আমার অবিশ্বাস।

আমি মাজহারুল ইসলাম । লেখালিখি করার মত সামর্থ্য বা অভ্যাস কোনটিই আমার কখনো ছিল না। তাই কোন ঘটনা বা কাহিনী সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দরভাবে কিভাবে উপস্থাপণ করা যায় তা আমি জানি না। তাছাড়া আমি এমন কোন জ্ঞানগর্ভ তত্ত্ব বা কথাবার্তা লিখছি না যা সবার পড়া খুব জরুরী। তবুও শ্রদ্ধেয় আসিফ মহিউদ্দীন ভাইয়ার দেয়া সুযোগটি লুফে নিয়ে আমার মনের কিছু কথা, বিশ্বাস , জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের খবর আপনাদের জানাবার জন্য মূর্খের মত একটু সাহস করলাম । ভাবছি না খুব বেশি মানুষ আমার এই লেখা পড়বেন। তবুও যদি কেউ পড়েন, তাঁর বিরক্তির কারণ হবার জন্য শুরুতেই ক্ষমাপ্রার্থনা করছি ।

আমার পুরো শৈশব ও কৈশোরের কিছুদিন কেটেছিল আমার গ্রামের বাড়িতে। আমার পূর্বপুরুষ বাপ দাদারা ছিলেন ভূঁইয়া বংশের লোক। তাই গ্রামে আমাদের বাড়িটির বিশেষ একটি পরিচিতি ছিল ভূঁইয়া বাড়ি নামে । কথিত ছিল যে এই বাড়ির মানুষেরা আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশী মানুষদের থেকে শিক্ষাদীক্ষা, আচার-ব্যবহার, কথাবার্তায় কিছুটা স্বতন্ত্র ছিলেন।আমাদের পাড়া প্রতিবেশী মানুষগুলো বংশানুক্রমিকভাবেই পড়াশোনায় খুব একটা আগ্রহ দেখাত না। তাদের ছেলেমেয়েরাও পূর্বসূরিদের অনুকরণে খুব অল্প বয়সেই পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন রকম পেশায় নিয়োজিত হয়ে যেত।এরকম অজপাড়াগাঁ ধরনের একটি পরিবেশ আমার আশেপাশে বিরাজ করায়, শিশু বয়সে বেড়ে উঠার সময় অফুরন্ত স্বাধীনতা যেমন পেয়েছিলাম, তেমনি এক ধরনের কড়া শাসনের চোখ রাঙগানিও বাবা মা দিয়ে রেখে দিতেন, যাতে যেন তেন কারো সাথে মিশে বিপথে চলে না যাই। আমি,আমার বড় বোন ,ছোট ভাই এবং বাবা মা মিলে ছোটখাট মধ্যবিত্ত একটি পরিবার আমাদের । বাবা ছিলেন একজন স্বপ্নবিলাসী মানুষ ।তিনি তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখতেন, সন্তানদের অনেক বড় করবেন, ডাক্তার -ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন আর বলতেন, “আমার ভাঙা ঘরে তিনটা চাঁদের আলো।”

আমার বাবা-মা দুজনই ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ।ছোটবেলা থেকেই দেখতাম আমার বাবা এলাকার মসজিদের তাবলীগের কাজকর্মের সাথে বেশ ভালভাবে জড়িত ছিলেন। মাঝে মাঝেই আব্বুর কাছে শুনতাম আজ মসজিদে পাকিস্তান থেকে জামাত এসেছে ,কিংবা হয়ত ইন্দোনেশিয়া, ইয়েমেন বা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে  জামাত এসেছে। আব্বু তখনই তিনদিন ধরে সেই জামাআত দলকে খাওয়া দাওয়া করানোর সব দায় দায়িত্ব নিয়ে বাড়িতে রান্নাবান্নার কর্মযজ্ঞ শুরু করতে বলে দিতেন। আমিও তখন মহা উৎসাহ ও কৌতূহল নিয়ে সেইসব ভীনদেশীয় ও ভিন্নভাষাভাষী হুজুরদের দেখতে আব্বুর পেছন পেছন ছুটতাম।এভাবে আস্তে আস্তে আমিও তাবলিগের কাজকর্মে জড়িত হয়ে যেতাম। ছোটবেলা থেকেই এলাকার তাবলিগের হুজুরদের সাথে থেকে থেকে অত্যন্ত ধর্মীয় একজন ছেলে হিসেবে বড় হয়ে উঠতে থাকি আমি।এটা সেই তখনকার কথা যখন আমি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি ।  এলাকার মসজিদের সেই তাবলিগের সাথীদের মাঝে আমিই ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ । তাবলিগের কাজের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ ছিল গাস্ত (ইসলাম প্রচার) করা ।সপ্তাহে দুইটি গাস্ত হত ,একটি নিজ এলাকায় যাকে বলে উম্মি গাস্ত, আরেকটি দূরবর্তী এলাকায় যাকে বলা হয় মোকামি গাস্ত। দুই প্রকার ইসলাম প্রচার কাজেই আমি গভীরভাবে অংশগ্রহণ করতাম। আট দশ জনের একটি দল লাইন ধরে দাঁড়াত। তারপর এলাকার যেসব মানুষ নামাজ- কালাম, ধর্মে কর্মে উদাসীন থাকত,তাদেরকে রাস্তা থেকে বা বাসা থেকে ডেকে এনে মসজিদে বসানো হত। আমি তাদেরকে ঈমান ও এক্বিনী কথাবার্তা বলে তাদেরকে ঈমানী জোশে দীক্ষিত করতে চেষ্টা করতাম । ফাজায়েলে আমাল, ফাজায়েলে সাদাকাত ইত্যাদি বইপত্র পড়ে মানুষদেরকে ইসলামের গোড়ার যুগের নবী সাহাবীদের নানা চমকপ্রদ-অলৌকিক-আবেগময় কাহিনী বলে তাদেরকে আবেগাপ্লুত করে তুলতাম। পার্থিব কাজকর্ম,খেলাধুলা,সংস্কৃতি, পড়াশোনা এগুলো যে নিছক মূল্যহীন , অনর্থক বিষয় এ সম্পর্কে তাদের বেজায় তালিম দিতাম ।

এভাবে এলাকায় একজন ধর্মীয় ছেলে হিসেবে পরিচিতি নিয়ে বড় হতে থাকি । একাডেমিক পড়াশোনাতেও ভাল রেজাল্ট করতে থাকি। ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার একটি নেশা আমার বাবা আমার মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ধর্মীয় বই এর পাশাপাশি দেশী বিদেশী নানা রকমের গল্পের বই পড়তাম আমি। এসব বই পড়ে পড়ে ছোটবেলা থেকেই কল্পনাপ্রবণ , অনুসন্ধিৎসু ও কৌতূহলী হয়ে বেড়ে উঠতে থাকি আমি ।

এভাবে যখন আরেকটু বড় হই,(সম্ভবত নবম শ্রেণিতে) তখন প্রথম স্টিফেন হকিং এর লেখা “দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন” নামক বইটি হাতে আসে আমার। বইটির ভাষাশৈলী দেখে মুগ্ধতা আমার সীমা ছাড়িয়ে গেল ,মনে হল স্টিফেন হকিং শুধু একজন কিংবদন্তীতুল্য বিজ্ঞানীই শুধু নন; একজন খাটি কথাসাহিত্যিক ও বটে । কিন্তু বইটিতে ধর্ম ও দর্শনকে নির্মোহভাবে নিখাদ বিজ্ঞান দিয়ে তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। পড়ে আমার মাথা বন বন করতে লাগল। আমি আমার এক শিক্ষিত পণ্ডিত ও ধার্মিক ভাইকে বিষয়টি বললাম, তিনি বললেন দেখো, হকিং অনেক বড় বিজ্ঞানী ঠিক আছে, কিন্তু বড় বড় মানুষের ও তো কত ভুল হয় তাই না? আর তাছাড়া বিজ্ঞান আজ এক কথা বলে তো কাল আরেক তত্ত্ব হাজির করে ,তাই তার কথা এত সিরিয়াসলি নেয়ার কিছু নাই । আমি ভাবলাম ঠিকই তো, মাথা নিচু করে সেখান থেকে চলে আসলাম । কিন্তু একটা সূচীর মত সূক্ষ্ম সন্দেহের তীর মনটাকে বিদ্ধ করতে থাকল অনবরত , এত বড় একজন বিজ্ঞানী কি এত সহজেই ভুল কথা বলে ফেলবেন!

২০১১ সাল। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। জীবনে কোনদিন হোস্টেলে থাকার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে জানতাম না এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হোস্টেলে থাকতে হলে কোন না কোন রাজনৈতিক সংগঠনের অধীনে থাকতে হয়। ছাত্রলীগের বহু বদনামের কথা আগে থেকেই শুনে আসছি ,তাই যেসব বড় ভাইরা ছাত্রলীগের অধীনে হোস্টেলে উঠতে বললেন, তাদেরকে শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করলাম।কিছু কিছু বড় ভাইকে দেখলাম অমায়িক ব্যবহার, মিষ্টিমধুর কথাবার্তা । তারা আমাকে অরাজনৈতিক সংগঠন বলে পরিচয় দিলেন।আমি তাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের বাইরে একটি ছাত্রাবাসে গিয়ে উঠে গেলাম। দুই মাস পর আমি জানতে পারলাম আমি ইসলামী ছাত্রশিবির নামক সংগঠনের একজন কর্মী।

এখানে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম এই ছাত্রাবাসে তারা একটা মডেল ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছে। এরা কেউ সিনেমা দেখে না, গান শোনে না, পহেলা বৈশাখ পালন করে না, শহীদ মীনারে ফুল দিতে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, নবীন ছাত্ররা যাতে সেদিকে আকৃষ্ট না হয়, এজন্য তারা পাল্টাপাল্টিভাবে ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে, ১৫ আগস্ট তারিখে তারা পিকনিক করে । ইসলাম যে শুধু নিজে পালন করা আর তাবলিগের দাওয়াত এর কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোন বিষয় নয়, বরং প্রাণপণে চেষ্টা করে একে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা সকল মুসলিমের উপর ফরজ, তা এখানে এসে বুঝলাম। এখানে নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়। যেখানে পড়ানো হত সাইয়েদ আবূল আলা মওদূদী, গোলাম আযমদের লেখা বই। এসব বই পড়ে পড়ে একটা বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, তা হল ইসলামি ছাত্রশিবির সমসাময়িক ইসলামি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেয় ইসলামি দল। বড় ভাইরা শিবিরে সক্রিয় হওয়ার জন্য চাপ দিতে লাগলেন। তারা আমাকে ইসলামী সংগঠন করার গুরুত্ব, ফজীলত, জিহাদ ইত্যাদি বিষয়ক কিছু সূরা ও হাদিস মুখস্থ করালেন।তারপর একদিন সকালবেলায় নতুন একটি জায়গায়  নিয়ে গেলেন । সেই জায়গায় শিবিরের একজন নেতা এসে গোপনে বৈঠকে মিলিত হন শিবিরের সক্রিয় কর্মীদের সাথে এবং নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ করার কাজ চালান ।

একদিনের ঘটনা । ছুটিতে বাসায় এসেছি । লক্ষ করলাম ছোট ভাইটা সারাক্ষণ পিসিতে বসে কি যেন পড়ে।দূর থেকে লক্ষ করতে চেষ্টা করলাম ।শুধু একটি লেখা বুঝলাম – মুক্তমনা। আমাকে দেখে তড়িঘড়ি করে সে পিসিটা অফ করল। জিজ্ঞেস করলাম ,কী পড়ছিলে? -মুক্তমনা ব্লগ। সেখানে কী লেখা আছে?- বিজ্ঞান ,দর্শন , যুক্তিবাদ নিয়ে লেখা। আমি জীবনে কখনও ব্লগ পড়ি নি ।

কিছুদিন পর অবসর সময়ে ভাবলাম দেখি একটু সেই ব্লগে কি লেখা আছে , যা ছোটভাইটা এত মন দিয়ে পড়ছিল ।দেখলাম একজন অতিথি লেখক কুরআনের সমালোচনা করে কিছু একটা লেখা লিখেছেন। কুরআনে দাসদাসী রাখার কথা, অন্য ধর্মের মানুষদের কে নিকৃষ্ট জীব হিসেবে বর্ণনা ,ইত্যাদি ।প্রথমে আমি ভাবলাম নিশ্চয়ই গালগল্প লিখে রেখেছে, যেখানে ইসলামে বিবাহ ছাড়া অন্য নারীর মুখ দেখাই হারাম করা রয়েছে, সেখানে দাসদাসী রাখার কথা বলার তো প্রশ্নই আসে না । সাথে সাথে আমার পাশেই থাকা কুরআন বের করে সূরা নিসা (আয়াত ২৪) এবং সূরা আহযাব( আয়াত৫০) পড়ে দেখলাম ব্যাখ্যাসহ ।আমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল , মাথা ঘুরতে লাগল।

দু দিন কারো সাথে কথা বললাম না ভাল করে। বুঁদ হয়ে নেশার মত পড়তে লাগলাম মুক্তমনা ব্লগের অন্য সব লেখা।বহু বছর ধরে লালিত বিশ্বাস, আজন্ম আচরিত প্রথার দেয়াল আমার সামনে প্রহেলিকা সম মনে হতে লাগল। পরবর্তীতে আরো অনেক বই পড়লাম “আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র“, প্রবীর ঘোষের “অলৌকিক নয়, লৌকিক” , হুমায়ুন আজাদের “আমার অবিশ্বাস” ইত্যাদি বিভিন্ন বই। আমার মনের জগতে জানার ইচ্ছা, জ্ঞানপিপাসা মধ্যাহ্ণের সূর্যের মত আগুন দিতে লাগল ।

লেখকঃ মাজহারুল ইসলাম ।

Facebook Comments