ঈশ্বর, জীবন এবং কিছু উপলব্ধি

সর্বপ্রথম যখন ঈশ্বরের অস্তিত্বে প্রশ্ন জাগে,তখন আমার বয়স ১৫ বছর।

যখন একদম শিশু, কেবল বুঝতে শিখেছি,তখন টিভি তে ফকির আলমগীরকে দেখে আল্লাহ ভেবেছিলাম। গায়কের গুরুগম্ভীর গলা, ঝাঁকড়া চুল আর অদ্ভুত দেহভঙ্গিমাকে শিশুমনে ঈশ্বর হিসাবে গগ্রহণ করেছিল। হুজুরের কাছে কোরান শিখতে গিয়ে সেই ভুল ভেঙে গেল। কোন প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না,বিশ্বাস করেছিলাম ঈশ্বরের কথা। যিনি আমার জন্ম, জীবন, মৃত্যু এবং পরকালের নির্ধারক।
বয়ঃসন্ধিকালের উন্মাতাল সময়গুলোতে কিছু প্রশ্ন তীব্র যন্ত্রণা দেয়া শুরু করল। প্রথম যে প্রশ্ন আমাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বে উদাসীন করেছিল, তা হল-ঈশ্বর এত শক্তিমান, কিন্তু আমার মত করে ভাবেন কেন? তাকে না মানলে তার রাগ হয়,শাস্তি পেতে হয়। তাকে তুষ্ট করলে অনেক কিছু পাওয়া যায়। তার চাওয়া আর আমার চাওয়ার মাঝে তো তফাৎ নেই।

আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এরচেয়ে জটিল অনেক প্রশ্নই অনেক কিশোরের মাথায় ঘোরে,ঘুরবে। সমস্যা হল, এসব প্রশ্নের উত্তর কাউকে জিজ্ঞেস করা যায় না। যায় না ভয়ে।শুরুতে ভয় পেলাম। ঈশ্বরের খেলা বোঝার বুদ্ধি তো আমার নেই। না জেনে অস্বীকার করার পাপে বেহেশত তো যাবেই,ইহকালটাও না নষ্ট হয়।

ভয় সর্বদাই কৌতুহলের চেয়ে দুর্বল অনুভূতি।ঈশ্বরকে জানা বা অস্বীকার করার কোন ইচ্ছা আমার ছিল না।শুধু ভাল লাগে, এজন্য বই পড়তাম।পড়ার তালিকায় ছিল বিজ্ঞান,গণিত এবং সাহিত্য।দিন যত যাচ্ছিল,আমি ততই সাহসী হয়ে উঠছিলাম।এই সাহস দুঃসাহসে রূপ নিল ১৬ বছর বয়সে। অনেক কিছু না জেনেই ঈশ্বর বিশ্বাসে ঘাটতি চলে এল।

আমার মনোজগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই ছিল খুশবন্ত সিং এর উপন্যাস “দিল্লী”। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র,গণিতে দক্ষ ছিলাম। বিজ্ঞানের,বিশেষ করে পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র এবং পদার্থবিজ্ঞানীদের ঈশ্বর অনীহার সংস্কৃতিতে আমি মজেছিলাম। কিন্তু আমার জীবন আমূল বদলে যায় দিল্লী বইটি পড়তে গিয়ে।সেখানে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কিছু লেখা ছিল না। ধর্ম উপন্যাসের মূল বিষয় ছিল না।কিন্তু অধর্ম ছিল সেই উপন্যাসের আর্তনাদ। সেইসময় প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদকে একুশের বইমেলা প্রাঙ্গণে কোপানো হয়।সেই ঘটনার আগে পর্যন্ত প্রথাবিরোধী লেখকদের সম্পর্কে বেশী কিছু জানতাম না। হুমায়ুন আজাদের লেখা “পাক সার জমিন সাদ বাদ” পড়া শুরু করেছিলাম, ভাল লাগল না। আমি আগ্রহ হারাচ্ছিলাম। অনাগ্রহের কারণ, খুব সম্ভব মজ্জাগত সংস্কারের ধারা থেকে তখনও বোধহয় বের হতে পারি নি।

বিজ্ঞানের ছাত্র,যার নেশা সাহিত্য,মন রোমান্সে ভরপুর-এধরণের ছেলেরা জীবনের শুরুতে অনেক ভুল করে ফেলে। আমিও করলাম।জীবনের কষ্টকর মুহুর্তগুলোতে গভীরভাবে ঈশ্বরকে স্মরণ করলাম,শান্তি পাই নি। বরং অশান্তি পড়ার নেশাকে আক্রমণ করল। যেই লেখালেখি ছিল আনন্দের উৎস, সেই লেখার ইচ্ছাও হত না। মনের মাঝে তীব্র ভীতি, এর নাম ঈশ্বর ভীতি।ঈশ্বরকে অস্বীকার করে আমি কি পাপ করেছি-এধরণের ভাবনা মাথায় ঘুরতে থাকল।

আগেই বলেছি,সাহিত্য ছিল আমার নেশা।নেশা কেটে যায়,নেশার রেশ সহজে যায় না।আবারও সেই বুড়ো শিখ,যাকে আমি কোনদিন দেখি নি, আমাকে অন্ধকার থেকে টেনে তুললেন।খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনীগ্রন্থ “ট্রুথ,লাভ এন্ড লিটল ম্যালিস” এর শেষাংশ আমার হারানো কৈশোর ফিরিয়ে দিল।ঈশ্বরের ব্যাপারে আমি আবার চিন্তা করা শুরু করলাম। এবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলাম, শেষটা যেন দেখতে পারি।

বিজ্ঞান মানুষকে সর্বোত্তম শিক্ষা দিয়েছে।সেটা হল,প্রশ্ন করার শিক্ষা।উত্তর খোজার আকাঙ্ক্ষা এর স্বাভাবিক ফলাফল। সেই শিক্ষা পূর্ণ হতে শুরু করল। কিন্তু পানি ততদিনে অনেকদূর গড়িয়ে গেছে।

খোদ বাংলাদেশে নাস্তিক্যবাদ,অজ্ঞেয়বাদ,প্রচলিত ঈশ্বরে অবিশ্বাস প্রকাশ্যেই চর্চিত হচ্ছিল এবং বেশ জোরেসোরেই। ইন্টারনেট, ব্লগ, ফেসবুকের কল্যাণে খুব দ্রুত ধারণাগুলো ছড়াতে শুরু করল। ধর্মীয় প্রত্যাঘাতও শুরু হল। আমার কাছে এতদিন যা ছিল জ্ঞানের ক্ষেত্র, সেখানে ধর্মীয় আঘাত আসা শুরু হল।

ধর্মীয় প্রত্যাঘাত ঈশ্বরের প্রতি আমাকে আরও বিমুখ করেছে। ধর্মীয় উন্মাদনার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলেছে। পৃথিবীর সকল অসহায়,নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ আমাকে ঈশ্বরের অনস্তিত্ব সম্পর্কে দৃঢ়তা দিয়েছে। কোন সৃষ্টিকর্তা নিষ্পাপ শিশুর জীবন নিয়ে রক্তহোলী খেলতে পারেন না। রক্তের গন্ধ কখনোই ফুলের সুবাসের মত হতে পারে না।

ভারতবর্ষের ইতিহাস,পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের ইতিহাসের মতই।এখানে দেশী এবং বিদেশী বিভিন্ন ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তাদের লোভকে ন্যায়সঙ্গত করার জন্য ধর্ম তৈরী এবং প্রচার করেছে। নিষ্ঠুরভাবে ধর্মকে ব্যবহার করতে তাদের একটুও বাধে নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ জাতীয়তাবাদের উগ্রতায় একে অপরকে হত্যা করেছে। দেশের সীমারেখা আর ধর্মের সীমারেখা এক হয়ে গেছে। সেসব হিংস্রতা, বন্য জন্তুর হিংস্রতার চেয়ে সহস্রগুণে ভয়ংকর।

ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে,কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে।এমনকি, যাদের কাছে ধর্ম শুধুমাত্র পরকালের আশা,সেইসব নিরীহ মানুষেরাই সবচেয়ে বেশীবার ধর্মের বলি হয়েছে। অথচ ঈশ্বরকে মেনে,ধর্মীয় আচার পালন করেও যেই ব্যাক্তি অবলীলায় খুন ধর্ষণ করেছে,তার বিচার খোদ সর্বশক্তিমানও করেন নি। আমি যৌক্তিক ভাবেই মনে করি না, যে হত্যাকারীর বিচার দোযখে হবে। দোযখের সহস্র বছরের আগুনও তাদের নিষ্ঠুরতার বিচার করতে অক্ষম।

আমি সেই মুহুর্তে সর্বশক্তিমানের অস্তিত্ব মেনে নিব, যখন তিনি পৃথিবীর সকল শিশুকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবেন। হোক সেটা বোমা হামলা কিংবা ক্যান্সারে। ক্যান্সার রোগীদের কষ্টগুলো উপলব্ধির বাইরে।সেটাতে শিক্ষণীয় কিছু থাকাকে আমি অবিশ্বাস করি। ধর্মীয় উন্মাদনা,জাত্যাভিমান আর ভোগের লোভে উন্মত্ত মানুষদের প্রতি আমি করুণা বোধ করি। সাদাত হোসেন মান্টোর লেখা “পাগল বিনিময়” গল্পের পাগলেরা পৃথিবীর ক্ষতি করে না। বরং ধর্মান্ধ উন্মাদের দলই পৃথিবীকে পাগলা গারদ বানাতে চায়।

এই উন্মাদনার শেষ আমি দেখতে চাই। এতে যদি আমি ভুল প্রমাণিত হই, যে ঈশ্বর বর্তমান,তাতেও আমার কোন খেদ নেই।আমার দন্দ্ব সর্বশক্তিমানের অস্তিত্বের চেয়ে ধর্মের সাথে লক্ষ কোটিগুণে বেশী। সৃষ্টিকর্তা বলে যদি কিছু থাকেনও, আমি নিশ্চিত জানি তিনি আমার মত পাগলদের সাথেই থাকবেন।

(সম্মান জানাই সেই সকল চিন্তাবীরদের,যাদের চিন্তার ব্যাপ্তি ঈশ্বরকে অতিক্রম করেছে।)

লেখকঃ কয়েস আলী

Facebook Comments