একজন সমকামীর কিছু কথা

লেখক : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

সমকামিতা, রূপান্তরকামিতা, উভকামিতা, বিষমকামিতা শব্দগুলো কখনোই পশ্চিমা বিশ্বের আবিষ্কার ছিলো না। বরং প্রাচীন সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের ইতিহাসে, গ্রীক, নেটিভ আমেরিকান, চৈনিক, আযটেক্স, মায়ান, মিশরীয় সভ্যতা, প্যাগান ইতিহাসের জীবনযাত্রা, আরব্য গোত্র প্রথার ইতিহাস, পারস্য সাহিত্য, আমাদের উপমহাদেশের পৌরানিক সাহিত্য সর্বত্র যৌনতার ভিন্নধারার প্রচলন দেখা যায়। শুধুমাত্র উনবিংশ শতাব্দীতে এসে পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষমতাধরেরা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে মানুষের আচার আচরনকে সীমিত ধরাবাধা নিয়মের মাঝে বেঁধে দিতে আইন ও রীতিনীতির প্রচলন করে, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে কিছু নির্দিষ্ট জীবনধারার আওতায় নিয়ে আসা এবং তাদের উপর নিয়ন্ত্রন শক্ত ও নিশ্চিত করা। যেটা ক্ষমতাধরদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার নিশ্চয়তা দেয়। মিশেল ফুকো তার হিস্টোরি অফ সেক্সুয়ালিটি বিষয়ক তিনটি বইয়ে এবিষয়ে তার গবেষনা ভিত্তিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বাংলাদেশে ৩৭৭ ধারা সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরই সিদ্ধান্তের অংশ। আমাদের প্রতিবেশী দেশ যারা সেই সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের প্রভাব থেকে বের হয়ে এসে কলনিয়াল ল ৩৭৭ ধারা বাদ দিয়েছে তাদের মাঝে রয়েছে ভারত। অতি সম্প্রতি তাইওয়ান ও ভুটানও পারস্পরিক সম্মতির সমকামিতার সম্পর্ককে আইনগত বৈধতা দিয়েছে। এখানে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, পেডোফিলিয়া বা শিশুকাম এবং জোরপূর্বক বলাৎকারকে উৎসাহিত করা হয়নি এবং এর জন্য সমকামিতাকে দায়ী করা যাবে না। যেমনভাবে প্রতিটা নির্মম রেপ, নারী/পুরুষ একে অপরের প্রতি সহিংসতা, যৌতুক, বিয়ের নামে প্রতারণা, এবং যৌন হয়রানিমূলক ঘটনার জন্য বাংলাদেশে কেউ বিষমকামিতাকে দায়ী করে না।

কিছু ব্যাক্তিবর্গ মনে করেন সমকামী অধিকারের পক্ষে যারা কথা বলেন তারাও সমকামী। কিন্তু যারা পরিবেশ রক্ষা নিয়ে কথা বলেন তারাও কি তবে গাছপালা, নদী প্ল্যাস্টিক বা বর্জ্যপদার্থ হয়ে যায়? যারা সমকামী অধিকারের পক্ষে কথা বলেন তারা তাদের মানবিক মূল্যবোধ থেকেই বলেন এবং তাদের সবাইকে সমকামী হতে হবে এমনকোন কথা নেই। পরিবেশটা উল্টোভাবে চিন্তা করে দেখুন, আপনি যদি একজন বিষমকামী হন এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণবোধ করেন আর সেটা আপনার সমাজ ও রাষ্ট্র দ্বারা স্বীকৃত না হয়, আপনাকে অভিনয় করে পালিয়ে চলতে হয় এবং শুধুমাত্র এজন্য আপনাকে ঘৃণা বা ত্যাজ্য করা হয়, এমনকি মেরে ফেলা হয়, তবে তা কি করুণ একটা পরিস্থিতি হবে। বিষমকামিতা সমকামিতার, উভকামিতা বা রূপান্তকামিতার মতই স্বাভাবিক একটি যৌনপ্রবণতা এবং সবাই একইভাবে ভালবাসে স্বপ্ন দেখে, গ্রহণযোগ্যতা পেতে চায়। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার আদায় হলে মুখ বুজে থাকলে বা অন্যের অধিকার আদায়ে আপনার কিছু যায় আসে না ভাবলে সেটাকে স্বার্থপরতা বলা যায়, আর অন্যের মানবিক অধিকার আদায় হোক সেটা না চাইলে তাকে অত্যাচার বলা যায়। আর অধিকার কোন পিঠা ভাগাভাগির মত ব্যাপার না যে একজনেরটা চাইলে আরেকজনের ভাগে টান পড়বে। বরং সমাজে সমতার চিত্র ফুটে উঠবে, একসাথে সবার মূল্যবোধের উন্নতি ঘটবে, অন্যের জন্য সাহায্যের মনোভাব বৃদ্ধি পাবে। যদি আমরা সবাই একসাথে মুক্ত না হই, তবে আসলেই কি আমরা সবাই পুরোপুরি মুক্ত ?

যাদের প্রশ্ন সকামিতা সন্তান উৎপাদন করে না, হ্যাঁ হয়তো সরাসারিভাবে অংশগ্রহন করে নয়, কিন্তু প্রকৃতি তার টিকে থাকার প্রয়োজনেই এই চালাকির ব্যবহার করে। উদাহরণসরূপ কোন একটি পরিবারে যদি একজন ছেলে সমকামী হয় তবে তার ভাইবোনদের মাঝে যদি কন্যা সন্তানের জন্ম হয় তার বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষন বেশী হবে, যা পরবর্তী প্রজন্মের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। সেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রতি দশজনের মাঝে একজন পুরুষ সমকামিতা বা একই লিঙ্গের প্রতি আকর্ষনের প্রবণতা নিয়ে জন্মায়। ২০০৪ সালে ইতালির একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পরিবারে পুরুষ সমকামী আছে সে পরিবারে নারীদের মাঝে উর্বরতার হার দেখা যায় বেশী। ডঃ আন্দ্রিয়া ক্যাম্পেরিও সিয়ানির গবেষনায় দেখা যায়, বিষমকামী পরিবারে যেখানে গড় সন্তান সংখ্যা ২.৩ সেখানে গে সন্তানবিশিষ্ট পরিবারে সন্তানের সংখ্যা ২.৭। তাই তিনি বলেছেন,

“We have finally solved the paradox … the same factor that influence sexual orientation in males promotes higher fecundity in females”

বিজ্ঞানী ডীন হ্যামারও বলেছেন,

‘The answer is remarkably simple: the same gene that causes men to like men, also causes women to like men, and as a result to have more children’

শুধু সন্তান উৎপাদন নয় বরং ভালবাসাই একটা সফল দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি। অনেক বিষমকামী এমনকি সমকামী নারী দম্পতিও আছেন যারা সন্তানহীন বা কৃত্রিম উপায়ে সন্তান নেন। টেস্টটিউব, সারোগেসি সিস্টেমের কথা তো আমরা জানিই। বিজ্ঞান এ ব্যাপারে আরো এগিয়ে চলছে দিন দিন। আর তাছাড়া বিষমকামীদের দ্বারা জন্ম দেয়া কত বাচ্চা তো বাবা-মা ছাড়াই রাস্তাঘাটে অনাদরে অবহেলায় বা এতিমখানা-আশ্রমে বড় হচ্ছে। এই দুস্থ দেশে কিছু সন্তান দত্তক নিয়ে তাদের যত্ন নিয়ে পরিবারের ছায়ায় বড় করে তুললে তাতে সমাজের উপকার বই অপকার হবে না। আর সমকামী সম্পর্কগুলো সামাজিক স্বীকৃতি পেলে এই দত্তক নেয়ার কাজটি উনারা করে থাকেন।

সমকামিতা দু ধরনের হয় এক হচ্ছে আচরণগত আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে জন্মগত যাদের বলা হয় বায়োলজিকাল হ্যার্ডফ্যাক্ট। আচরণগত সমকামীরা পরিবেশের উপর ভিত্তি করে যৌন আচরণ পরিবর্তন করেন। যেমন পুরুষ জেলে এই উদাহরণ দেখা যায়। কিন্তু জন্মগতভাবে যারা সমকামীতার বৈশিষ্ট্যগুলো পান তা পরিবর্তন হয় না। ২০১৮ এর অক্টোবরে উইনিভার্সিটি অফ এসেক্সের একটি গবেষণা দল ডঃ ওয়াটস – এর নেতৃত্বে মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ে বাচ্চার ওপর পুরুষ এবং নারী হরমোনের তারতম্যের কারণে হাতের আঙ্গুলের উচ্চতার পরিবর্তণ লক্ষ্য করেছেন যা পরবর্তী জীবনে তাদের সেস্কুয়ালিটিতেও প্রভাব ফেলে। ডঃ ওয়াটস বলেন,

“Research suggests that our sexuality is determined in the womb and is dependent on the amount of male hormone we are exposed to or the way our individual bodies react to that hormone, with those exposed to higher levels of testosterone being more likely to be bisexual or homosexual.”… “Because of the link between hormone levels and difference in finger lengths, looking at someone’s hands could provide a clue to their sexuality.”

তাই বিষমকামীদের চেয়ে সমকামীদের নারী ও পুরুষভেদে কিছু নির্দিষ্ট দিক থেকে আঙ্গুলের উচ্চতা ভিন্ন হয়। আর্কাইভস অফ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার-এ এই গবেষণাকর্মটির ব্যাপারে বিস্তারিত পড়তে পারবেন।

আমাদের যৌন সচেতনতার শিক্ষার অভাবপূর্ণ রক্ষনশীন সমাজে পেশীর জোর যেখানে মানবিক মূল্যবোধের মুখ চেপে ধরে সেখানে যৌনতা অবদমিত করেই সমকামীরা একটি বিষাদঘন জীবন কাটিয়ে দেন। ইচ্ছে করে কেউ কঠিন কষ্টের অবদমনের জীবন বেছে নিতে চায় না। আমাদের জনসংখ্যার সেই ১০-১৫ ভাগ সমকামীদের জীবন এই কঠিনভাবেই পার হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিষমকামীদের অজ্ঞতাপূর্ণ ঘৃণার কারণে। কারণ, আমাদের সমাজে আমরা জন্ম থেকে অজান্তেই অজ্ঞতা, বিভেদ, আগ্রাসনপূর্ণ চিন্তা ও ঘৃণা শিখে বড় হই। কিছু বিষমকামীর কাছে সমকামী যৌনতা অসম্ভব মনে হয়, হতে পারে। কারণ, তিনি চিন্তা করছেন তার নিজেকে দিয়ে কিন্তু তাকে কেউ সমকামী হতে বলছে না আর তাই উনার নিজেকে দিয়ে চিন্তা করার কোন প্রয়োজনও নেই, তাছাড়া তিনি একজন সমকামীর পক্ষ হয়ে চিন্তা করবেনই বা কি কারণে। বিষমকামী যৌনতা যেমন পারস্পরিক সম্মতিতে হয় বা হওয়া উচিত ঠিক তেমনি সমকামী যৌনতাও ঘটে বা ঘটা উচিত দুজন সঙ্গীর পারস্পরিক সম্মতিতে।

One thought on “একজন সমকামীর কিছু কথা

  • June 19, 2019 at 2:28 am
    Permalink

    ওমর যে দাসী ক্রয় করেছিল বুক টিপে সেই রেফারেন্স আমার জরুরি

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: