সকল ধর্মবিশ্বাসী মাত্রই কি জঙ্গি?

পৃথিবীর কোন নাস্তিক কখনো বলেছে, ধর্মবিশ্বাসী মাত্রই জঙ্গি, এরকম আমি কোনদিন শুনি নি। পৃথিবীর কোন নাস্তিক কখনো এরকম কোথাও লিখেছে বলেও পড়ি নি। অসংখ্য বই পড়েছি, নাস্তিক্যবাদী বই কিংবা মুক্তচিন্তার বই নেহাত কম পড়া হয় নি। কিন্তু এরকম পড়ার আজ পর্যন্ত সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয় নি।

আমার সাথে ব্যক্তিগতভাবে পৃথিবীর বেশ বিখ্যাত কয়েকজন নাস্তিকের পরিচয় আছে। রিচার্ড ডকিন্সের সাথে আড্ডা দিয়েছি, পিজে মায়ার থেকে শুরু করে আয়ান হিরসি আলী, ডেভিড সিলভারম্যান, এরকম লিস্ট দিলে অনেক লম্বা লিস্ট হয়ে যাবে। যাদের অনেকের নামও হতো বাঙালি ব্লগাররা জানে না, কিন্তু তারা অসম্ভব প্রতিভাবান এক একজন মুক্তচিন্তক। এই সেইদিন প্রখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক স্টেফেন ল এর সাথে অনেক তর্ক বিতর্ক করলাম। এরকম লিস্ট অনেক। তাদের থেকে শুরু করে বাঙলাদেশের প্রায় সকল মুক্তচিন্তার মানুষের সাথেই আমার কমবেশি আলাপ হয়েছে, আলাপ আছে।

বাঙলাদেশের শীর্ষ মুক্তচিন্তার লেখক ডঃ হুমায়ুন আজাদের সাথে আড্ডা দিয়েছি, আড্ডা দিয়েছি যুক্তিবাদী নাস্তিক প্রবীর ঘোষের সাথে, আড্ডা দিয়েছি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের সাথে। নিহত ব্লগার রাজীব আমার খুবই ঘনিষ্ট ছিল এককালে, সেই সাথে অভিজিত রায়, অনন্ত বিজয়, বাবু, নীল, ওদের প্রত্যেকের সাথে আমার সখ্যতা ছিল এবং কমবেশি আড্ডাও দিয়েছি। কেউ কোনদিন বলে নি, ধর্মবিশ্বাসী মাত্রই জঙ্গি। এরকম কোথাও কখনো শুনি নি। বরঞ্চ উনারা যা বলেছেন, বা যা বলছেন, তা হচ্ছে, ধর্মীয় সন্ত্রাসের মূল প্রোথিত রয়েছে ধর্মের মূলের ভেতরে। এ কারণেই  এদেরকে বলা হয় মৌলবাদী। যেকোন মতাদর্শ যখন লক্ষ লক্ষ জঙ্গি সন্ত্রাসী সৃষ্টি করে, তখন খুঁজে দেখা প্রয়োজন সেই মতাদর্শের মূলে কী রয়েছে।

যেমন ধরুন, কোন বিশেষ কোম্পানির খাবার খেয়ে কিছু লোক প্রায়ই অসুস্থ হচ্ছে। শুধু অসুস্থ হচ্ছে তাই নয়, অন্যকে কামড়াতেও শুরু করছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, যারা এরকম অসুস্থ হচ্ছে, অন্যদের কামড়াচ্ছে, তাদের মধ্যে ৯৫% মানুষই ঐ একই কোম্পানির খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। তাহলে ভেবে দেখা প্রয়োজন, ঐ কোম্পানির খাবারের মধ্যে আসলে কী কী উপাদান রয়েছে। সেই উপাদানগুলো মানুষের জন্য কতটা ক্ষতিকর। হয়তো সেই কোম্পানীর অনেক বড় ব্যবসা, অনেক লোক সেই কোম্পানির সাথে যুক্ত, অনেক শ্রমিক, অনেকের জীবন সেই কোম্পানির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারপরেও, জনসাধারণের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হলে, খুঁজে দেখতেই হবে, ঐ কোম্পানির খাবারে আসলে কী কী উপাদান রয়েছে।

সেই কোম্পানির ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। তাদের বিজ্ঞাপন এবং তাদের কেনা রাজনৈতিক নেতারা, টিভি চ্যানেলের মডেলরা ঐ খাবারকে যত ভালই বলুক, তারপরেও দেখতে হবে, ঐ খাবারে কী আছে। মানুষকে রক্ষা করবার জন্যেই।
যারা মানুষকে ঐ খাবারের হাত থেকে রক্ষার জন্য খাবারে বিষাক্ত পদার্থের কথা বলছে, আবার যারা খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে মানুষকে কামড়াচ্ছে, তারা মোটেও সমগোত্রীয় নয়। একদল মানুষকে রক্ষার জন্য ঐ খাবারের উপাদান পরীক্ষার জন্য বলছে, আরেকদল ঐ খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে মানুষ কামড়াচ্ছে। বরঞ্চ, যারা খাবারে বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতির কথা বলছে, তারা ঐ সব মানূষের জীবন রক্ষার জন্যেই তা বলছে।
কিন্তু সব মানুষ কী ঐ খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়? না। তা হয় না। এক একজনার শারীরিক সামর্থ্য এক এক রকম। কেউ হয়তো সেই বিষাক্ত খাবার খেয়ে হজম করে ফেলতে পারছে, আবার কেউ পারছে না। সে অসুস্থ হচ্ছে। কিন্তু খাবারে যে কিছু একটা গোলমাল আছে, তা তো নিশ্চিতই। যেই উপাদান কিছু দুর্বল মানুষকে সহজেই আক্রান্ত করে ফেলতে পারছে।

নাস্তিকরা বলছে ঐ খাবার সঠিকভাবে পরীক্ষা করে দেখতে। নাস্তিকরা বলছে, ঐ কোম্পানির খাবারে অবশ্যই কিছু না কিছু সমস্যা আছে। নইলে ৯৫% অসুস্থ মানুষকে কামড়াতে চাওয়া রোগীরা কাকতালিয় ভাবে ঐ একই কোম্পানির খাবার খেয়ে অভ্যস্ত কীভাবে? তারা সেগুলো নিজেরাই পরীক্ষা করে বের করেও দেখাচ্ছে। পরীক্ষার স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, খাবারের গোলমালের কথা। কিন্তু সেই ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসার কোম্পানী এত সহজে ছাড়বে কেন? তারা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মুখ বন্ধ করে দিচ্ছে সেই সব নাস্তিকদের। ঐ খাবার খাওয়া অসুস্থ রোগীদের লেলিয়ে দিচ্ছে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে। মুখ বন্ধ করছে, ওয়েবসাইট বন্ধ করছে, লেখা কথা বন্ধ করছে, ৫৭ ধারা চালু করছে, কত কিছু!

তাহলে চাপাতির কোপ খাওয়া নাস্তিক আর ঐ কোম্পানির নিয়ন্ত্রকরা এক হলো?

Facebook Comments
%d bloggers like this: