প্যারাডক্সিকাল সাজিদ ২: গল্পে জল্পে আরিফ আজাদের মূর্খতা

সস্তা ও জনপ্রিয় ধারার অপবৈজ্ঞানিক ইসলামী কেতাব লেখক জনাব আরিফ আজাদ তার সদ্য প্রকাশিত বই “প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২” নামক কেতাবে আস্তিকতাকে যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায়ে গল্পে জল্পে ডারউইনিজম নামে একটা অধ্যায় লিখেছেন। এই অধ্যায়টিতে উনি খুবই হাস্যকর এবং চমকপ্রদ কিছু দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছেন, যা নিতান্তই কুযুক্তি ও মিথ্যাচারের সকল সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। সেইসব কুযুক্তি এবং মিথ্যাচার নিয়ে আলোচনা করাই এই লেখাটির উদ্দেশ্য। যদিও আমি ভালভাবেই জানি, যেই পাঠক-শ্রেণী এবং ভক্ত অনুসারী উনি গড়ে তুলেছেন, উনারা যুক্তি প্রমাণের চাইতে বিশ্বাসের ওপরেই আস্থাশীল। তাই যুক্তিপ্রমাণ উনাদের কাছে খুব বেশি বিবেচ্য হয়ে উঠবে না। বরঞ্চ মুক্তমনাদের যুক্তি প্রমাণের তোপের মুখে আরিফ আজাদই হয়ে উঠবেন উনাদের জন্য বিশ্বাসের ত্রাণকর্তা। আরিফ আজাদ যত অযৌক্তিক কথাই বলুক না কেন।

কারণ বিশ্বাসই যেখানে মূখ্য, সেখানে যুক্তি কাজ করে না।

বইটিতে তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, ডারউইনিজম থেকে হিটলার আর স্টালিন প্রভাবিত হয়ে গণহত্যা চালিয়েছেন! যা নির্লজ্জ মিথ্যাচার এবং সেটি আমরা এই প্রবন্ধে প্রমাণও করবো। তবে, আনন্দের বিষয় হচ্ছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি বিবর্তনতত্ত্বকে একপ্রকার স্বীকৃতিই দিয়ে ফেলেছেন। তাই শুরুতেই উনাকে সাধুবাদ জানাই, উনি আস্তে আস্তে মেনে নিচ্ছেন বিবর্তনতত্ত্বই জীববৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করার একমাত্র বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, আর তিনি আগের বইয়ের বিবর্তনকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা থেকে সরে এসেছেন।

এবার এই অধ্যায়ে উপস্থাপিত ব্যাপারগুলোর উত্তর আমরা ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেই।  

প্রসঙ্গঃ ডারউইনিজম

প্রথমত, “ডারউইনিজম” বলতে কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আজ পর্যন্ত দুনিয়াতে আসে নি। পাঠকের জানার জন্য উল্লেখ করি- ডারউইন উঁনার সময়ে জানতেন না কিভাবে জীব বৈচিত্র্য ঘটে। মানে তিনি জেনেটিক্সের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। পরবর্তীতে মেন্ডেলের জেনেটিক্স আসার পরে বোঝা গেল ডারউইনের বর্ণিত বৈচিত্র্যের কারণ। এ দুইয়ের সংযোগে মর্ডান সিন্থেসিস এসেছে যা বর্তমান বিজ্ঞানের জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষনার বিষয়।

কিছু খ্রিষ্টান ওয়েবসাইট বিবর্তনের তত্ত্বকে বুঝাতে “ডারউইনিজম” শব্দটা ব্যবহার করে থাকে, তবে আমরা আরিফ আজাদের বুদ্ধিমত্তা আর সৃষ্টিশীলতাকে সম্মান জানিয়ে ধরে নিচ্ছি তিনি সেখান থেকে এই শব্দটি “সংগ্রহ” করেন নি। কারণ এই শব্দটার অর্থ ব্যাপক।    

ডারউইনিজম বা ডারউইনবাদের অর্থ আটলান্টিকের দুই পাশে, মানে ব্রিটেন আর আমেরিকায় দুই রকম। বৃটেনে ডারউইনিজম বলতে ডারউইনের চিন্তাধারা, প্রাকৃতিক নির্বাচন, যৌন নির্বাচন ইত্যাদিকে একসাথে বোঝায়। কিন্তু আমেরিকাতে কোন বিজ্ঞানী ডারউইনিজম শব্দটি ব্যবহার করেন না, শুধুমাত্র সৃষ্টিবাদিরা ব্যবহার করেন যেন ডারউইনের তত্ত্বকে আক্রমণ করা সহজ হয়। যেন তারা ডারউইনের  তত্ত্বকে কোন দার্শনিক মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, যা এটি একেবারেই নয়! আরিফ আজাদ লিখেছেন, সাজিদের ডায়েরিতে একটা নিবন্ধের কথা- যেখানে সাজিদ লিখেছে-

“…ডারউইন তার বিখ্যাত বই, যেটিকে বিবর্তনবাদের বাইবেল বলা হয়, সেটির নামও রাখেন এটিকে মূল বিষয় ধরে। বইটির নাম Origin of Species: By means of natural selection”    

উক্ত বাক্যদ্বয়ে ব্যাকরণগত ভুলকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি আমরা, কারণ সেটা খুব নিচ একটা চেষ্টা হবে আজাদকে নিচু দেখাতে। শুধু একটা হিন্ট দেই, বইয়ের নামের ক্ষেত্রে প্রিপজিশন আর আর্টিকেল ছাড়া বাকি প্রত্যেকটা শব্দের প্রথম অক্ষর বড় হাতের হবে। [১]

ডারউইনের বইয়ের নামটি আরিফ আজাদ ভুল লিখেছেন- বইয়ের নাম হচ্ছে – On the Origin of Species by Means of Natural Selection, or the Preservation of Favoured Races in the Struggle for Life মানে সাজিদ যে বইয়ের ব্যাপারে সমালোচনামূলক নিবন্ধ লিখেছে সে বইয়ের নামও সে জানেন না!    

পুরো নামটা আনার আরেকটা কারণ আছে বৈকি। বইয়ের নামে ‘Races’ শব্দটি নিয়ে অনেকের সমস্যা দেখা যায়। রেস বললে কি বর্ণবাদ প্রকাশ পায় না? পায়। ডারউইনের সময়ে বা তারও আগে থেকে এই ধারণা ছিল যে প্রত্যেকটা বর্ণের মানুষ আলাদা। ধর্মের বিচারে মনে করা হতো ইহুদীদের জন্ম ঈভের সাথে সাপের মিলনে হয়েছে, বা কৃষ্ণাঙ্গদের জন্ম হয়েছে নূহের ছেলের সাথে শিম্পাঞ্জির মিলনে। ডারউইনের সময়ের দূর্দান্ত প্রভাববিস্তারকারী দার্শনিকেরাও এই ধারণার বাইরে ছিলেন না। হিউম, ভলতেয়াররাও একই ধারণা পোষন করতেন।    

দ্বিপদ নামকরণের জনক ক্যারেলাস লিনিয়াস মনে করতেন মানুষের ছয়টি প্রজাতি বিদ্যমান। Homo sapiens Europaenus albenscens বা ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ, Homo sapiens Americanus rebsceus বা আমেরিকান লাল মানুষ, Homo sapiens Asiaticus fuscusens বা এশিয়ান হলুদ মানুষ, Homo sapiens Africanus nigrus বা আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ, Homo troglodyte বা শিম্পাঞ্জী এবং Homo nocturnis বা ওরাংওটাং। [২]

ডারউইন তার বই Descent of Man এর ৭ম অধ্যায় “On the Races of Man” এ লিখেন তার সময়ের প্রকৃতিবিদদের মানুষের প্রজাতি নিয়ে দ্বিমতের কথা- “অন্যান্য জীবকূল নিয়ে যতটা গবেষণা করা হয়েছে, মানুষের উপর তার চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে গবেষণা করা হয়েছে। এবং নানা রকম বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ একটি একক প্রজাতি অথবা একটি একক জাতি হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু এতে রয়েছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে মানুষের একটি নয় একাধিক জাতি বিদ্যমান। ভাইরের মতে মানুষের দুইটি জাতি, জ্যাকুইনটের মতে তিনটি, কান্টের মতে চারটি, ব্লুমেনবাচের মতে পাঁচটি, বাফনের মতে ছয়টি, হান্টারের মতে সাতটি, আগাসিচের মতে আটটি, পিকারিংয়ের মতে এগারটি, বরি ডি এসটি ভিঞ্চেন্টের মতে পনেরটি, ডেসমলিন্সের মতে ষোলটি, মর্টনের মতে বাইশটি, ক্রফার্ডের মতে ষাটটি এবং বার্কের মতে তেষট্টিটি মানব জাতি এই পৃথিবীতে বিদ্যমান। এই যে মানুষকে এত এত জাতিকে বিভক্ত করে ফেলা হলো, এতে কিন্তু প্রতিটি জাতি স্বতন্ত্র প্রজাতি হয়ে গেলো না । অর্থাৎ, তারা প্রত্যেকেই হোমো স্যাপিয়েন্সেরই অন্তর্গত।  কিন্তু এখান থেকে একটা বিষয়ই প্রতিপন্ন হয় আর তা হলো প্রত্যেকটা জাতিই পূর্বে একটি জাতিরই অন্তর্গত ছিল, যা পরবর্তীতে ক্রমে ক্রমে ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তায় পরিণত হয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে অভ্যন্তরীণ এমন কোনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নেই, যা তাদেরকে একে অপর থেকে আলাদা করে ফেলে”। ডারউইন যেন ব্রিটেনে বসে তার মৃত্যুর বছরই জন্ম নেওয়া ভারতীয় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা পংক্তি আবৃত্তি করলেন, “বাহিরে কালো আর ধবল কেবল, ভিতরে সবার সমান রাঙা।”

এর আগের প্যারায় ডারউইন লিখেছেন তখনকার সময়ের মানুষের প্রজাতির যে বৈচিত্র্যের মানদণ্ড ছিল সেটা কতটা ভাসাভাসা ধারণালব্ধ আর এর ব্যতিক্রম কতটা সহজলভ্য ছিল।

“আমাদের প্রকৃতিবিদ নিজেকে খুব বিপদের মধ্যেই আবিষ্কার করবেন, যখন তিনি বুঝতে পারবেন যে বর্ণগুলোর মধ্যকার আলাদাকারি বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যপ্তি অনেক বেশি। এ ব্যাপারটা আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা কৃষ্ণাঙ্গদের দেখলে বুঝা যায়। একই ভাবে পলিনেশিয়ান, আর অন্যান্য বর্ণের লোকেদের মধ্যেও দেখা যায়। কোন বৈশিষ্ট্য কোন জাতির জন্য নির্দিষ্ট করে বলা যায় কি না সেটা সন্দেহের বাইরে নয়। একই গোত্রের বর্বর লোকেরাও নিজেদের বৈশিষ্ট্যে এক রকম না, হটেনটট নারীদের মধ্যে কিছু এমন বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য জাতির থেকে ওদের আলাদা করে, কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের মধ্যেও সমান ভাবে বিস্তৃত না। আমেরিকান বিভিন্ন গোত্রের সদস্যদের মধ্যে পরস্পরের গায়ের রঙ আর গায়ের চুলের পরিমাণে বৈচিত্র্য আর বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান, একই ভাবে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যেও তাদের রঙের বৈচিত্র্যের সাথে সাথে গঠণেরও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। একই বর্ণের লোকেদের করোটির গঠনে আর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্য দেখা যায়। সকল প্রকৃতিবিদরাই অভিজ্ঞতা থেকে জেনে গেছে এমন অনির্দিষ্ট আর অগ্রহণযোগ্য বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে প্রজাতি আলাদা বিবেচনা করা যায় না”।

[Our naturalist would likewise be much disturbed as soon as he perceived that the distinctive characters of all the races were highly variable. This fact strikes every one on first beholding the negro slaves in Brazil, who have been imported from all parts of Africa. The same remark holds good with the Polynesians, and with many other races. It may be doubted whether any character can be named which is distinctive of a race and is constant. Savages, even within the limits of the same tribe, are not nearly so uniform in character, as has been often asserted. Hottentot women offer certain peculiarities, more strongly marked than those occurring in any other race, but these are known not to be of constant occurrence. In the several American tribes, colour and hairiness differ considerably; as does colour to a certain degree, and the shape of the features greatly, in the Negroes of Africa. The shape of the skull varies much in some races;[1] and so it is with every other character. Now all naturalists have learnt by dearly-bought experience, how rash it is to attempt to define species by the aid of inconstant characters.” ]    

তাছাড়া তার ভ্রমণ কথা, The Voyage of Beagle এর ৩৮ পৃষ্ঠায় ডারউইন লিখেন, –

“আমি এই কৃষ্ণাঙ্গের মত এমন ভদ্র আর সভ্য লোক দেখি নি, আর তাই এর সাথে বসে খাবার না খেতে পারার দুঃখটা আমার কাছে বেশি মনে হচ্ছিল”।    

[…I did not anywhere meet a more civil and obliging man than this negro; it was therefore the more painful to see that he would not sit down and eat with us.” ]      

তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন যে শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ হবার কারণে একজন সভ্য আর ভদ্র লোকের সাথে উনি খাবার খেতে পারছেন না।  নিগ্রো শব্দটা তখনকার সময়ে প্রচলিত ছিল।

একই বইয়ের ২১তম অধ্যায়ে সব পরিষ্কার হয়ে যায় যখন ডারউইন শপথ করেন তিনি আর কোন এমন দেশে যাবেন না যেখানে দাসত্বপ্রথা আছে, আর ওদের উপর হওয়া নির্যাতনে ডারউইন নিজেকে একজন বাচ্চার মত অসহায় বোধ করেছিলেন, আরও যে তিনি এই নির্যাতন থামানোর জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন-

“১৯ আগষ্ট অবশেষে ব্রাজিল উপকূল আমরা পিছনে ফেলে রেখে এলাম। আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই। আমি আর কখনোই দাস প্রথা প্রচলিত এমন দেশে যাব না। আমি যখন পার্নাম্বুসোর কাছে ঘরের পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম, আমি শুনতে পাচ্ছিলাম কোনো অভাগার আর্তনাদ। আমি নিশ্চিত না হলেও অনুমান করতে পারি কোনো এক ভাগ্যহত দাস নির্যাতিত হচ্ছে। আমার নিজেকে তখন শিশু মনে হচ্ছিল, যে সব বুঝে, শুনে কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারে না। আজকের পরে যদি কখনো কোনো আর্তনাদ দূর থেকে ভেসে আসে, আমার সেই নিপীড়িত দাসের আর্তনাদ আমার কর্ণকুহরে বারবার বেজে উঠবে”।    

[On the 19th of August we finally left the shores of Brazil. I thank God, I shall never again visit a slave-country. To this day, if I hear a distant scream, it recalls with painful vividness my feelings, when passing a house near Pernambuco, I heard the most pitiable moans, and could not but suspect that some poor slave was being tortured, yet knew that I was as powerless as a child even to remonstrate. I suspected that these moans were from a tortured slave, for I was told that this was the case in another instance. Near Rio de Janeiro I lived opposite to an old lady, who kept screws to crush the fingers of her female slaves. I have staid in a house where a young household mulatto, daily and hourly, was reviled, beaten, and persecuted enough to break the spirit of the lowest animal. I have seen a little boy, six or seven years old, struck thrice with a horse-whip (before I could interfere) on his naked head, for having handed me a glass of water not quite clean; I saw his father tremble at a mere glance from his master’s eye.]

উপরের আলোচনা প্রমাণ করে ডারউইন বর্ণবাদকে পছন্দ করতেন না। ১৭ শতকের জন্য এই অবস্থান খুব প্রগতিশীলতার পরিচয়ই দেয়। আব্রাহাম লিংকন যেখানে Emancipation Proclamation দিয়ে দাসত্বপ্রথা বিলুপ্ত করার কাজ শুরু করেন ১৮৬৩ সালে [৩], সেখানে ডারউইনের The Voyage of Beagle প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৩৯ সালে। এ সকল তথ্যাবলি দিয়ে সহজেই অনুমান করা যায় ডারউইন বর্ণবাদি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এর উল্টো, আর তিনি তার ডায়েরি/ভ্রমণ কথায় এই কথা লিখেও রেখেছিলেন যে দাসত্বপ্রথাকে তিনি ঘৃণা করেন।    

এবার দেখা যাক সাজিদ কী বলেছে-

“আপাতদৃষ্টিতে এই কথাগুলোকে “বৈজ্ঞানিক” কথাবার্তা মনে হলেও এই কথাগুলো দ্বারা উৎসাহিত হয়ে মানব-ইতিহাসে ঘটে গেছে এমন কিছু ঘটনা, যার দায় ডারউইনিজম কোনোভাবেই এড়াতে পারে না”।

প্রথমত, এই লাইন দ্বারা প্রমাণ হয় না যে বিবর্তনতত্ত্ব (ধরে নিচ্ছি আরিফ আজাদ সাহেব ডারউইনিজম বলতে বিবর্তনতত্ত্বকেই বুঝিয়েছেন) ভুল। বিবর্তনতত্ত্ব ব্যবহার করে মানুষের প্রাণ বাঁচানো টিকা বানানো হয়, নতুন নতুন ওষুধের এনিমেল ট্রায়াল করার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণীদের সাদৃশ্য। লেখকের হয়ত সেগুলো মাথায় আসে নি, বা আসলেও নিজের মতবাদকে সত্য প্রমাণিত করতে সেগুলোকে অগ্রাহ্য করে গেছেন। একে বলে Arguments from Adverse Consequences। বিবর্তনতত্ত্বের মানব কল্যাণমূলক প্রায়োগিক ব্যবহারকে তারা স্বীকার করেন না, কিন্তু যখন তাদের নিজেদের সঠিক প্রমাণ করার প্রয়োজন তখন ঠিকই উদাহরণ খুঁজে নেন তারা!    

পরবর্তীতে আরিফ আজাদ লিখেন-

“…এই থিওরির বিরুদ্ধে বিজ্ঞানীমহল থেকে নানান ধরণের ক্রিটিসিজম আসলেও সে সম্পর্কে খুব-একটা কনসার্ন নন অ্যাকাডেমিক সাইন্সের হর্তাকর্তারা”।

আমেরিকার ৯৭% বিজ্ঞানী মনে করেন মানুষের আবির্ভাব বিবর্তনের মাধ্যমে হয়েছে। ৩% মনে করেন এমনটা না। [৪] বিজ্ঞান গণতান্ত্রিক না, সবাই যা মনে করে সেটা সত্য নাও হতে পারে। কিন্তু, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ৯৭% বিজ্ঞানী যে তত্ত্বকে জীববৈচিত্র্যের ব্যাখ্যায় একমাত্র গ্রহনযোগ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মনে করেন, আর বাকি ৩% ভাবেন মানুষের সৃষ্টি হয়েছে অলৌকিকভাবে, এদের মধ্যে কোন পক্ষের দাবিটা বেশি বিজ্ঞানসম্মত আর গ্রহনযোগ্য হবে? বিজ্ঞানী মহলে ক্রিটিসিজম বলতে আজাদ বুঝিয়েছেন ডিসকভারি ইনসটিটিউটের “ডিসেন্ট ফ্রম ডারউইনিজম” [৫] প্রজেক্টের ৭০০ “বিজ্ঞানীর” কথা। আজাদ হয়ত জানেন না যে এর প্যারোডি হিসেবে প্রজেক্ট স্টিভ নামে একটা প্রজেক্ট আছে যেখানে, জানুয়ারী ২০১৯ পর্যন্ত, ১৪৩৫ জন বিজ্ঞানী যাদের নামের আগে স্টিভ বা স্টিফেন আছে, তারা ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। [৬]  

আরিফ আজাদ কিছুদিন আগে তার একটা পোস্টে এই “বস্তুবাদি বিজ্ঞানীদের” গবেষণার উপর ভিত্তি করে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর “তেঁতুল” বিবৃতিকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন! [৭] মানে, আমার যখন দরকার তখন বিজ্ঞান বস্তুবাদি, যখন দরকার তখন বিজ্ঞান গ্রহণযোগ্য?? বাহ! সখী হিপোক্রেসি কাহাকে বলে! তার পোস্টটি তথ্যসূত্র থেকে খুঁজে নিতে পারেন।

আজাদ লিখেছেন মাইকেল বেহের (মাইকেল বিহি?) কথা! মাইকেল বিহি হ্রাস অযোগ্য জটিলতা নামের একটা গোঁজামিল দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাণী বৈচিত্র্য আসা সম্ভব না! কীটজ মিলার বনাম ডোভার এরিয়া স্কুল ডিস্ট্রিক্টের [৮] একটা মামলায় আদালতে জীববিজ্ঞানী কেনেথ মিলার হ্রাস অযোগ্য জটিলতার যুক্তিকে ভুল প্রমাণিত করেছেন। মামলার রায়ে বলা হয়েছে বিহি আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের “ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন” বিজ্ঞান না, আর তাই এটিকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। বিহি শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নেন যে-

“আমাদের হাতে যেমন কোনো পিয়ার রিভিউড আর্টিকেল নেই, একইভাবে কোনো জোড়ালো প্রমাণ নেই; যা থেকে আমরা বলতে পারি ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন জৈববৈজ্ঞানিক ব্যবস্থায় কিভাবে ক্রিয়াশীল হয় বা কাজ করে।.” [৯]    

আজাদ চাচ্ছেন বিজ্ঞানী সমাজ এই বিহি আর তার মতাদর্শীদের ব্যাপারে কনসার্নড হবে?? যে লোক তার জীবনভর একটা জিনিস বলে গেল, কিন্তু মোক্ষম সময়ে তার কোন প্রমাণ হাজির করতে পারলো না, তাকে বিজ্ঞানীমহল যারা কিনা প্রমাণ ছাড়া কোন কিছুকেই গ্রাহ্য করেন না, তারা উনাকে সমান সম্মান দিবে?? বিজ্ঞানীমহল না সাজিদের আলম ভাইয়ের চায়ের দোকান??

হিটলার কি নাস্তিক ছিলেন?

আরিফ আজাদ লিখেন-

“…ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও হিটলার হয়ে ওঠে একজন বিধ্বংসী নাস্তিক”।

এই তথ্যের কোন সূত্র আজাদ দেন নি। অথচ এর বিপরীতটা প্রমাণ করার মত যথেষ্ট তথ্য আছে, হিটলার একজন ক্যাথলিক ছিল। মাইন ক্যাম্ফে হিটলার লিখেছে-    

“তাই, আজ আমি মনে করি আমি মহান স্রষ্টার ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করছি; ইহুদীদের থেকে নিজেকে বাঁচানোর মধ্যে দিয়ে, আমি স্রষ্টার দেখানো কাজই করছি”। (৬৫)    

[Hence today I believe that I am acting in accordance with the will of the Almighty Creator: by defending myself against the Jew, I am fighting for the work of the Lord. (p. 65)]    

ডাউনলোড লিঙ্ক mein kampf
উপরের বইতে ৫৯ পৃষ্ঠাতে পাবেন

“তার (ইহুদীর) জীবন এই জগতের, তার আত্মার সাথে খ্রিষ্ট ধর্মের দুরত্ব ২০০০ বছর পূর্বে আসা যিশু খ্রিষ্টের প্রতি তখনকার ইহুদীদের দুরত্বের সমানই। অবশ্য, যিশু ইহুদীদের ব্যাপারে তার মনোভাব গুপ্ত করেন নি, এবং প্রয়োজনে তিনি ওদের চাবকে প্রভুর জমিন থেকে বিতাড়িত করেছেন এই মানবতার শত্রুদের যারা ধর্মকে ব্যবসা ছাড়া অন্য কিছু বিবেচনা করেনি। এর বিনিময়ে খ্রিষ্টকে ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যা করেছিল তারা, আর এখন আমাদের বর্তমানের খ্রিষ্টান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নিচে নামিয়ে ইহুদীদের কাছ থেকে ভোট ভিক্ষা করেন আর পরে এই নাস্তিক্যবাদি ইহুদীদের সাথে নিজেদের রাজনীতি মিশিয়ে নেন- আর নিজের দেশের সাথে বেঈমানি করেন”। (৩০৭)    

[His [the Jewish person’s] life is only of this world, and his spirit is inwardly as alien to true Christianity as his nature two thousand years previous was to the great founder of the new doctrine. Of course, the latter made no secret of his attitude toward the Jewish people, and when necessary he even took to the whip to drive from the temple of the Lord this adversary of all humanity, who then as always saw in religion nothing but an instrument for his business existence. In retum, Christ was nailed to the cross, while our present-day party Christians debase themselves to begging for Jewish votes at elections and later try to arrange political swindles with atheistic Jewish parties — and this against their own nation. (p. 307)]    

“যে-ই প্রভুর মহত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে সে মহান স্রষ্টার বিরুদ্ধে পাপ করে, আর স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণকে প্রভাবিত করে”। (৩৮৩)    

[Anyone who dares to lay hands on the highest image of the Lord commits sacrilege against the benevolent creator of this miracle and contributes to the expulsion from paradise. (p. 383)]    

“সাধারন মননের লোকেদের, বিশেষত, একটা পবিত্র দায়িত্ব আছে…তাদের নিজের অবস্থান থেকে স্রষ্টার ব্যাপারে কটুক্তি করানো বন্ধ করানোর ব্যবস্থা নেয়ার, আর স্রষ্টার ইচ্ছাকে পূরণ করার, আর স্রষ্টার কথার বিকৃতি বন্ধে কাজ করার। কারণ স্রষ্টার ইচ্ছা মানুষকে তার জীবন দেয়, তার ক্ষমতা আর অস্তিত্ব দেয়। যদি কেউ স্রষ্টার কাজে বাধা দেয়, সে স্রষ্টার সৃষ্টির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছে আর স্রষ্টার ঐশ্বরিক ইচ্ছাকে অমান্য করেছে”। (৫৬২)    

[The folkish-minded man, in particular, has the sacred duty, each in his own denomination, of making people stop just talking superficially of God’s will, and actually fulfill God’s will, and not let God’s word be desecrated. For God’s will gave men their form, their essence and their abilities. Anyone who destroys His work is declaring war on the Lord’s creation, the divine will. (p. 562)]    

জার্মানির চ্যান্সেলার হয়ে হিটলার তার ভাষণে (১৯৩৩) বলে-    

প্রভু যেন আমাদের আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য তার আশীর্বাদ দেন, তার ঐশ্বরিক জ্ঞান দিয়ে আমাদের বোধকে বাড়িয়ে দেন, আর জনগণের মধ্যে আমাদের জন্য আস্থা সৃষ্টি করেন, কারণ আমরা নিজেদের জন্য লড়ছি না, আমরা লড়ছি জার্মানির জন্যে”।    

[May God Almighty give our work His blessing, strengthen our purpose, and endow us with wisdom and the trust of our people, for we are fighting not for ourselves but for Germany.] [১০]

আরো অন্যান্য ভাষণে-

“…আমাদের এই আন্দোলনের মূলনীতি, একটা বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা যায়- “প্রভু তাদের সাহায্য করেন যারা নিজেদের সাহায্য করে”…বাক্যটা শুধু একটা ধর্মভীরু বাক্যই না, এটা একটা ন্যায়সঙ্গত বাক্য। কারণ আমরা ধরে নিতে পারি না প্রভু ভীতু আর অলসদের সাহায্য করার জন্য আছেন আর যারা ভাবে প্রভু দূর্বলের দূর্বলতাকে প্রশমিত করার জন্য আছেন। প্রভু এদের পক্ষে নাই। তিনি সবসময়, সকল সময়, তাদের আশীর্বাদ করেছেন যারা নিজেদের লড়াই নিজেরা করতে পারে”।    

[The conception of the new Movement, whose fundamentals can be expressed in a single sentence: “The Lord helps those who help themselves,” opposed this. That is not only a very pious phrase, but a very just one. For one cannot assume that God exists to help people who are too cowardly and too lazy to help themselves and think that God exists only to make up for the weakness of mankind. He does not exist for that purpose. He has always, at all times, blessed only those who were prepared to fight their own battles]. [১১]    

“কিন্তু যারা “প্রভু” শব্দটাকে এমন নিধার্মিক কারণে ব্যবহার করে তারা ঐশ্বরিক আইনের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি করে, আর আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তার ধ্বংস ছাড়া আর কোন গন্তব্য নাই”।    

[But he who dares to use the word “God” for such devilish activity blasphemes against Providence and, according to our belief, he cannot end except in destruction.] [১২]    

প্রভু কখনো অলসদের সাহায্য করেন নি। না সাহায্য করেছেন ভীতুদের। তিনি তাদের সাথে নাই যারা নিজের কাজ নিজে করতে পারে না। এখানে মূলনীতি হচ্ছে- নিজেদের সাহায্য কর, প্রভুও তোমাদের সাহায্য করতে অস্বীকার করবেন না”।    

[The Lord God has never helped the lazy person. Nor does He help the coward. He will never help him who is not ready to help himself. Here the principle applies: Volk, help yourself, then the Lord God will not refuse you His assistance either.] [১৩]    

আর ব্যক্তিগত আলাপে-    

আমি এখনও, আগের মত, ক্যাথলিক আছি আর সারাজীবনই থাকবো।    

[I am now as before a Catholic and will always remain so.] [১৪]    

আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, আর আমি নিশ্চিত যে তিনি নিজের পৃথিবীতে নিজের অধিকার আদায়ে কাজ করা ৬৭ মিলিয়ন জার্মানকে নিরুৎসাহিত করবেন না।    

[I believe in God, and I am convinced that He will not desert 67 million Germans who have worked so hard to regain their rightful position in the world.] [১৫]    

এবারে বলুন তো, নাৎসি মতাদর্শ এবং হিটলার নাস্তিক হয়ে থাকলে, তাদের সরকারী বেল্টে কীভাবে ঈশ্বরের নাম খোদাই করা থাকে?

নাৎসী বাহিনীর ব্যবহৃত বেল্ট
Gott mit uns যার বাঙলা হচ্ছে, ঈশ্বর আমাদের সাথে আছেন

উপরে দেখুন নাৎসী বাহিনীর সদদের বেল্টে ঈশ্বরের নাম খোদাই করা। নাস্তিক হিটলার তো দেখি উঠতে বসতে গড আর লর্ডের বন্যা বসিয়ে দিত দেখছি! আসুন শুনি “নাস্তিক” আর “ডারউইন ভক্ত” হিটলার তার বইয়ে ডারউইনের নাম কতবার ব্যবহার করেছে?

শূন্য (০) বার।    

এবার সাজিদের ডায়েরিতে দেখা যাক- সাজিদ সার্ভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্ট নামক ধারনাকে  ডারউইনের তত্ত্বের সাথে মিলাতে চেয়েছে। আর প্রমাণ করতে চেয়েছে সোশ্যাল ডারউইনিজম হিটলারকে প্রভাবিত করেছিল। ভাল কথা! সোশ্যাল ডারউইনিজম কথাটার আবিষ্কারক হার্বার্ট স্পেনসার, আর সার্ভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্টও তারই আবিষ্কার।[১৬] 

ডারউইনের বইয়ের কোথাও সার্ভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্ট লেখা নাই। এমন কি বিবর্তনের ব্যাপারে একটা ভুল ধারণা এটা। সার্ভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্ট না, সার্ভাইভাল অফ দ্যা ফিট এনাফ। [১৭]    

হিটলারের বই থেকে কয়েকটা উক্তি সাজিদের মাধ্যমে আরিফ আজাদ  ব্যবহার করেছেন, যা দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন হিটলার ডারউইনের কাছ থেকে উচ্চ বর্ণের লোক আর নিচু বর্ণের লোকের ধারণা পেয়েছেন। প্রথম উক্তিটি হিটলারের বইয়ের প্রথম খণ্ড, অধ্যায় ১১ থেকে নেয়া। আরিফ আজাদ  সাহেব খুব সম্ভবত পুরো অধ্যায় পড়ে দেখেন নি! কারণ ঠিক এর এক অনুচ্ছেদ পরেই লেখা আছে-    

“দুই বর্ণের মধ্যে প্রজননের ফলে যেটা ঘটে তা হচ্ছে-    

অ) উচ্চ বর্ণের মান কমায়।    

আ) বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক পতন, আর ধীর কিন্তু অবশ্যম্ভাবী অসুস্থততার শুরু।    

এমন বংশবিস্তার, তবে, স্রষ্টার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাপাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এমন পাপের যোগ্য পুরষ্কার ওদের প্রাপ্য”।    

[The result of all racial crossing is therefore in brief always the following:    

(a) Lowering of the level of the higher race;    

(b) Physical and intellectual regression and hence the beginning of a slowly but surely progressing sickness.    

To bring about such a development is, then, nothing else but to sin against the will of the eternal creator. And as a sin this act is rewarded.]    

এটা তার চোখ এড়িয়ে গেছে!    

এবারে দেখি  Deuteronomy 7:3–4 এর মিল পাওয়া যায় কি না-    

#৩. তাদের মধ্যে কাউকে বিয়ে করো না এবং তোমাদের ছেলেমেয়েরাও য়েন ঐসব অন্য জাতির কাউকে বিয়ে না করে।    

#৪ কারণ, ঐ সমস্ত লোকরা তোমাদের সন্তানদের আমাকে অনুসরণ করা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে।  তখন তোমাদের সন্তানরা অন্য দেবতাদের পূজা করবে এবং প্রভু তোমাদের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হবেন। তিনি তোমাদের খুব তাড়াতাড়ি ধ্বংস করে দেবেন।    

[#3 You shall not intermarry with them, giving your daughters to their sons or taking their daughters for your sons,    

#4. for they would turn away your sons from following me, to serve other gods.  Then the anger of the LORD would be kindled against you, and he would destroy you quickly.] [১৮]    

খাপে খাপ! ডারউইন তো বলেন নি নিজের বর্ণের বাইরে বিয়ে করা যাবে না, গড বলছেন! ডারউইন তো গডের স্বীকৃত দাসপ্রথাকেও অমানবিক বলেছিলেন। আজব! নাস্তিকের কথাবার্তা দেখি ওল্ড টেস্টামেন্টের গডের সাথে মিলে যায়!    

পরের অনুচ্ছেদে হিটলার লিখেছে- “প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে মানুষের চেষ্টা যার উপরে মানুষের নিজের অস্তিত্ব টিকে আছে, তাকে প্রকৃতির সে সকল মূলনীতির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রকৃতির এমন আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষ নিজের ধ্বংসের কাছে চলে যায়।”  

[Man’s effort to build up something that contradicts the iron logic of Nature brings him into conflict with those principles to which he himself exclusively owes his own existence. By acting against the laws of Nature he prepares the way that leads to his ruin.”]    

মানে- নির্ধারিত বর্ণ বা প্রকৃতির বাইরে মানুষ কিছু জন্ম দিয়ে নিজের ধ্বংসই ডেকে আনে। অথচ উপরে  ডারউইনের বিগলযাত্রার লেখায় আমরা দেখেছি-    

“It may be doubted whether any character can be named which is distinctive of a race and is constant. Savages, even within the limits of the same tribe, are not nearly so uniform in character, as has been often asserted.”    

মানে, মানুষের “বর্ণ” আলাদা হিসেবে দেখার জন্য যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে নির্ধারিত করা হয়েছে সেগুলো কি আসলেই নির্দিষ্ট কোন বর্ণের বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা যায়- সে বিষয়ে ডারউইন সন্দেহ পোষন করেছেন।    

কেমন ডারউইন ভক্ত নাস্তিক রে বাবা!    

এখানে আরেকটা কথা না বললেই নয়, সাজিদের ডায়েরিতে লেখা হিটলারের বইয়ের যে দুটি অনুচ্ছেদ আরিফ আজাদ একসাথে লিখেছেন তার মাঝে আমাদের উপরের আলোচনার সবগুলো উক্তিই আছে। এমন কি হতে পারে, আরিফ আজাদ  ইচ্ছা করেই মাঝের লাইনগুলো বাদ দিয়েছেন??    

সাজিদ জানতে চাচ্ছে এখানে ন্যাচার বলতে হিটলার কি ন্যাচারাল সিলেকশন বুঝিয়েছে কি না। এটা বুঝতে গেলে আমাদের আবার যেতে হবে সাজিদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের বাক্যটির ঠিক আগের বাক্যে-

“সকল সভ্যতার অবক্ষয় শুরু হয়েছে রক্তের মিশ্রণের ফলে, তাদের পতন হয়েছে শুরুর দিকের সৃজনশীল লোকেদের রক্তের সাথে অন্যদের রক্ত মিশে নতুন বংশধরের জন্মের ফলে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ প্রাকৃতিক আইনের লঙ্ঘন করেছে। ঐতিহ্য মানুষের উপর নির্ভর করে, মানুষ ঐতিহ্যের উপর না। মানে, প্রত্যেকটা সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সভ্যতার স্থপতিদের রক্তকে বংশধরের মাধ্যমে সংরক্ষিত করা”।    

[All the great civilizations of the past became decadent because the originally creative race died out, as a result of contamination of the blood.     The most profound cause of such a decline is to be found in the fact that the people ignored the principle that all culture depends on men, and not the reverse. In other words, in order to preserve a certain culture, the type of manhood that creates such a culture must be preserved.”]    

হিটলার লিখেছে যত উন্নত সভ্যতা আছে তাদের পতন হয়েছে বিভিন্ন জাতির রক্তের মিশ্রণের ফলে, আর মানুষ বারবার ভুলে যায় যে সংস্কৃতি মানুষের উপর নির্ভরশীল। আর একটা ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে যারা সেই ঐতিহ্যের শুরু করেছিল তাদের রক্তকে বিশুদ্ধ রাখতে হবে। আর এর পরের লাইন হচ্ছে –

“কিন্তু এমন সংরক্ষণের মানে দাঁড়ায় দূর্বলদের উপর সবলদের কর্তৃত্ব, আর সবলদেরই আছে টিকে থাকার অধিকার”।    

But such a preservation goes hand-in-hand with the inexorable law that it is the strongest and the best who must triumph and that they have the right to endure.”    

মানে, ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে শক্তিমানদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। আবারও মনে করিয়ে দেই, ডারউইনের বিগলযাত্রায় প্রাপ্ত মানুষদের নির্ধারিত বর্ণে ফেলার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার কথা। [১৯]    

তাছাড়া প্রাকৃতিক নির্বাচন নামটার মধ্যেই আছে “প্রাকৃতিক” নির্বাচন। হিটলারকে যদি আরিফ আজাদ  প্রকৃতি মনে করেন, তার কোন জবাব দেওয়া এই জগতের কোন লোকের পক্ষে সম্ভব না।

Der Grossmufti von Palästina vom Führer empfangen.
Der Führer empfing in Gegenwart des Reichsministers des Auswärtigen von Ribbentrop den Grossmufti von Palästina, Sayid Amin al Husseini, zu einer herzlichen und für die Zukunft der arabischen Länder bedeutungsvollen Unterredung.
9.12.41 Presse Hoffmann

আচ্ছা বলতে পারেন, হিটলারের সাথে জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি (১৯২১-১৯৪৮) আমিন আল হুসেইনির [২০] কি কাজ ছিল? হুসেইনি, যিনি নিজেকে নবী মুহাম্মদের বংশধর দাবি করেন, তিনি কেন হিটলারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন, কেউ বলতে পারেন? কেন তিনি হিটলারের সাথে মিলে ইহুদীদের ইউরোপে এবং ইউরোপের বাইরে লড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? [২১] ষাট লক্ষ ইহুদী মারায় কি মুফতিও জড়িত ছিলেন?    

হিটলারের বাহিনীর কাছে সরাসরি নির্দেশ ছিল ডারউইনের বই, আর হেকেলের বই পোড়ানোর।[২২] ডারউইনের একনিষ্ঠ ভক্ত কেন চেয়েছেন ডারউইনের বই পোড়াতে, সেটা নিশ্চয় সাজিদ আমাদের জানাবে!    

এরপরে তো সাজিদ ডারউইনের তত্ত্বকে খারাপ বলে প্রমাণ করার সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেল! মার্ক্সবাদের সাথে বিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজে বের করে ফেললো সে! মার্ক্সবাদ একটা আর্থ-সামাজিক ধারণা, আর মানুষ যেহেতু বিবর্তনের মাধ্যমে আসে সামাজিক প্রাণী সেহেতু মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের সাথেই বিবর্তনের বোধ জড়িত থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।    

সমাজবিজ্ঞানের সাথেও বিবর্তনের সম্পর্ক আছে, ভাষাতত্ত্বের সাথেও আছে। মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস না জেনে সমাজবিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, এমনকি ধর্মকেও পুরোপুরি বুঝা সম্ভব না। আর মার্ক্সবাদও তো মানুষের সামাজিক অবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। মার্ক্সবাদ কি আদৌ বৈজ্ঞানিক সেটা নিয়ে বাংলায় অভিজিৎ রায়ের দূর্দান্ত একটা বিশ্লেষণমূলক লেখা রয়েছে। [২৩]    

সাজিদ লিখেছে- স্টালিনও ডারউইন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সে ডারউইনের লেখা পড়ে নাস্তিক হয়েছে! হলো! সমস্যা তো কিছু নাই! স্টালিন ডারউইনের লেখা পড়ে নাস্তিক হয়েছে, কিন্তু কম্যুনিজমের মত একটা অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে সামনে রেখে সে দেশ শাসন করতে গিয়ে নিজেকে কাল্ট নেতা বানিয়ে বসেছিল! সে অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে পূঁজি করে সে মানুষ হত্যা করেছিল, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, লেখক, মিউজিশিয়ান, সবাইকে একাধারে হত্যা করেছিল। কৃষকদের হত্যা করেছিল। অতঃপর সে যখন অসুস্থ হয়ে পরে তখন দেখানোর মত কোন ডাক্তার পাওয়া না যাওায় তার অবস্থার অবনতি হয় আর সে মারা যায়।    

স্টালিনের ইতিহাসের সাথে, বা হিটলারের ইতিহাসের সাথে বিবর্তনের সম্পর্ক কী! হিটলারের ব্যাপারে আলোচনাও সভ্য দেশে নিষিদ্ধ, সেখানে হিটলারের ইতিহাস পড়াবে এমন আশা করা বোকামির নামান্তর।    

“Nothing in Biology makes sense except the light of evolution” উক্তিটির জনক, Theodosius Dobzhansky একজন অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ছিলেন। [২৪] তিনি বিবর্তন পড়ে, জেনে, বুঝেও খ্রিষ্টান থেকেছেন। স্টালিনের বিবর্তন বুঝে নাস্তিক হওয়া যেমন তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল, তেমনি Theodosius Dobzhansky’র খ্রিষ্টান থাকাও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

অবশেষে আরিফ আজাদ সাজিদকে ঘোষনা দিলেন আইনস্টাইন বলে। আচ্ছা, আইনস্টাইনের সমীকরণ ব্যবহার করে যে পারমাণবিক বোমা বানানো হলো, এখন কি আমরা আজাদের আইনস্টাইন- সাজিদকে দোষ দিতে পারি হিরোশিমা নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞের জন্য? বা আসল আইনস্টাইনকে?    

পারি না, কারণ আইনস্টাইন বলে দেন নি বোমা বানাও। আইনস্টাইনের সেই একই সমীকরণ দিয়ে PET Scan, MRI Scan ইত্যাদি সম্ভব হয়েছে। স্যাটেলাইটের জ্বালানী হিসেবে থাকা প্লুটোনিয়ামের মত মৌল ব্যবহার করে আমরা মোবাইল থেকে শুরু করে টিভি পর্যন্ত দেখি কারণ E=mc^2 ব্যবহার করে আমরা সেই শক্তিকে ব্যবহার করার উপায় বের করেছি। LHC, Laser এগুলোও এই সমীকরণের ফসল।    

একইভাবে বিবর্তনের ভাল প্রায়োগিক, মানবকল্যাণমূলক ব্যবহার না দেখে শুধু খারাপটা খুঁজে বেড়ানো, আর সেটা প্রমাণ করতে মিথ্যাচার করা খুবই গর্হিত কাজ।

এবারে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় উল্লেখ করেই লেখাটি শেষ করছি। হিটলার কী নাস্তিক ছিলেন, নাকি ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদের খুব বড় মাপের ভক্ত ছিলেন? হযরত মুহাম্মদ এবং সলাম সম্পর্কে প্রশংসা করে মানব ইতিহাসের সবচাইতে বড় গণহত্যাকারী এবং ভয়ঙ্কর শাসক হিটলার কী বলেছিলেন?

-দেখো, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের ভুল ধর্মটি রয়েছে। আমাদের কেন জাপানিদের ধর্মটি নেই? যেই ধর্মে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের নিয়ম আছে? খ্রিষ্ট ধর্মের চাইতে মুহাম্মদের ধর্মটাও আমাদের জন্য যথার্থ ছিল। কেন আমাদের এত বিনয়ী এবং দুর্বলতার সাথে খ্রিস্টান হতে হবে?
– এডলফ হিটলার

“You see, it’s been our misfortune to have the wrong religion. Why didn’t we have the religion of the Japanese, who regard sacrifice for the Fatherland as the highest good? The Mohammedan religion too would have been more compatible to us than Christianity. Why did it have to be Christianity with its meekness and flabbiness?”
– Adolf Hitler [২৬]

পাঠকরা এই ভিডিওটি দেখতে পারেন:

তথ্যসূত্রঃ  

১) Capitalization: The Major Words in The Titles Of Books, Articles, and Songs. (2017, April 07)
২) Carolus Linnaeus. (n.d.)
৩) Emancipation Proclamation. (2019, January 19)
) Section 5: Evolution, Climate Change and Other Issues. (2018, September 18).
) A Scientific Dissent from Darwinism 
) Project Steve
) List of Steves 
https://www.facebook.com/arifazad.official/posts/714656092038886  
) The Trial of Kitzmiller v. Dover. (n.d.) 
০) Kitzmiller v. Dover Area School District. (n.d.)
১) Speech delivered at Berlin, 1 February 1933; from Adolf Hitler (1941). My New Order. New York: Reynal & Hitchcock. p. 147.
২) Speech in Munich 24 February 1941; Franklin Watts, ed. (1942). Voices of History: Great Speeches and Papers of the Year. New York: Franklin Watts, Inc., p. 98.
৩) Speech before the Reichstag 4 May 1941; Franklin Watts, ed. (1942). Voices of History: Great Speeches and Papers of the Year. New York: Franklin Watts, Inc., p. 211.
৪) Speech 9 October 1941; Max Domarus, ed. (2004). Speeches and proclamations, 1932-1945, Wauconda IL: Bolchazy-Carducci Publishers, p. 2496
৫) Adolf Hitler in 1941 to General Gerhard Engel. In John Toland (1992). Adolf Hitler. New York: Anchor Publishing, p. 507.
৬) Statement to Ward Price. In Max Domarus (2007). The Essential Hitler: Speeches and Commentary. Wauconda: Bolchazy-Carducci Publishers, p. 21.
৭) Herbert Spencer, The Principles of Biology, Vol. I
৮) Survival of the “fit enough” (n.d.).
৯) Deuteronomy. (1991). In Deuteronomy. Grand Rapids (Mich.): Wm. B. Eerdmans. 7:3-4
০) Darwin, C., Huxley, T. H., & Stebbing, T. R. R. (1885). The descent of man, and selection in relation to sex. London: John Murray.
১) Amin al-Husseini. (2019, February 21)
২) Documents on German Foreign Policy 1918–1945, Series D, Vol XIII, London, 1964, p. 881 Akten zur deutschen auswärtigen Politik, Series D, Vol. XIII, 2, No. 515 Hitlers Weisungen für die Kriegführung 1939–1945, ed. by Walther Hubatsch (Frankfurt: Bernard und Graefe, 1962) pp. 129–39
৩) Guidelines from The Library
৪) রায়, অভিজিৎ. (2008, September 4). মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান?
২৫)  Dobzhansky, Theodosius (March 1973), “Nothing in Biology Makes Sense Except in the Light of Evolution”, American Biology Teacher, 35 (3): 125–129, JSTOR 4444260; reprinted in Zetterberg, J. Peter, ed. (1983), Evolution versus Creationism, Phoenix, Arizona: ORYX Press
২৬) Speer, Albert (1971). Inside the Third Reich. Trans. Richard Winston, Clara Winston, Eugene Davidson. New York: Macmillan, p. 143; Reprinted in 1997. Inside the Third Reich: Memoirs. New York: Simon and Schuster. p. 96.ISBN 978-0-684-82949-4.

লেখক: সাজিদের প্রোফেসর

Facebook Comments

12 thoughts on “প্যারাডক্সিকাল সাজিদ ২: গল্পে জল্পে আরিফ আজাদের মূর্খতা

  • March 2, 2019 at 6:18 pm
    Permalink

    কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভেতরে সবারই সমান রাঙা, এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের না, আব্দুল কাদিরের কবিতা।।।

    Reply
    • March 3, 2019 at 6:37 am
      Permalink

      সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা । প্রথম থেকে আবার পড়ে দেখেন

      Reply
  • March 14, 2019 at 4:41 pm
    Permalink

    লিখার জবাব লিখার মাধ্যমে হোক ব্রাদার,,,
    একটা বই লিখেন যাতে সত্য উন্মোচন হয়, আর অবশ্যই আরিফ আজাদের মূর্খ্যতার সঠিক জবাব দিয়ে,, যদি লোকটা একটু শিক্ষা অর্জন করে।

    Reply
    • April 2, 2019 at 10:50 am
      Permalink

      বই লেখতে গেলেতো চাপাতি পরবে গলায়। কেউ পরেই দেখবে না এই বই। না পরেই অনেকে কাফের কাফের বলে চিল্লাবে।

      Reply
  • May 1, 2019 at 2:45 am
    Permalink

    আরিফ আজাদের দুইএকটা বানান ভূল নিয়াও তার মূর্খতার প্রমান করে।
    এই আবাক চোদা ভাবে যুক্তি ভাংগানোর কোনো মানি হয় না।
    আবার এইগুলা নিয়া বড় বড় কথা। আবাল চোদা নাস্তিক।

    Reply
  • July 13, 2019 at 3:57 pm
    Permalink

    শুধু একটি ভুল রেফারেন্স ছাড়া সবই ঠিক আছে । অভিজিত রায়ের ‘মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান’ নামক একটি বিতর্কিত লেখাকে রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণ করেছেন, এবং অবশ্যই সেটা আপনার অধিকার । তবে আমার কিছু বক্তব্য আছে, আমার প্রবন্ধের কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি ঃ অভিজিতের লেখার শক্তিশালী দিকটি হচ্ছে, শানিত যুক্তির সাবলীল উপস্থাপন; এবং কালজয়ী বিজ্ঞানী, সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, হিউম্যামিস্ট প্রমুখের বিখ্যাত তত্ত্ব, ডকট্রিন, নীতি বা কনসেপ্টের দক্ষ উপস্থাপন বা রেফারেন্স প্রবন্ধে অন্তর্ভুক্তকরণ- যুক্তি বা বিশ্লেষণ অনুযায়ী যথাস্থানে । তবে, সেটি করতে গিয়ে তিনি অনেক সময় (অভিজিতের প্রবন্ধের দুর্বল দিকগুলি ঃ ) ১) তাঁর প্রবন্ধের আলোচনাকে অগভীর বা ভাসাভাসা করে ফেলেছেন অথবা প্রবন্ধের মৌলিকতাকে ধ্বংস করেছেন; এবং ২) যত্রতত্র কোন বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক বা দার্শনিকের মতবাদ বা আপাত তত্ত্বের রেফারেন্স দিয়েছেন, ওসব তত্ত্ব বা মতবাদের কিংবা নীতির পেছেনে যে প্রেক্ষাপট, পর্যবেক্ষণ বা অভিজ্ঞতা, শানে-নুযুল কাজ করেছে, সেগুলি সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা না দিয়ে এবং যে সময়টিতে এসব মতবাদ বা তত্ত্ব প্রণিত হয়েছিল, তা হিসেবে না ধরা । ৩) অভিজিত প্রায়ই মার্ক্সের কোন ব্যক্তিগত মন্তব্য বা সাধারণ বিবৃতিকে তত্ত্বের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন । দৃষ্টান্তস্বরুপ, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো থেকে বাছবিচারহীন রেফারেন্স দেয়া । কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো ছিল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা, যা প্রলেতারিয়েতকে উদ্বুদ্ধ করা এবং জাগিয়ে তোলার জন্য প্রণিত হয়েছিল-এটি কোন তাত্ত্বিক-একাডেমিক আলোচনা প্রসূত প্রবন্ধ ছিল না । অথচ, অভিজিত, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর অনেক বিবৃতি ও ভবিষ্যদ্বাণীকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের স্ট্যান্ডার্ড বা পরিমাপে বিচার করতে গিয়ে ভুলভাবে “তত্ত্ব” বলে বুঝতে ভুল করেছেন । 8) যে কার্ল পপারের ফলসিফায়েবিলিটি(বাতিলযোগ্যতা) ডক্‌ট্রিন অনুসরণ করে অভিজিত বাবু মার্ক্সবাদী সমাজতত্ত্বকে ভুল বা ধর্ম বলে প্রমাণ করে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন, তিনি ছিলেন পূজিবাদী আদর্শের একজন কট্টর সমর্থক(প্রমাণঃ তাঁর “The Open Society and Its Enemy”) এবং মার্ক্সের প্রতি ঈর্ষাকাতর এবং বিদ্বেষপরায়ন(প্রমাণ এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের ততোধিক বিতর্কিত একটি হাইপোথিসিসকে(ফলসিফায়েবিলিটি) তিনি টুল(হাতিয়ার) হিসেবে বেছে নিয়েছেন মার্ক্সবাদকে অবিজ্ঞান প্রমাণ করার জন্য । অথচ, পপারের তথাকথিত বাতিলযোগ্যতা যাকে পপারের অন্ধ অনুসারীরা বিজ্ঞানকে ছদ্মবিজ্ঞান থেকে পৃথক করার (ডিমার্কেশন) উপায় বলে বিশ্বাস করেছেন, সেটিকে প্রখ্যাত ‘গণিত, বিজ্ঞান, জ্ঞানতত্ত্বের (হাঙ্গেরীয়) দার্শনিক লেম্‌র্‌ লাকাটোস(যিনি ‘বিজ্ঞান গবেষণা প্রোগ্রামের জন্য’ “রিসার্চ প্রোগ্রাম” নামে সুপরিচিত মেথডলজী উদ্ভাবন করেছেন পপারের “কাঁচা বাতিলযোগ্যতা”-এর ত্রুটি সংশোধনে), ডুহেম(ফরাসী পদার্থবিদ, গণিতবিদ এবং বিজ্ঞানের দার্শনিক), কোয়াইন(মার্কিন দার্শনিক এবং যুক্তিবিদ) থোমাস কু’ন(মার্কিন পদার্থবিদ, ইতিহাসবিদ এবং বিজ্ঞানের দার্শনিক), এল্যান সোকাল(পদার্থবিদ, গণিতবিদ, বিজ্ঞানের দার্শনিক; উত্তরাধুনিকতাবাদের সমালোচক) এবং জিন ব্রিকমন্ট(তত্ত্বীয় পদার্থবিদ এবং বিজ্ঞানের দার্শনিক)প্রমুখগণ যে “কাঁচা বাতিলযোগ্যতাবাদ” বলে মূল্যায়ন করে সূত্রটির মারাত্মক ত্রুটি ও দুর্বলতাগুলি সংশোধনকল্পে যে আলোচনা কিংবা সমালোচনা এবং সমাধান(যথাঃ-সোফিস্টিকেটেড ফলসিফিকেশন, ডুহেম-কোয়াইন থিসিস, রিসার্চ প্রোগ্রাম প্রভৃতি) উপস্থিত করেছেন, সেসব অভিজিত রায় সম্পূর্ণভাবে চেপে গেছেন বা নীরব থেকেছেন । (চলছে পরবর্তী বক্সে)

    Reply
  • July 13, 2019 at 4:00 pm
    Permalink

    (চলছে উপরের বক্স থেকে) উক্ত পণ্ডিতদের(যাদের বেশীরভাগই পাশ্চাত্যের বিভিন্ন নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বা প্রফেসর) এসব সমাধান(পপারের বিজ্ঞানের দর্শনের বিকল্প হিসেবে) সম্পর্কে অভিজিত অবহিত ছিলেন না আমি সেটা বিশ্বাস করিনা । এটা কি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা(Intellectual Dishonesty) নয় ? এবং ৫) বিজ্ঞানের দার্শনিক কার্ল পপারের কাঁচা ফলসিফায়েবিলিটি নীতিকে আক্ষরিকভাবে প্রয়োগ করে মার্ক্সবাদের কিছু তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন । সেক্ষেত্রে খেয়াল করেননি যে, পপারের নীতির মধ্যে ত্রুটি থাকতে পারে এবং যিনি পর্যবেক্ষণ কিংবা পরীক্ষণ সম্পাদনা করেছেন কোন তত্ত্বের কোন প্রেডিক্‌শন বা প্রত্যাশিত ফলাফল যাচাই করার জন্য, তার পর্যবেক্ষণে বা পরীক্ষণে অসম্পূর্ণতা বা ত্রুটি ঘটতে পারে এবং উপাত্ত সংগ্রহে ত্রুটি ঘটতে পারে, যে উপাত্তগুলি বা অপর্যবেক্ষিত কারণগুলি তত্ত্বটিকে এনোমালীর(অপ্রত্যাশিত ফলাফল) সম্মুখীন করাচ্ছে । ৬) অভিজিত রায় তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম ব্যবহার করেছেন “মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান ?” শিরোনামটি দেখলেই যেকোন বোদ্ধা পাঠকের মনে এই চিন্তাধারাই সৃষ্টি হবে যে, লেখকের প্রণিত প্রবন্ধটি হবে গবেষণাধর্মী এবং একাডেমিক চরিত্রের । রাজনৈতিক আদর্শ, ভাবাবেগ কিংবা কোন ধরণের প্রপাগান্ডামূলক উদ্দ্যেশ্য বা মোটিভেশন এখানে স্থান পাবে না যা লেখার বস্তুনিষ্ঠতাকে এবং গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ বা ধ্বংস করে ফেলবে । মার্ক্সীয় তত্ত্বের বিজ্ঞানভিত্তিক সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি “লেনিন কেন চেকা গঠন করে বিরুদ্ধবাদীদের দমন করেছিলেন(?)…..”(প্রতিবিপ্লবীদের দ্বারা তিনি যে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সে তথ্যটি গোপন করে-অর্থাৎ কমিউনিস্টদের আত্মরক্ষার অধিকার নেই); সোভিয়েত আমলে এবং চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণে কত লক্ষ লোক মারা গিয়েছিল সেসবের ফিরিস্তি; ষ্টালিন আমলের বাড়াবাড়ির কল্পকাহিনী ইত্যাদি ইত্যাদি । এগুলিকে কি একাডেমিক আলোচনা বলা যায় ? এসব রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা যা তিনি মার্কিনীদের অর্থপুষ্ট হয়ে চালিয়েছেন, তার সঙ্গে বিজ্ঞানে কিংবা মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান কিনা তার কি সম্পর্ক রয়েছে সেটি পাঠক ভেবে দেখতে পারেন । এই লেখক মনে করে যে, এসবই হচ্ছে অভিজিত রায়ের প্রবন্ধটির দুর্বল দিক । অথচ, পূজিবাদী যুদ্ধে অর্থাৎ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো সারা বিশ্বের মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই যুদ্ধ দুটিতে এর চেয়ে কত হাজার গুন বেশী লোক, কত শত কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল, সেগুলি নিয়ে তিনি ছিলেন আশ্চর্যজনকভাবে নিশ্চুপ । ইরাক যুদ্ধে এবং অন্যান্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কত কোটি লোক হত্যা করেছে সেই পরিসংখ্যান অভিজিত বাবু দেননি কেন ? জারের রাশিয়ায় ভূমিদাসরা কিভাবে নিপীড়িত হতো, তখন অহরহ দুর্ভিক্ষ-মহামারীতে কত কোটি লোক প্রাণ হারিয়েছিল, সেসবের হিসাব তিনি দেননি কেন ? এরকম অনেক প্রশ্নই তাঁকে করা যায় । ৭) অভিজিত বাবু মার্ক্সের অর্থনীতির দর্শন বা তত্ত্ব নিয়ে যেধরণের ভুল বিশ্লেষণ করেছেন, তাতে বোঝা যায়, যে হয় তিনি মার্ক্সের ক্যাপিটাল গ্রন্থটি বিশদভাবে এবং গভীরভাবে অধ্যয়ন করেননি, অথবা তিনি তা সম্যক বুঝতেই পারেননি । ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ নিয়েও একই কথা বলা যায় । আমার পুস্তকের এই অংশে অভিজিতের এসব মারাত্মক ভুলগুলি নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই । এগুলি বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে আলোচনা করে পাঠকের কাছে তুলে ধরব অভিজিত কি ধরণের তাত্ত্বিক ভুল করেছেন । এটি অবশ্য ঘটেছে শুধুমাত্র কার্ল পপারের মতো উদারবাদী(একচেটিয়া পূজিতন্ত্রপন্থী বুদ্ধিজীবি বা অর্থনীতিবিদ) বুদ্ধিজীবিদের ‘বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্বন্ধীয় তত্ত্ব বা মূলনীতি(Doctrine or Principle)’ একচেটিয়াভাবে অনুসরণ করার ফলশ্রুতিতে এবং অন্যান্য মধ্যপন্থী(দক্ষিনপন্থা ও বামপন্থার মাঝামাঝি অবস্থান কিংবা এর বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র একাডেমিক চরিত্র নিয়ে) চিন্তাবিদদের মতামত ও বিশ্লেষণকে আমলে না নেয়ার কারণে । এই পুস্তকে শুধুমাত্র কার্ল পপারের ফলসিফায়েবিলিটি ডক্‌ট্রিনের সরলতা বা অপরিপক্কতা নিয়ে পাশ্চাত্যের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানের দার্শনিকগণ এবং গণিতের দার্শনিকগণ কি বিশ্লেষণ করেছেন এবং কি ধরণের সমাধান দিয়েছেন, সেগুলি নিয়ে আলোকপাত করব ।

    Reply
  • July 13, 2019 at 4:06 pm
    Permalink

    (উপরের বক্স থেকে) এ প্রবন্ধের উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে, ১) কার্ল পপারের যে বিজ্ঞানের দর্শনের অন্ধ ও একরোখা প্রয়োগের মাধ্যমে অভিজিত বাবু মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্বকে অবৈজ্ঞানিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, সেই বিখ্যাত বা (পাশ্চাত্যের দার্শনিক ও বিজ্ঞানী মহলে) কুখ্যাত ফলসিফিকেশন নীতির ত্রুটিগুলি এবং অপপ্রয়োগ(অবৈজ্ঞানিক ও বিতর্কিত একটি নীতি দিয়ে প্রমাণ করা যে, মার্ক্সবাদ অবৈজ্ঞানিক, যেই নীতিটির প্রধান অংশটি নিজেই বিতর্কিত, দার্শনিক সমস্যাসঙ্কুল এবং বিজ্ঞানী মহল দ্বারা প্রত্যাখ্যাত ) নিয়ে আলোকপাত করা । ২) বোঝার চেষ্টা করা যে, মার্ক্সবাদ কতটা পর্যায় বা ডিগ্রী পর্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক বা বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব সম্পন্ন । ৩) বৈজ্ঞানিকতা বা বিজ্ঞানভিত্তিকতা নিয়ে অপব্যাখ্যা বা ভুল বোঝাবোঝি(Misinterpretation) চলছে কিনা ; এবং ৪।) যাদের রেফারেন্স অভিজিত বাবু দিয়েছেন, সেই উদারবাদী দার্শনিক-সমাজতাত্ত্বিক-বিজ্ঞানীর রেফারেন্স বা তত্ত্ব-নীতি প্রয়োগের ফাঁকগুলি কোথায়, পপার এবং তার অনুসারীদের ব্যাখ্যার মধ্যে স্ববিরোধিতা ও অবৈজ্ঞানিকতা কতখানি(জ্ঞানতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানের দর্শনের আলোকে); তাঁদের তত্ত্ব ও রেফারেন্সের গ্রহণযোগ্যতা ও সততা কতখানি ।
    যদিও অভিজিতের লেখার প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্য এই গ্রন্থের ভূমিকা শুরু করেছি, তবে যেহেতু অভিজিত কার্ল পপারের বিজ্ঞানের দর্শন তথা বাতিলযোগ্যতার নীতিকে কঠোরভাবে অনুসরণ করেই মার্ক্সবাদকে অবিজ্ঞান প্রতিপাদন করার চেষ্টা করেছেন, তাই প্রথমে আমি পপারের বিজ্ঞানের দর্শনের সমস্যা নিয়েই আলোচনা এবং আলোকপাত করব । পরে অর্থাৎ, দ্বিতীয় খন্ডে বা গ্রন্থে আমি অভিজিত যেসব প্রশ্ন কিংবা আপত্তি দেখিয়ে মার্ক্সবাদকে ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসী হয়েছেন, সেগুলির জবাব দেব বিজ্ঞানসম্মত বা এম্পিরিক্যাল পন্থায় । অতএব, স্বাভাবিকভাবেই, বিজ্ঞান বলতে আমরা কি বুঝি, এবং কি আসলে বোঝা উচিত, বিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানতত্ত্বীয়, ভাষাতাত্ত্বিক এবং মেথডিক্যাল বোধ বা চেতনা কি হওয়া উচিত এবং কি আছে; বিজ্ঞান বলতে আধুনিক দার্শনিক, বিজ্ঞানী বা সমাজতাত্ত্বিকগণ কি বোঝেন এবং বিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞা কি, পূর্বে বিভিন্ন যুগে বিজ্ঞান কি নামে বা পরিভাষায় অভিহিত হতো এসব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে চাই । আমরা দেখব সায়েন্টিফিক মেথড কি ? একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের আসলে কি কি গুণ বা বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, যা দিয়ে ন্যায্যভাবে দাবী করা যাবে যে তত্ত্বটির বৈজ্ঞানিক সুদৃঢ় ভিত্তি রয়েছে । তাহলেই আমরা বিচার করতে পারব, মার্ক্স তার তত্ত্বগুলি নির্মানে সায়েন্টিফিক মেথড এবং অন্যান্য এম্পিরিক্যাল বা পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন কিনা ! বলা বাহুল্য, অভিজিত রায় এ ব্যাপারে মার্ক্সের উপর সুবিচার করেননি । আশা করি পাঠক ধৈর্য হারাবেন না ।
    অধ্যায় ঃ বিজ্ঞান ঃ
    সায়েন্স(Science) শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘Scientia’ থেকে যা উক্ত ভাষায় ‘Knowledge’ শব্দের অনেকগুলি অর্থের একটি । এরিষ্টটলের মতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হচ্ছে, নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের সমষ্টি যা যুক্তিসিদ্ধ উপায়ে এবং বিচারবুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব । আর আধুনিক বা সাম্প্রতিক বিজ্ঞান মহল এবং উত্তর –
    প্রত্যক্ষবাদীদের (Postpositivist) জ্ঞানতত্ত্ব মতে এবং বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানের দার্শনিকদের বিজ্ঞান-দর্শন অনুসারে, বিজ্ঞান হচ্ছে সেটি যা প্রকৃতি বা জগতটাকে সত্যরুপে বা সঠিকরুপে দেখা কিংবা বোঝা যায়; অথবা যথাযথভাবে এবং দ্ব্যর্থহীন পন্থায় প্রকৃতিকে ইন্টারপ্রেট বা প্রকাশ বা বর্ণনা প্রদানের জন্য যে সাধনা ও প্রচেষ্টা তাই বিজ্ঞাণ । কিছুটা বোঝা গেল, কিন্তু পুরোটা বলা হলো না । ‘বিজ্ঞান হচ্ছে একটা প্রণালীবদ্ধ বা সুশৃঙ্খল কর্মোদ্যোগ বা সৃজনোদ্যোগ যা প্রকৃতি বা জগত সম্বন্ধীয় জ্ঞানকে নির্মান এবং সংগঠিত করে পরীক্ষণযোগ্য ব্যাখ্যা, বিবৃতি বা ঘোষণা এবং (কোন ফ্যাক্ট বা প্রপঞ্চ সম্পর্কিত ) ভবিষ্যত-বিবৃতির আঙ্গিকে বা কাঠামোয় ।’ এরিষ্টটলের মতে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হচ্ছে বিশ্বস্ত জ্ঞানের রাশিপুঞ্জ বা রাশি-সমষ্টি । তবে সমস্যা হচ্ছে এরিষ্টটলের নিজেরই বিজ্ঞান সম্বন্ধে স্পষ্ট কোন ধারণা ছিল না । যদি থাকত, তবে তিনি মহাবিশ্বের ভুল মডেলকে সত্য বলে স্থির বিশ্বাস করতেন না ধর্মবিশ্বাসের মতো, বাইবেলের অনুকরণে বলতেন না যে পৃথিবী বিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে । সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই, মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটছে, যেমন গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন, সেগুলোর পেছনে প্রকৃতির বেশ কিছু নিয়ম কাজ করে বলে যে বিজ্ঞানীরা বলে আসছেন-সে ধরণের কোন নিয়মকে আবিষ্কার করার কোন চেষ্টা(যা পর্যবেক্ষণ-পরীক্ষণের মাধ্যমে আজকের বিজ্ঞানীরা করে থাকেন) এরিষ্টটলের সময়ের বিজ্ঞানীরা করেননি । পর্যবেক্ষণলব্ধ নিয়মগুলিকে সুসংবদ্ধ করে তত্ত্বীয় মডেল তৈরী করে তার মাধ্যমে ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যদ্বাণী করার যে পদ্ধতি সপ্তদশ শতাব্দীতে শুরু হয়েছিল, এরিষ্টটলদের যুগে সেটি ছিলনা । কিছু বাস্তব উদাহরণ থেকে আমরা বোঝার চেষ্টা করি ।
    বিজ্ঞান কি তা বুঝতে হলে আগে জানা দরকার ফ্যাক্ট কি জিনিস । ফ্যাক্ট শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, ‘সত্য বলে গৃহীত তথ্য; প্রকৃত ঘটনা, বাস্তব ; যার অস্তিত্ত্ব আছে । “একটি পিপড়ার ছয়টি পা আছে”-এটি একটি ফ্যাক্ট যা তর্কাতীতভাবে খালি চোখের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব । তারপর, সব ধাতু উত্তপ্ত করলে সম্প্রসারিত হয়-এই প্রপঞ্চ (বা বাস্তবে দৃশ্যমান ঘটনাটি) বা ফ্যাক্ট পাওয়া যায় অনেকগুলি পর্যবেক্ষণ লব্ধ সিদ্ধান্ত থেকে । কিন্তু আরেক ধরণের ফ্যাক্ট আছে যা কেবল পর্যবেক্ষণ দ্বারা সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়না । যেমন, ‘গ্যালাক্সীগুলি পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে’ কিংবা ‘বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সম্প্রসারিত হচ্ছে’ এই ফ্যাক্টগুলি শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ লব্ধ সিদ্ধান্ত থেকে পাওয়া সম্ভব নয় । তার জন্য আবশ্যক বেশ কিছু জটিল তত্ত্ব বা সূত্র এবং অত্যাধুনিক বা সূক্ষ্ণ প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্জিত অনেক এম্পিরিক্যাল (পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা লব্ধ) সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে জাত সিদ্ধান্ত । (চলছে)

    Reply
  • July 13, 2019 at 4:14 pm
    Permalink

    ‘বিজ্ঞান’ শব্দটি এসেছে পুরনো ফরাসী শব্দ থেকে, এবং তার আগে ল্যাটিন ‘Scientia’ থেকে । দার্শনিক কন্‌টেক্সটে(Context) ‘Scientia’ আর ‘Science’ ব্যবহৃত হতো গ্রীক শব্দ ‘Episteme’-এর ভাবানুবাদ করার জন্য । যার অর্থ ছিল বিশ্বস্ত জ্ঞান যা প্রণিত হয় শক্তিশালী দৃষ্টান্ত থেকে যুক্তির মাধ্যমে । ‘প্রাক্‌ আধুনিক যুগে দুটি শব্দ ‘বিজ্ঞান’ এবং ‘দর্শন’ একই অর্থে প্রাক্‌-আধুনিক যুগের পর, সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রাকৃতিক দর্শনকে(যা আজ প্রকৃতি বিজ্ঞান নামে অভিহিত) সাধারণভাবে দর্শন থেকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা শুরু হয় । আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বে, বিজ্ঞানকে গণ্য করা হয় প্রকৃতিবিদ্যা বা প্রাকৃতিক নিয়ম সম্বন্ধীয় বিদ্যা(Natural Science or Physical Science)-র সমার্থক পরিভাষারুপে । ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে, বিজ্ঞান শব্দটি ক্রমশ প্রকৃতি জগতের সুসংবদ্ধ (বিভাগীয়) জ্ঞান বা বিদ্যার সংশ্লিষ্ট চর্চা রুপে চলে আসছে । যার অন্তর্গত হচ্ছে, পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন, শরীর বিদ্যা, ভূতত্ত্ব, এবং জীব বিদ্যা প্রভৃতি ।
    বিজ্ঞান গবেষণায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগের সূচনাঃ-যখন বিশ্ব প্রকৃতি নিয়ে সুসংবদ্ধ বা শৃঙ্গলাবদ্ধ এম্পিরিক্যাল (প্রায়োগিক, গবেষণামূলক) অনুসন্ধানের বর্ণনাসমূহ বহু আগে থেকে বিরাজমান ছিল, বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতির প্রয়োগ সেই মধ্যযুগ থেকে চলে আসছে আল হাজেন এবং রজার বেকন প্রমুখের মাধ্যমে । তবে, আধুনিক বিজ্ঞানের উষাকাল হচ্ছে ষোড়ষ ও সপ্তদশ শতাব্দী যেই কালপর্ব বিজ্ঞানের বিপ্লবের যুগ বলে পরিচিত । এই কালপর্ব প্রকৃতি জগতকে অধ্যয়নের বা গবেষণার নতুন পন্থার দ্বারা চিহ্নতি করা হয় । আর তা হচ্ছে, পদ্ধতিগত পরীক্ষণের লক্ষ্য ছিল ‘প্রকৃতির নিয়মগুলিকে’ সংজ্ঞায়িত করা যখন এর অধিবিদ্যা সম্বন্ধীয় ইস্যুগুলি পরিহার করা হয়, যথাঃ-এরিষ্টটলের কার্যকারণ সূত্র ।
    এই প্রাবন্ধিক সবিনয়ে উল্লেখ করতে চায় যে, ‘মার্ক্সবাদ কি বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে অভিজিত বাবু মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ কভার বা স্পর্শ করেননি, যেগুলি ছাড়া মার্ক্সবাদের বৈজ্ঞানিকতা প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার ব্যাপারটা সততাপূর্ণ নয় । এর পরিণতিতে তাঁর উক্ত প্রবন্ধ বেশ কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে । তাঁর প্রবন্ধের আরো বড়ো একটা দুর্বল দিক হচ্ছে, প্রবন্ধটি পড়লে মনে হবে, মার্ক্সবাদ শুধু কোন সেমিনার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের মধ্যকার একাডেমিক্যাল আলোচনা বা বিশ্লেষণের বিষয় কিংবা বদ্ধ পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করের দেখার বিষয় । তিনি সম্ভবত ভুলেই গেছেন, যে এটি একটি প্রায়োগিক এবং সৃজনশীল সমাজবিদ্যা, যা নিরন্তর বাস্তব ও জীবন্ত তৃণমূল পর্যায়ের বিচিত্র শ্রেণীর মানুষের বাস্তব জীবন ধারা ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষণ এবং অনুশীলনের মাধ্যমেই কেবল সমৃদ্ধিশালী হয়ে চলেছে । প্রকৃতি বিজ্ঞানের কিংবা বৈজ্ঞানিক মৌলিক আবিষ্কারের ইতিহাসের সঙ্গে এক্ষেত্রে মার্ক্সীয় দর্শন ও সমাজতত্ত্বের যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় । যারা বিজ্ঞানের ইতিহাস গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন, তারা এই সাদৃশ্যটি বুঝতে পারবেন । মার্ক্সবাদ কোন বদ্ধ জলাশয় নয় । এটি সময়ের সাথে সাথে এর নিত্য নতুন উপাদান বা গুণগত চরিত্র-বৈশিষ্ট্যগুলিকে সহজে এডাপ্ট করে চলেছে, যা মার্ক্সীয় তত্ত্বগুলির বৈজ্ঞানিক চরিত্রকে নির্দেশ করে । এ প্রবন্ধের পরবর্তীতে আপনারা দেখবেন, যে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের শাঁস বা কেন্দ্রীয় অংশটিকে যেকোন মূল্যে রক্ষা বা অপরিবর্তিত রাখা হয় ; এবং তত্ত্বের অতিরিক্ত বা বাউন্ডারী কন্ডিশন বা বিবৃতিগুলিকে অনেক সময় মডিফাই বা সংশোধন করা হয় যখন তত্ত্বটি কোন এনোমালী বা অপ্রত্যাশিত পর্যবেক্ষণ বা ফলাফল বা প্রপঞ্চের সম্মুখীন হয় । বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিবর্তন বা বিকাশের প্রক্রিয়ার এই গুণের সঙ্গে মার্ক্সবাদের যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকায় মার্ক্সবাদী সমাজতত্ত্বকে সহজেই ‘বৈজ্ঞানিক’ অভিধায় প্রত্যয়ন বা সার্টিফাই করা যায় । আজকের যুগের নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ মার্ক্সবাদের আলোকে অতি সহজে ব্যাখ্যা করা যায় এবং বোঝা যায় ।
    কার্ল পপারের বিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে এতটা বিতর্ক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই হওয়ার পেছনে যে ঘটনাটি মূলত দায়ী ছিল, তা হচ্ছে, তিনি তাঁর ঐ দর্শন বিশেষ করে ফলসিফিকেশনিজ্‌ম(বাতিলযোগ্যতাবাদ) ব্যবহার করে কেবল মার্ক্সবাদই নয়, এমন অনেক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে মিথ্যে বা বাতিল করার উপক্রম করেছিলেন, যেগুলির মৌলিক ধারণা বা কন্সেপ্ট বাদ দিয়ে পরবর্তীতে উন্নততর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উদ্ভাবন সম্ভব হতোনা ।
    “জ্ঞানতত্ত্বহীন বিজ্ঞান…………..আদিম এবং কর্দমাক্ত । তবে, জ্ঞানতত্ত্ববিদ(যিনি একটি বিশুদ্ধ বা স্বচ্ছ প্রণালীর সন্ধান করেন) তার এধরণের প্রণালীর মধ্য দিয়ে সংগ্রাম-প্রচেষ্টা চালিয়ে উত্তীর্ণ হতে না হতেই, তিনি (নিজস্ব প্রতিষ্ঠিত) প্রণালী বা পদ্ধতির অর্থ অনুযায়ী বিজ্ঞানের চিন্তা-ধারণাকে(Thought context) ইন্টারপ্রেট করার চেষ্টা করার দিকে ঝুঁকে পড়েন । তবে বিজ্ঞানী তার সাধনাকে জ্ঞানতাত্ত্বিক নিয়মাবদ্ধতার জন্য কুলিয়ে উঠতে(Afford) পারেন না অতটা দূর পর্যন্ত।।…………তাকে তাই বাছবিচারহীন সুযোগসন্ধানী হিসেবে নিয়মাবদ্ধ জ্ঞানতাত্ত্বিকের সামনে অবশ্যম্ভাবীরুপে আবির্ভূত হতে হয় ।-আলবার্ট আইন্‌ষ্টাইন ।(১৯৪৯, পৃঃ ৬৮৪)
    আইন্‌ষ্টাইনের এই বক্তব্য পপারের তথাকথিত বিজ্ঞানের দর্শন, কাঁচা বাতিলযোগ্যতাবাদ ও তার জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কে প্রযোজ্য । বিজ্ঞান নিয়ে পপারের জ্ঞানতাত্ত্বিক নিয়মাবদ্ধতার(পপারের বিজ্ঞানের দর্শন-বাতিলযোগ্যতাবাদ ফলসিফিকেশন, থিওরী অব ডিমার্কেশন বা বিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান পৃথকীকরণ মেথড ইত্যাদি) বাইরে গেলেই কোন বৈজ্ঞানিক প্রোগ্রামকে বা তত্ত্বকে অপবিজ্ঞানের দলে ফেলে দিয়েছেন । সাইকো এ্যানালাইসিস্‌, জীবের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব বা বিবর্তনবাদ, নিউটনীয় মেকানিক্‌স্‌, তার অন্যতম ।
    বার্ট্রান্ড রাসেল লিখেছেন, “আমার কোন সন্দেহ নেই যে, যদিও পদার্থ বিদ্যায় প্রগতিশীল পরিবর্তন প্রত্যাশা করতে হবে, ………………………………বিজ্ঞান কোন মূহুর্তেই সম্পূর্ণরুপে সত্য নয়, কিন্তু তা কদাচই সম্পূর্ণ মিথ্যা নয় । এবং নিয়ম হিসেবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন তত্ত্বগুলির চেয়ে এর সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । অতএব, একে হাইপোথিসিস্‌ হিসেবে গ্রহণ করাটা যুক্তিসঙ্গত ।”(Bertrand Russel, My philosophical development, 1995, (1959)
    বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ এল্যান সোকাল এবং জিন ব্রিকমন্ট আমাদের জানাচ্ছেন, ‘ইতিহাসবিদ, গোয়েন্দা, মেকানিক, গণিতবিদ, পদার্থবিদ, দার্শনিক-সবাই অবরোহ-আরোহ পদ্ধতির একই মৌলিক নিয়মগুলি ব্যবহার করেন । এবং প্রমাণ বা নজীরের মূল্যায়ন করেন ।‘ আধুনিক বিজ্ঞান
    বিজ্ঞান এই কার্যপ্রণালীগুলো আরো যত্নসহকারে, সুসম্বদ্বভাবে করার চেষ্টা করে রিসার্চ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ।
    বিজ্ঞানের সংজ্ঞা নিয়ে পপার যে তত্ত্ব বা দর্শন হাজির করেছেন, তা এই ঃ

    তিনি বিজ্ঞান এবং ছদ্মবিজ্ঞানের মধ্যে অর্থাৎ, বিজ্ঞানভিত্তিহীন তত্ত্ব এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মধ্যে সীমানা নির্দেশের জন্য একটা মানদন্ড(Critery of Demarcation) উপস্থাপন করতে চান । তিনি মনে করেছেন, যে বাতিলযোগ্যতা(Falsifiability) উক্ত কাজের জন্য বিশ্বস্ত বা সত্য টুল বা হাতিয়ার । এই নীতি অনুযায়ী, বিজ্ঞান হতে হলে একটি তত্ত্বকে অবশ্যই প্রেডিক্‌শন বা সঠিক বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী দিতে হবে, যা নীতিগতভাবে বাস্তবে মিথ্যে হতে পারে । যদি একটি তত্ত্ব ‘বাতিলযোগ্য’ তথা বিজ্ঞানসম্মত হয়, প্রথমত তত্ত্বটি টেস্টেব্‌ল্‌(পরীক্ষণযোগ্য) হতে হবে । এটি করা হয় বাতিলকরণ পরীক্ষার(Falsification) অধীনে পাশ বা ফেল করার মধ্য দিয়ে । অর্থাৎ, কেউ তত্ত্বের (পরীক্ষণমূলক বা) এম্পিরিক্যাল প্রেডিক্‌শন সংশ্লিষ্ট উপাত্তগুলির সঙ্গে পর্যবেক্ষণসমূহ অথবা পরীক্ষণসমূহের (ফলাফলের) তুলনা করতে পারেন । এবং যদি ফলাফল প্রেডিক্‌শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে এটা সিদ্ধান্ত আসে যে, তত্ত্বটি ভুল এবং অবশ্যই বাতিল করতে হবে । (চলছে)

    Reply
  • July 13, 2019 at 4:20 pm
    Permalink

    (চলছে উপরের বক্স থেকে) পপারের নীতির ত্রুটি হচ্ছে, উক্ত নীতি অনুসারে ফলসিফিকেশনের(সত্যতা যাচাইকরণের বিপরীতে) মাধ্যমে তত্ত্ব বাতিলকরণের উপর এই অতি গুরুত্ব প্রয়োগ, এই চূড়ান্ত ভারসাম্যহীনতাকে জোরালোভাবে তুলে ধরছে ঃ কেউ কখনই প্রমাণ করতে পারবে না যে, একটি তত্ত্ব সত্য । কারণ কি ? অর্থাৎ কিনা, এই যুক্তির ভিত্তি কি ? পাঠক বুঝতে পেরেছেন কি ? ব্যাপারটা হচ্ছে, এটি(মানে সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব) সাধারণত অগণিত সংখ্যক গবেষণামূলক প্রেডিক্‌শন দিয়ে থাকে যেগুলি থেকে শুধু কিছু সীমাবদ্ধ সংখ্যকই সর্বদা যাচাই করা যায়(বাস্তব সমস্যা) । কিন্তু তৎসত্ত্বেও
    , পপারের ফলসিফায়েবিলিটি নীতি অনুসারে কেউ প্রমাণ করতে পারে যে একটি তত্ত্ব ভুল । কারণ, তা করার জন্য একটি (নির্ভরযোগ্য) পর্যবেক্ষণই যথেষ্ঠ যা তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক । (পরে আমরা দেখব যে, একটি ব্যাখ্যা Adhoc কিনা তা জোরালোভাবে নির্ভর করে প্রাসঙ্গিকতার উপর)
    বাতিলবাদী(Falsificationist) ডক্‌ট্রিনকে কেউ যখন আক্ষরিক অর্থে গ্রহণের চেষ্টা করে, বেশকিছু বিপত্তির সৃষ্টি হয় । ফলসিফিকেশনের নিশ্চয়তার অনুকূলে সত্য যাচাইকরণের(Verification) অনিশ্চয়তাকে পরিত্যাগ করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত বা শ্রেয় মনে হতে পারে গোঁড়া পপারবাদীদের কাছে(যেমন-বাংলাদেশের অভিজিত রায় এবং তার অনুসারীগণ) । কিন্তু এই পদক্ষেপ দুটি সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়-ভেরিফিকেশন পদ্ধতি পরিত্যাগ করে কেউ বেশী মূল্য দেয় বা ধাক্কা খায়; এবং কেউ ব্যর্থ হয় তার অঙ্গীকার অর্জনে । কারণ মিথ্যা প্রতিপাদন(Falsification) যতখানি মনে হয় তার চেয়ে অনেক বেশী অনিশ্চিত ।
    প্রথম বিপত্তিটা হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক বা বিজ্ঞানভিত্তিক ‘আরোহ পদ্ধতি’(Inductive method) নিয়ে । যখন একটি তত্ত্ব সাফল্যজনকভাবে ফলসিফিকেশন টেস্ট উতরে যায়, বিজ্ঞানী অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তত্ত্বটিকে সত্য প্রমাণিত বলে বিবেচনা করবে । এবং একে আরো উচ্চতর(বিষয়ীগত) সম্ভাব্যতার সঙ্গে মেলাবে । সম্ভাব্যতার মাত্রা অবশ্যই নির্ভর করবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা শর্তের উপর ঃ পরীক্ষার মান, অপ্রত্যাশিত ফলাফল ইত্যাদি ।
    কিন্তু বিজ্ঞানের জন্য সমস্যা হচ্ছে পপার সেসবের বাইরে-সারা জীবন তিনি ছিলেন কোন তত্ত্বের নিশ্চিত প্রমাণের ধারণার কট্টর বিরোধী, অথবা এমনকি নিশ্চিত প্রমাণের সম্ভাবনারও বিরোধী(দেখুন তাঁর Logic of Scientific Discovery) । আর তার পেছনে উদ্দ্যেশ্য হিসেবে কাজ করেছে, মার্ক্সীয় তত্ত্বগুলিকে(অর্থনৈতিক এবং দার্শনিক) অবৈজ্ঞানিক প্রমাণ করা । যখন একজন গবেষক বা বিজ্ঞানী বা দার্শনিক তার গবেষণা শুরুর পূর্ব থেকেই কোন পক্ষপাতদুষ্ট লক্ষ্য(কিংবা রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্য দ্বারা) চালিত হয়ে বিচার একরকম ঠিক করে রাখেন, তখন কিন্তু তিনি তার গবেষণা, বস্তুনিষ্ঠতা, দর্শন কিংবা বিজ্ঞানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন । এটি একাডেমিক এথিক্‌সের বিরোধী । তিনি লিখেছেন, “পুনরাবৃত্তিমূলক দৃষ্টান্তসমূহ, যেগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে, সেগুলির তুলনায়, কার্যকারণের ভিতর দিয়ে যেসব দৃষ্টান্ত বা ঘটনার অভিজ্ঞতা আমাদের (এখনো) হয়নি, সেগুলির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত টানার ক্ষেত্রে আমরা কি যুক্তিসঙ্গতভাবে ন্যায্য ? দার্শনিক-সমাজতাত্ত্বিক হিউমের কঠিন উত্তর হচ্ছে ঃ “No, we are not justified…………………….My own view is that Hume’s answer to this problem is right. (পপার ১৯৭৪, পৃঃ ১০১৮-১০১৯) ৬৬
    [ ৬৬ ঃ—বিষয়টি হচ্ছে আরোহবাদ নিয়ে বিতর্ক । পাঠক খেয়াল করুন যে,পপার একটি তত্ত্বকে ‘Corroborated’(সত্য বলে দৃঢ় সমর্থিত) বলছেন যখনই তত্ত্বটি সাফল্যজনকভাবে বাতিলকরণ(Falsification)-এর পরীক্ষাগুলো পাশ করবে । কিন্তু পরিভাষাটির অর্থ পরিষ্কার নয় । এটি শুধু ‘Confirmed’এর সমার্থক হতে পারেনা । (এটি তার ফলসিফিকেশন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ।) অন্যথায়, আরোহবাদের(Inductionism) বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ পপারীয় সমালচনা হবে শূন্যগর্ভ । (বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন পুটনাম (১৯৭৪) ) নিম্নের আলোচনায় ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে । ]
    বিজ্ঞানের দার্শনিক কার্ল পপারের আরোহবাদের বিরুদ্ধে উপরোক্ত বিশ্লেষণের জবাব হচ্ছে এই ঃ প্রত্যকটি আরোহই(Induction) হচ্ছে, পর্যবেক্ষিত(অভিজ্ঞতা বা ফলাফল) থেকে অপর্যবেক্ষিত ফলাফলে পৌঁছার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ (অর্থাৎ, ইন্ডাক্‌শন ঃ কনফারমেশন, য়ুনিভার্সাল স্বতসিদ্ধ; ফরমুলা ফর সুপারপজিশন) এবং এধরণের কোন সিদ্ধান্তই কেবলমাত্র অবরোহী যুক্তিতে (Deductive Logic) সিদ্ধ হতে পারেনা । যদি যৌক্তিকতা শুধুমাত্র অবরোহী প্রথায়ই গঠিত হতো, তাহলে তার অর্থ দাঁড়াত যে, ‘আগামীকাল সূর্য উদীত হবে’
    . -এটা বিশ্বাস করার সঙ্গত বা উত্তম কোন কারণ থাকতে থাকেনা । এবং আজ পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে কেউ প্রত্যাশাও করেনা যে কাল সূর্য উঠবেনা ।
    বাতিলকরণ প্রণালীর মাধ্যমে, পপার ভেবেছেন যে তিনি হিউমের সমস্যার সমাধান করেছেন । যেমন তিনি লিখেছেন, “ প্রস্তাবিত সীমানা নির্দেশক মানদন্ড (বিজ্ঞান থেকে ছদ্মবিজ্ঞানের পৃথকীকরণকল্পে) আমাদেরকে হিউমের ‘আরোহ’ সমস্যার সমাধানের দিকেও নিয়ে যায়-প্রকৃতির নিয়মের অখন্ডতা বা অকাট্যতার সমস্যার সমাধানের দিকে……………..ফলসিফিকেশন পদ্ধতি কোন আরোহী সিদ্ধান্তকে পূর্ব থেকেই মেনে নেয় না, কিন্তু শুধুমাত্র অবরোহী যুক্তির সমার্থক শব্দ(Tautological base statement-সত্যতা যাচাই করা হয়নি এমন সাম্প্রতিক প্রতিজ্ঞা বা তাত্ত্বিক তর্কের ভিত্তিমূলক উক্তি বা বিবৃতি) ব্যাতিরেকে যার অখন্ডনীয়তা বিতর্কহীন।” (পপার, ১৯৫৯, পৃঃ ৪২)
    উপরোক্ত তাত্ত্বিক অবস্থানের মারাত্মক ত্রুটিটা হচ্ছে, ‘আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে, পপারের উপরোক্ত সমাধান নির্ভজালভাবেই নেতিবাচক-‘আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, কিছু তত্ত্ব মিথ্যে, কিন্তু কখনই নিশ্চিত হতে পারি না যে একটি তত্ত্ব সত্য বা এমনকি সম্ভাবনাময় । বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিষ্পত্তি সন্তোষজনক নয় । বিশেষ করে, বিজ্ঞানের অন্যতম ভূমিকা হচ্ছে প্রেডিক্‌শন দেওয়া যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলীরা এগিয়ে যাবে । এবং এধরণের সমস্ত প্রেডিকশনই একধরণের ‘আরোহ’ পন্থার উপর নির্ভর করে । এছাড়াও, বিজ্ঞানের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলি স্বীকৃত হয়ে উঠে তাদের সাফল্যের কারণে । নিউটনীয় মেকানিক্‌সের উপর ভিত্তি করে পদার্থবিদ্যার বহুল সংখ্যক এষ্ট্রোনমিক্যাল এবং মহাকাশীয় গতির সম্পর্কে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হন, যেগুলো পর্যবেক্ষণ ফলাফলের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলে যায় । অবরোহী প্রণালী বা ফলসিফিকেশন পরীক্ষার মাধ্যমে সেসব সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি । মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রেও এটি আরো বেশি প্রযোজ্য-সমাজ ব্যক্তি মানুষের মানসিক বিবর্তন বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার সামষ্টিক ও জটিল প্রতিফলন । সেক্ষেত্রে প্রেডিক্‌শন দেওয়াটা কতখানি বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে ।
    পাপারীয় জ্ঞানতত্ত্বের দ্বিতীয় বিপত্তি হচ্ছে, ফলসিফিকেশন যতখানি মনে হয় তার চাইতেও অনেক বেশী জটিল । (পপার নিজেই ফলসিফিকেশনের সঙ্গে যুক্ত দুর্বোধ্যতার ব্যাপারে সম্পূর্ণরুপে অবগত ছিলেন । তিনি যা করছেন না, তা হলো “কাঁচা বাতিলযোগ্যতাবাদের” একটি সন্তোষজনক বিকল্প অর্থাৎ এমন একটি ‘বাতিলযোগ্যতাবাদ’ যা তার বর্তমান ত্রুটিগুলি সংশোধন করবে এর কিছু কিছু ইতিবাচক গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে ।) এটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য, নিউটনীয় মেকানিক্‌সের দৃষ্টান্ত আবারো গ্রহণ করা যাক । [উদাহরণস্বরুপ দেখুন, পুতনাম, ১৯৭৪; দেখুন পপারের প্রত্যুত্তর (পপার, ১৯৭৪; পৃঃ ৯৯৩-৯৯৯) এবং পুতনামের প্রত্যুত্তর(পুতনাম, ১৯৭৪) ]
    মেকানিক্‌স্‌কে দুটি সূত্রের সমষ্টিরুপে বোঝা হয় । একটি হচ্ছে গতির সূত্র, যেটির নিয়মানুযায়ী ‘বল সমান ভর গুণন ত্বরণ । অন্যটি হচ্ছে মহাকর্ষণীয় সূত্র (Universal Gravitation), যেটির নিয়মানুযায়ী দুটো পদার্থের বা বস্তুর(Bodies) মধ্যকার আকর্ষণ বল, তাদের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যকার দূরত্বের বর্গের উল্টানুপাতিক । এই তত্ত্বগুলি কোন দিক থেকে ফলসিফায়েব্ল ? এটি নিজে থেকে তেমন কিছু প্রেডিক্ট করে না । (এবং সেজন্য নিউটনীয় মেকানিক্স্ ‘ছদ্মবিজ্ঞান হয়ে গেছে’ বলে কেউ মনে করেন না, যে অভিযোগ মার্ক্সীয় দর্শনের বিরুদ্ধে করা হয় বুর্জোয়া কিংবা উদারবাদী বুদ্ধিজীবিদের পক্ষ থেকে) বাস্তবিক, বিপুল সংখ্যক বিভিন্ন গতি নিউটনীয় মেকানিক্সের সূত্রগুলির সঙ্গে মিলে যায় ; এবং এমনকি সেগুলি থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব, যদি কেউ বিবিধ মহাশূন্যীয় বস্তুর ভরসমূহ সম্বন্ধে যথাযথ(বুদ্ধিদীপ্ত বা যৌক্তিক) অনুমান করে । দৃষ্টান্তস্বরুপ, গ্রহের গতি সম্বন্ধীয় কেপ্‌লারের সূত্রগুলি থেকে নিউটনের বিখ্যাত অবরোহ সিদ্ধান্তের জন্য আবশ্যক করেছিল কতিপয় অতিরিক্ত অনুমান, যেগুলি যৌক্তিকতার দিক দিয়ে নিউটনীয় মেকানিক্‌সের সূত্রগুলির উপর নির্ভরশীল নয় ব সম্পর্কহীন । মূলনীতি অনুযায়ী অবরোহটি হলো, গ্রহগুলির ভর তুলনামূলকভাবে সূর্যের ভরের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র ঃ উক্ত অবরোহ (পরোক্ষভাবে) বোঝাচ্ছে যে, গ্রহগুলির মধ্যকার পারস্পরিক (আকর্ষণ) ক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করা যায়, প্রথম এপ্রোক্সিমেশনে(Approximation-Mathematical টার্ম-অর্থ হচ্ছে সত্যের কাছাকাছি বা সঠিকতার কাছাকাছি মান বা ভ্যাল্যু বাহির করা)-এ । কিন্তু এই প্রকল্প যুক্তিসঙ্গত হলেও, কোনক্রমেই স্বতসিদ্ধ নয়-গ্রহগুলি ঘন বস্তু দিয়ে গঠিত হতে পারে, অর্থাৎ, আপেক্ষিক ঘনত্ব বেশী হওয়ার কারণে আকর্ষণ ক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য তারতম্য ঘটে, যার ফলে অতিরিক্ত প্রকল্প ব্যর্থ হতে পারে । (এতে কিন্তু তত্ত্বটি বাতিল হয় না বা বাতিল করার নজীর নেই বিজ্ঞান-ইতিহাসে ।) অথবা, বিপুল পরিমাণ অদৃশ্য বস্তুর অস্তিত্ত্ব থাকতে পারে, যেগুলি গ্রহগুলির গতিকে প্রভাবিত করে । (লক্ষ্য করুন যে, যদিও এটি অপরিহার্য নয় যে, এধরণের অদৃশ্য বস্তুর অস্তিত্ত্ব অন্যান্য উপায়ে আবিষ্কারের উর্ধ্বে- কিছু বিজ্ঞান দার্শনিক এল্যান সেকালের সমসাময়িক মহাশূন্যীয় তত্ত্বে সেগুলির অস্তিত্ত্ব স্বীকার বা ধরে নেয়া হয়েছে । কার্ল পপারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফলসিফায়েবিলিটির নিয়মানুযায়ী, এধরণের ঘন ঘন এডহক পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্য এই তত্ত্বগুলির গুরুত্ব কমে যায়নি এবং অবৈজ্ঞানিক বলে ঘোষিত হয়নি, যা তিনি মার্ক্সবাদের উপর প্রয়োগ করেছিলেন ।)
    তাছাড়া যেকোন মহাশূন্যীয় পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা নির্ভর করছে কতিপয় তাত্ত্বিক প্রস্তাবনার উপর, বিশেষ করে অপটিক্যাল হাইপোথিসিসের উপর যেগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কার্যপ্রণালী এবং শূন্যের মধ্য দিয়ে আলোকের বিস্তার(Propagation) । (টীকাঃ-পরীক্ষণের ইন্টারপ্রিটেশনে তত্ত্বের গুরুত্বকে জোর দেওয়া হয়েছে ডুহেম কর্তৃক । (ডুহেম, ১৯৫৪; ১৯১৪; দ্বিতীয় খন্ড, চাপ্টার ৬)
    অন্যান্য পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য ঃ দৃষ্টান্তস্বরুপ, যখন কেউ বিদ্যুতপ্রবাহের পরিমাপ করে, তখন সে যা দেখে তা হচ্ছে, এম্‌মিটার বা ওস্‌সিলোস্কোপের স্ক্রীনে কাঁটার অবস্থান বা রিডিং । এই রিডিংকে ইন্টারপ্রেট করা হয় তত্ত্ব অনুসারে, যেগুলি বিদ্যুতপ্রবাহের উপস্থিতি এবং মান নির্দেশ করে ।[পরীক্ষণের ইন্টারপ্রিটেশনে তত্ত্বের গুরুত্বকে জোর দেওয়া হয়েছে ডুহেম কর্তৃক । (Duhem {1954}{1914}, Second part, Chapter VI )
    অতএব, এই উপসংহার টানা যায় যে, বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা একটি একটি করে বাতিল করা যায় না । (অর্থাৎ, পপারের পিসমিল থিওরীও ভুঁয়া যা তিনি সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পিত অর্থনীতির বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছেন তার ‘লজিক অব সায়েন্টিফিক ডিসকভারীতে) কারণ, সেগুলি থেকে (অবরহী প্রথায়) কোন পরীক্ষণমূলক (Empirical) প্রস্তাবে উপনীত হতে হলে , বেশকিছু সংখ্যক অতিরিক্ত অনুমান আবশ্যক, যদি মাপনযন্ত্রগুলি শুধু সেভাবেই কাজ করে । তাছাড়া এই প্রকল্পগুলি প্রায়ই অন্তর্নিহিতরুপে কাজ করে । মার্কিন দার্শনিক কোয়াইন এই ধারণাটি(এডহক সংশোধনের জন্য অতিরিক্ত অনুমান) তুলনামূলক মৌলিক কায়দায় প্রকাশ করেছেন ঃ-“বহির্জগত সম্বন্ধে আমাদের বিবৃতি ইন্দ্রীয়ের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় এককভাবে নয় বরং ‘মিলিত দেহরুপে’(Corporate Body)……………. সমষ্টিগতভাবে গ্রহণ করলে বিজ্ঞানের দ্বৈতনির্ভরতা রয়েছে ভাষা ও অভিজ্ঞানের(প্রতীক, প্রামাণিক সাক্ষ্য, নিদর্শন, পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ প্রভৃতি) উপর । কিন্তু এই দ্বৈততা উল্লেখযোগ্যরুপে উল্লেখযোগ্যভাবে এক এক করে বৈজ্ঞানিক বিবৃতিরুপে অনুসরণযোগ্য নয় ।…………………ব্যবহার্য সংকেতের সংজ্ঞা নিরুপণের ধারণা ছিল…………………….দার্শনিক লক(Locke) এবং হিউমের টার্ম বাই টার্ম ইন্দ্রীয় অভিজ্ঞানবাদের(Epiricism) উপর একটি অগ্রগতি । পরিভাষার পরিবর্তে এই ‘বিবৃতি’ বা ‘সত্যঘোষণা’ বেনথামের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়ে উঠে একক হিসেবে, যাকে অভিজ্ঞানবাদী সমালোচনার কাছে জবাবদিহি হতে হয় । কিন্তু আমি যেটার জন্য জেদ করছি বা সাগ্রহে পক্ষ সমর্থন করছি তা হচ্ছে-“এমনকি বৈজ্ঞানিক বিবৃতিগুলিকে একক হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের তারজালি সূক্ষ্মভাবে তৈরী করেছি । পরীক্ষণমূলক(Empirical) গুরুত্ব বা ফলাফলের এককই হচ্ছে বিজ্ঞানের সম্পূর্ণটা ।” (Quine 1980[1963], pp,41-42)
    “……………কিন্তু এই দ্বৈততা উল্লেখযোগ্যরুপে উল্লেখযোগ্যভাবে এক এক করে বৈজ্ঞানিক বিবৃতিরুপে অনুসরণযোগ্য নয় ।“-কোয়াইনের উপরোক্ত উদ্ভাবন বা অভিজ্ঞানের(এম্পিরিক্যাল পর্যবেক্ষণ) মাধ্যমে পপারের খন্ডতাবাদ(Reductionism or Piecemeal method) এভাবেই খন্ডিত হয়ে যায় । (খন্ডতাবাদঃ এটি দর্শন, বিজ্ঞানের দর্শন এবং বিজ্ঞান গবেষণায় একটি বিতর্কিত তত্ত্ব বা নীতি, যা কার্ল পপার গোঁড়াভাবে অনুসরণ করেছিলেন শুধুমাত্র মার্ক্সীয় সমাজবিজ্ঞানকে মিথ্যে প্রমাণ করার জন্য । )
    এধরণের আপত্তির কি জবান থাকতে পারে ? প্রথমত, এব্যাপারে জোর দেওয়া আবশ্যক যে, বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় উপরোক্ত সমস্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণরুপে সচেতন থাকেন । যতবারই কোন পরীক্ষণ একটি তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ফলাফল প্রদর্শন করে, বিজ্ঞানী নিজেদেরকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করে থাকেন ঃ ভুলটা কি পরীক্ষা যেভাবে সম্পাদন বা বিশ্লেষণ করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল ? এটা কি তত্ত্বের কারণে ? অথবা ভুলটা কি অতিরিক্ত অনুমানের মধ্যে ? শুধুমাত্র পরীক্ষণ নিজে থেকে বলে দেয় না কি করতে হবে । ‘বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনাগুলি একটা একটা করে টেস্ট করা যায়’-এই ধারণা বা কনসেপ্ট(যাকে দার্শনিক কোয়াইন বলছেন ‘Empirical Dogma’ বা অভিজ্ঞানবাদী মতবাদ) বিজ্ঞানের কল্পকাহিনীতেই থাকে ।
    কিন্তু কোয়াইনের Assertion দাবী করে গুরুতর যোগ্যতার, যা মার্ক্সীয় অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলির পরীক্ষণের ক্ষেত্রে ঘাটতি হয়েছিল । বাস্তবে অভিজ্ঞান এমনিতে পাওয়া যায়না ; আমরা জগতটাকে শুধু নিবিষ্টভাবে অবলোকন করে তার ব্যাখ্যাই করিনা –আমরা তত্ত্ব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষানিরীক্ষা চালাই; বিশেষভাবে ঐ তত্ত্বগুলির বিভিন্ন অংশের পরীক্ষার জন্য । যদি সম্ভব হয় একটিকে আরেকটি থেকে পৃথকভাবে, অথবা অন্তত যুক্তভাবে । আমরা একগুচ্ছ পরীক্ষা অবলম্বন করি, যার কিছু কিছু ‘শুধুমাত্র মাপন যন্ত্রগুলি প্রত্যাশিতরুপে সত্যিই কাজ করছে কিনা’-সেটা দেখার জন্য উপযোগী(তাদেরকে জানা অবস্থার বা সুপরিচিত অবস্থা বা শর্তের জন্য প্রয়োগের মাধ্যমে) । এটা যেমন সেই প্রাসঙ্গিক তাত্ত্বিক প্রস্তাবনাগুলির সমষ্টি, যেটাকে বাতিলকরণ পরীক্ষাধীন করা হয়, তেমনি এটা হচ্ছে এম্পিরিক্যাল পর্যবেক্ষণগুলোর সমগ্রটা যা আমাদের তাত্ত্বিক ইন্টারপ্রিটেশনগুলোকে সীমাবদ্ধ রাখে । দৃষ্টান্তস্বরুপ, যখন এটা সত্য যে মহাশূন্য সংক্রান্ত জ্ঞান (আলোকবিজ্ঞান সম্পর্কিত হাইপোথিসিসের উপর নির্ভরশীল, এই হাইপোথিসিসগুলি খেয়ালখুশিমাফিক মডিফাই করা যায় না, কারণ, সেগুলিকে অন্তত আংশিকভাবে যাচাই করা যায় কতগুলি স্বাধীন পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে ।
    তবে আমরা আমাদের বিপত্তির শেষ পর্যন্ত পৌঁছিনি । (চলছে পরের বক্সে)

    Reply
  • July 13, 2019 at 4:27 pm
    Permalink

    (চলছে উপরের বক্স থেকে) যদি কেউ Falsificationist নীতিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে,(অর্থাৎ, চরম নীতি গ্রহণ করা) তাকে ঘোষণা করতে হবে যে(ঐ নীতি প্রয়োগের ফলশ্রুতিতে) নিউটনীয় মেকানিক্‌স্‌ ঊনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল(Falsified) মার্কারী গ্রহের কক্ষপথের Anomalies(পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণ ফলাফল বিরোধী) বৈশিষ্ট্যের কারণে । (টীকা দেখুন ঃ-
    ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে জ্যোতির্বিদ লে ভেরিয়ার থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিদগণ লক্ক্য করে আসছেন যে, নিউটনীয় মেকানিক্সে মার্কারী গ্রহের কক্ষপথ সম্পর্কে যেভাবে প্রেডিক্ট করা হয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষিত কক্ষপথ তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন(এনোমালী) ঃ [অমিল বা ফাঁক বা ত্রুটিটা(Discrepency), মার্কারীর পেরিহেলিয়ন বিন্দুর (Term of Physical Science : Perihelion- মার্কারীর কক্ষপথে আবর্তনের সময়ে সূর্যকে কেন্দ্র করে যে ট্রাজেক্টরী(Trajectory) বা ভ্রমণপথ অঙ্কন করে, তার মধ্যে সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি বিন্দু) প্রিসিশনের(Precision-মার্কারির ঘূর্ণন-অক্ষের ধীর, Conical(Geomatric term) গতি, যা সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহপুঞ্জের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ ক্রিয়ার ফলাফল; এবং যা মার্কারীর সম্প্রসারিত নিরক্ষ রেখার ঘূর্ণন বলের সঙ্গে গ্রহগুলির ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট Torque বা ভ্রামক{গতিবিদ্যার পরিভাষা}), বা সঠিকতার সমতুল্য, যে প্রিসেশন approximately প্রতি শতাব্দীর অতিক্রান্ত ‘arc’(বক্রতা)-এর ৪৩ সেকেন্ড অংশে প্রাপ্ত কোণের মাধ্যমে পাওয়া যায় । এটি অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষুদ্র কোণ । মনে করে দেখুন, ত্রিকোণমিতিতে এক আর্ক সেকেন্ড হচ্ছে এক ডিগ্রীর ১/৩৬০০, এবং এক ডিগ্রী হচ্ছে সম্পূর্ণ বৃত্তের ১/৩৬০ । ] উপরোক্ত এনোমালীর( ব্যাখ্যার জন্য নানা প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল নিউটনীয় মেকানিক্‌স কাজে লাগিয়ে । দৃষটান্তস্বরুপ, মার্কারী গ্রহের অস্তিত্ত্ব অনুমান করার মাধ্যমে(নেপচুন গ্রহ যেভাবে আবিষ্কৃত হয়, তার সাফল্যের পেছন প্রয়োগকৃত কনসেপ্‌টের অনুকরণে) । তারপরও গ্রহটিকে আবিষ্কারের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো । এই Anomaly বা আপাত নিয়ম বহির্ভূত প্রপঞ্চের ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত ১৯১৫ সালে করা হয়েছিল আইনষ্টাইনের জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটির ফলশ্রুতিতে বা কাজে লাগিয়ে ।
    তাই বলছিলাম যে, বৈজ্ঞানিক গবষণার ইতিহাসে এনোমালী একটি স্বাভাবিক ঘটনা । আর সমাজ বিজ্ঞান বা সমাজতত্ত্বে বিশেষ করে সামাজিক বিবর্তনের বিজ্ঞান সাবজেক্টিভ এবং অবজেক্টিভ্‌ এই উভয় ফ্যাক্টরের উপর পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায়, সেটি আরো জটিল এবং এনোমালী সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা, যা আপাতদৃষ্টিতে মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্বে অনেক সমালোচক অগভীর ও বাহ্যিকভাবে লক্ষ্য করেছেন কতগুলো Nonsense Principals বা থিওরী প্রয়োগ করে । এনোমালী ঘটলেই কোন তত্ত্ব যদি অবৈজ্ঞানিক হয়ে যেত,-পপার কিংবা অভিজিত বাবুদের ফলসিফিকেশন ফতোয়া মানলে বিজ্ঞান গবেষণা বহু শতাব্দী পূর্বেই বন্ধ করে দিতে হতো নতুবা অত্যন্ত ধীর গতিতে এগোতে হতো-বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি ঘটতো না । কোপার্নিকাসের সময় পপারের (পশ্চিমা সমালোচক ও বিজ্ঞানী-দার্শনিকদের বহুল কথিত) কাঁচা বাতিলযোগ্যতাবাদের নীতি কিংবা আজকের উত্তরাধুনিক প্রত্যক্ষবাদের(Positivism) যুগের বিজ্ঞানের দর্শনের উদ্ভব ঘটেনি এবং প্রয়োজনও পড়েনি । কিন্তু তাঁরা তাঁদের নিজস্ব Rationalism, Verification, গবেষণার শৃঙ্খলা, পরীক্ষণ মেথড, ও দর্শন মেনে বুঝেই বিজ্ঞান চর্চা করেছেন । এনোমালী সত্ত্বেও, কোপার্নিকাসের তত্ত্ব বা প্রকল্প হার্ডকোর বা শাঁস অংশসহ ভুল হলে, গ্যালিলিও তাঁর হাইপোথিসিসের উপর ভিত্তি করে নিশ্চিত ঘোষণা দিতেন না যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে এবং তা বিশেষ নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ……….।
    একজন কট্টর পপারবাদীর জন্য এনোমালী(যথাঃ-মার্কারীর পর্যবেক্ষিত কক্ষপথের সঙ্গে নিউটনীয় মেকানিক্সের তত্ত্বীয় কক্ষপথের অমিল বা ত্রুটি) অস্থায়ী এবং ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত ফলাফল দেবে-এই আশায় একপাশে সরিয়ে রাখার ধারণা হচ্ছে অবৈধ বা ভুল কৌশল তুল্য । যার লক্ষ্য, তাদের মতে, ফলসিফিকেশনকে এড়িয়ে যাওয়া । তবে, কেউ যদি পারিপার্শ্বিক শর্তগুলিকে(Peripheral Conditions) হিসেবে নেয়, তবে সে জোরালোভাবেই এটার সমর্থনে যুক্তি দিয়ে যাবে যে, উপরোক্ত পথে(এনোমালীকে সাময়িকভাবে একপাশে রেখে ত্রুটিটা বের করতে সম্ভাব্য অন্যান্য কারণ অনুমান করা এবং পরীক্ষণে যাওয়া-ভেরিফিকেশনিজম) অগ্রসর হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত, অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য । তা না হলে বিজ্ঞনের গতি থেমে যেত ।
    এমন ধরণের পরীক্ষণ অথবা পর্যবেক্ষণসমূহ চিরকালই চলে এসেছে যেগুলিকে সম্পূর্ণরুপে ব্যাখ্যা করা যায়না । অথবা, যেগুলি এমনকি তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে একপাশে সরিয়ে রাখা হয় আরো উত্তম দিনের প্রতীক্ষায় । তাই, নিউটনীয় মেকানিক্‌সের বিশাল সাফল্য কিংবা মার্ক্সীয় তত্ত্বগুলির সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক-বৈপ্লবিক প্রভাবের কথা মনে রেখে তাদের বাতিলের চিন্তা একেবারেই যুক্তিসঙ্গত হবেনা-শুধু কয়েকটি প্রেডিক্‌শন (পর্যবেক্ষণ দ্বারা আপাতভাবে) খন্ডিত হওয়া থেকে । যেহেতু অমিলগুলির সব ধরণের ব্যাখ্যা রয়েছে । (যদিও, পপার, তত্ত্বে আপাত-ত্রুটি ধরা পড়ার পরে এধরণের ব্যাখ্যা কিংবা সংশোধনী, যা এডহক কারেক্‌শন বা সংযোজন হিসেবে বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের কাছে, ঘোর বিরোধী তাঁর মতে তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বা বনেদিয়ানা হ্রাস পাবার আশংকায় ।) আর, মার্ক্সীয় তত্ত্বগুলির ক্ষেত্রে অনেক কাঁচা সমালোচক(যেমন অভিজিত রায়) রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডামূলক জনপ্রিয় ধারণাকে (যার উদ্দ্যেশ্য ছিল কেবল সর্বহারাদেরকে জাগানো) দার্শনিক বা অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন । উদাহরণস্বরুপ, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে যেসব মন্তব্য বা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কোন তত্ত্ব ছিল না, ছিল নিছক রাজনৈতিক টুল বা অস্ত্র বা কৌশল । কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে করা ভবিষ্যতবাণীগুলি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে করা হয়নি । সেগুলি কেবলমাত্র প্রোলেতারিয়েতকে উজ্জিবিত করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে মেথডলজি হিসেবে ।
    বাস্তবিক, নিউটনীয় মেকানিক্‌সে যেমন ত্রুটি হতে পারে অতিরিক্ত প্রকল্প বা তাত্ত্বিক বিবৃতিতে(Peripheral statements for hypotheses), নিউটনের মূল সূত্রে নয় । লাকাটোসের রিসার্চ প্রোগ্রামের মেথড অনুসরণ করে জোর দিয়ে বলা যায়, মার্ক্সের ক্যাপিটালে বর্ণিত “একটা নির্দিষ্ট সময় পর লভ্যাংশের হারের হ্রাস প্রাপ্তির’ ভবিষ্যতবাণীর ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য তাত্ত্বিক ভবিষ্যতবাণীর ব্যাপারে যে অপ্রত্যাশিত ফলাফল দেখা গেছে, সেগুলির ক্ষেত্রেও একই কথা, অর্থাৎ, সমস্যা মূল তত্ত্বে ছিলনা, ছিল পারিপার্শ্বিক শর্তে বা প্রকল্পে অথবা পরীক্ষকের উপাত্ত সংগ্রহের ত্রুটিতে(ক্যাপিটালের ক্ষেত্রে) কিংবা ইন্টারপ্রিটেশনে (নির্দিষ্ট সময় কি শর্ট টার্ম নাকি লং টার্ম ? ইত্যাদি), যার জন্য তত্ত্বকে দোষারোপ না করে পরীক্ষক বা পর্যবেক্ষণকারীর দক্ষতাকে দোষারোপ করতে হবে । মার্কারী গ্রহের কক্ষপথের নিয়ম বহির্ভূত আচরণের কারণ নিহিত থাকতে পারে একটি গ্রহের কক্ষ পরিক্রমনের মধ্যে, গ্রহানুমন্ডলে, অথবা অন্যত্র । অবশ্যই এই প্রকল্পগুলিতে পরীক্ষণের অধীন করতে হবে মার্কারীর কক্ষপথের পরীক্ষণ থেকে স্বাধীনভাবে । কিন্তু এই পরীক্ষাগুলো আবার অতিরিক্ত হাইপোথিসিসের উপর নির্ভর করবে । (বিস্তারিত ব্যাখ্যায় গেলাম না) প্রফিট রেইটের ক্ষেত্রে মার্ক্সের তাত্ত্বিক প্রেডিক্‌শনবিরোধী আপাত ফলাফলের কারণ মার্ক্স দিয়েছিলেন তার বিখ্যাত Counterbalancing Effect সঠিকভাবে সনাক্তকরণের মাধ্যমে । তখন, ছদ্ম বিজ্ঞান-দর্শনের পুরোহিত পপার (রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত হয়ে, অর্থাৎ, মার্ক্সবাদের বিরুদ্ধে একাডেমিক যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ প্রভাবিত হয়ে) তার সরল বাতিলযোগ্যতাবাদ অন্ধভাবে অনুসরণ করে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, “বিজ্ঞানী যদি বার বার এনোমালী সংশোধনের জন্য তত্ত্বের এডহক পরিবর্তন ঘটান এবং এভাবে ফলসিফিকেশনের নীতিকে এড়িয়ে চলেন, তবে তত্ত্বটি তাঁর দৃষ্টিত বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে । এটা ঠিক কেউ অনন্ত কাল ধরে এনোমালী সংশোধনার্থে পর্যবেক্ষণ বা ভেরিফিকেশন চালাবে-সেটা বিজ্ঞানী মহলে বা বৈজ্ঞানিক অর্থে কারো কাছে গ্রহণযো নয়গ্য । এটা অবশ্যই ঠিক যে, একটা সময় পর এডহক ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে বেশ অবিশ্বাস্য বা কল্পনাসুলভ হয়ে উঠে । তবে, এটাও দেখতে হবে যে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এধরনের প্রক্রিয়া সহজেই অর্ধ শতাব্দী পর্যন্ত চলেছে, যা কিনা মার্কারীর কক্ষপথের ক্ষেত্রে লেগেছিল । অতএব, শুধুমাত্র মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্বকে টার্গেট করাটা সৎ উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত নয়, যখন সেটি আবার জটিল সামাজিক বিবর্তন নিয়ে যেখানে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ব্যাখ্যা, দক্ষতা ইত্যাদির প্রশ্ন রয়েছে ।
    তাছাড়া ওয়েনবার্গ (Weinberg, 1992) লক্ষ্য করেন যে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সৌরমন্ডলের মেকানিক্‌সের বেশকিছু এনোমালী বা অনিয়ম (তাত্ত্বিক প্রেডিক্‌শনের সঙ্গে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে প্রাপ্ত অপ্রত্যাশিত ফলাফল বা প্রপঞ্চ বা ফেনোমেন বা পরীক্ষাধীন বস্তুর আচরণ) রয়েছে । শুধু মার্কারীর কক্ষপথই নয়, বরং চন্দ্রের কক্ষপথ, হ্যালির ধুমকেতু ও এঙ্কের ধুমকেতুর (Encke’s Commet) কক্ষপথেও এনোমালী ধরা পড়েছিল । বিজ্ঞানী মহল ও জ্যোতির্বিদ্যার ছাত্ররা আজ জানে যে, পরের অনিয়মগুলি ছিল অতিরিক্ত হাইপোথিসিসের মধ্যকার ত্রুটির কারণে-তত্ত্বের শাঁস অংশের(Ther Core part) কারণে নয় ঃ যথা-ধুমকেতু হতে গ্যাসের বাষ্পিভবন এবং চন্দ্রের উপর ক্রিয়ারত জোয়ার-ভাটার বলের প্রভাব অসম্পূর্ণভাবে বোঝা বা ব্যাখ্যা করা হয়েছিল । (দেখুন, এখানে কিন্তু ইন্টারপ্রিটেশনের গুরুত্ব আবারো চলে আসছে, যা পপার-অনুসারীরা অগ্রাহ্য করেছেন ।) এবং তারা এও জানেন যে, শুধু মার্কারির কক্ষপথই নিউটনীয় মেকানিক্সের ফলসিফিকেশনকে প্রমাণ করে না । কিন্তু সে যুগে আদৌ সেটি স্পষ্ট ছিল না, যেহেতু বিজ্ঞানের দর্শন তখন পরিপক্ক বা উন্নত হয়নি ।
    বিজ্ঞান একটি যুক্তিমাফিক কর্মদ্যোগ, কিন্তু যার সারসংগ্রহকরণ বা রীতিভুক্তকরণ অত্যন্ত কঠিন ………………………..এটা দাবী করা কুযুক্তিপূর্ণ বা ধূর্ততাপূর্ণ কুতর্ক যে, বিজ্ঞানীরা নিজেরাই যেসব কড়া নিয়ম-পদ্ধতি (গবেষণায়) আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করেন না, সমাজতত্ত্বে বা অধিবিদ্যায়(এখানে অধিবিদ্যা বা Metaphysics বলতে ঠিক বিশ্বতত্ত্ব(বিশ্বতত্ত্ব ঃ জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত শাখা Ontology বা তত্ত্ববিদ্যা) বোঝানো হচ্ছে না,-বোঝানো হচ্ছে বিমূর্ত প্রকল্প, কনসেপ্ট বা তত্ত্বীয় বিদ্যা যা পরবর্তীতে প্রমাণিত ও মূর্ত তত্ত্বে ভিত্তিরুপে কাজ করবে । যেমন কীট এবং উড়ী (Keat and urry) বলছেন, “(প্রকৃতিবাদে) একটি অন্তর্নিহিত মূলগত দাবী হচ্ছে যে, বিজ্ঞানের শুধু একটিই লজিক বা যুক্তি রয়েছে ; যা বিজ্ঞানের শিরোনাম প্রত্যাশী বা বিজ্ঞানের নামে গবেষণারত যেকোন বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মপ্রচেষ্টাকে অবশ্যই মেনে চলতে হয় । (Keat and Urry, Social Theory of Science, p.25)
    উপরে নির্দেশিত General Logic of Science’ কথাটির ব্যাখ্যা বা ইন্টারপ্রিটেশন মার্কিন সমাজতাত্ত্বিক ডেনিয়েল লিটল করেছেন এভাবেঃ-) জেনারেল লজিক অব সায়েন্স সেই তত্ত্বব্যবস্থাকেই বোঝায় যা অন্তর্ভুক্ত করেঃ “বৈজ্ঞানিক জ্ঞানতন্ত্রের যৌক্তিক বিন্যাসরুপে তার কিছু বিমূর্ত উপাদান বা বৈশিষ্ট্য, তত্ত্ব ও নজীরের মধ্যকার সম্পর্ক, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বৈশিষ্ট্য, এবং বৈজ্ঞানিক কন্সেপ্টের চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য । (Daniel Little, ‘The Scientific Marx: Naturalism and Capital(of Karl Marx), pp. 13-14)
    আমরা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সংক্রান্ত বিশেষায়িত Metaphysics(যা কার্ল পপার অধিবিদ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, সেই মেটাফিজিক্স নয়; বরং বিমূর্ত উপাদান অর্থে) নিয়ে কিছু আলোকপাত করব । ডেনিয়েল
    লিট্ল্ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিমূর্ত উপাদান সম্বন্ধে লিখেছেন ঃ “………………….On this view, scientific knowledge takes the form of deductive theoretical systems…………………….This form of naturalism can be summarized through the following theses : (1)………………..(2) Such theories typically describe unobservable mechanisms in order to explain observable conditions………………” অর্থাৎ, এধরণের তত্ত্বগুলি পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণযোগ্য শর্ত বা অবস্থানগুলিকে ব্যাখ্যার জন্য অপর্যবেক্ষণযোগ্য মেকানিজমকে টিপিক্যালি বর্ণনা করে । উদাহরণস্বরুপ, থিওরিটিক্যাল মেকানিক্সের তিনটি সূত্র ঃ X(summation)=0, Y(summation)=0; Z(summation)=0 (চলছে পরবর্তী বক্সে)

    Reply
  • July 13, 2019 at 4:53 pm
    Permalink

    (চলছে উপরের বক্স থেকে) দার্শনিক হেম্পেল একটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরেন যখন তিনি লিখেছেন “এটা একটা লক্ষ্যণীয় ফ্যাক্ট যে, …………………..বৈজ্ঞানিক প্রণালীবদ্ধকরণের ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ সাফল্য, পর্যবেক্ষণযোগ্য সূত্র বা নিয়মগুলিকে স্পষ্টভাবে(Explicitly) নির্দেশ করার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি,……………….বরং সেই নিয়ম-সূত্রগুলির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে যেগুলি বিবিধ প্রকল্পগত(Hypothetical), অথবা তাত্ত্বিক বা অস্তিত্ত্বের এককের(Entities) ব্যাপারে বলে বা প্রকাশ করে । (Hampel, “The Theoretician’s Dillema, p. 177)
    প্রকৃতিবিজ্ঞানের সর্ববৃহৎ সাফল্যের সবই(যথা-পরমাণু তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স্, জেনেটিক তত্ত্ব ইত্যাদি) পর্যবেক্ষণযোগ্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর (অর্থাৎ প্রপঞ্চ) ভিত্তিরুপে ক্রিয়ারত প্রকল্পগত সত্ত্ব বা একক(Hypothetical Entity-যেমন পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ কণা বা শক্তি-প্যাকেটের ধারণা) অথবা প্রক্রিয়াগুলোর স্বতসিদ্ধ স্বীকৃতরুপ(Postulation-এখানে অর্থ হচ্ছে ‘বিমূর্তায়ন’) যা পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়-সেইসব প্রপঞ্চ বা এনটিটির উপর নির্ভর করেছে । কি পাঠক, স্পষ্ট হলো না তো ? এখনই খোলাসা হবে । নিউটনের সময় থেকেই পদার্থ বিজ্ঞান হয়ে এসেছে খুবই তাত্ত্বিক ও বিমূর্ত । ………………..এই বিজ্ঞানগুলি (Predictive Theory Naturalism-এর নিয়মে) পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রপঞ্চগুলিকে(পরমাণু, বল, জিন) ব্যাখ্যার জন্য অপর্যবেক্ষণযোগ্য এনটিটি(Entity) বা অস্তিত্ত্বকে স্বতঃসিদ্ধরুপে স্বীকৃতি দিয়েছেন । (The Scientific Marx, Naturalism and Capital, p. 15) আশা করি এতটুকুই যথেষ্ট হবে । পুরো প্রবন্ধ দেওয়ার স্কোপ নেই । অভিজিত দার প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে চাই, যে তিনি তাঁর ঐ প্রবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রএর সি আই এ কর্তৃক সমগ্র লাতিন আমেরিকায় যে গণহত্য চালানো হয়েছে(চিলি গুয়াতেমালা থেকে শুরু করে নিকারাগুয়া মেক্সিকো সর্বত্র) সেসব নিয়ে কোন শব্দ উল্লেখ করেননি । ভারসাম্যের যেকোন একটা স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা উচিত । তিনি যদি মনে করেন, যে প্রবন্ধটি বিজ্ঞান নিয়ে রাজনীতিই নিয়ে নয়, তাহলে ষ্টালিনের ঘটনা নিয়ে এবং তখনকার বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আলাদা প্রবন্ধ লিখতে পারতেন। একটি একাডেমিক আলোচনার মধ্যে রাজনৈতিক বিষয় না আনলেই পারতেন । ষ্টালিনের বাড়াবাড়ি বা গ্ণহত্যাকে সাফাই দেওয়ার কোন সুযোগ আমাদের নেই, কিন্তু তার জন্য কি তিনি একা দায়ী ছিলেন ? যুদ্ধ কি তার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি ? তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে কি করতে পারতেন এই প্রশ্নগুলি করা জরুরী, বিশেষ করা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্রগুলি হয়েছিল সেগুলি মনে রেখে । সি আই এ সেখানে তৎপর ছিল, ষড়যন্ত্র চালাচ্ছিল পার্টির ভেতরে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির অব্যাহত ষড়যন্ত্র, একটি সদ্য জন্ম নেওয়া সমাজতান্ত্রিক দেশের বিরুদ্ধে । ষ্টালিন যদি কৃষকদের উপর চাপ সৃষ্টি না করে তথাকথিত “জোরপূর্বক” কালেক্টিভ চাপিয়ে না দিতেন, এবং রাজস্ব যদি সংগ্রহ না করা যেত, তাহলে এত দ্রুত শিল্পায়ন সম্ভব ছিল না-আর যার পরিণতি হতো হিটলারের বাহীনীর হাতে শোচনীয় পরাজয় কারণ দ্রুত শিল্পায়ন না ঘটালে জঙ্গী বিমান, ক্ষেপনাস্ত্র, ট্যাঙ্ক ইত্যাদি উৎপাদন সম্ভব ছিলনা । ষ্টালিন জানতেন যে হিটলার আক্রমণ করতে যাচ্ছেন তাই তার হাতে সময় ছিল অত্যন্ত কম শিল্পায়নের জন্য । রাশিয়া শিল্পের দিক থেকে পশ্চিম য়ূরোপের দেশগুলি থেকে পিছিয়েছিল এটা তো তার দোষ ছিলনা, হিটলার যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন ষ্টালিনের উপর সেসব অভিজিত বাবু এড়িয়ে গেছেন । একটি লোককে সমস্ত চাপগুলি নিতে যা তাকে উম্মাদ করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল । হয়েছিলও তাই, তিনি ক্রনিক ডিসর্ডারে ভোগা শুরু করেছিলেন শেষ দিকে । সামগ্রিক পরিস্থিতি তাকে পাগল করে তুলেছিল । তিনি প্যারানয়াল ডিসর্ডারে ভোগেছিলেন সেটা সবাই জানে । ব্যক্তি ষ্টালিনকে দায়ী করার সেই সময়ের বিশ্ব পরিস্থিতি আমাদের হিসেবে নেওয়া উচিত । পক্ষান্তরে সেই সময় য়ুরোপের কমিউনিষ্টরা যে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, অভিজিত বাবু সেই ব্যাপারটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন । যাই হোক, মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান , পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর যে ত্যাগ আমি তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে আমার দ্বিমত বা আপত্তি শেষ করছি ।

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: