হিন্দুধর্মে হস্তমৈথুন ও যৌনতায় নিয়ন্ত্রণ: একটি আয়ুর্বেদ-সংক্রান্ত বিশ্লেষণ

শিরোনাম দেখেই বুঝতে পারছেন আজকের আলোচনা কি নিয়ে হতে যাচ্ছে। বহুদিন আগে এই নাস্তিক্য ব্লগে হস্তমৈথুন নিয়েই একটা পোস্ট দেখেছিলাম। “হস্তমৈথুন- ধর্ম এবং বিজ্ঞান” শিরোনামে খুব সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত একটি পোস্ট। কিন্তু পোস্ট পড়তে গিয়ে কিঞ্চিৎ হতাশ হয়েছিলাম। সেখানে ধর্মগুলোয় হস্তমৈথুনকে কিভাবে নিরুৎসাহিত ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেসম্পর্কে দুই একটা কথা লেখা হয়েছে মাত্র। আর হিন্দুধর্মকে দেখানো হয়েছে হস্তমৈথুনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, মোটামুটি এই রায় দিয়ে।

সেখানে লেখা হয়, “সনাতন ধর্ম মতে , জীবনের চারটি উদ্দেশ্যর মধ্যে কাম কার্যকে একটি উদ্দশ্যে মনে করে। হিন্দু ধর্মের ব্রম্মাচার্য শাখা ছাড়া সকল শাখাই যৌনাকাঙ্খায় পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। প্রাচীন কামাসুত্রে (চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দী) হস্তমৈথুনকে নিষিদ্ধ করা হয়নি এবং সেখানে হস্তমৈথুন করার বিস্তারিত ব্যক্ষা আছে।(সচিত্র)।”

আমি ভাবলাম, যাহ চলে! সব ধর্মেই হস্তমৈথুনকে নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, আর হিন্দুধর্মে কিনা একে দেখা হচ্ছে ইতিবাচক হিসেবে? তাই এই বিষয়টা নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি শুরু করি। এখানে উল্লেখ্য, উক্তিতে যে কামসূত্রের কথা বলা হয়েছে তাতে হস্তমৈথুনকে উৎসাহ করা হয়েছে, ঠিকই আছে, কিন্তু কামসূত্রকে কশ্মিনকালেও ধর্মগ্রন্থ বলে ভাবা হয়নি। এটা প্রাচীন গ্রন্থ, তা ঠিক। কিন্তু ধর্মগ্রন্থ হবার জন্য যা যা লাগে, অর্থাৎ ধর্মানুষ্ঠান, আচার, ঈশ্বর তত্ত্ব, আত্মাতত্ত্ব, পুরাণ… এসব নিয়ে এখানে কিছুই লেখা হয়নি। যদি হত তাহলে আজও হিন্দুরা গ্রন্থটিকে হয়তো জীবনের খুব প্রয়োজনীয় অংশ বলে মনে করত, যা করা হয় না।

হিন্দুধর্মে ধর্মগ্রন্থের বিধানই কি সব?

হিন্দুধর্মের ধর্মগ্রন্থে হস্তমৈথুনের বিরুদ্ধে কথাবার্তা দেখা যায়, একে পাপ হিসেবে উল্লেখ আছে। এই যেমন পরাসর স্মৃতিতে বলা হয়, “যদি কোন গৃহী স্বেচ্ছায় সঙ্গম ছাড়া অন্য কোনভাবে বীর্যপাত করে, তবে তাকে এক হাজার বার গায়ত্রী মন্ত্র জপতে হবে, আর তিনবার প্রাণায়াম করতে হবে।”

তবে এই লেখায় আমি ঠিক এভাবে ধর্মগ্রন্থে ফোকাস করতে চাই না। কারণ এইসব ধর্মগ্রন্থের কথা হিন্দুদের বেশিরভাগই জানে না। পরাসর স্মৃতি কী, আগে কখনও এই নাম শুনেছে কিনা এই প্রশ্ন করা হলে হিন্দুদের বেশিরভাগই হা করে তাকিয়ে থাকবে। মূল কথা হল, হিন্দুদের মধ্যে এসবের কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। তাদের বেশিরভাগই এইসব নিয়ে জানে না, মানে তো নায়ই। তাই আমাকে দেখতে হবে হিন্দুধর্মে হস্তমৈথুনের মত যৌনতা বিষয়ক আচরণে ঠিক কোন দিকটি থেকে আধিপত্য বা হেজেমনি তৈরি হয়। আর এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করলেই বোঝা যায় যৌনতার ক্ষেত্রে হিন্দুদের মধ্যে কামসূত্রের প্রভাব নেই, পরাসর স্মৃতির মত ধর্মগ্রন্থের প্রভাব নেই, প্রভাব আছে ভারতীয় চিকিৎসাপদ্ধতি আয়ুর্বেদের।

আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠিত কালচারাল হেজিমনি

মোটামুটি সবাই জানেন যে আয়ুর্বেদ হচ্ছে ভারতীয় প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতি। ঐতিহাসিকভাবেই ভারতে চিকিৎসাবিদ্যাসংক্রান্ত ডিসকোর্স ছিল আয়ুর্বেদের দখলেই। আর মিশেল ফুকোর দর্শন অনুসারে, যেখানেই ডিসকোর্স, সেখানেই পাওয়ার বা ক্ষমতা। ঐতিহাসিকভাবে আয়ুর্বেদ তাই জীবনের কিছু নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে আধিপত্য সৃষ্টি করে ক্ষমতা তৈরি করে রেখেছে, প্রভাব ফেলেছে মানুষের আচরণে। আয়ুর্বেদ যেভাবে বলে দিয়েছে মানুষকে আচরণ করতে হয়েছে সেভাবেই। আর আয়ুর্বেদের এই ক্ষমতা বিস্তৃত হয়েছে মানুষের আহার গ্রহণ, নিয়ম মেনে চলা, এমনকি যৌনতার ক্ষেত্রেও। কারণ জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, ঔষধী প্রভৃতি সকল ডিসকোর্স যে এই আয়ুর্বেদেরই দখলে ছিল। পরে বৃটিশ ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা প্রবেশ করা।

আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা মানে হচ্ছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সাহায্যে তৈরি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেটার চেয়ে অধিক বিশ্বাসযোগ্য আর কিছুই পারে না। এই চিকিৎসাশাস্ত্রে কোন অবৈজ্ঞানিক কিছু নেই, ভাববাদী কিছুও নেই যেগুলো অন্যান্য চিকিৎসাশাস্ত্রে আছে, যেগুলোর মধ্যে হেকিমি, ইউনানি, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজিতে আছে। কবিরাজি আর আয়ুর্বেদ একই কথা। এগুলোকে বর্তমানে স্যুডোসায়েন্স বা ছদ্মবিজ্ঞান, স্যুডোমেডিসিন বা ছদ্মচিকিৎসাশাস্ত্র অথবা অল্টারনেটিভ মেডিসিন বা বৈকল্পিক চিকিৎসাশাস্ত্র বলা হয়। ১৯৯০ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৪১% আয়ুর্বেদী প্রোডাক্টে বিষাক্ত আর্সেনিক রয়েছে, আর ৬৪% আয়ুর্বেদী প্রোডাক্টে রয়েছে শিশা ও পারদের মত বিষাক্ত পদার্থ! যাই হোক, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র বর্তমানে একটি শক্তিশালী ডিসকোর্স তৈরি করে রাখলেও এটি মানুষের থেকে অন্যান্য ছদ্ম-চিকিৎসাপদ্ধতির আধিপত্যকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে পারেনি। তাই আজও অনেক লোককেই দেখা যায় কবিরাজি চিকিৎসা গ্রহণ করতে, আয়ুর্বেদ থেকে বিভিন্ন কুসংস্কারে বিশ্বাস করতে। ভারতীয় উপমহাদেশে আয়ুর্বেদ ভিত্তিক অলটারনেটিভ মেডিসিন মার্কেটে নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়িয়ে ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনেও এগুলোর প্রসার ঘটছে!

আয়ুর্বেদকে কি হিন্দুরা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মানে? এর কোন ধর্মগ্রন্থ হিন্দুরা আদৌ পড়ে? না, পড়ে না। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে নাকি উৎপত্তি। ওরাল ট্রেডিশন বা মৌখিকভাবেই এর জন্ম হয়েছিল। বেদে এর প্রথম নথিবদ্ধ রুপ পাওয়া যায়। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে চড়ক সংহিতা এখানে যুক্ত হয়, সুশ্রুত সংহিতা যুক্ত হয়। খ্রিস্টীয় ২য় শতকে বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুনও একে আপডেট করে। এরপর কালক্রমে আরও হালনাগাদ করা হয় একে। সেই ইতিহাসে আর যাচ্ছি না। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী আয়ুর্বেদের অনেক ধারণাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যাই হোক, এই যে আয়ুর্বেদের এত লেখা, আপডেট এসব কিছুই কিন্তু সাধারণ হিন্দুরা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে পড়ে না, বা তাদের পাঠ্যও নয়। মূলত কবিরাজরাই এসব পড়ে, আর শেখে। কিন্তু আয়ুর্বেদের অনেক বিধান হিন্দুদের ঘরে ঘরে মানা হয়, তারা কবিরাজদের থেকে বা পরিবারের গুরুজনদের থেকে এসব শেখে ও মানে। তাদের মধ্যে আয়ুর্বেদের একরকম আধিপত্য কাজ করে বলে তারা এর বিধানগুলো সত্য বলে মেনে নেয়। আর এখানেই এর ক্ষমতা ও প্রভাব নিহিত।

আয়ুর্বেদে যৌনতার নিয়ন্ত্রণ

মূল কথায় আসি। লেখাটা লিখছিলাম হিন্দুধর্মে হস্তমৈথুন এর ব্যাপারে কিভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়, বা একে কিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এই প্রসঙ্গে আসার আগে যৌনতা সম্পর্কে আয়ুর্বেদিক ধারণাগুলো সম্পর্কে কিছু ধারণা রাখা দরকার বলে মনে করি। তাই আগে সেই দিকটা নিয়েই আলোচনা করে নিচ্ছি।

আয়ুর্বেদ অনুসারে পুরুষের বীর্য ও নারীর ডিম্বকে সাধারণভাবে শুক্র বলা হয়। আবার অনেক সময় পুরুষের বীর্যকেই কেবল শুক্র বলা হয়। শুক্র শব্দের অর্থ হচ্ছে উজ্জ্বল, পবিত্র ও তেজস্বী। এর দ্বারা আবার কোন কিছুর “সারবস্তুও” বোঝায়। শুক্র হচ্ছ ধাতু তৈরি চক্রের সপ্তম ও শেষ ধাতু। যে ব্যক্তির স্বাস্থ্যকর শুক্র রয়েছে তার চোখ ও ত্বক থেকে নাকি রশ্মি নির্গত হয় বলে মনে হয়, তিনি তার আত্মবিশ্বাসের ঔজ্জ্বল্যে উজ্জ্বল হন। যেকোনো সংবেদনশীল ব্যক্তিই নাকি এই আভা বুঝতে পারবেন, অন্যেরা হয়তো এটা বুঝতে পারেন না কিন্তু তারা ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসকে লক্ষ্য করতে পারেন। মানে হস্তমৈথুনের দ্বারা যদি কেউ তার বীর্য নষ্ট না করে তাহলে তার শরীরে একরকম আভা তৈরি হবে, তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে – এরকম ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকে হস্তমৈথুনের বিরুদ্ধে এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।

শুক্র হচ্ছে সপ্তধাতুর মধ্যে শেষ ধাতু। ধাতুর কনসেপ্টটা নিয়ে একটু কথা বলা যাক। আয়ুর্বেদ অনুসারে ধাতু (সংস্কৃত धातु) শরীরের গঠনকারী উপাদান, আদি ও প্রাথমিক উপাদান এর দ্বারা সাতটি মৌলিক উপাদানকে বোঝানো হয় যা শরীরের মৌলিক গঠন (এবং কার্যকারিতাকে) তৈরি করে। এই ধাতু মূলত সাতটি। সাতটি ধাতুকে একত্রে সপ্তধাতু বলা হয়ে থাকে। আয়ুর্বেদ অনুসারে এই ধাতুসমূহের গুরুত্ব অনেক। আয়ুর্বেদে বিভিন্ন ধাতুর সাথে সম্পর্কিত রোগের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। সাতটি ধাতু হচ্ছে –

  • রস ধাতু (অন্নরস)
  • রক্ত ধাতু (রক্ত)
  • মাংস ধাতু (পেশী)
  • মেদ ধাতু (চর্বি)
  • অস্থি ধাতু (হাড়)
  • মজ্জা ধাতু (অস্থি মজ্জা (হাড় ও মেরুদণ্ডীয়))
  • শুক্র ধাতু (বীর্য)

আয়ুর্বেদ অনুসারে এই সাতটি ধাতু ছাড়াও (সপ্তধাতু) ওজস নামে অষ্টম ধাতু রয়েছে যাকে মহাধাতুও বলা হয়। ওজসের ব্যাপারে একটু পরে আসছি।

বীর্যমাহাত্ম্য!!!

আয়ুর্বেদে এই শুক্র ধাতু বা পুরুষের বীর্য কিন্তু খুবই মূল্যবান একটি বস্তু। আয়ুর্বেদ মতে, আমরা যে খাদ্য খাই সেখান থেকে রস ধাতু তৈরি হয়। সেই রস ধাতু থেকে তৈরি হয় রক্ত ধাতু। সেই ধাতু থেকে আবার তৈরি হয় মাংস ধাতু। মাংস ধাতু থেকে তৈরি হয় মেদ ধাতু বা চর্বি। মেদ ধাতু থেকে তৈরি হয় অস্থি ধাতু, অস্থি ধাতু থেকে তৈরি হয় মজ্জা ধাতু, আর মজ্জা ধাতু থেকে তৈরি হয় শুক্র ধাতু বা বীর্য। আয়ুর্বেদ অনুসারে এই সাতটি ধাপ পেড়িয়ে তারপর বীর্য তৈরি হয়। এক ফোটা বীর্য তৈরি হতে নাকি ১০০ ফোটা, মতান্তরে ৮০ ফোটা রক্তের দরকার হয়।

এখন ভাবুন, যে জিনিসটা এত কষ্ট করে, এত রক্তের বিনিময়ে তৈরি হয় বিনা কারণে তা নষ্ট করা কী মেনে নেয়া যায়? সেজন্য আয়ুর্বেদের পণ্ডিতরাও হস্তমৈথুনকে নিরুৎসাহিত করেন। পণ্ডিতদের কথা পরে হবে, আপাতত আয়ুর্বেদ অনুসারে কিভাবে রক্ত, অস্থি, পেশি, অস্তিমজ্জা, বীর্য, মেদ এসব তৈরি হয় পড়লেন? আধুনিক শারীরতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা রাখা আমি যখন এই আয়ুর্বেদিক শারীরতত্ত্ব সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলাম, তখন আমি হাসব নাকি কাঁদব ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। যে চিকিৎসাশাস্ত্রের মৌলিক শারীরতত্ত্বের ধারণারই এই অবস্থা, তার মেডিসিন বা চিকিৎসাশাস্ত্রের অবস্থা কী হতে পারে তা অনুমেয়।

শরীরে শুক্র ধাতু তৈরির জন্য জল দরকার, কেননা মনে করা হয় জলই সব ধাতুর প্রাথমিক উপাদান, কেননা রস ধাতুর বেশিরভাগই জল ও রস ধাতু থেকেই পর্যায়ক্রমে শুক্র ধাতু তৈরি হয়। কাজেই যেসব খাদ্যে বেশি পরিমাণে জল আছে আয়ুর্বেদ অনুসারে সেসব খাদ্যই শুক্র উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। এগুলোর মধ্যে আছে দুধ, ঘি, আঠালো ফল যেমন কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বীর্যবৃদ্ধি নিয়ে এরকম কিছু বলে না। অবশ্য স্পার্মকাউন্ট বৃদ্ধির জন্য কিছু খাদ্যতালিকার কথা বলা যেতে পারে। সেই তালিকার খাদ্যগুলো আয়ুর্বেদ উল্লিখিত এই খাদ্যগুলোর থেকে আলাদা।

আয়ুর্বেদ অনুসারে বাত, পিত্ত ও কফ – এই তিনটি হল প্রকৃতির তিনটি শক্তি যা সব কিছুতেই, এমনকি মানুষের মাঝেও বিভিন্ন অনুপাতে বিদ্যমান থাকে। কোন মানুষের মধ্যে এই তিনটি শক্তির যেটার পরিমাণ বেশি তার উপর ভিত্তি করে তার ব্যক্তিত্ব বা প্রকৃতি তৈরি হয়। এই শক্তিগুলোকে দোষ বলে।

বাত দোষ প্রকৃতির বায়ু শক্তিকে নির্দেশ করে। গতি ও যোগাযোগই এই দোষের বৈশিষ্ট্য। যাদের মধ্যে এই দোষের পরিমাণ বেশি হয় তারা বাত প্রকৃতির মানুষ। এরা খুব চঞ্চল থাকে, সব সময় অস্থিরতায় থাকে, কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকে। এরা উত্তেজনা ও আমোদ-প্রমোদ পছন্দ করে, তারা দ্রুত রেগে যায়, আবার ক্ষমাও করে দেয়। এরা খুব কর্মশক্তিপূর্ণ, সৃষ্টিশীল ও নমনীয়। এদের শরীর চিকন হয়, হঠাৎ করে শরীর ভেঙ্গে পড়তে পারে, বা অবসাদ আসতে পারে। এদের ত্বক রুক্ষ হয়, হাত পা ঠাণ্ডা হয়। এরা কম ঘুমায় ও এদের পরিপাক সংবেদনশীল। এই দোষ ভারসাম্যহীনভাবে বেড়ে গেলে উদ্বিগ্নতা ও ঘুমে সমস্যার সৃষ্টি করে। সেই সাথে ওজন কমা, কোষ্ঠকাঠিন্য, উচ্চ রক্তচাপ, বাতের সমস্যা, দুর্বলতা, অস্থিরতা ইত্যাদি সমস্যা হয়।

আয়ুর্বেদ অনুসারে বাত দোষ শুক্র ধাতুর জন্য ক্ষতিকর, এটি শুক্র নষ্ট করে। বাত দোষ যুক্ত খাদ্য যেমন ঠাণ্ডা ও শুকনো খাদ্য, বাত দোষময় জীবন ধারার ফলে শুক্র ধাতু শুকিয়ে যায়। এর ফলে বন্ধ্যাত্ব তৈরি হয়। একই সাথে এর ফলে যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যায়। আয়ুর্বেদের পণ্ডিতগণ বর্তমান পাশ্চাত্য জীবনধারার অনেক ব্যস্ততা ও কাজের চাপ এবং বর্তমান সময়ের স্ট্রেসজনিত বিভিন্ন যৌন সমস্যাকে এভাবে সম্পর্কিত করেন। আয়ুর্বেদ অনুযায়ী শুক্র ধাতু সৃষ্টিশীলতা বা সৃজনশীলতার সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু শরীরে বত দোষের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে এই সৃষ্টিশীলতায় ব্যাঘাত ঘটে।

আয়ুর্বেদ যে মানুষের সাইকোলজিকে এভাবে তিনটিভাগে ভাগ করছে, আর সেটার উপর ভিত্তি করে যে মানুষের শরীরের প্রকৃতিও বলে দিচ্ছে সেটা আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী ভুল, আর বীর্যের সাথে সম্পর্কের কথায় নাই বা গেলাম…

আয়ুর্বেদ অনুসারে পুরুষের বীর্যের রং, ঘনত্ব, আয়তন ইত্যাদি থেকেও আবার ধাতুর প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করা হয়। বলা হয় বীর্য ধূসর হলে ব্যক্তি বাত প্রকৃতির, হলুদ হলে পিত্ত প্রকৃতির ও সাদা হলে কফ প্রকৃতির। নারীর প্রজনন তন্ত্রের বেশিরভাগ সমস্যাই বাত দোষের আধিক্যের কারণে হয়, অবশ্য অধিক রজঃস্রাব এর কারণ কফ দোষের আধিক্য!

ব্যক্তি কিরকম যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবেন তাও আয়ুর্বেদ ঠিক করে দেয়! আয়ুর্বেদ অনুসারে ব্যক্তি যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবে তার শুক্র ধাতুর প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। ধাতু অনুযায়ী কোন ব্যক্তির যৌনশক্তি বেশি থাকলে তিনি যৌনক্রিয়ায় অংশ নিয়ে পারেন, যদি যৌনশক্তি কম থাকে তিনি যৌনক্রিয়ায় অংশ নিলে তার যৌনশক্তি আরও কমে যাবে। কাজেই তিনি তার যৌনশক্তির ক্ষতিপূরণ হবার আগ পর্যন্ত যৌনক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন না। এখানে যৌনক্রিয়া বলতে শুক্রধাতু হারানোর কথা বলা হচ্ছে, অর্থাৎ এর মধ্যে হস্তমৈথুনও অন্তর্ভূক্ত।

শুধু যৌনতা নয়, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতায়ও ধাতু!

ধাতু নিয়ে আলোচনার প্রথম দিকে অষ্টম ধাতু বা ওজস ধাতুর ব্যাপারে কিছু বলব বলেছিলাম। এবারে সেদিকে যাওয়া যাক। এই শুক্র ধাতু থেকেই তৈরি হয় ওজস ধাতু যা আয়ুর্বেদ অনুসারে আধ্যাত্মিকতার সাথে সম্পর্কিত। যোগী, ধ্যানী, সন্যাসীদেরকে এই ওজস ধাতু সঞ্চয় করতে হয় তাদের আধ্যাত্মিকতার অনুভূতি লাভ করার জন্য। আর তাই সন্যাসীদের জন্য যেকোন রকম যৌনক্রিয়া নিষিদ্ধ, কেননা তাতে বীর্য বা শুক্র ক্ষয় হয়, তাতে আর ওজস সঞ্চিত হয় না।

হিন্দু ধর্মে ব্রহ্মচর্য বা সন্যাস এর বিধান আছে। মনে করা হয় সঠিকভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করা হলে ব্যক্তি অনেক দিন ধরে বাঁচবেন। আয়ুর্বেদ অনুসারে ব্যক্তির যৌনক্রিয়ার সাথে যেমন তার শুক্র ধাতুর অবস্থার সম্পর্ক আছে, তেমনি আছে তার ধর্মেরও। ব্যক্তির যদি পরিবার থাকে তবে তিনি স্বাভাবিক যৌনতায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন, কেবল দেখতে হবে তার যৌনক্রিয়া যাতে তার প্রকৃতির তুলনায় অধিক না হয়ে যায়। কিন্তু ব্যক্তি যদি আধ্যাত্মিক সন্যাসী হয়ে থাকেন তবে তার জন্য যেকোন রকম যৌনক্রিয়া নিষিদ্ধ থাকে। সন্যাসীদের জন্য শুক্র ধাতু থেকে ওজস ধাতু তৈরি করা জরুরি। আয়ুর্বেদ অনুসারে এই ওজস ধাতু হচ্ছে অষ্টম ধাতু যা আধ্যাত্মিক আচারের জন্য উচ্চমাত্রায় ওজস সঞ্চয় করা জরুরি।

যারা সংসার করেন তাদের যৌনক্রিয়ার হার কেমন হবে? তারা সপ্তাহে কয়বার যৌনক্রিয়ায় অংশ নেবেন? আয়ুর্বেদ অনুসারে এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে তার ভেতরের শুক্র ধাতু ও ওজস ধাতুর প্রকৃতির উপর। যদি ব্যক্তির শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে শুক্র সঞ্চিত হয় এবং তার ওজস শক্তিশালী থাকে তবে তিনি যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু বেশি যৌনতায় অংশ নিলে তার শুক্র ও ওজস ধাতু কমে যাবে। আর তার লক্ষণ শরীরেও প্রকাশিত হবে। শরীর থেকে শুক্র ধাতু ফুরিয়ে গেলে শরীরের দীপ্তি হারিয়ে যায়, সৃষ্টিশীলতা শেষ হয়ে যায়, সৃষ্টিশীল উদ্যোগ নিতেও ব্যক্তি আর সক্ষম হয় না। কাজেই যাদের শুক্র কমে যায় তাদেরকে যেকোন রকমের যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে হয়, আর তখন আবার শরীরে শুক্র ধাতুর সঞ্চয় হয়।

তবে আয়ুর্বেদ অনুসারে শুক্রের ক্ষয় হওয়ার ব্যাপারটাও মানুষের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। কফ প্রকৃতির ব্যক্তি যৌনশক্তি বজায় রাখতে পারে, এবং শুক্রের ক্ষয় ছাড়াই অনেকবার যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। এদিকে বাত প্রকৃতির ব্যক্তিদের মধ্যে শুক্রের মাত্রা কম থাকে, তাদের যৌনক্রিয়ায় আগ্রহ অনেক বেশি পরিবর্তিত হতে পারে, এবং এই বিষয়ে তাদেরকে যত্নশীল হতে হবে।

সাধারণত, রাজযোগের অনুশীলন (আসন, প্রাণায়ম, ধ্যান) যত বেশি হবে, ব্যক্তির যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ তত কম হওয়া উচিৎ। কারণ তাদের এই অনুশীলনের জন্য উচ্চমাত্রার শুক্র ও ওজস এর দরকার হয়।

হস্তমৈথুন নিয়ে আয়ুর্বেদ-পণ্ডিতদের “অমিয় বাণী

যেখানে ফোকাস করার জন্য এই লেখা… বোঝাই যায় যে, যেখানে শুক্র ধাতুকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় সেখানে হস্তমৈথুনকে কোন চোখে দেখা হবে। হস্তমৈথুন করার মাধ্যমে বীর্যপাত মানে শরীরে সঞ্চিত শক্তিকে ক্ষয় করে ফেলা, যেখানে সেই বীর্য বা শুক্র আর কোন কাজেই লাগছে না। আয়ুর্বেদের বিভিন্ন পণ্ডিতের বাণীতে তাই পাওয়া যায় হস্তমৈথুনের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া। তার দুটো নমুনা আপনাদের উদ্দেশ্যে এখানে দিয়ে দিচ্ছি। পড়লেই বুঝতে পারবেন।

প্রথমেই বলি আয়ুর্বেদ সংক্রান্ত বিখ্যাত লেখক ও পণ্ডিত পঞ্চানন বাবু হরিদাস বৈদ্য এর কথা। তিনি তার তার চিকিৎসা চন্দ্রোদয় গ্রন্থে তো হস্তমৈথুন এর একটি নিজস্ব সংজ্ঞা পর্যন্ত দিয়েছেন: “প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে, শুধুমাত্র ক্ষণিক সময়ের স্ফূর্তির জন্য, নির্বোধ বোকা লোকেরা ধূর্ত লোকেদের পাল্লায় পড়ে নিজেদের পুরুষাঙ্গকে হস্তের দ্বারা সঞ্চালন করে থাকেন, যার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এদের বীর্যপাত হয়, একেই হস্তমৈথুন বলে।” এই সংজ্ঞা পড়লেই বোঝা যায় যে হস্তমৈথুনকে তিনি কতটা ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখেন।

তার মতে, এই “অশুভ কার্যটি” ব্যক্তির দেহকে দুর্বল করে ফেলে, তার মুখের ঔজ্জ্বল্য এর ফলে নষ্ট হয়ে যায়, ব্যক্তি হয়ে যান বিরক্ত ও হতাশ। হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত হয়ে সেই ব্যক্তি সবসময় ভীত ও উদ্বিগ্ন হয়ে থাকেন, তার হৃদয় ও মস্তিষ্ক দুর্বল হয়ে যায়, তার ঘুম কম হয়, তাকে অনিদ্রায় ভুগতে হয়।… যদি এই বাজে অভ্যাসটি বন্ধ না হয় তাহলে শুরু হয় আরও বড় সমস্যা। শিরায় শিরায় ব্যাথা শুরু হয়, হতাশা, উদ্বিগ্নতা অনেক বেড়ে যায়, আর নাকি দেখা যায় বিভিন্ন রকমের স্নায়বিক বৈকল্য! এগুলো ছাড়াও রয়েছে শক্তি কমে যায়, শরীরের দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, পুরুষাঙ্গের ভীষণ দুর্বল হয়ে যাওয়া, পুরুষাঙ্গের ছোট ও চিকন হয়ে যাওয়া, অকাল বীর্যপাত ও ধ্বজভঙ্গ রোগ।

বিখ্যাত আয়ুর্বেদ-পণ্ডিত শ্রী রামনারায়ণ শর্মা হচ্ছে আয়ুর্বেদ সংক্রান্ত বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান শ্রী বৈদ্যনাথ আয়ুর্বেদ ভবন এর প্রতিষ্ঠাতা। তার মতে, হস্তমৈথুনের ফলে নাকি মানসিক চাপ, উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়, গাল শুকিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে হাড় দেখা যায়। হস্তমৈথুনের কারণে নাকি পুরুষাঙ্গ ছোট, চিকন ও দুর্বল হয়ে যায়, আবার অনেক সময় নাকি পুরুষাঙ্গ বিকৃতও হয়ে যায়। সেই সাথে পুরুষের স্বপ্নদোষ, ধ্বজভঙ্গ, অকাল বীর্যপাত ঘটার ব্যাপার তো আছেই। এছাড়া হস্তমৈথুন এর ফলে দৃষ্টিশক্তি, স্মৃতিশক্তি কমার ব্যাপারেও বলেন।

এছাড়া তিনি তার “আরোগ্য প্রকাশ” গ্রন্ত্রে লেখেন, যারা নোংরা বই পড়ে এবং পর্ন দেখে তাদের মনও নোংরা হয়ে যায়। আর তার ফলে তাদের পাপ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। শিক্ষার্থীরা হস্তমৈথুনের চর্চার ফলে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, এবং এর ফলে তারা দুর্বল ও শক্তিহীন হয় (পূর্বে প্রকাশিত অবস্থাগুলো ছাড়াও)। সেই সাথে ক্ষুধামন্দা দেখা যায়। এর কারণে মনেও কুচিন্তা প্রবেশ করে। আর এখান থেকে বাঁচার জন্য নোংরা নোংরা বই ও ভিডিও দেখা থেকে বিরত থাকা উচিৎ।

এরকম আরও উদাহরণ আছে যে প্রাচীন আয়ুর্বেদের পণ্ডিতগণ নারী ও পুরুষের হস্তমৈথুনকে নিন্দা করেছে। এগুলোর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নেই। আধুনিক বিজ্ঞান হস্তমৈথুনকে ক্ষতিকর বলে মনে করে না। বরং অনেক সময় এটাকে ভাল বলেই রায় দিয়ে থাকে। ইহুদি ধর্মে হস্তমৈথুনকে মারাত্মক পাপ হিসেবে দেখা হত, আর আজকের অনেক ইহুদি পণ্ডিতই সেই অবস্থান থেকে সরে এসে হস্তমৈথুন যে ক্ষতিকর নয় তা স্বীকার করে নিয়েছে। হ্যাঁ, আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞানের প্রভাবে ইহুদি ধর্মীয় পণ্ডিতগণ অবস্থান নিয়েছেন তাদের ধর্মের বিরুদ্ধেই। আর হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তাদের ধর্মগ্রন্থগুলোতে হস্তমৈথুনকে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থের মত সেভাবে ফোকাস না করা হলেও, বীর্যের গুরুত্বকে কেন্দ্র করে আয়ুর্বেদের সাহায্য নিয়ে আজও হস্তমৈথুনকে নিন্দা ও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রকে স্বীকার তো করা হচ্ছেই না, বরং প্রাচীনযুগের এই “মহৎ ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাশাস্ত্রকে” আরও বেশি মহিমান্বিত করা হচ্ছে আর এর জন্য গর্ববোধ করা হচ্ছে, আর আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাশাস্ত্রকে জানানো হচ্ছে ধিক্কার!

আয়ুর্বেদ প্রভাবিত সংস্কৃতি ও ধাতুদোষ

এবারে বিশুদ্ধ আয়ুর্বেদ থেকে বের হয়ে গিয়ে আমি একটি অন্যদিকে যেতে চাই। সেটা ঠিক আয়ুর্বেদের ধর্মীয় প্রভাব নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশে আয়ুর্বেদ প্রভাবিত সাংস্কৃতিক উপাদান। প্রশ্ন করতে পারেন, এই আয়ুর্বেদ আর আয়ুর্বেদ প্রভাবিত সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্যটা কী? পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্যের জন্য আমি যে বিষয়টা সামনে নিয়ে আসব তা হল “ধাতুদোষ”। আমাদের গ্রামবাংলায় এই শব্দটা খুব পরিচিত। এখানে আয়ুর্বেদী ধারণার মত ধাতু মানে শারীরিক বা আধ্যাত্মিক কোন উপাদান নয়, এর অর্থ সহজ সরল অর্থে বীর্য। গ্রাম বাংলায় অনেকেই বীর্য শব্দটা বোঝে না, বীর্য বলতে বোঝে ধাতু। আর দোষ এখানে কোন প্রাকৃতিক শক্তি নয়, এখানে দোষ হচ্ছে রোগ বা অসুখ। বীর্যপাত জনিত এক বিশেষ রকমের অসুখকে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক অঞ্চলেই ধাতুদোষ নামে পরিচিত।

ধাতু দোষ (ইংরেজি: Dhat syndrome) হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে প্রথম দেখা যাওয়া এমন একটি অবস্থা যেখানে পুরুষ রোগীগণ দাবি করেন, তারা অকাল বীর্যপাতও ধ্বজভঙ্গের সমস্যায় ভুগছেন, এবং একই সাথে বিশ্বাস করেন যে তাদের মূত্রের সাথে বীর্য নির্গমন হচ্ছে। এই অবস্থার জন্য এখন অবধি কোনো জৈবিক শারীরবৃত্তিক কারণকে দায়ী করা যায় নি, ধারণা করা হয় এ অবস্থাটি একটি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা।

হিন্দুধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার পরম্পরাতে বীর্যকে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তরল” (ভাইটাল ফ্লুইড) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যৌনক্রিয়া বা স্বমেহনের ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ তরল শরীর থেকে বের হয়ে গেলে উদ্বিগ্নতা ও বিষণ্ণতার অনুভূতি তৈরি হয়। প্রায়ই রোগীগণ মূত্রের সাথে সাদা সাদা তরল প্রবাহের কথা বলেন। অন্যান্য সময়ে রোগীগণকে “অতিরিক্ত” স্বমেহনের ধারণা থেকে তৈরি হওয়া অপরাধবোধের কথা বলতেও শোনা যায়।

অনেক চিকিৎসক ধাতু দোষকে ভারতের লোক রোগনির্ণয়সংক্রান্ত শব্দ হিসেবেও দেখেন যাকে বীর্যপাতের সাথে সম্পর্কিত উদ্বিগ্নতা ও স্নায়বিক উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ও যার সাথে মূত্রের রং এর পরিবর্তন এবং দুর্বলতা ও অবসাদের অনুভূতিও জড়িত। অনেকেই এই সমস্যাকে কালচার-বাউন্ড সিনড্রোম বা সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ লক্ষণ বলে। এর অর্থ হচ্ছে এই ব্যাপারটা খালি নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতেই দেখা যায়, আর কোথাও দেখা যায় না। হ্যাঁ, সম্ভাবনা আছে যে রাগমোচন পরবর্তি বিষণ্ণতার অনুভূতির সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু মুত্রের সাথে সাদাসাদা তরল প্রবাহ, বীর্য নষ্ট হয়ে গেল রে – এই কথা ভেবে এত বেশি উদ্বিগ্নতাকে কি আর কেবল রাগমোচন পরবর্তি বিষণ্ণতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়?
ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অফ ডিজিসেস (ICD-10) অনুসারে ধাতু দোষ হচ্ছে একটি স্নায়ু-বৈকল্য বা নিউরোটিক ডিজর্ডার (কোড এফ৪৮.৮) এবং একটি সংস্কৃতি-নির্দিষ্ট বিকার; (পরিশিষ্ট ২) যা “বীর্য নির্গমনের জন্য হওয়া দুর্বলতা সম্পর্কিত অযৌক্তিক উদ্বেগের” কারণে তৈরি হয়।

শেষ কিছু কথা

পাঠকগণ, একটু ভেবে দেখুন, বীর্যকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করলে কোন ব্যক্তি বীর্য নষ্টের কারণে উদ্বিগ্নতায় ভুগতে পারেন। এই উদ্বিগ্নতা কতটা প্রভাবশালী হলে এটা একটা সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ লক্ষণে পরিণত হয়ে যায়। ভেবে দেখুন আয়ুর্বেদ সাধারণ মানুষের মনে হাজার হাজার বছর ধরে কিভাবে প্রভাবিত করে এসেছে? এর ক্ষমতা কতখানি ছিল? আর ভাবুন কেবল যৌনতা, বীর্য, হস্তমৈথুনের ব্যাপারে একটা শক্তিশালী ডিসকোর্স তৈরি করে এটা যদি এইসব বিষয়ে মানুষের আচরণকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের উপর বায়োপাওয়ার কায়েম করে, এটি যুগ যুগ ধরে মানবদেহকেন্দ্রিক বিষয়গুলোকে কতটা গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। আর সেই নিয়ন্ত্রণ কতটা বেশি থাকলে আজকের এই আধুনিক যুগেও মানুষ এইসবে বিশ্বাস করে, এখনও ধাতুদোষে মানুষ আক্রান্ত হয়? আবার এখন তো দেখা যায় মানুষের উপর আয়ুর্বেদের এই সাধারন প্রভাবকে কেন্দ্র করে আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে নতুন নতুন প্রোডাক্টের মারকেট তৈরি হচ্ছে। আয়ুর্বেদের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে নিত্যনতুন বিভিন্ন কসমেটিক্স, ফেশিয়াল ক্রিম, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট ইত্যাদি। এইসব প্রোডাক্ট আবার আয়ুর্বেদের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে আরও বেশি শক্তিশালী করছে, এখনও এইসব মানুষের মনে আয়ুর্বেদকে প্রাসঙ্গিক করে রাখছে।

আর সেই সাথে পরোক্ষভাবে এগুলো প্রভাবিত করছে মানুষের ধর্মীয় ভাবনা, ধর্মীয় চেতনাকেও। কামসূত্র হিন্দুধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয়, কিন্তু আয়ুর্বেদ হিন্দুধর্মের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই লেখায় আলোচিত ওজসের ব্যাখ্যা থেকেই দেখা যাচ্ছে কিভাবে হিন্দুধর্মের আধ্যাত্মিকতা সহ বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যার জন্য আয়ুর্বেদের জ্ঞান ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এখন তাই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকে এরকম প্রাচীন ছদ্মবৈজ্ঞানিক চিকিৎসাশাস্ত্রগুলোর সমালোচনা বেশি বেশি করে করা প্রয়োজন, মানুষের মধ্যে আয়ুর্বেদ প্রভাবিত বিশ্বাসগুলোকে চিহ্নিত করে মানুষকে এগুলো থেকে মুক্ত করা প্রয়োজন। তারই একটি অংশ হিসেবে হস্তমৈথুন বিষয়ে এই লেখাটি।

তথ্যসূত্র

১। পরাসর সংহিতায় হস্তমৈথুন –
https://en.wikipedia.org/wiki/Religious_views_on_masturbation#Hinduism

২। আয়ুর্বেদের ইতিহাস –
(a) Ernst, Edzard (2007-01-01). Complementary Therapies for Pain Management: An Evidence-based Approach. Elsevier Health Sciences. p. 108. ISBN9780723434009. Ayurveda evolved in India some 8000 years ago and is often quoted as the oldest medical system in the world
(b) T.S.S. Dikshith (2008). Safe Use of Chemicals: A Practical Guide. CRC Press. p. 16. ISBN9781420080513.
(c)  Leonore Loeb Adler; B. Runi Mukherji. Spirit Versus Scalpel: Traditional Healing and Modern Psychotherapy. Greenwood. p. 76.
(d) Glucklich, Ariel (2008). The Strides of Vishnu: Hindu Culture in Historical Perspective. Oxford, England: Oxford University Press. p. 141ISBN978-0-19-531405-2.
(e) J. N. Roy; Braja Bihārī Kumāra. India and Central Asia: Classical to Contemporary Periods. Concept Publishing Company. p. 103.

৩। আয়ুর্বেদিক মেডিসিনে বিষাক্ত পদার্থ –
Paul I. Dargan; et al. (2008). “Heavy metal poisoning from Ayurvedic traditional medicines: an emerging problem?”Int. J. Environment and Health2 (¾): 463–74. doi:10.1504/IJENVH.2008.020935. Retrieved 5 October 2011.

৪। বিভিন্ন ধাতু এবং ধাতুসমূহের উৎপাদন –
(a) https://en.wikipedia.org/wiki/Dh%C4%81tu_(Ayurveda)
(b) http://www.ayurveda-recipes.com/dhatus.html
(c) http://ayurveda.iloveindia.com/ayurveda-fundamentals/dhatu-significance.html
(d) http://www.ayurvedacollege.com/articles/drhalpern/the-seven-dhatus-tissues-ayurveda

৫। আয়ুর্বেদে বীর্য বা শুক্রধাতু এবং যৌনতায় নিয়ন্ত্রণ –
(a) http://www.ayurvedacollege.com/Ayurveda/shukra-dhatu-closer-look-reproductive-tissue-ayurvedic-perspective
(b) http://www.yoga-age.com/modern/brahma.html

৬। হস্তমৈথুন সম্পর্কে আয়ুর্বেদিক পণ্ডিতগণ –
(a) http://www.biovatica.com/masturbation.htm#.XKINX5gzZPZ
(b) Arogya Prakash (2014) by Ramnarayan Sharma, Vaidyaraj Pt.
(c) Chikitsa Chandrodya – A Comprehensive Manual for Ayurvedic Treatment of Various Diseases (Set of 7 Volumes) (2015) by Babu Haridas Ji Vaid, Chaukhamba Publication.

৭। ধাতুদোষ –
(a) বাংলায় এই উইকিপিডিয়া নিবন্ধটি পড়া যেতে পারে। আমারই লেখা –
https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%81_%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B7
(b) Ajit Avasthi, Om Prakash Jhirwal (2005). “The Concept and Epidemiology of Dhat Syndrome”Journal of Pakistan Psychiatry Society2 (1).
(c) Sumathipala A, Siribaddana SH, Bhugra D (March 2004). “Culture-bound syndromes: the story of dhat syndrome”. Br J Psychiatry184 (3): 200–9. doi:10.1192/bjp.184.3.200PMID14990517.
(d)  Issa El Hamad, Carmelo Scarcella, Maria Chiara Pezzoli, Viviana Bergamaschi, Francesco Castelli. “Forty Meals for a Drop of Blood”. Journal of Travel Medicine. 16(6): 64-65.doi:10.1111/j.1708-8305.2008.00264.x
(e) Om Prakash, Sujit Kumar Kar, T. S. Sathyanarayana Rao (2014). “Indian story on semen loss and related Dhat syndrome”. Indian Journal of Psychiatry. doi: 10.4103/0019-5545.146532, PMID: 25568479

৮। ইহুদি ধর্মের পণ্ডিতদের ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে হস্তমৈথুনকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা –
(a) “Masturbation: Is It Kosher?“. Beliefnet. –
https://www.beliefnet.com/love-family/2001/07/masturbation-is-it-kosher.aspx
(b) Stein, Jonathan (Fall 2001). “Toward a Taxonomy for Reform Jews to Evaluate Sexual Behavior”CCAR Journal. Central Conference of American Rabbis. Retrieved 2007-08-27.
(c) Jacob, Walter (1979). “Masturbation”American Reform Responsa. Central Conference of American Rabbis. Retrieved 2007-08-28.

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: