জামাত ইসলাম সহি ইসলাম নয়?

সেদিন মোশরেফা মিশু আপার সাথে দীর্ঘ সময় নানা বিষয় নিয়ে আলাপ হলো। মোশরেফা মিশু আপা গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী, এবং উনার সংগ্রামী জীবন এবং বাঙলাদেশের অসংখ্য শ্রমিকের জন্য উনার কাজ আমি সম্মান করি। নানা তর্ক বিতর্কের মাঝে দারুণ সময় কেটে গেল। বেশিরভাগ বিষয় নিয়ে আমরা একমত হলেও একটা বিশেষ বিষয়ে আমি উনার সাথে দ্বিমত করলাম। সেই দ্বিমতের জায়গাটা পরিষ্কার করছি অন্যদের জানাবার জন্য। কারণ এই কথাটা আমি ইতিপূর্বে বেশ কয়েকজনার কাছ থেকে শুনেছি এবং আমার যুক্তি তুলে ধরেছি। এবারে লিখিতভাবেই যুক্তি তুলে ধরলাম, পরে ভুলে যাবো বলে লিখে রাখছি।

উনি বললেন, জামাত হেফাজতের মত সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর আসল রূপ জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে, তারা আসলে কোন ইসলামি দল নয়। সরাসরি সেক্যুলারিজম কিংবা নাস্তিক্যবাদের কথা বলা হলে ধর্মপ্রাণ জনগণের মধ্যে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে। যেমন বলতে হবে, জামাত ইসলাম মানে ইসলাম নয়। কারণ তারা বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন করেছে, রাজনীতি করেছে এবং সরকার গঠন করেছে। যেহেতু ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম, তাই জামাত ইসলাম আর ইসলামী দল হিসেবে গণ্য হতে পারে না। তাই জামাতকে বর্জন করতে হবে।

আমি উনাকে বললাম, কিন্তু এই পন্থায় জামাতের মত ইসলামী দলগুলোকে “সহি ইসলাম নহে” প্রমাণ করার মধ্যে মস্ত বড় একটা ঝামেলা আছে। এর মানে হচ্ছে এক অর্থে নারী নেতৃত্ব হারাম, তা মেনে নেয়া এবং সেটাকে আদর্শ গণ্য করে জামাত ইসলামকে ইসলাম থেকে খারিজ করা। অর্থাৎ “ইসলাম” এবং “নারী নেতৃত্ব হারাম” এই ধারণা বলবত রেখে শুধুমাত্র জামাতকে ঘায়েল করা। এটা আমার মতে মস্তবড় একটা ভুল, যা শোধরানো যায় না। জনগণ যদি এই মর্মে জামাতের বিরোধিতা করে যে, জামাত নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়ে ইসলাম বিরোধী কাজ করেছে, এবং সেকারণে তারা এখন আর ভাল রাজনৈতিক দল নেই, তার মানে হচ্ছে আমরা ইসলামের নারী নেতৃত্ব হারামের মত একটা অত্যন্ত বাজে, মধ্যযুগীয় এবং নারী বিদ্বেষী ধারণাকে মেনে নিচ্ছি। এবং সেই মেনে নেয়া থেকে যদি আমরা জামাতকে খারিজও করে দিই, তাতে আসলে কোন লাভ হবে না। জনগণের মধ্যে জামাতের বিরোধীতা বৃদ্ধি পেলেও এই নারী বিরোধী ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করতেই সাহায্য করবে শুধু।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরোধিতা করি। কিন্তু তা খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনার নারী হওয়ার জন্য মোটেও নয়, তাদের দলীয় নীতি আদর্শের কারণে। খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনা নারী, সে কারণে তাদের সাথে কেউ জোট গঠন করলে তারা খারাপ হয়ে যাবে, এই ধারণাকে সমর্থন দেয়া হচ্ছে নারী নেতৃত্বকে খারাপ বলে সার্টিফাই করা। যা জনগণের মধ্যে শুধু নারীবিদ্বেষ, মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষকেই পরিপুষ্ট করবে।

ইউরোপে যখন নারীরা শিক্ষায় জ্ঞানে বিজ্ঞানে উন্নতি করে যাচ্ছে, মহাকাশ পাড়ি দিচ্ছে, সেই সময়ে মুসলিম দেশগুলোতে নারীরা যুদ্ধ করছে ভোটের অধিকারের জন্য, গাড়ি চালাবার অধিকারের জন্য, ধর্ষিত হওয়ার পরে শরীয়া আইন মোতাবেক দোররা যেন না মারা হয় তা থেকে বাঁচার জন্য। যেই সব দেশ এখন পর্যন্ত সহি ইসলাম পালন করছে না, সে সব দেশেই বরঞ্চ নারীরা কিছুটা অধিকার পাচ্ছে। এই দেশে সহি ইসলাম কায়েম হলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আর গার্মেন্টসে গিয়ে কাজ করতে হতো না। এই দেশের প্রধান দুটো দলের নেতারা নারী হতো না। জামাতকে ঘায়েল করতে গিয়ে যেন আমরা আরব থেকে সহি এবং পরিপূর্ণ ইসলাম আমদানি না করে ফেলি! তাহলে আম ছালা দুটোই চলে যাবে।

তার চাইতে জনগণকে বোঝাতে হবে, একজন নারী যদি যোগ্য হয়, একজন মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ইহুদী যদি যোগ্য হয়, একজন নাস্তিক যদি যোগ্য হয়, একজন সমকামী যদি যোগ্য হয়, একজন আদিবাসী যদি যোগ্য হয়, একজন হিজরা যদি যোগ্য হয়, যেকোন মানুষই যদি যোগ্য হয়, তাকে তার যোগ্যতা অনুসারেই বিচার করতে হবে। আর যারা মানুষকে যোগ্যতার ভিত্তিতে পরিমাপ না করে, বিবেচনা না করে শুধুমাত্র তার ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-জাত-পাত-যৌনরুচি ইত্যাদির দ্বারা বিচার করে, তাদের সেই ধারণাই আমাদের শত্রু। সেটা জামাত হোক কিংবা হেফাজত, আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বিএএনপি। ধর্মীয় নিয়ম কানুন এবং আইনগুলো সর্বদাই মানুষকে নানাভাবে বিভক্ত করে, এবং সাম্প্রদায়িকতা-নারীবিদ্বেষ-সমকামীবিদ্বেষ সহ নানা ধরণের বিদ্বেষের জন্ম দেয়। তাই সেগুলোর গোড়াতেই আঘাত করতে হবে। আমাদের রাজনীতিবিদদের দীর্ঘদিনের কাজ ছিল সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে “সহি ইসলাম নহে” প্রমাণের চেষ্টা করতে থাকা। যেটা ছিল মস্তবড় একটি ভুল কাজ। যার ফলে এ সহি নহে সে সহি নহে এসব মারামারি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে, আর সহি হওয়ার প্রতিযোগীতায় একজন আরেকজনার চেয়ে বেশি ইসলামিস্ট হয়ে উঠেছে। যেখানে সহি ইসলামের মধ্যেই এত বেশি ভয়ংকর ব্যাপার স্যাপার, নারী সহ সকল সংখ্যালঘু মানুষের জন্য এত বেশি অসম্মানজনক কথাবার্তা, যে সেগুলোর বিরুদ্ধে এখন মেরুদণ্ড শক্ত করে না দাঁড়ালে আমরা অশিক্ষিত আর বর্বরই রয়ে যাবো। এবং জামাতের বিরুদ্ধে এই পন্থা হিতে বিপরীত হয়ে উঠবে। জনগণ ধরেই নেবে, নারী নেতৃত্ব আসলে খুব খারাপ বিষয়! এবং সেক্যুলাররাও সে বিষয়ে একমত!

কিন্তু নারী নেতৃত্ব হারাম, বা খারাপ, বা ধ্বংসের কারণ, ইসলামের এই বর্বর ধারণাকে আমরা কেন প্রোমোট করবো?

বরঞ্চ কোন ইসলামী সংগঠন বা রাজনৈতিক দল যদি ইসলামের বাজে নিয়মগুলো আঁকড়ে ধরে বসে না থেকে আধুনিক হয়, নারী নেতৃত্ব মেনে নেয়, সেইসাথে অন্যান্য পুরনো ধ্যানধারণা থেকে সরে আসে, সেটা তো আরো ভাল ব্যাপার। সেটা নিয়ে সেক্যুলাররা কেন জামাতের সমালোচনা করবে? সমালোচনা হতে পারে অন্যান্য বিষয় নিয়ে। যেমন তাদের ইসলামী জঙ্গি কানেকশন, কিংবা তাদের একাত্তরের কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। কিন্তু তারা নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়ে খারাপ কাজ করেছে, এই প্রচার অত্যন্ত অসভ্য এবং বাজে।

এবং নিজের পায়ে কুড়াল মারার মত ক্ষতিকর।

Facebook Comments