জারজ

লেখক  নুরুল আলম

এক

এমদাদ সাহেবের একমাত্র সন্তান হাশেম মিয়া, বয়স খুব একটা বেশি না, সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ।  মাদ্রাসায় পড়ে।  ইদানিং তাঁর মাথায় বিভিন্ন চিন্তা ভর করেছে।

সেদিন মাদ্রাসা থেকে এসে কিতাবাদি রেখে যখন খেতে বসেছে তখন মাকে জিজ্ঞেস করেছে, মা, আমার বাবা কলেজের শিক্ষক, তোমরা আমাকে স্কুলে ভর্তি না করে মাদ্রাসায় ভর্তি করলা কেন? বাবা বা তুমি দুজনের কেউই তো এমন ধার্মিকও না।

মা একটু বিব্রত স্বরে বললেন, সেটা কি খারাপ হয়েছে?

হাশেম মাথা নিচু করে বলে, তা বলি নি। অনেকে জিজ্ঞেস করে এই আর কী!

মা কৌতূহলী হয়ে বলেন, আর কিছু জিজ্ঞেস করে মাইনষে?

হাশেম বলে, হ, আমার কি একটা সুন্দর নাম দিতে পার নাই, বন্ধুরা হাসাহাসি করে।

মা বলেন, ‘হাশেম’ এর মানে জানো? এটা খুব ভাল একটা ইসলামি নাম।  আমাদের নবীজির দাদা আব্দুল মুত্তালিবের বাবার নাম ছিল হাশেম। কেউ হাসাহাসি করলে তোমার হুজুরকে জানাবে।

দুই

এবার হাশেম বায়না ধরেছে তার একটা ল্যাপটপ চাই। মা জিজ্ঞেস করলেন, কেন, এটা দিয়ে কী হবে?

হাশেম কর্কশ কণ্ঠে বলে, নাস্তিকদের মোকাবিলা করব। এরা ইন্টারনেটে ইসলাম ধ্বংসের পায়তারা করছে। এগুলো জারজ, এদের দেশ থেকে বিদায় করতে হবে।

মা বললেন, বাবা, শোন, ঐ যে তোর বাবার বন্ধু আকমল সাহেব আমাদের বাসায় আসেন, তিনি কিন্তু নাস্তিক, খুব ভাল ও সৎ মানুষ। নিজের অল্প সম্পত্তি থেকে প্রায় অর্ধেকই দিয়ে দিয়েছেন তোর বাবার কলেজের জন্য।

হাশেম বলে, নাস্তিকদের নৈতিকতার কোনো বালাই নাই,ওদের আবার সৎ আর অসৎ।

মা বললেন, যাই হোক, তুই একবার হাশেম সাহেবের সাথে দেখা করবি।

তিন

অনেক তর্কাতর্কির পর হাশেমকে একটা ল্যাপটপ কিনে দেয়া হল। সে সারাদিন ফেইসবুকে নাস্তিকদের সাথে জিহাদ করে। নাস্তিকদের যুক্তিতে হারানোর চমৎকার আইডিয়াটাও সে পেয়ে গেছে। যেমন, কোনো নাস্তিক যদি বলে আল্লাহর প্রমাণ নাই তাই বিশ্বাস করিনা, তাহলে এর জবাবে বলতে হবে, মা-বাবাকেও তো আমরা না দেখে ও প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করি। কোনো নাস্তিক তারপরও যদি বলে, প্রমাণ ছাড়া কিছুই বিশ্বাস করা যাবে না তখনই মোক্ষম সুযোগ। সরাসরি বলে দিতে হবে, দেখো নাস্তিকরা, তোমরা তোমাদের জন্মপরিচয় নিয়ে সন্দিহান,তোমরা জারজ।

চার

এদিকে নাস্তিকদের সাথে অনলাইনে জিহাদ করতে করতে হাশেম এতদিনে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। অনেক নাস্তিককে সে ধরাশায়ী করেছে। বিশ্বব্যাপী অসংখ্য বিজ্ঞানী যে প্রতিদিন ইসলাম গ্রহণ করছে সে খবরও সে এখন জানে। কোরান থেকে নাসার বিজ্ঞানীরা যে তথ্য চুরি করে রকেট বানাচ্ছে, বিমান তৈরী করেছে, ভিন গ্রহে অভিযান চালাচ্ছে এসব নির্ভেজাল সত্য ঘটনা সম্পর্কে জেনে সে মোহিত হয়। ধীরে ধীরে নাস্তিকদের উপর মেজাজ খারাপ হতে থাকে।

হাশেমের বাবার নাস্তিক বন্ধু আকমল সাহেব বেড়াতে এলে সে গিয়ে আকমল সাহেবের পাশে ঘাপটি মেরে বসল। সরাসরি জিজ্ঞেস করল, আপনি নাকি নাস্তিক?আপনাদের নাস্তিকদের নৈতিকতাঁর কোনো লেশ নাই।

বাবা সামনে থাকায় বলতে পারে নাই,  আপনারা মা-বোনের সাথে ইয়ে করেন।

এমদাদ সাহেব বিব্রত বোধ করলেও  আকমল উনাকে থামান। বলেন, ও অনেক ছোট, আর মাদ্রাসায় তো এগুলো নিয়ে কথা বলা দূরের কথা, আমাদের ভার্সিটিতেও বলা যায় না। তিনি হাশেমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা সারাদিন সেসব কাজ করি এগুলো কি সওয়ার আর গুনাহের কথা চিন্তা করে করি? ভাল করে ভেবে দেখো, আমরা কিন্তু ধর্মের চেয়ে আমাদের নিজের বিবেকবোধকেই বেশি গুরুত্ব দেই। বিবেককে পাশ কাটিয়ে যখন কেউ ধর্ম দিয়ে তাঁর কাজকর্ম বিবেচনা শুরু করে তখন সে একসময় আর টেরই পায় না যে তাঁর বিবেক আছে। তাই হিন্দুরা একসময় সতিদাহ করত,ধর্মান্ধ মুসলমানরা অনেকে এখনো শিশুবিবাহে আপত্তি করেনা। কিন্তু আমরা নাস্তিকরা এগুলোতে আপত্তি করি। ধর্ম বিশ্বাস থাকা অবস্থায় আমার মধ্যে যে নৈতিকতা ছিল তা থেকে অনেক বেশি নৈতিক এবং সুন্দর জীবন-যাপন করছি নাস্তিক হওয়ার পর, তুমি খোঁজ নিলেই জানতে পারবে।

হাশেম অবস্থা বেগতিক দেখে আবার তার সেই জারজ যুক্তিতে চলে গেল। আচমকা আকমল সাহেবকে জিজ্ঞেস করে বসল, আপনি কি আপনার মা-বাবাকে নিয়ে সন্দেহ করেন, নিজের জন্ম পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করেন? মা-বাবাকে প্রমাণ ছাড়াই, না দেখে বিশ্বাস করা যায়,আল্লাকে করা যায় না?

তারপর ফেইসবুকে জিহাদের কৌশলমতে আর কোনো কথা বলতে না দিয়েই উত্তেজনা বশত বলে ফেলল,দেখছেন, নাস্তিক মাত্রই জারজ।

পাঁচ

আকমল সাহেবের সাথে এ ঘটনার পর এমদাদ সিদ্ধান্ত নিলেন, হাশেমকে কিছু বিষয় জানাবেন। তিনি স্ত্রী ও হাশেমকে নিয়ে বসলেন। শান্ত কণ্ঠে হাশেমকে বললেন,বাবা, তুই কি জানিস, তোর বয়সে আমি একটা বড় পরিবারের দায়িত্ব নিজে নিয়েছিলাম। আশা করি কিছু কষ্টকর সত্য তুই মেনে নিতে পারবি।

হাশেম মাথা নাড়ায়।

এমদাদ সাহেব বলতে থাকেন, আমরা তোর বাবা-মা। কিন্তু আমরা তোর জন্মদাতা বাবা-মা নই।

হাশেমের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।  জিজ্ঞেস করল,তাহলে কে আমার বাবা-মা?

এমদাদ বললেন, আমি তখন এই কলেজে সদ্য জয়েন করেছি। নিজ এলাকা ছেড়ে এত দূরে আসায় একটা মানসিক চাপ ছিল। এর মধ্যে আবার তোর মা অসুস্থ হয়ে গেল। এসময় একটা কাজের মেয়ে রাখলাম। মেয়েটি অবিবাহিত, কাজে বেশ পটু। কিন্তু কয়েকমাস পরেই তার একটা বাচ্চা হল, ওকে সাথে নিয়ে সে কাজ করতে আসত। তোর মা ওকে দুধ খেতে দিত। আমাদের সন্তান হচ্ছিল না, হয়ত ওকে দেখে সে হাহাকার তোর মায়ের মনে জেগে উঠত। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, বিয়ে না করেই সন্তানের ব্যাপারটা আমাদের কাছে অন্যরকম হলেও এ নিয়ে খুব একটা খটকা ছিল না । একদিন কাজের মেয়েটি বলল, তার এলাকার মানুষজন তাকে খুব চাপ দিচ্ছে,খারাপ বলছে। এমনকি, এক হুজুরও মেয়েটার সাথে চলাফেরা, লেনদেন হারাম বলে ফতোয়া দিয়ে দিছে। মেয়েটি এখন কোথাও পালিয়ে যেতে চায়। ঐ বাচ্চাটিকে নিয়ে কী করবে দিশা পাচ্ছিল না। বাচ্চাটির মুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের বড্ড মায়া হল। তোর মা ওকে কোলে তোলে নিল, আমি জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল। বাচ্চাটিকে জন্ম দেয়ায় মেয়েটি একট পাপবোধে ভুগত। তাই আমাদের হাতে ধরে বলল,আপনারা কথা দেন ওকে মাদ্রাসায় পড়াবেন, সে আমার সকল পাপ ধুয়ে-মুছে দেবে। আমরা ওকে কথা দিলাম। সেই ছেলেটি হলে তুই।

হাশেম কিছু বলে না, কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, তারপর দাঁত বের করে হাসে।  ভেবে দেখে এসব বাস্তবতা থেকে ধর্ম অনেক বড়। নাস্তিকদের সাথে জিহাদ অব্যাহত রাখতে হবে বলে পুনরায় শপথ নেয়। যখনই নিজেকে জারজ মনে করে কষ্ট পাবে তখন নাস্তিকদের জারজ বলে গালাগালি করলেই সে কষ্ট লাগব হবে, দ্বীনেরও খেদমত হবে।

Facebook Comments

One thought on “জারজ

  • January 9, 2019 at 10:25 am
    Permalink

    অসাধারণ।

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: