আল্লামা শফি- নারীবিদ্বেষী নাকি দূরদর্শী?

বিকেল পাঁচটা থেকেই রশিদের চায়ের দোকানে বসে আছে সেলিম আর নোবেল। এ পর্যন্ত তিন তিন ছয় কাপ চা খেয়েছে তারা। রশিদ জিজ্ঞাসা করে, ‘মামা আজ সাজিদ মামা আসবেনা?’ নোবেল জবাব দেয়, ‘আসবে তো অবশ্যই, তবে মনে হচ্ছে মাগরিবের নামাজ পড়ে আসবে’। নোবেল আর সেলিম দু’জন দু’জনের মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দেয়। আজ যে সাজিদকে আসতেই হবে। নইলে তারা যাবে সাজিদের বাসায়। সাজিদের কাছে রোজ রোজ নানা রকম বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা শুনতে শুনতে তারা বিরক্ত। অন্তত একটি বারের জন্য হলেও সাজিদকে যুক্তিতে পরাজিত করতেই হবে। ভুল তো মানুষেরই হয়, সাজিদেরও যে হতে পারে সেটাই প্রমাণ করবে তারা। আজ সেই সুযোগ এসেছে। আজ তারা সাজিদকে যতক্ষণ না ধরাশায়ী করছে তাদের শান্তি নেই। ‘না, এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়!’, সেলিম কপাল কুঁচকে বলল। নোবেল বলল, ‘তাহলে চল আমরা ওর বাসায়ই যাই’। রশিদের চায়ের বিল মিটিয়ে কেবল উঠতে যাবে তখনই মাথার টুপি খুলে হাতে নিতে নিতে এগিয়ে আসতে থাকে সাজিদ।

-‘কিরে কোথায় ছিলি আজ সারাদিন?’, সেলিম জানতে চায়।

-‘এইতো মাগরিবের নামাজ পড়ে এলাম’, সাজিদ জবাব দেয়।

তারা আবারও বসে পড়ে, এবারে আর চা নয়, রশিদের স্পেশাল কফি হাতে তারা কথা শুরু করে। আজ স্পেশাল কফি খেতে খেতে স্পেশাল ধরা খাবে সাজিদ, ভাবতেই খুশিতে মন ভরে যায় নোবেলের।

খুশি মুখে দাঁত বের করে নোবেল বলতে থাকে, ‘তুই তো শফি হুজুরের খুব ভক্ত। নারীকে দেখলে লালা বের হয় বলে তো সেইদিন অনেক সাইন্টিফিক প্রমাণ দিলি। আজ কী বলবি?’ সাজিদ মাথার এলোমেলো চুল গুলো আঙুল দিয়ে ঠিক করতে করতে জিজ্ঞাসা করে, ‘ঘটনা কী?’

সেলিম আকাশ থেকে পড়ে। পুরো দুনিয়া তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, ফেসবুকে পোস্ট, ভিডিও, ছবি, ট্রল, কমেন্ট, কার্টুন, লাইভ দিয়ে ভরে গেছে, বুদ্ধিজীবী মহলে তুলকালাম পড়ে গেছে আর সাজিদ এই কথা জানেনা!!!

-‘শফি হুজুর বলেছে আপনাদের মেয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠাবেন না। পাঠালেও ক্লাস ফোর ফাইভের বেশি পড়াবেন না। শুধু বলেনই নি। পুরো ময়দান ভর্তি মুসল্লিদের কাছে ওয়াদা নিয়েছেন। এক দুই শত বা হাজার নয়, প্রায় পনেরো হাজার মুসল্লির সামনে’, একটু বিরক্তির সুরে জানায় সেলিম। সাজিদ হো হো করে হেসে ওঠে। কদিন হল গুদামগারাম দিয়ে ধোঁয়া উড়ানোর হাতে খড়ি নেয়া কিশোর ছেলেটা সিগারেটে আগুন ধরাতে ধরাতে এক মুহুর্তের জন্য ভাবে হয়তো তাকে নিয়ে বড় ভাইরা হাসাহাসি করছে। সেলিমের বিরক্তি দ্বিগুন হয়,

-‘এটা কি হাসির বিষয় মনে হচ্ছে তোর কাছে?’

-‘আরেক চামচ চিনি দিনতো মামা’, বলে কফির কাপ এগিয়ে দেয় সাজিদ।

কফিতে তৃপ্তির চুমুক দিতে দিতে বলা শুরু করে সাজিদ, -‘শোন, তোদের সমস্যা হল তোরা কদিন পরপরই ভুলে যাস। যেটাকে বলা হয় গোল্ডফিস মেমোরি’।

-‘কী বলতে চাস তুই?’, নোবেল বিরক্তির সুরে জিজ্ঞাসা করে।

-‘কেন? ভুলে গেছিস? তুই নিজেই আমাকে দেখিয়েছিলি এবং একটু আগেও যে লালা ঝরা নিয়ে বললি, ঐ ভিডিওটার কথা ভুলে গেছিস বুঝি? সেখানেই তো এই কথাও বলেছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রঃ)। মনে পড়েছে উনি বলেছিলেন বেশি ক্লাস পর্যন্ত পড়ানোর দরকার নেই মেয়ে শিশুদের?’

-‘আচ্ছা, নাহয় মেনে নিলাম যে এই কথা উনি আগেও বলেছেন। কিন্তু তোর মত শিক্ষিত এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে কি এটাও সমর্থন করিস?’, আগ্রহ ভরে জানতে চায় নোবেল। সেলিম তাকিয়ে আছে অপলক।

-‘তোরা নারী স্বাধীনতা মানে হয়তো বুঝিস বেগানা পুরুষের সাথে চলাফেরা, ছোটখাটো পোশাক পরে সবার মনোরঞ্জন করা কিম্বা সব পুরুষকেই ধর্ষক বলে দাবি করে পুরুষদের নামে বিষদগার করা। কিন্তু একটু বুদ্ধি খাটালেই দেখবি আল্লাহ তায়ালা এই বিষয়ে আগেই বলেছেন যে একজন নারীর সমস্ত ভরনপোষণের দায়িত্ব পুরুষের। তাহলে খামোখা কেন নারীরা এই চাকরির মন্দের বাজারে প্রতিযোগিতায় নেমে নানা রকম খারাপের ফাঁদে পড়বে বা আরেকটা পুরুষের পদ দখল করে আরেকটা পরিবারের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে?’

-‘তুই এসব পুরনো আমলের কথাবার্তা কীভাবে বলছিস? তুই কি জানিস যে আমাদের দেশের প্রধান মন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং হবু প্রধান বিচারপতি সবাই নারী? এছাড়াও কত লক্ষ নারীরা স্বনির্ভর হয়ে পরিবারের হাল ধরেছে। তোর কথা মানলে তো এগুলোর কিছুই হত না’, নোবেল প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বলে।

কফিটাতে চুমুক দিয়ে আবার বলা শুরু করে একটু মুচকি হাসি নিয়ে সাজিদ, ‘হাসালি। তুই কি জানিস বিশ্বের সবচাইতে আধুনিক দেশ আমেরিকায় কেন কখনও নারী প্রেসিডেন্ট হয়নি? তুই কি জানিস যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারী হিসেবে নিজের যোগ্যতায় নয় বরং পারিবারিক সূত্রে প্রধানমন্ত্রী হয়েছে? এগুলো বললে তো আবার সাইবার সিকিউরিটি আইন বা যেটাকে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পরিণত করা হয়েছে সেটাতে জেলে যেতে হবে। শোন, তোকে কিছু কঠিন বাস্তব সত্য বলি।

এই রিসার্চ পেপারটা দেখলে বুঝবি মুসলিম নয়, নারীদের প্রতি কোনোরূপ ক্ষোভ বা বিদ্বেষ ছাড়াই অমুসলিমদের কথা গবেষণা বলছে যে নারীদের কর্মক্ষেত্রে কম নিতে চায় তারা। [১] গবেষণা বলছে নারীরা কম কর্মদক্ষতা, কম কর্মঘন্টা, চাপ সহ্য করার কম ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাসের স্বল্পতা, সিদ্ধান্তহীনতা, মানসিক দুর্বলতা, নিরাপত্তা ও নানা রকম কারণেই চাকরিদাতাদের কাছে পুরুষের তুলনায় কম পছন্দ। [২] শুধু তাই নয়, পুরুষরা শারীরিকভাবেই নারীর তুলনায় বেশিক্ষণ কাজ করতে সক্ষম। [৩] আর সেই কারণেই পুরুষ কর্মীর তুলনায় নারী কর্মীর বেতন কম হয়। ওরা তো আর আল্লামা শাহ আহমদ শফি হুজুরের বয়ান শুনে এসব লেখে নি তাইনা?’

নোবেল বলে, ‘তো সেই কারণেই কি আমরা এখন নারীদের আর পড়াশোনা করতে দেব না? ওদের অবস্থা এখন খারাপ আছে আমাদেরই সমাজের তৈরি নানা রকম প্রতিবন্ধকতার কারণে … ‘ কথা শেষ করতে না দিয়েই সাজিদ বলে উঠল, ‘দেখ তুই আবার ফিরে গেছিস সেই প্রথম কথায়। সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসতে পারছিস না তাইতো। আচ্ছা তুই কি চাস যে একজন দক্ষ পুরুষ কর্মী তৈরি না করে তার জায়গায় একজন নারী কর্মী তৈরি করে পিছিয়ে পড়ি আমরা? বেকারত্বের হার এমনিতেই বেশি, তার ওপরে যদি নারী ক্ষমতায়নের নামে আরও এভাবে দেশের কর্মক্ষেত্রে ক্ষতি করা হয় তাহলে সেটা তুই সমর্থন করবি?’

‘বুঝলাম তোর কথা। তাহলে আমাকে একটা কথা বল। এই হুজুররাই কিন্তু ঘরের নারীরা অসুস্থ হলে নারী ডাক্তার খোঁজে। তাহলে তখন কোথায় পাবে?’, জিজ্ঞাসু মনে প্রশ্ন করে নোবেল। মনে হচ্ছে না সে সন্তুষ্ট হতে পেরেছে সাজিদের তথ্যে।

‘আচ্ছা তুই আমাকে বল তো তোর দাদির বা দাদার জন্ম কোন হাসপাতালে হয়েছিল এবং ডাক্তার কজন উপস্থিত ছিল সেখানে?’, সাজিদ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।

‘আরে বোকা তখন তো এসব ছিল ই না, ঘরেই দাই এর হাতেই তো বাপ দাদা সবাই জন্মালো’।, নোবেল জবাব দেয়।

‘এইতো বুঝতে পেরেছিস, তাহলে এই অলীক ধোঁয়া তুলেও যদি পড়াতে চাস নারীদের, সেক্ষেত্রেও কথা থাকে। প্রতিটা ছাত্রীই কি আসলে মেডিকেল পড়ার যোগ্য? ডাক্তার হিসেবেও তো তারা ঐ পিছিয়েই থাকবে। তারপরেও যদি ইচ্ছে হয় তো মহিলা মেডিকেল কলেজ খোলা যেতেই পারে। আরো নানাভাবে সেটা সমাধান করার চেষ্টা যেতে পারে। কিন্তু ঘুরেফিরে ঐ পর্দার বরখেলাপ, নারী পুরুষ সমাগম, খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা …..’, হাসতে থাকে সাজিদ।

ফোন বাজায় নীরবতা ভাঙে সেলিমের। ‘এই চল বাসা থেকে ফোন দিচ্ছে, যেতে হবে।

যেতে যেতে সাজিদ নোবেলের ঘাড়ে হাত রেখে বলে, ‘শোন, আল্লাহ তায়ালা সব জেনেবুঝেই আমাদের জন্য উত্তম বিধান রেখেছেন।

‘তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ উত্তম বিষয়ের অনুসরণ কর তোমাদের কাছে অতর্কিতে ও অজ্ঞাতসারে আযাব আসার পূর্বে’। [আল জুমার-৫৫]

এই আযাব মানে আবার মনে করিস না যে আকাশে ঝলকানি দিয়ে আসা সিনেমার দৃশ্যের মত কিছু। অর্থনীতি ধ্বসে পড়লে আযাব কাকে বলে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাবে’।

[১] https://hbswk.hbs.edu/item/why-employers-favor-men

[২] https://www.hbs.edu/faculty/Pages/item.aspx?num=53686

[৩] https://www.forbes.com/sites/eliseackerman/2013/02/24/superiority-of-female-workers-confirmed-study-finds-women-really-do-work-longer-and-harder-than-men/amp/

Facebook Comments

আরিফ আজাদ

আরিফ আজাদ। জন্মেছেন চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সময় থেকেই লেখালেখির হাতেখড়ি। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করতেই বেশি পছন্দ করেন। ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায় প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা কুড়ান। বিশ্বাসের কথাগুলােকে শব্দে রূপ দিতে পছন্দ করেন। অবিশ্বাসের দেয়ালে অনুপম স্পর্শে বিশ্বাসের ছোঁয়া দিতে তাঁর রয়েছে ব্যাপক মুন্সিয়ানা। একুশে বইমেলা – ২০১৮ তে তাঁর রচিত দ্বিতীয় বই ‘আরজ আলী সমীপে।

One thought on “আল্লামা শফি- নারীবিদ্বেষী নাকি দূরদর্শী?

  • January 13, 2019 at 9:16 am
    Permalink

    Mumingon ekhon ki bolben ? Allama Shofi proman kore diechhen je Islam narir shotru, narir kolyaner shotru, Islam=Ogganota=Ondhokar

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: