মানুষ ও পশু

অনেক সময়ই একজন মানুষ আরেকজন মানুষককে পশু, জানোয়ার, হায়না, কুত্তা, গরু, গাধা, ছাগল বলে গালি দেয় বা সম্বোধন করে। আসলেই কি মানুষকে পশুদের নামে গালি দেয়া বা ডাকা উচিৎ? মানুষ ও পশুর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে।

মানুষ আর পশুর কিছু মিলতো আছেই।

প্রথমেই বলা যায় প্রভুভক্তির কথা। মানুষও প্রভুভক্ত, পশুও প্রভুভক্ত। মানুষ তার আসমানি প্রভু, বায়বীয় প্রভু, জলীয় প্রভু, পাথুরে প্রভু, পশু প্রভু, মানুষ প্রভু হরেক প্রভুর ভক্তি করে। উঠতে বসতে দাঁড়াতে ঘুমাতে চলতে ফিরতে প্রভুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকে, উপঢৌকন দেয়, পদধূলি নেয়, সাষ্টাঙ্গে অবনত হয় আর প্রভুর আদেশে লতি পেঁচিয়ে ছুড়ে দেয়া লাটিমের মত শুধু ঘুরপাক খায়। আর পশুরা শুধুমাত্র যে তাকে খেতে দেয়, থাকতে দেয়, আদর করে তার পিছন পিছন ঘুরে আর প্রয়োজনে প্রভুর জন্য জীবন দেয়।
এবার আসা যাক লোভের কথায়। মানুষও লোভী, পশুও লোভী। মানুষের থাকে টাকার লোভ, ক্ষমতার লোভ, গাড়িবাড়ির লোভ, প্রভাব প্রতিপত্তির লোভ, বেহেস্তের লোভ, হুরের লোভ- হরেক রকম লোভ। আর পশুর থাকে খাওয়ার লোভ। খাওয়ার লোভেই পশু খেলা দেখায়।

পুরুষ মানুষের দাড়ি আছে। কিছু কিছু পশুরও দাড়ি আছে। পশুরা দাড়ি কাটতে পারে না। মানুষ দাড়ি কাটতে পারে। তবুও রাখে ধর্মীয় কারণে, স্টাইলের কারণে।

মানুষ আর পশুর পার্থক্য কিন্তু অনেক।

মানুষ ধর্ষণে বেশ পারদর্শী। পশুরা ধর্ষণ করে না। মানুষ ধর্ষণের ক্ষেত্রে শিশু, নাবালিকা, সাবালিকা, সধবা, বিধবা, বৃদ্ধা কেউই রেহাই পায় না। এমন কি নিরীহ পশুওনা। আর বলাৎকারেও তারা বেশ পটু।
মানুষ অভিনয় করতে পারে কিন্তু পশুরা অভিনয় করতে পারে না। অনেক মানুষ নিজের আসল চরিত্র লুকিয়ে রেখে সাধু সেজে কাছে এসে সুযোগ বুঝে বিষাক্ত ছোবল মারে। পশুরাতো পশুত্বই প্রকাশ করবে, মনুষ্যত্ব নয়।

মানুষের মধ্যে ভেদ বিভাজন রয়েছে। কেউ কালো কেউ ফর্সা, কেউ ধনী কেউ গরীব, কেউ চাষি কেউ মন্ত্রী, কেউ সামান্য কেউ শ্রেষ্ঠ। পশুদের ভেদাভেদ নেই। কালো হোক, সাদা হোক, লাল হোক কুকুর কুকুরই।

মানুষ বিভিন্ন কারণেই পশু হত্যা করে। খাওয়ার আনন্দে, বিয়ের আনন্দে, ধর্মীয় আনন্দে, ব্যবসার আনন্দে, অবসরে শিকারের আনন্দে। পশুরা মানুষকে আক্রমণ করে নিরাপত্তার কারণে অথবা পাগলা হলে।

মানুষ খুব নোংরা, ভয়ঙ্কর, বীভৎস গালাগালি করে- অমুকের পুত তমুকের ঝি, তোর ইয়েকে ইয়ে করি। পশুরা গালাগালি করে না। ঘেউঘেউ করে, হাম্বা হাম্বা করে, ম্যাম্যা করে। আর হুঙ্কার দেয়।
মুনীর চৌধুরী বলেছেন, মানুষ মরে গেলে পচে যায়। কিন্তু হাতি মরলে লাখ টাকা। অনেক পশুর হাড়, চামড়া, শিং, দাঁত অনেক কাজে লাগে।

পশু বাড়ি পাহারা দেয়। মানুষ চুরি করে, ডাকাতি করে, ছিনতাই করে, ব্যাংকের টাকা পাচার করে।

মানুষ মদ খেয়ে মাতাল হয়। পশুরা নয়।

মানুষ মানুষকে ঠকায়, দেশকে ঠকায়, জাতিকে ঠকায়। পশুরা ঠকাতে পারে না।

মানুষে ধর্ম আছে, ধর্মগ্রন্থ আছে, নবী আছে, রাসূল আছে, দেবতা আছে, অবতার আছে, পরকাল আছে, বিচার আছে, শাস্তি আছে, বেহেশত আছে, দোজখ আছে। পশুদের ধর্ম নেই, পথ প্রদর্শক নেই, পরকাল নেই, বেহেস্তদোজখ নেই। হিন্দু বাঘ, মুসলিম বাঘ, নাস্তিক বাঘ নেই। শেষ হিসাব নিকাশ নেই। তবে কি পশুরাই সঠিক পথে?

কে উত্তম? পশু না মানুষ?

যে সকল মানুষ পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট চরিত্রের সে সকল মানুষকে পশুর নামে গালি দিলে পশুরও অপমান হয়। দুই পা আর দুই হাত আর মন থাকলেই কি মানুষ হওয়া যায়?

মানুষের থাকবে ভালোবাসা- মানুষের জন্য, দেশের জন্য। মানুষের থাকবে সহানুভূতি সকল প্রাণীর জন্য। মানুষকে হতে হবে নির্লোভ, অহিংস। মানুষের থাকবে মনুষ্যত্ব। তবেইতো শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় থাকবে।

লিখেছেনঃ মিষ্টি কুল

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: