সবকিছু কি ঘটনাচক্রে কিংবা দূর্ঘটনাবশত সৃষ্টি হয়েছে?

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন সবকিছু এলোমেলো ঘটনাচক্রে কিংবা দূর্ঘটনাবশত সৃষ্টি হয়ে গেছে?

উত্তরঃ অধিকাংশ নাস্তিকের মতে এই প্রশ্নটির উত্তর হচ্ছে, “না। অবশ্যই না।”

এই প্রশ্নটার মধ্যেই একটি ফাঁদ পাতা আছে, যাকে লজিক্যাল ফ্যালাসি বলে। প্রশ্নটি আড়ালে কিছু বদ্ধমূল ধারণা সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে।

এখানে ধরে নেয়া হয়েছে দুটি বিকল্প পরিস্থিতির একটা হতেই হবে –

১ . উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সৃষ্টি পরিকল্পনা (purposeful design)
২ . দুর্ঘটনা জনিত ঘটনা/ ঘটনাচক্রে / বাই চান্স) (accidental happenstance)

এখানে অলিখিত তাৎপর্য হিসেবে ধরে নেয়া হচ্ছে যে যেহেতু একটি ঘটনা বাই চান্স ঘটেছে বলে তা হওয়ার কথা না।

এই ধরনের প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে নাস্তিকদের বোকা হিসেবে উপস্থাপন করা এবং এই অপবাদ দেয়ার চেষ্টা যে, তারা একটা খুব অসম্ভব জিনিস বিশ্বাস করার মতো বোকামি করে। তার মানে হচ্ছে এটি প্রমাণ করার চেষ্টা যে, নাস্তিকরাও বিশ্বাসী এবং তাদের বিশ্বাসটি খুবই হাস্যকর। এটিও একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি যাকে বলা হয়, খড়ের মানুষ হারানো কুযুক্তি ( Straw man Fallacy ) ।

সেইসাথে, এটি প্রমাণের চেষ্টা যে, নাস্তিকরা বোকা, নাস্তিকদের বিশ্বাস খুবই অবাস্তব এবং অযৌক্তিক। এবং এটি প্রমাণের চেষ্টা যে, প্রথম জীবনের সৃষ্টির ঘটনা – অনেকটা লটারি জেতার চেয়েও অসম্ভবনাময় ঘটনা । আর তাই অবশ্যই এই কাজ সৃষ্টিকর্তা দ্বারা পূর্ব পরিকল্পনার মাফিক অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা হয়েছে। যেন অন্য কোনভাবে জীবন সৃষ্টি সম্ভব না।

এখানে আমাদের বুঝতে হবে যে একটি তৃতীয় সম্ভাবনাও আছে, যদিও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। সেটি সম্ভব যেভাবে, তা জানতে হলে আমাদের জানতে হবে, প্রত্যাশিত ফলাফল (predictable result) কাকে বলে।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

যেমন শীতপ্রধান দেশে জলীয় বাষ্প শীতের সময় তুষারের রূপ লাভ করে। এটি কোনো দুর্ঘটনা জনিত ঘটনা না বা কোন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা পূর্বপরিকল্পিত ভাবে করা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাজ নয়। এটা খুবই ভৌত এবং প্রাকৃতিক উপায়ে নিতান্ত একটি প্রত্যাশিত ফলাফল (predictable result)। আমরা জানি শীতপ্রধান দেশে শীতকালে তুষার পাত হয় এই কারণে।

প্রারম্ভিক শর্তগুলি যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে একটি প্রত্যাশিত ফলাফল নির্দিষ্ট সময়ে ঘটতে থাকবে – এতে অবাক হবার কিছু নাই।

আমরা যদি বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ঘটনার পরম্পরা গুলো অনুসরণ করি তাহলে দেখতে পাই মহাবিশ্বে প্রচুর পরিমাণ হাইড্রোজেন ভাসমান অবস্থায় ছিল যা একসময় ঘনীভূত হয়ে নক্ষত্র রূপে জ্বলে ওঠে। এটি নিতান্ত অতি সাধারন প্রত্যাশিত ফলাফল। কোন বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ বা পরিকল্পনা ছাড়াই এমনটিই হবে।

নক্ষত্র সমূহ তারপর নিউক্লিয়ার ফিউশন এর মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত ভারী পদার্থের উৎপত্তি ঘটায়। এটা নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এর নিয়ম অনুসারে খুবই প্রত্যাশিত ফলাফল মাত্র ।

নক্ষত্রগুলির অবশেষে জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে নোভা (nova) হিসেবে বস্তু থেকে বেরিয়ে আসে, প্রায় ভারী উপাদানগুলি (অক্সিজেন, কার্বন, লোহা, ইত্যাদি) ছড়িয়ে দেয়। এটিও পদার্থ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রত্যাশিত ঘটনা। The stars eventually nova as they run out of fusible material, spreading the heavier elements around (oxygen, carbon, iron, etc.) This is predictable physics.

ভারী উপাদান সমূহ ঘনীভূত হয়ে নক্ষত্রের মতোই accretion discs এ পরিনত হয় যা কিনা উল্কাপিন্ড, গ্রহাণু কিংবা গ্রহের উৎপত্তি দেয়। এটি শুধুই প্রত্যাশিত মহাবিশ্বতত্ত্ব । (predictable cosmology)। এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

একই রকম ঘটনা পরিক্রমা যদি আপনি অনুসরণ করতে থাকেন কাল ক্রমে আপনি পাবেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্ট অ্যামিনো এসিড (যা কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের পুনরূত্পাদিত করেছে যেমনটা আমরা দেখেছি Miller -Urey Experiments নামক গবেষণায়) এবং অন্যান্য প্রোটিনের বুদ্বুদের এবং আরো অনেক কিছুর উদ্ভবের ঘটনা।

অবশ্যই কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সময় পরিক্রমার সব কিছু সুস্পষ্টভাবে সবসময় আমাদের জানা নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় অজানা বিষয়টি একটি দুর্ঘটনা বা বাই চান্স ঘটনা। এটা কেবলই একটা পূর্ববর্তী ঘটনার পারিক্রমিক ফলাফল।

আমরা শতভাগ জানি না, কিভাবে জড় পদার্থ থেকে প্রথম জীব ও প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু নাস্তিক এবং বিজ্ঞানীরা সাধারণত মনে করেন যে, এটা ভৌত ও প্রাকৃতিকভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য নিতান্ত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা কিনা একটি ঘটনার ফলাফল হিসেবে অন্যটা হতে হতে বর্তমানের এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের বিজ্ঞানের অগ্রগতির মাধ্যমে আমরা এতোটুকু পর্যন্তই জানতে পেরেছি। কোন ধরণের অলৌকিক সত্ত্বার নিয়ন্ত্রণ বা পরিকল্পনা ছাড়াই এগুলো ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছে।

আর তাই আমরা এটাও বলতে পারি যে জড় পদার্থ থেকে প্রথম প্রাণের প্রথম ক্ষুদ্র প্রাণীর উৎপত্তি শীতের সময় প্রত্যাশিত বরফ পড়ার মতোই (পূর্ববর্তী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে) একটি প্রত্যাশিত ঘটনা। কোন অলৌকিক ঘটনা নয়।

সরকার আশেক মাহমুদ

Sarker Ashek Mahmud is a Bangladeshi Ex-Muslim Atheist, Humanist, secular online activist.

Leave a Reply

%d bloggers like this: