বলেন। সূর্য ফিরে যেতে সম্মত হন না বরং কুন্তিকে অভিশাপের ভয় দেখিয়ে তার সাথে সহবাস করেন।

সূর্য কুন্তিকে বলেছিলেন, “ আমি যদি ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাই তবে দেবতাদের নিকট হাসির বস্তুতে পরিণত হব। হে কুন্তি! তুমি যদি আমাকে সন্তুষ্ট না কর তবে আমি তোমাকে এবং যে ব্রাহ্মণ তোমাকে মন্ত্রটি দিয়েছে তাকে অভিশাপ দেব।[2]

এছাড়া সূর্য কুন্তিকে বর দিয়েছিলেন যে সন্তান প্রসবের পরও কুন্তির কুমারিত্ব বজায় থাকবে।

ভয় দেখিয়ে নারী সহবাসকে ধর্ষণ ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?

[দেবী ভাগবত ২/৬ ;অনুবাদক-স্বামী বিজ্ঞানানন্দ]

ইন্দ্র

সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা অহল্যা নামের এক অপরূপা নারীকে সৃষ্টি করেছিলেন। ‘অহল্যা’ শব্দের অর্থ হল ‘অনিন্দনীয়া’, ‘যার মধ্যে কোনো বিরূপতা নেই তিনিই অহল্যা’। এই জন্যেই ব্রহ্মা নারীটির ‘অহল্যা’ নামকরণ করেন। ‘অহল্যা কার পত্নী হবেন- এই নিয়ে স্রষ্টা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। দেবতাদের রাজা হওয়ার কারণে ইন্দ্র ভাবলেন, অহল্যা তারই পত্নী হবেন কিন্তু ব্রহ্মা অহল্যাকে গৌতম মুনির কাছে গচ্ছিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং বহুকাল পরে গৌতম অহল্যাকে পুনরায় ব্রহ্মার কাছে ফিরিয়ে দেন। গৌতমের সংযম দেখে ব্রহ্মা খুবই সন্তুষ্ট হন এবং অহল্যাকে তার স্ত্রী করে দেন। অহল্যাকে গৌতমের স্ত্রী হতে দেখে দেবতারা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। এতে দেবতাদের রাজা ইন্দ্র অত্যন্ত রেগে যান এবং গৌতমের আশ্রমে উপস্থিত হয়ে ক্রুদ্ধ ইন্দ্র অহল্যাকে দেখতে পান।

এর পর একই ঘটনার দুই ধরণের বিবরণ বাল্মীকি রামায়ণে পাওয়া যায়, একটি অনুসারে ইন্দ্র অহল্যাকে ধর্ষণ করেছিলেন, অপরটি অনুসারে অহল্যা ইন্দ্রের সাথে ব্যভিচারে রত হয়েছিলেন।

ইন্দ্রের অহল্যা ধর্ষণ প্রসঙ্গে ব্রহ্মা বলেন,

“ ইন্দ্র তুমি কামপীড়িত হইয়া অহল্যাকে বলাৎকার করিলে…”

অহল্যাকে ধর্ষণ করে পালানোর সময় ইন্দ্র গৌতমের কাছে ধরা পড়ে যান।ক্রুদ্ধ গৌতম ইন্দ্রকে দেখতে পেয়ে, কুপিত হয়ে ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন,

ইন্দ্র! তুমি নির্ভয় চিত্তে আমার পত্নীকে বলাৎকার করেছ। সুতরাং দেবরাজ ,তুমি যুদ্ধে শত্রুর হস্তগত হবে। দেবেন্দ্র! এইজন্যই তোমার দশা পরিবর্তন ঘটেছে। তুমি ইহলোকে যে ভাব প্রবর্তিত করলে, তোমার দোষে মনুষ্যলোকেও এই জারভাব প্রবর্তিত হবে, পাপের অর্ধেক অংশ তার হবে এবং পাপের অর্ধেক অংশ তোমাকে স্পর্শ করবে; আর তোমার স্থান স্থির থাকবে না, এতে সংশয় নাই। যিনি যিনি দেবগণের রাজা হবেন তিনি স্থির থাকবেন না”

এরপর গৌতম তার পত্নী অহল্যাকে অতীব তিরস্কার করেন। গৌতম বলেন,

“ আমার আশ্রমের কাছে তুমি সৌন্দর্যহীনা হয়ে থাক। তুমি রূপবতী এবং যুবতী বলেই গর্বে অস্থির হয়েছ, বিশেষত এতদিন পর্যন্ত তুমি একাকিনীই ইহলোকে রূপবতী ছিলে, কিন্তু এখন আর তা হবে না, তোমার একত্রস্থিত রূপরাশি দেখেই ইন্দ্রের দেহবিকার জন্মেছে; সুতরাং তোমার রূপ প্রজামাত্রেই পাবে, সন্দেহ নাই।“

এই কথা শুনে অহল্যা বলেন,

বিপ্রশ্রেষ্ঠ! স্বর্গবাসী ইন্দ্র তোমার রূপ ধরে অজ্ঞানবশত আমাকে বলাৎকার করেছে, বিশেষত আমার কামাচারবশত এটা সংঘটিত হয়নি”

[বাল্মীকি রামায়ণ/ উত্তর কাণ্ড/ ৩৫ সর্গ]

বিষ্ণু

পুরাণ অনুযায়ী,শঙ্খচূড় বরপ্রাপ্ত ছিল, যতক্ষণ অবধি তার পত্নী তুলসীর (তথাকথিত) সতীত্ব বজায় থাকবে, ততক্ষণ শঙ্খচূড় যুদ্ধে অপরাজেয় থাকবে। সুতরাং শঙ্খচূড়কে যুদ্ধে পরাজিত করার জন্য ভগবান বিষ্ণু শঙ্খচূড়ের রূপ ধরে শঙ্খচূড়ের পত্নী তুলসীকে ধর্ষণ করেন। তুলসীকে ধর্ষণ করার পর শঙ্খচূড়কে সহজেই হত্যা করা হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ভগবান বিষ্ণুর ধর্ষণ লীলা এইভাবে বর্ণিত আছে-

“কবচ গ্রহণ করি বিষ্ণু অতঃপর।

তুলসীর নিকটেতে চলিলা সত্ত্বর।।

শঙ্খচূড় রূপে সেথা করিয়া গমন।

তুলসীর সতীধর্ম করিলা হরণ।।

না জানিলা দৈত্যপত্নী কি পাপ হইল।

দেবতা ছলনা করি সতীত্ব নাশিল।।

যেইক্ষেত্রে বিষ্ণুদেব করিলা রমণ।

তুলসী উদরে বীর্য হইল পতন।।

সেইক্ষণে মহাদেব দৈববাণী শোনে।

শঙ্খচূড়ে বধ তুমি করহ এক্ষণে।।“

[ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, ১৩৬ পৃষ্ঠা ,সুবোধচন্দ্র মজুমদারের অনুবাদ]

ভগবান বিষ্ণু বৃন্দা নামক এক নারীকেও ধর্ষণ করেন। স্কন্দপুরাণে ঘটনাটির উল্লেখ আছে। অসুরদের রাজা জলন্ধর  ক্রুদ্ধ হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছিল, জলন্ধরের পরাক্রমে দেবতারা তার বশীভূত হয়েছিল।

এরপর একসময় শিবপত্নী পার্বতীর প্রতি মোহিত হয়ে  শিবের কাছ থেকে পার্বতীকে নিয়ে আসার জন্য জলন্ধর দূত প্রেরণ করে।  জলন্ধরের সেই ইচ্ছা অপূর্ণ থাকলে জলন্ধর বিশাল সৈন্য নিয়ে শিবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করে। শিবের সাথে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে এক মায়ার দ্বারা শিবকে জলন্ধর বশীভূত করলে, শিবের হাত হতে সকল অস্ত্র পতিত হয়। এই সময়ে জলন্ধর কামার্ত হয়ে, শিবের রূপ ধারণ করে শিবপত্নী গৌরি যেখানে উপস্থিত ছিলেন সেখানে উপস্থিত হন। দূর থেকে পার্বতীকে দেখে জলন্ধরের বীর্য পতিত হয়। পার্বতীও শিবরূপী জলন্ধরকে চিনতে পেরে, সেখান থেকে পালিয়ে যান। জলন্ধরও শিবের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ফিরে আসেন।  এরপর, পার্বতী বিষ্ণুকে স্মরণ করতে থাকেন। পার্বতীর আহ্বানে বিষ্ণু উপস্থিত হলে পার্বতী তাকে বলেন,

” হে বিষ্ণু! দৈত্য জলন্ধর আজ এক পরম অদ্ভুত কর্ম করিয়াছে; তুমি কি সেই দুর্মতি দৈত্যের ব্যবহার বিদিত নহ?” [3]

বিষ্ণু উত্তর দেন,

হে দেবী! জলন্ধরই পথ দেখাইয়াছে, আমরাও সেই পথের অনুসরণ করিব, ইহা না করিলে জলন্ধরও বধ হইবে না এবং আপনারও পাতিব্রাত্য রক্ষিত হইবে না।” [4]

“জলন্ধর যখন শিবের সাথে যুদ্ধে রত, তখন “বিষ্ণু দানবরাজপত্নী বৃন্দার পাতিব্রাত্য ভঙ্গ করিবার অভিলাষে বুদ্ধি করিলেন এবং তখনই জলন্ধরের রূপ ধারণ করিয়া, যথায় বৃন্দা অবস্থিত ছিলেন, সেই পুরমধ্যে প্রবেশ করিলেন।” [5]

এইখানে বলে রাখা প্রয়োজন, বৃন্দা হল জলন্ধরের স্ত্রী।

সেইসময়ে জলন্ধরের স্ত্রী বৃন্দা এক দুঃস্বপ্ন দেখে তার স্বামীর জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং এক ঋষির দেখা পান। বৃন্দা সেই ঋষির কাছে জলন্ধরের অবস্থা জানতে চাইলে, মুনির আদেশে দুটি বানর জলন্ধরের মাথা ও ধর নিয়ে উপস্থিত হন। তা দেখে বৃন্দা শোকগ্রস্ত হয়ে মূর্ছিত হয়ে  ভূমিতে পতিত হয়। পরে জ্ঞান ফিরলে জলন্ধরের স্ত্রী সেই ঋষির কাছে তার স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকে। তার অনুরোধে সেই ঋষি নিজে সেই স্থান হতে অদৃশ্য হয়ে যান ও সাথে সাথেই বৃন্দা জীবিত জলন্ধরকে সেই স্থানে দেখতে পায়।

জলন্ধর জীবিত হয়ে, ” প্রীতিমান বৃন্দাকে আলিঙ্গন করিয়া তাহার গলদেশে চুম্বন করিল”। “অনন্তর বৃন্দাও স্বামীকে জীবিত দেখিতে পাইয়া সুখীমনে সেই কাননমধ্যে অবস্থিত হইয়া তাহার সহিত রতি করিতে লাগিল।” একদিন বৃন্দা জলন্ধররূপী বিষ্ণুকে চিনতে পারেন। [6]

ক্রুদ্ধ হয়ে বৃন্দা বলেন,

” হে হরে! তুমি পরদারগামিনী (অন্যের স্ত্রীকে সম্ভোগকারী), তোমার চরিত্রে ধিক!”  [7]

বিষ্ণুকে তীরস্কার করে, অভিশাপ দিয়ে , আত্মহত্যা করার জন্য বৃন্দা আগুনে প্রবেশ করেন। “বৃন্দাসক্তমনা (বৃন্দার প্রতি আসক্ত) বিষ্ণু তাঁহাকে বারণ করিলেও তিনি তাহা শুনিলেন না। অনন্তর হরি বারবার তাঁহাকে স্মরণ পূর্বক দগ্ধদেহ বৃন্দার ভস্ম-রজো দ্বারা শরীর আবৃত করিয়া সেই স্থানেই অবস্থিত হইলেন, সুর ও সিদ্ধগণ তাঁহাকে সান্ত্বনা  দান করিলেও তিনি শান্তি লাভ করিলেন না।” [8]

রাক্ষস বিবাহ

হিন্দু শাস্ত্রে আটপ্রকারের বিবাহের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যথাঃ ব্রাহ্ম,দৈব,আর্য,প্রাজাপত্য,আসুর,গান্ধর্ব,রাক্ষস ও পৈশাচ। (মনু ৩/২৩) এই বিবাহগুলির মধ্যে আমাদের আলোচ্য বিবাহ হল রাক্ষস বিবাহ। মনুসংহিতায় রাক্ষস বিবাহ সম্বন্ধে বলা হয়েছে,

“কন্যাপক্ষের লোকদের হত্যা করে,আহত করে কিংবা তাদের বাসস্থান আক্রমণ করে রোদনরত কন্যাকে বলপূর্বক হরণ করে যে বিবাহ তাকে রাক্ষস বিবাহ বলে। (মনু ৩/৩৩)

এই ধরণের অপহরণ করে বিবাহকে ধর্ষণ না বলে আর কি বলা যায়? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল আগেকার হিন্দু সমাজে এই প্রকারের ধর্ষণ তুল্য বিবাহ বৈধতা পেয়েছিল। রাক্ষস বিবাহকে ক্ষত্রিয় জাতির জন্য বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল-

“… শেষ চারটি বিবাহ অর্থাৎ আসুর,গান্ধর্ব,রাক্ষস ও পৈশাচ ক্ষত্রিয়ের পক্ষে বৈধ”। (মনু ৩/২৩)

এমনকি রাক্ষস বিবাহকে ধর্মজনক হিসাবে গণ্য করা হয়েছে-

  • “কিন্তু এই মানবশাস্ত্র মতে প্রাজাপত্য,আসুর,গান্ধর্ব,রাক্ষস ও পৈশাচ – এই পাঁচ প্রকারের বিবাহের মধ্যে প্রাজাপত্য,গান্ধর্ব ও রাক্ষস- এই তিনপ্রকার বিবাহ ধর্মজনক।“ (মনু ৩/২৫)
  • “ক্ষত্রিয়ের পক্ষে গান্ধর্ব ও রাক্ষস বিবাহ পৃথক পৃথকভাবে অথবা মিশ্রিতভাবে যেভাবেই সম্পাদিত হোক না কেন, দুই প্রকার বিবাহই ধর্মজনক…” (মনু ৩/২৬)

শাস্ত্রে রাক্ষস বিবাহের অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। ভীষ্ম তার ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশিরাজের তিন কন্যা অম্বা,অম্বিকা ও অম্বালিকাকে অপহরণ করে এনেছিলেন। [9] দুর্যোধনের সাথে কলিঙ্গ  রাজ চিত্রাঙ্গদের কন্যার বিবাহ দেওয়ার জন্য স্বয়ংবরসভা থেকে তাকে বলপূর্বক হরণ করে আনেন কর্ণ।[10]দেবকের রাজসভা থেকে দেবকীকে শিনি বলপূর্বক অধিকার করে এনেছিলেন বসুদেবের সাথে বিবাহ দেবার জন্য। [11] কৃষ্ণের  মন্ত্রণায় অর্জুন কৃষ্ণের বোন সুভদ্রাকে হরণ করেছিলেন।  সুভদ্রাকে দেখে অর্জুনের পছন্দ হলে কৃষ্ণ অর্জুনকে সুভদ্রা লাভের পরামর্শ দেওয়ার সময় বলেন, ” হে অর্জুন! স্বয়ংবরই ক্ষত্রিয়দিগের বিধেয়, কিন্তু স্ত্রীলোকের প্রবৃত্তির কথা কিছুই বলা যায় না, সুতরাং তদ্বিষয়ে আমার সন্দেহ জন্মিতেছে। আর ধর্ম শাস্ত্রকারেরা কহেন, বিবাহোদ্দেশ্যে বলপূর্বক হরণ করাও ক্ষত্রিয়দিগের প্রশংসনীয়। অতএব স্বয়ংবরকাল উপস্থিত হইলে তুমি আমার ভগিনীকে বলপূর্বক হরণ করিয়া লইয়া যাইবে। কারণ স্বয়ংবরে সে কাহার প্রতি অনুরক্ত হইবে, কে বলিতে পারে?” কৃষ্ণের পরামর্শ মত অর্জুন সুভদ্রাকে রৈবতক পর্বতে পূজা করে ফেরার সময় অপহরণ করেন। এ ঘটনায় সুভদ্রার পরিবার ও বংশের লোকেরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলে কৃষ্ণ তাদের শান্ত করেন। কৃষ্ণ বলেন, ” … স্বয়ংবরে কন্য লাভ করা অতীব দুরূহ ব্যাপার, এই জন্য (অর্জুন) তাহাতেও সম্মত হন নাই এবং পিতামাতার অনুমতি গ্রহণপূর্বক প্রদত্তা কন্যার পাণিগ্রহণ করা তেজস্বী ক্ষত্রিয়ের প্রশংসনীয় নহে।অতএব আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, কুন্তিপুত্র ধনঞ্জয় উক্ত দোষ সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া বলপূর্বক সুভদ্রাকে হরণ করিয়াছেন…” [12]

উপনিষদের অমানবিকতা

সঙ্গমে আগ্রহহীনা নারীকে লাঠি দিয়ে প্রহার করে সঙ্গমের জন্য রাজি করানোর কথা বলা হয়েছে উপনিষদে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হচ্ছে-

“সা চেদস্মৈ ন দদ্যাৎ কামমনোমবক্রীণীয়াৎ সা চৈদস্মৈ নৈব দদ্যাৎ

কামমেনাং যষ্ট্যা পাণিনা বোপহত্যাতিক্রামেদিন্দ্রিয়েণ তে যশসা যশ

আদদ ইত্যযশা এব ভবতি।। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৬/৪/৭)

সরলার্থঃ যদি সেই স্ত্রী এই পুরুষকে কামনা না যোগায় তবে সে সেই স্ত্রীলোককে উপহারাদি দ্বারা বশীভূত কতিবে। তাহাতেও যদি সে পুরুষের কামনা চরিতার্থ না করে তবে সেই স্ত্রীকে সে হাত বা লাঠি দ্বারা আঘাত করিয়া বলিবে-‘আমি ইন্দ্রিয়রূপ যশদ্বারা তোমার যশ গ্রহণ করিতেছি।‘ এই বলিয়া তাহাকে বশীভূত করিবে।ইহাতে সেই স্ত্রী যশোহীনা হইবে।” [হরফ প্রকাশনী]

নারীর সাথে এমন ব্যবহারকারী পুরুষ আজকের যুগে ঋষি হিসাবে পূজিত হত না বরং কারাগারে তার ঠাই হত।

 


তথ্যসূত্র ও টীকা- 

[1] It so happened, however, that the handsome Varuna had, from a long time before, coveted the girl. Coming to the woods where Utathya dwelti Varuna stole away the girl when she had plunged into the Yamuna for a bath. Abducting her thus, the Lord of the waters took her to his own abode. That mansion was of wonderful aspect. It was adorned with six hundred thousand lakes. There is no mansion that can be regarded more beautiful than that palace of Varuna. It was adorned with many palaces and by the presence of diverse tribes of Apsaras and of diverse excellent articles of enjoyment. There, within that palace, the Lord of waters,
O king, sported with the damsel. A little while after, the fact of the ravishment of his wife was reported to Utathya. [ Mahabrahata/Anushasana Parva/  154, Translated by Pratap Chandra Roy]

[2]  ”…Surya Deva said :– “O Kunti! What for you called me, by virtue of the Mantra? Calling me, why do you not worship me, standing before you? O beautiful blue one! Seeing you, I have become passionate; so come to me. By means of the mantra, you have made me your subservient so take me for intercourse.” Hearing this, Kunti said:– “O Witness of all! O knower of Dharma! You know that I am a virgin girl. O Suvrata! I bow down to you; I am a family daughter; so do not speak ill to me.” Surya then said :– “If I go away in vain, I will be an object of great shame, and, no doubt, will be laughed amongst the gods; So, O Kunti! If you do not satisfy me, I will immediately curse you and the Brahmin who has given you this mantra. O Beautiful one! If you satisfy me, your virginity will remain; no body will come to know and there will be born a son to you, exactly like me.” Thus saying Surya Deva enjoyed the bashful Kunti, with her mind attracted towards him; He granted her the desired boons and went away. The beautiful Kunti became pregnant and began to remain in a house, under great secrecy. Only the dear nurse knew that; her mother or any other person was quite unaware of the fact. In time, a very beautiful son like the second Sun and Kartikeya, decked with a lovely Kavacha coat of mail and two ear-rings, was born there.” [ Devi Bhagavatam 2.6.13-35 Translated by-  Swami Vijnananda]

[3]  স্কন্দ পুরাণ/বিষ্ণুখণ্ড/ কার্ত্তিক মাসের মাহাত্ম্য কথন/ ২০/২২-৩১

[4]  স্কন্দ পুরাণ/বিষ্ণুখণ্ড/ কার্ত্তিক মাসের মাহাত্ম্য কথন/ ২০/২২-৩১

[5] স্কন্দ পুরাণ/বিষ্ণুখণ্ড/ কার্ত্তিক মাসের মাহাত্ম্য কথন/ ২১/১-৫

[6]  স্কন্দ পুরাণ/বিষ্ণুখণ্ড/ কার্ত্তিক মাসের মাহাত্ম্য কথন/ ২১/১৯-৩১

[7]  স্কন্দ পুরাণ/বিষ্ণুখণ্ড/ কার্ত্তিক মাসের মাহাত্ম্য কথন/ ২১/১৯-৩১

[8]  স্কন্দ পুরাণ/বিষ্ণুখণ্ড/ কার্ত্তিক মাসের মাহাত্ম্য কথন/ ২১/১৯-৩১

[9] মহাভারত/আদি পর্ব/ দ্বধিকশততম (১০২) অধ্যায়

[10] ভারতে বিবাহের ইতিহাস, লেখক- অতুল সুর

[11] ভারতে বিবাহের ইতিহাস, লেখক- অতুল সুর

[12] কালিপ্রসন্নসিংহের মহাভারত/ আদিপর্ব/ ১২০-১২১ অধ্যায়

 

Facebook Comments

অজিত কেশকম্বলী II

"মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।" - লালন সাঁই

15 thoughts on “হিন্দু ধর্মে ধর্ষণ

  • December 13, 2018 at 3:39 am
    Permalink

    গ্রন্থ অনুসারে আপনি ঠিক কথা-ই লিখেছেন। কিন্তু, আমার প্রশ্ন হলো, এগুলো তো গল্পগাছা বা myth, এর মধ্যে তো কোনো সারবত্ত্বা নেই। অধিকাংশ হিন্দুরা পুরাণ গন্থগুলোকে মান্য শাস্ত্র গ্রন্থ হিসেবে মনে করেন না।

    Reply
    • December 13, 2018 at 7:01 am
      Permalink

      মিথগুলোর মাধ্যমে কোনো সমাজের অবস্থাই প্রতিফলিত হয়।অধিকাংশ হিন্দুরা পুরাণকে না মানলে নিশ্চয় পৌরাণিক দেবদেবীদের পূজা করা বন্ধ করবে! অধিকাংশ হিন্দুরাই পুরাণের ধর্ম পালন করে এখনও।

      মহাভারতের কৃষ্ণকে আরাধ্য মানলে, ঐতিহাসিক মনে করলে,তার জন্মদিন পালন করলে, মহাকাব্য মহাভারতের অন্তর্গত গীতাকে প্রামাণিক গ্রন্থ মানলে, ভারতের বৃহস্পতিকে কোন যুক্তিতে মিথ মনে করবে?

      Reply
    • December 13, 2018 at 7:16 am
      Permalink

      প্রধান ধর্মশাস্ত্র মনুসংহিতার রাক্ষস বিবাহ সম্বন্ধে এবং উপনিষদের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সহবাসে রাজি করানো সম্বন্ধে আপনার কি বক্তব্য?

      Reply
  • December 16, 2018 at 10:32 pm
    Permalink

    পুরান কখনই শাস্ত্রের মধ্যে পড়ে না । পুরান বহু আগেই সমস্ত সনাতন ধর্মের স্কলাররা খারিচ করেছেন । পুরানের কখনই কোন অথেন্টিসিটি প্রমাণিত নয় । মনু নিয়মও শাস্ত্রের মধ্যে পড়ে না । সনাতন ধর্মে শাস্ত্র হল বেদ , রামায়ন ও মহাভারত যার অংশ হল গীতা যেটি ভগবানের দেখানো একমাত্র রাস্তা ।

    মহাভারতের বরুন দেব নিয়ে যেটি লেখা হয়েছে এটি একজন কাহিনি হিসাবে বর্ননা করছেন । যিনি বলছেন তিনি ভগবান নন । বাণী সেটাই যেটা হিন্দুরা ঈশ্বর বলছেন বলে জানেন । যেমন মুসলিমরা কোরানের কথাগুলিই আল্লাহ্‌র বাণী মনে করে । সেই হিসাবে সাধারন মানুষ কি বলছে সেটা কখনই এডমিসিবল হয়না । সেই হিসাবে তাহলে মহাভারতে দুর্শাসনেরও অনেক খারাপ কথা আছে । দুর্যোধনেরও অনেক খারাপ কাজ , খারাপ কথা আছে , সেটাও ধর্ম বলে বিবেচিত হত । গীতার বাণী দেবার আগে পর্যন্ত মহাভারতের বিভিন্ন মানুষরা নিজেদের মনের মতই ধর্ম পালন করত । তারা নিজেরা যেটাকে ঠিক মনে করত সেটাই তার কাছে ধর্ম মনে করত । যেমন ভীষ্ম আজীবন বিয়ে না করে সেবা করাটাই নিজের ধর্ম ভেবেছিলেন পড়ে ভগবান তাকে বলেন যে সে ভুল ছিল ।

    মনুতে রাক্ষস বিবাহ সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে সেই হিসাবে দেখলেও এই বিবাহ একমাত্র কুমারী মেয়ের জন্যেই প্রযোজ্য ছিল । এটিকে বিবাহ বলা হয়েছে যাতে ঐ মেয়েটির পরবর্তি দায়িত্বও ঐ ছেলেটির ওপরেই থাকে । বেদে বলা হয়েছে , যে ব্যাক্তি ঘরে লুকিয়ে আগুন দেয় , যে ব্যাক্তি বিষ প্রয়োগ করে ও যে ব্যাক্তি পরস্ত্রীর দিকে কামাতুর হয় তাকে সেখানেই হত্যা করতে । তো মনুবাদ কখনই বেদের থেকে বিপরীত হতে পারে না । অনেকেই এটি জানে না যে সনাতন ধর্মে পুরুষের যেমন বহুবিবাহের অনুমতি রয়েছে তেমনভাবেই একজন মহিলাকেও সর্বাধিক ৩ টে বিয়ে করার অনুমতি রয়েছে । অর্থাৎ কোন মেয়ের রাক্ষস বিবাহ হলেই এই নয় যে সে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে না । যদিও শাস্ত্রের মধ্যে মনু পড়ে না ।

    কুন্তিকে এই মন্ত্র এই জন্যই দেওয়া হয়েছিল কারন তার স্বামীর অভিশাপ ছিল যে সহবাস করলেই সে মারা যাবে । এক সন্যাসি তার স্ত্রীর সাথে হরীনের রুপ ধরে সহবাস করছিলেন । রাজা পান্ডু দুই হরীন দেখতে পেয়ে তীর ছুড়েন । হরীন দুটি এরপর সন্যাসী ও তার স্ত্রীর রুপে ফিরে আসেন এবং অভিশাপ দেন যে আমাদের যে অবস্থায় তুমি হত্যা করলে , তুমি যদি কখনই সহবাস করো তাহলে মারা যাবে । এই কারনে কুন্তিকে মন্ত্র দেওয়া হয় যে যখনই এই মন্ত্র পড়ে কোন দেবতাকে ডাকবে সে আসতে বাধ্য হবে এবং তোমায় সন্তান প্রদান করবে । বিয়ের পুর্বে কুন্তি এই মন্ত্রের সত্যতা প্রমান করতে সুর্যদেবকে স্বরন করে ফেলেন মন্ত্র পড়ে । ফলে সুর্যদেব আসেন । সুর্যদেব কখনই কুন্তির সাথে সহবাস করেনি । কুন্তি অবিবাহিতের কথা বলতে সুর্যদেব কুন্তির কান থেকে কর্নের সৃষ্টি করেন । এরপর বিয়ের পর পান্ডুর সামনেই প্রথমে যমরাজকে ডেকে যুধিস্টির , পবনদেবকে ডেকে ভিম , ও ইন্দ্রদেবকে ডেকে অর্জুনের জন্ম দেন । এদের তিনজনের জন্মই একই দিনে হয়েছে একই সাথে । তো বোঝাই যাচ্ছে যে কোনটাই সহবাসের জন্য হয়নি । পান্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী এমন কোন মন্ত্র জানা না থাকায় সে পান্ডুকে সহবাসে বাধ্য করে । এরপর মাদ্রীর গর্ভে নকুল ও সহদেব জন্মায় । পান্ডু মারা যান ।

    লেখক হাস্যকর ভাবে কিছু পুরান ও সাধারন কিছু লোকের গল্প কথা হাজির করেছেন । যদি কোন খারাপ বা ভুল দেখাতেই হয় , সেটা দেখান যেখানে ভগবান কোন ভুল বা খারাপ কিছু বলেছে । মানুষ নয় ।

    Reply
  • December 17, 2018 at 11:21 am
    Permalink

    প্রথমত, পুরাণ,মনু শাস্ত্রের মধ্যে পড়েনা এই ধরণের মনগড়া কথা বলার কি দরকার? প্রথমে মনুর কথা দিয়েই শুরু করি। ১/ হিন্দুদের আদিমতম গ্রন্থ বেদে অসংখ্যবার মনুর উল্লেখ পাওয়া যায়-
    “ হে অগ্নি! দেবগণ প্রথমে তোমাকে নহুষের মনুষ্যরূপধারী সেনাপতি করেছিলেন এবং ইহলোকে মনুর ধর্মোপদেষ্টা করেছিলেন। পুত্র যেন পিতৃতুল্য হয়।“ ঋগ্বেদ ১/৩১/১১
    “হে বিশুদ্ধ অগ্নি! হে অঙ্গীরা! মনু ও অঙ্গীরা এবং যযাতি ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের ন্যায় তুমি সম্মুখবর্তী হয়ে (যজ্ঞ) দেশে গমন কর, দেবসমূহকে আন ও কুশের উপর উপবেশন করাও এবং অভিষ্ট হব্যদান কর।“ ঋগ্বেদ ১/৩১/১৭
    “হে অগ্নি!তুমি এ যজ্ঞে বসুদের,রুদ্রদের এবং আদিত্যদের অর্চনা কর এবং শোভনীয় যজ্ঞযুক্ত ও জলসেচনকারী মনুজাত জনকেও অর্চনা কর।“ ঋগ্বেদ ১/৪৫/১
    “আমাদের নতুন স্তুতি হৃদয়জাত ও মিষ্ট জিহ্ব অগ্নির সম্মুখে ব্যপ্ত হোক; মনুর সন্তান মানুষগণ যথাকালে যজ্ঞ সম্পাদন করে ও যজ্ঞান্ন প্রদান করে সে অগ্নিকে সংগ্রামকালে উৎপন্ন করে। ঋগ্বেদ” ১/৬০/৩
    “হে অগ্নি! তুমি মনুর অপত্যগণের মধ্যে দেবগণের আহ্বানকারী রূপে অবস্থিতি কর;তুমিই তাদের ধনের স্বামী, তারা স্বীয় শরীরে পুত্র উৎপাদনার্থ শক্তি ইচ্ছা করেছিল এবং মোহত্যাগ করে পুত্রগণের সাথে চিরকাল জীবিত থাকে।“ ঋগ্বেদ ১/৬৮/৪
    “ দেবগণের আহ্বানকারী, অতিশয় বিদ্বান এবং দেবগণের মধ্যে মেধাবী অগ্নিদেব,মনুর যজ্ঞের ন্যায় আমাদের যজ্ঞে উপবেশন করে দেবগণকে আমাদের হব্যের অভিমুখে শাস্ত্রানুসারে প্রেরণ করুন। হে দ্যাবাপৃথিবী! আমার বিষয় অবগত হও।“ ঋগ্বেদ ১/১০৫/১৪
    “আমরা যজ্ঞানুষ্ঠান ও আজ্যাদিবিশিষ্ট নমোস্কারোপলক্ষিত স্তোত্র দ্বারা বহু হব্য বিশিষ্ট এবং দেবযজ্ঞে যজ্ঞসাধক অগ্নিকে পরিতোষপূর্বক সেবা করি। সে অগ্নি আমাদের হব্যরূপ অন্য গ্রহণের জন্য ক্ষমবান হয়ে নাশপ্রাপ্ত হবেন না। মাতরিশ্বা মনুর জন্য দূর হতে অগ্নিকে এনে দীপ্ত করেছিলেন, সেরূপ দূর হতে আমাদের যজ্ঞশালায় তিনি আসুন।“ ঋগ্বেদ ১/১২৮/২
    “ হে ইন্দ্র! তুমি সমুদ্রাভিমুখে যাবার জন্য নদীদের গমণশীল রথের ন্যায় অনায়াসে সৃজন করেছ। সংগ্রামকামীগণ যেরূপ রথ সৃজন করে সেরূপ তুমিও করেছ।মনুর জন্য ধেণুগণ যে সর্বার্থপ্রদ হয় এবং সমর্থ মানুষের জন্য ধেণুগণ যেরূপ ক্ষীরপ্রদ হয় সেরূপ অস্মদাভিমুখী নদী সকল একই প্রয়োজনে জল সংগ্রহ করে।“ ঋগ্বেদ ১/১৩০/৫
    “ স্বীয় তেজবলে শত্রুদের পরাভব করবার সময় হে অগ্নি! তুমি আমাদের সম্ভোগযোগ্য স্তুতি অবগত হও। তোমার আশ্রয় পেয়ে আমরা মনুর ন্যায় স্তব করি। সে অনুন মধুস্পর্শী ধনপ্রদ অগ্নিকে আমি জুহু ও স্তুতি দ্বারা আহ্বান করি।“ ঋগ্বেদ ২/১০/৬
    হে মরুৎগণ ! তোমাদের যে নির্মল ঔষধ আছে, হে অভীষ্টবর্ষিগণ, তোমাদের যে ঔষধ অত্যন্ত সুখকর ও সুখপ্রদ, যে ঔষধ আমাদের পিতা মনু মনোনীত করেছিলেন, রুদ্রের সে সুখকর ভয়হারী ঔষধ আমরা কামনা করছি। (২.৩৩.১৩)।
    ঋগ্বেদ ৪/২৬/১ এ ইন্দ্র আপনার কীর্তি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
    “আমি মনু, আমি সূর্য, আমি মেধাবী কক্ষীবান ঋষি, আমি অর্জুনীর পুত্র কুৎস রিষিকে অলঙ্কৃত করেছি, আমি কবি উশনা, আমাকে দর্শন কর।
    “হে অগ্নি! মনুর ন্যায় আমরা তোমাকে ধ্যান ও প্রজ্বলিত করছি; হে অঙ্গীরা! তুমি মনুর ন্যায় যজমানের জন্য দেবগণের পূজা কর।“ ঋগ্বেদ ৫/২১/১
    “মনুকৃত দেবযজ্ঞে তিনটি তেজের আবির্ভাব হয়; মরুৎগণ অন্তরিক্ষে সূর্য, বায়ু,অগ্নিরূপে তিনটি জ্যোতিষ্ক ধারণ করেন। হে ইন্দ্র! বিশুদ্ধ বলসম্পন্ন মরুৎগণ তোমার স্তব করেন, কারণ তুমি সুবুদ্ধিসম্পন্ন এবং এসকল মরুৎ দর্শন করে।“ ঋগ্বেদ ৫/২৯/১
    “হে বন্ধুগণ! এস, আমরা সে স্তোত্র পাঠ করি, যা দিয়ে অপহৃত ধেণুগণের গোষ্ঠ উদ্ঘাটিত হয়েছিল, যা দিয়ে মনু বিশিশিপ্রকে জয় করেছিলেন যা দিয়ে বণিকের ন্যায় কক্ষীবান জলেচ্ছায় বনে গিয়ে জল লাভ করেছিল।“ ঋগ্বেদ ৫/৪৫৬
    “হে মহান ইন্দ্র! মনুর ন্যায় কুশ বিস্তারকারী যজমানের অন্নের জন্য এবং সুখের জন্য যে যজ্ঞ আরদ্ধ হয়, অদ্য তোমাদের জন্য ক্ষিপ্র সে যজ্ঞ ঋত্বিকগণের দ্বারা প্রবৃত্ত হয়েছে।“ ঋগ্বেদ ৬/৬৮/১
    “হে অগ্নি! ঋত্বিকগণ দিবসে তিনবার হব্যদাতা মনুষ্যের জন্য তোমার মধ্যে হব্য প্রক্ষেপ করে। মনুর ন্যায় এ যজ্ঞে দূত হয়ে যাগ কর এবং আমাদের শত্রু হতে রক্ষা কর।“ ঋগ্বেদ ৭/১১/৩
    “ যজ্ঞার্হ দেবগণের ও যজনীয় মনুর, যজনীয় মরণরহিত সত্যজ্ঞ যে দেবগণ আছেন, তারা অদ্য আমাদের বহু কীর্তি যুক্ত পুত্র প্রদান করুন। তোমরা সর্বদা আমাদের স্বস্তি দ্বারা পালন কর।“ ঋগ্বেদ ৭/৩৫/১৫
    “তুমি যজ্ঞশীল, কবিপুত্র,জাতবেদা,মনুর গৃহে উশবা তোমাকে হোতারূপে উপবেশন করিয়েছিলেন।“ ঋগ্বেদ ৮/২৩/১৭
    “হে বরুণ! আমরা মনুর ন্যায় সোম অভিষব করে ও অগ্নি সমিদ্ধ করে, ঘন ঘন হব্য স্থাপন ও বর্হি ছেদন করে তোমাদের আহ্বান করছি” ঋগ্বেদ ৮/২৭/৭
    “সমান ক্রোধবিশিষ্ট বিশ্বদেবগণ মনুর উদ্দেশ্যে যুগপৎ দানে প্রবৃত্ত হোন, অদ্য এবং অপর দিনে এবং আমাদের পুত্রের জন্যেও ধনদাতা হোন।“ ঋগ্বেদ ৮/২৭/২০
    “হে শত্রু ভক্ষক, মনুর যজ্ঞারহ দেবগণ! তোমরা ত্রয়স্ত্রিংশ, তোমরা এ প্রকারে স্তুত হয়েছ।“ ঋগ্বেদ ৮/২৯/২
    “তোমরা আমাদের ত্রাণ কর,তোমরা রক্ষা কর, তোমরা আমাদের মিষ্ট কথা বল। হে দেবগণ! পিতা মনু হতে আগত পথ হতে আমাদের ভ্রষ্ট করো না, দূরবর্তী মার্গ হতেও ভ্রষ্ট করো না।“ ঋগ্বেদ ৮/২৯/৩
    “ হে ইন্দ্র! বিবস্বান মনুর সোম পূর্বে যেরূপ পান করেছ, ত্রিতের মন যেরূপ যুগিয়েছ, আয়ুর সাথে যেরূপ প্রমত্ত হয়েছে,-“ ঋগ্বেদ ৮/৫২/১
    “ যে স্থানে সকল স্তুতিবাক্য রচয়িতারা স্তব করবার জন্য মিলিত হয়, সোমের সে সত্য স্বরূপ স্থান আমরা যেন প্রাপ্ত হই। সে সোম যার জ্যোতি দ্বারা আলোক উদয় হয়ে দিবসের আবির্ভাব করেছে। যার জ্যোতি মনু রক্ষা করেছে এবং দস্যুর দিকে প্রেরিত হয়েছে।“ ঋগ্বেদ ৯/৯২/৫
    “ যে সকল দেবতা অতি দূরদেশ হতে এসে মনুষ্যদের সাথে বন্ধুত্ব করেন,যারা বিবস্বানের পুত্র মনুর সন্তানদের অতি সন্তুষ্ট হয়ে তাদের আশ্রয় দান করেন, যারা নহুষপুত্র যযাতির যজ্ঞে অধিষ্ঠান হন, তারা আমাদের মঙ্গল করুন।“ ঋগ্বেদ ১০/৬৩/১
    “মনু অগ্নি প্রজ্বলিত করে শ্রদ্ধাযুক্ত চিত্তে সাতজন হোতা নিয়ে যে সকল দেবতার উদ্দেশ্যে অতি উৎকৃষ্ট হোমের দ্রব্য উৎসর্গ করেছেন, সে সমস্ত দেবতাগণ আমাদের অভয় দান করুন এবং সুখী করুন, আমাদের সকল বিষয়ে সুবিধা করে দিন এবং কল্যাণ বিতরণ করুন।“ ঋগ্বেদ ১০/৬৩৬/৭
    ইন্দ্রের কীর্তি সম্বন্ধে ঋগ্বেদে বলা হচ্ছে-

    “যজ্ঞানুষ্ঠানে নমুচিকে বধ করেছ। দাসজাতীয়কে ঋষির নিকট নিস্তেজ করে দিয়েছ। তুমি মনুকে সুবিস্তীর্ণ পথ সকল প্রস্তুত করে দিয়েছ, সেগুলি দেবলোকে যাবার অতি সরল পথ হয়েছে।“ ঋগ্বেদ ১০/৭৩/৭
    “যেমন পূর্বকালে মনুর যজ্ঞে সোমরস এসেছিল, সেরূপ এ প্রস্তরের দ্বারা নিষ্পীড়িত সোম জলে প্রবেশ করুন। গাভীদের জলে স্নান করাবার সময়ে এবং গৃহ নির্মাণ কারযে এবং ঘোটকদের স্নান করাবার সময় যজ্ঞকালে এ অবিনাশী সোমরসদের আশ্রয় লওয়া হয়। “ ঋগ্বেদ ১০/৭৭/৩

    ২/এছাড়াও,

    তৈত্তিরীয় সংহিতায় মনুর নির্দেশকে ‘ভেষজ’ বলা হয়েছে- “যদ্বৈ কিং চ মনুরবদৎ তদ্ ভেষজম্।”
    ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণে “সর্বজ্ঞানময়ো বেদঃ সর্ববেদময়ো মনুঃ” উক্তিটির মাধ্যমে মনুর মধ্যে সমস্ত বেদের জ্ঞান নিহিত আছে বলে প্রশংসা করা হয়েছে।
    ছান্দোগ্য উপনিষদে ঋষি বলছেন- “প্রজাপতি (ব্রহ্মা) মনুকে উপদেশ দিয়েছিলেন এবং মনুই প্রজাদের মধ্যে তা প্রচার করেন।”- “প্রজাপতি র্মনবে মনুঃ প্রজাভ্যঃ” (৩.১১.৪)।
    তৈত্তিরিয় সংহিতায় মনু থেকেই প্রজা সৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
    ৩/ রামায়ণের কিস্কিন্ধ্যাকাণ্ডে দেখা যায়, রামচন্দ্রকর্তৃক আহত বানররাজ বালি রামচন্দ্রকে ভর্ৎসনা করলে রামচন্দ্র মনুসংহিতা থেকে দুটো শ্লোক উদ্ধৃত করে নিজ দোষ ক্ষালনে উদ্যোগী হয়েছিলেন-“রাজভিঃ ধৃতদণ্ডাশ্চ কৃত্বা পাপানি মানবাঃ।নির্মলাঃ স্বর্গমায়ান্তি সন্তঃ সুকৃতিনো যথা।।শাননাদ্ বাপি মোক্ষাদ্ বা স্তেনঃ পাপাৎ প্রমুচ্যতে।রাজা ত্বশাসন্ পাপস্য তদবাপ্নোতি কিল্বিষম্ ।।” (১৮/৩১-৩২)অর্থাৎ, মানুষ পাপ করলে যদি রাজা তাকে দণ্ড দেন, তবে সে পাপমুক্ত হয়ে পুণ্যবান ব্যক্তির ন্যায় স্বর্গে যায়; রাজার দ্বারা শাসিত হলে, অথবা বিচারের পর বিমুক্ত হলে, চোর চৌর্যপাপ থেকে মুক্তি লাভ করে। কিন্তু রাজা চোরকে শাসন না করলে তিনি নিজেই ঐ চৌর্যপাপের দ্বারা লিপ্ত হন।রামায়ণে উদ্ধৃত এই শ্লোক দুটি মনুসংহিতার অষ্টম অধ্যায়ের ৩১৬ ও ৩১৮ সংখ্যক শ্লোকে প্রায় একইভাবে পাওয়া যায়।
    কোশলদেশে বিখ্যাত অযোধ্যা নগরীর স্রষ্টা হিসাবে রামায়ণে ‘মানবশ্রেষ্ঠ মনু’-র নাম পাওয়া যায়।
    “অযোধ্যা নাম তত্রাসিৎ নগরী লোকবিশ্রুতা।
    মনুনা মানবেন্দ্রেণ পুরের পরিনির্মাতা।। (বালকাণ্ড ৫/৬)

    ৪/ মহাভারতেও অসংখ্যবার মনুর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে কখনো ‘স্বায়ংভুব মনু’ এবং কখনো বা ‘প্রাচেতস মনু’র উক্তি উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে।
    মহাভারতের শান্তিপর্বে (৩৩৬.৩৮-৪৬) বর্ণিত হয়েছে-“পুরুষোত্তম ভগবান ধর্মবিষয়ক লক্ষ শ্লোক রচনা করেছিলেন, যার দ্বারা সমগ্র লোকসমাজের পালনীয় ধর্মের প্রবর্তন হয়েছিলো (লোকতন্ত্রস্য কৃৎস্নস্য যস্মাদ্ ধর্মঃ প্রবর্ততে)। স্বায়ংভুব মনু নিজে ঐ ধর্মগুলি প্রচার করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে উশনাঃ ও বৃহস্পতি মনু-স্বায়ংভুবের গ্রন্থ আশ্রয় করে নিজ নিজ শাস্ত্র রচনা করেছিলেন।–“স্বায়ংভুবেষু ধর্মেষু শাস্ত্রে চৌশনসে কৃতে।বৃহস্পতিমতে চৈব লোকেষু প্রতিচারিতে।।”

    মহাভারতের শান্তি পর্বে রয়েছে,
    “প্রজেনং স্বেষু দারেষু মার্দবং হ্রীরচাপলম।
    এবং ধর্মং প্রধানেষ্টং মনু স্বায়ম্ভুবোহব্রবিং।।“ (২১/১২)
    অর্থাৎ, স্বায়ম্ভুব মনু বলেছেন- নিজ স্ত্রীতে সন্তান উৎপাদন, ম্রিদুতা, লজ্জ্বা ও অচপলতা প্রভৃতি গুণগুলি অবলম্বন করাই হল শ্রেষ্ঠ ও অভিষ্ট ধর্ম।
    রাজধর্ম বা রাজনীতিশাস্ত্রের রচয়িতা হিসাবে প্রাচেতস মনুর পরিচয়ও শান্তি পর্বে আছে-
    “প্রাচেতসেন মনুনা শ্লৌকৌ চেমৌ উদাহুতৌ।
    রাজধর্মেষু রাজেন্দ্র তাবিহৈকমনাঃ শৃণু ।।“ (৫৭/৪৩)
    অর্থাৎ,মহাভারতের বনপরবে (৩৫/২১) মনুর দ্বারা মনুর দ্বারা রাজধর্ম বর্ণিত হওয়ার কথা এবং মনুর সৃষ্ট অর্থবিদ্যার প্রসঙ্গ দ্রোণপর্বে (৭/১) দেখা যায়।

    ৫/ গীতায় কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন-
    “ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবান্ অহমব্যয়ম্।বিবস্বান্ মনবে প্রাহ মনুরিক্ষাকবেহব্রবীৎ।।” (৪.১)
    অর্থাৎ আমি ঐ যোগ পুরাকালে বিবস্বানকে বলেছিলেন এবং বিবস্বান নিজপুত্র বৈবস্বত মনুকে বলেছিলাম । পরে বৈবস্বত মনু ঐ যোগ ইক্ষাকুকে বলেছিল।
    প্রচুর ধর্মগ্রন্থে বারংবার মনুর উল্লেখ থেকে বোঝা যায় মনু হিন্দু ধর্মে কতটা গুরুত্বপূর্ণ নাম।

    হিন্দু সমাজের সকল রীতি নীতি আইন ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত হয়। আর ধর্মশাস্ত্রগুলির মধ্যে মনুই সর্বপ্রধান। আর মনুতে রাক্ষস বিবাহের অনুমোদন রয়েছে। মহাভারতেও রাক্ষস বিবাহের অনুমোদন রয়েছে। মহাভারত পড়ে দেখুন। আপনার কথা অনুসারে কৃষ্ণ যেটা বলেছে সেটাই বাণী। তাহলে কৃষ্ণের নিচের উক্তিগুলির ব্যাখ্যা দিন-

    ” হে অর্জুন! স্বয়ংবরই ক্ষত্রিয়দিগের বিধেয়, কিন্তু স্ত্রীলোকের প্রবৃত্তির কথা কিছুই বলা যায় না, সুতরাং তদ্বিষয়ে আমার সন্দেহ জন্মিতেছে। আর ধর্ম শাস্ত্রকারেরা কহেন, বিবাহোদ্দেশ্যে বলপূর্বক হরণ করাও ক্ষত্রিয়দিগের প্রশংসনীয়। অতএব স্বয়ংবরকাল উপস্থিত হইলে তুমি আমার ভগিনীকে বলপূর্বক হরণ করিয়া লইয়া যাইবে। কারণ স্বয়ংবরে সে কাহার প্রতি অনুরক্ত হইবে, কে বলিতে পারে?
    ” … স্বয়ংবরে কন্য লাভ করা অতীব দুরূহ ব্যাপার, এই জন্য (অর্জুন) তাহাতেও সম্মত হন নাই এবং পিতামাতার অনুমতি গ্রহণপূর্বক প্রদত্তা কন্যার পাণিগ্রহণ করা তেজস্বী ক্ষত্রিয়ের প্রশংসনীয় নহে।অতএব আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, কুন্তিপুত্র ধনঞ্জয় উক্ত দোষ সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া বলপূর্বক সুভদ্রাকে হরণ করিয়াছেন…”

    মহাভারতে দুর্যোধন, দুঃশাসনের খারাপ কাজের দায় হিন্দু ধর্মের উপরে চাপাইনি। কিন্তু কৃষ্ণ,অরজুন,যুধিষ্ঠির,প্রভ্রিতি নায়কেরা যদি অপকর্ম করে থাকে তবে তার ভার হিন্দু ধর্মকেই নিতে হবে।
    আপনি বলেছেন, ” মনুতে রাক্ষস বিবাহ সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে সেই হিসাবে দেখলেও এই বিবাহ একমাত্র কুমারী মেয়ের জন্যেই প্রযোজ্য ছিল । এটিকে বিবাহ বলা হয়েছে যাতে ঐ মেয়েটির পরবর্তি দায়িত্বও ঐ ছেলেটির ওপরেই থাকে ।” তার মানে ভিক্টিমকে অপহরণকারীর কাছে, ধর্ষকের কাছে বিয়ে দেওয়া উচিত , তাহলে মেয়েটির দায়িত্ব সেই ধর্ষক নিতে পারবে কি বলেন? দারুণ বিধি বিধান তো!

    হিন্দু ধর্মের গ্রন্থগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক, শ্রুতি ; দুই, স্মৃতি। বেদ,উপনিষদ এগুলো শ্রুতির মধ্যে পড়ে। রামায়ণ মহাভারত,পুরাণ,ধর্ম শাস্ত্র এসব স্মৃতির মধ্যে পড়ে। বর্তমান হিন্দু সমাজের পূজিত দেবতার অধিকাংশই পৌরাণিক দেবতা। পুরাণ না মানলে হিন্দুদের শিব, দুর্গা, কালি,বিষ্ণু,মনসা,ব্রহ্মা ইত্যাদি পৌরাণিক দেবদেবীদের পূজা করা বন্ধ করা উচিত।

    আপনি বলেছেন , “কুন্তিকে এই মন্ত্র এই জন্যই দেওয়া হয়েছিল কারন তার স্বামীর অভিশাপ ছিল যে সহবাস করলেই সে মারা যাবে । এক সন্যাসি তার স্ত্রীর সাথে হরীনের রুপ ধরে সহবাস করছিলেন । রাজা পান্ডু দুই হরীন দেখতে পেয়ে তীর ছুড়েন । হরীন দুটি এরপর সন্যাসী ও তার স্ত্রীর রুপে ফিরে আসেন এবং অভিশাপ দেন যে আমাদের যে অবস্থায় তুমি হত্যা করলে , তুমি যদি কখনই সহবাস করো তাহলে মারা যাবে । এই কারনে কুন্তিকে মন্ত্র দেওয়া হয় যে যখনই এই মন্ত্র পড়ে কোন দেবতাকে ডাকবে সে আসতে বাধ্য হবে এবং তোমায় সন্তান প্রদান করবে ।” আপনার এই কথা ভুল। কুন্তি বিয়ের আগে একবার সেবার দ্বারা দুর্বাসা মুনিকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। তার ফলে দুর্বাসা সত্নুষ্ট হয়ে কুন্তিকে বর দিয়েছিলেন। যে দেবতা ডাকবে তার থেকেই কুন্তি সন্তান পাবে। এবং দেবতাদের সাথে সহবাসের মাধ্যমেই পাণ্ডবদের জন্ম হয়েছিল। আপনি এই ব্যাপারটি জানেন না দেখে খারাপ লাগলো।

    মহাভারতে কি বলা আছে দেখা যাক-
    “Vaisampayana said, O Janamejaya, when Gandhari’s conception had been a full year old, it was then that Kunti summoned the eternal god of justice to obtain offspring from him. And she offered without loss of time, sacrifices unto the god and began to duly repeat the formula that Durvasas had imparted to her some time before. Then the god, over-powered by her incantations, arrived at the spot where Kunti was seated in his car resplendent as the Sun. Smiling, he asked, “O Kunti, what am to I give thee ?And Kunti too smiling in her turn,replied, ‘Thou must even give me offspring !’
    Then the handsome Kunti was united (in intercourse) with the god of justice in his spiritual form and obtained from him a son devoted to the good of all creatures. And she brought forth his excellent child, who lived to acquire a great fame, at the eighth Muhurta called Abhijit, o f the hour of noon of that very auspicious day of the seventh month (Kartika), viz., the fifth of the lighted fortnight, when the star Jeshtha in conjunction with the moon was ascendant. ” (adiparva/123 chapter translated by pratap chandra roy)

    বাকিদের জন্মও কিভাবে হয়েছিল তা বলার আর প্রয়োজন নেই মনে হয়। যাইহোক কর্ণের জন্ম নিয়েই কথা বলা যাক আপাতত-

    একদিন ধার্মিকাগ্রগণ্য মহাতেজস্বী,জিতেন্দ্রিয়,মহর্ষি দুর্বাসা কুন্তিভোজের গৃহে আতিথ্য স্বীকার করিলেন। আতিথেয়ী কুন্তি ভক্তিযোগ সহকারে ও পরম সমাদরে তাহার সেবাবিধি নির্বাহ করিলে মহর্ষি পরিতুষ্ট হইয়া তাহাকে এক মহামন্ত্র প্রদান করিলেন এবং কহিয়া দিলেন, ” বৎসে, আমি তোমার সেবায় সন্তুষ্ট হইয়া তোমাকে এই মহামন্ত্র প্রদান করিলাম, তুমি ইহা পাঠ করিয়া যে যে দেবতাকে আহ্বান করিবে, তাহাদের প্রভাব বলে তোমার গর্ভে এক এক পুত্র উৎপন্ন হইবে।” মুনিবর এই বলিয়া প্রস্থান করিলে পর কুন্তি বালস্বভাব সুলভ কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া মহর্ষি দত্ত মন্ত্র দ্বারা সূর্যদেবকে আহ্বান করিলেন। মন্ত্রবলে অশেষ ভূবনদ্বীপদীপক ভগবান তৎক্ষণাৎ আসিয়া সম্মুখে উপস্থিত হইলেন এবং কহিলেন, “সুন্দরী! তোমার অভিপ্রায়ানুসারে উপস্থিত হইয়াছি। কি করিতে হইবে, বল?” কুন্তি এই অদ্ভুত ব্যপার দর্শনে আশ্চর্যান্বিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, ” ভগবান, এক ব্রাহ্মণ আসিয়া আমাকে বিদ্যা ও বর প্রদান করিয়া যান, আমি তৎপরীক্ষা বাসনায় আপনাকে আহ্বান করিয়া অতিমূঢের কারয করিয়াছি। এতিমূঢের কাৰ্যকরিয়াছি, আমার অপরাধ হইয়াছে, ভগবন! এক্ষণে চরণে ধরিয়া বিনয়-পূৰ্ব্বক প্রার্থনা করিতেছি, কৃপাময় ! রুপা প্রকাশ করিয়া অপরাধ মার্জনা করুন। স্ত্রীলােক সহস্র অপরাধে অপরাধিনী হইলেও তাকে ক্ষমা করা মহতের কর্তব্য কৰ্ম্ম।” সুৰ্য্যদেব কুন্তীর কাতরােক্তি শুনিয়া মধুর-বচনে কহিলেন, “সুন্দরি। মহর্ষি দুৰ্ব্বাসা তােমাকে যে বর ও বিদ্যা প্রদান করিয়া গিয়াছেন, আমি তৎসমস্ত অবগত আছি, তুমি ভীত হইও না, অসন্দিগ্ধচিত্তে আমার ভােগাভিলাষ পূর্ণ কর। দেখ, শুভে ! তুমি আমাকে আহ্বান করিয়াছ, আমি তাহাতেই আসিয়াছি, এক্ষণে আমার মনােরথ ব্যর্থ করা কোনক্রমেই উচিত নহে; আর যদি তুমি একাস্তই সম্মত হও, তাহা হইলে অবশ্যই দোষভাগিনী | হইবে, সন্দেহ নাই।” সূর্যদেব এইরূপ নানা প্রকার বুঝাইলে কুন্তী কন্যাবস্থা ও লজ্জাভয়ের অনুরােধে স্বীকার পাইলেন না। তখন সূর্যদেব পুনৰ্ব্বার কহিলেন, “হে বরবর্ণিনি! তােমার কিছুমাত্র শঙ্কা নাই। আমি কহিতেছি, আমার প্রসাদবলে ইহাতে তােমার কোন দোষ হইবে না।” এই বলিয়া কুন্তীকে সম্মত করিয়া তাহার সহিত সহবাসে প্ররন্তু ইলেন। সূর্যদেবের সহযােগে কুন্তী গর্ভবতী হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ সৰ্ব্বশাস্ত্রবো, কবচ-কুণ্ডলধারী, পরম-রূপবান্ এক পুত্র-সন্তান প্রসব করিলেন। ঐ পুত্র ভুবনতলে কর্ণ নামে বিশ্রুত হইয়াছিল। (কালিপ্রসন্নের মহাভারত / আদিপর্ব / ১১১ অধ্যায়)

    পুরাণ ধর্মগ্রন্থের মধ্যে পড়ে কি পড়ে না দেখা যাক-
    “The rk and saman verses, the chandas, the Purana along with the Yajus formulae, all sprang from the remainder of the sacrificial food, (as also) the gods that resort to heaven.” “He changed his place and went over to great direction, and Itihasa and Purana, gathas, verses in praise of heroes followed in going over.” (atharva veda / 11/7/24)

    শতপথব্রাহ্মণে পুরাণকে বেদ বলা হয়েছে।
    ছান্দোগ্য উপনিষদ ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে পুরাণকে পঞ্চম বেদ বলা হয়েছে।

    Reply
    • January 19, 2019 at 3:56 pm
      Permalink

      মহাভারতে রাক্ষস বিবাহ-

      ” ধর্মশাস্ত্রে অষ্টবিধ বিবাহ নির্দিষ্ট আছে। ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব,রাক্ষস ও পৈশাচ। ভগবান স্বায়ম্ভূব মনু এই সর্ববিধ বিবাহের যথাসম্ভব ব্যবস্থা সংস্থাপন করিয়া গিয়াছেন। ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য ও প্রাজাপত্য এই চারিপ্রকার বিবাহ ব্রাহ্মণের পক্ষে প্রশস্ত। ব্রাহ্মাদি গান্ধর্বান্ত ষটপ্রকার বিবাহ ক্ষত্রিয়ের পক্ষে প্রশস্ত। রাজাদিগের উক্ত ষটপ্রকার বিবাহে এবং রাক্ষস বিবাহেও অধিকার আছে। বৈশ্য ও শূদ্রের পক্ষে কেবল আসুর বিবাহই বিহিত। অতএব ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পৈশাচ ও আসুর বিবাহ কদাপি কর্তব্য নহে। দেখ যদি গান্ধর্ব ও রাক্ষস বিবাহ ক্ষত্রিয়দিগের ধর্ম সংযুক্ত হইল তবে আর শংকার বিষয় কি? এক্ষণে গান্ধর্ব বিধানেই হউক আর রাক্ষস বিধানেই হউক কিংবা গান্ধর্ব ও রাক্ষস উভয়ের বিমিশ্র বিধানেই হউক , আমাকে বিবাহ করিয়া আমার মনোরথ পরিপূর্ণ কর ।” [কালিপ্রসন্নের মহাভারত / আদিপর্ব / ৭৩ অধ্যায়]

      Reply
  • December 28, 2018 at 5:30 am
    Permalink

    The atrocities committed by the gods and even Narayan did not go unpunished. They had to face the consequences of their deeds. This is the moral of the story. The Sanatans do not believe in organised religion. As such they do not have a religion. In a house of seven there may be seven or more than seven gods folllowed by the members. At no point does the followers of this culture say that Bhagwan is the only God and he or she is the supreme like the Abrahamical religions declare. There are many negatives in Sanatans but they never declare themselves to be the supreme. There is always scope to improve and strive for the best

    Reply
  • January 1, 2019 at 9:21 am
    Permalink

    ধন্যবাদ অজিত বাবু। বহু অজানা অন্তরতথ্য সামনে আনার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। এই পোস্টটি শেয়ার করার পর, আমার জনৈক ফেসবুক বন্ধু শুভাঞ্জন চক্রবর্তী (হিন্দু ধর্মের আসল চেহারা মেনে নেবার ব্যাপারে একটু স্পর্শকাতর) তা নিয়ে বিতর্কে নেমেছেন। আমি আমার জানা যাকিছু তথ্য ও যুক্তি দিয়েও তাঁকে পুরোটা বুঝিয়ে উঠতে পারিনি হয়তো, তাই ওঁর বক্তব্য আপনার কাছে সরাসরি পেশ করছি নীচের কমেন্টে। অনুরোধ রাখছি যদি আপনি এ ব্যাপারে আরো গভীরভাবে কিছু আলোকপাত করেন এবং ওনাকে সঠিক ধারণা গড়ে তুলতে যদি একটু সাহায্য করেন। কারণ কোনো পুঁথিপন্ডিত ভক্ত (শিক্ষিত বললাম না) হিন্দু ধর্মের এই নষ্টামিকে নেহাতই ঘামাচি’ প্রমাণ করে যখন এই ক্যান্সারকে আড়াল করতে চান, তখন তার প্রতিরোধও সবল-সক্ষম হওয়া প্রয়োজন। সেই প্রতিরোধের স্বার্থে এবং সত্যের স্বপক্ষেই আপনার কাছে এই অনুরোধ রাখলাম।

    শুভাঞ্জনের বক্তব্য => হিন্দু দর্শনে এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণের কথা বলা হয়নি। হিন্দু দর্শনে বাহ্যিক ধর্মাচরণের নিন্দা করা হয়েছে কারণ এতে প্রাণীপীড়ণ ঘটে। মৈত্রী, মুদিতা, করুণা ও উপেক্ষাই মোক্ষ লাভের পথ বলে বর্ণিত হয়েছে।
    হিন্দু মন্দির গুলি যখন অনাহারক্লিষ্ট মানুষগুলির দুমুঠো অন্নের আয়োজন করে বা কেরালার মন্দির খুলে দেওয়া হয় বন্যা কবলিত এলাকার মুসলিমদের ঈদের নামাজ পড়ার জন্য তখন একজন হিন্দু হিসেবে গর্ব বোধ হয়। কিন্তু যখন মন্দিরে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয় তখন লজ্জিত হই কারণ হিন্দুই একমাত্র ধর্ম যা নারীকে মায়ের আসনে বসিয়ে পূজা করেছে।
    দেবদাসী প্রথা ভারতীয় সংস্কৃতির কলঙ্ক।

    (conversation follows in next comments)

    Reply
    • January 1, 2019 at 9:26 am
      Permalink

      My 1st response to Mr. Shubhanjan Chakraborty :
      শুভাঞ্জন দা, এব্যাপারে একমত হতে পারলুম না। কারণ –

      প্রথমত, হিন্দু দর্শনের বা শাস্ত্রের ‘শ্রুতি’ ভিত্তিক আকর (বেদ, উপনিষদ) এবং ‘স্মৃতি’ ভিত্তিক আকর (ব্রাহ্মণ, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ এবং অন্যান্য ধর্মশাস্ত্র সংলগ্ন আনুষঙ্গিক আচারপালন বিধিনির্দেশ), দুটি শ্রেণীতেই কিন্তু হিন্দুধর্মপালনে আচারসর্বস্বতা বিশেষভাবে পালনীয় বলে উল্লিখিত এবং উদযাপিত। তা রাজসূয়যজ্ঞ হোক বা অশ্বমেধ যজ্ঞ বা নেহাৎ ঘরোয়া অর্চ্চনা। হিন্দুধর্মের পূজিত দেবদেবীরা মূলত পৌরানিক চরিত্র, যাদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট পূজা-পরিতোষ বিধি পুরোহিতদর্পণে স্পষ্ট। তাহলে এর বাইরেও কোন আলাদা হিন্দুদর্শন আছে কী? যা বাহ্যিক ধর্মাচরণের বিরুদ্ধে হিন্দু ধর্মকে প্রতিষ্ঠা দেয়?

      দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক ধর্মই কিছু সমাজকল্যাণকর কাজের কথা বলে এবং করে , যেটা নিয়ম হিসেবে বাধ্যতামূলক নয় নেহাৎ জনসংযোগ এবং জনপ্রিয়তা অর্জন (বা অর্থশালীর পৃষ্ঠপোষকতা লাভের উদ্দেশ্যে)। কোনো ধর্মেরই এটা মুখ নয়, মুখোশ। কোনো কোনো অসৎ রাজনৈতিক নেতাও স্থানীয় জনভিত্তি বজায় রাখতে এমন সমাজসেবা করেন। কিন্তু তাকে সদিচ্ছা বলে ধরে নিয়ে, তার ভিত্তিতে ধর্ষক হিন্দুদেবতা নীরিহ মাটিরমানুষ বলে বিবেচিত হতে পারেন কী?

      তৃতীয়ত, হিন্দু ধর্মমত এবং ধর্মীয় দর্শনের অন্যতম প্রাণপুরুষ (তথা মাতব্বর) মনু ও তার নারী-বিরোধী অনুশাসনকে পালনীয় প্রাতিষ্ঠানিকতায় পরিণত করার ইচ্ছে কী হিন্দু ধর্মকে খুব উদার বলে প্রমাণ করে?

      আর আপনার কথা অনুযায়ী যদি ধরেও নিই, এই সব আচারসর্বস্বতা, ধর্ষনের প্রবণতা, নারীদের প্রতি বিরূপতা সবের নকল আবেগ তথা ভ্রান্তির বাইরেও ‘আসল হিন্দুধর্ম’ নামক একটি গভীর সংবেদনশীল, বিচক্ষণ এবং যুক্তিনির্ভর সোনার পাথরবাটি সদৃশ গুপ্তধন লুকোনো আছে, কিন্তু কেউ তার খোঁজ জানে না, পালন কেউ করে না, সমাজে তার কোনো ব্যবহারিকতা নেই শুধু বাগাড়ম্বরে আছে, তবে তা থেকেই বা কী আর না থাকলেই বা কী ক্ষতি?

      জনৈক পাঠকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে শ্রী অজিত কেশকম্বলী যে পরবর্তী রেফারেন্সগুলো দিয়েছেন তাদেরও পেয়ে যাবেন মূল পোস্টের ‘মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য’ বিভাগে। তথ্য হিসেবে সব হিন্দুরই এগুলো জানা উচিৎ ও পরিস্কার ধারনা থাকা প্রয়োজন মনে হল। রেফারেন্সগুলো পড়ে আপনি ওনার কাছেও সরাসরি আপনার মতামত বা জিজ্ঞাস্য পৌছে দিতে পারেন।

      Reply
      • January 1, 2019 at 9:29 am
        Permalink

        comment from Shubhanjan against my 1st response :

        Prantik Ghosh আমি আমার টাইমলাইনে এ বিষয়ে একটি পোস্ট করেছি তার লিঙ্ক দিলাম।
        আপনি যে লিঙ্ক দিয়েছেন তাতে এমন কিছু পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ আছে যে গুলির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। যেমন দেবতারা অপর কারুর রূপ ধরে সেই ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে সম্ভোগে লিপ্ত হচ্ছে। এই সব বিশ্বাস করতে গেলে ভোজভাজিতে বিশ্বাস করতে হয়।
        আমার ধারণা এই সব কাহিনী রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছিল সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। আমি উদাহরণ সহ ব্যাখ্যা করেছি আমার পোস্টে।
        আপনি শাস্ত্র বা বেদোক্ত যে ধর্মীয় রীতিনীতির কথা বলেছেন সে গুলি কিন্তু মূল হিন্দু দর্শনের বিষয় নয়। এই সব নিয়ম কানুনের অনেক কিছু বৈদেশিক সংস্পর্শে এসে পড়ে সংযোজিত হয়েছে। ব্যাসভাষ্যে পরিষ্কার বলা আছে মৈত্রী, মুদিতা, করুণা ও উপেক্ষা এই চারটির দ্বারাই ধর্মাচরণ ও মোক্ষলাভ সম্ভব। বাহ্যিক ধর্মানুষ্ঠান নিন্দিত হয়েছে কারণ এতে প্রাণী পীড়ণের সম্ভাবনা থাকে।

        Reply
        • January 1, 2019 at 9:31 am
          Permalink

          My 2nd reply to Shubhanjan :
          ১. আজও পৌরাণিক ও পরবর্তীতে আসা রামায়নিক দেবদেবীরা (লক্ষ্মী, কালি, দুর্গা, শণি, কার্তিক, বিষ্ণু,রাম, ইন্দ্র ইত্যাদি) হিন্দুধর্মের মূল উপাস্য। পুরাণ’কে বলা হয়েছে পঞ্চম বেদ। তাহলে কী ধরে নেবো যে পুরাণের আখ্যান আসলে অবাস্তব কিছু ভোজবাজিরই মতো রূপকথার গল্প? তার চরিত্ররা কল্পিত তাই তাদের উপস্থিতি স্বীকার ও উপাসনা আসলে কল্পনাবিলাসের কৃত্য? সেক্ষেত্রে তো হিন্দুধর্মের দেবদেবী ভিত্তিক সম্মাননা তত্ত্বটাই আর থাকে না। হিন্দুধর্মের প্রায়োগিক ও পৌত্তলিক দেবচর্চাটাও তাহলে অমূলক।

          ২. কোন সদুদ্দেশ্য সাধনে দেবতা’রা ধর্ষক হয়েছেন? রূপক তো বাস্তবকে আশ্রয় করেই গড়ে নেন কথাকার, তার মানে দেবত্বের রূপকে এই ধর্ষণ আসলে কোনো মানুষই করেছিল বা কোনো সম্প্রদায়। যারা হিন্দুধর্মের পুরাণভাষ্য অনুযায়ী আবার দেবত্বেরও অধিকারী। তাহলে মোদ্দাকথা হিন্দুধর্মের বিবৃতি অনুযায়ী দেবত্বে উন্নীত মানুষদেরই ধর্ষক হতে দেখছি আমরা। এই ধর্মটা তারমানে অপরাধযাপনের পাসওয়ার্ড।

          ৩. সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পন্ডিতসমাজ ‘ব্যাস’ কোনো একটি মানুষ নন, একটা সম্প্রদায় যারা প্রজন্মান্তরে মহাভারত লিখেছেন। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন তাদেরই নবম (মতান্তরে ১১তম) বংশ প্রতিনিধি। ভারতে বহিরাগত। আর্যসন্তান। সেই ব্যাসই তো রাজসূয় যজ্ঞের সার্থকতার কথা সসম্মানে লিখেছেন। অশ্বমেধ যজ্ঞে নিবেদনের আগে পবিত্র অশ্বটির জননাঙ্গ প্রধানা রাজমহিষীর যোনিতে স্থাপন করার যাজ্ঞিক রীতিনীতিও সবিস্তারে লিখেছেন। কই একবারও লেখেন নি তো যে – এ আচারবিধি অন্যায়, রাজারা ভুলের উৎসব অনুষ্ঠান এবং উদযাপন করছেন! তাহলে কী তিনিও দ্বিচারিতায় আক্রান্ত? রাজানুগ্রহ বনাম নীতিবোধ! কার দাসত্ব করবেন এই নিয়ে দ্বিধা? সেক্ষেত্রে দ্বিচারী মানুষের ভাষ্যকে গুরত্ব দেওয়া তো আত্মহত্যা।

          Reply
          • January 1, 2019 at 9:34 am
            Permalink

            Subhanjan on my 2nd reply : আজকে যদি বাংলা ভাষায় কেউ অশালীন সাহিত্য সৃষ্টি করে তাহলে কি রবীন্দ্র সাহিত্যের মান নিচু হয়ে যায় নাকি গোটা বাঙালি জাতি অনৈতিক হয়ে যায়?
            পৌরাণিক কিছু উপাখ্যান এবং শাস্ত্রের কিছু নিয়ম আমিও সমর্থন করি না। আসলে এগুলি বিকৃত করা হয়েছিল মধ্য যুগে। যেমন বলপূর্বক সতীদাহ হিন্দু শাস্ত্রে উল্লিখিত নেই বরং বিধবা বিবাহ শাস্ত্র সম্মত সে কথা বিদ্যাসাগর মহাশয় কোর্টে প্রমাণ করেছিলেন।
            হিন্দু দর্শন বলতে আমি উপনিষদ এবং বেদান্ত সহ ষড়দর্শনের অন্যান্য শাখাগুলিকে বুঝি। কয়েক লক্ষ শ্লোক বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে রচনা করেছেন। আমাদের বেছে নিতে হবে কোনগুলি গ্রহণীয় আধুনিক মনন অনুসারে।

  • January 1, 2019 at 9:46 am
    Permalink

    My 3rd reply to shubhanjan :
    হিন্দুত্বের ষড়দর্শন অর্থাৎ – সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা এবং বেদান্ত। প্রত্যেকটাই কিন্তু আদি মনুবাদী হিন্দুদর্শনের (যা বেদেও স্বীকৃত ও উল্লিখিত এবং পুরুষতান্ত্রিক প্রাধান্যের প্রাচীন ব্যবস্থা) আমূল সংস্কার ঘটায় নি বা চায় নি। নিজের ইচ্ছেয় বা চারপাশের চাপে সুবিধাজনক কিছু পরিবর্তন করেছিলো মাত্র। সংবিধানের সংশোধনী যেমন। তাতে মূল সংবিধানের বৈধতা কিন্তু হ্রাস করা যায় না। তাই রামমোহন বা বিদ্যাসাগর সহজে সেই আংশিক পরিবর্তনও আনতে পারেননি, তাঁদের ইংরেজ শাসনব্যবস্থার দ্বারা বলপ্রয়োগ নীতির সাহায্য নিতে হয়েছে। পাশাপাশি কোনো সংশোধকই কোথাও লেখেননি যে মূল আকর বেদ, উপনিষদ বা পুরাণ আজ থেকে একমাত্র পরিবর্তিত রূপেই গ্রহনযোগ্য। অর্থাৎ আসলটাও রইলো, নতুনটাও রইলো, যার যেমন ইচ্ছে বেছে নাও। এই কারণেই নারীধর্ষণ মানসিকতার মূল চালিকাশক্তি “পুরুষতান্ত্রিক প্রাধান্য প্রমাণ” হিন্দুধর্মের চিরসঙ্গী আজও।
    ////////////

    এরপর শুভাঞ্জন একটি নতুন তত্ত্ব এনেছেন যে, বেদান্ত দর্শন হল হিন্দুদের মূখ্য দর্শন, যা সব মানুষকে সমান চোখে দ্যাখে। তদুপরি, এই ষড়দর্শন মনুবাদের প্রভাবমুক্ত, উপনিষদ ভিত্তিক ও আধুনিকমনস্ক। অর্থাৎ হিন্দুধর্মের দেবতা কর্তৃক ধর্ষণতত্ত্ব নেহাৎ মনগড়া কাব্য-বিলাস মাত্র।

    Reply
  • January 1, 2019 at 11:12 am
    Permalink

    শুভাঞ্জনের সাম্প্রতিকতম মন্তব্যটি দিলাম, এ বিষয়ে আপনার মতামত জানার জন্য –

    শুভাঞ্জন৷ => ষড়দর্শনের সঙ্গে মনুবাদ বা শাস্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই।
    উপনিষদ সমস্ত মানুষকে অমৃতের সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন। সেই উপনিষদের থেকে বেদান্তের উৎপত্তি। বেদান্ত তাই সকল জীবকে সমদৃষ্টিতে দেখে। অদ্বৈত বেদান্ত সকল জীবকে পরমাত্মার সঙ্গে অভেদ রূপে বর্ণনা করে এবং মানুষে মানুষে ভেদাভেদ এবং আপাত বৈষম্যকে অস্বীকার করে।
    সাংখ্য দর্শনে বলা হচ্ছে সকল জীবের মধ্যেই পুরুষ ( আত্মা) বর্তমান ।
    সাংখ্য বা বেদান্ত কোনো দর্শনই লিঙ্গ ভেদকে স্বীকার করছে না বা নারী পুরুষের মধ্যে ভেদাভেদ করছে না।
    হিন্দু দর্শনের মূল লক্ষ হল দেহবোধকে অস্বীকার করে পরমাত্মার সন্ধান করা নিজের অন্তরে। যোগ দর্শনে আত্মার সাথে পরমাত্মার যোগ বা মিলনের পন্থা নির্দেশ করা হয়েছে যা একটি মানসিক পদ্ধতি।
    ন্যায় কার্য কারণ ( Causality) নীতি সম্পর্কে আলোচনা করেছে। বিশেষিকা পরমাণুবাদের তত্ত্ব দিয়েছে। চার্বাক নাস্তিক্য জড়বাদী দর্শনের কথা বলেছে।
    কোনো হিন্দু দর্শনেই ধর্ষণ, প্রানীপীড়ন বা হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি।

    Reply
  • February 15, 2019 at 7:25 pm
    Permalink

    প্রান্তিক বাবু, আপনি আপনার বন্ধু শুভাঞ্জনের সাথে দারুণ আলোচনা করেছেন এবং সেই আলোচনা এখানে মন্তব্য হিসাবে দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। আপনার মন্তব্যের উত্তর দিতে দেরি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছি।

    আপনার বন্ধুর কথা থেকে বোঝা যায়, উনি হিন্দু ধর্মের অনেক দিকই মানেন না, অগ্রাহ্য করেন তবে হিন্দু দর্শনকে উনি মান্য করেন। সুতরাং, আপনি আপনার বন্ধুর সাথে হিন্দু দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: