রাজীব, তোমার রক্তে বিপুল অঙ্গিকার!

ওর লাশের ছবিটার দিকে এখনও ঠিক করে তাকাতে পারি না। কেন জানি মনে হয় লাশটা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। খুব করুন মুখে। বলছে, “মামা-ওরা আমারে মেরে ফেললো! আপনারা কী করলেন?” ওর বীভৎস লাশটার রক্তাক্ত চেহারার মধ্যে একটা মায়াভরা চেহারা উঁকি দেয়, স্বচ্ছ সুন্দর একটা হাসি দেখতে পাই। ও মারা যাবার পরে মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখতাম ওকে, যেন চলে যাচ্ছে কোথাও। ফিরে তাকিয়ে হেসে বলছে, আসিফ মামা, ফোন দিয়েন কিন্তু!

আমার বন্ধু ছিল সে। খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুই। ফোন দিতো মাঝে মাঝেই, একবার ফোন দিলে আর ফোন ছাড়তে চাইতো না। দুঘণ্টা তিনঘণ্টা আলাপ। মিশরে চার হাজার বছর আগে কী হয়েছিল, তিব্বতে নারীদের অবস্থা এখন কেমন, পুরান ঢাকার পুরনো বিল্ডিংগুলোর আর্কিটেকচার কেমন, হিন্দুদের উপরে আক্রমণগুলোর কারণ কী কী হতে পারে, আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগ থেকে কীভাবে বের হয়ে গেল, জাকির নায়েক কতবড় বেকুবের মত একটা কথা বলেছে এইসব নানান কথাবার্তা। দিনের পর দিন ফোনেই আড্ডা। দেখা হলেও তুমুল আড্ডা। কখনো ধানমণ্ডি রবীন্দ্র সরোবরে, কখনো মিরপুর বিহারী ক্যাম্পের পাশে কাবাবের দোকানে। আমাকে দেখলেই ছুটে আসতো, মনে হতো ওর কথাগুলো ও সবাইকে বলতে পারতো না। আমাকে পেয়ে গেলে মন খুলে কথা বলতে শুরু করতো। আমিও শুনতাম, অনেকক্ষণ ধরে ওর নানান বই পড়ার খবর নিতাম। কোথায় পুরানো বই কমদামে কিনতে পাওয়া যায় সে খবর দিতাম, সে খোঁজ পেলেই সেখানে হানা দিতো।

সেই ২০০৬ বা ২০০৭ সালের কথা। ব্লগার রাজীব হায়দার ওরফে থাবা বাবার সাথে পরিচয় হয়েছিল। সে সময় খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। আপাদ মস্তক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, এবং শেখ মুজিবুর রহমানের অন্ধ ভক্ত। এবং জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার। এই বিষয়ে কোন ছাড় দেবে না সে। আমি বলতাম জামাত শিবির যারা করে তারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, ধর্ম ব্যবস্থা, সমাজ কাঠামোর ফলাফল। মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটলে এসব আস্তে আস্তে কমে যাবে। সে বলতো না, আগে এদের উচ্ছেদ করতে হবে, যেভাবেই হোক। এই নিয়েও তর্ক হতো। অনেক অনেক তর্ক।

অনেকদিন পরে নানান মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়, আমি তাকে ব্লকও করি ফেসবুকে। তার সাথে আমার আর মিলতো না। প্রথম দিকে যখন একসাথে লিখতাম, একসাথে আড্ডা দিতাম, সেসময়ে ওর লেখাগুলো আমার চমৎকার মনে হতো। বৃহন্নলাদের অধিকার নিয়ে লিখতো, রাস্তায় পরে থাকা প্রতিবন্ধী কিংবা বেশ্যাদের জন্যেও তার মমতা ছিল অনেক। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার সর্বপরি ধর্মের যৌক্তিক বিরোধিতায় ছিল পারদর্শী। পরের দিকে যাদের সাথে মিশেছে, যাদের সাথে আড্ডা দিতো, যা লিখতো, আমার সাথে মিলতো না। আমার ভাল লাগতো না। তবে আমার যে ভাল লাগতেই হবে এমন কোন কথাও নেই। কে কী লিখবে, কোন দলকে সমর্থন করবে, লেখার মান কেমন হবে, তা তার একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। আমি তার লেখার স্বাধীনতাকে সম্মান করতাম। এমনকি আমার বিরুদ্ধে লিখলেও।

কিন্তু তারপরেও আমার বন্ধুই ছিল। পরের দিকে আমাকে আর তেমন পছন্দ করতো না সে, আমি জেনেছিলাম। তারপরেও আমার বন্ধুই ছিল। ইতিহাস সম্পর্কে দারুণ জ্ঞান ছিল, মাঝে মাঝে তর্ক করতে গেলে বোঝা যেত সে ইতিহাস নিয়ে সে পড়ালেখা করে। ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার মানুষ ছিল, মাঝে মাঝে ধর্ম নিয়ে বেমক্কা প্রশ্ন করতে ভালবাসতো। আমাকে বলেছিল, স্কুলে থাকতে- কলেজে থাকতে নানান কৌতূহলী প্রশ্ন করে হুজুর মোল্লাদের ঘোল খাইয়ে দিতে সে ভালবাসতো। যার উত্তর কেউ দিতে পারতো না। কিন্তু সে আসলে তখনও নাস্তিক ছিল না। ধর্ম এবং মিথলজী সম্পর্কে আগ্রহী ছিল বটে, তবে নাস্তিক নয়। অনেকদিন পরে সামহোয়্যার ইন ব্লগে আমার একটা পোস্টে সে লিখেছিল, তার নাস্তিক হবার পিছনে আমার কিছুটা ভূমিকা ছিল। আমার সাথে পরিচয়ের পর থেকেই সে ধর্মে অবিশ্বাসী হতে শুরু করে, এবং প্রকাশ্যে নিজের অবিশ্বাসের ঘোষণাও দিতে শুরু করে। ওর মৃত্যু আমাকে বারবার তাই অপরাধী করে দেয়।

ওকে মহামানব কিংবা সাক্ষাৎ শয়তান বানাবার দ্বিমুখী প্রক্রিয়া দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে গেছি। সে মহামানব কিংবা শয়তান ছিল না। খুব সাধারণ একজন তরুণ, সাধারণ একজন হাসিখুশি বিনয়ী মানুষ ছিল। যারা মহামানব কিংবা শয়তান বানাতে চায়, তারা তার লাশ বিক্রি করতে চায়, তারা কসাইয়ের মত তার রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত লাশ ভাগ বাটোয়ারা করে বাজারে তুলতে চায়। তার অসংখ্য ভাল দিক ছিল, ছিল অসংখ্য দুর্বলতাও। সবকিছু মিলিয়েই একজন মানুষ ছিল সে, মানবিক বোধ আর মুক্তচিন্তার একজন কর্মী। তার স্বপ্ন ছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি মুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাঙলাদেশ, কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলতেও এখন সবাই ভয় পায়।

ওর মৃত্যুর পরে অনেকগুলো চেহারা পালটে যেতে দেখেছি, দেখে হতবাক হয়েছি। অনেক নাস্তিককে দেখেছি টুপি পরে মোল্লা হয়ে যেতে, অনেকে প্রাণ ভয়ে চুপ হয়ে গেছে। কেউ কেউ এখন খালি রক্ত দিন জীবন বাঁচান, ক্যান্সার রোগীর জন্য সাহায্য দিন এসব লিখে নিজেকে ভাল প্রমাণে ব্যস্ত আছেন। কেউ কেউ পাক্কা মোল্লাও হতে শুরু করেছে! সম্ভবত তাদের গ্রন্থে সবচাইতে বড় যুক্তি হচ্ছে রক্তমাখা চাপাতি দেখানো। রাজীবের রক্তাক্ত লাশ দেখার পরেই হঠাৎ তারা ইসলামের শান্তি এবং সৌন্দর্য বুঝে মসজিদে দৌড়ানো শুরু করলো! ফেসবুকে কোরান হাদিস দেয়া শুরু করলো। অনেক সুশীল আহাম্মক আবার আগ বাড়িয়ে মুখোশ বদলে বলতে শুরু করলো, উগ্র নাস্তিক-যারা লেখালেখি করে আর যারা আল্লাহু আকবর বলে গলা কাটে-সে সব মৌলবাদী, উভয়ই সমান অপরাধী। গণজাগরণ মঞ্চ থেকেও কতিপয় নির্বোধ বলছিল, শাহবাগ আন্দোলনে কোন নাস্তিক নেই! তা যেন ছিল মৃত রাজীবের লাশের উপরে দাঁড়িয়ে তাকে থুথু দেয়ার চেয়েও বড় নোংরামি। রাজীবকে বানানো হচ্ছিল ধার্মিক, রাজীবের লাশ তারা ভালই বেঁচে খেল। পকেট টাকায় উপচে পরার পরে মঞ্চ থেকে লাথি মেরে ফেলে দিল রাজীবের লাশ!

ওর মায়ের সাথে কথা হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। পরিবারটিকে একঘরে করে রাখা হয়েছে, ওর পিতার সম্ভবত কিছুটা মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। শাহবাগে যারা ওর লাশ নিয়ে নাকে কেঁদেছিল, তারা পরে আর কোনদিন খোঁজও নেয় নি। লাশের রাজনীতি বড্ড খারাপ আর নোংরা, শাহবাগের নিকৃষ্ট লোভী লোকগুলো তখন নাস্তিক বিরোধী প্রচার চালাতে ব্যস্ত, দেশকে মুসলমান বানাবার চেষ্টায় ব্যস্ত। যারা প্রথমদিনই শাহবাগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, শাহবাগকে ট্রাইবুনাল বিরোধী জামাতি প্রজেক্ট নাম দিয়েছিল, তারাই এখন হর্তাকর্তা। এবং তারা ১০০% খাঁটি মুমিন মুসলমান। নাস্তিক কতলে তারাও কারো চেয়ে কম যায় না। তারা এখন রাজীবের নামে আড়ালে আবডালে নোংরা কথা বলে, কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে ওর পরিবারকে গালাগালিও করেছে। কিন্তু মঞ্চে ওঠা মাত্রই এক একজন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের অসাম্প্রদায়িক মানুষ বনে যান। নির্লজ্জ বেহায়া বলা হলেও মনে হয় এদের কম বলা হবে।

হ্যাঁ রাজীব নাস্তিক ছিল। ধর্ম বিরোধী নাস্তিক ছিল সে। এবং সে মরে গিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছে, ধর্ম এবং ধর্মান্ধরা কতটা নৃশংস, কতটা যুক্তি বুদ্ধি আর মগজহীন। ধর্মের সমালোচনা করলে, বিরোধিতা করলে জেলে যেতে হয়, শাস্তি পেতে হয়, কল্লা নামানো হয়। অথচ কল্লা কাটা মোল্লাদের এবং তাদের উস্কানি দেয়া লোকদের স্পর্শও করা হয় না। তারা থেকে যায় আড়ালে। কারো সাধ্য নেই আল্লামা শফীদের গ্রেফতার করে। গতকালই আল কায়দা প্রধান হেফাজত আর জামাতকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। সুশীল নির্বোধগুলো এখন হয়তো বলবে, আল-কায়দা এবং আল কায়দার বিরুদ্ধে যারা লেখে, আল-কায়দার অনুভূতিতে আঘাত দেয়, উভয়ই সমান অপরাধী!

ডিবি অফিসে থাকার সময়ে রাজীব হত্যা মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছিলাম। কয়েকজন নিম্নপদস্থ পুলিশের কাছ থেকে জেনেছিলাম, রাজীব হত্যাকারীদের বিন্দুমাত্র শারীরিক নির্যাতন করা হয় নি। আমি রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতনের পক্ষে নই, কিন্তু যেখানে মিন্টুরোডের ডিবি অফিস শারীরিক নির্যাতনের জন্য দুনিয়াজোরা খ্যাত, সেখানে কয়েকজনকে দামী খাবার দাবার খাওয়ানো, আদর আপ্যায়ন করা কেন হয়েছে তা আমার কাছে পরিষ্কার হয় নি কখনো। এবং চার্জশিটে একজনকে সমস্ত অপরাধের দায় দিয়ে অন্যদের অব্যহতি দেয়া হয়েছে। নর্থ সাউথের ধনী পরিবারের ছেলেগুলোর বাবামা বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষও দিয়েছে সেখানে। চার্জশিট এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অনেক ফাক ফোকর, এবং আসামীদের বলেও দেয়া হয়েছে কীভাবে মামলা লড়লে মামলায় জেতা যাবে। কারণ পুলিশ থেকে শুরু করে তদন্তকারী কর্মকর্তা সকলেই ধর্মান্ধ, পাক্কা মুমিন মুসলমান। তাই তারা কেমন তদন্ত করবে তা সহজেই অনুমেয়।

ধর্মের পক্ষে কিছু লেখার অধিকার থাকলে বিপক্ষেও লেখার অধিকার থাকবে। সমালোচনা, স্যাটায়ার, প্রশ্ন, পর্যবেক্ষণ, যাচায় বাছাই এসবই থাকবে। সমালোচনা করার মত কিছু থাকলে সমালোচনা হবেই। হাসাহাসি করার মত কোন বিষয় থাকলে হাসাহাসি হবেই। চাপাতি দিয়ে আক্রমণ করে, রক্তাক্ত করে শুধু ভয় আদায় করা সম্ভব, শ্রদ্ধা নয়। হে ধর্মান্ধরা, হে ঘাতকেরা, ভেবো না সবাই তোমাদের ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, পশ্চাৎপদতাকে সম্মান কিংবা শ্রদ্ধা করছে, তোমাদের কেতাব এবং কেতাবধারীদের জয়গান করছে। আসলে তোমাদের মত দাঁতাল পশুদের ভয় পাচ্ছে সবাই। এটাকে শ্রদ্ধা বা সম্মান ভেবে ভুল বুঝো না।

কারণ পাগল বুনো জন্তু সকলেই ভয় পায়।

Facebook Comments
%d bloggers like this: