ভগবদ গীতার সমালোচনায়

গীতা হচ্ছে হিন্দুধর্মের মানুষের কাছে একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র গ্রন্থ। বর্তমানে সমাজে যার জনপ্রিয়তা আকাশছোয়া। গীতা একটি নিত্য পাঠ্য গ্রন্থ ও বটে, এবং দাবী করা হয় গীতা একটি অপুরুষীয় গ্রন্থ। কিছু লোক দাবী করেন এটি একটি বিজ্ঞানময় গ্রন্থ। দীর্ঘদিন গীতা পড়ে গীতার মধ্যেকার যে সকল হাস্যকর বৈজ্ঞানিক ভুল, জাতিভেদ, সামাজিক অবক্ষয় এবং অমানবিক বিষয় আছে তা নিচের লেখাগুলোতে উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি।

কলেজে পড়ার সময় এক স্যার আমাদের প্রায় বকা দিয়ে বলতেন: ‘‘যারা গাধাকে ঘোড়া বলে, তারা গাঁধা চিনে না, ঘোড়াও চিনে না। যারা ধর্মকে (Religion) এবং ধর্মিয় গ্রন্থকে বিজ্ঞান বলে দাবি করেন, তারা বিজ্ঞান বোঝেন না, ধর্মও বোঝেন না! বোঝেন শুধু নিজেদের আখের গোছানো।”

যারা ধর্মের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়, তারা ধার্মিকও নয়, বৈজ্ঞানিকও নয়। শুরুতেই স্বর্গ থেকে যাকে বিতারিত করা হয়েছিল, তারা তাঁদের বংশধর। -হুমায়ূন আজাদ

বিজ্ঞান আজ অস্বাভাবিক গতিতে অপ্রতিরোধ্য। আর আজকের আধুনিক যুগে ধর্মের বাণীগুলো কেমন যেন বোকা-বোকা ধরনের কথাবার্তা বলেই মনে হয়। বোঝাই যায়, এখন বিজ্ঞানে সাথে ধর্মের মেল ঘটাতে না পারলে যে, পাবলিককে গেলানো যাবে না, আর পাবলিক না খেলে যে….প্রভুজি, বাবাজি, মাতাজি, স্বামীজিদের তল্পিতল্পা বেঁধে ল্যাম্পপোস্টের নিচে থালা হাতে বসে থাকতে হবে! পাঠক, লেখাটি পড়ে নিশ্চয় অনেক প্রশ্ন তাৎক্ষণিক মাথায় উদয় হচ্ছে তাই না? এবার আসুন কথাগুলোর বলার কারণ নিচে ব্যাখ্যা করছি. গীতার প্রথম অধ্যায়ের বিষাদ-যোগ থেকে পাঠ করলে আমরা দেখি সঞ্জয়, রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ ময়দানে তার পুত্র এবং পান্ডুর পুত্রগন(পঞ্চ পান্ডব) কি করছেন তা র্বণনা করছেন।বিষাদ-যোগ শ্লোক (১-১০/১১) নং শ্লোক পড়লে বোঝাযায়। এরপর থেকে শুরু হয় গীতার আসল গোজামিল! যুদ্ধশুরু করার জন্য কুরুবংশের পিতামহ ‍অতি উচ্চনাদে তাঁর শঙ্খ বাজালেন অন্যদিকে পান্ডবরা ও তাদের নিজ নিজ শঙ্খ বাজিয়ে যুদ্ধ শুরু করলেন শঙ্খ-নিনাদের সেই প্রচন্ড শব্দে আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত হল। এখন অর্জুন উভয় পক্ষের সৈন্যদের মধ্যে রথ স্থাপনের জন্য কৃষ্ণকে অনুরোধ করলেন, এরপর অর্জুন উভয় পক্ষের যোদ্ধাদের মধ্যে তার আপনজন ও গুরুজনদের দেখে তিনি যুদ্ধ করার ইচ্ছা হারিয়ে পেলেন মূলত গীতার মূল বক্তব্য এইখান থেকে শুরুহয় পাঠক গণ একটু খেয়াল করলে বোঝতে পারবেন যে ইতপূর্বে আমরা আগের শ্লোক থেকে জানতে পারি যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে তো যুদ্ধের মাঝে কৃষ্ণ কিভাবে এতোসব কিচ্চা-কাহিনি রঠালেন আমার দৃষ্টি তো অসম্ভব ব্যাপার মনে হয় আরো সহজ করে বলতে গেলে বলা যায় করিম উদ্দিন এবং রহিম উদ্দিন দুই বন্ধু মিলে কক্সবাজার যাচ্ছে পিকনিক করতে, কিন্তু দুর্ভাগ্য বিষয় তারা উভয়ে বাস মিস করেন, কিন্তু তারা দুইজনে বলে বেরাচ্ছে কক্সবাজারে তারা পানিতে লাফা-লাফি করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিক তেমনি কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের ময়দানে প্রচন্ড ভাবে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরেই কিভাবে তারা আপন মনে গল্পগুজপ করলেন হিসাব-নিকাশ তো কিছুই মিলছে না! একটু চিন্তা করেন!

এখন দেখা যাক বিজ্ঞানময় ধর্মগ্রন্থে কি কি বিজ্ঞান পাওয়া যায়!

(১৮:৬১) হে অর্জুন! পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত জীবের হৃদযে অবস্থান করছেন এবং সমস্ত জীবকে দেহরুপ যন্ত্রে আহোরণ করিয়ে মায়ার দ্বারা ভ্রমন করেন।

‘‘ভগবান প্রাণীদের হৃদয়ে অবস্থান করেন? তা হৃৎপিন্ড কি? কেনই বা হৃৎপিন্ডে অবস্থান করবেন? ওটা তো পাম্প মাত্র, যা সারা শরীরে রক্ত প্রবাহ সচল রাখে। আধুনিক কালে হৃৎপিন্ডের বিভিন্ন সমস্যার কারনে ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয় কিন্তু কোন আত্মা-পরমাত্মা ভগবানের তো পাওয়া যায় না(মানুষের সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক)প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন উন্নত ছিল না তখন মানুষ মনে করত হৃৎপিন্ডে সব কিছু কেননা শরীরের একমাএ হৃৎপিন্ড স্পন্দন অনুভব করা যায়।
এইথেকে কি এটা বোঝা যায় শ্রী কৃষ্ণ হৃৎপিন্ড এবং মস্তিকের পার্থক্য জানতেন না?

(৩:১৪)= প্রাণিগন অন্ন হইতে উৎপন্ন হয়, বৃষ্টি হইতে অন্ন উৎপন্ন হয়, যজ্ঞ হইতে মেঘ উৎপন্ন হয়, কর্ম হইতে যজ্ঞ হয়।।

মেঘ হইতে কিভাবে বৃষ্টি সৃষ্টি হয়? মেঘ তো সৃষ্টি হয় পানি চক্রের মাধ্যমে তাহলে আমরা কি মনে করতে পারি প্রাচীন যুগের মানুষের মতো কৃষ্ণের জ্ঞান অন্য সাধারণ মানুষের মত ছিল।

গীতায় স্ববিরোধী কথা

(৪:৫) তোমার এবং আমার বহু জন্ম হয়েছে, সে সকল আমি জানি কিন্তু তুমি জান না।“আবার (১০র্ম) অধ্যায়ে বিভূতিযোগে বলছেন (১০:৩)/ আমার আদি নাই, জন্ম নাই, সর্বলোকের মহেস্বর তিনি”
বক্তব্যটা স্ববিরোধী হয়ে গেল না? কিন্তু এখানে শেষ নয়! আরো কিছু উদাহারন আছে:
গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে (মোক্ষযোগ, ১৮:৪০)বলেন, এই পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে অথবা স্বর্গে দেবতাদের মধ্যে এমন কোন প্রাণির অস্তিত্ব নেই যে প্রকৃতিজাত এই ত্রিগুণ থেকে মুক্ত।

ত্রিগুণ ‍কি? গীতার ভাষ্য মতে সত্ত্ব, রজো, তম,! কিন্তু গীতায় শ্রী কৃষ্ণ (সাংখ্য-যোগ২:৪৫) বলছেন বেদে প্রধানত জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সম্বন্ধেই আলোচনা করা হয়েছে। হে অর্জুন! তুমি সেই গুণগুলিকে অতিক্রম করে নির্গুণ স্তরে অধিষ্টিত হও। সমস্ত দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হও। অর্থাৎ ত্রিগুণাতিত হও!
কিভাবে সম্ভব? আবার গীতার সন্নাসযোগের ১৫নং শ্লোকে শ্রী ভগবান বলছেন ভগবান কারো পাপ বা পূন্য গ্রহন করেন না আবার রাজগুহ্য-যোগে বলছেন, আমি সকলের প্রতি সমান ভাব সমভাবাপন্ন ।কেউ আমার বিদ্বেষ ভাবাপন্ন নয় এবং প্রিয়ও নয়। কিন্তু যারা ভক্তিপূর্বক আমাকে ভজন করেন, তারা আমাতে অবস্থান করেন এবং আমিও তাদরে মধ্যে বাস করি। “অথচ” জ্ঞান-বিজ্ঞানযোগের 15 নং শ্লোকে দেখা যায় ভগবানের ঈশ্বরত্বে, ধর্মমতে অবিশ্বাসী, তাদেরকে তিনি বিবেকশূন্য, নরাধাম, পাপকর্মপরায়ণ, হিসেবে অভিহিত করেছেন! ভগবানের প্রচারিত ধর্মের প্রতি যাদের আস্থা নেই তারা মৃত্যুময় সংসারে বারবার আবর্তিত হয়। দৈবাসুর-সম্পদ বিভাগযোগে ভগবান বলেন(16.18-20) বল, দর্প, অহংকার্ ক্রোধের বশবর্তী হয়ে বিদ্বেষকারীকে আমি অশুভ অসুর যোনিতে অজস্রবার নিক্ষেপ করে থাকি। মূঢ়েরা(মূর্খ ব্যাক্তি) জন্মে-জন্মে অসুরযোনি প্রাপ্ত হয় এবং আমাকে না পেয়ে আরো অধমগতি লাভ করে। দেখা যাচ্ছে অন্য ধর্মের ঈশ্বরের মতো শুধুমাএ নিজের ভক্তদের প্রতি দয়াশীল; কিন্তু ‍নিরুশ্বরবাদী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ভয়ানক নিষ্টুর! বরং মনে হয় গীতার ভগবান একটু নিষ্টুর এবং বেশি এগ্রেসিভ।

গীতায় ভগবানের কিছু কুৎসিত দিক!

গীতার একাদশ অধ্যায়ে বিশ্বরূপ-দর্শনযোগে ভগবান যখন শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর বিশ্বরুপ ধারন করলেন(১১:২৩-৩১) ভগবানের আকাশর্স্পশী তেজোময় দীর্ঘ দন্তযুক্ত, উজ্জ্বল বিশাল উরুপদ-উদর বিশিষ্ট উগ্রমূর্তি দেখে অর্জুন ভয় পেয়ে গেলেন, এবং জানতে চাইলেন তিনি কে? উত্তরে ভগবান জানালেন (১১.৩২) আমি লোকক্ষয়কারি মহাকাল, লোক সংহারে প্রবৃত্ত হইয়াছি..।
এতো কিছু বলার পরও আর্শ্চয্যর ব্যাপার হচ্ছে,
বিভূতিযোগে(১০.৩১)নিজের শ্রেষ্ঠত্ব তুলনা করতে গিয়ে কৃষ্ণ বললেন, তিনি মৎসদের মধ্যে মকর(কুমির) সমস্ত নদীর মধ্যে গঙ্গা! হাস্যকর কথা, গঙ্গা নদী কি পৃথিবির সব থেকে বিশাল নদী? এর থেকে বড় নদী কি আর নেই? নাকি ভগবান আর বাকী সব নদীর কথা জানতো না?
এবার দেখুন গীতার ভগবান মাছের মধ্যে কুমিরের সাথে তুলনা করছেন(ছি.! ছি.!) হাতির সাথে মাছির তুলনা কি যর্থাথ!। কুমির কি মাছ? কুমির হচ্ছে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণি; (Reptile) সরীসৃপ জাতীয় প্রাণির সাথে আর মাছের পার্থক্য জানতে হলে দেখি সর্বজ্ঞানি ভগবানকে এখন মাধ্যমিক শ্রেণির জীব বিজ্ঞান বই পড়ে আসতে হবে আবার পানিতে কি কুমিরের ছেয়ে অন্য কোন প্রাণি আর বড় নেই? নাকি ভগবান নিজেও জানেন না বিষয়টা। সবার অবগতির জন্য জানিয়ে ‍দিচ্ছি যে ‍তিমি মাছ কিন্তু মাছ না! ভগবান মনে হয় তার জীবনে কুমিরের চেয়ে আর বড় প্রাণি চোখে দেখেন নি।
মজার কথা হচ্ছে বিভূতিযোগে ভগবান নিজের সাথে ঋতু হিসেবে বসন্তের, মাসের মধ্যে অগ্রহায়ন(১০;৩৫) পশুর মধ্যে সিংহ, পাখির মধ্যে গরুর পাখি,(এই পাখির নাম শুধু হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থেই পাওয়া যায় বাস্তবে কোন হদিস পাওয়া যায় নি।) (১০.৩৭) হাতির মধ্যে ঐরাবত ,সাপের মধ্যে বাসুকি (গরুর পাখির মত এই সাপের নাম ও কোথাও পাওয়া যায় না) (১০;২৭-২৮) মহাভারতের সত্যবাদী হিসেবে যুধিষ্টিরকে বাদ দিয়ে অর্জুনের সাথে তুলনা করেছেন, এমন কি ভগবান নিজেই-নিজের সাথে তুলনা করেছেন(১০.৩৭) হায়রে ভগবান। নিজের শ্রেষ্টত্ব-বিশালত্ব জাহির করতে গিয়ে এত নিচে নেমে আসতে পারল। শেষমেশ হাতি, ঘোড়া, সাপ, পাখির সাথে তুলনা করলেন।
১০ম অধ্যায়ে আরেকটি শ্লোক(১০.২১) দেখুন হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে। ভগবান বলেন “আমি আদিত্যগণের মধ্যে বিষ্ণু জ্যেতিস্কগণের মধ্যে কিরণশালী সূর্য্, মরুতদের মধ্যে আমি মরিচি, নক্ষেত্রদের মধ্যে আমি চন্দ্র। ভাবতে অবাক লাগে যারা দাবি করেন ভগবান এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা তিনি কি করে নক্ষত্র এবং চন্দ্রের মধ্যে পার্থক্য জানেন না( চন্দ্র মানে চাঁদ আর চাঁদ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ কোন নক্ষত্র না) চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই, চাঁদ সূর্য্ থেকে আলো নিয়ে আলো বিস্তার করে। সর্বজ্ঞানী ভগবান কি সেটাও জানেন না? তাইতো (১৫.১২) আবার নিজেকে সূর্য্,চন্দ্র,অগ্নির তেজকে নিজের তেজ বলে অভিহিত করেছেন।

গীতার মধ্যে ভগবান স্বয়ং জাতিভেদের প্রবক্তা

ভারতবর্ষে বৈদিকযুগের সমাজ ব্যবস্থায় ‍হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, এই চার প্রকার জাতিতে হিন্দু সমাজ বিভক্ত ছিল। সমাজের উপরতলার মানুষ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় আর নিচু তলার মানুষ বৈশ্য এবং শূদ্ররা। সমাজ-কাঠামোর সকল সুযোগ-সুবিধা শাসন-ক্ষমতা ভোগ করতো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় শোষক-গোষ্টী আর উদয়-অস্ত শ্রম ‍দিয়ে সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা, ভোগের যোগান টিকিয়ে রাখতো বৈশ্য-শূদ্ররা। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের আঁতাত সম্পর্কে খুব সুন্দর করে বর্ণিত হয়েছে। (৯:৩২২) ব্রাহ্মণহীন ক্ষত্রিয় উন্নতি লাভ করতে পারে না, আর ক্ষত্রিয়হীন ব্রাহ্মণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় মিলিত হয়ে ইহলোকে ও পরলোকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
এই ইহলোকে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের মিলিত শাসনে বৈশ্য থেকে শূদ্রদের সামাজিক অবস্থান ছিল আরো করুণ! সঠিকভাবে বলতে গেলে শূদ্র আর নারী উভয়ের সামাজিক অবস্থান ছিল প্রায় এক সূতায় গাঁথা। বর্ণভেদ প্রথার গুরুতর আর্থ-সামাজিক অসাম্যকে ঐশ্বরীয় সমর্থন দেবার উদ্দেশ্য যখন গীতায় ভগবান বলে উঠেন(৪:১৩) চাতুর্বর্ণ্যয়ং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।/তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম।। অর্থাৎ, গুণ অনুযায়ী কর্মের বিভাগ অনুসারে আমা দ্বারা চাতুর্বর্ণ্য সৃষ্টি হয়েছে। আমাকে তার কর্তা এবং অব্যয় অকর্তা রূপে জানবে। মানেটা হল কি? শূদ্রদের জন্য এতো অন্যায় রীতিনীতি-নির্দেশ দয়ালু ভগবান নিজের সৃষ্টি বলে সাফাই গেলেন!
অবশ্য ভগবান আগেই জানিয়ে দিয়েছেন(৪:১) গীতার তত্ত্ব তিনি নাকি আগেই সূর্যকে বলেছিলেন, সূর্য্ মনুকে, মনু স্বপুত্র ইক্ষাকুকে বলেছিলেন। যা-হোক ভগবান গীতায় আরো বলেন(১৪:১৮) “ঊর্ধ্বং গচ্ছন্তি সও্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ/ জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ।। অর্থাৎ সও্বগুণের অধিকারীরা ঊর্ধ্বে যায়, রজঃগুণসম্পন্নরা মধ্যে অবস্থান করে আর তমোগুণসম্পন্ন লোকেরা জঘন্য বৃত্তিতে নিযুক্ত হয়ে অধোগামী হয়। কিন্তু ভগবানের দৃষ্টিতে সও্বগুণের অধিকারী কারা? রজঃ বা তমোগুণসম্পন্ন কারা, সেটাতো আগে দেখতে হবে।
এ বিষয়ে মনুসংহিতা থেকে জানা যায়, সত্ত্বগুণজাত হচ্ছে ব্রহ্মা, ‍বিশ্বস্রষ্ট্রাগণ যজ্ঞকারী, ঋষি, দেবতা, বেদ তপস্বী, সন্নাসী, ব্রহ্মণ প্রমুখ(মনুসংহিতা, ১২:৪৮-৫০) রাজা, ক্ষত্রিয়, যক্ষ, দেবগণের অনুগামী, অস্ত্রজীবী লোক প্রমুখ রাজোগুসম্পন্ন; আর হাতি, ঘোড়া, শূকর, শূদ্র, নিন্দিত ম্লেচ্ছ সিংহ, বাঘ, ধর্মচারণকারী, রাক্ষস, পিশাচ, হচ্ছে তমোগুণজাত(মনুসংহিতা, ১২:৪৩-৪৪)।
তাহলে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে ভগবান গীতায় ১৪তম অধ্যায়ের ১৮নং শ্লোকের এই উক্তির মাধ্যমে আর্য্ সমাজ এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রচলিত অর্থসামাজিক কাঠামোর ব্রাহ্মণ্যদের উচ্চস্থান, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের মধ্যস্থান আর শূদ্রের নিন্মস্থানের নিদের্শ করছে। দয়াময় ভগবান, যিনি সর্বপ্রাণীর হৃদয়ে অবস্থান করেন বলে দাবি করেন, অথচ তিনি গীতায় বলে উঠেন(১৭:১০) ‘‘যাতযামং গতরসং পৃতি পর্যুষিতঞ্চ যৎ /উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম।।”; বাংলা করলে হয়, বহুদিনের পূর্বের বাসী, রসশূন্য, দুর্গন্ধযুক্ত, উচ্ছিষ্ট এবং অপবিত্র খাদ্য তমোগুণ সম্পন্ন লোকের প্রিয়। হায়রে! সর্বজ্ঞ ভগবান কি জানেন না যে, এরকম খাবার তথাকথিত তামস প্রকৃতির শূদ্রলোকেরা ভালবেসে খায় না। বাসি, নিরস, উচ্ছিষ্ট এবং অপবিত্র খাবার তারা দারিদ্রের পীড়নে খেতে বাধ্য হয়। বাসী-নিরস-উচ্ছিষ্ট খাবার কারো-ই বা খেতে কারো-ই বা খেতে ভালো লাগে? অথচ ভগবান নিকৃষ্ট খাদ্য গ্রহণকেই শূদ্রদের স্বভাব তমোগুণের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সাধারণ চিন্তা থেকেই বোঝা যায়, তৎকালিন যুগের অমানবিক অর্থসামাজিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থের কুখ্যাত চাতুর্বর্ণ প্রথাটি শ্রী ভগবনের মুখ দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীর(ক্ষত্রিয়দের যোগসাজশে) বলেছেন; শ্রী ভগবানের দোহাই দিয়ে, ধর্মিয় ভাবাবেগ তৈরি করে, দারিদ্র ক্লিষ্ট অনাহারী মানুষেরা(শূদ্ররা) যেন তাদের(ব্রাহ্মণ্যদের) ক্ষমতার প্রতি অফুরন্ত লিপ্সা মিটিয়ে চলে বিনা প্রশ্নে, বিনা বাঁধায়। এখানে একটি বিষয়ে ছোট করে বলে নেয়া যায়, পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রাচীনকালে শ্রম বিভাজনভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণী সময়-সুযোগ পেলেই আর্থ-সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরুপ বিদ্রেহ করেছে। এখান থেকেই শ্রমিকশ্রেণীর মানবমুক্তির বীজ বপিত হয়েছে; যেমন প্রাচিন চীন, গ্রিক সাম্রাজের, রোমান সাম্রজে বরাবর দাস বিদ্রোহ হয়েছে। এমন কি ১৭৮৬-১৭৯৫ সাল ব্যাপী সংঘটিত ফরাসী বপ্লিব পৃথিবীর গণমানুষের চেতনায় মোড় ঘুড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভারতবর্ষে এরকম শ্রমিকশ্রেণীর জেগে উঠার নজির ইতিহাসে তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না।(মৌর্য্ যুগের শেষের শূদ্রবিদ্রোহ বাদে)। কারণটা কি? কারণটা হচ্ছে ধর্ম নামক আফিম।

আমার জানা মতে আর কোন দেশে এরকম শ্রেণীবিভাগের কাঠামোকে ধর্মীয় আবরণে বংশানুক্রমিক ও চিরস্থায়ী করার রীতি ছিল না কিংবা সম্ভবও হয়নি। ভারতবর্ষেই একমাত্র মনুসংহিতা-গীতা-উপনিষদ ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে কর্মফল, জন্মান্তবাদ, অবতারত্ত্ব ইত্যাদির দোহাই দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীসহ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমজনতাকে বেঁধে ফেলে ধর্ম নামক আফিমকে পৌরাণিক ঐতিহ্যের নামে গলাধঃকরণ করিয়ে গুটিকয়েক ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়গোষ্ঠীর স্বার্থে দাস শ্রেণীতে পরিণত করাই ছিল শাস্ত্রকারদের মূল লক্ষ্য। ধর্মের নামে সামাজিক শোষন আর নিপীড়নের এতো দীর্ঘস্থায়ীরুপ দেখে বলা যায়, তারা তাতে সফলকামও হয়েছিল।

এবার আলোচনাটুকু গুটিয়ে আনি; উপরের বিস্তারিত আলোচনা থেকে দোখা যায়, ভগবদগীতা-ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের নিজস্ব কাঠামো, শাসন-শোষণ, চাতুর্বর্ণ প্রথা টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন ব্রাহ্মণদের সুদীর্ঘ সময় ধরে সুকৌশলে রচিত। এটি কোনোভাবাই কোন দেবতার মুখঃনিসৃত বাণী নয়; নয় কোন আধ্যাত্মিক গ্রন্থ। হতে পারে প্রাচিন সাহিত্য হিসেবে এর ঐতিহাসিক একটা মূল্য রয়েছে, কিন্তু স্পষ্ট করে বলা যায়, বর্তমানে গণমানুষের কল্যাণের জন্য-মুক্তির জন্য, বিজ্ঞান-দর্শন চর্চায়-প্রসারে, জ্ঞানের বিকাশে এর বিন্দুমাত্র কোন ভূমিকা নেই।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:

(১)শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী কতৃক(আনুবাদকৃত) শ্রীমদ্ভগবগগীতা যথাযথ, ভক্তিবেদান্ত বুক ট্র্রাস্ট
(২)শ্রী প্রাণকুমার ভট্টাচার্য্ এম এ(সম্পাদিত)নিউ এজ পাবলিকেশন্স প্যারী দাস রোড, ঢাকা-১১০০
(৩)শ্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ(সম্পাদিত)১৯১৭ শ্রীমদ্ভগবদগীতা,প্রেসিডেন্সী,কলকতা
(৪)সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপধ্যায়(ভূমিকা, অনুবাদ,টীকা)২০০২, মনুসংহিতা,আনন্দ পাবলিকেশন্স
(৫) ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ, (সম্পাদক)যুক্তি পত্রিকা, ভগবদগীতায় বিজ্ঞান অন্বেষণ এবং অন্যান্য
(৬)ভবানীপ্রসাদ সাহু,২০০১ ধর্মের উৎস সন্ধান, উজ্জ্বল সাহিত্য প্রকাশ,কলকাতা

লেখক পরিচিতিঃ রাজিব শীল শিবলু

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: