মেয়েদের স্কুলে বোমা

এই সেই দিনও পাকিস্তানের পেশোয়ারে ইসলামি জঙ্গিরা একটি স্কুলে বোমা মেরে শতাধিক শিশু হত্যা করেছে! এরা তো ইহুদী জঙ্গি নয়, হিন্দু জঙ্গি নয়, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ জঙ্গি নয়। অন্য ধর্মের জঙ্গিরা মেয়েদের স্কুলে বোমা মারে না কেন? ধর্মের সাথে সম্পর্ক না থাকলে সব ধর্মের জঙ্গিদেরই তো একই রকম হওয়ার কথা! কিন্তু ইসলাম কোনোদিক থেকে আলাদা? কেন শুধু ইসলামি জঙ্গিরাই মেয়েদের পড়তে দিতে চায় না? আসুন কিছু ইসলামি ওয়াজ শুনি। এই ইসলামি বক্তা ইসলাম জানে না, এই কথা বলে আহাম্মকি করবেন না।

তোমাদের ছিন্নভিন্ন নিহত শরীরের, রক্তাক্ত হাত পা, উড়ে যাওয়া মাথার দায় এখন প্রগতিশীলতা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে অপরাধীদের দায় মুক্তি দেবে। অপরাধী মৌলবাদীরা তা শুনে মুচকি হাসবে, আর বলবে, আমাদের রক্তাক্ত হাত পরিষ্কারের জন্য মডারেটরা তো রয়েছেই। তারা সোনা মুখ করে বলবে, ইহা ছহি নহে! সেটা অবশ্য ধর্মযুদ্ধের আরেক সেক্টর। মাঠের যোদ্ধারা মানুষ কেটে হাত রক্তাক্ত করবে, আর কুটিল মগজ যোদ্ধারা সেই রক্তের দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে মোল্লাদের হাতে লেগে থাকা রক্ত সাফ করবে। মৌলবাদীরা মডারেটদের ধর্ম ভাই। নিশ্চয়ই এক ধর্ম ভাই আরেক ভাইয়ের দোষ গোপন করে-ইহা তাদের কেতাবেরই কথা! তাই তারা যত মানুষই মারুক, মডারেটদের হৃদয় কেঁপে উঠবে না। তারা মাঝরাতে শিউরে উঠবে না।

সাংবাদিকের গলা কেটে ফেলা ভিডিও দেখে তারা বলবে, এটা ভিডিওটি ফটোশপ! নতুবা ষড়যন্ত্র! আইসিস এমনটা করতেই পারে না! তারা বলবে, তালেবানদের কোন দোষ নেই, আইসিসের কোন অপরাধ নেই, বোকো হারামের কোন ত্রুটি নেই, জামাতে ইসলামির কোন দায় নেই, সর্বোপরি ইসলামের কোন কিছু খারাপ থাকতেই পারে না। সব পশ্চিমা ষড়যন্ত্র! অথচ পৃথিবীতে কী ঘটে চলেছে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মূহুর্ত, তা বেমালুম চেপে যাবে তারা। শরীয়া আইনে ধর্ষিতাকেই দোররা মারার নোংরা আইন লুকাবে তারা, নারীকে পাথর ছুড়ে মারা, শস্যক্ষেত্র বানানো, চুরির দায়ে হাত কেটে দেয়া, প্রকাশ্যে শিরঃচ্ছেদ করা, যুদ্ধবন্দীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা, বিধর্মী কতল করা, নাস্তিক জবাই করা যে তাদের পবিত্র কেতাবে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, সেগুলো যে খোদ পয়গম্বরই অনুশীলন করে গেছে, সেগুলো ধামাচাপা দেবে তারা। শিয়ারা বলবে সুন্নীরা ছহি নহে, সুন্নীরা বলবে শিয়ারা ছহি নহে। এ কথা বলে দুই পক্ষই হত্যার উৎসব করে যাবে। শিয়ারা হত্যা করলে মডারেটরা বলবে সুন্নীরাই ছহি, শিয়ারা ছহি নহে; আর সুন্নীরা গলা কাটলে বলবে শিয়ারাই আসলে ছহি, সুন্নীরা ছহি নহে। সব ইহুদী নাসারাদের চক্রান্ত, বুঝলেন হে? এভাবেই ঘোর ঘোরালো গোলক ধাঁধা বানিয়ে নিজেরাই নিজেদের ঘোলা খাওয়াবে।

তারা বলবে না, মৌলবাদের সমস্যা তো মৌলে। মৌলবাদী ইসলামের সমস্যা হচ্ছে ইসলামের মৌলে, ভিত্তিতে। সেই মৌলে যারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী, তারা দুনিয়া জুড়ে খোদার রাজত্ব কায়েম করতে চাইবেই। অপরাধ তো তাদের যারা সেই মৌলের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে তাদের আস্কারা দেয়, তাদের ছোটবেলা থেকে ঘৃণার পুস্তক মুখস্থ করায়। সেই পুস্তক মাথায় ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে বড় করলে তো সে ঘৃণা নিয়েই বাড়তে থাকবে। তাকে কে থামাবে? সে তো এই পৃথিবীর জন্য বাঁচে না, সে বাঁচে পরকালের জন্য। এই পৃথিবী তো তার কাছে জেলখানা, সে তো যেতে চায় ৭২ বেশ্যা আর মদের সমুদ্রে সাতার কাটতে।

যেন ইসলামের কোন দায় নেই। সবই ইহুদী নাসারা পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র। যেন তালেবান, আইসিসরা, বোকো হারামরা, এরকম লক্ষ লক্ষ জঙ্গি সংগঠন একদম দুধের শিশু, বোকার হদ্দ, কিছুই বোঝে না, ভাজা মাছটিও উলটে খেতে জানে না। তাদের পশ্চিমারা বলেছে, যাও বাছারা টুইন টাওয়ার উড়িয়ে দিয়ে আসো, অমনি তারা দৌড়ে গেল। তাদের আমেরিকা বলেছে, শিশুদের স্কুলে বোমা মারো, অমনি তারা এক লাফ দিয়ে বাচ্চাদের স্কুলে বোমা মেরেছে। ইহুদী নাসারারা তাদের বলেছে স্কুলের মেয়েদের অপহরণ করো, অমনি বোকো হারাম অপহরণ করেছে। ওরা কী আসলে কিছু বোঝে? ওরা অবুঝ, তাই ভুল করে মানুষ মারছে হাজারে হাজার। গলা কাটছে শত শত। মেয়েদের নিলামে তুলছে লাখে লাখে। মোল্লাদের নিষ্পাপ, অবুঝ, বোকা, সহজ সরল বানাতে পারলেই ইসলাম কায়েমের ভিত্তি পাকাপোক্ত হয়। নাহ, তাদের কিচ্ছুটি দোষ নেই। তাদের আল্লাহর আইনের কণামাত্র অপরাধ নেই। তাদের জিহাদে কোন অন্যায় নেই। থাকতেই পারে না। তাদের বিশ্বব্যাপী জিহাদ তো আসলে শোষকের বিরুদ্ধে নির্যাতিতের শ্রেণী সংগ্রাম!

সিরিয়াসলি? এই কথা বলতে একটুও লজ্জা করে না? বাচ্চা মেয়েদের স্কুলে বোমা মারা শ্রেণী সংগ্রাম? জন্মদাতা পিতা মাতা সন্তানের ছিটকে যাওয়া হাত পা কুড়াচ্ছে, এই হচ্ছে ধর্মযুদ্ধ? এই হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রাম? এই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই? থুথু মারি এমন জিহাদে, একদলা থুথু মারি সেই ধর্মে, যেই ধর্ম শিশুর লাশের ওপর দাঁড়িয়ে তাণ্ডব নৃত্য করে। থুথু মারি এমন খোদার রাজ্যে, যেই রাজ্য শিশুর মৃতদেহের ওপরে দাঁড়িয়ে কলেমার পতাকা উড়ায়। থুথু মারি এমন পতাকায়।

গতকাল আমাদের বিজয় দিবস ছিল। বাঙলাদেশের বিজয় দিবসে আমি শুভেচ্ছা জানাতে পারি নি। পাকিস্তানের শত শত শিশুদের মৃতদেহ দেখার পরে বিজয়ের আনন্দ আর সম্ভব ছিল না। আমি কামনা করি তোমরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করবে না, কারণ তারা এটাই চায়। তারা বাঙলাদেশেরও শত্রু ছিল, তোমাদেরও শত্রু। তোমরা যত জানবে, যত পড়বে, তত তাদের ধর্ম আর ধর্মতত্ত্বের ভিত্তি দুর্বল হবে। একদিন তোমরা পড়ালেখা করবে, দর্শন বিজ্ঞান গণিত শিখবে, যুক্তিবাদের চর্চা করবে। পাকিস্তানের দর্শনকে তোমরা হত্যা করবে। ধর্মের প্রাগৈতিহাসিক নিয়ম কানুনের পাছায় লাথি মেরে ঝেঁটিয়ে ফেলবে। ধর্মীয় ভেদাভেদ আর ঘৃণার সাগর পাড়ি দিয়ে ভালবাসা আর মানবতার কথা বলবে। মানুষের কোন ধর্ম নেই, মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য নেই। আর কোন পরিচয় জরুরী না। শুধুই মানুষ।

পাকিস্তানের নিহত শিশুদের প্রতি শোক জানাচ্ছি। তোমরাই সত্যিকারের শহীদ। বাঙলাদেশের বিজয় দিবসে পাকিস্তানের স্কুলে পড়তে যাওয়া শিশুদের জন্য ভালবাসা।

তোমার নৈতিকতা ও বিবেকবোধ যখন স্বর্গীয় বেশ্যার লোভে ছোট ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে বোমা মারতে অনুমতি দেয়, নিজ স্ত্রীকে প্রহারের অনুমতি দেয়, নিজ কন্যাকে অর্ধেক সম্পত্তি দিতে বাধ্য করে, নারীকে শস্যক্ষেত্র কিংবা তেঁতুল বলে ভাবতে শেখায়, বিধর্মীদের গলা কাটতে- মুক্তমনা নাস্তিকদের জবাই করতে উৎসাহ দেয়, তখন তোমার নৈতিকতার উৎস সম্পর্কে; যা থেকে তুমি নৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করো, যেই কেতাব তোমার ভেতরে হালাল হারাম-ঠিক বেঠিকের ধারণা সৃষ্টি করে, যা তুমি ছোটবেলা থেকে ভালত্ব নির্ধারণের কর্তৃপক্ষ মনে করো; তা সম্পর্কে তোমার পুনরায় মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে। সেই সাথে দুনিয়ার সব কিছু তোমাদের বিরুদ্ধে বিধর্মীদের ষড়যন্ত্র, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশিমা ষড়যন্ত্র, নাকি আসলে তোমার গোড়াতেই মস্তবড় গলদ রয়ে গেছে, তা সম্পর্কেও আবারো ভেবে দেখা অত্যাবশ্যক হয়ে যায়।

পুরনো লেখা

Facebook Comments