নাস্তিকরা জারজ সন্তান?

এই লেখাটি সেই সব মুমিন মুসলমানের জন্য যারা ডেইলি নিয়ম করে আমাকে জারজ সন্তান বলে গালাগালি করে। পাল্টা গালি নয়, যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ এবং পর্যালোচনার জন্যেই এই লেখাটি। শুরুতেই বলে নিচ্ছি, আমি জারজ সন্তানদের ততটাই পবিত্র মনে করি যতটা আরেকজন শিশুকে মনে করি। জন্ম সব সময়ই বৈধ, মানুষের জন্ম কখনো অবৈধ হতে পারে না। শিশুটির বাবা মায়ের প্রথামাফিক বিয়ে হয়েছিল কিনা, তার ওপর ভিত্তি করে শিশুটির বৈধতার মূল্যায়ন আমার কাছে ভয়ঙ্কর নোংরা বিষয় মনে হয়। তাই যারা জারজ বলে গালি দেয়, তাদের আমি বর্বর মনে করি। অসভ্য মনে করি।

মুহাম্মদের জন্মদাতা বলে নানা জায়গাতে বর্ণিত যে নামটি, সেটা হচ্ছে আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব। যদিও কিছু সূত্র অনুসারে এই বিষয়টা নিয়ে বড় ধরণের একটা ঘাপলা সবসময়ই আছে। ঘাপলাটি কি সেটা জানার জন্য বেশ কিছু বিষয় জানা থাকতে হবে।

প্রথমেই জানা দরকার, মুহাম্মদের জন্মদাতা আবদুল্লাহ এবং আমিনার বিয়ে কীভাবে হয়েছিল। মুহাম্মদের মাতা আমিনা ছিলেন বানু জুহরা গোত্রের। তার বাবার নাম ছিল ওয়াহাব ইবনে আবদমানাফ (মানাফের দাস)। এবং মায়ের নাম ছিল, বারাহ বিনতে আবদুল উজ্জা। আবদ- মানে হচ্ছে দাস। আবদ আল উজ্জা মানে হচ্ছে উজ্জার দাস। উজ্জা কে ছিল তা জেনে নিন। সামান্য পড়ালেখা করলেই জানতে পারবেন।

সে সময়ে মুহাম্মদের দাদা আবদুল মুত্তালিব তার পুত্র আবদুল্লাহকে নিয়ে ওয়াহাবের বাসায় যায় আমিনার সাথে পুত্র আবদুল্লাহর বিয়ে দেয়ার জন্য। সে সময়ে আমিনার চাচাতো বোন হালাকে দেখে আবদুল মুত্তালিবেরও বিবাহ করতে ইচ্ছে হয় এবং তিনি নিজে হালাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এরপরে একই দিনে আবদুল মুত্তালিব বিয়ে করেন হালাকে, এবং তার পুত্র আবদুল্লাহ বিয়ে করেন হালার চাচাতো বোন আমিনাকে। দাবী করা হয়, সেইখানেই আবদুল্লাহর সাথে আমিনার বাসর হয় এবং আমিনা গর্ভবতী হয়।

পাঠক, লক্ষ্য করে পড়বেন। আমিনা এবং হালা এই দুই বোনের বিবাহ হয়েছিল একই দিনে। পিতা আবদুল মুত্তালিব এবং পুত্র আবদুল্লাহর সাথে। এর অল্প কিছুদিন পরেই পিতা আবদুল মুত্তালিবের নির্দেশে আবদুল্লাহ বিদেশ ভ্রমণে যান এবং সেখানেই অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

দাবীটি হচ্ছে, আমিনা তখন গর্ভবতী। হিসেব মতে তার দশ মাস পরেই মুহাম্মদের জন্ম হওয়ার কথা। এবং পরে তিনি মুহাম্মদের জন্ম দেন। ঐদিকে হালাও গর্ভবতী হন, আবদুল মুত্তালিব দ্বারা, এবং জন্ম দেন হামজা নামের এক সন্তানকে। এই হামজা পরে মুহাম্মদের অনুসারী হন।

প্রাপ্ত হিসেব মতে, মুহাম্মদ এবং হামজার বয়স হওয়ার কথা সমান। অথবা হামজার বয়স হওয়ার কথা কম। যেহেতু আমিনাই আগে গর্ভবতী হয়েছিলেন বলে মনে হয়। যদি হালা আগে গর্ভবতী হয়ে থাকে, তাহলে আবদুল্লাহর আরও কিছুদিন মক্কায় থাকার কথা। কিন্তু সমস্ত সূত্র থেকেই জানা যায়, বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আবদুল্লাহ বিদেশ চলে যান। এবং, হামজা ছিলেন মুহাম্মদের চাইতে চার বছরের বড়। এখন আসুন হিসেবে মিলাই।

১) আবদুল্লাহ এবং আবদুল মুত্তালিব একই দিনে আমিনা এবং হালাকে বিয়ে করেন। সূত্রঃ Lings, Martin (1983). Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources. George Allen & Unwin. p. 17. ISBN 0946621330.
২) ছয় মাস বা তারও কম সময়ের মধ্যে আবদুল্লাহ বিদেশ ভ্রমণে যান।
৩) হামজা যেহেতু বড় সেহেতু হালা আগে গর্ভবতী হন। হামজার জন্ম হয়। সূত্র
(এখানে গণ্ডগোলটা)
৪) আমিনা গর্ভবতী হন। হামজার জন্মের চার বছর পরে মুহাম্মদের জন্ম হয়। কিন্তু তার তিন বছর আগেই তো আবদুল্লাহ বিদেশ ভ্রমণে চলে গেছে! আবদুল্লাহ তো আমিনার সাথে চার বছর ছিলেনই না।

সূত্রঃ ইবন সাদ লিখেছেন, উহুদের যুদ্ধে যখন হামজা মারা যায় তখন তার বয়স ছিলো ৫৯ বছর । এবং ওই সময় মুহাম্মদের বয়স ছিলো ৫৫ বছর । সূত্রঃ Muhammad ibn Saad. Kitab al-Tabaqat al-Kabair vol. 3. Translated by Bewley, A. (2013). The Companions of Badr. London: Ta-Ha Publishers.

> এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, হালা এবং আমিনার মধ্যে কে আগে গর্ভবতী হয়েছিলেন? যেহেতু হামজা মুহাম্মদের চাইতে চার বছরের বড় ছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই হালা আগে গর্ভবতী হয়েছিলেন।
> এর তিন বছর দুই মাস পরে আমিনার গর্ভবতী হওয়ার কথা। কিন্তু আবদুল্লাহ তো আমিনার সাথে ছিলেন বিয়ের পরে মাত্র ছয়মাসেরও কম সময়। কোন অবস্থাতেই চার বছর নয়। তবে কী আবদুল্লাহ বিদেশ যাওয়ার পরে আমিনা তিনবছর দুইমাস ধরে গর্ভবতী ছিলেন? সেই সময়ে হামজার জন্ম হয় এবং তার তিন বছর দুই মাস পরে মুহাম্মদের জন্ম হয়? হিসেব কিন্তু মিলছে না। খুব গোলমেলে হিসেব।

সূত্রঃ https://www.hadithbd.com/print.php?hid=66

সূত্রঃ https://www.hadithbd.com/print.php?hid=14335

জানা যায়, আবদুল মুত্তালিব পরবর্তীতে মুহাম্মদকে পুত্র স্নেহে লালন করেন। আবদুল মুত্তালিবের এই মহানুভবতার জন্য সে কাফের হওয়া সত্বেও মুহাম্মদ উনার সম্পর্কে সম্মান রেখেই কথা বলতেন তাকে সব সময়ই শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন।

আমি কোন সিদ্ধান্তে যাচ্ছি না। পাঠকের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি পুরো বিষয়টি। আপনারা সাধারণ গণিত করেছেন, কমনসেন্স খাঁটিয়ে ভেবে দেখবেন।

ধন্যবাদ।

Facebook Comments
%d bloggers like this: