ব্যক্তি আক্রমণ ও রেটোরিকাল ডিভাইস নিয়ে কিছু কথা – পর্ব ২

গত পর্বে ব্যক্তি আক্রমণ বা এড হোমিনেম নিয়ে আলোচনার শেষে অলঙ্কারের সমস্যার কথা উল্লেখ করেছিলাম। আমরা মানুষেরা যুক্তিবাক্য তৈরি করে কথা বলি না, এদিকে আমাদের সকলের মধ্যেই কম বেশি সাহিত্য চেতনা, শিল্প চেতনা রয়েছে, যার ফলে কথা বলার সময় আমরা চেতনে অচেতনে বিভিন্ন ফিগার অফ স্পিচ বা রেটোরিকাল ডিভাইস বা অলঙ্কার ব্যবহার করি। আমাদের এই ফিগার অফ স্পিচ ব্যবহারই দেখিয়ে দেয় যে আমরা মানুষেরা কতটা জটিল প্রাণী, আমাদের চিন্তা করার প্রক্রিয়া কত জটিল, কত সম্পৃদ্ধ, কত সুন্দর। মানুষের কথা বলার এই বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্যই তো মানব সভ্যতায় বিকশিত হয়েছে সাহিত্যের, শিল্পের। এগুলো মানব সভ্যতাকে করে মহিমান্বিত।

যাই হোক, মানুষের এই বৈচিত্র্য তাদের ব্যক্তি আক্রমণকেও করেছে বৈচিত্র্যময়। ব্যক্তি আক্রমণের ক্ষেত্রেও মানুষ ব্যবহার করে এই অলঙ্কারগুলোকে। আর তাই ব্যক্তি আক্রমণকে চিহ্নিত করতে হলে রেটোরিকাল ডিভাইস বা অলঙ্কারগুলো সম্পর্কে কিছু ধারণা রাখা ভাল। গত পর্বেই বলেছিলাম, বিভিন্ন বক্তব্য বা আলোচনা থেকে কুযুক্তি বা যৌক্তিক হেত্বাভাসগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য যুক্তিবাক্য বা আর্গুমেন্ট গঠন করে সেগুলোকে লজিকাল ফর্মে বসিয়ে তারপর দেখতে হয় এগুলো আসলেই কুযুক্তি কিনা। এই পর্বে তাই ব্যক্তি আক্রমণ বা কুযুক্তিগুলোকে চিহ্নিত করতে যাতে সুবিধা হয় তাই উদাহরণ সহ বেশ কিছু রেটোরিকাল ডিভাইস বা অলঙ্কার সম্পর্কে দু-একটি কথা বলা হল। অলঙ্কারের সংখ্যা বহু, ৩০০-৪০০ এর মত চিহ্নিত অলঙ্কার রয়েছে, আর সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই পরিসরে অল্প কিছু উদাহরণই দেব, যাতে আমি যা বলতে চাই তা যাতে স্পষ্ট হয়। উদাহরণগুলোর অনেকগুলোই সাহিত্য থেকে নেয়া।

তাহলে শুরু করা যাক। ফিগার অফ স্পিচ বা রেটোরিকাল ডিভাইসের আলোচনায় প্রথমেই শুরু করছি আয়রনি বা বক্রাঘাত দিয়ে। আয়রনি বলতে এমনভাবে কথা বলা বোঝায়, যার দ্বারা যেটা বলা হয়েছে বা লেখা হয়েছে সেটা না বুঝিয়ে অন্য কিছু বোঝানো হয়। এই ধরণের অলঙ্কার প্রায়ই উপহাস, বিদ্রুপ বা ঠাট্টা এর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। আয়রনি প্রকাশ করে এরকম কয়েক ধরণের অলঙ্কার আছে। কয়েকটা সম্পর্কে জানা যাক –

১। এন্টিফ্রেসিস (ANTIPHRASIS)

আয়রনি যদি একটি শব্দ নিয়ে হয় তবে তাকে এন্টিফ্রেসিস বলে। যেমন একজন লম্বা ব্যক্তিকে আসতে দেখে বলা হল, “আমাদের মিজেট এসে গেছে”, কিছুদিন আগে একজনকে লিখতে দেখলাম “ইনি তো যুক্তিতে ভরপুর মিমই শেয়ার করবেন” (তার মিমটি অযৌক্তিক ছিল এটি প্রকাশ করলেন)। বাংলা সাহিত্যে এটি নিয়ে বেশ কিছু অসাধারণ উদাহরণ আছে। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার করা একটি বিখ্যাত এন্টিফ্রেসিস হল –

“তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে” – রবীন্দ্রনাথ

এখানে ‘সাধু’ ও ‘চোর’ শব্দ দুটি উচ্চারণের সময় স্বাভাবিক ভাবেই এমন একটা মোচড় এসে যায় যে, বিপরীত অর্থ গ্রহণ করা ছাড়া আর উপায় থাকে না (অর্থাৎ মহারাজই চোর, বক্তা সাধু)। সুতরাং এটি এন্টিফ্রেসিসের উদাহরণ।

২। প্যারালিপসিস (PARALIPSIS)

এই অলঙ্কারের ক্ষেত্রে কোন কিছু বলে অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু অভিনয় করা হয় যে গ্রাহ্যই করছেন না। যেমন –

(১) এই নির্বাচনী প্রচারণায় আমি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বয়সকে সামনে নিয়ে আসতে চাই না। আর তাই আমি এটা বলতে চাইনা যে আমার প্রতিপক্ষ ব্যক্তিটি একজন অনভিজ্ঞ ও অভিজ্ঞতাশূন্য ক্যান্ডিডেট।

(২) কেনেডির মদ্যপানের নেশার ব্যাপারে বলাটা আসলে ঠিক হবে না। ইতিমধ্যেই অনেকে তার উইমেনাইজার হবার ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছেন।

৩। এপিট্রোপ (EPITROPE)

এই অলঙ্কারের ক্ষেত্রে অপরপক্ষের কথা মেনে নেয়া হয়, কিন্তু সেটা করা হয় বিদ্রুপাত্মক বা পরিহাসমূলকভাবে, যাতে তা আপাতভাবে পরাজয় স্বীকারমূলক, বা সম্মতিসূচক হলেও অন্য কিছুর আভাস দেয়। যেমন –

(১) ক্লিন্ট ইস্টউডের বিখ্যাত ডায়ালগ “Go ahead, make my day”
কিছু দুষ্কৃতিকারী এক রেস্টুরেন্টে ডাকাতি করছিল, এক দুষ্কৃতিকারী সেখানকার এক নারীর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ক্লিন্টকে ব্ল্যাকমেইল করলে তিনি এই ডায়ালগটা দেন। এই কথাটিতে পরিহার ফুটে উঠেছিল কেননা ইতিমধ্যেই পুলিস চলে এসেছিল, দুষ্কৃতিকারী মহিলাকে খুন করলে তার বিশাল সাজা নিশ্চিত, তাই এভাবে তার বাঁচার আর কোন উপায়ই নেই। মুভি সিনটি দেখতে চাইলে ডায়লগটি ইউটিউবে লিখে সার্চ করে দেখতে পারেন।

(২) এবারের উদাহরণটি একেবারে বাইবেল থেকে নেয়া – “Rejoice, O young man, in thy youth; and let thy heart cheer thee in the days of thy youth, and walk in the ways of thine heart, and in the sight of thine eyes: but know thou, that for all these things God will bring thee into judgment.” —Ecclesiastes 11:9

(৩) নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটার জিমি নিশাম এর সাম্প্রতিক টুইট – “Kids, don’t take up sport. Take up baking or something. Die at 60 really fat and happy.”

৪। সারকাজম (SARCASM) বা পরীবাদ

সারকাজম এর আক্ষরিক অর্থই হচ্ছে কটূবচন। এটা আসলেই একরকম ইনসাল্টিং স্পিচ যা ভাষার চাতুর্যের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কোমল কথায় তা লুকিয়ে থাকে। যেমন –

(১) জন লক এরিস্টোটলিয়ান লজিককে বিদ্রুপ করে বলেছিলেন, “ঈশ্বর মানুষকে তৈরি করে তাকে এরিস্টোটলের কাছে পাঠিয়ে দেন নি, যাতে তারা যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে”।

(২) শেক্সপিয়র এর এন্টোনি এন্ড ক্লিওপেট্রায় একটা অসাধারণ সারকাজমের নজির পাওয়া যায় যখন এন্টনির কাছে সিজার বা তার স্ত্রীর কাছ থেকে বার্তা আসে। এই বার্তা আসতে দেখে ক্লিওপেট্রা এন্টোনিকে বিদ্রুপের সাথে বলেছিলেন –Nay, hear them [the messages], Antony.Fulvia perchance is angry; or who knowsIf the scarce-bearded Caesar have not sentHis pow’rful mandate to you: “Do this, or this;Take in that kingdom, and enfranchise that;Perform’t, or else we damn thee.”—Antony and Cleopatra 1.1.19-24

বাংলায় সারকাজমকে বলা হয় পরীবাদ। জীবেন্দ্র সিংহ রায় তার গ্রন্থ “বাঙলা অলঙ্কার“-এ লিখছেন, যখন প্রশংসার দ্বারা নিন্দা না করে অভিপ্রেত নিন্দার ভাবটিকে একটু বৈচিত্র্যের সাহায্য নিয়ে সোজাসুজিই প্রকাশ করা হয় তখন পরীবাদ বা সারকাজম অলঙ্কার হয়। যেমন –

(৩) থাকতে দিলি না ভাত-কাপড়,মরলে করবি দান-সাগর।এই প্রবাদ-বাক্যে মাতার মুখ দিয়ে পুত্রদের কর্তব্যহীনতার নিন্দা সোজাসুজি হলেও একটু বৈচিত্র্যের সাহায্যে করা হয়েছে বলে পরীবাদ বা সারকাজম অলঙ্কার হয়েছে।

৫। এস্টেইসমাস (ASTEISMUS)

এই আইরনিতে একটা প্রশ্ন থাকে, এরপর উত্তর দেবার সময় সেই প্রশ্ন থেকে কিছু অংশ গ্রহণ করে এমনভাবে উত্তর ছুড়ে দেয়া হয় যাতে বিদ্রুপ বা পরিহাস প্রকাশ পায়। শেক্সপিয়রের Much Ado About Nothing থেকে উদাহরণ টানছি –

Benedick: God keep your ladyship still in that mind! [of not marrying] so some gentleman or other shall scape a predestinate scratch’d face.
(বেনেডিক – ঈশ্বর তোমার নারীত্বকে সবসময় স্মরণে রাখুন, যাতে কেউ ভুল করে কোন জেন্টলম্যান বা অন্য কেউ তোমাকে বিবাহ করে মুখে স্ক্র্যাচ লাভ না করেন)
Beatrice: Scratching could not make it worse, an ‘t were such a face as yours were.
(বিয়েট্রিস – স্ক্র্যাচিং এর ফলে বেশি খারাপ হবে না, তোমার মুখের দশা এমনিতেই খারাপ)
Benedick: Well, you are a rare parrot-teacher.
(বেনেডিক – তুমি একটি বিরল তোতাপাখির শিক্ষক (বিয়েট্রিসের মুখরা স্বভাবকে ইঙ্গিত করা হয়েছে))
Beatrice: A bird of my tongue is better than a beast of yours.
(বিয়েট্রিস – আমার কথায় কথা বলা পাখি তোমার অন্তরের পশুর থেকে ভাল)।
—Shakespeare, Much Ado About Nothing 1.1:133-140

৬। শ্লেষ বক্রোক্তি

এস্টেইমাস এর কথা বলতে গিয়ে বাংলা অলঙ্কারশাস্ত্রের শ্লেষ বক্রোক্তির কথা মনে পড়ে গেল। পুরোপুরি এক না হলেও কিছু মিল অন্তত আছে। বক্তার বক্তব্যকে তার অভিপ্রেত অর্থে গ্রহণ না করে অন্য অর্থে গ্রহণ করা হলে তাকে শ্লেষ বক্রোক্তি বলে। যেমন –

(১) প্রশ্ন – দ্বিজ হয়ে কেন কর বারুণী সেবন?উত্তর – রবির ভয়েতে শশী করে পলায়ন!দ্বিজ শব্দের অর্থ হল ব্রাহ্মণ আর বারুণী অর্থ হচ্ছে মদ। প্রশ্ন করা হচ্ছে, ব্রাহ্মণ হয়েও কেন মদ্যপান করো? উত্তর কিন্তু সেই অর্থগুলো ভেবে দেয়া হয়নি। দ্বিজ শব্দের আরেকটি অর্থ হল চাঁদ বা শশী, আর বারুণী শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে পশ্চিম দিক। প্রশ্নটাকে উত্তরদাতা ধরে নিয়েছেন এই অর্থে যে, “চাঁদ কেন পশ্চিম দিকে গমন করে?” উত্তরদাতাও উত্তর দিলেন, সূর্যের ভয়েই চাঁদ পশ্চিম দিকে পালায়।

(২) সভাকবি – ওঁদের শব্দ আছে বিস্তর, কিন্তু মহারাজ, অর্থের বড়ো টানাটানি।
নটরাজ – নইলে রাজদ্বারে আসব কোন দুঃখে? – রবীন্দ্রনাথ
এখানে সভাববি অর্থ বলতে বুঝিয়েছেন শব্দের অভিধেইয় তাৎপর্য বা meaning – কে। অন্যদিকে নটরাজ উত্তর দেবার সময় অর্থ বলতে বুঝিয়েছেন টাকা পয়সাকে।আয়রনি আরও অনেক রকমের আছে, সেদিকে গিয়ে এত বিস্তারিত আলোচনা করছি না। অন্য ধরণের অলঙ্কারে যাওয়া যাক।

৭। ইনুয়েন্ডো (INNUENDO)

এক্ষেত্রে একটি বাক্যের মধ্যে কোন লুক্কায়িত ভিন্ন কোন অর্থ থাকে। এই লুক্কায়িত অর্থটি নিন্দামূলক হয়ে থাকে, অনেক সময় যৌনতাসূচকও হয়ে থাকে। ইনুয়েন্ডো যৌনতাসূচক হলে তাকে সেক্সুয়াল ইনুয়েন্ডো বলে। উদাহরণ দেয়া যাক –
(১) “We need to go deeper”
এই কথাটিকে আরও বেশি তদন্ত করার কথা বোঝাতে পারে, আবার শরীরের প্রাইভেট পার্টের গভীরে যাবার কথাও বোঝাতে পারে।

২) ক্লাসে ছাত্র কলম আনেন নি বলে শিক্ষক তাকে বলছেন, “Oh my poor boy, what will you do in your life without a pen?”
(এখানে পেন দ্বারা কলম বোঝানো যায়, আবার এর দ্বারা ছাত্রের পুরুষাঙ্গের কথাও ইঙ্গিত করা যেতে পারে)।

(৩) এক মেয়ে ক্লাসে দেরিতে আসায় শিক্ষক জিজ্ঞেস করছেন, “সারারাত কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলে?”
(এটির দ্বারা দেরিতে আসার কারণ দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা ধরে তার কারণ জিজ্ঞাসা করা বোঝাতে পারে, আবার কেন দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা হয়েছে তার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে রাতে মেয়েটি যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল সেটাকেও ইঙ্গিত করা হতে পারে)।কিছু রেটোরিকাল কোয়েশ্চন জাতীয় অলঙ্কারের কথা আনা যাক।

৮। এরোটেমা (EROTEMA)

এধরণের রেটোরিকাল প্রশ্নে কেবল একটি প্রশ্ন করার মাধ্যমে শক্তিশালীভাবে কোন পয়েন্টকে জোড় দিয়ে স্বীকার বা অস্বীকার করা হয়। যেমন –

একজন ব্যক্তি একটা বড় বোকামি করে ফেলার পর কেউ তাকে প্রশ্ন করেছেন, “তুমি এত বোকা কেন?”
এই প্রশ্নটি কোন উত্তরের আশায় করা হয়নি, “লোকটি খুবই বোকা” এই কথাটি জোড় দিয়ে বলার জন্য এটি বলা হয়েছে।

৯। এনাকোয়েনোসিস (ANACOENOSIS)

এই প্রশ্নটি বিচারক বা শ্রোতার উদ্দেশ্যে করা হয় যেখানে প্রশ্নের আড়ালে তাদের উপর বক্তা নিজের ইচ্ছা বা চিন্তা আরোপ করে দেন। যেমন –

(১) এবার আমি আপনাদের বিচারের জন্য বিষয়টি ছেড়ে দিচ্ছি। আপনারাই বিচার করুন, এই লোকটি কি তার কৃতকর্মের জন্য জনতার ন্যায্য ক্ষোভ আশা করেন না?

(২) বাইবেল থেকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি –
And now, O inhabitants of Jerusalem, and men of Judah, judge, I pray you, betwixt me and my vineyard. What could I have done more to my vineyard, that I have not done in it? —Isaiah 5:3-4

১০। এপোরিয়া (APORIA)

এক্ষেত্রে ব্যক্তি তার প্রশ্নের মাধ্যমে মনের মধ্যকার সন্দেহ ব্যক্ত করেন। তবে এই সন্দেহটা যে আন্তরিক হতে হবে এমন নয়, তা ফেইকও হতে পারে। উদাহরণ –

Where shall I begin to describe her wisdom? In her knowledge of facts? In her ability to synthesize diverse matters? In her capacity to articulate complex ideas simply?

১১। এপিপ্লেক্সিস (EPIPLEXIS)

এই অলঙ্কারের দ্বারা শোক প্রকাশ করা হয়।

যেমন –কেন আমি জন্মগ্রহণ করলাম?

১২। এক্সাসসিটাশিও (EXUSCITATIO)

এই অলঙ্কারের দ্বারা নিজের অনুভূতি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যেমন –

আমরা কি কেবলই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সরকারকে আমাদের অধিকারকে পদদলিত করতে দেখব? এটাকি আমাদের জন্য নিরাপদ? এটা কি আমাদের জন্য সঠিক? আমাদের কেউ কি এভাবে চলতে দিতে সক্ষম?

১৩। কাকু বক্রোক্তি

এটি বাংলা অলঙ্কারশাস্ত্রের রেটোরিকাল কোয়েশ্চেন। সরাসরি উদাহরণে যাচ্ছি –

(১) রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে? – মধুসূদন

(২) আজ শতবর্ষ পরেএ সুন্দর অরণ্যের পল্লবের স্তরেকাঁপিবে না আমার পরাণ? – রবীন্দ্রনাথআরও বিভিন্ন রকমের রেটোরিকাল কোয়েশ্চেন আছে। আলোচনা ব্যাপক আকার নেবে বলে যাচ্ছি না। এবার অন্যদিকে যাচ্ছি।

১৪,১৫। ইউফেমিজম ও ডিসফেমিজম (EUPHEMISM AND DYSPHEMISM)

এই দুটো অলঙ্কার নিয়ে একসাথে বললেই সুবিধা হব। কোন কথা প্রকাশ করা যদি অসভ্য বা অপ্রীতিকর বলে মনে হয় তবে দেখা যায় সেই কথাটি প্রকাশ না করে কোন বিকল্প কথাকে প্রকাশ করা করা হয়। কথাটি শব্দও হতে পারে, বাক্যও হতে পারে। একে ইউফেমিজম বা সুভাষণ বলে। যেমন –

(১) শেক্সপিয়র থেকে একটা উদাহরণ দেই –King Richard: What says he?Northumberland: Nay, nothing, all is said.His tongue is now a stringless instrument—Shakespeare, Richard II 2.1.147-149
এখানে “stringless instrument” এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে তিনি মারা গেছেন।

(২) “কর্তাবাবু, আপনাকে খাওয়ানোর মধ্যে আনন্দ আছে। আপনি খেতে বসেন সকলের আগে, খানও তাড়াতাড়ি, আর ওঠেনও সকলের শেষে।”এখানে, আপনি বড় বেশি খান – এই কঠিন কথাটি এখানে পরোক্ষভাবে কোমল করে বলা হয়েছে বলে সুভাষণ বা ইউফেমিজম অলঙ্কার হয়েছে।

(৩) কিছুক্ষণ আগে একটা লেখা পড়তে গিয়ে একটা বাক্য সামনে এল। সেটা ছিল, “The fact Jimmy Swaggart likes to play a round of bedroom golf with some local entrepreneurial ladies, is not evidence for sexual immorality in general, only that he is sexually immoral.”
এখানে bedroom golf বলতে বোঝানো হচ্ছে যৌনক্রিয়া আর local entrepreneurial ladies দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যৌনকর্মীকে। দুটোই ইউফেমিজম।ইউফেমিজম নিয়ে জর্জ কার্লিন এর একটা অসাধারণ স্ট্যান্ড আপ কমেডি আছে। ইউটিউবে সার্চ দিলেই দেখতে পাবেন।

(৪) বর্তমানে হিজড়া শব্দটির জায়গায় কিন্নরী, বৃহন্নলা, শিখণ্ডিনীর মত পৌরাণিক চরিত্রকে ব্যবহার করাও ইউফেমিজম।

ডিসফেমিজম হল ইউফেমিজমের উলটো। যখন কোন সাধারণ কথাকে এমনভাবে প্রকাশ করা হয় যার ফলে সেটি অফেন্সিভ বা অপ্রীতিকর হয়ে যায় তখন তাকে ডিসফেমিজম বলে। কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আক্রমণ করার জন্য, বা অফেন্স করার জন্য শব্দের ডিসফেমিজম ব্যাবহার করতে পারেন। এগুলোর অনেকগুলোই স্লার বা গালি হিসেবে পরিচিত। ডিসফেমিজম এর উদাহরণ এর মধ্যে আছে, সিগারেটের জায়গায় ক্যান্সার স্টিক, হোমোসেক্সুয়াল ম্যান এর জায়গায় ফ্যাগ, মিথ্যার বদলে বুলশিট, টয়লেট টিস্যুর জায়গায় ম্যানহোল কাভার বলা ইত্যাদি। ব্যক্তির নামকে পরিবর্তন করেও ডিসফেমিজম হয়। যেমন জগন্নাথ এর জায়গায় জগা বলে ডাকা ডিসফেমিজমের মধ্যে পড়ে।

অনেক শব্দের ক্ষেত্রেই ইউফেমিজম ও ডিসফেমিজম দুইই থাকতে পারে। যেমন টয়লেট এর ইউফেমিজম হল বাথরুম, আর ডিসফেমিজম হল পিসার, অরকা নামক সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীর ইউফেমিজম হচ্ছে সি পান্ডা আর ডিসফেমিজম হচ্ছে কিলার হোয়েল, রেবেল এর ইউফেমিজম হল ফ্রিডম ফাইটার আর ডিসফেমিজম হল টেরোরিস্ট, সিগারেট এর ইউফেমিজম হল টর্চ অফ ফ্রিডম আর ডিসফেমিজম হল ক্যান্সার স্টিক। বাংলা ভাষায়ও কিছু উদাহরণ দেয়া যায়। মুমূর্ষু ব্যক্তির ইউফেমিজম হিসেবে বলা যায় মৃত্যু পথযাত্রী আর ডিসফেমিজম হিসেবে বলা যায় ঘাটের মরা, মানসিক রোগীকে ইউফেমিজম হিসেবে বলা যায় মানসিক ভারসাম্যহীন বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী আর ডিসফেমিজম হিসেবে বলা যায় পাগলা, পড়াশোনায় দুর্বল বাচ্চাদের ইউফেমিজম হল কোমলমতি শিশু আর ডিসফেমিজম হল গাধা।অনেকগুলো রেটোরিকাল ডিভাইস নিয়ে কথা হল। মেটোনিমি ও সিনেকডকি নিয়ে কিছু কথা বলেই আপাতত শেষ করে দেব।

১৬।মেটোনিমি (METONYMY) বা অনুকল্প

কোনো রকমের সম্পর্কের সূত্রে এক নামের নস্তুকে অন্য বস্তুর নামে অভিহিত করা হলে অনুকল্প বা মেটোনিমি অলঙ্কার হয়। যেমন –

(১) জওহরলালের মৃত্যুতে সমগ্র ভারতবর্ষ শোকাভিভূত।
এখানে ‘সমগ্র ভারতবর্ষের’ অর্থ হচ্ছে ‘সমগ্র ভারতবর্ষের অধিবাসিবৃন্দ’। সুতরাং দেশের নামে অধিবাসিবৃন্দকে বোঝানো হয়েছে বলে এখানে অনুকল্প বা মেটোনিমি অলঙ্কার হয়েছে।

(২) “The pen is mightier than the sword”
এখানে পেন বা কলম দ্বারা চিন্তাকে বোঝানো হচ্ছে, আর সর্ড দ্বারা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ যেমন মিলিটারি একশন বা পুলিসি একশন বোঝানো হচ্ছে।

(৩) “My son, give me thy heart”
এখানে হার্ট বলতে ভালোবাসা বোঝানো হচ্ছে।

১৭। সিনেকডকি (SYNECDOCHE) বা প্রতিরূপক

এক বস্তুকে অন্য বস্তুর দ্বারা বোঝানো হলে প্রতিরূপক অলঙ্কার হয়। এতে সাধারণত ব্যাপকতর কথার দ্বারা অপেক্ষাকৃত সঙ্কীর্ণ বিষয়কে বা সঙ্কীর্ণতর কথার দ্বারা অপেক্ষাকৃত ব্যাপক বিষয়কে বোঝানো হয়ে থাকে। সিনেকডকি একটি বিশেষ ধরণের মেটোনিমি। উদাহরণ –

(১) উন্মত্ততরঙ্গ মাঝখানেযে পুত্র সঁপেছে অঙ্গ, তারে কোন্‌প্রাণে ছাড়ি যাব? – রবীন্দ্রনাথএখানে ‘অঙ্গ’ কথাটি ব্যবহারের দ্বারা অধিকতর ব্যাপক ‘দেহকে’ বোঝানো হয়েছে। সুতরাং এটি প্রতিরূপক বা সিনেকডকি অলঙ্কার।

(২) কড়ি দিয়ে কিনলাম – এই কথাটিতে কড়ি দ্বারা অর্থ বা টাকাপয়সা বোঝানো হয়েছে। তাই এটিও সিনেকডকি বা প্রতিরূপক অলঙ্কার।

(৩) “He shall think differently,” the musketeer threatened, “when he feels the point of my steel.” – স্টিলের দ্বারা এখানে তরবারিকে বোঝানো হচ্ছে।

(৪) দুই দিন আগে একজনকে ফেইসবুকে ব্যক্তি আক্রমণ করে লিখতে দেখলাম “that won’t get you any crumb of pussy” – এখানে crumb of pussy বলতে যোনি বোঝানো হয়নি, যৌনসুখ প্রাপ্তিকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল।

(৫) একটি প্রসিদ্ধ ইংরেজি গালি – “What an asshole!”
এখানে এই এসহোলও সিনেকডকি, এখানে আসলে ব্যক্তির এসহোল বা গুহ্যদেশকে না বরং সমগ্র ব্যক্তিকেই নির্দেশ করা হচ্ছে।

যাই হোক, লেখা বেশি বড় করব না এই সিদ্ধান্ত নিলেও ১৭টা রেটোরিকাল ডিভাইস নিয়ে লেখা হয়ে গেল। কিন্তু এগুলোই সব না, আরও অনেক আছে। আপনারা প্রত্যহ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে অনেক অনেক রেটোরিকাল ডিভাইস দেখেন। সব কিছু নিয়ে এই পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে আরও অনেকগুলো রেটোরিক ডিভাইস নিয়ে হয়তো লিখব। তবে আমি যা বোঝাতে চেয়েছিলাম তা আশা করি বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। লেখা বেশি বড় হয়ে যাওয়ায় দুঃখিত।

প্রথম পর্বের লিংক –
https://www.nastikya.com/archives/13926

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: