হাদিস সমূহের ভুল ঢাকতে ইসলামিস্টদের দেওয়া ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা

ঘটনা ১: দিয়াশলাইয়ের সাহায্যে আগুন কিভাবে জ্বলে?
দাবী ১: বারুদের সাথে উপযুক্ত খসখসে তলের ঘর্ষণের ফলে তাপ উৎপন্ন হয়। তখন বায়ুমন্ডলের অক্সিজেনের উপস্থিতিতে আগুন জ্বলে ওঠে।
দাবী ২: উপরের দাবীটি সত্য এবং সেই সাথে এটাও সত্য যে ম্যাচের কাঠির ভেতর এক ধরনের দৈত্য থাকে। ঘষা দিলে সে রেগে যায় এবং জ্বলে ওঠে।

ঘটনা ২: মেঘ ডাকে কেন?
দাবী ১: বিদ্যুৎ চমকের ফলে তাপমাত্রা ও চাপ হঠাৎ
বেড়ে যাওয়ায় বাতাসের হঠাৎ সম্প্রসারনের ফলে এবং বিদ্যুৎ চমকের কারনে শক ওয়েভ তৈরী হয়। এটাকে মেঘের গর্জন বলা হয়।
দাবী ২: উপরের দাবীটি সত্য সেই সাথে এটাও সত্য যে মেঘের গর্জন হল ফেরেশতাদের হাকডাক।

ঘটনা ৩: জ্বর কেন হয়?
দাবী ১: জ্বর বিভিন্ন কারনেই হতে পারে। যেমন- ইনফেকশন, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমন, পরজীবীর আক্রমন, ইনফ্লেমেশন, অটোইমিউন রোগ ইত্যাদি। আমাদের ব্রেইনের হাইপোথ্যালামাস অংশ থেকে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়। ইনফেকশন বা অন্যান্য বিভিন্ন অসুস্থতার কারনে হাইপোথ্যালামাস শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
দাবী ২: উপরের দাবীটি সঠিক। কিন্তু সেই সাথে এটাও সঠিক জ্বর হল জাহান্নামের উত্তাপ।

ঘটনা ৪: মৃত্যু কেন হয়?
দাবী ১: মৃত্যু বিভিন্ন কারনে হতে পারে। দুর্ঘটনায়, রোগে, দুর্ভিক্ষে, বয়সের ভারে, পুষ্টিহীনতায় কিংবা আত্মহত্যার ফলে। অনেক কারনই থাকতে পারে। মৃত্যু হল কোন জীবের সকল জৈবিক কার্যক্রমের ইতি।
দাবী ২: উপরের দাবীটি সঠিক কিন্তু সেই সাথে এটাও সঠিক আল্লাহর ইচ্ছায় আজরাইল নামক ফেরেশতা মৃত্যু ঘটায়।

উপরের ৪ টি ঘটনা লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন একজন দাবীকারী বিজ্ঞানসম্মত দাবীটি মেনে নেয়ার পাশাপাশি একটি উদ্ভট দাবীর উদ্ভব ঘটাচ্ছেন। তার দাবীটি প্রমানিত নয় এবং তার দাবীর স্বপক্ষে কোন যুক্তিও তিনি উপস্থিত করতে পারছেন না।

এই ধরনের দাবী একই সাথে অপ্রাসঙ্গিক তর্কের কুযুক্তি এবং অজ্ঞতার কুযুক্তির অবতারনা করে।

অপ্রাসঙ্গিক তর্কের কুযুক্তি:

দাবীঃ আমার মনে হয় ভুত আছে।
প্রশ্নঃ ভুত যে আছে, তার প্রমাণ কী?
দাবীঃ এই যে আমরা জন্মেছি, মারা যাচ্ছি, এগুলো তো সত্য, তাই না? মারা যে যাচ্ছি, আমরা কোথায় যাচ্ছি?

উপরের দাবীগুলো লক্ষ্য করুন। দাবীকারী প্রথমে বললো ভুত আছে। প্রমাণ চাওয়া মাত্রই তিনি আলোচনা ভিন্ন একদিকে নিয়ে গেলেন, যেই আলোচনায় তার কথাগুলো আপাত দৃষ্টিতে লজিক্যাল মনে হলেও, তিনি অপ্রাসঙ্গিকভাবেই আসলে জন্ম মৃত্যুর প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। যার সাথে ভুত থাকা না থাকা সম্পর্কহীন। পরের ধাপে তিনি যতই যৌক্তিক কথা বলুন না কেন, তার সকল যুক্তিই কুযুক্তি বলে বিবেচিত হবে। কারণ তিনি মূল প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে অন্যদিকে চলে গেছেন।

আবার, ম্যাচের কাঠির ভেতর যে কোন ধরনের ভুত-প্রেত থাকে বা আজ্রাইল এসে মৃত্যু ঘটায় কিংবা ফেরেশতারা চিল্লাপাল্লা করার ফলে মেঘ ডাকে- সেই ধরনের কোন প্রমান দাবীকারীর কাছে নেই। যুক্তিবিদ্যার ভাষায় এই ধরনের দাবীকে বলা হয় অজ্ঞতার কুযুক্তি।

অজ্ঞতার কুযুক্তি:
দাবীঃ যেহেতু তুমি জানো না, বিগ ব্যাং এর আগে কী ছিল, তাই আমার দাবীটিই সঠিক!
দাবীঃ যেহেতু তুমি জানো না, মিশরের পিরামিডগুলো কোনটি কয়টি পাথর দিয়ে বানানো, তাই যৌন সম্পর্ক ছাড়াই ম্যারীর গর্ভে সন্তান হয়েছে!
দাবীঃ যেহেতু তুমি জানো না,
আমার মাথায় কয়টি চুল, তাই মুহাম্মদ ঘোড়ায় চড়ে সাত আসমান পাড়ি দিয়ে কয়েক মিনিটেই আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছে!
দাবীঃ যেহেতু তুমি জানো না, প্রশান্ত মহাসাগরে কয়লিটার পানি আছে, তাই হনুমান এক লাফে ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা পৌঁছে গেছে!

উপরের দাবীগুলো অজ্ঞতার কুতর্কের কিছু উদাহরণ। ধরুন কেউ দাবী করলো, তিনিই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন; এবং যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলো, এই দাবীটি কেউ অপ্রমাণ করতে পারবে না, এবং আরও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করলো মানুষের অজ্ঞতাকে। যেহেতু মানুষ কিছু বিষয় সম্পর্কে জানে না, বা মানুষের জ্ঞান যেহেতু সীমাবদ্ধ, বা তার কথাটি ভুল প্রমাণ করা হয় নি, সেহেতু তার দাবীটিই সঠিক! কিন্তু কোন অজানা বিষয় অপ্রমাণিত কোন কিছুর সপক্ষের যুক্তি বা প্রমাণ হতে পারে না।

এখন, তার কাছে তার দাবীর স্বপক্ষে প্রমান চাওয়া হলে হয়ত তিনি বলবেন, ‘মেঘ যে ফেরেশতাদের হাকডাক নয়- সেটা অপ্রমান করুন।’ কিংবা, ‘ জ্বর যে জাহান্নামের উত্তাপ নয় সেটা অপ্রমান করুন।’ অথবা, ‘শীত/গ্রীষ্মকাল যে জাহান্নামের উত্তাপের কারনে হয়না- সেটা অপ্রমান করুন।’

এই ধরনের যুক্তি আসলে এক ধরনের লজিক্যাল ফ্যালাসি। যাকে বলা হয়- অপ্রমানের বোঝা।

অপ্রমানের বোঝা:
ঘটনা- ১
দাবীঃ আমি তোমার কাছে দশলক্ষ টাকা পাই।
প্রশ্নঃ টাকা যে পাও তার প্রমাণ কী? কোন কাগজপত্র বা এভিডেন্স আছে?
কুযুক্তিঃ আমি যে টাকা পাই না, তা কি তুমি প্রমাণ করতে পারবে?

ঘটনা- ২
দাবীঃ আমি রোজ সকালে আকাশে উড়তে পারি।
প্রশ্নঃ উড়তে পারো, তার প্রমাণ কী?
কুযুক্তিঃ আমি রোজ সকালে উড়তে যে পারি না, তা তুমি প্রমাণ করতে পারবে?

ঘটনা- ৩
দাবীঃ স্যুপারম্যানের সাথে আমার প্রতিদিন কথা হয়।
প্রশ্নঃ স্যুপারম্যান যে আছে তার প্রমাণ কী?
কুযুক্তিঃ স্যুপারম্যান নেই, তা প্রমাণ করতে পারবে?

উপরের প্রতিটি দাবী এবং দাবীর সপক্ষে কুযুক্তিগুলো লক্ষ্য করুন। দাবীকারী নিজ দাবীর সপক্ষে কোন প্রমাণ উপস্থাপন না করে প্রশ্নকর্তাকেই তার দাবীটি অপ্রমাণের দাবী জানাচ্ছে। অর্থাৎ, তার কাছে তার দাবী প্রমাণের যথেষ্ট যুক্তি না থাকায় প্রশ্নকর্তার ওপরেই সে তার দাবী অপ্রমাণের বোঝা চাপাতে চাচ্ছে। যুক্তিবিদ্যায় একে আমরা বার্ডেন অফ প্রুফ বা অপ্রমাণের বোঝা চাপানো বলি। উল্লেখ্য, প্রমাণ বা যুক্তি উপস্থাপনের দায় তারই, যিনি দাবী উত্থাপন করেন। অন্য কারও তা অপ্রমাণ করার দায় নেই। অন্য কেউ তা অপ্রমাণ না করলেও, তার দাবীটি প্রমাণের বোঝা অন্যের কাঁধে চাপাতে চাইলে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ ও যুক্তির অভাবে তার দাবীটিই খারিজ বা বাতিল হয়ে যাবে।

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: