ভাল মুহাম্মদ খারাপ মুহাম্মদ

আমার মনের মধ্যে নবী মুহাম্মদের প্রতিচ্ছবি অনেকটা এরকম – উজ্জ্বল চেহারার সৌম্য শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ। স্বভাবে তিনি বিনয়ী ও দয়ালু। তিনি তার অনুসারীদের উপদেশ দেন দুখী মানুষকে দয়া করতে, ভালবাসতে, তাদের প্রতি সহনশীল হতে। তিনি ন্যায়বিচারের প্রতীক। কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরবদের মাঝে তিনি এসেছেন সভ্যতার প্রদীপ নিয়ে, এসেছেন তাদেরকে আলোকিত করতে। তার সংস্পর্শে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মানুষটিও বদলে যায়।

বাস্তবতার নিরিখে এই কল্পিত প্রতিচ্ছবি অনেকটাই ভুল। ইসলামিক সূত্রগুলো যদি মোটামুটি সত্যি বলে থাকে, তাহলে আমার মনের যুক্তিশীল অংশটা বলবে, নবী মুহাম্মদ পুরোপুরি এমন ছিলেন না। বরং অনেকক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এই কল্পনার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি যতটা বিনয়ী ও দয়ালু ছিলেন, সম্ভবত তার চেয়ে বেশী ছিলেন নির্দয় ও উদ্ধত। তিনি তার সাহাবিদের হয়তো একবার দয়া করতে কিংবা ভালবাসতে কিংবা সহনশীল হতে বলেছেন, কিন্তু বিভীষিকা প্রদর্শনে কিংবা নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিতে কিংবা ঘৃণা ছড়াতে বলেছেন অন্তত দশবার।

নবী মুহাম্মদ তার নামাজের শেষে অসংখ্যবার দোয়া করেছেন যেন আরবের পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী মুদার গোত্রে ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ নেমে আসে, যেন তারা ধ্বংস হয়। বোখারির একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, যার স্ত্রিনশট আমি কমেন্টে উল্লেখ করবো, ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এক মাস পর্যন্ত আরবের কয়েকটি গোত্রের প্রতি বদদোয়া করার জন্য নামাজে রুকুর পর কুনুত পাঠ করেছেন।’ তিনি আরো দোয়া করেছেন, মুশরিকদের ঘর ও কবর যেন আগুনে পরিপূর্ণ করে দেয়া হয়। এছাড়া অসংখ্য হাদিসে তিনি ইহুদি ও কাফিরদের প্রতি লানত বা অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। স্বয়ং কোরানেরও একাধিক আয়াতে আল্লাহ্‌ কর্তৃক এদেরকে অভিশাপ দেয়ার কথা জানানো হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ তুচ্ছ মানুষজনকে এতো অভিশাপ দিয়ে কী সুখ পেয়েছেন, কে জানে!

সূত্রঃ এক
০১) সহিহ বোখারি ৯৫২, ২৭৩১, ৩১৪৮, ৪২৪৩ ও ৫৭৬৭ নং হাদিস।
০২) সহিহ বোখারি ৩৭৮৯-৯০, ৩৭৯৪, ৩৭৯৬ ও ৬৮৪০ নং হাদিস; সহিহ মুসলিম ১৪২০-২১ নং হাদিস।
০৩) সহিহ বোখারি ২৭৩০ ও ৩৮১১ নং হাদিস; সহিহ মুসলিম ১৩০০-০২ নং হাদিস।
০৪) সহিহ বোখারি ৪২৩, ৪২৪, ৩২০৮, ৩২১৪ ও ৪২৭৮ নং হাদিস।
০৫) সুরা বাকারা ৮৮-৮৯, ১৫৯ ও ১৬১ নং আয়াত; সুরা নিসা ৫২ নং আয়াত; সুরা মায়েদাহ ৬০ নং আয়াত।

নবী মুহাম্মদ পারস্যের সম্রাটের প্রতি বদদোয়া করেছেন এবং হিজড়া ও পুরুষের বেশ ধারণকারী মহিলাদের উদ্দেশ্যে অভিশাপ দিয়েছেন। নিষেধ সত্ত্বেও একদল লোক আকাবার মরুপ্রান্তরে আগে পানি সংগ্রহে গেলে তিনি তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন। এছাড়া জনৈক ব্যক্তি নামাজের সময় সামনে দিয়ে গাধায় আরোহণ করে চলে যায় বলে তিনি তাকে অভিশাপ দিয়েছেন, যার দরুন লোকটি চিরতরে পঙ্গু হয়ে পড়ে। এভাবে বারবার অভিশাপ দেয়া তথা অকল্যাণ কামনার মধ্যে মহত্ত্বের কোন পরিচয়টি পাওয়া যায়, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।

সূত্রঃ দুই
০১) সহিহ বোখারি ৬৪ ও ৫৪৬৫-৬৬ নং হাদিস।
০২) সহিহ মুসলিম ৬৭৮০ নং হাদিস।
০৩) সুনানে আবু দাউদ ৭০৫-০৭ নং হাদিস।

ইহুদিদের প্রতি নবী মুহাম্মদের বিদ্বেষ সর্বজনবিদিত। এই অবিশ্বাস্য গভীর বিদ্বেষের পরিচয় পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি হাদিসে, যার একটিতে তিনি বলেছেন, “কেয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না তোমরা ইয়াহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এমনকি কোন ইয়াহুদি পাথরের আড়ালে আত্মগোপণ করে থাকলে পাথর বলবে, ‘হে মুসলিম, আমার পেছনে ইয়াহুদি রয়েছে, তাকে হত্যা করো’”। চিন্তা করা যায়!

ইহুদি গোত্র কুরাইজার প্রতিটি সাবালক পুরুষকে হত্যা এবং নারী-শিশুদের ভাগবাটোয়ারায় সমর্থন করে তিনি তার কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখেছেন। ইতিহাস থেকে এই নৃশংসতার ঘটনা কখনোই মুছে যাবে না।

সূত্রঃ তিন
০১) সহিহ বোখারি ২৭২৪-২৫ নং হাদিস; সহিহ মুসলিম ৭০৭১-৭৪ নং হাদিস।
০২) সহিহ বোখারি ২৮২৯, ৩৫৩২ ও ৩৮২১ নং হাদিস; সুনানে নাসায়ি ৩৪৩০-৩১ নং হাদিস।

অসংখ্য হত্যার সাথে নবী মুহাম্মদ নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। যারা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে, তার স্পষ্ট নির্দেশ, তাদেরকে হত্যা করতে হবে। তিনি তার অধিকাংশ সমালোচক কবিকে গুপ্তঘাতক দিয়ে নিকেশ করেছেন। এদের মধ্যে কবি আসমা বিনতে মারওয়ানকে রাতের আঁধারে নিহত করেছেন। হতভাগিনী এই মহিলাটি তখন তার সন্তানকে দুগ্ধপান করাচ্ছিলেন। এটি দেখে একটি লোকেরও দয়া হয়নি, কী আশ্চর্য!

প্রতিপক্ষের উপর ভোররাতে অতর্কিত আক্রমণ ছিল নবী মুহাম্মদের বিশেষ কৌশল। সাহাবিগণ এই কৌশল প্রসঙ্গে মন্তব্য করলেন যে, এতে করে শত্রুপক্ষের নারী ও শিশুগণ মারা যেতে পারে। তিনি উত্তর দিলেন, ‘তারাও তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভূক্ত’। এর দ্বারা হয়তো তিনি জিহাদিদের জন্য নারী ও শিশুহত্যার ক্ষেত্রে দায়মুক্তির মতো একটা ব্যবস্থা রেখেছেন।

সূত্রঃ চার
০১) সহিহ বোখারি ২৮০৮, ৬৪৫৪ ও ৬৬৭১ নং হাদিস; সহিহ মুসলিম ৪২২৮ ও ৪২৩০ নং হাদিস।
০২) সহিহ বোখারি ২৮১৯-২০, ২৯৯০ ও ৩৮৪৩ নং হাদিস; সুনানে আবু দাউদ ১২৪৯ নং হাদিস।
০৩) সহিহ মুসলিম ৪৩৭০, ৪৩৯৯-০১ ও ৪৫১৪-১৫ নং হাদিস।

না খাইয়ে মারার লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের অসংখ্য খেজুর গাছ জ্বালিয়ে দেন, শত্রুর উপাসনালয় অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ধ্বংস করে দেন। এটা ছিল তৎকালীন আরবে প্রচলিত যুদ্ধরীতির মারাত্মক বরখেলাপ। কয়েকজন বেদুইন জনৈক রাখালকে হত্যা করে নবী মুহাম্মদের উট নিয়ে পালিয়ে যায়। তিনি এই কাজের জন্য অপরাধী বেদুইনদেরকে যে শাস্তি দেন, তার ভয়াবহতার কোন তুলনা হয় না। তিনি তাদের হাতপা কেটে চোখ উপড়ে মরুভূমির উপর ফেলে রাখার নির্দেশ দেন। তারা পানি চাইলেও তাদেরকে কোন পানি পান করতে দেয়া হয়নি। পিপাসার্ত হয়ে এই বেদুইনগুলো মারা যায়।

সূত্রঃ পাঁচ
০১) সহিহ বোখারি ২১৭৫ ও ৩৭৩৮ নং হাদিস।
০২) সহিহ বোখারি ২৮১১, ৩৫৪৯ ও ৪০১৬ নং হাদিস।
০৩) সহিহ বোখারি ২৩৩, ২৮০৯ ও ৩৮৭৮ নং হাদিস; সুনানে আবু দাউদ ৪৩১৬ নং হাদিস।

যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করার ইতিহাসও রয়েছে নবী মুহাম্মদের জীবনে। বদরের যুদ্ধে বন্দীদের মধ্যে অজ্ঞাত কারনে দু’জনকে তার নির্দেশে কোনরকম বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়। আর যুদ্ধবন্দী নারীদেরকে ধর্ষণের অনুমতি দিয়ে তিনি নিশ্চয়ই তার কৃত সর্বোচ্চ অপরাধটি সম্পন্ন করেন।

সূত্রঃ ছয়
০১) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩য় খণ্ডের ৫৬৮ পৃষ্ঠা।
০২) সহিহ বোখারি ২৩৭৪, ৩৮৩২, ৪০১২ ও ৪৮৩০ নং হাদিস; সুনানে নাসায়ি ৩৩৩৪ নং হাদিস।

এতদসত্ত্বেও নবী মুহাম্মদকে নিয়ে আমার এই কল্পণার প্রতিচ্ছবি বিধ্বস্ত হোক, এটা আমি কখনোই চাইবো না। বরং চাইবো, তিনি আমার হ্নদয়ের একটা অংশে এমনই বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিরাজ করুন, যা আমি ছোটবেলা থেকে তার সম্পর্কে জেনে এসেছি। আমি নবী মুহাম্মদের শুধু ভালো কাজগুলোকে স্মরণ রাখবো। এসবকে স্মরণ রেখে আমি দুখী মানুষের দুঃখে সমব্যথী হবো, মানুষকে ভালোবাসবো, মানুষের প্রতি সহনশীল আচরণ করবো।

আমি জানি, আমার কথাবার্তা নিতান্তই পরস্পরবিরোধী, অযৌক্তিক ও হাস্যকর। প্রকৃতপক্ষে আমি সর্বক্ষণ যুক্তিনির্ভর হয়ে রোবটের জীবনযাপণ করতে আগ্রহী নই, সজ্ঞানেই। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রাম এবং দারিদ্র দূরীকরণে অমর্ত্য সেনের গবেষণার কথা স্মরণ রাখি আমি। অতিবৃদ্ধ বয়সে ডিভোর্স শেষে তাদের পুনঃর্বিবাহের কথা স্মরণ রাখি না।

অবশ্য বৃদ্ধবয়সে পুনঃর্বিবাহ আর সুচিন্তিত গণহত্যার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। তারপরও আমি নবী মুহাম্মদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কেননা আমি প্রায়ই যুক্তির সীমাকে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হই। এছাড়া কোন মানুষকে আমি নিখুঁত বলি না। নবী মুহাম্মদের পাপ তার পূণ্যকে ছাড়িয়ে গেছে কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু আমি তার জীবনী ভালোভাবে পড়ে দেখেছি। এর ভিত্তিতে তাই এটুকু শুধু বলতে পারি, আরব জাতির অবিসংবাদিত নেতা হওয়ার অধিকার তার রয়েছে।

পর্যাপ্ত অর্থোপার্জনের পর আরেকটি অযৌক্তিক কাজ করবো। তা হলো, আমি নবী মুহাম্মদের রওজা জেয়ারত করতে মদিনায় এবং খালিদ বিন ওয়ালিদের কবর পরিদর্শন করতে সিরিয়ার হিমসে যাবো। মানুষ হয়ে যেহেতু জন্মেছি, মাঝে মাঝে যুক্তিহীন ও ভুল কাজ তো করবোই।

প্রতিটি তথ্যসূত্রের স্ত্রিনশট দিয়ে দিচ্ছি।

রেফারেন্সসমূহ

এক

০১। সহিহ বোখারি ৯৫২, ২৭৩১, ৩১৪৮, ৪২৪৩ ও ৫৭৬৭ নং হাদিস। 





০২। সহিহ বোখারি ৩৭৮৯-৯০, ৩৭৯৪, ৩৭৯৬ ও ৬৮৪০ নং হাদিস; সহিহ মুসলিম ১৪২০-২১ নং হাদিস। 






০৩। সহিহ বোখারি ২৭৩০ ও ৩৮১১ নং হাদিস; সহিহ মুসলিম ১৩০০-০২ নং হাদিস। 




০৪। সহিহ বোখারি ৪২৩, ৪২৪, ৩২০৮, ৩২১৪ ও ৪২৭৮ নং হাদিস।


০৫। সুরা বাকারা ৮৮-৮৯, ১৫৯ ও ১৬১ নং আয়াত; সুরা নিসা ৫২ নং আয়াত; সুরা মায়েদাহ ৬০ নং আয়াত। 





দুই 





তিন 








চার 
















পাঁচ 









ছয় 






Facebook Comments
%d bloggers like this: