আমি কেন ইসলামে বিশ্বাস করি না। পর্ব-১

পর্ব-১

সহজ মানুষ
ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে
পাবিরে অমূল্য নিধি বর্তমানে।।
ভজ মানুষের চরণ দু’টি
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি মরিলে
সব হবে মাটি
ত্বরায় এই ভেদ লও জেনে।।
শুনি ম’লে পাবো বেহেস্তখানা
তা শুনে তো মন মানে না
বাকির লোভে নগদ পাওনা
কে ছাড়ে এই ভুবনে।।
আচ্ছালাতুল মেরাজুল মোমেনীনা
জানতে হয় নামাজের বেনা
বিশ্বাসীদের দেখাশোনা
লালন কয় এই ভুবনে।।
– লালন ফকির

সত্যিকথা বলতে কী, যেকোন ব্যক্তিই সবসময়ই চায় একজন ধর্মপ্রাণ ঈশ্বরভক্ত মানুষ হয়ে জীবন কাটাতে, রাষ্ট্র-সমাজ এবং আমাদের প্রথাসমূহ ঠিকঠাকভাবে পালন করে পরকালের জীবনের জন্য কিছু পুণ্য সঞ্চয় করে জীবনটাকে নিরুত্তাপভাবে শেষ করতে। সব মানুষই চাইবে, পৃথিবীর পুণ্য ব্যাংকে বেশ ভাল পরিমাণ পুণ্য সঞ্চয় করে এই অস্থায়ী জীবনটাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে, এবং পরকালে গিয়ে স্বর্গের অফুরন্ত সুখ উপভোগ করতে। একমাত্র নির্বোধরাই চাইবে পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য পরকালের অনন্ত সুখ, অসংখ্য হুর গেলমানে পরিপূর্ণ স্বর্গ, দুধের সমুদ্র আর শরাবের নদীর লোভকে বিসর্জন দিতে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই পর্যন্ত পাওয়া যাওয়া তথ্য অনুসারে, মানুষই মহাবিশ্বের একমাত্র জীব যা মহাবিশ্ব, মহাবিশ্বের উৎপত্তি থেকে শুরু করে নানান বিষয়ে চিন্তা করতে সক্ষম। মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণীর পার্থক্য এটাই যে, মানুষ মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্যকে জানার এবং বোঝার চেষ্টা করে আসছে বহু বছর ধরে। শুধুমাত্র একটি বন্য পশুর মত জীবনটাকে খাদ্য ও যৌনতায় পরিপূর্ণ না করে সে প্রকৃতিকে দেখেছে, চিনেছে, বুঝেছে এবং নিয়ন্ত্রণও করেছে। ফরাসী গণিতজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক রেঁনে দেকার্ত (Rene Descartes) তার ‘Discourse on method’ এ বলেছিলেন “Cogito ergo sum” অর্থাৎ “I doubt, therefore I think, I think, therefore I am” মানে হচ্ছে “আমি সন্দেহ করি, কেননা আমি চিন্তাশীল, আর চিন্তাশীল বলেই আমি অস্তিত্বশীল।” মানুষের এই অস্তিত্ব একটি পশুর অস্তিত্বের চাইতে আলাদা একারণেই যে, মানুষ শুধু খেয়ে পরে বেঁচে থাকার কথাই ভাবে না, মানুষ আরও অনেক বেশি চিন্তা করতে সক্ষম একটি প্রাণী। আমিও চিন্তা করি, আর চিন্তা করতে পারি বলেই কোনকিছুকেই আর সহজে গ্রহণ করতে ইচ্ছা হয় না। সন্দেহ জ্ঞানের জননী। তাই যাচাই বাছাই বিচার বিশ্লেষণ করে তবেই গ্রহণ করতে ইচ্ছা করে।

আর তা করবে না-ই বা কেন? কাল যদি একজন পীর সাহেব এসে বলেন, তিনিই আল্লাহ, তাহলে আমি কেন তা মানবো? এমনকি তিনি যদি কিছু জাদুমন্ত্র দেখিয়ে আমাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তখনও আমি অবশ্যই সেই জাদুগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বের করার চেষ্টা করবো এবং সেই প্রতারক জাদুকরকে বাতিল করার জন্য যুক্তির আশ্রয় নেবো। যদি দ্বিধাহীনভাবেই বিশ্বাস করতে হয়, তবে তো সবই বিশ্বাস করতে হবে। অন্ধভাবে শুধুমাত্র পিতামাতা এই ধর্মটি পালন করতো বলে কিংবা আমি অমুক ধর্মের পরিবারে জন্মেছি বলে শুধুমাত্র এই ধর্মটি সত্য, এটা তো কোন যুক্তির কথা হলো না। আর যদি যুক্তি দিয়েই গ্রহণ করতে হয়, তবে সবকিছুই যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমেই গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে।

প্রথমত আমি জন্মেছি একটি মুসলিম পরিবারে। স্বাভাবিকভাবেই আমাকে বলা হয়েছে, আল্লাহ নামের একজন সবকিছু সৃষ্টি করেছে, এবং তিনিই সর্বশক্তিমান ও অসীম দয়ালু। আমাকে ইসলাম ধর্ম পালন করতে হবে, কারণ এটাই শ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র সত্য ধর্ম, এবং হযরত মুহাম্মদ হচ্ছেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল। এবং এসব বিশ্বাস না করলে সেই অসীম দয়ালু ভদ্রলোকটি আমাকে অনন্তকাল নরকের আগুনে জ্বালাবেন, আমাকে অনন্তকাল শাস্তি দেবেন! আর বিশ্বাস করলে এবং তার দেয়া নিয়মকানুন নিয়ে প্রশ্ন না তুলে তা ঠিকঠাক ভাবে পালন করলে আমাকে দেবেন অসংখ্য হুর, গেলমান, অনন্ত সুখের জান্নাতুল ফেরদৌস। এসব কথা যখন আমাকে শেখানো হলো, পরবর্তীতে আরও অনেক যাচাই বাছাই করে দেখলাম, আমি যদি একটি হিন্দু পরিবারে জন্মাতাম, ঠিক একই ভাবে আমাকে শিবের কথা বলা হতো, বা ব্রহ্মার কথা বলা হতো। বলা হতো হিন্দুধর্মই সনাতন এবং সত্য ধর্ম, বাকি সবগুলোই মিথ্যা। এমনকি খ্রিষ্টান বা ইহুদি ধর্মের কোন পরিবারে জন্মালেও ঠিক একই কথা। সব ধর্মই একই কথা বলে আসছে। ঠিক যেমন টিভিতে দেখানো বিজ্ঞাপনের মত। শুধুমাত্র ফেয়ার এন্ড লাভলিই আপনার ত্বক ফর্সা এবং সুন্দর করবে! কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখে আমি কী জিনিসটি কিনবো? না নিজেই যাচাই করে দেখবো?রা

এই পরিবারটিতে জন্মাবার পিছনে আমার কোন হাত নেই, তাই আল্লাহ বা ইসলামকে দ্বিধাহীনভাবে মেনে নিতেও আপত্তি তৈরি হলো। কেন মেনে নেবো? এই ধর্মটি অন্য ধর্মগুলোর চাইতে কেন এবং কীভাবে আলাদা? অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই ইসলামও নিজেকে শান্তির ধর্ম বলে দাবী করে; অথচ ঠিক একই পন্থায়, যেই পন্থায় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা হত্যা ধর্ষণ দুর্নীতিতে লিপ্ত, তারাও সমপরিমাণে- কোন কোন ক্ষেত্রে বেশিই এই সকল অপকর্মে লিপ্ত। ইসলাম যদি এতই শান্তির কথা বলতো, তবে ইসলামি দেশগুলোর আজকে এই অবস্থা হতো না। তবে কি মুসলিমরা ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে? দূরে সরে যাবার কারণেই আজ তাদের এই দুর্দশা?

কিন্তু তা কীভাবে বিশ্বাস করি? হযরত মুহাম্মদ মারা গিয়েছিলেন বিষক্রিয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে (টিকা-১)। উনার চারজন প্রধান খলিফার মধ্যে তিনজনই মারা গিয়েছিলেন মুসলমানদের হাতে খুন হয়ে। উনার প্রিয় নাতি দুইজনই মারা গিয়েছিলেন মুসলমানদের হাতেই। মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে মুসলমানদের মধ্যেই এইসব খুনখারাবী চলছে অনেক কাল ধরে। এত শান্তির একটা ধর্মে এরকম রক্তারক্তির ইতিহাস কেন? কীভাবে? খুবই আশ্চর্য বিষয়। এমন হতেই পারে যে, মুসলিমরা আধুনিক যুগে আর ইসলাম পালন করছে না, তাই তারা দুর্দশা এবং দুরবস্থায় পতিত হয়েছে। তাই আমাদের সকলের উচিত, শান্তির ধর্ম ইসলামের আদি যুগে ফিরে যাওয়া, কুরআন হাদিসকে একমাত্র সংবিধান ধরে মানব জীবন পরিপূর্ণ করা। তাই আমিও কুরআন হাদিসেই ফিরে যাচ্ছি। নিজে বুঝে তারপরেই মেনে নেবো, না বুঝে মেনে নেয় নির্বোধরা, যারা চিন্তা করতে অক্ষম। আমি দেখে শুনে বুঝে তারপরেই ইসলামকে গ্রহণ করবো।

কিন্তু তার আগে প্রশ্ন হচ্ছে, আমাকে কেন একটি ধর্মে বিশ্বাস করতেই হবে? বিশ্বাসের উপযোগীতা কতটুকু? একজন বিশ্বাসী এবং একজন অবিশ্বাসী কীভাবে আলাদা? ধর্ম বা ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন জরুরী কীভাবে?

■ প্রশ্নের উদ্ভবঃ

ছোটবেলা আমি বেশ ধর্মপ্রাণ এবং বিশ্বাসী মানুষ ছিলাম। একটা মসজিদে গিয়ে আমপাড়া সিপাড়া পড়তাম। মসজিদের মৌলানা সাহেব সুললিত কণ্ঠে আরবি পড়তেন, আমরাও তার সাথে সুর করে করে কোরআনের আয়াত পড়তাম। নামাজের আহবান আজান শুনে আমার মনে দোলা দিয়ে উঠত। নিয়মিত সুরাকালাম পড়তাম। তখনো বাঙলা কোরআন হাতে পাই নি, তাই মানেটানে কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু খুব শ্রদ্ধা ভক্তি সহকারে কোরআন পড়তাম, কিছু না বুঝলেও মনে হতো খুব পবিত্র একটা কাজ করছি। মনে খুব শান্তি শান্তি একটা অনুভূতি হতো। সে সময়ে রাস্তায় কোন আরবি লেখা পরে থাকা দেখলেই তুলে সালাম করতাম। সেটা ছিল আরবি ভাষার প্রতি ভক্তির কারণে। বুঝতামও না আরবিতে আসলে কী লেখা আছে।
একটু বড় হওয়ার পরে একটা বাঙলা কোরআন শরীফ হাতে পেলাম। হাতে পাওয়ার পরে খুব আগ্রহ নিয়েই কোরানের আয়াতগুলোর অনুবাদ পড়তে শুরু করলাম। তখন রীতিমত বিশ্বাসী ছিলাম, কোন প্রশ্ন ট্রশ্ন মনে জাগে নি। যা পড়েছি সেগুলোই মনে হচ্ছিল খুব অসাধারণ কিছু একটা। যা বুঝতে পারতাম না, বা একটু গোলমেলে লাগতো, ভেবে নিতাম আমার জ্ঞান নেই, আমি বুঝি না তাই বুঝতে পারছি না। যাইহোক, এভাবেই কোরআন বিষয়ক জ্ঞান আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেতে লাগলো।

হঠাৎ একদিন মনে খটকা লাগলো। একদিন মৌলানা সাহেব সুরা হিজর এর একটি আয়াত বললেন, সেটা হচ্ছে,
“ইন্না নাহনু নায্-যাল-নায্ জিকরা ওয়া ইন্না লাহূ লাহাফিজুন”

বাসায় গিয়ে বাঙলা কোরআনটা খুলে দেখলাম, এর অর্থ হচ্ছে
– ‘নিশ্চয়ই কোরআন আমি নাযিল করেছি এবং আমি নিজেই এর হিফাজতকারী’

তখনো খটকাটি হয় নি। মৌলানা সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম এই আয়াতটির প্রত্যেকটি শব্দের মানে বলতে। তিনি এক এক করে প্রতিটি শব্দের মানে বললেন। ‘নাহনু’ শব্দটির মানে তিনি বললেন ‘আমরা’। অথচ পুরোটি একসাথে অনুবাদের সময় তিনি বললেন ‘আমি’। এই শুনে মনে খুব খটকা লাগলো। হয়তো মৌলানা সাহেব কিছু ভুল বলছেন, নতুবা কোন ঝামেলা আছে। যাইহোক, একদিন পাশের লাইব্রেরিতে চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে আরেকটি (ড. জহুরুল হকের) বাঙলা কোরানে দেখতে পেলাম আয়াতটির অর্থ লেখা, ”নাহনু” শব্দটির অর্থ ”আমরা”।

পুরো আয়াতটির বাঙলা হচ্ছে,
‘নিঃসন্দেহ আমরা নিজেই স্মারকগ্রন্থ (কোরআন) অবতারণ করেছি, আর আমরাই তো এর সংরক্ষণকারী।’

মনে ভীষণ খটকা লাগলো। ইসলামের অন্যতম মূল বিষয় হচ্ছে আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। তার কোন শরীক নেই। অথচ তিনি বিভিন্ন জায়গাতে এভাবে আমরা আমরা করছেন কেন? সুরা বাকারার ৩৪ নম্বর আয়াতে পেলাম আরেকটা একই রকম কথা!

“আর স্মরণ করো! আমরা ফেরেশতাদের বললাম- আদমের প্রতি সিজদা করো। সুতরাং তারা সিজদা করল, কিন্তু ইবলিস করলনা, কারণ সে ছিল কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত।”

এরকম আরো কিছু আয়াত পেয়ে গেলাম, যেখানে আল্লাহ নিজেকে বোঝাতে আমরা ব্যবহার করছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বেশ কিছু বাঙলা অনুবাদে কোরানের এই ভুলটি সংশোধন করে আমি করে দেয়া হয়েছে। এই নিয়ে একে জিজ্ঞেস করলাম, তাকে জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু কেউই সদুত্তর দিতে পারলো না। বরঞ্চ মসজিদের মৌলানার কাছে বেশ কয়েকবার চড় খেলাম বেমক্কা প্রশ্ন করার জন্য। শেষমেশ এলাকার এক বড় ভাই সমাধান দিলেন, বললেন কোরানে যেহেতু ভুল কিছু লেখার সুযোগ নেই, তাই নিশ্চয়ই এর ব্যাখ্যা আছে। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমরা দ্বারা আসলে রাজকীয় আমি (majestic plural) বোঝানো হয়েছে। আমরা শব্দটি এখানে সম্মানার্থে ব্যবহৃত। ব্রিটিশ রানীকে সম্মান করার জন্যেও এরকম শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। রাণী নিজেই নিজের সম্পর্কে আমরা বলতে পারেন। আল্লাহর অনেকগুলো নাম, সেই অনেকগুলো রাজকীয় নাম বোঝাবার জন্য কোরানে আমরা ব্যবহার করা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, তার কথা শুনে যুক্তিযুক্ত মনে হলো। আমি এরপরে ম্যাজিস্টিক প্লুরাল নিয়ে পড়তে লাগলাম। তখন জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ নিজেই নিজেকে সম্মান করে আমরা বলছেন, তা বেশ ভাল কথা। কিন্তু কোথাও কোথাও আবার আমি কেন ব্যবহার করছেন? একস্থানে আমি, আরেকস্থানে আমরা ব্যবহার খুবই সন্দেহজনক। তিনি নিশ্চয়ই এতই ভুলোমনা মানুষ নন যে, আগের লাইনেই আমি বলে পরের লাইনে আমরা ব্যবহার করবেন! উল্লেখ্য, ব্যাকরণ ঠিক রেখে লিখলে ম্যাজিস্টিক প্লুরাল ব্যবহার করে একটি পুরো প্যারা লিখতে সর্বত্রই আমরা ব্যবহার করতে হয়। এক জায়গায় আমি আরেকজায়গাতে আমরা লেখা যায় না। আবার, যিনি রয়্যাল উই ব্যবহার করবেন, তিনি সর্বত্রই তা ব্যবহার করবেন। এক জায়গায় আমি আরেক জায়গাতে আমরা ব্যবহার করবেন না। তাহলে কী আল্লাহ মাঝে মাঝে ব্যাকরণ ভুলে যেতেন?

এই সুরাটি পড়ে দেখলাম,

SAHIH INTERNATIONAL
[Say], “Then is it other than Allah I should seek as judge while it is He who has revealed to you the Book explained in detail?” And those to whom We [previously] gave the Scripture know that it is sent down from your Lord in truth, so never be among the doubters.

MUHSIN KHAN
[Say (O Muhammad SAW)] “Shall I seek a judge other than Allah while it is He Who has sent down unto you the Book (The Quran), explained in detail.” Those unto whom We gave the Scripture [the Taurat (Torah) and the Injeel (Gospel)] know that it is revealed from your Lord in truth. So be not you of those who doubt.

আরও অবাক বিষয় হচ্ছে, বাঙলা অনুবাদে বেমালুম আমরা শব্দটি বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছেঃ
তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন বিচারক অনুসন্ধান করব, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত গ্রন্থ অবতীর্ন করেছেন? আমি যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করেছি, তারা নিশ্চিত জানে যে, এটি আপনার প্রতি পালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবর্তীর্ন হয়েছে। অতএব, আপনি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।

PICKTHALL
Shall I seek other than Allah for judge, when He it is Who hath revealed unto you (this) Scripture, fully explained? Those unto whom We gave the Scripture (aforetime) know that it is revealed from thy Lord in truth. So be not thou (O Muhammad) of the waverers.

ভেবে দেখলাম, বাঙলা অনুবাদের সময় অনেককেই এই ভুলগুলো নিজের ইচ্ছামত সংশোধনের চেষ্টা করেছেন। এতো গেল একটি বিষয়। ধীরে ধীরে এক এক করে নানা সন্দেহের কথা, জিজ্ঞাসা এবং প্রশ্নের কথা বলছি।

■ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর!!!

Rene Descartes বলেছেন, If you would be a real seeker after truth, it is necessary that at least once in your life you doubt, as far as possible, all things. আমাদের জ্ঞান, আমাদের প্রজ্ঞা আমাদের জানায়, সন্দেহ-অবিশ্বাস-কৌতূহল জ্ঞানের জন্মদাতা।
প্রাচীনকালে/মধ্যযুগে অল্প জ্ঞানের কারণে মানুষ বিভিন্ন জিনিস বিশ্বাস করত। বিদ্যুৎ চমকালে বিশ্বাস করত দেবতারা রাগ করেছেন, বন্যা হলে বিশ্বাস করত অপদেবতা নাখোশ হয়েছেন, অসুখ হলে কোন এক একেশ্বর অভিশাপ দিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ গাছপালার পূজা করতো, কেউ বা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করতো, আবার কেউ এক ঈশ্বরের আরাধনা করতো। কিছু কৌতূহলী মানুষ এই সকল ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সব সময়ই সন্দেহ করত। তারা এইসব বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলতো। তারা বলত, আসলেই কি ঝড় দেবতাদের অথবা একেশ্বরের কাজ? আসলেই কি বিদ্যুৎ চমকানো দেবতাদের/ এক ঈশ্বরের রাগ? আসলেই কি অসুখ বিসুখ এক ঈশ্বরের অভিশাপ? নাকি এগুলো আমাদের অজ্ঞতা, যা আমরা জানি না, তা আমরা ঐশ্বরিক বা অলৌকিক ব্যাপার বলে চালিয়ে দিই?

যুগে যুগে নানা ধর্ম প্রচারক, নবী পয়গম্বর বা অবতারের আবির্ভাব হয়েছে। তাদের পথ ধরে আবির্ভাব হয়েছে নানা পীর ফকির, ওলী আউলিয়া, মুনি ঋষির উদ্ভব হয়েছে। তারা দাবী করতো, তারা দেবতা বা ঈশ্বর থেকে আসা, এবং দেবদেবী বা ঈশ্বরের খুব কাছের বন্ধু, বা সন্তান, বা স্ত্রী। তারা অন্যদের বুঝাতো তারা অলৌকিক জ্ঞান লাভ করেছেন। যেহেতু তারা দিব্যপ্রেরণাপ্রাপ্ত, প্রত্যাদিষ্ট। কিন্তু মহাবিশ্বের উদ্ভব বা মানুষের উদ্ভব সম্পর্কে যা বলতেন, সেই সবই ছিল তাদের জ্ঞানের অভাবের কারণে ভুল এবং প্রাচীনকালের রূপকথায় ভরপুর।

প্রাচীন ভারতে বেদকে ভাবা হতো ঐশ্বরিক গ্রন্থ। চার্বাক কিংবা গৌতম বুদ্ধের মত মানুষেরা সর্বপ্রথম বেদের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। বেদের বক্তব্যকে বাতিল করেছিলেন। অন্যান্য সভ্যতাতেও একইভাবে সন্দেহবাদীরা দর্শনের জন্ম হয়। যার মুল ভিত্তি হলো সন্দেহ। ধীরে ধীরে বিজ্ঞানের সূচনা হলো, যার মুল ভিত্তি হলো যুক্তি-প্রমাণ এবং পর্যবেক্ষণ। বিশ্বাসের জোরে এখন আর রোগ ভাল হয় না, আমরা বিশ্বাসের জোরে বিমান উড়ে না, বিশ্বাসের জোরে ট্রেন চলে না । আমরা বিশ্বাসের জোরে নদীতে পানি আনতে পারি না, আমাদের বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হতে হয়। আমাদের রাষ্ট্র, আইন, বিচার, পুলিশ, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সবকিছুই নির্ভরশীল, যুক্তি-প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং তার ওপর ভিত্তি করে নেয়া সিদ্ধান্তের ওপর। বিশ্বাসের ওপর নয়।

■ নার্সিসিস্ট আল্লাহ পাক।

আল্লাহ পাক তার পবিত্র কেতাবের পাতায় পাতায় নিজেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা এত অধিক সংখ্যক বার কেন দিচ্ছেন বোঝা মুশকিলের বিষয়। প্রাচীনকালের রাজা বাদশাহদের মত কেন তিনি প্রায় প্রতিটি সুরায় নিজের ঢোল নিজেই পেটাচ্ছেন? মহাবিশ্বের মত এত বিশাল এক সৃষ্টির একমাত্র স্রষ্টা প্রাচীনকালের রাজাবাদশাহদের মত ক্রমাগত নিজের ঢোল নিজে পিটিয়ে যাচ্ছেন, এবং মানুষকে বিশ্বাস করাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, বিশ্বাস না করলে অনন্তকাল মারপিটের ভয় দেখাচ্ছেন, বিশ্বাস করলে হুরের সাথে যৌনতার অশ্লীল লোভ দেখাচ্ছেন, কখনও রেগে যাচ্ছেন আবার কখনও খুশি হচ্ছেন, এগুলো একেবারেই মানবিক এবং রাজনৈতিক চরিত্র। কোনভাবেই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য এগুলো হতে পারে না।

যেমন ধরুন নিজের আয়াতগুলোর কথাঃ
সকল প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর, তিনি বেহেশত ও পৃথিবীর সবকিছুর স্রষ্টা। তাকে বন্দনা করি, তিনি ফেরেশতাদেরকে তৈরি করেছেন। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তাই সৃষ্টি করেন। আসলে আল্লাহ সবকিছুই করতে পারেন। ৩৫.১
এবং সকল প্রশংসা ও ধন্যবাদের মালিক আল্লাহ কারণ তিনি আলামিন (মানুষ, জিন এবং যা কিছু আছে সবকিছুর)। ৩৭/১৮২
অতএব সকল প্রশংসা ও ধন্যবাদ আল্লাহর উপরে বর্ষিত হোক, কারণ তিনিই জগতের প্রভু। ৪৫/৩৬

শুধু তাই নয়, আল্লাহ পবিত্র কেতাবে নিজেই কথা বলতে শুরু করেছেন নিজের প্রশংসা করে, নিজের নাম উচ্চারণ করে। শুধু নিজের প্রশংসাই নয়, একে ওকে অশিক্ষিত অসভ্য লোকের মত অভিশাপও দিয়েছেন। আমাদের এলাকার লুলা পাগলাকে কেউ ঢিল ছুড়লে সে যখন কিছু করতে পারতো না, তখন সবাইকে অভিশাপ দিতো। বলতো তোর কুষ্ঠ হবে, তোর পোলা পানিতে ঢুবে মরবে, তোর বউ আগুনে জ্বলবে। আল্লাহও ঠিক একজন রক্তমাংশের মানুষের মতই আরেকজন রক্তমাংশের মানুষকে অভিশাপ দিয়েছেন, ঘৃণা করেছেন। বউ টু তুলে অভিশাপ দিয়েছেন। আল্লাহ পাকের মত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একজন কীভাবে একজন সামান্য রক্তমাংশের মানুষকে অভিশাপ দেন, অভিশাপ দেয়ার পরেও সেই ব্যক্তি অক্ষত থাকেন, ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। যেখানে তিনি হও বলার সাথে সাথে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে যায়, সেখানে একজন সামান্য ব্যক্তির প্রতি তার এই ঘৃণা কীভাবে তৈরি? এবং একজন নশ্বর মানুষকে দেয়া অভিশাপের এই সুরাটিও কীভাবে যুগ যুগান্ত ধরে মুসলিমরা পাঠ করে?

সূরা আল লাহাব/সূরা আল মাসাদ
১. ধ্বংস হোক! আবু লাহাবের উভয় হাত, আর সেও ধ্বংস হোক।
২. তার ধন-সম্পদ যা সে উপার্জন করেছে তা তার কোন কাজে আসবে না।
৩. তাকে অচিরেই লেলিহান আগুনে ঠেলে দেওয়া হবে।
৪. আর তার স্ত্রীকেও, লাকড়ীর বোঝা বহনকারিণী।
৫. তার গলায় থাকবে খেজুর গাছের ছালের তৈরি রশি।

■ আল কুরআন যে সত্য সেটারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?

বলা হয়, আল কুরআন সত্য, কারণ আল্লাহ নিজেই আল কুরআন লিখেছেন। সেখানেই তিনি বলেছেন কোরআন সত্য।
অর্থাৎ আল কুরআনের সত্যতার প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ, এবং আল্লাহর সত্যতার প্রমাণ হচ্ছে আল কুরআন!  আধুনিক যুক্তিবিদ্যায় একে বলা হয় বৃত্তাকার যুক্তি বা সার্কুলার লজিক।

যেমনঃ

  • ক সত্য কারণ হচ্ছে খ
  • খ সত্য কারণ হচ্ছে ক

উদাহরণঃ

ধরুন আপনার কাছে একটি ইমেইল এসেছে, নাইজেরিয়া কিংবা কঙ্গোর কোন ব্যাংকের ম্যানেজার আপনাকে ৫০ হাজার ইউরো দিতে চায়। মেইলটি সত্য তার প্রমাণ হচ্ছে, মেইলটিতেই লেখা আছে, মেইলটি একদম সত্য। কিন্তু সেটা যে নাইজেরিয়া বা কঙ্গোর কোন ব্যাংকের ম্যানেজার পাঠিয়েছে তার প্রমাণ কী? কারণ মেইলটিতেই লেখা আছে সেটি এসেছে তার কাছ থেকে। এটাকে বলা হয় সার্কুলার লজিক। একটি আরেকটির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এটি একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি। এ থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না।

■ আল্লাহ না বানালে পৃথিবী এবং এই বিশাল মহাবিশ্ব কীভাবে আসলো?

ধরুন আপনার পেট ব্যাথা। একজন লোক এসে সুযোগ বুঝে বললো, সেই আপনাকে পেট ব্যাথা দিয়েছে, এবং তাকে ২০০ টাকা দিলে পেট ব্যাথা কমে যাবে। প্রমাণ হিসেবে বলল, সে পেট ব্যাথা না দিলে আপনার পেট ব্যাথা কেন হচ্ছে?
আপনি যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে ভাবলেই বুঝবেন, লোকটা ফ্রড। হয়তো আপনি জানেন না আপনার পেট ব্যাথা কেন হচ্ছে। এর সঠিক কারণটি জানতে আপনার কয়েকটি পরীক্ষা করতে হবে। বা আপনি সকালে কী খেয়েছেন তা ভেবে দেখতে হবে। আপনার পেট ব্যাথার লক্ষণ এবং পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া ফলাফল, এই থেকে আপনার পেট ব্যাথার কারণ সম্পর্কে কিছু ধারণা করা সম্ভব। তারপরেও সেই ধারণা যে শতভাগ সঠিক তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে আপনি আরও নিখুঁত ভাবে আপনার পেট ব্যাথার কারণ জানতে পারেন। কিন্তু এটা হলপ করে বলে দেয়া যায়, ঐ যে লোকটা, যে দাবী করেছে, সেই আপনার পেট ব্যাথা দিয়েছে, সে আস্ত একটি জোচ্চোর, মিথ্যাবাদী।
এখন সেই লোকটি যদি বলে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা আপনাকে শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারবে না, কিন্তু লক্ষণ এবং পরীক্ষার ফলাফল থেকে সিদ্ধান্তে আসবে। কিন্তু ঐ লোকটি শতভাগ নিশ্চিতভাবেই আপনাকে বলবে, সেই ঐ পেট ব্যাথার কারণ। তাহলে আপনি কোনটা বিশ্বাস করবেন? শতভাগ নিশ্চিত ফ্রডের কথায়, নাকি পরীক্ষা ও প্রমাণ ভিত্তিক সিদ্ধান্তে?
আমরা জানি যে, আমরা সবকিছু জানি না। ভণ্ডামি হচ্ছে কোন কিছু না জেনেও জানার ভান ধরা বা কোন গল্পকে সত্য হিসেবে চালিয়ে দেয়া। আর সততা হচ্ছে নিজেদের অজ্ঞতা স্বীকার করে নেয়া এবং জানার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য জানতে হলে আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, অনবরত জ্ঞানের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য জানার জন্য দ্বিধাহীনভাবে প্রাচীন কেতাব মেনে নেয়া নয়, আধুনিক বিজ্ঞানের আধুনিক তথ্য উপাত্তই নির্ভরযোগ্য। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের যা জানাচ্ছে, তা দীর্ঘসময় ধরে তারা গবেষণা এবং অনুসন্ধান করেই জানাচ্ছে, এবং যেকেউ তথ্য উপাত্তগুলো যাচাই করার সুযোগও পাচ্ছে। এমন নয় যে বিজ্ঞান যা বলছে সেটাই নেমে নিতে হবে, না মানলে কাউকে অবিশ্বাসী বলে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হবে! এবং আধুনিক তথ্য উপাত্ত পরিষ্কারভাবেই মহাবিশ্বের সৃষ্টিতে কোন ঈশ্বরের প্রয়োজন অস্বীকার করছে। স্টিফেন হকিং বলেছেন, মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য অনুসন্ধানে ঈশ্বর এখন গুরুত্বহীন। তাছাড়া ঈশ্বর যদি থেকেও থাকে, তিনিই একজন নাস্তিককে নাস্তিক বানিয়েছেন, তাকে নাস্তিক হবার জন্য প্রেরণা জুগিয়েছেন, তার মধ্যে চিন্তাশীলতা সৃষ্টি করেছেন। তাই একজন নাস্তিককে ধার্মিক বানাবার চেষ্টা ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধতা মাত্র।

আল্লাহ তাদের অন্তঃকরন ও কান সমূহ বন্দ করে দিয়েছেন, তাদের চোখ সমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। টিকা-২

■ আল্লাহ নিজেই নাস্তিক

ধর্মের পক্ষে যারা নানান যুক্তি তৈরি করতে চেষ্টা করেন, তারা প্রায়ই বলেন, মানুষের মত উন্নত বুদ্ধিমত্তার প্রাণীর অবশ্যই একজন স্রষ্টা থাকতে হবে। স্রষ্টা না থাকলে এত উন্নত বুদ্ধিমত্তার জটিল প্রাণী থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু, মানুষের মত বুদ্ধিমান জটিল সত্ত্বার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন হয়ে থাকলে, তাকে যে সৃষ্টি করেছে সে তো আরও উন্নত বুদ্ধিমত্তার সত্ত্বা। সূত্র মতে, সেই একই যুক্তিতে, ঈশ্বরের মত অতিবুদ্ধিমান সত্ত্বারও স্রষ্টা থাকতে হবে। নইলে এত উন্নত বুদ্ধিমত্তার সত্ত্বা কীভাবে আসলো?
আবার, দাবী করা সেই ঈশ্বর নিজেও একজন নাস্তিকই বটে। তিনি যেহেতু দাবী করেন, তাকে কেউ সৃষ্টি করে নি, অর্থাৎ তার কোন স্রষ্টা নেই, তাই তিনি একজন নাস্তিক। ঠিক একইভাবে, একজন নাস্তিকও সেটাই দাবী করে যে, তার কোন স্রষ্টা নেই। তাই ঈশ্বরের সাথে একজন নাস্তিকের মিলটাই বেশি।

■ আল্লাহ তালাহ পরমকরুণাময়, সর্বত্রই তার করুণা এবং দয়া ছড়িয়ে আছে।

পরমকরুণাময় আল্লাহ তালাহ পবিত্র কোরআনে আমাদের জানাচ্ছেন, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে তার উপাসনা করা। এবং তিনি আমাদের উপাসনা পেতে আগ্রহী, একারণেই নানা সময়ে পৃথিবীতে তিনি নবী রাসুল পাঠিয়েছেন। কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাকের এত উপাসনা পাওয়ার আগ্রহ কেন সেটা বোঝা মুশকিল। আমি যখন প্রথম ফেইসবুক ব্যাবহার করি, তখন লাইক পেতে আমার খুব ভাল লাগতো। কেউ লাইক দিলে আমি খুবই খুশি হয়ে যেতাম। এখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠেছি, লাইক ফাইক নিয়ে আর চিন্তা করি না। বরঞ্চ বেশি লাইক হলে বেশি নোটিফিকেশন আসে বলে বিরক্তই লাগে মাঝে মাঝে। কিন্তু আল্লাহ পাক এরকম পোলাপানের মত লাইক চায় কেন? অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর কিংবা কিশোরী যারা কিছু লিখে আবার লাইক চায়, নিজেই নিজের ছবি বা লেখায় লাইক দেয়, আল্লাহও ঠিক একই রকম অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরের মত। খালি উপাসনা চায়। তাও দিনে পাঁচবার। একটু কম হলেই রেগে যান। সেই রাগ যেই সেই রাগ না, একদম গাল ফুলানো নিজের খেলনাটি ভেঙ্গে ফেলার মত বাচ্চা ছেলেটির মত রাগ।

ইতিহাসে কোন কোন সময় পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস উঠে যাবার কারণে এবং পাপে পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তিনি জলচ্ছ্বাস, বন্যা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ পাঠিয়ে পৃথিবীতে গণহত্যা চালিয়েছেন। তিনি প্রায়ই বিভিন্ন আয়াতে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন, যে তার উপাসনা না করলে তিনি ভয়ংকর শাস্তি দেবেন। কিন্তু তার চরিত্র তো কোন এলাকার গুণ্ডা বদমাইশদের থেকে উন্নত কিছু মনে হচ্ছে না। এলাকার গুণ্ডা বদমাইশরা যেমন জনগণের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে, চাঁদা না দিলেই নানা ধরণের ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে, মহাবিশ্বের স্রষ্টা পরমকরুণাময় আল্লাহ পাকও ঠিক তেমনি ভয় দেখিয়ে উপাসনা আদায় করেন, এবং উপাসনা করলে স্বর্গীয় বেশ্যাদের অসুস্থ লোভ দেখান। এগুলো কোন ঈশ্বরের চরিত্র হতে পারে না, এগুলো কোন যুদ্ধবাজ নেতার চরিত্র হতে পারে বড়জোর।

■ কোরানের লেখক বা বক্তা কে?

ধরে নিচ্ছি কোরান আল্লাহর বানী, এবং তা সৃষ্টির আদিকাল থেকে লাওহে মাহফুজে লিখিতভাবে সংরক্ষিত ছিল। এরপরে নবী মুহাম্মদ নবুয়ত লাভ করেন, জিব্রাইলের মাধ্যমে আল্লাহ সেই পবিত্র কেতাব মুহাম্মদের কাছে প্রেরণ করেন। এসব ধরে নিলে বোঝা যাচ্ছে, কোরানের মূল লেখক আল্লাহ পাক, এবং নবী মুহাম্মদের ওপর তা নাজিল হয়েছে মাত্র। জিব্রাইল ছিলেন বাহক মাত্র। কিন্তু কোরানে এই ধারাটি ঠিক রাখা হয় নি। কোথাও আল্লাহ বলছেন, কোথাও নবী বলছেন, আবার কোথাও বান্দা বলছেন।

বক্তাঃ বান্দারা, বলছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে  

  • পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।
  • আল্লাহরই জন্য সমস্ত প্রশংসা, যিনি বিশ্বজগতের রাব্ব।
  • যিনি পরম দয়ালু, অতিশয় করুণাময়।
  • যিনি বিচার দিনের মালিক।
  • আমরা আপনারই ইবাদাত করছি এবং আপনারই নিকট সাহায্য চাচ্ছি।  
  • আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।
  • তাদের পথ, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন। তাদের পথে নয়, যাদের প্রতি আপনার গযব বর্ষিত হয়েছে, তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

এখানে বক্তা কে? আল্লাহ? নাকি মুহাম্মদ, নাকি আল্লাহর বান্দারা? পরিষ্কারভাবে এটি হচ্ছে বান্দাদের কথা।

বক্তাঃ মুহাম্মদ- বলছেন মানুষের উদ্দেশ্যে 

  • হে মানবসমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। ৪ঃ ১
  • যে কেউ আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্যতা করে ও তার সীমা অতিক্রম করে তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন । ৪ঃ ১৪
  • আর তোমরা আকাংক্ষা করো না এমন বিষয়ে যাতে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের একের ওপর অন্যের শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ, নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত। ৪ঃ ৩২

এখানে বক্তা কে? আল্লাহ? নাকি মুহাম্মদ, নাকি আল্লাহর বান্দারা? পরিষ্কারভাবে এটি হচ্ছে মুহাম্মদের কথা, বলছেন মানুষের উদ্দেশ্যে।

বক্তাঃ আল্লাহ- বলছেন মানুষের উদ্দেশ্যে 

  • নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সত্য ধর্মসহ সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী রূপে পাঠিয়েছি। আপনি দোজখবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না। ২ঃ ১১৯
  • হে বনী ইসরাইল আমার কথা স্মরন কর যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি। আমি তোমাদেরকে বিশ্ববাসীর ওপর শ্রেষ্টত্ব দিয়েছি।২ঃ ১২২

এখানে বক্তা কে? আল্লাহ? নাকি মুহাম্মদ, নাকি আল্লাহর বান্দারা? পরিষ্কারভাবে এটি হচ্ছে আল্লাহর কথা, বলছেন মানুষের উদ্দেশ্যে।

অর্থাৎ এক এক জায়গাতে এক এক জন বলেছেন। কে আসলে কথা বলছেন, সেই ধারাটি একরকম নয়। কখনো মুহাম্মদ বলছে মানুষকে, কখনো আল্লাহ বলছে মানুষকে, কখনো মানুষ বলছে আল্লাহ বা মুহাম্মদকে। যেই বইটি সৃষ্টির আদিতে লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত, সেই বইটিতে আল্লাহ পাক খানিকটা ব্যাকরণগত সংশোধন করলে ভাল হতো। যদিও এটা কোন বড় ভুল নয়, ব্যাকরণগত সমস্যা।

■ কোরআন হচ্ছে একমাত্র অবিকৃত গ্রন্থ, আর কোন গ্রন্থ কি এমন অবিকৃত অবস্থায় থেকেছে?

হযরত মুহাম্মদের কাছে সর্বপ্রথম যেই আয়াতটি নাজিল হয়, তা হচ্ছে ইকরা বিসমে (৯৬ নং সুরা আলাক)। অথচ কোরানের প্রথম সুরাটি হচ্ছে সুরা ফাতিহা। কোরআন যেভাবে নাজিল হয়েছিল সেভাবে লিখিত হয় নি। আগের সুরা পরে, পরের সুরা আগে এসেছে।  শুধু তাই নয়, নোক্তা ও কারক বিভক্তি বা ব্যাকরণিক সংযোজন-সংশোধন হয়েছে মুহাম্মদের মৃত্যুর অনেক বছর পরে। এখন আমরা যে কোরআন দেখি তা আর আদি অবস্থাতে নেই। অনেক সুরাকে আবার বাতিল পর্যন্ত করা হয়েছে। সেই লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত কোরান কীভাবে মানসুখ হয় তা বোঝা বড়ই মুশকিলের বিষয়।
শুধু তাই নয়, কয়েকটি আয়াত বেমালুম হারিয়েই গেছে, যেখানে কোরআনে আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনিই কোরআন নাজিল করেছেন এবং তিনিই তা সংরক্ষণকারী!
ছাগলে খাওয়া কোরানের আয়াতঃ আবু সালমা ইয়াহইয়া ইবন খালাফ (র:) হতে’ আয়শা সূত্রে বর্নিত । তিনি বলেন : রজম (পাথর মেরে হত্যা) সম্পর্কিত আয়াত এবং বয়স্কা লোকের আপন স্ত্রীর দশ ঢোক দুধ পান করার বর্ণনা একটি সহিফা (লিখিত ভাবে) আমার খাটের নীচে সংরক্ষিত ছিল । যখন রাসূলুল্লাহ (সা:) ইন্তেকাল করেন এবং আমরা তার ইন্তেকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরলাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে । (ইবনে মাজাহ, ২য় খ. হা নং-১৯৪৪; ই. ফা) (হাদিসের স্ক্রিনশট দেখুন টিকা-৩ এ)

■ কোরানের আয়াত নিয়ে মতবিরোধঃ Bukhari: vol. 6, hadith 60, p. 46; book 60    Narrated Ibn Az-Zubair: I said to `Uthman, “This Verse which is in Surat-al-Baqara: `Those of you who die and leave wives behind………… without turning them out,’ has been abrogated by an other Verse. Why then do you write it (in the Qur’an)?” `Uthman said, “Leave it (where it is), O son of my brother, for I will not shift anything of it (i.e. the Qur’an) from its original position.” অর্থাৎ উপরে উল্লিখিত আয়াতগুলো থাকবে কি থাকবে না, সে সময়ে এই নিয়ে প্রবল মতবিরোধও দেখা দিয়েছিল। হযরত উসমানের ইচ্ছা অনুসারে আয়াতগুলো কোরআনে স্থান পায়। (হাদিসের স্ক্রিনশট দেখুন টিকা-৪ এ)

কোরানের আয়াত সংশোধনঃ আবার, ইবন সা’দ এবং তাবেরির বর্ণনা থেকে জানা যায়, কোরআনের অনেকগুলো আয়াত পরে বাতিল ঘোষিত হয়েছে, মুহাম্মদ নিজেই কিছু আয়াত রদ করেন। এছাড়াও হযরত মুহাম্মদ জীবিত থাকা অবস্থাতেই তিনি একটি সুরার কয়েকটি লাইন পালটে ফেলেছিলেন, যেটাকে তিনি পরবর্তীতে শয়তানের আয়াত নাম দিয়েছিলেন। যেমন, শয়তানের কুমন্ত্রণায় কিছু ভুল আয়াত কোরআনের বানী হিসেবে সংকলিত হয় বলে সূরা আন নজমের আয়াত বাতিল ঘোষণা করা হয়। এই তথ্যগুলো ইসলামিক রেফারেন্স থেকেই পাওয়া যায়, সালমান রুশদি যা নিয়ে বই লেখার পরে ইসলাম অবমাননার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়। কিন্তু যদি কোরআন আগেই লাওহে মাহফুজে রাখা থাকে, এবং সেটা যদি অপরিবর্তনীয় হয় তবে কেনো ভুল আয়াত নাজিল হবে? আর পুরো কোরানেওই শয়তানের আয়াত কিনা, তারই বা গ্যারান্টি কী? হয়তো শয়তানই পুরোটা সময় ধরে জিব্রাইল সেজে মুহাম্মদকে ধোঁকা দিয়েছিল, মুহাম্মদ বুঝতেই পারে নি।

কোরআন ভালভাবে বুঝতে হলে আরবি ভাষা জানতে হবে, হাদিস সমূহ জানা থাকতে হবে।
তার মানে কি কোরআন স্বয়ং সম্পূর্ণ পুস্তক নয়? কোরআন বোঝার জন্য সহায়ক গ্রন্থ এবং ভাষা জানা জরুরী? অর্থাৎ কোরআন শুধুমাত্র আরবি ভাষাভাষীর বোধগম্য করে নাজিল করা হয়েছে? আরবি না জানা পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোরআন শুদ্ধভাবে বুঝতেই পারবে না? এর নাম কি হচ্ছে সব মানুষের সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য শ্রেষ্ঠ অলৌকিক আসমানি কেতাব?

  • আমি কোরানকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। ৫৪ঃ১৭

আল কুরআন বিশ্বাস না করলে এমন একটি সুরা লিখে দেখাও। কুরানে আল্লাহপাক নিজেই চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, কেউ কুরানের মত একটি সুরা লিখে দেখাতে পারবে না।
কোরআনের একটি পরিচিত আয়াত রয়েছে, “আলীফ লাম মীম” যার অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। ধরুন ঠিক একইভাবে একটি আয়াত নাজিল করা হলো “ৎ ঋ ড়” যার অর্থ শুধু এর লেখক জানেন। কিন্তু তিনি কাউকে কিছু বলবেন না। এখন এরকম আয়াত কি কেউ লিখে দেখাতে পারবে? তাছাড়া কোরআনের মত সুরা যদি কেউ লিখেও দেখায়, সেটা যাচাই করবে কে, যে সেটা কোরানের অনুরূপ হয়েছে কিনা? কোরআনের চাইতে মান সম্পন্ন হলেও মুসলিমরা তা মানবে না, আবার কোরআনের অনুরূপ হলেও বলা হবে এটা আল কোরআনের নকল। ঠিক একইভাবে, কেউ কি রবীন্দ্র সংগীত লিখে দেখাতে পারবে? কেউ যদি লিখে দেখাতেও পারে, সেটা রবীন্দ্র সংগীত হবে কি? বা একটি শেক্সপিয়ারের অনুরূপ সনেট? কিন্তু অনুরূপ হলে কী আর সেটা শেক্সপিয়ারের সনেট হলো?
এই সুরাটি কী গুণে মানে কোরানের যে কোন সুরার চেয়ে উন্নতমানের নয়?

■ আল্লাহ এক। নিশ্চয়ই তিনি নিরাকার, সর্বব্যাপী এবং সকল ক্ষমতার মালিক।

আমরা জানি পদার্থের প্লাজমা অবস্থার কথা বাদ দিয়ে পদার্থের অবস্থা তিন ধরনের, কঠিন, তরল এবং বায়বীয়। এর মধ্যে তরল এবং বায়বীয় পদার্থের নির্দিষ্ট আকার আকৃতি নেই, যার কারণে তাদের পরিমাপের পদ্ধতি ভিন্ন। আমরা কেউ বলি না একটি পানি বা ৫-টি দুধ। আমরা বলি এক কেজি বা ৫ লিটার দুধ। বায়বীয় পদার্থের ক্ষেত্রেও একই হিসাব। কিন্তু কঠিন বস্তুর ক্ষেত্রে গণনার হিসাবটা চলে আসে, সেটিকে এক দুই বা এই ধরনের সংখ্যা দ্বারা নির্দেশ করা হয়। এর কারণ হচ্ছে ইহার নির্দিষ্ট আকার আকৃতি রয়েছে। কোন কিছুর (সেটা যাই হোক) আকার আকৃতি না থাকলে তাকে সংখ্যা দ্বারা কীভাবে প্রকাশ করা সম্ভব? আল্লাহ এক না পাঁচ নাকি তিনশ চুরানব্বই সে হিসাবের আগে দেখা প্রয়োজন নিরাকার বস্তুকে সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা সম্ভব কিনা। যদি তিনি আসলেই নিরাকার হয়ে থাকেন, তাহলে এক দুই বা পাঁচশ পঞ্চাশের হিসাবটা অর্থহীন; আর যদি তার আকার থেকেই থাকে, তবে সংখ্যার হিসাব আসতে পারে।
কোন কিছুকে সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করার সাথে সাথেই সেটা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। যেমন ধরুন আমি যদি বলি এক বাক্স মিষ্টি, অর্থাৎ মিষ্টিগুলো বাক্সটির মধ্যে সীমাবদ্ধ, বাক্সের বাইরে আর মিষ্টি নেই। অথবা বললাম একগ্লাস পানি, অর্থাৎ পানিটুকু গ্লাসটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেরকম যদি বলি আল্লাহ এক, তাহলে এই ধারণাটা সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অসীমত্বের দাবীদার কিছুই এক বা যেকোন সংখ্যা দ্বারা সীমাবদ্ধ হতে পারে কী?
আবার, কোরআনের বর্ণনায় আল্লাহ তাঁহার হাতের কথা উল্লেখ করেছেন ।
প্যাগান ধর্মগুলার দেবদেবীর মত ইসলাম ধর্মেও আল্লাহর হাত আছে।قُلْإِنَّالْفَضْلَبِيَدِاللّهِ
হে রাসূল বলুন ! ধন-সম্পদ ও সম্মান আল্লাহর হাতে । [আল ইমরান ৭৩]فَسُبْحَانَالَّذِيبِيَدِهِمَلَكُوتُكُلِّشَيْءٍوَإِ لَيْهِتُرْجَعُونَ
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যার হাতে বিশ্বের সকল বিষয়ের ক্ষমতা । তাঁর নিকট তোমদের সকলকে ফিরে যেতে হবে ।قَالَيَاإِبْلِيسُمَامَنَعَكَأَنتَسْجُدَلِمَاخَلَقْ تُبِيَدَيَّأَسْتَكْبَرْتَأَمْكُنتَمِنَالْعَال ِينَ
আল্লাহ বললেন, হে ইবলিস, আমি স্বহস্তে যাকে সৃষ্টি করেছি, তার সম্মুখে সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল ? তুমি অহংকার করলে, না তুমি তার চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ? [সুরা ছোয়াদ] ।
এখানে আল্লাহ তাঁর হাতের কথা বললেন ।
নফস আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে দেহ। يَوْمَتَجِدُكُلُّنَفْسٍمَّاعَمِلَتْمِنْخَيْرٍمُّحْ ضَرًاوَمَاعَمِلَتْمِنسُوَءٍتَوَدُّلَوْأَنَّبَيْنَه َاوَبَيْنَهُأَمَدًابَعِيدًاوَيُحَذِّرُكُمُاللّهُنَ فْسَهُوَاللّهُرَؤُوفُبِالْعِبَادِ
সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু ভাল কাজ সে করেছে: চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ সে করেছে তাও । ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং ওসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দুরের হতো।
আল্লাহ তোমাদিগকে আপন নফসের ভীতি প্রদর্শন করছেন । আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু । [আল ইমরান ৩০] আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দিতে কারো মুখাপেক্ষী নন । তার দেহে যে শক্তি বিদ্যমান তা দিয়েই তিনি মানব জাতি ও নিখিল বিশ্বকে ধ্বংস করতে পারেন । আল্লাহ মানুষকে সেই মহান শক্তির ভীতি প্রদর্শন করছেন ।
আবু যার [রা:] বলেন যে, রাসূল [সা:] বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বান্দাদের উদ্দেশ্যে বলেন, হে আমার বান্দাগণ ! আমি আমার নফসের জন্য জুলুম হারাম করে রেখেছি । [মুসলিম আরবি মিশকাত ২০৩ পৃ:, মিশকাত বাংলা ৫ম পৃ: ১৩৩, হা: ২২১৮, এমদাদিয়া] যার দেহ আছে তাঁর আকার আছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ নিরাকার নন ।
রূহ শব্দের অর্থ প্রাণ। আল্লাহর যে প্রাণ আছে কোরআনে তার বর্ণনা রয়েছে ।فَإِذَاسَوَّيْتُهُوَنَفَخْتُفِيهِمِنرُّوحِيفَقَعُو اْلَهُسَاجِدِينَ
আল্লাহর ফেরেশতাদিগকে বলেন, আদমকে সুঠাম করব, তারপর আদমের মধ্যে আমার রূহ প্রদান করব, অত:পর তোমরা তাকে সেজদা করবে। [হিজর ২৯] এই আয়াতে প্রমাণ হয় আল্লাহর রূহ আছে । অর্থাৎ কোরানেই বলা রয়েছে আল্লাহর আকার আছে।

■ আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান???

আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান কথাটি মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য নীচের আয়াতগুলোর লক্ষ্য করুন ।الرَّحْمَنُعَلَىالْعَرْشِاسْتَوَى
তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন। [তোয়া হা ৫]الَّذِينَيَحْمِلُونَالْعَرْشَوَمَنْحَوْلَهُيُسَبِّ حُونَبِحَمْدِرَبِّهِمْوَيُؤْمِنُونَبِهِوَيَسْتَغْف ِرُونَلِلَّذِينَآمَنُوارَبَّنَاوَسِعْتَكُلَّشَيْءٍ رَّحْمَةًوَعِلْمًافَاغْفِرْلِلَّذِينَتَابُواوَاتَّ بَعُواسَبِيلَكَوَقِهِمْعَذَابَالْجَحِيمِ
যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। [মুমিন ৭]وَالْمَلَكُعَلَىأَرْجَائِهَاوَيَحْمِلُعَرْشَرَبِّك َفَوْقَهُمْيَوْمَئِذٍثَمَانِيَةٌ
এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে ও আট জন ফেরেশতা আপনার পালনকর্তার আরশকে তাদের ঊর্ধ্বে বহন করবে। ( কোরান ৬৯/১৭ ) (স্ক্রিনশটের জন্য টিকা ৫ দেখুন)
আল্লাহর পয়গম্বর বলে নিজেই দাবীকারী আরবের হযরত মুহাম্মদ এটাও দাবী করেছেন তিনি সাত আসমান পার হয়ে (মেরাজ) উনার সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। অর্থাৎ উনার সাথে সাক্ষাতের জন্য পথ পাড়ি দিতে হয়, অর্থাৎ উনি যে সর্বব্যাপী একথাটাও ভিত্তিহীন। উনার বসবাসের নির্দিষ্ট স্থান না থাকলে এত কোটি কোটি মাইল পাড়ি দিয়ে দেখা করতে যাবার কোন অর্থ হয় না। ঘরে বসেই দেখা সাক্ষাৎ- আলাপ আলোচনা সম্ভব ছিল।
উপরের আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে আল্লাহ আরসে সমাসীন আছেন । তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন।
সুতরাং বোঝা গেল,আল্লাহ নিরাকার না, আল্লাহর দেহ আছে, এবং আল্লাহ সর্বব্যাপী নন। সর্বব্যাপী হলে আরশ নামক বসার স্থানের কথা বলা হত না।
আবার, একজন সর্বশক্তিমান তখনি হতে পারে যখন এই মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটছে সকল কিছুই তার নির্দেশে ঘটে থাকলে। আমি যদি সর্বশক্তিমান হই তবে অন্য সমস্ত কিছুর শক্তিই আমার শক্তি বলে বিবেচিত হবে। এখানে অন্য কেউ যদি শক্তিমান থাকে যেটা আমার নিয়ন্ত্রনের বাইরে, তাহলে আমি হয়ত তার চাইতে বেশি শক্তিমান হতে পারি, কিন্তু সর্বশক্তিমান হতে পারি না। সর্বশক্তিমান কথাটার অর্থই হচ্ছে সকল শক্তি এবং ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি।
কিন্তু তাহলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে, এই যে বন্যা, দুর্ভিক্ষ, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, নাইন-এলিভেন, এগুলো তাহলে কে বা কারা করাচ্ছে? এগুলোর জন্য যদি মানুষ, শয়তান বা প্রকৃতিকে দায়ী করা হয় তাহলে সর্বশক্তিমান কথাটা ভিত্তিহীন হয়ে পরে। খুব বেশি হলে বলা যেতে পারে শক্তিমান, কিন্তু সর্বশক্তিমান হতে হলে কিন্তু যা কিছু ঘটছে সকল কিছুর দায়দায়িত্বই নিতে হবে। ভাল কিছু হলে ডুগডুগি বাজিয়ে কৃতিত্ব নিতে আসলো, আর কোন দুর্ঘটনা ঘটলে দূরে বসে বলতে থাকলো এতে আমার কোন দোষ নেই, এগুলা মানুষের কৃতকর্মের ফল-শয়তানের ধোঁকা, এটা হলে তো ব্যাপারটা আওয়ামী বিএনপি সরকারের মত জোচ্চুরি হয়ে গেল।

ধরুন বাঙলাদেশের মানুষ ঠিক করলো এখন থেকে আর দুর্নীতি করবে না, বাঙলাদেশ দুর্নীতি মুক্ত হল। আওয়ামী লীগ সরকার বগল বাজাতে বাজাতে আওয়ামী সরকারের গুন গাইতে লাগলো। বলতে লাগলো বাঙলাদেশ আওয়ামী লীগের আমলে দেশে কোন দুর্নীতি হয় না। সকল প্রশংসাই আওয়ামী সরকারের। আবার হয়ত দেখা গেল এবছর মানুষ দুর্নীতি করেছে বেশি। আওয়ামী সরকার প্রেসনোট পাঠালো, সেখানে বলা হল আগের সরকারের দুর্নীতির কারণে এটা হয়েছে। অতএব সকল দোষ আগের বিএনপি সরকারের।

ঠিক তেমনি ভাল কিছু হলে, দেশের বা মানুষের উন্নতি হলে পবিত্র গ্রন্থে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে বলেছেন। উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু যখনি দেশে হত্যা, খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাস, লোডশেডিং বেড়ে গেল, মহান আল্লাহ সমস্ত দোষ চাপালেন বেচারা শয়তানের কাঁধে, কিছু কিছু আবার মানুষের কৃতকর্মের উপরে। কিংবা স্বাধীন ইচ্ছার ওপরে। এটা কি ন্যায় সঙ্গত আচরণ হল?

সেই সাথে, সর্বশক্তিমান হবার দাবীটিই একটি যৌক্তিকভাবে ভুল দাবী। যুক্তিবিদ্যায় এই দাবীটিকে বহুকাল আগেই ভুল দাবী বাতিল হয়ে গেছে। কারণ এরকম দাবী যুক্তিতে টেকে না। ধরুন আল্লাহ কি এমন একটা পাথর তৈরি করতে পারবেন যেটা এত ভারী হবে যে আল্লাহ নিজেই এটা জাগাতে পারবেন না?

সম্ভাব্য উত্তর-১ঃ হ্যা, তৈরি করতে পারবেন, তিনি যা ইচ্ছা তাই তৈরি করতে পারবেন। আলোচনাঃ তাহলে সেই পাথরটি তৈরি হল। এখন এই পাথরটি কি তিনি জাগাতে পারবেন? না পারবেন না। কারণ এটা তিনি এমন ভাবেই বানিয়েছেন যে এটা কেউই জাগাতে পারবেন না। যদি একটা পাথরই জাগাতে না পারেন, তাহলে তিনি কিভাবে সর্বশক্তিমান হলেন?

সম্ভাব্য উত্তর-২ঃ না, এমন কোন পাথর সৃষ্টি করা সম্ভব না। আলোচনাঃ একটা পাথরই যে তৈরি করতে পারেন না তিনি কিভাবে সর্বশক্তিমান হতে পারেন? তিনি নিজেই তো বলেছেন তিনি পারেন না এমন কিছু নাই। অতএব বোঝা যাইতেছে সর্বশক্তিমানের দাবী নিজেই নিজেকে বাতিল করে।

বা ধরুন, আরেকটি উদাহরণ। আল্লাহর কী আত্মহত্যা বা নিজেকে ধ্বংস করার ক্ষমতা আছে? না থাকলে সে সর্বশক্তিমান কীভাবে হয়?

এখানেই শেষ নয়। পরের পর্বে বাদবাকি বিষয় আলোচনা করা হবে। লেখাটি বিষয়ে আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানাতে পারেন। ফেইসবুক দিয়েই কমেন্ট করা যাবে। সেইসাথে, এই লিঙ্কে গিয়ে দেখে আসতে পারেন, আপনার প্রশ্নের উত্তর ইতিমধ্যে দিয়ে রাখা হয়েছে কিনা।

ফুটনোটঃ

টিকা-১ঃ

বুখারি , ভলিউম- ৫, বই – ৫৯, হাদিস- ৭১৪
আয়শা থেকে বর্ণিত – নবী (সা) যখন খুব পীড়িত ছিলেন ও যাতে তিনি মারা যান , তখন তিনি বলতেন , ” ও আয়শা, আমি এখনও খায়বারে যে বিষ মিশান মাংশ খেয়েছিলাম তা থেকে যন্ত্রনা অনুভব করছি এবং বিষ থেকে এমন যন্ত্রনা বোধ হচ্ছে যে আমার মনে হচ্ছে আমার গ্রীবা কেটে ফেলা হচ্ছে”

Bukhari :: Volume 5 :: Volume 59 :: Hadith 714
Narrated `Aisha: The Prophet (sallallahu ‘alaihi wa sallam) in his ailment in which he died, used to say, “O `Aisha! I still feel the pain caused by the food I ate at Khaibar, and at this time, I feel as if my aorta is being cut from that poison.”

টিকা-২ঃ

টিকা-৩ঃ

টিকা-৪ঃ

টিকা-৫ঃ

পরের পর্বগুলোঃ

Facebook Comments

2 thoughts on “আমি কেন ইসলামে বিশ্বাস করি না। পর্ব-১

  • May 23, 2018 at 10:13 pm
    Permalink

    আমিতো ফাইস্যা যাওয়ার কায়দায় আছি হালার লেখা পরে।

    Reply
  • June 23, 2018 at 9:14 pm
    Permalink

    “আল্লাহ এমন একটি পাথর বানাতে পারবেন যেটা সে নিজে তুলতে পারবেন না ”
    ——- এইটার উত্তর আমি দিতে চাই যদি আমার আমার comment এর reply দেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: