কুরআন এবং ভ্রূণের বিকাশ: নুতফা পর্যায়

মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের ধর্মগ্রন্থ ‘কুরআন’ স্বয়ং তাদের ঈশ্বর আল্লাহর বাণী এবং সেই কারণে তাতে কোনোরূপ ভুল থাকতে পারেনা। তারা বিশ্বাস করেন, কুরআন পুরোপুরি নির্ভুল একটি গ্রন্থ এবং তাতে কোনোরূপ কোনো সমস্যা নেই। মুসলিমরা মনে করেন, কুরআনে ভুল আছে বলে মানুষ যা বলে থাকেন তা আসলে তাদের বুঝার ভুল। একজন মুসলিম হতে হলে আপনাকে অবশ্য তাই বিশ্বাস করতে হবে, তাই ভেবেই নিজের বিশ্বাসকেই সত্য বলে নিজেকে বুঝ দিতে হবে। তবে বাস্তবতার দিক থেকে বললে, কুরআনে বেশকিছু ভুল পাওয়া যায় এবং সেইসব ভুল সমূহকে ইসলাম প্রচারকরা “বুঝার ভুল” বলে যেসব ব্যাখ্যা সমূহ দেন সেইসব ব্যাখ্যা সমূহকে আবার নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নিরীক্ষা করলে তাতেও প্রচুর অসততা, ভুল উপস্থাপন এবং মিথ্যা বর্ণনা পাওয়া যায়। কুরআনে যতো ভুল আছে তার মধ্যে কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনার ভুল সমূহ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। অতীতে ইসলামের সমালোচকেরা কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনার মধ্যে ভুল দেখিয়েছিলেন, ইসলাম প্রচারকেরাও সেসব ভুলের জবাব দিয়ে কুরআনকে নির্ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, আবার ইসলামের সমালোচকেরাও সেইসব জবাবের অসততা দেখিয়ে ইসলাম প্রচারকদের জবাব দিয়েছেন। এবিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে, সব মিলিয়ে বিষয়টি অনেক আলোচিত একটি বিষয়। মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, কুরআনে ঈশ্বর মানব ভ্রূণের পর্যায় থেকে পর্যায়ে অবস্থার পরিবর্তন বর্ণনা করেছেন এবং সেই বর্ণনা আধুনিক বিজ্ঞানের প্রমানিত তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ইসলাম প্রচারকেরা কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা নির্ভুল প্রমাণ করার জন্য ভ্রূণ বিকাশ বিষয়ক আয়াত সমূহের কোনো শব্দের অর্থ বিকৃত করে এমন অর্থ দাঁড় করান যা প্রখ্যাত কোনো তাফসীর এবং ডিকশনারিতে পাওয়া যায় না, আবার ডিকশনারি থেকে কোনো শব্দের বিকল্প অর্থ গ্রহণ করে সেই অর্থ দিয়ে ভ্রূণের বিকাশ বিষয়ক আয়াত সমূহ পুনরায় ব্যাখ্যা করে আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য সমূহের সাথে সংগতিপূর্ণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, তবে দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, সেইসব ব্যাখ্যা সমূহকে আবার নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নিরীক্ষা করলে তাতেও প্রচুর অসততা খুঁজে পাওয়া যায়। ইসলামের সমালোচকদের সমালোচনার বিরুদ্ধে ইসলাম প্রচারকদের জবাব সমূহ পড়ে সাধারণ মুসলিমরা সাধারণত মনে করেন ইসলামের সমালোচকেরা ভুল বলেন, কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় কোনো অসংগতি নেই, ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই মানব ভ্রূণের বিকাশ সঠিকভাবে বর্ণনা করেছে। কারণ তারা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ইসলামের সমালোচকদের সমালোচনার বিরুদ্ধে ইসলাম প্রচারকদের জবাব সমূহ যাচাই করে দেখেন না, বিচার বিবেচনা করে দেখেন না যে ইসলাম প্রচারকদের ব্যাখ্যা সমূহ কতটুকু গ্রহণযোগ্য কতটুকু যুক্তিযুক্ত। যা তাদের বিশ্বাসের পক্ষে যায় তাই তাদের কাছে যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তব মনে হয় আর যা তাদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায় তাই তাদের কাছে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয়। কারণ ছোটবেলা থেকে মেনে আসা বিশ্বাসের প্রতি ভালোবাসা কিংবা দূর্বলতার কারণে তারা তাদের বিশ্বাসের পক্ষে যাওয়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণই যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তবতা বলে বিশ্বাস করতে স্বস্তি বোধ করেন। আশাকরি, প্রবন্ধটি যারা পড়ছেন তারা নিজের প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি দূর্বলতা নিয়ন্ত্রণ করে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে পড়বেন এবং যাচাই-বাছাই করার পরেই সিদ্ধান্ত নিবেন।

কুরআনের ভ্রূণতত্ত্বের প্রসারণ ইসলামী দাওয়াতের একটি অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায় যখন অমুসলিম চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ড. কিথ মুর এবং ড. মরিস বুকাইলির বই প্রকাশিত হয়৷ তারা তাদের বইতে কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা নির্ভুল প্রমাণ করতে যে সকল দাবি তুলে ধরেন সেইসব দাবিই ড. জাকির নায়েক, হারুন ইয়াহিয়া এবং অন্যান্য অনেকেই পুনরাবৃত্ত করেন। সমসাময়িক বিজ্ঞানের সাথে কুরআনের তুলনা করতে ড. কিথ মুরের আন্তরিকতা এবং পারদর্শিতার অভাবের অনেক প্রমাণ আছে। অনেকেই কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা এবং গ্যালেনের শেখানো ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনার অসাধারণ সাদৃশ্য নিয়ে লিখেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন গ্রীক চিকিৎসক, যার কাজ মুহাম্মদের সময়ে সিরিয়া এবং মিশরে চর্চা করা হয়েছিল। [1] কুরআনের ভ্রূণতত্ত্বের নুতফা পর্যায় বিষয়ক বিবরণে গ্যালেনের বর্ণনার সাথে কিছু সুস্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। কুরআনের অন্যান্য পর্যায়ের সাথেও গ্যালেনের বর্ণনার লক্ষণীয় সাদৃশ্য রয়েছে। যাইহোক, এই লেখাটির উদ্দেশ্য কেবল কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনার সমস্যা তুলে ধরা এবং কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনার সমর্থনে বিভিন্ন ইসলামিক ওয়েবসাইট এবং ইসলাম প্রচারকদের মিথ্যা, ন্যায়বিরুদ্ধ এবং অপ্রমাণিত দাবির অসারতা তুলে ধরা।

কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনার প্রধান ভুল সমূহ

কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় যে যে ভুল পাওয়া যায় তা নিচে সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তুলে ধরছি, তারপরে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হবে।

১) কিছু সংখ্যক আয়াত সমবেত ভাবে প্রকাশ করে যে, কুরআন অনুযায়ী নুতফা পর্যায়ে বা ভ্রূণের প্রথম দিকে ভ্রূণ কেবলই সামান্য পরিমাণ বীর্য। কুরআন অনুসারে, ভ্রূণের নুতফা পর্যায় হচ্ছে পুরুষের বীর্য ও নারীর বীর্যের মিলনে গঠিত মিশ্র বীর্য, যা গর্ভাশয়ে স্থাপিত হয় এবং বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের অধীনস্থ হয়।

কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় কোথাও পুরুষের শুক্রাণু, নারীর ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু ডিম্বানুর মিলন থেকে ভ্রূণ গঠন হওয়ার কথার কোনো উল্লেখ্য পাওয়া যায়না।  কুরআনের বর্ণনায় পুরুষের শুক্রাণু এবং নারীর ডিম্বাণুর কথা উল্লেখ্য থাকা তো দূরের কথা, কোনোরূপ কোনো ইংগিতও নেই। কুরআন যার বাণী তিনি পুরুষের শুক্রাণু  এবং নারীর ডিম্বাণুর ব্যাপারে কোনো ধারনা রাখতেন কিনা, তারও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়না। কুরআন এই পর্যায়ে ভ্রূণকে সামান্য পরিমাণ তরল হিসেবে বর্ণনা করে। একটি শুক্রাণু এবং একটি ডিম্বাণুর মিলন থেকে গঠিত ভ্রূণকে কোনোভাবেই সামান্য পরিমাণ তরল হিসেবে বর্ণনা করা যায়না। ভ্রূণ কোনো অবস্থাতেই সামান্য পরিমাণ তরল নয়।

বাস্তবে, একটি একক শুক্রাণু গর্ভাশয়ে প্রবেশ করে এবং নারীর ডিম্বাণুর সাথে একীভূত হয়। এই নিষিক্ত ডিমকে ভ্রূণকোষ বলা হয়, যা তারপরে কয়েকদিনের জন্য ফ্যালোপিয়ন নলের দিকে ধাবিত হয়। যাত্রাপথে কোষ বিভাজন শুরু হয় এবং এই বহুকোষী ক্লাস্টার যাকে এসময় ব্লাস্টোসিস্ট বলে তা জরায়ুতে স্থাপিত হয়।

২) কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা অনুযায়ী, ভ্রূণটি তারপর জমাট রক্তে পরিনত হয়। সকল ক্লাসিকাল তাফসীর অনুযায়ী আরবী শব্দ ‘আলাকাহ’ অর্থ রক্ত বা, জমাট রক্ত এবং ‘জমাট বাঁধা রক্ত’। বাস্তবে, ভ্রূণ কখনোই জমাট বাঁধা রক্ত নয় এবং কোনো পর্যায়েই তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয় না। ‘আলাকাহ’ শব্দের বিকল্প অর্থসমূহ যাই হোক না কেন, এরকম একটি শব্দ ব্যাবহার করা খুবই হাস্যকর যার প্রধান সংজ্ঞা সমূহ একটি বায়োলজিক্যাল প্রোসেসের (ভ্রূণতত্ত্ব) বর্ণনায় একটি পরিষ্কারভাবে বর্ণিত বায়োলজিক্যাল অর্থের (জমাট বাঁধা রক্ত) সাথে জড়িত যদি সেই অর্থ তা নাহয় যা আপনি মনস্থ করেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মিল রেখে শব্দের অর্থ পছন্দ করাই এখানে কুরআনের তথ্যটি ভুল কিনা সেই ন্যায্য সন্দেহ তৈরি করে। একইভাবে, এই পর্যায়ে ভ্রূণকে দেখতে জমাট বাঁধা রক্তের মতো লাগে বুঝাতেও এই শব্দ ব্যাবহার করা হাস্যকর।

৩) কুরআন অনুযায়ী, মাংস দ্বারা আবৃত হওয়ার পূর্বেই হাড় গঠিত হয় এবং তারপরেই মাংস গঠিত হয় যা হাড়কে আবৃত করে। বাস্তবে, যখন হাড়ের তরুণাস্থি গঠন গঠিত হতে শুরু করে তখন একইসাথে তার চারপাশের মাংসপেশি গঠিত হতে থাকে। এই তরুণাস্থি পরবর্তীতে হাড়ে পরিণত হয়।

কুরআনের ভ্রূণতত্ত্ব বিষয়ক আয়াতসমূহ

কুরআনের সেই সকল আয়াত নিচে উল্লেখ করা হল যেই সকল আয়াত ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা প্রদান করে :

23:12

وَ لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنۡ سُلٰلَۃٍ  مِّنۡ طِیۡنٍ ﴿ۚ۱۲﴾

উচ্চারণ : ওয়ালাকাদ খালাকনাল ইনছা-না মিন ছুলা-লাতিম মিন তীন।

আমিতো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান হতে।

 

23:13

ثُمَّ  جَعَلۡنٰہُ  نُطۡفَۃً  فِیۡ قَرَارٍ مَّکِیۡنٍ ﴿۪۱۳﴾

উচ্চারণ : ছু ম্মা জা‘আলনা-হু নুতফাতান ফী কারা-রিম মাকীন।

অতঃপর আমি ওকে বীর্য রূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে।

 

23:14

ثُمَّ خَلَقۡنَا النُّطۡفَۃَ عَلَقَۃً  فَخَلَقۡنَا الۡعَلَقَۃَ مُضۡغَۃً فَخَلَقۡنَا الۡمُضۡغَۃَ عِظٰمًا فَکَسَوۡنَا الۡعِظٰمَ لَحۡمًا ٭ ثُمَّ اَنۡشَاۡنٰہُ خَلۡقًا اٰخَرَ ؕ فَتَبٰرَکَ اللّٰہُ  اَحۡسَنُ  الۡخٰلِقِیۡنَ ﴿ؕ۱۴﴾

উচ্চারণ : ছু ম্মা খালাকনান নুতফাতা ‘আলাকাতান ফাখালাকনাল ‘আলাকাতা মুদগাতান ফাখালাকনাল মুদগাতা ‘ইজা-মান ফাকাছাওনাল ‘ইজা-মা লাহমান ছু ম্মা আনশা’না-হু খালকান আ-খারা ফাতাবা-রাকাল্লা-হু আহছানুল খা-লিকীন।

পরে আমি বীর্যকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!

Pickthal : Verily We created man from a product of wet earth [sulalatin min teenin سُلَٰلَةٍ مِّن طِينٍ]; Then placed him as a drop (of seed) [nutfatan نُطْفَةً] in a safe lodging [qararin makeenin قَرَارٍ مَّكِينٍ]; Then fashioned We the drop a clot [‘alaqatan عَلَقَةً], then fashioned We the clot a little lump [mudghatan مُضْغَةً], then fashioned We the little lump bones [‘ithaman عِظَٰمًا], then clothed [kasawna كَسَوْنَا] the bones with flesh [lahman لَحْمًا], and then produced it as another creation. So blessed be Allah, the Best of creators!

Qur’an 23:12-14

 

22:5

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ  اِنۡ  کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّنَ الۡبَعۡثِ فَاِنَّا خَلَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ تُرَابٍ ثُمَّ مِنۡ نُّطۡفَۃٍ  ثُمَّ مِنۡ عَلَقَۃٍ  ثُمَّ مِنۡ مُّضۡغَۃٍ مُّخَلَّقَۃٍ  وَّ غَیۡرِ مُخَلَّقَۃٍ  لِّنُبَیِّنَ لَکُمۡ ؕ وَ نُقِرُّ  فِی الۡاَرۡحَامِ مَا نَشَآءُ  اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی ثُمَّ نُخۡرِجُکُمۡ طِفۡلًا ثُمَّ  لِتَبۡلُغُوۡۤا  اَشُدَّکُمۡ ۚ وَ مِنۡکُمۡ  مَّنۡ یُّتَوَفّٰی وَ مِنۡکُمۡ مَّنۡ یُّرَدُّ  اِلٰۤی  اَرۡذَلِ الۡعُمُرِ لِکَیۡلَا یَعۡلَمَ مِنۡۢ بَعۡدِ عِلۡمٍ شَیۡئًا ؕ وَ تَرَی الۡاَرۡضَ ہَامِدَۃً  فَاِذَاۤ  اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡہَا الۡمَآءَ   اہۡتَزَّتۡ وَ  رَبَتۡ وَ  اَنۡۢبَتَتۡ مِنۡ  کُلِّ  زَوۡجٍۭ  بَہِیۡجٍ ﴿۵﴾

উচ্চারণ : ইয়াআইয়ুহান্না-ছুইন কুনতুম ফীরাইবিম মিনাল বা‘ছি ফাইন্না-খালাকনা-কুম মিন তুরা-বিন ছু ম্মা মিন নুতফাতিন ছুম্মা মিন ‘আলাকাতিন ছুম্মা মিম মু দগাতিম মুখালিলকাতিওঁ ওয়া গাইরি মুখাল্লাকাতিল লিনুবাইয়িনা লাকুম ওয়া নুকিররু ফিল আরহা-মি মা-নাশাউ ইলাআজালিম মুছাম্মান ছুম্মা নুখরিজুকুম তিফলান ছুম্মা লিতাবলুগূআশুদ্দাকুম ওয়া মিনকুম মাইঁ ইউতাওয়াফফা-ওয়া মিনকুম মাইঁ ইউরাদ্দুইলাআরযালিল ‘উমুরি লিকাইলাইয়া‘লামা মিম বা‘দি ‘ইলমিন শাইআওঁ ওয়া তারাল আরদা হা-মিদাতান ফাইযা আনঝালনা-‘আলাইহাল মাআহতাঝঝাত ওয়া রাবাত ওয়া আমবাতাত মিন কুল্লি ঝাওজিম বাহীজ।

হে মানুষ! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দিহান হও তাহলে  (জেনে রেখ),  আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি মাটি হতে, তারপর বীর্য হতে, এরপর জমাট বাধা রক্ত থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতি অথবা অপূর্ণাকৃতি মাংসপিন্ড হতে; তোমাদের নিকট ব্যক্ত করার জন্য। আমি যা ইচ্ছা করি তা এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে স্থিতি রাখি, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশু রূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও; তোমাদের মধ্যে কারও মৃত্যু ঘটানো হয় এবং তোমাদের মধ্যে কেহকে কেহকে প্রত্যাবৃত্ত করা হয় হীনতম বয়সে, যার ফলে তারা যা কিছু জানত সেআ সম্বন্ধে তারা সজ্ঞান থাকেনা। তুমি ভূমিকে দেখ শুস্ক, অতঃপর তাতে আমি বারি বর্ষণ করলে তা শস্য শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ।

Pickthall: O mankind! if ye are in doubt concerning the Resurrection, then lo! We have created you from dust [turabin تُرَابٍ], then from a drop of seed [nutfatin نُّطْفَةٍ], then from a clot [alaqatin عَلَقَةٍ], then from a little lump of flesh [mudghatin مُّضْغَةٍ] shapely and shapeless [mukhallaqatin waghayri mukhallaqatin مُّخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ], that We may make (it) clear for you. And We cause what We will to remain in the wombs for an appointed time, and afterward We bring you forth as infants, then (give you growth) that ye attain your full strength. And among you there is he who dieth (young), and among you there is he who is brought back to the most abject time of life, so that, after knowledge, he knoweth naught. And thou (Muhammad) seest the earth barren, but when We send down water thereon, it doth thrill and swell and put forth every lovely kind (of growth).

Qur’an 22:5

বিশ্লেষণ

কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা নিয়ে এযাবৎ অনেক ইসলামিক এপোলোজস্ট লেখালেখি করেছেন যাদের উদ্দেশ্য ছিলো কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনাকে নির্ভুল প্রমাণ করা, অনেক ইসলামিক ওয়েবসাইটে এবিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে যেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় কোনো ভুল নেই। আমি এই প্রবন্ধে কেবল নুতফা পর্যায় নিয়ে আধুনিক ইসলাম প্রচারকদের ব্যাখ্যা সমূহের জবাব তুলে ধরবো। কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের পরবর্তী পর্যায় সমূহ নিয়ে আধুনিক ইসলাম প্রচারকদের ব্যাখ্যা সমূহের জবাব থাকবে পরবর্তী লেখা সমূহে।

নুতফা পর্যায়

দাবি :

১) আধুনিক ইসলাম প্রচারকদের ভাষায় “নুতফা” শব্দটির সংজ্ঞাটি হবে এরকম, “একটি একক সত্ত্বা যা তার মত সত্ত্বার বড় সমষ্টির অংশ”। দাবি করা হয়, প্রখ্যাত ডিকশনারি ‘লিসান আল আরব’ এই সংজ্ঞাটির ইংগিত দেয়। [2]         

২) কুরআনের আয়াত ৭৫:৩৭ এর ওপর অপব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করা হয় যে, “নুতফা” শব্দের অর্থ বীর্য নয়, বরং বীর্যের মধ্যে থাকা কোনো পদার্থ।

৩) “সুলালাতিন মিন মা’ইন মাহিন” (তরল পদার্থের নির্যাস) এই শব্দদ্বয় কুরআনের আয়াত ৩২:৮ এ পাওয়া যায়। “নুতফা” শব্দের অর্থ বীর্য নয়, বরং বীর্যের উপাদান বলে দাবি করার উদ্দেশ্যে মুসলিমরা “সুলালাহ” বা “নির্যাস” শব্দটির ব্যাপারে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

৪) কুরআনের আয়াত ৭৬:২ এ “নুতফাতিন আমশাজিন” (মিলিত নুতফা) শব্দদ্বয় আছে। তারা এই আয়াতের ব্যাকরণ ব্যাবহার করে দাবি করেন যে, “নুতফা” দ্বারা ভ্রূণকোষ বোঝায়।

জবাব :

(১) “নুতফা” শব্দের ভুল সংজ্ঞা 

“নুতফা” শব্দটি নিয়ে ইসলাম প্রচারকদের প্রধান এবং মূল দাবি হচ্ছে, “কুরআনে নুতফা শব্দটি দ্বারা বীর্য নয়, বরং বীর্যের উপাদান শুক্রাণু বোঝানো হয়েছে। তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, “নুতফা” শব্দটির অর্থ হচ্ছে, “একটি একক সত্ত্বা যা তার মতো সত্ত্বার বড় সমষ্টির অংশ”। “নুতফা” শব্দ নিয়ে তাদের নিজস্ব সংজ্ঞা বা দাবি “নুতফা” শব্দটির ক্লাসিকাল আরবী ডিকশনারি লিসান আল-আরবের সংজ্ঞা সমর্থন করে বলে তারা দাবি করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, লিসান আল-আরব “নুতফা” কে সংজ্ঞায়িত করে “খালি বালতিতে অবশিষ্ট পানির একটি বিন্দু” হিসেবে।

“নুতফা” শব্দ নিয়ে ইসলাম প্রচারকদের দাবি খুব পরিষ্কার ভাবেই ভুল। তাদের দাবির পেছনে তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যে ছিল “নুতফা” শব্দটিকে একটি একক শুক্রাণু বা ডিম্বাণু অর্থে সংজ্ঞায়িত করা, কারণ তারা তাদের ধর্মগ্রন্থকে বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরি ভাবে সংগতিপূর্ণ রূপে  উপস্থাপন করতে চান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মূল শব্দ সমূহকে এমনভাবে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা যেন তা তাদের পূর্বে নির্ধারিত উপসংহারের সাথে যথোপযুক্তভাবে মিলে যায়।

(ক) লিসান আল-আরব কি আসলেই এরকম কিছু বলে?

ইসলাম প্রচারকরা সাধারণত “নুতফা” শব্দটির লিসান আল-আরবের সংজ্ঞার ভুল অনুবাদ তুলে ধরেন। আমি “নুতফা” শব্দের লিসান আল-আরবের সংজ্ঞাটির [3] লিপ্যন্তর এবং অনুবাদ তুলে ধরছি :

লিপ্যন্তর : ওয়া আল-নুতফা ওয়া আল-নুতাফা: আল-কালীল মিন আল-মা’আ, ওয়াকীলা: আল-মা’আ আল-কালীল ইয়াবকা ফি আল-কিবরাহ, ওয়া কীলা: হিয়া কাল-জুর’আহ ওয়া লা ফি’আলা লিল-নুতফা।

ওয়া আল-নুতফা আল মা’আ আল-কালীল ইয়াবকা ফি আল-ড্ডালু; আন আল-লিহায়ানি আয়ডান, ওয়া কালা: হিয়া আল-মা’আ আল-সাফী, কাল্লা আও কাথার

অনুবাদ : এবং “নুতফা” এবং “নুতাফা”: সামান্য পরিমাণ পানি। এবং একে বলা হয়: ভিস্তিতে অবশিষ্ট সামান্য পানি। এবং একে বলা হয়: এটি একটি ডোজের মতো এবং “নুতফা” শব্দের কোনো ক্রিয়াপদ নেই।

এবং “নুতফা” হল বালতিতে অবশিষ্ট সামান্য পরিমাণ পানি। লেহায়ানিও বললেন: এটি বিশুদ্ধ পানি, সামান্য কিংবা অনেক।

বাক্যটির কিছু মূল শব্দ অর্থসহ উল্লেখ্য করা হলো:

১) মা’আ: পানির জন্য প্রচলিত ব্যাবহৃত শব্দ। [4]

২) কালীল: “অল্প; ছোট; অথবা সংখ্যায়, পরিমাণে সামান্য; অত্যল্প – একটি সামান্য পরিমাণ।” [5]

সুতরাং, “নুতফা” শব্দটির লিসান আল-আরবের সংজ্ঞার সঠিক অনুবাদটি হচ্ছে “সামান্য পরিমাণ পানি এবং একে বলা হয়: বালতিতে অবশিষ্ট অল্প পানি”।

মুসলিমদের আলোচনায় সততার বেশ অভাব খুঁজে পাওয়া যায়৷ সততার অভাবে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, “কালীল” শব্দটি “একটি একক কণামাত্র” হিসেবে অনুবাদ করা যায়। অথচ সবচেয়ে সঠিক অর্থটি হচ্ছে, “একটি ছোট পরিমাণ” বা “সামান্য”। উল্লেখ্য করা প্রয়োজন, “একটি একক কণামাত্র” কথাটার অর্থ আরবীতে “আল-কাতারা আল-ওয়াহিদা (القطرة الواحدة)”। [6]

মুসলিমরা কেন শব্দের অর্থ বদল করেন সেটা বোঝাটা কঠিন কিছু নয়। উদ্দেশ্য হল “একটি একক শুক্রাণু একটি ডিম্বাণুকে উর্বর করে” অথবা, “এই জননকোষ সমূহ একত্রে একটি কোষ গঠন করে” এমন বৈজ্ঞানিক বর্ণনার সাথে কুরআনের তথ্যকে সংগতিপূর্ণ হিসেবে দেখানো। যেহেতু কুরআনের এই তথ্যটি বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাই তারা নির্লিপ্তভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তা সংগতিপূর্ণ করার চেষ্টা করেন।

(খ) ইসলাম প্রচারকদের অনুমানের জোর

মুসলিমদের বক্তব্য হচ্ছে, “নুতফা” শব্দের লিসান আল-আরব ডিকশনারির সংজ্ঞা তাদের নিজস্ব আবিষ্কৃত সংজ্ঞার ইংগিত প্রদান করে। কেবল সাধারণ বোধের অভাব এবং পরম হতাশা থেকেই কেউ দুটি স্বতন্ত্র ধারনাকে সমীকরণ করতে পারে৷ বিষয়টা “অল্প একটু বালুর গাদা” এবং একটি “একক বালুকণা” সমীকরণ করার মতো। তাছাড়াও, সন্দেহাতীতভাবেই দাবি করা যায় যে, “একটি একক সত্ত্বা” ধারনাটি “বালতিতে অবশিষ্ট সামান্য পরিমাণ পানি” এই বাক্য থেকে অনুমান করা যায় না। কেননা, কোনোভাবেই একটি বালতিতে অবশিষ্ট মাইক্রোস্কোপিক পরিমাণ পানি “একটি একক সত্ত্বার” সাথে সমতুল্য নয়, সমতুল্য নয় পানির একটি অনুর সাথে যা ন্যানোস্কোপিকও নয়। অর্থ্যাৎ, একটি শুক্রাণু বা শুক্র বিন্দুর সাথে এক ফোঁটা তরল কোনোভাবেই সমতুল্য নয়।

লিসান আল-আরব “নুতফা” শব্দ নিয়ে আরও কিছু তথ্য [7] দেয় যা মুসলিমদের দাবি মিথ্যা প্রমাণ করে। নিচে সেসব তথ্যের ইংরেজি এবং বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হল:

অনুবাদ : “… এবং হাদিসে: তিনি তার সহচরদের বলেন: ওজুর জন্য কি পানি আছে? তখন একজন ব্যাক্তি একটি বদনায় করে “নুতফা” নিয়ে আসেন; এটি দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন “সামান্য পানি”। এবং বীর্যকে (“মানি”) তার সামান্য পরিমানের জন্য “নুতফা” বলা হয়। এবং দৈববাণী: সে কি বীর্যের সামান্য পরিমাণ ছিল না? (কুরআন ৭৫:৩৭)

লিসান আল-আরব অনুযায়ী, “নুতফা” শব্দটির মানে হচ্ছে “সামান্য পরিমান পানি”। তাছাড়াও লিসান আল-আরব “নুতফা” শব্দটিকে বিশেষভাবে ওজু করার জন্য বদনাতে বাহিত সামান্য পরিমাণ পানি হিসেবে বর্ণনা করে। “নুতফা” শব্দটির ব্যাপারে লিসান আল-আরব আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে, আর তা হচ্ছে, “বীর্যকে তার সামান্য পরিমাণের জন্য “নুতফা” বলা হয়”। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ডিকশনারিতে “নুতফা” শব্দের সংজ্ঞায় এমন কোনো চিহ্ন নেই যা এই ইংগিত দেয় যে, “নুতফা” শব্দটি কোনোভাবে হলেও শুক্রাণু বোঝায়।

আরবের লোকরা “নুতফা” শব্দটি দ্বারা কি বুঝে এবং বুঝায় তা নিচে উল্লেখিত হাদিসটি দ্বারা খুব পরিষ্কার ভাবেই বুঝা যায়।

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩২। পড়ে থাকা বস্তু পাওয়া (كتاب اللقطة)
হাদিস নম্বরঃ ৪৪১০

باب اسْتِحْبَابِ خَلْطِ الأَزْوَادِ إِذَا قَلَّتْ وَالْمُؤَاسَاةِ فِيهَا ‏‏ حَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ يُوسُفَ الأَزْدِيُّ، حَدَّثَنَا النَّضْرُ، – يَعْنِي ابْنَ مُحَمَّدٍ الْيَمَامِيَّ – حَدَّثَنَا عِكْرِمَةُ، – وَهُوَ ابْنُ عَمَّارٍ – حَدَّثَنَا إِيَاسُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي غَزْوَةٍ فَأَصَابَنَا جَهْدٌ حَتَّى هَمَمْنَا أَنْ نَنْحَرَ بَعْضَ ظَهْرِنَا فَأَمَرَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَجَمَعْنَا مَزَاوِدَنَا فَبَسَطْنَا لَهُ نِطَعًا فَاجْتَمَعَ زَادُ الْقَوْمِ عَلَى النِّطَعِ قَالَ فَتَطَاوَلْتُ لأَحْزُرَهُ كَمْ هُوَ فَحَزَرْتُهُ كَرَبْضَةِ الْعَنْزِ وَنَحْنُ أَرْبَعَ عَشْرَةَ مِائَةً قَالَ فَأَكَلْنَا حَتَّى شَبِعْنَا جَمِيعًا ثُمَّ حَشَوْنَا جُرُبَنَا فَقَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ فَهَلْ مِنْ وَضُوءٍ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَجَاءَ رَجُلٌ بِإِدَاوَةٍ لَهُ فِيهَا نُطْفَةٌ فَأَفْرَغَهَا فِي قَدَحٍ فَتَوَضَّأْنَا كُلُّنَا نُدَغْفِقُهُ دَغْفَقَةً أَرْبَعَ عَشْرَةَ مِائَةً ‏.‏ قَالَ ثُمَّ جَاءَ بَعْدَ ذَلِكَ ثَمَانِيَةٌ فَقَالُوا هَلْ مِنْ طَهُورٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ فَرِغَ الْوَضُوءُ ‏”‏ ‏.‏

৪৪১০-(১৯/১৭২৯) আহমাদ ইবনু ইউসুফ আযদী (রহঃ) ….. সালামাহ্ (রহঃ) তার পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে এক যুদ্ধে গিয়েছিলাম। তখন আমাদের মধ্যে খাদ্যের অভাব দেখা দিল। অবশেষে আমাদের কিছু সওয়ারীর বাহন যাবাহ করার কথা ইচ্ছা করেছিলাম। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে আমরা আমাদের খাদ্যদ্রব্য একত্রিত করলাম। আমরা একটি চামড়া বিছালাম এবং তাতে লোকদের খাদ্যদ্রব্য জমা করা হল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি সেটির প্রশস্ততা অনুমান করার জন্য দাঁড়ালাম এবং আমি আন্দাজ করলাম সেটি একটি ছাগল বসার স্থানের সমান। আর আমরা সংখ্যায় ছিলাম চৌদ্দশ’।

রাবী বলেন, আমরা সকলেই তৃপ্তির সাথে খেলাম। তারপর আমাদের নিজ নিজ খাদ্য রাখার থলে পূর্ণ করে নিলাম। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ওযুর জন্য কি পানি আছে? বর্ণনাকারী বলেন, এক ব্যক্তি তার পাত্রে সামান্য পানি নিয়ে এগিয়ে এল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা একটি বড় পাত্রে ঢেলে দিলেন। এরপর আমরা চৌদ্দশ’ লোক সকলেই তার থেকে পানি ঢেলে ঢেলে ওযু করলাম। তারপর আরো আটজন লোক এসে বলল, ওযুর জন্য কি পানি আছে? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ওযুর পানি সমাপ্ত হয়ে গেছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৩৬৯, ইসলামিক সেন্টার ৪৩৬৯)

হাদিসটিতে দেখা যায়, আরবের লোকজন নুতফা শব্দটি দ্বারা ওজু করার প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানিকে বোঝাতো।

(২) কুরআনের আয়াত ৭৫:৩৭ এর ভুল ব্যাখ্যা   

“নুতফা পর্যায়” নিয়ে ইসলাম প্রচারকদের আরেকটি দাবি রয়েছে, আর সেটি কুরআনের আয়াত ৭৫:৩৭ কে কেন্দ্র করে। আয়াতটি উল্লেখ করা হল :

75:37

اَلَمۡ یَکُ نُطۡفَۃً مِّنۡ مَّنِیٍّ یُّمۡنٰی ﴿ۙ۳۷﴾

আলাম ইয়াকুনুতফাতাম মিম মানিইয়িইঁ ইউমনা- ।

সে কি নির্গত বীর্যের এক “নুতফা” ছিল না?”

ইসলাম প্রচারকদের বক্তব্য হচ্ছে, “নুতফা” শব্দটি দ্বারা বীর্য বোঝায় না। তাদের দাবি অনুসারে, “নুতফা” শব্দটি কেবল “বীর্য” থেকে আলাদা অর্থ প্রকাশ করে। তারা “নুতফা” শব্দটির অর্থ “একটি শুক্রাণু” বা “একটি ডিম্বাণু” বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান। ইতিমধ্যেই দেখানো হয়েছে যে “নুতফা” শব্দটির অর্থ কি এবং শব্দটি দ্বারা আসলে কি বোঝানো হয়। আরবের লোকজন “বীর্য” শব্দটি প্রকাশ করতে কিভাবে “নুতফা” শব্দটি ব্যাবহার করতো তার একটি উদাহরণ হিসেবে লিসান আল-আরব উপরে উল্লেখিত আয়াতটি ব্যাবহার করে।

লিসান আল-আরব : বীর্যকে তার সামান্য পরিমাণের জন্য “নুতফা” বলা হয়। এবং দৈববাণীতে (কুরআন): সে কি নির্গত বীর্যের এক “নুতফা” ছিল না?”

সুতরাং, একাডেমিক অভিধান সমূহের তথ্যের আলোকে এই আয়াতটির সবচেয়ে সঠিক অনুবাদটি হবে, “সে কি নির্গত বীর্যের এক সামান্য পরিমাণ ছিল না?”

এখন একজন সাধারণ মুসলিমের মনে এই প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, “যদি “নুতফা” কেবলই বীর্য হয়ে থাকে, তাহলে কুরআন কেন “মানি” শব্দটি ছাড়াই কেবল বলে না যে “নুতফা” নির্গত হয়? এই প্রশ্নের উত্তর হবে, “হ্যাঁ” কুরআন তা বলে।

53:46

مِنْ نُطْفَةٍ إِذَا تُمْنَىٰ

মিন নুতফাতিন ইযা-তুমনা।

এক “নুতফা” থেকে যখন নির্গত করা হয়

(৩) “সুলালাতিন” শব্দটির ভুল ব্যাখ্যা

ইসলাম প্রচারকেরা এবিষয়ে কুরআনের আয়াত ৩২:৮ নিয়েও একটি দাবি উপস্থাপন করেন। আয়াতটি উল্লেখ করা হল :

32:8

ثُمَّ جَعَلَ نَسۡلَہٗ مِنۡ سُلٰلَۃٍ مِّنۡ مَّآءٍ مَّہِیۡنٍ ۚ﴿۸﴾

ছু ম্মা জা‘আলা নাছলাহূমিন ছুলা-লাতিম মিম মাইম মাহীন।

তারপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেছেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে।

ইসলাম প্রচারকদের দাবি হচ্ছে, “নুতফা শব্দটি দ্বারা বীর্য বোঝায় না” কেননা কুরআন অনুযায়ী, নুতফা হচ্ছে, “একটি তুচ্ছ তরলের নির্যাস”। ইসলাম প্রচারকরা তাদের ভুল যুক্তি এবং “সুলালাহ” শব্দের মিথ্যা সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে এই দাবিটি করেন। ইসলাম প্রচারকেরা বোঝাতে চান যে, “একটি নির্যাস” বা “নিষ্কোষিত কোনোকিছু” বিশুদ্ধ এবং অপরিহার্য উপাদান থেকে ভিন্ন। প্রখ্যাত আরবী ইংরেজি অভিধান লেনের অভিধান [8] থেকে “সুলালাহ” শব্দটির সংজ্ঞার বিশেষ অংশ তুলে ধরা হল :

প্রখ্যাত আরবী ইংরেজি অভিধান লেনের অভিধান “Extract of a thing” বা কোনোকিছুর নির্যাসকে সংজ্ঞায়িত করে “The clear or pure part…of a thing” বা কোনোকিছুর পরিষ্কার অথবা বিশুদ্ধ অংশ হিসেবে। অর্থ্যাৎ, লেনের অভিধান অনুযায়ী, “তুচ্ছ পানির নির্যাস বা বীর্যের নির্যাস” মানে “তুচ্ছ পানির বিশুদ্ধ অংশ”। আরও পরিষ্কার অর্থে বলতে গেলে বলতে হয়, “ক এর নির্যাস” মানে “ক এর বিশুদ্ধ রূপ” বা “বিশুদ্ধ রূপে ক”।

মুসলিমরা এইখানে প্রশ্ন করতে পারেন যে, “কুরআন কেন “নির্যাস” শব্দটির ব্যাবহার না করে বললো না যে, মানুষ কেবল একটি তুচ্ছ তরল থেকে সৃজিত হয়েছে?” এই প্রশ্নের উত্তর হল, হ্যা কুরআন বলে, কুরআনের আয়াত ৭৭:২০ এ কুরআন এই কথা বলেছে।

77:20

اَلَمۡ نَخۡلُقۡکُّمۡ مِّنۡ مَّآءٍ مَّہِیۡنٍ ﴿ۙ۲۰﴾

আলাম নাখলুককুম মিম মাইম্মাহীন।

আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি দিয়ে সৃষ্টি করিনি?

77:21

فَجَعَلۡنٰہُ فِیۡ قَرَارٍ مَّکِیۡنٍ ﴿ۙ۲۱﴾

ফাজা‘আলনা-হু ফী কারা-রিম মাকীন।

অতঃপর তা আমি রেখেছি সুরক্ষিত আধারে

কুরআনের আয়াত ৭৭:২০-২১ অনুযায়ী, এক তুচ্ছ পানি (যাকে আরবী শব্দ “মা’ইন” দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে) একটি সুরক্ষিত আঁধারে স্থাপিত হয়। এই আয়াতটি কুরআনের আয়াত ২৩:১৩ এর অনুরূপ, যা বলে “নুতফা” একটি সুরক্ষিত আঁধারে স্থাপিত হয়। এই বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে তোলে যে, কুরআনে “নুতফা” শব্দ দ্বারা বীর্য বা তরল বুঝানো হয়েছে।

23:13

ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ

ছু ম্মা জা‘আলনা-হু নুতফাতান ফী কারা-রিম মাকীন।

অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি।

(৪) ব্যাকরণের ওপর ভিত্তি করে একটি বাজে যুক্তি

আরও একটি দাবি হলো, কুরআনে ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনায় “নুতফা” “ভ্রূণকোষ” কে বোঝায়। ইসলাম প্রচারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, “নুতফা” শব্দটি দ্বারা বাবার শরীরের একটি একক শুক্রাণুও বোঝায়, আবার মায়ের শরীরের একটি একক ডিম্বাণুও বোঝায় এবং উভয় “নুতফা” মিলিত হয়ে এক “নুতফা” তে পরিণত হয়, যা দ্বারা ভ্রূণকোষ বোঝায়। তাদের দাবি, বাক্যের ব্যাকরণের কারণে কুরআনের আয়াত ৭৬:২ এই দাবিটি সমর্থন করে।

76:2

إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا

ইন্না-খালাকানাল ইনছা-না মিন নুতফাতিন আমশা-জিন নাবতালীহি ফাজা‘আলনা-হু ছামী‘আম বাসীরা- ।

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি “নুতফাতিন আমশাজিন” থেকে, এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন।

তারা মূলত দাবি করেন, আয়াতটির ব্যাকরণ ইংগিত দেয় দেয় যে, “নুতফা” শব্দটি মা এবং বাবা থেকে আসা পদার্থ সমূহের একটি মিলন থেকে উদ্ভূত একটি একক সত্ত্বা বা বিন্দুকে বোঝায়।

তারা বলেন, “আল-আমশাজ” (মিশা) শব্দটি একটি বহুবচন বিশেষণ এবং শব্দটি আয়াতটিতে একবচন বিশেষ্য “নুতফা” শব্দটির সাথে ব্যাবহৃত হয়েছে, ব্যাকরণগতভাবে যা প্রকাশ করে আয়াতটিতে “নুতফা” শব্দটি দ্বারা মা এবং বাবা থেকে আসা পদার্থ সমূহের একটি মিলন থেকে উদ্ভূত একটি একক সত্ত্বা বা বিন্দুকে বোঝানো হয়েছে।

ইসলাম প্রচারকরা “নুতফা” শব্দটির সাথে “একক” শব্দটি মিলিয়ে দিতে চান, যা সরাসরি “নুতফা” শব্দটির সংজ্ঞার বিরুদ্ধে যায়। তাদের যুক্তি অনুযায়ী, যেহেতু “নুতফা” একটি একবচন শব্দ, সেহেতু আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, “নুতফা” শব্দটি দ্বারা একটি “একক সত্ত্বা” বোঝায়। তাদের এই যুক্তিটি পুরোপুরি এই হাস্যকর যুক্তির অনুরূপ; “পরিমাণ” শব্দটি একবচন তাই “পরিমাণ” শব্দটি দ্বারা একটি “একক সত্ত্বা” বোঝায়। তাদের যুক্তি অনুযায়ী, “টাকার পরিমাণ” কথাটি দ্বারা কেবল “এক টাকা বা এক রুপি” বোঝায়।

উপসংহার

  • কুরআন অনুসারে, ‘নুতফা’ পর্যায়ের ভ্রুণ কেবলই নারী পুরুষের মিলিত তরল। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলিত ফলকে বা ভ্রূণকে কোনোভাবেই তরল হিসেবে বর্ণনা করা যায় না। ভ্রূণ কোনো অবস্থাতেই নারী পুরুষের মিলিত তরল নয়। কুরআনে পুরুষের শুক্রাণু এবং নারীর ডিম্বাণুর কোনো উল্লেখ বা ইংগিত নেই। 
  • ইসলাম প্রচারকরা কুরআনের ভ্রূণ বিকাশের বর্ণনা সমূহকে নির্ভুল প্রমাণ করতে যেসব ব্যাখ্যা দেন তাতে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা উপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার।

তথ্যসূত্র 

1.  Marshall Clagett, “Greek Science in Antiquity”, pp.180-181, New York: Abelard-Schuman, 1955; Dover, 2001

2.  Tzortzis, Hamza 2012. Embryology in the Quran: A Scientific-Linguistic Analysis of Chapter 23. Version 2.1. page 14

3.  “نطفة (Nutfah)”. Lisan-al-Arab. http://www.baheth.info

4. “ماء  (maa’)”Wehr, H. & Cowan, J. M. (1979). A Dictionary of Modern Written Arabic: (Arab.-Engl.). Harrassowitz Verlag. Page 1094

5. “Qaleel”. Edward William Lane. An Arabic-English Lexicon. Librairie Du Liban.
1968. Vol. 8, page 2992.
www.studyquran.org/LaneLexicon/Volume8/00000246.pdf

6. “al-qatara (رةѧѧѧѧѧالقط . “(Edward William Lane. An Arabic-English Lexicon.
Librairie Du Liban. 1968. Vol. 7, page 2542
http://www.studyquran.org/LaneLexicon/Volume7/00000070.pdf & “al-wahida
(دةѧѧѧالواح “(Vol. 8, page 2927.
http://www.studyquran.org/LaneLexicon/Volume8/00000181.pdf

7. “ةѧѧѧѧѧѧنطف) Nutfah)” Lisan-al-Arab. http://www.baheth.info

8. “Sulalah”. Edward William Lane. An Arabic-English Lexicon. Librairie Du Liban.
1968. Vol. 4, page 1397.
http://www.studyquran.org/LaneLexicon/Volume4/00000121.pdf

Facebook Comments

Marufur Rahman Khan

Atheist, Feminist

3 thoughts on “কুরআন এবং ভ্রূণের বিকাশ: নুতফা পর্যায়

  • February 20, 2019 at 11:27 am
    Permalink

    ভাইরে টাকার পরিমান টা কি পয়সা দিয়ে হয় না? যেমন ১০০ পয়সা? কোরআনে অনেক সময় উপমা অর্থেও সরল ভাবে বুঝার জন্য বলা হয়েছে। যেমন কেউ যদি আপনাকে বলে যাও এক কেজি চাল নিয়ে এসো? এতে কি আপনি প্রশ্ন করতে পারেন কয়টা চাউল আনতে হবে? অথবা, যদি গুনে গুনে কখনো এক কেজির পরিমানটা জানাও যায়, তবুও কি সব সময় এক কেজিতে সমান সংখ্যার চাউল হবে? কখনোই না, কারণ তাতেও যে সাইজের কম বেশির কারণে চাউলও কম বেশি হবে।

    Reply
  • February 21, 2019 at 8:02 am
    Permalink

    ধার্মিকরা এগুলো বিশ্বাস করবে না। তারা বলবে কোরানে উপমার সাহায্যে অনেক কিছু বলা হয়েছে। সেকালে পর্যাপ্ত মেডিকেল নলেজ ছিল না বলে প্রচলিত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ধার্মিকরা এ যুক্তি দিলে কি বলবেন?

    Reply
  • March 18, 2019 at 5:54 pm
    Permalink

    কুরআনকে রুপক অর্থে ধরা গুনাহ, যা আছে তার সরল ব্যাখ্যা পড়তে হবে এবং মানতে হবে,”আল্লাহ এর দ্বারা এটা বোঝাননি, ওটা বুঝিয়েছেন” এসব তো পাপ, তাহলে আবার আপনারাই উপমা ব্যবহারের কথা বলেন কেন,

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: