বিবর্তনের কোনো প্রমাণ নেই?

বিবর্তনের প্রমাণ কি?

জৈবিক বিবর্তন তত্ত্ব জীব জগৎ সম্পর্কে খুব সাহসী দুটি দাবী তোলে :

প্রথমত, “পৃথিবীর সমস্ত জীব পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। তারা একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে।”

দ্বিতীয়ত, “জীবের বিবর্তন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় চলে।”

যা নিয়ে গবেষণা করা যায় এবং বোঝা যায়। কিন্তু আসলেই কি এমন কোন প্রমাণ আছে যে দাবি দুটি সত্য? হ্যাঁ। বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্র থেকে এত এত পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় যে, এসব নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে এদের বিভিন্ন শ্রেণি বা প্রমাণের ধারায় ভাগ করে নিতে হবে।


আলোচনার সুবিধার্থে, এখানে আমরা বিবর্তন তত্ত্বের প্রথম দাবিটির দিকে মনোনিবেশ করব: “সব জীবই পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত।”

আমরা এখানে সমগ্র জীবজগৎ নিয়ে একবারে আলোচনা করতে পারবো না। (যত যাই হোক, বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৮৭ লক্ষ প্রজাতি রয়েছে), তাই আমরা আজ বিবর্তন বৃক্ষের এক ছোট কিন্তু আকর্ষণীয় শাখা ‘সিটাসিয়া’ দের নিয়ে আলোচনা করবো। এই শাখাতে তিমি, ডলফিন এবং শুশুক রয়েছে। জীববিজ্ঞানী দাবি করে এই সব প্রাণী ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, এবং এই পুরো বর্গটি এক প্রাচীন চতুষ্পদী স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়েছে।

তাদের কথা নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার পরিবর্তে, আসুন আমরা প্রমাণের দিকে তাকাই। শুরুতেই আমরা দেখবো “তুলনামূলক দৈহিক গঠনতন্ত্র” থেকে যেখানে জীবের মধ্যে পার্থক্য এবং মিল নিয়ে গবেষণা করা হয়।

১। তুলনামূলক দৈহিক গঠনতন্ত্রঃ

তিমি জলে বাস করে এবং দূর থেকে, তাদের দৈত্যাকার মাছের মতো দেখায়। কিন্তু তাদের শারীরতত্ত্বের নিবিড় পরিদর্শন বলে একটি ভিন্ন গল্প। তিমিরা, অন্যান্য মাছের চেয়ে আলাদা। এরা স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো গর্ভ ধারণ করে এবং সরাসরি বাচ্চা জন্ম দেয় তারা তাদের বাচ্চাদের  দুধ খাওয়ায়, তারা উষ্ণ রক্তের প্রাণী (যা কোন মাছের জন্য অত্যন্ত বিরল) এবং তিমিদের ফুলকা নেই, বরং, আমাদের মত, তারা ২টি সম্পূর্ণরূপে বিকশিত ফুসফুসের সাহায্যে নিশ্বাস নেয়। তিমিদের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মত নাক আছে বলে মনে হয় না। এর পরিবর্তে তারা মাথার উপরে থাকা ব্লোহোল এর মাধ্যমে শ্বাস নেয়। কিছু তিমির দুইটি ব্লোহোল আছে, যা প্রায় নাসারন্ধ্রের মতোই দেখতে, কিন্তু ডলফিন ও শুশুকদের মাত্র একটি নাক আছে।
আশ্চর্যজনকভাবে, আপনি তাদের খুলির দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন যে এই ব্লোহোল মাথার ভেতরে গিয়ে দুইটি পৃথক পথে বিভক্ত হয়ে গেছে।

এমন কি হতে পারে যে তিমির নাসারন্ধ্র আসলে একটি পরিবর্তিত স্তন্যপায়ী নাক? সেরকমই মনে হয়। তবে, আমাদের নিশ্চিত হতে হলে আরও প্রমাণ দরকার হবে। অনেক তিমির স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর মত চুল আছে। নিচের ছবিতে, মায়ের পিঠে চিবুক রাখা এই শিশু ধূসর তিমিটির গোঁফ দেখা যাচ্ছে।

আশ্চর্যজনক ভাবে, তিমির সামনের ফ্লিপার এর ভিতরে বাহু, কব্জি, হাত  এবং আঙুলের হাড় রয়েছে।

এই হল হাড় সমূহের ছবি।

আর ঠিক একই হাড় রয়েছে বাদুড়, জলহস্তী এবং মানুষের সম্মুখ উপাঙ্গে: এক হাড়, দুই হাড়, কব্জি, হাত ও আঙুলের হাড় আধুনিক তিমির পিছনের পা নেই। কিন্তু তাদের অদ্ভুত একজোড়া ছোট হাড় আছে, যেখানে নিতম্ব এবং পিছনের পা থাকার কথা। নিচের ছবিতে এই হাড় সমূহ একটি ‘Bowhead’ তিমির।

এসব হাড় দেখায় কুঁচকে যাওয়া নিতম্ব, উরু এবং জঙ্ঘাস্থির মতো। এখানের এটাকে এমনকি একটি বিকৃত কোটরসন্ধি মধ্যে মত দেখায়। আপনার নিজের নিতম্বের হাড়ের মধ্যে এমন কোটরসন্ধি রয়েছে।

এটা কি একটি নিছক কাকতালীয় ঘটনা নাকি এগুলো বাস্তবিক পায়ের হাড়? সম্ভবত তিমির বিবর্তনের ইতিহাস এর সাক্ষী?

আমরা কোন সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, আসুন আমরা প্রমাণের একটি সম্পূর্ণরূপে পৃথক ধারায় বিচরণ করে আসি সন্দেহ নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

২। ভ্রূণতত্ত্ব

ভ্রূণতত্ত্ব হল জন্মের আগে বা ডিম ফোঁটার আগে কিভাবে প্রাণীদের বিকাশ হয় তার গবেষণা। নিচের চিত্রে আমরা একটি শুশুক এবং একটি মানব ভ্রূণ পাশাপাশি দেখতে পাচ্ছি, বিকাশের একই পর্যায়ে।

লক্ষ্য করুন যে, এদের উভয়েরই হাতের কুঁড়ি ও পায়ের কুঁড়ির মতো অংশ রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে, এই পায়ের কুঁড়ি পরে বড় হয়ে পায়ে পরিণত হয়। তিমির ক্ষেত্রে, এরা কিছুদিনের জন্য বড় হয়, কিন্তু তারপর থেমে যায় এবং বিলীন হয়ে যায় তিমির বাকি অংশ বেড়ে উঠার সাথে সাথে।

এসব হচ্ছে একই ডলফিনের বড় হওয়ার ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের ছবি।

লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, প্রথম দিকে, দুই নাসারন্ধ্রের খাঁজ দেখা যাচ্ছে মুখের সামনে, ঠিক যেমন একটি কুকুর ছানা অথবা মানব শিশুর থাকার কথা। ডলফিনটি বড় হওয়ার সাথে সাথে নাসারন্ধ্রটি মাথার উপরে সরে আসে এবং একীভূত হয়ে ডলফিনের ব্লোহোল এ পরিণত হয়।

এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা তুলনামূলক শারীরতত্ত্ব ও ভ্রূণবিদ্যা দুইটি আলাদা প্রমাণের ধারা থেকে একাধিক তথ্য উদ্ঘাটন করে দেখলাম উভয় আমাদের একই দিকে নিয়ে যাচ্ছে: তিমির পূর্বপুরুষ এককালে  ছিল চতুষ্পদী স্থলচর প্রাণী। “জীবাশ্ম রেকর্ড” কি এই ধারণার একটি তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে কাজ করবে?

৩। জীবাশ্ম রেকর্ড

নিচে উল্লেখিত চিত্রে দেয়া আছে বিলুপ্ত হওয়া ‘বেসিলোসরিড’ তিমির দুইটি প্রজাতি।

এদের একাধিক সু-সংরক্ষিত কঙ্কাল থাকার জন্য এরা বিখ্যাত। এরা প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি বছর আগে একই সাথে বসবাস করত। নিচে উল্লেখিত ছবিতে আমরা একটি বেসিলোসরিডের খুলির উপর থেকে দেখছি।

এটা কোন মডেল কিংবা ঢালাই নয়, এই আসলেই মাটির নিচ থেকে পাওয়া হাড়। লক্ষ করলে দেখবেন যে এদের নাসারন্ধ্র বর্তমান তিমির মতো মাথার উপরের দিকে নয়। আবার অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো শুণ্ডের সামনের দিকেও নয়। বরং তাদের নাক ঠিক মধ্যবর্তী অবস্থানে।

এই একটি অন্তর্বর্তী প্রজাতি, ঠিক বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী যেভাবে পাওয়ার কথা! বেসিলোসরিডের শরীরের শেষ প্রান্তে, ছোট কিন্তু  সম্পূর্ণরূপে বিকশিত নিতম্ব, পা, গোড়ালি, পায়ের পাতা এবং আঙ্গুলের হাড় পেয়েছি।


(আমাদের ধারণা পায়ে অন্তত ৩টি আঙ্গুল ছিল। যদিও আমরা একটির হাড় পেয়েছি) এই পা পর্যন্ত খুব উপর হাঁটা জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। কিন্তু হয়তো মিলনের জন্য বা পরজীবী প্রাণী তাড়াতে অথবা চামড়া চুলকাতে সাহায্য করত। বিবর্তন তত্ত্ব আমাদের যে আরও বলে যে আমরা সময়ের যত পিছনে ফিরে যাবো, সাধারণ স্থলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে তিমির পার্থক্য করাটা ততই দুষ্কর হবে।

এই হল ‘মায়াসিটাস’।

মায়াসিটাস এর নিতম্বের হাড় স্থলভূমিতে হাঁটার জন্য পোক্ত, কিন্তু এদের বিভিন্ন কারণে তিমি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে: তাদের কঙ্কাল অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর ফসিলের সাথে পাওয়া গেছে। যার মানে এরা সমুদ্রে বসবাস করত।

এদের ছোট পায়ের সাথে লম্বা চেপটা আঙ্গুল এই ইঙ্গিত দেয় যে, এরা বেশ ভাল সাঁতারু ছিল। নিচে উল্লেখিত চিত্রে আমরা একটি মায়াসিটাস এর চোয়াল ও খুলির নিচের দিক থেকে দেখছি।

তার আগে আমরা বেসিলোসরিড এর যে দাঁত দেখেছি তা এর দাঁতের সাথে মিলে যায় এবং এর মধ্যকর্ণের অনন্য কাঠামো এবং চোয়ালের পিছনের বাল্ব, ‘বেসিলোসরিড’ তিমি ও বর্তমান তিমির সাথে মিলে যায়।

মায়াসিটাস যেন এক পাদচারী তিমি। তিমির মতো দেখতে এমন স্তন্যপায়ীদের অনেক ফসিল পাওয়া গেছে। এবং আমরা আরও খুঁজে পাচ্ছি। এই ফসিলগুলো চতুষ্পদী স্থলজ প্রাণী আর জলজ তিমিদের মধ্যে পার্থক্যের ধারা অস্পষ্ট করে দেয়। তিমিরা যে আসলেই স্থলজ প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়েছে সে ধারণা আরও পোক্ত করে।

চলুন দেখি আমাদের প্রমাণের চতুর্থ ধারা:

৪। ডি.এন.এ

ডিএনএ অণু রাসায়নিক কোড বহন করে যা জীবের জন্য রেসিপির মত কাজ করে। কখনো হাড়, ভ্রূণ, বা শারীরতত্ত্বের দিকে না তাকিয়েই গবেষকরা বিভিন্ন জীবের ডিএনএ কোড তুলনা করে বের করতে পারেন কে কার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। তিমির ডিএনএ অন্য সব ধরনের প্রাণীর সাথে তুলনা করা হয়েছে: মাছ, বড় শীল এমন অনেক প্রাণীর সাথে এবং এ পর্যন্ত এদের সবচেয়ে বেশি জেনেটিক মিল পাওয়া গেছে জলহস্তীর সাথে। এর অর্থ এই নয় যে, তিমি জলহস্তী থেকে বিবর্তিত হয়েছে, বরং যদি এই জেনেটিক গবেষণা সঠিক হয়, সেক্ষেত্রে তিমি এবং জলহস্তী উভয় একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত যারা প্রায় ৫ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে বাস করত তিমি এবং জলহস্তীর মধ্যে প্রথম সংযোগ খুঁজে পাওয়ায় গবেষকরা বিস্মিত হন। তিমি প্রধানত মাংসাশী, তারা মাছ ও ছোট ক্রাস্টেশান খেয়ে থাকে, এদিকে জলহস্তীরা বেশিরভাগ নিরামিষাশী হয়।

তবে ভাল করে দেখলে দেখা যায়, জলহস্তী আর তিমিদের মধ্যে আসলে অনেক অদ্ভুত ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। যেগুলো হয়তো এদের একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে।


প্রাচীন স্থলজ তিমির বিশেষ আকৃতির গোড়ালির হাড় আছে।

যা শুধুমাত্র জলহস্তী আর জলহস্তীর মতো প্রাণীদের দেহেই পাওয়া যায়। ঠিক তিমির মতোই জলহস্তীরাও বাচ্চা জন্ম দিয়ে থাকে এবং এদের পানিতে লালন পালন করে থাকে। এদের উভয়ের পেটে ভাগ ভাগ করা পাকস্থলী আছে যা তৃণভোজী প্রাণীদের থাকে কিন্তু মৎসভূক স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে বিরল। উভয়ের দেহে পশম অনুপস্থিত। ওহ, আরেকটা মজার ব্যাপার – তিমি এবং জলহস্তীরা পৃথিবীতে মুষ্টিমেয় কিছু স্তন্যপায়ী যাদের অণ্ডকোষ দেহের ভিতরের দিকে। এই তো, চারটি ভিন্ন ভিন্ন ধারা থেকে এক এক ডজন প্রমাণ যারা সবাই একই ঘটনা বলছে যে, তিমিরা চতুষ্পদী স্থলচর স্তন্যপায়ীদের থেকে বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু তিমিদের ইতিহাসই বিবর্তনের একমাত্র ইতিহাস নয় যা আমরা উদ্ঘাটন করতে পেরেছি।

আমরা জীবাশ্ম, ডিএনএ, ভ্রূণতত্ত্ব এবং প্রমাণের অন্যান্য ধারা থেকে জানতে পারি যে পাখিদের ডানা বস্তুত বাহু এবং থাবা থেকে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে।

পাখিরা ডায়নোসরের মতো দেখতে পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত।

আমরা এও পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই যে বাদুড়ের ডানা বিবর্তিত হয়েছে বানর বা শ্রুদের হাতের মতো ৫ আঙ্গুলবিশিষ্ট হাত থেকে।

আমরা এও জেনেছি যে বেশ কাছাকাছি সময়ে মানুষ ও শিম্পাঞ্জীর একই পূর্বপুরুষ থেকে বিভক্ত হয়েছে। আর স্তন্যপায়ীরা এসেছে সরীসৃপের মতো প্রাণী থেকে, তারা এসেছে উভচর জাতীয় প্রাণী থেকে, সেই উভচর জাতীয় প্রাণী মাছ জাতীয় প্রাণী থেকে এবং আপনি যদি অনেক পেছনের ইতিহাস ঘাটতে চান তাহলে দেখবেন এই মাছ আর কেঁচোদের একই পূর্বপুরুষ ছিল।

সুতরাং উপসংহারে বলা যায়, সম্পুর্ণ পৃথক গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে পাওয়া হাজার হাজার প্রমাণ সব ঐকতানে আমাদের একই কথা বলে।
পৃথিবীর সব জীবেরই পরস্পরের সাথে সম্পর্ক রয়েছে।

– জন পেরি
– ইউটিউব চ্যানেল “Stated Clearly” থেকে নেয়া।

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: