কোরআনে বিগ ব্যাং?

এই প্রবন্ধে আমরা ‘পবিত্র কুরআনের আয়াতে বিগ ব্যাংয়ের কথা বলা আছে’ – কতিপয় মুসলিম ধর্ম প্রচারকদের এই ধরনের দাবি ও তার পক্ষের যুক্তি সমূহ বিশ্লেষণ এবং ভুল প্রমাণ করবো।

ইসলাম প্রচারকদের দাবি

তুরস্কের মুসলিম লেখক আদনান ওক্তার (ছদ্মনাম হারুন ইয়াহিয়া) নিম্নোক্ত দাবি সমূহ করেছেন যা এই ধরনের দাবির একটা উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় –

মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণের প্রমাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির মধ্যে একটি হলো এই যে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে। যদিও এটি বিংশ শতাব্দীর পূর্বে আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা আবিষ্কৃত হয় নি, তবুও আল্লাহ তা’আলা ১,৪০০ বছর আগেই পবিত্র কুরআনে তাঁর ঐশী বাণীতে এই চিরসত্য সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন :

আমরাই মহাবিশ্বকে (আমাদের সৃজনশীল) শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছি, এবং অবশ্যই আমরা ধীরস্থিরভাবে এটি প্রসারিত করছি |(সূরা আদ-ধরিয়াতঃ ৪৭)

বিগ ব্যাং এর আধুনিক তত্ত্ব প্রকাশের প্রায় ১৪ শত বছর আগে কুরআনের আরেকটি আয়াতে এ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেটা হলো যখন মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তখন মহাবিশ্ব খুব ছোট আয়তনের ছিল –

কাফেররা কি দেখে না যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল একত্রে অনুস্যূত ছিল, অতঃপর আমি তাদেরকে আলতোভাবে পৃথক করেছি এবং আমি পানি হতে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি? তারা কি বিশ্বাস করবে না? (সূরা আল-আম্ববিয়াঃ৩০)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরবীতে শব্দ সমূহের নির্বাচন, যার অনুবাদ উপরে দেওয়া হয়েছে। “রাকত্” শব্দটি ‘অনুস্যূত’ হিসাবে অনুবাদ করা হয়েছে, আরবি অভিধানে যার অর্থ ‘মিশ্রে মিশ্রিত’। এটি একটি সম্পূর্ণ করা কাজ যেখানে দুটি ভিন্ন পদার্থ ব্যবহৃত হয়। “আমরা আলতোভাবে পৃথক করেছি” শব্দ সমূহ আরবিতে ক্রিয়াপদ “ফাতক্” এবং এর অর্থ হচ্ছে ‘রাতক্’ এর গঠনকে পৃথক করা বা ধ্বংস করা। মাটি থেকে একটি বীজের অঙ্কুর হওয়া – একটি উদাহরণ যেখানে এই ক্রিয়াপদ প্রয়োগ করা হয়।

Creation of the Universe
Harun Yahya

বিশ্লেষণ

প্রথমে এটা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ যে কুরআনের প্রকৃত বিবৃতি কি এবং তা আসলেই সৎভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিনা।

হারুন ইয়াহিয়া কুরআনের আয়াত ৫১ঃ৪৭ এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন এভাবে, “আমরাই সেই মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছি (আমাদের সৃজনশীল) শক্তি দিয়ে, এবং প্রকৃতপক্ষে, আমরা এটি ধীরস্থিরভাবে প্রসারিত করছি।”

প্রশ্নঃ এটি কি উক্ত আয়াতের উপযুক্ত অনুবাদ?

সাধারণত এই আয়াতের তিনটি অত্যন্ত প্রখ্যাত ইংরেজি অনুবাদ অনুযায়ী পাওয়া যায়।

মূল আরবিঃ وَالسَّمَاء بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ

ইউসুফ আলীঃ With power and skill did We construct the Firmament: for it is We Who create the vastness of space.

শক্তি ও দক্ষতা দিয়ে আমরা মহাকাশ সৃষ্টি করেছি: কারণ আমরাই মহাবিশ্বের বিশালতা সৃষ্টি করি।

পিকথালঃ We have built the heaven with might, and We it is Who make the vast extent (thereof).

আমরা আকাশমন্ডলীকে শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছি এবং আমরা এটি বিস্তৃত করেছি।

শাকিরঃ And the heaven, We raised it high with power, and most surely We are the makers of things ample.

আর আকাশমন্ডলীকে আমরা শক্তি দিয়ে উঁচু করেছি, আর নিঃসন্দেহ আমরা প্রচুর পরিমাণ জিনিসের সৃষ্টিকর্তা।

ওয়া-আস-সাম’আ বায়নাহহহ দ্বী-ইদীন ওয়া-ইন্না লা-মুসিয়ুন

কুরআন ৫১ঃ৪৭

এদের মধ্যে একটিও মহাবিশ্বের চলমান সম্প্রসারণের ব্যাপারে ধারণা দেয় না। “আমরা এটি তৈরি করেছি” (بنيناها, বানায়নাহ্হা ) একটি পুরাঘটিত অতীত কালের ক্রিয়া। প্রকৃতপক্ষে, অনুবাদ সমূহের কোথাওই “মহাবিশ্ব” নির্দেশ করা হয়নি, বরং আকাশ বা মহাকাশকে বোঝানো হয়েছে; তার পরের আয়াতেই আবার পৃথিবী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে :

আরবিঃ وَالأَرْضَ فَرَشْنَاهَا فَنِعْمَ الْم

ইউসুফ আলীঃ And We have spread out the (spacious) earth: How excellently We do spread out!

আর আমরা পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি, কত চমৎকারভাবে আমরা ছড়িয়ে দিয়েছি!

পিকথালঃ And the earth have We laid out, how gracious is the Spreader (thereof)!

নিঃসন্দেহে আমরা পৃথিবীকে প্রশস্ত করেছি, প্রশস্তকারী কতটুকু দয়ালু!

শাকিরঃ And the earth, We have made it a wide extent; how well have We then spread (it) out.

এবং পৃথিবী, আমরা একে বিস্তৃত করেছি; আমরা তারপর কত সুন্দরভাবে (এটা) ছড়ি়য়ে দিয়েছি।

লিপ্যন্তরঃ ওয়া-আল -আরদা ফার্সনাহা ফা-নিমা লা-মাহিদুন

কুরআন ৫১ঃ৪৮

আকাশ ও পৃথিবীর দ্বৈতবাদ কুরআনে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক বিষয় এবং প্রাচীন আরবদের কাছে আকাশ ও পৃথিবীকে একত্রে সমগ্র বিশ্ব হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাধারণত, যখন একটির উল্লেখ করা হয়, অন্যটিই স্বভাবত চলে আসে। অনেক আরবি কবিতাতেও এর নিদর্শন পাওয়া যায়।

এখানে সমস্যাটি হচ্ছে, এই দুটি আয়াতের শেষ শব্দটির জন্য ক্রিয়ার কাল অন্তর্ভুক্ত করতে একই ক্রিয়াপদ এবং ব্যাকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। আয়াত দুইটিতে ক্রিয়ার কাল একই, কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে হারুন ইয়াহিয়া ঠিক কিভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে প্রথম আয়াত “মহাবিশ্বের” নিরন্তর, অব্যাহত সম্প্রসারণ নির্দেশ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ছাড়াই যে দ্বিতীয় আয়াত পৃথিবীর নিরন্তর, অব্যাহত সম্প্রসারণ নির্দেশ করে?

৪৮ নং আয়াতে ব্যবহৃত আল মাহিদুন المهدون (প্রশস্তকারীগণ) শব্দটি এসেছে ধাতু মূল মাহাদা مهد থেকে, যার অর্থ মসৃণ করা, আরও মসৃণ, বিছানা ছড়িয়ে দেওয়া। এই ধাতু থেকে বিশেষ্য পদ হলো মাহাদান, যার অর্থ বিছানা বা আরও বিস্তৃতি, যা পৃথিবীর সৃষ্টির অন্যান্য আয়াত সমূহে দেখা যায় যেখানে এটি অতীত কালে বিছানা তৈরি করা বোঝাচ্ছে (কুরআন ও সমতল পৃথিবী সম্পর্কে এই নিবন্ধটি পড়ুন – Flat Earth and the Qur’an)। এই আয়াত সমূহ চলমান প্রক্রিয়াটির পরিবর্তে অতীতের ঘটনাকে বোঝাচ্ছে সেটা স্পষ্ট।

কুরআনের সৃষ্টিতত্ত্ব দৃঢ়রূপে পৃথিবীকেন্দ্রিক, যার মাঝখানে অবস্থান করে স্থির সমতল পৃথিবী, পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে কঠিন স্তরের সাতটি আসমান, যাতে আবার রয়েছে সূর্য এবং চন্দ্র ও অন্যান্য জ্যোতিষ্কের কক্ষপথ, যেই কক্ষপথ সমূহে তারা গতিশীল অবস্থায় থাকে।

কিন্তু এখানে ইয়াহিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে এবং চাতুরীর সাথে ৫১ঃ৪৭ নং আয়াতের অর্থ বদলে দিয়েছেন।

তিনি আকাশকে ভুলভাবে মহাবিশ্ব হিসেবে অনুবাদ করেছেন কুরআনকে তাত্ত্বিকভাবে অপেক্ষাকৃত বেশি বাস্তবিক দেখাতে, যা কুরআন নয় এবং এর মাধ্যমে তিনি তার পরবর্তী এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিকৃতিকে একটা শক্তিশালী ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তারপর তিনি কেবল আরবি শব্দ ‘mūsiʿūna’, যার প্রকৃত অর্থ প্রশস্ত কক্ষের নির্মাতাদের বোঝায়, তাকে তিনি বিকৃত করে ‘প্রসারণশীল’ নামে একটা ক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং “ধীরস্থিরভাবে চলমান” এই অতিরিক্ত একটি ক্রিয়া-বিশেষণ যুক্ত করেন, যার মাধ্যমে তিনি এক প্রকারে কুরআনের মূল আইডিয়াকে পরিবর্তন করে ফেলেন। আর তার মধ্যে দিয়ে তিনি আল্লাহর সৃষ্টির বিবরণের বদলে বিজ্ঞানী হাবল – এর প্রসারণশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বে চলে যান।

হারুনের ইয়াহিয়ার কুরআন ২১ঃ৩০ এর অপব্যাখ্যা তার ২১ঃ৪৭ নং আয়াতের বিকৃতি থেকে কম দৃষ্টিকটু নয়। যদিও এখানে অন্ততপক্ষে তিনি তার অনুবাদ মূল আয়াতের অনুরূপ করেছেন। এখানে কনটেক্সট বাদ দিয়ে মাত্র একটা আয়াতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করাই তার ভুল ব্যাখ্যর মূল প্রতারণা।

হারুন ইয়াহিয়ার নিজ অনুবাদকৃত কুরআনের আরেকটি আয়াত ২১ঃ৩০

যারা অবিশ্বাসী তারা কি দেখেনা আমরা আকাশ এবং পৃথিবী একসাথে অনুস্যূত ছিল এবং আমরা তাদের আলতোভাবে  পৃথক করেছি এবং আমরা সকল জীবন্ত বস্তু পানি হতে সৃষ্টি করেছি। তারা কি বিশ্বাস আনবে না? (কুরআন ২১ঃ৩০)

তিনি নিজের পূর্ব নির্ধারিত উপসংহারকে বাস্তবতা বলে রূপ দেওয়ার জন্য পরের আয়াত দুইটি কি বলছে তা এড়িয়ে গেছেন। আবারও, এখানে উক্ত তিনটি আয়াতের সবচেয়ে প্রখ্যাত তিনটি অনুবাদ দেখানো হলো –

ইউসুফ আলীঃ Do not the Unbelievers see that the heavens and the earth were joined together (as one unit of creation), before we clove them asunder? We made from water every living thing. Will they not then believe?

অবিশ্বাসীরা কি দেখে না আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবী একইসাথে সংযুক্ত ছিল (সৃষ্টির একক হিসেবে) আমরা তাদের আলাদা করার আগে। আমরা পানি হতে সকল জীবন্ত বস্তু তৈরি করেছি। তারা কি বিশ্বাস আনবে না?

পিকথালঃ Have not those who disbelieve known that the heavens and the earth were of one piece, then We parted them, and we made every living thing of water? Will they not then believe?

যারা অবিশ্বাস করে তারা কি দেখেনি যে আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবী এক টুকরো অবস্থায় ছিল এবং আমরা তাদের পৃথক করেছি। এবং আমরা পানি দিয়েই সব জীবন্ত বস্তু তৈরি করলাম। তারা কি তারপরও বিশ্বাস আনবে না?

শাকিরঃ Do not those who disbelieve see that the heavens and the earth were closed up, but We have opened them; and We have made of water everything living, will they not then believe?

যারা অবিশ্বাস করে তারা কি দেখে না যে আকাশ এবং পৃথিবী একত্রে ঘনিষ্ঠভাবে বন্ধ অবস্থায় ছিল এবং আমরাই তাদের খুলে পৃথক করলাম। এবং পানি দিয়েই আমরা সকল জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি। তারা কি তারপরও বিশ্বাস আনবে না?

কুরআন ২১ঃ৩০

ইউসুফ আলীঃ And We have set on the earth mountains standing firm, lest it should shake with them, and We have made therein broad highways (between mountains) for them to pass through: that they may receive Guidance.

আর আমি পৃথিবীতে পর্বতমালাকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছি, যাতে তা হেলে না পড়তে পারে এবং আমি তাতে (পর্বতের মধ্য দিয়ে), মহাসড়ক সৃষ্টি করেছি, যাতে তাদের মধ্য দিয়ে যারা অতিক্রম করেতারা পথনির্দেশ পায়।

পিকথালঃ And We have placed in the earth firm hills lest it quake with them, and We have placed therein ravines as roads that haply they may find their way.

আর আমরা পৃথিবীতে দৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছি যাতে তা কম্পন না করে এবং আমরা তাতে পানির স্রোতকে রাস্তা হিসেবে স্থাপন করেছি, যাতে তারা তাদের পথ খুঁজে পায়।

শাকিরঃ And We have made great mountains in the earth lest it might be convulsed with them, and We have made in it wide ways that they may follow a right direction.

আর আমরা পৃথিবীতে বড় পাহাড় বানিয়েছি, যাতে তা মুষড়ে না যায় এবং আমি এগুলোতে পথ বিস্তৃত করে দিয়েছি যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।

কুরআন ২১ঃ৩১

ইউসুফ আলীঃ And We have made the heavens as a canopy well guarded: yet do they turn away from the Signs which these things (point to)!

আর আমি মহাকাশমন্ডলীকে সুরক্ষারূপে সুদৃঢ় করে দিয়েছি, অথচ তারা কি এসবের চিহ্ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় (তাক করে)?

পিকথালঃ And we have made the sky a roof withheld (from them). Yet they turn away from its portents.

এবং আমরা আকাশকে একটি ছাদ হিসেবে রেখেছি (তাদের থেকে)। তবুও তারা এসব নিদর্শন থেকে দূরে থাকে।

শাকিরঃ And We have made the heaven a guarded canopy and (yet) they turn aside from its signs.

আর আমি আকাশকে একটি সুরক্ষিত চাদর বানিয়েছি এবং তবুও তারা এসব নিদর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় |

কুরআন ২১ঃ৩২

এখন আমরা এই আয়াতটিকে তার প্রকৃত প্রসঙ্গে ফিরিয়ে এনেছি, আসুন আমরা কুরআনে যা বর্ণনা করা হয়েছে তার সাথে ইয়াহিয়ার দাবির বৈপরীত্য বুঝতে এক মুহূর্ত সময় নিই। তিনি দাবি করেন যে এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্যের বর্ণনা যে “যখন মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছিল, তখন মহাবিশ্বটি খুব ছোট আকার ধারণ করেছিল।” আসলে, এই আয়াতটিতে এমন কোনো বর্ণনা নেই যার অর্থ কোনোভাবেও আয়তন (Volume) হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

কিন্তু আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, ইয়াহিয়া দাবি করছেন যে আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত আকাশ এবং পৃথিবীর “পৃথকীকরণ” ” বিগ ব্যাং ” বা মহাবিশ্বের আদিম সৃষ্টির একটি সাক্ষ্য। যদি তা হয়ে থাকে তাহলে আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত “পৃথিবী” পৃথিবী গ্রহটিকে বোঝাতে পারে না, কেননা বিগ ব্যাং এর বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পর পৃথিবীর উদ্ভব ঘটে।

অন্যকথায়, ইয়াহিয়া দাবি করছেন (এবং অনেক ইসলামী প্রকাশনা ও ওয়েবসাইট দাবি করে থাকে) এখানে উল্লেখিত ‘পৃথিবী’ বলতে পৃথিবী গ্রহকে নয় বরং বস্তু বা ‘Matter’ বোঝানো হয়েছে।

কিন্তু তার পরের আয়াতই প্রমাণ করে যে এমনটা হতে পারে না। কারণ তার পরের আয়াতে আল্লাহ সেই ‘‘পৃথিবী’’ পৃষ্ঠের উপর পাহাড়-পর্বত স্থাপন করছেন। তার পরের আয়াতে আল্লাহ আকাশকে পৃথিবীর উপর ছাদ বা চাদর হিসেবে বসানোর কথা বলেছেন।

সুতরাং বোঝাই যায়, এখানে ‘পৃথিবী’ বলতে আমাদের পৃথিবী গ্রহকেই বোঝানো হচ্ছে। বস্তু বা ‘Matter’ কে বোঝানো হচ্ছে না। সুতরাং এই আয়াত সমূহের সাথে বিগ ব্যাং এর কোনও প্রকার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

সাধারণ দৃষ্টিতে এই আয়াত সমূহের অর্থ যা বোঝা যায় আসলেও তাই বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ এখানে তাঁর সৃষ্টির অর্থাৎ পৃথিবীর উপরে আকাশকে ছাদরূপে স্থাপন করার বর্ণনা দিয়েছেন। তার সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের তত্ত্বের কোন সম্পর্ক নেই।

আসলে পৃথিবী এবং আকাশমণ্ডলী যে একসময় একত্রে সংযুক্ত ছিল আর ঈশ্বর বা দেবতাদের কাজের মাধ্যমে তারা আলাদা হয়েছে – এই ব্যাপারটা তৎকালীন পৌত্তলিক ধর্ম সমূহে বেশ প্রচলিত বা কমন একটা ব্যাপার ছিল। যেমন প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাসে জেব (Geb – পৃথিবী দেবতা) আর নাট (Nut – আকাশ দেবী) এর বিচ্ছেদের কারণেই পৃথিবী আর আকাশ আলাদা হয়ে যায়। সুমেরিয়ান মহাকাব্য  ‘Gilgamesh’- এ একইভাবে বিষয়টার বর্ণনা করা হয়, ‘যখন পৃথিবী ও আকাশমণ্ডল পৃথক হয়ে গেল, যখন পৃথিবীকে আকাশ থেকে আলাদা করা হয়েছিল” আকাশ দেব (An) আর পৃথিবী দেবী (Ki) এর বিচ্ছেদের ফলাফল হিসেবে।

এখান থেকে প্যাগান দেব-দেবীর ব্যাপার সমূহকে বাদ দিলে কুরআনেও ঠিক একই কথাই বলা হয়েছে।

উপসংহার

কুরআনে ” বিগ ব্যাং ” বর্ণনা করা হয়েছে বা বিগ ব্যাং এর ইংগিত দেওয়া হয়েছে – এই দাবিটি ভুল। আসলে ” বিগ ব্যাং ” এর ব্যাপারে কিছুই বলা হয় নি। মুসলিমদের দাবি পুরোপুরিই বানোয়াট, তাদের ব্যাখ্যা কুরআনের বর্ণনার বিরুদ্ধে যায়। নিজেদের বিশ্বাসকে জোরালো করতে, নিজেদের বিশ্বাসকে বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ প্রমাণ করতে তারা কুরআনের বর্ণনা বিকৃত করে।

মূল: Qur’an and the Big Bang – WikiIslam

অনুবাদক – Sumit Selim

প্রাসঙ্গিক লেখা :

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: