ভগবদগীতা সমালোচনা

লেখকঃ জয়গোপাল দে

প্রথম পরিচ্ছেদ

আজ কাল গীতার বড় আদর। সকল গৃহেই প্রায় গীতা দৃষ্ট হয়। গীতার বহুবিধ সংস্করণ ও অনুবাদ হইয়াছে। গীতার প্রশংসা আর লোকের মুখে ধরে না। পদ্মনাভ-মুখপদ্ম বিনিঃসৃত এক মাত্র ভগবদগীতা পাঠ করিলে অন্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করিবার আর আবশ্যক থাকে না, শ্রীধর স্বামী এ কথা বলিয়া গিয়াছেন। হিন্দু মাত্রেই এ কথা মুক্ত কণ্ঠে অনুমোদন করেন। ভারতবাসী আর্য্যসন্তানই কেবল গীতার গুণে মুগ্ধ নয়; ম্লেচ্ছ কুলোদ্ভব ডেলি-নিউসের (Daily News) ভূতপূর্ব্ব ইংরাজ সম্পাদক বলেন যে, ধর্ম্মপদ, বাইবেল এবং গীতা, এই তিন খানিই জগতের মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম্মপুস্তক। তাহাদের মধ্যে গীতাই আবার সর্ব্বোৎকৃষ্ট। গীতার সহিত তুলনা করিলে ইউরোপের রাজত্ব এবং সমস্ত পৃথিবীর ঐশ্বর্য্য তুচ্ছ বলিয়া বোধ হয়। নিত্য এবং অনিত্য পদার্থের পার্থক্য, স্বর্গ এবং পরলোকের কথা, কেবল মাত্র গীতা পাঠেই অবগত হওয়া যায়। গীতার এরূপ প্রশংসা করদূর যুক্তিসঙ্গত, তাহার সমালোচনা করাই এই পুস্তকের উদ্দেশ্য।(১)

বাঙ্গালা ভাষায় গীতার অনেক প্রকার অনুবাদ দেখিতে পাওয়া যায়; কিন্তু তাহার মধ্যে অনেক গুলিই ভ্রমপূর্ণ। নিজের মানসসম্ভূত হিন্দু ধর্ম্মের সংরক্ষণার্থ কেহ বা (২) কোন কোন স্থলে স্বকপোলকল্পিত অর্থ করিয়াছেন, কেহ বা (৩) অনুবাদ না করিয়া এরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন যে, যাহার সহিত মূলের অনেক স্থলে কিছু মাত্র সংশ্রব নাই। ভাষ্যকার শ্রীশঙ্করাচার্য্য এবং শ্রীধর স্বামীও গীতার অর্থ হৃদয়াঙ্গম করিতে পারেন নাই, শ্রীমান বঙ্কিম চন্দ্র এই কথা বলিতে কুণ্ঠিত হন নাই। হিন্দু ধর্ম্মের এরূপ দুরবস্থা উপস্থিত!!!

কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদ সর্ব্বাপেক্ষা মূলানুযায়ী এবং উপরি উক্ত দোষ সকল বিবর্জিত।তাঁহার অনুবাদ শ্রীসত্যচরণ মিত্র মূলের সহিত প্রকাশ করিয়াছেন। পণ্ডিতবর শ্রীপ্রসন্নকুমার বিদ্যারত্ন, স্বামীকৃত টীকা অবলম্বন করিয়া গীতার এক সুন্দর অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা রচনা করিয়াছেন। এই পুস্তকে আমরা উল্লিখিত দুই খানি পুস্তকের অনুবাদ অবলম্বন করিব।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র গীতার ঘটনা স্থল। উক্ত মহাযুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জ্জুন গীতোক্ত উপদেশমালা প্রাপ্ত হন। কৌরব এবং পাণ্ডবগণ, সংগ্রামাভিলাষে ধর্ম্মক্ষেত্রে সমবেত হইয়াছেন। এক দিকে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ প্রমুখ কৌরব পক্ষীয় বীরগণ, ব্যূহরচনা করিয়া যুদ্ধার্থে প্রস্তুত; অপরদিকে পাণ্ডবীয়েরাও উপযুক্ত রূপে সজ্জিত হইয়া দণ্ডায়মান। তখন প্রতাপবান ভীষ্ম, দূর্য্যোধনের হর্ষবর্দ্ধনার্থ সিংহনাদসহকারে উচ্চৈঃস্বরে শঙ্খধ্বনি করিলেন। পরক্ষণেই শঙ্খ, পণব, আনক এবং গোমুখ সকল বাদিত হইয়া তুমুল শব্দ প্রাদুর্ভূত হইল। পাণ্ডবীয়েরাও নিরস্ত রহিলেন না। বাসুদেব, অর্জ্জুন, ভীমসেন, যুধিষ্ঠির, নকুল, সাত্যকি, অভিমন্যু প্রভৃতি বীরগণ, ধার্ত্তরাষ্ট্রগণের হৃদয় বিদারিত করিয়া আপন আপন শঙ্খ-ধ্বনি করিতে লাগিলেন। তখন অর্জ্জুন-সারথি বাসুদেব, তাঁহার আদেশে উভয় পক্ষের বল নিরীক্ষনার্থ উভয় সেনার মধ্যস্থলে রথ সংস্থাপন করিলেন। কপিধ্বজ পাণ্ডব দেখহিলেন, উভয় সেনার মধ্যে তাঁহার পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, সখা প্রভৃতি সমস্ত আত্মীয়গণ যুদ্ধে জীবন সংকল্প করিয়া অবস্থান করিতেছেন। সমরাভিলাষী আত্মীয়গণকে দর্শন করিয়া অর্জ্জুনের মুখ শুষ্ক, দেহ অবসন্ন, কম্পিত এবং রোমাঞ্চিত হইতে লাগিল। গাণ্ডীব হস্ত হইতে খসিয়া পড়িতে লাগিল, এবং সমুদয় ত্বক দগ্ধ হইতে লাগিল। তখন তিনি কাতরস্বরে বলিলেন :-
“হে গোবিন্দ, এ সকল আত্মীয়গণকে নিহত করা শ্রেয়স্কর বোধ হইতেছে না। আমি জয় আকাঙ্খা করি না, রাজ্যসুখও চাহি না। যাঁহাদের নিমিত্ত রাজ-ভোগ ও সুখের কামনা করিতে হয়, সেই আচার্য্য, পিতা, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক প্রভৃতি আত্মীয়গণকে বধ করিয়া আমাদের রাজ্যে প্রয়োজন কি? ইহাঁরা আমাদের বধ করিলেও আমি ইহাঁদের বধ করিতে পারিব না। হে মাধব, আত্মীয়গণকে বধ করিয়ায় আমি কি প্রকারে সুখী হইব? কৌরবগণের চিত্ত লোভ দ্বারা অভিভূত হইয়াছে বলিয়াই, যেন ইহাঁরা কুলক্ষয় জনিত দোষ এবং মিত্রদ্রোহ জনিত পাপ দেখিতেছেন না। কিন্তু হে জনার্দ্দন, আমরা কুলক্ষয় দোষ অবগত হইয়াও কি নিমিত্ত এই পাপযুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইব না? কুলক্ষয় হইলে, কুলধর্ম্ম বিনষ্ট হয়। কুলধর্ম্ম বিনষ্ট হইলে, কুল অধর্ম্মে পরিপূর্ণ হয়। কুল অধর্ম্মে পূর্ণ হইলে, কুলস্ত্রীগণ ব্যভিচারিণী হয় এবং তাহা হইতে বর্ণশঙ্কর জন্মায়। কুলনাশকদিগের পিতৃগণের পিণ্ডোদক ক্রিয়া বিলুপ্ত হয়। সুতরাং তাহারা স্বর্গ হইতে পতিত হয়। হায়, কি কষ্ট, আমরা এই মহাশাপের অনুষ্ঠান করিতেছি! রাজ্যসুখলোভে স্বজনকে বধ করিতে উদ্যক্ত হইয়াছি! আমি অস্ত্র সকল পরিত্যাগ করিয়া রথের উপর উপবেশন করিলে ধার্ত্তরাষ্ট্রগণ যদি আমাকে বধ করে, তাহাও আমার পক্ষে কল্যাণকর হইবে।”

অর্জ্জুন ইহা বলিয়া শরাসন পরিত্যাগ পূর্ব্বক শোকাকুল চিত্তে রথের উপর উপবেশন করিলেন। অর্জ্জুনের উল্লিখিত বাক্য সকল শ্রবণ করিলে তাঁহাকে দ্বিতীয় যিশুখ্রিষ্ট্র বা শাক্যসিংহ বলিয়া বোধ হয়। যে কৌরবগণ অন্যায় পূর্ব্বক তাঁহাদের সমস্ত বিষয় অপহরণ করিয়া বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র পরিমাণ ভূমি দান করিতে অস্বীকৃত হয়; যাঁহাদের জন্য দ্বাদশ বৎসর বনবাস এবং এক বৎসর, বিরাট-ভবনে অজ্ঞাত বাসের অশেষ কষ্ট সহ্য করিতে হইয়াছিল; তাহাদের প্রতি দয়া প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করিয়া অর্জ্জুন নিজ মনের মহত্ব দেখাইলেন। কৌরবগণ তাঁহাদের আজন্ম শত্রু। জতু-গৃহ দাহ ও সভা মধ্যে দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা করিয়া তাহাদের কলুষিত হৃদয়ের পরিচয় দিয়াছে। অস্ত্র হস্তে উপস্থিত এরূপ শত্রুকে সম্মুখ সংগ্রামে নিহত করিতে কোনো বীরই পরান্মুখ হয় না। শত্রুকে শাস্তি প্রদান-করণ মানবের প্রকৃতি। কিন্তু ক্ষমা ঈশ্বরের ধর্ম্ম। অর্জ্জুনের হৃদয় সেই স্বর্গীয় ভাবে পূর্ণ হইয়া জ্ঞাতি নিধনে অনিচ্ছা প্রকাশ করিল।

পাঠক হয় ত ভাবিবেন যে, কৃষ্ণ যখন ঈশ্বরের অবতার বলিয়া পরিচয় দেন, তখন তিনি অর্জ্জুনের সাধু ইচ্ছার পোষকতা করিবেন; (৪) এবং তাঁহাকে নরহত্যা হইতে নিবৃত হইতে পরামর্শ দিবেন। ঈশার ন্যায় মহাশত্রুকেও ক্ষমা করিতে আদেশ করিবেন। কিন্তু কৃষ্ণের হৃদয় প্রতিহিংসা পূর্ণ। তিনি অর্জ্জুনের কাতরতা দর্শনে আশ্চর্য্যন্বিত হইয়া বলিলেন–“হে পরস্তপ, তুচ্ছ হৃদয়-দৌর্ব্বল্য দূরীকৃত করিয়া উত্থান কর। ঈদৃশ বিষম সমরে তোমার কি জন্য অনার্যজনোচিত, স্বর্গপ্রতিরোধকর এবং অকীর্ত্তিকর মোহ উপস্থিত হইল।” জ্ঞাতিবধই বোধ হয় কৃষ্ণের মতে আর্য্যজনোচিত কার্য্য, এবং গুরুহত্যা, পিতামহ হত্যাই স্বর্গ গমনের ও কীর্ত্তি স্থাপনের উপায়। পার্থের সহৃদয়তা দর্শনে মুগ্ধ হইয়া কোন বিদেশীয় পণ্ডিত বলেন :–
Arjun’s humanity,–it may be, well styled humane–compassion and generousity is far preferable to the stony hearted philosophy which Krishan professes to be divine. কৃষ্ণের আশ্বাস বাক্যে অর্জ্জুনের শোক দূর হইল না। তিনি দুঃখিতান্তঃকরণে বলিলেন :–“ভগবন্‌, আমি কি প্রকারে পূজনীয় ভীষ্ম এবং দ্রোণকে শরজাল দ্বারা বিদ্ধ করিব! গুরুজনদিগকে বধ না করিয়া যদি ভিক্ষান্ন ভোজন করিতে হয়, তাহাও শ্রেয়ঃ। এই যুদ্ধে জয় এবং পরাজয়ের মধ্যে কোনটীর গৌরব অধিক, তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। কারণ যাঁহাদিগকে বধ করিলে ভূমণ্ডলের রাজ্য এবং সুরলোকের আধিপত্য প্রাপ্ত হইলেও আমার ইন্দ্রিয়গণ শোকে পরিশুষ্ক হইবে, সেই ধার্ত্তরাষ্ট্রগণ যুদ্ধার্থে উপস্থিত।”
পরন্তপ জিতনিদ্র অর্জ্জন, ইহা বলিয়া এবং আমি যুদ্ধ করিব না বলিয়া তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।
কৃষ্ণ দেখিলেন, যথোপযুক্ত উত্তর দিয়া অর্জ্জুনের ন্যায়সঙ্গত আপত্তির খণ্ডন করা দূরহ। যখন তর্কে পারা যায় না, তখন গম্ভীর ভাবে মুরুব্বিয়ানা চালে–“বাপু হে, তুমি বালক, তোমার বুদ্ধি উত্তমরূপে পরিস্ফুটিত হয় নাই; এ সকল শাস্ত্রীয় কথা, হৃদয়াঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন; তুমি বুদ্ধিমান হইয়া এরূপ কুতর্ক করিতেছ কেন?” ইত্যাদি বলিয়াও জয়ী হওয়া যায়। কৃষ্ণ তখন সেই পন্থাবলম্বন করিয়া উভয় সেনার মধ্যবর্ত্তী বিষন্ন-বদন-অর্জ্জুনকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন :–
“হে অর্জ্জুন, তোমার মুখ হইতে পণ্ডিতগণের ন্যায় বাক্য সকল বিনির্গত হইতেছে, অথচ তুমি অশোচ্য বন্ধুগণের নিমিত্ত শোক করিয়া মূর্খতা প্রদর্শন করিতেছ। পণ্ডিতগণ, কি জীবিত, কি মৃত কাহারও নিমিত্ত অনুশোচনা করে না।”(৫)
আরো দেখ, জীবের আত্মা নিত্য এবং অবিনাশী, তিনি শন্ত্রে ছেদিত বা অগ্নিতে দগ্ধ বা জলে ক্লেদ যুক্ত হন না। সুতরাং যুদ্ধার্থে উপস্থিত রাজন্যবর্গকে হনন করিলেও কোন ক্ষতি নাই, কেননা তাঁহারা যেমন জন্মের পূর্ব্বেও বিদ্যমান ছিলেন, মৃত্যুর পরেও তাঁহারা থাকিবেন।
যিনি মনে করেন, এই জীবাত্মা অন্যকে বিনাশ করেন, এবং যিনি মনে করেন, অন্যে এই জীবাত্মাকে বিনাশ করেন, তাঁহারা উভয়ই অনভিজ্ঞ; কেননা জীবাত্মা কাহাকেও বিনাশ করে না এবং জীবাত্মারেও কেহ বিনাশ করিতে পারে না। জাত ব্যক্তির মৃত্যু, এবং মৃত ব্যক্তির জন্ম অপরিহার্য্য। অতএব তুমি শোক পরিত্যাগ পূর্ব্বক আনন্দচিত্তে জ্ঞাতিবর্গকে সমূলে নির্ম্মূল কর। তাহাতে তাঁহাদের কেবল শরীর বিনষ্ট হইবে, আত্মার কিছুই হইবে না। সুতরাং তোমারও কোন পাপ হইবে না।”

বেশ কথা; এই যুক্তি অবলম্বন করিয়া অর্থের জন্য কেহ পিতৃহত্যা করিলেও গীতানুরাগী কৃষ্ণের উপাসকগণ তাহার কিছুমাত্র দোষ দিতে পারিবেন না।
এই সকল কথা শুনিলে Julius Ceasar নাটকের Cassiusএর উক্তি মনে পড়ে।
Cassius:-He that cuts off twenty years of life, cuts off twenty years of fearing death.
Brutus:- Grant that and then is death a benefit. So we are Caesar’s friends, that have abridged his time of fearing death.
Bishop Caldwell কৃষ্ণের এই যুক্তিগুলি সম্বন্ধে বলেন :– A man accused of murder neither denies his guilt,
nor pleads that he committed the act in self-defence, but addresses the Court in the language of Krishna: ‘ It is needless’, he says, * to trouble yourselves about the inquiry any further, for it is impossible that any murder can have taken place. The soul can neither kill nor be killed. It is eternal and indestructible. When driven from one body, it passes into another. Death is inevitable, and another birth is equally {inevitable. It is not the part, therefore, of wipe men like the judges of the court, to trouble themselves about such things5. Would the judges regard this defence as conclusive ? Certainly not. Nor would it be regarded as a conclusive defence by the friends of the murdered person, or by the world at large. The criminal might borrow from the Gita as many sounding nothings as he liked, but the moral sense of the community would continue to regard his murder as the crime. তৎপরে কৃষ্ণ অর্জ্জুনের আত্মগরিমাবৃত্তি উত্তেজিত করণাশায় বলিলেন যে, “তুমি এক জন মহারথী হইয়া যুদ্ধ না করিলে অন্যান্য বীরগণ তোমাকে ভীরু বলিয়া উপহাস করিবে। তোমার ন্যায় যশস্বী লোকের অকীর্ত্তি মরণাপেক্ষাও অধিকতর দুঃসহ।” আর যুদ্ধে লাভেরও বিলক্ষণ সম্ভাবনা আছে। কেননা “সমরে বিনষ্ট হইলে স্বর্গ প্রাপ্ত হইবে, এবং জয়ী হইলে পৃথিবী উপভোগ করিবে।” দুই দিকেই সমান লাভ। অতএব “জয়পরাজয় তুল্য জ্ঞান করতঃ যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া উত্থান কর।” এই সকল “তত্ত্ব জ্ঞানের” কথা প্রকাশ করিয়া বাসুদেব “কর্ম্মযোগ বিষয়িণী বুদ্ধি” কীর্ত্তন করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি বলিলেন, হে ধনঞ্জয়;–“তুমি আপত্তি পরিত্যাগ পূর্ব্বক একান্ত ঈশ্বর-পরায়ণ হইয়া সিদ্ধি এবং অসিদ্ধি উভয়েই তুল্য জ্ঞান করতঃ কর্ম্ম সকল অনুষ্ঠান কর।”(৬)

ইহাই গীতোক্ত সর্ব্বজন প্রশংসিত নিষ্কাম ধর্ম্ম। এই স্থানে বাসুদেব বেদোক্ত যজ্ঞাদি দ্বারা মোক্ষলিপ্সু দ্বিজবর্গের ভ্রম প্রদর্শনার্থ যাহা বলেন, বেদানুরক্ত হিন্দু মাত্রেরই তাহা স্মরণ রাখা উচিত।
“যাহারা আপাততঃ মহোহর শ্রবণরমণীয় বাক্য অনুরক্ত, বহুবিধ ফলপ্রকাশক বেদ বাক্যই যাহাদের প্রীতিকর, যাহারা স্বর্গাদি-ফল-সাধন কর্ম্ম ভিন্ন অন্য কিছুই স্বীকার করে না। যাহারা কামনা পরায়ণ, স্বর্গই যাহাদের পরম পুরুষার্থ; জন্ম, কর্ম্ম ও ফলপ্রদ ভোগ ও ঐশ্বর্য্য লাভের সাধনাভূত নানাবিধ যজ্ঞাদি ক্রিয়া প্রকাশক বাক্যে যাহাদিগের চিত্ত অপহৃত হইয়াছে; সেই বিবেক বিহীন মূঢ় ব্যক্তিদিগের বুদ্ধি সমাধি বিষয়ে (ঈশ্বরারাধনা বিষয়ে) সংশয় শূন্য হয় না। বেদ সকল ত্রিগুণাত্মক; হে অর্জ্জুন, তুমি ত্রিগুণের অতীত হও।” গীতার লেখক (ব্যাসদেব?) যে একজন reformed হিন্দু ছিলেন; হিন্দু ধর্ম্মের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, বেদের প্রতিও যে তাহার যথেষ্ঠ অশ্রদ্ধা ছিল, এই সকল শ্লোকই তাহার প্রমাণ। অথচ মনের দুর্ব্বলতা বশতঃ অথবা সমাজের ভয়ে বৈদিক যজ্ঞেরও মধ্যে মধ্যে প্রশংসা করিয়াছেন; যথা, “কর্ম্ম বেদ হইতে, বেদ ব্রহ্ম হইতে সমুদ্ভব হইয়াছে। অতএব এই সর্ব্বগত ব্রহ্ম নিয়তই যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত আছেন।” যাঁহারা যজ্ঞানুষ্ঠান না করেন, তাঁহাদের জীবন পাপময় ইত্যাদি। অথচ, ‘এই সকল কর্ম্ম, অজ্ঞ ব্যক্তিগণের জন্যে’; “ব্রহ্মোপাসকদিগের অনুষ্ঠান করিবার আবশ্যক নাই,” (তস্য কার্য্যং ন বিদ্যতে) ইহাও পুনঃ পুনঃ বলিতে ক্ষান্ত হন নাই।

এ সকল শাস্ত্রীয় কথা শুনিতে শুনিতে অর্জ্জুনের “সমাধিস্থ স্থিত-প্রজ্ঞ” ব্যক্তির লক্ষণ জানিতে বাসনা হইল। শ্রীকৃষ্ণ তাহা বলিয়া দ্বিতীয় অধ্যায় শেষ করেন।
প্রজহাতি সদা কামা্ন সর্ব্বান্‌ পার্থ মনোগতান্‌
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থীত প্রজ্ঞস্ততদোচ্যতে
দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ
বীতরাগ ভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্ম্মুনিরুচ্যতে। ২অ-৫৬।
“যিনি সর্ব্বপ্রকার মনোগত কামনা পরিত্যাগ করেন, যাঁহার আত্মা আত্মাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ। যিনি দুঃখে অক্ষুব্ধ চিত্ত, সুখে স্পৃহা শূন্য এবং অনুরাগ, ভয় ও ক্রোধ বিবর্জ্জিত সেই মুনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।”
কবিবর Goldsmithএর Deserted Village গ্রন্থেও একটী খ্রীষ্টীয়ান স্থিতপ্রজ্ঞের চিত্র পাওয়া যায়। উভয়টী তুলনা করিলে ইংরাজ এবং ভারতবাসীর স্বভাব এবং ধর্ম্মগত প্রভেদ বেশ বুঝা যায়। গীতার যোগী জিতেন্দ্রিয়, ঈশার ন্যায় ক্ষমাশীল। শত্রু এবং মিত্রেও তাঁহার সম দৃষ্টি। তিনি সকল বিষয়েই স্পৃহা শূন্য। আত্মাতেই তাঁহার প্রীতি, আত্মাতেই তাঁহার সন্তোষ। আত্মাতেই তাঁহার আনন্দ। সংসারের শুভাশুভ কর্ম্মে তাঁহার হস্তক্ষেপ করিবার আবশ্যক নাই। কর্ত্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠান না করিলেও তাঁহার পাপ হয় না (৩অ-১৮) পুত্রকলত্রাদিতেও স্নেহ শূন্য (জিতসংঙ্গদোষাঃ)। তিনি কুর্ম্মের ন্যায় ইন্দ্রিয় সকল বিষয় হইতে প্রত্যাহরণ করিয়া, নাসিকার অগ্রভাবে দৃষ্টি সংস্থাপন পূর্ব্বক এক প্রকার জীবন্মৃত ভাবে কাওযাপন করেন। মুক্তির জন্যে তাঁহাকে ব্রহ্মোপাসনাও করিতে হয় না;–(ন চাস্য সর্ব্বভূতেষু কশ্চিদর্থব্যপাশ্রয়ঃ)। তিনি “আপনাতেই আপনি প্রীত” হইয়া বসিয়া থাকেন। তাঁহার এই “নিষ্কাম ধর্ম্মের” ভিতর ঘোর স্বার্থপরতা দৃষ্ট হয়, কেননা তিনি সর্ব্বদাই নিজের চিন্তায় মগ্ন।
পরহিতব্রতে উৎসর্গীকৃত জীবন খ্রীষ্টের পুরোহিতও নিজের শুভাশুভের প্রতি দৃষ্টি রাখিতেন না। ঈশ্বরের প্রতি নির্ভর করিয়া সংসারের দুঃখ মোচনে ব্যস্ত থাকিতেন।
Unpractised he to fawn, or seek for power,
By doctrines fashioned to the varying hour;
Far other aims his heart had learned to prize,
More skilled to raise the wretched than to rise.
His house was known to all the vagrant train,
He chid their wanderings but relieved their pain;
His ready smile a parent’s warmth exprest,
Their welfare pleased him, and their cares distrest:
To them his heart, his love, his griefs were given,
But all his serious thoughts had rest in Heaven.
As some tall cliff that lifts its awful form,
Swells from the vale, and midway leaves the storm,
Tho’ round its breast the rolling clouds are spread,
Eternal sunshine settles on its head.

Lord Macaulay প্রাচীন এবং আধুনিক দর্শনশাস্ত্র সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন, Goldsmith এবং ব্যাসদেবের আদর্শ মনুষ্য সম্বন্ধে তাহা সুন্দররূপে বর্ত্তে।
The oboject of Bacon’s philosophy “was the multiplying of human enjoyment, and the mitigating of human sufferings. It was the relief of man’s estate. Two words form the key of the Baconian doctrines, Utility and Progress. The ancient philosophy disdained to be useful, and was content to be stationary. It dealt largely in theories of moral perfection, which were so sublime that they never could be more than theories ; in attempts to solve insoluble enigmas; in exhortations to the attainment of unattainable frames of mind. It could not condescend to the humble office of ministering to the comforts of human beings.” (Essay on Bacon)

বিষয় বাসনা মানবহৃদয়কে কিরূপে পাপপঙ্কে নিপতিত করে, তৎসম্বন্ধে এই অধ্যায়ে একটী সুন্দর উপদেশ আছে। ধ্যায়তো বিষয়ান্‌পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে (২অ-৬২)। এই জন্যই ঈশা বলিয়াছেন :–
It is easier for a camel to go through the eye of a needle, than for a rich man to enter into the kingdom of God.

——————
১. এই পুস্তকের কিংয়দশ ১৩০১ সালের পৌষ মাসের নব্যভারতে প্রকাশিত হইয়াছিল।
২. আর্য্যমিশন ইনষ্টিটিউশনের গীতা।
৩. শ্রীশশধর তর্কচূড়ামণির বঙ্গানুবাদ।
৪. হৃদ রাজ্য উদ্ধারার্থে যুদ্ধ করা পাণ্ডবগণের পক্ষে অন্যায় হইয়াছিল, এ কথা কেহ বলে না। এরূপ স্থলে যুদ্ধ করাই মানবের স্বাভাবিক কিন্তু যুদ্ধ না কইলেও যে বিশেষ পাপ হইত, তাহাও নয়। এমন লোকও বিরল নয়, যাহারা আত্মীয়বর্গকে হত্যা পর্য্যন্ত করিয়া বিষয় উদ্ধার করা অপেক্ষা, অক্ষুব্ধ চিত্তে ছাড়িয়া দিতে পারেন। কিন্তু এ সকল কথা অপ্রাসঙ্গিক, কারণ কৃষ্ণ গীতায় যে সকল যুক্তি দ্বারা অর্জ্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করিয়াছিলেন, তাহারই সমালোচনা করা এই পুস্তকের উদ্দেশ্য।
Bishop Caldwell বলেন, Krishna does not base his exhortations to Arjun on the justice of the war in, which he was engaged. That ground might have been taken with properety and Arjun was evidently persuaded of the justice of the Pandava’s cause. But Krishna’s arguments are based upon transcendental doctrines respecting the immortality and impassibility of the soul, which, if they proved his point, would equally prove the most unjust war that was ever waged to be innocent.গীতায় “ধর্মযুদ্ধ” শব্দ ইংরাজী just war-এর প্রতিশব্দ নয়। ধর্ম্মশাস্ত্রানুসারে যুদ্ধ করাকে ধর্ম্মযুদ্ধ কহে। তদ্বিপরীতকে অধর্ম্ম যুদ্ধ বলে। যথা, ভীম কর্তৃক দূর্য্যোধনের উরূভঙ্গ, সপ্তরথী কর্ত্তৃক অভুমন্যু বধ।
৫. স্বাভাবিক কারণে মৃত আত্মীয়বর্গের জন্য জ্ঞানবান শোক করিতে না পারেন। গতানুশোচনা পণ্ডিতের পক্ষে অনুপযুক্ত। কিন্তু যে পণ্ডিত স্বহস্তে গুরুজনকে বধ করিয়াও বিন্দুমাত্র দুঃখিত হন না, তাঁহার পাণ্ডিত্যের মহিমা বোঝা আমাদের পক্ষে অসম্ভব।
৬. ইতিপূর্ব্বে বাসুদেব রাজ্যলাভ এবং স্বর্গলাভের প্রলোভন দেখাইয়া যুদ্ধ করিতে পরামর্শ দেন। এখন আবার নিষ্কাম ভাবে তাহা করিতে বলিতেছেন। যে প্রকারেই হউক, অর্জ্জুনকে যুদ্ধ নিযুক্ত করাই তাঁহার উদ্দেশ্য। কেহ কেহ বলেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণার্জ্জুনের স্বার্থ নাই। ধর্ম্মের সংস্থাপন এবং অধর্ম্মের নাশই তাঁহাদের উদ্দেশ্য। বন্ধুদ্বয়ের কথাবার্ত্তায় কিন্তু স্পষ্টই দেখা যায় যে, অপহৃত রাজ্যের পুনরুদ্ধারই তাঁহাদের অভিপ্রায়। কৃষ্ণ বলিতেছেন, “তুমি রণে শত্রুগণকে হত্যা করিয়া সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ কর (১১অ–৩৩)। আর অর্জ্জুন বলতেছেন, হে গোবিন্দ, আত্মীয়গণকে হত্যা করিয়া রাজ্যলাভে আমার প্রয়োজন কি! বন্ধুগণকে বধ করিয়া স্বর্গের আধিপত্য পাইলেও আমি সুখী হইব না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

কখন বা জ্ঞানের কখন বা কর্ম্মের প্রশংসা শুনিয়া অর্জ্জুনের মনে ঘোর সন্দেহ উপস্থিত হইল। তজ্জন্য তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে জনার্দ্দন, “তোমার মতে কর্ম্ম অপেক্ষা জ্ঞানই যদি শ্রেষ্ঠ হয়, তবে আমাকে কি নিমিত্ত অধর্ম্মকর কর্ম্মে নিযুক্ত করিতেছ?” কেশব বলিলেন, পুরুষ কর্ম্মানুষ্ঠান না করিলে জ্ঞান প্রাপ্ত হয় না; এবং জ্ঞান প্রাপ্ত না হইলে কেবল সন্ন্যাস দ্বারা সিদ্ধি লাভ হয় না। “কর্ম্মত্যাগ অপেক্ষা কর্ম্মানুষ্ঠানই শ্রেষ্ঠ। তদ্বিষয়ে অনেক গুলি নজিরও দেখাইলেন। (১ম) জনকাদি ঋষিরা নাকি কেবল মাত্র কর্ম্ম দ্বারাই সিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। (২য়) সৃষ্টির সময় প্রজাপতি এরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছেন যে, প্রজাগণ যজ্ঞ দ্বারা দেবতাগণকে সংবর্দ্ধিত করিবেন, এবং দেবতাগণও বৃষ্টি দ্বারা অন্নের উৎপত্তি করিয়া প্রজাদিগকে সংবর্দ্ধিত করিবেন। এইরূপ পরস্পর পরস্পরীর সংবর্দ্ধনা করিয়া পরম শ্রেয়ঃ লাভ করিবেন। এই ঘোর কলিকালে যজ্ঞকর্ম্ম যেরূপ লোপ প্রাপ্ত হইতেছে, তাহাতে দেবতাকুলের অন্ন-কষ্ট উপস্থিত না হয়, তদ্বিষয়ে দৃষ্টি রাখা হিন্দু মাত্রেরই কর্ত্তব্য। তেত্রিশ কোটী দেবতার ভরণপোষণের গুরুভার তাঁহাদের স্কন্ধেই ন্যস্ত। খ্রীষ্টীয়ান মুসলমানগণের নিকট, ইহা প্রত্যাশা করা যায় না। কেননা তাহারা এমন “চোর” যে পঞ্চ যজ্ঞাদি দ্বারা দেবঋণ পরিশোধ না করিয়াই দেবদত্ত অন্নাদি অম্লান বদনে ভক্ষণ করে!!!

কৃষ্ণ বলিলেন,–“যজ্ঞ হইতে মেঘের উৎপত্তি হয়, মেঘ হইতে বৃষ্টি এবং বৃষ্টি হইতে অন্নের উৎপত্তি হয়।” “কোন কোন পণ্ডিত কৃষ্ণের এই সংসার বর্ণনা শুনিয়া হাস্য করায়” গীতারহস্যজ্ঞ আর এক পণ্ডিত ইহার এক সুন্দর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বাহির করিয়া দিয়াছেন। তিনি বলেন, “যজ্ঞদগ্ধ ঘৃত কাষ্ঠাদি হইতে ধূম রাশি উৎপন্ন হইবে, এবং ঐ বাষ্প রাশি হিমালয়ের পার্শ্বে আবদ্ধ হইয়া মেঘের উৎপত্তি করিতে পারে। পরে মেঘ হইতে জল এবং জল হইতে শস্য এবং শস্য হইতে প্রাণিগণের উদ্ভব হইতে পারে।” এরূপ যুক্তির উত্তর দিবার আবশ্যকতা ছিল না, আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, আমাদের দেশের অনেক শিক্ষিত (?) লোকের মুখেও এই সকল অসার কথা শুনা যায়। স্কুলের বালকেরাও অবগত আছে যে, কাষ্ঠাদি দগ্ধ করিলে কেবল মাত্র জলীয় বাষ্প বহির্গত হয় না, কার্ব্বনিক এসিড প্রভৃতি বাষ্প থাকে, তাহা শীতল হইলে জল হয় না। প্রভূত পরিমাণে কাষ্ঠ দগ্ধ করিলেও সামান্য পরিমাণ বৃষ্টি হইবার উপযুক্ত জলীয় বাষ্প বহির্গত হয় না। বাষ্প বহির্গত হইলেও, যে দেশে কাষ্ঠ দগ্ধ হইল, সেই স্থানেই বৃষ্টির সম্ভাবনা কোথায়?–কেননা বায়ুর সহিত বাষ্প দেশ দেশান্তরে চলিয়া যাইবে; যজ্ঞকারিগণের কোন উপকারে আসিবে না। আর যজ্ঞের জন্য না হউক, রন্ধনাদি কর্ম্মের জন্যও প্রতিদিনই প্রতি গৃহে যথেষ্ট কাষ্ঠ দগ্ধ হইতেছে। তাহা কি বৃষ্টিপাতের বিশেষ কিছু সহায়তা করে?

কৃষ্ণ পুনরায় বলিলেন–“শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা যাহা আচরণ করেন, ইতর ব্যক্তিরা তাহার অনুসরণ করেন।(১) অতএব বিজ্ঞ ব্যক্তি, কর্ম্মাসক্ত অজ্ঞদিগের কর্ম্ম সকল নিষ্ফল ইত্যাদি বলিয়া, তাহাদের বুদ্ধিভেদ উৎপন্ন না করিয়া স্বয়ং সর্ব্বপ্রকার অনুষ্ঠান পূর্ব্বক তাহাদিগকে কর্ম্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত করিবেন (৩অ–২৬-২৯)। অর্থাৎ অজ্ঞ ও মূর্খকে অজ্ঞ ও মূর্খ রাখিতে বিজ্ঞ ব্যক্তি বিধিমতে চেষ্টা করিবেন। পাছে মূর্খ লোকের, অর্থশূন্য বেদোক্ত কর্ম্মকাণ্ডের প্রতি সন্দেহ জন্মে, এবং তন্নিবন্ধন পুরোহিতবর্গের আধিপত্ত এবং অর্থলাভ কম হয়, তজ্জন্য বুদ্ধিমান লোকে এই সকল কর্ম্মকে নিষ্ফল জানিয়া ও তাহাদের প্রতারণার জন্য স্বয়ং আচরণ করিবে!!! এ সকল কথা কেবল ব্রাহ্মণ গীতাকারের ম্যখেই শোভা পায়। শ্রীধর স্বামী গীতার মত সমর্থনার্থ বলেন–তেষাম্‌ বুদ্ধি বিচালনে কৃতে সতি কর্ম্মসু শ্রদ্ধা নিবৃত্তেঃ জ্ঞানস্য চানুৎপত্তে স্তেষাম্‌ উভয় ভ্রংশঃস্যাৎ। অর্থাৎ “যদি তুমি অজ্ঞানীর মনে (উপদেশ দ্বারা) জ্ঞানোদ্রেক করিতে চাও, তাহার জ্ঞান লাভ ত হইবেই না, কিন্তু তাহাদের কর্ম্মের প্রতি অনাস্থা ও বিদ্বেষ জন্মিবে।” উপদেশ দ্বারাও যে অজ্ঞানীর মনে জ্ঞানের উদয় হইবে না, তাহা স্বামীজি জানিলেন কি প্রকারে? জ্ঞানী অজ্ঞানী দুইটী কি স্বতন্ত্র জীব? সকল লোকেই প্রথমাবস্থায় অজ্ঞানী থাকে, পরে শিক্ষা দ্বারাই জ্ঞানী হয়। স্বামীজি কি মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াই সুবোধিনী টীকা লিখিতে সমর্থ হইয়াছিলেন? আর ভ্রমের বিনাশের নামই জ্ঞান। সুতরাং যজ্ঞ কর্ম্ম দ্বারা কোন উপকার হইবে না, জানিতে পারাই ত জ্ঞান!

কৃষ্ণের তৃতীয় সর্গের শেষ যুক্তি এই;–অর্জ্জুন ক্ষত্রিয়, যুদ্ধ করাই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম্ম। তাহাতে তাহার পাত্রাপাত্র বিবেচনা করিবার আবশ্যক নাই। অতএব তিনি নিঃশঙ্ক চিত্তে জ্ঞাতি নিধনে নিযুক্ত হইতে পারেন। কারণ আপনার জাতিধর্ম্ম পালন করাই সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য।

শ্রেয়ান্‌ স্বধর্ম্মো বিগুণঃ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্ম্মো ভয়াবহঃ।।
“সম্যক অনুষ্ঠিত পর ধর্ম্ম(২) অপেক্ষা কিঞ্চিত অঙ্গহীন স্বধর্ম্মও(৩) শ্রেষ্ঠ। স্বজাতির বিহিত ব্যবসায় অবলম্বন দ্বারা যদি মৃত্যুও হয়, তাহাও শ্রেয়ঃ, তত্রাচ অন্য জাতির ব্যবসায় অবলম্বন করা উচিত নয়।”

হাইকোর্টের শূদ্র বিচারপতি এবং উকিলগণের মধ্যে কেহ গীতাভক্ত থাকিলে, এই দণ্ডেই তাঁহাদের কার্য্য ছাড়িয়া দেওয়া উচিত। কারণ দ্বিজগণের পরিচর্য্যা করাই শূদ্রগণের স্বাভাবিক কর্ম্ম। পরিচর্য্যাত্মকং কর্ম্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজং। তিষক্‌ কুলতিলক পরিব্রাজক, কুমার শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন সেন ওরফে শ্রীকৃষ্ণানন্দ স্বামী আয়ুর্ব্বেদ পরিত্যাগপূর্ব্বক কিরূপে হিন্দুধর্ম্ম প্রচাররূপ ব্রাহ্মণোচিত কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়া গীতার অবমাননা করিতেছেন, তাহাও আমাদের বোধগম্য হয় না। তিনি ত স্বয়ং গীতার্থ সন্দীপনীব্যাখ্যায় লিখিয়াছেন যে, একের যাহা ঔষধ, অন্যের তাহা বিষ। সনাতন ধর্ম্মের গূঢ় তত্ত্ব প্রকাশ করা বিপ্রবর্গের স্বর্গ লাভের উপায় হইলেও বৈদ্যাদি শুদ্রগণের নরক গমনের হেতু। আজ হিন্দুধর্ম্মের কোনো রক্ষক থাকিলে, তিনি মনুর বিধানানুসারে ব্রাহ্মণগণকে ধর্ম্মোপদেশ প্রদানেচ্ছু মদগর্ব্বিত শূদ্রের কর্ণে তপ্ত তৈল ঢালিয়া দিতেন।

Monier Williams উল্লিখিত শ্লোকের ভাবার্থ, ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া এইরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন।
Better to do the duty of one’s caste,
Though bad and ill performed and fraught with evil,
Than undertake the business of another,
HOwever good it be.

Remembering the sacred character attributed to this poem and the veneration in which it has always been held throughout India, we may well understand that such words as these must have exerted a powerfull influence for the last 1800 years tending, as they must have done to rivet the fetters of caste institutions, which for several centuries preceding the Christian era, notwithstanding the efforts of the great liberator Buddha, increased year by year their hold upon the various classed of Hindu Society impeding mutual intercourse, preventing healthy interchange of ideas, and making national union almost impossible.

এই অধ্যায় এবং অষ্টাদশ অধ্যায়ে প্রত্যেক বর্ণের কর্ত্তব্য কর্ম্ম বিশদ রূপে বর্ণনা করিয়া জনার্দ্দন বলেন,–স্বে স্বে কর্ম্মণয়ভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ = মানব নিজ নিজ বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম পালন দ্বারাই সিদ্ধি লাভ করে। সহজং কর্ম্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ = স্বভাবজাত স্বধর্ম্ম দোষযুক্ত হইলেও তাহা ত্যাগ করা উচিত নয়। অর্থাৎ নিজের জাতি ব্যবসায় পাপজনক হইলেও তাহা পরিত্যাগ করা উচিত নয়।

এ সম্বন্ধে Bishop Caldwell বলেন,–A soldier of the Kshatriya caste has no other duty superior to fighting. If fighting and slaying are lawful, simply because they are caste employments and the immutability of moral obligations is ignored, what shall we say Kellars, the thief caste of the South, the ancient (but now generally abandoned) employment of whose caste was to steal, and whose caste means simply thieves? Krishna’s teaching on these heads elevates the conventional duties of the institutions of a dark age, above the essentioal distinction between right and wrong.

পণ্ডিতবর শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে এই গুলি জাতিভেদ প্রথার ফল:–
(1) It has produced disunion and disorder.
(2) It has made honest manual labour contemptible in this country.
(3) It has checked internal and external commerce.
(4) It has brought on physical degeneracy by confining marriage within a narrow circle.
(5) It has been a source of conservatism in every thing.
(6) It has suppressed individuality and independence of character.
(7) It has helped in developing other injurious customs, such as early marriage, charging of heavy matrimonial fees &c.
(8) It has successfully restrained the growth and development of national worth, whilst allowing the opportunity of mental and spiritual culture only to a limited number of privileged people, it has denied these opportunities, to the majority fo lower classes consequently it has made the country negatively a loser.
(9) It has made the country fit for foreign slavery by previously enslaving the people by the most abject spiritual tyranny.

Sir Henry Maine জাতিভেদ প্রথাকে বলেন,–
The most disastrous and blighting of all human Institutions.

“পুরুষ ইচ্ছা না করিলেও কে তাহাকে বল পূর্ব্বক পাপাচরণে নিয়োজিত করে?” অর্জ্জুনের এই প্রশ্নের উত্তরে কেশব বলিলেন;–
“রজোগুণ সমুদ্ভব কাম এবং ক্রোধ।
ইহারা মুক্তিপথের বৈরী। অতএব হে ভরতর্ষভ, তুমি ইন্দ্রিয়গণকে সংযত করিয়া জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের বিনাশক এই কামকে জয় কর।”

চতুর্থ অধ্যায়ের প্রারম্ভে যোগের মাহাত্ম্য বৃদ্ধিত জন্য ভগবান বাসুদেব, এক আষাঢ়ে গল্পের অবতারণা করিয়া বলিলেন, আমিই প্রথমে সূর্য্য ঠাকুরকে যোগের বিষয়ে উপদেশ দিই। আদিত্য (বোধ হয় এক দিন মর্ত্ত্য-লোকে বেড়াইতে আসিয়া) মনুকে বলিয়া যান। মনু বলেন ইক্ষাকুকে; এবং নৈমি প্রভৃতি রাজগণ, ইক্ষাকু প্রমুখাৎ অবগত হন। কালক্রমে এই বিদ্যার লোপ হয়। তুমি আমার বিশেষ ভক্ত বলিয়া, আজ তোমার নিকট কীর্ত্তন করিলাম। ধনঞ্জয় শুনিয়া আশ্চর্য্যন্বিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,–হে মাধব, প্রভাকরের জন্ম হইবার অনেক পরে, তোমার জন্ম হইয়াছে। তুমি কিরূপে তাহার উপদেষ্টা হইলে?
গোবিন্দ বলিলেন, এই জন্ম হইবার পূর্ব্বে আমার অনেক জন্ম হইয়াছিল। সেই সময় বলি। এই উপলক্ষে শ্রীকৃষ্ণ তাহার পূর্ব্ব জন্মের দুই একটি বৃত্তান্ত শুনাইয়া দিলেন।
পরিত্রাণায় সাধূনাম্‌ বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।(৪)
ধর্ম্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।
মধুসূদন কোন সময় দুষ্টদিগকে নিপাত করিয়া কোন স্থানে ধর্ম্মরাজ্য সংস্থাপন করিয়াছিলেন এবং তাহার পরিণামই বা কি হইল, তাহার উল্লেখ নাই। কিন্তু সুরধুণী কাব্য পাঠে জানা যায়, তাঁহারই পাশ্চাত্য শিক্ষার আক্রমণ হইতে স্বরাজ্যরক্ষা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে।
রাধার বচন শুনি মদন মোহন,
বলিলেন মৃদুস্বরে এই বিবরণ,
অজ্ঞানের অন্ধকারে ভ্রমের মন্দিরে,
আধিপত্য এত দিন উন্নত শরীরে,
করিয়াছি অনায়াসে এবে অবোধিনী,
জ্ঞানালোকে আলোময় হয়েছে মেদিনী;
গিয়াছে আঁধার দূরে ভেঙ্গেছে মন্দির,
কতক্ষণ ঢাকা রহে মেঘেতে মিহির?
বলিতে বলিতে শ্যাম বিরস বদনে,
ঝাঁপ দিলা কালীদহে সার ভেবে মনে;
কোথায় প্রাণের হরি বলি কমলিনী,
পড়িল জীবন মাঝে যেন পাগলিনী।।

এই অধ্যায়ে কর্ম্মবন্ধন এবং পুনর্জন্মের হস্ত হইতে মুক্ত হইবার এক সহজ উপায় বর্ণিত আছে। কৃষ্ণ বলিলেন, “হে অর্জ্জুন, আমার এই স্বেচ্ছাকৃত জন্ম এবং ধর্ম্মপালন ও অলৌকিক কর্ম্ম যিনি প্রকৃতরূপে জানিতে পারেন, তাঁহাকে দেহ পরিত্যাগ করিয়া আর পুনর্ব্বার জন্ম গ্রহণ করিতে হয় না। তিনি আমাকে প্রাপ্ত হন।” (৪অ–৯)। “কর্ম্ম আমাকে স্পর্শ করিতে পারে না, কর্ম্মফলেও আমার স্পৃহা নাই, যে ব্যক্তি আমারে এইরূপে অবগত হইতে পারেন, তাঁহাকে কর্ম্মবন্ধনে বদ্ধ হইতে হয় না।” (৪অ–১৪)। এই কথাগুলি সত্য হইলে মোক্ষলাভের জন্য কাহাকেও ভাবিতে হইবে না।
কর্ম্ম শব্দ গীতায় পুনঃ পুনঃ ব্যবহৃত হইয়াছ, অথচ তাহার অর্থ কোন স্থানে পরিষ্কার রূপে বিবৃত নাই। শ্রীধরস্বামী বলেন, কর্ম্ম–যজ্ঞাদি, সন্ধ্যা-উপাসনাদি, নিত্যকর্ম্ম এবং শ্রাদ্ধাদি নৈমিত্তিক ক্রিয়া। একাদশ শ্লোকে যদুনন্দন স্বয়ং কর্ম্মতত্ত্বের মীমাংসায় প্রবৃত্ত হইয়া বলিলেন, “গহনা কর্ম্মণোগতিঃ,” “কর্ম্মের গতি দুরবগাহ এবং দুর্জ্ঞেয়।” ইহলোকে কর্ম্ম এবং অকর্ম্ম বিষয়ে বিবেকীগণও মোহিত হইয়া আছেন। কিন্তু তোমাকে কর্ম্ম বিষয়ে এমন এক সুন্দর উপদেশ দিতে ইচ্ছা করি, যাহা অবগত হইয়া তুমি অনায়াসে সংসারবন্ধন হইতে মুক্ত হইতে পারিবে।” (৪অ-১৬)। এইরূপ গৌর চন্দ্রিকা শ্রবণ করিয়া, অনেকে হয় ত ইহা ভাবিতে পারেন যে, শ্রীকৃষ্ণ এইবার বুঝি কর্ম্মের একটা চূড়ান্ত মীমাংসা করিয়া দিবেন। “তিনি বলিলেন, কর্ম্ম অর্থাৎ বিহিত কর্ম্ম, অকর্ম্ম অর্থাৎ বিহিত কর্ম্মের অকরণ এবং বিকর্ম্ম অর্থাৎ নিষিদ্ধ কর্ম্ম, এই ত্রিবিধ কর্ম্মের সকলেরই উত্তম রূপে জানা উচিত। যিনি কর্ম্মে অকর্ম্ম দর্শন করেন, এবং অকর্ম্মে কর্ম্ম দর্শন করেন, সমস্ত কর্ম্ম করিলেও তিনি মনুষ্য মধ্যে যোগী।” (৪অ–১৭-১৮)। শ্রীধর স্বামীর টীকায় উক্ত শ্লোকের এক সুন্দর ব্যাখ্যা আছে। তিনি বলেন, “কর্ম্ম করিলেই কর্ম্মবন্ধনে পড়িতে হয়, অর্থাৎ পুনর্জ্জন্ম হয়। কেবল মাত্র ঈশ্বরোদ্দেশ্যে যে সকল কর্ম্ম করা যায়, তাহাদের বন্ধন শক্তি নাই। তদ্দ্বারা জীব মুক্ত হইয়া যায়; সুতরাং বন্ধন শক্তির অভাবে সেই সকল কর্ম্ম অকর্ম্ম, অর্থাৎ কর্ম্মই নয়। আর বিহিত কর্ম্ম না করিলে প্রত্যবায় হয়, সুতরাং সংসারে বদ্ধ হইতে হয়। অতএব বিহিত কর্ম্মের অকরণেও কর্ম্মের ন্যায় বন্ধন শক্তি আছে; সুতরাং অকর্ম্মও কর্ম্ম।” মানবের পুনর্জন্মের প্রমাণ কিছুই নাই। “আত্মা অবিনশ্বর” স্বীকার করিলেও তাহাকে পুনরায় দেহান্তর পরিগ্রহপূর্ব্বক ইহ জগতে বিচরণ করিতে হইবে, তাহার প্রমাণ কি? কেহ কেহ ভাবেন, পুনর্জন্ম মানিয়া লইলে ইহ জন্মের সুখ সুঃখাদির কারণ বোঝা যায়। কেহ বা ধনী, কেহ বা দরিদ্র, কেহ বা সুখী, কেহ বা ঘোর দুঃখ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া জন্ম গ্রহণ করেন। সেই সকল তাঁহাদের পূর্ব্বজন্মকৃত কর্ম্মের ফল। কিন্তু ইহাতেই কি সুখ দুঃখের কারণ বোঝা যায়? মনে করুন, পূর্ব্বজন্মকৃত কর্ম্মের ফল আমি এজন্মে ভোগ করিতেছি। পূর্ব্বার্জিত কর্ম্মফলে বাধ্য হইয়া এ জীবএন্র সমস্ত কার্য্য করিতেছি, অর্থাৎ আমার কার্য্য সকল আমার এ জন্মের স্বাধীন চেষ্টা সম্ভূত নয়। এ জন্মেই হউক, বা আর দুই এক জন্মেই হউক, পূর্ব্বকৃত কর্ম্মের ফল ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়া যাইবে; তখন তাহার পরজন্মে আবার স্বাধীন ভাবে কার্য্য করতে হইবে। সুতরাং কর্ম্মফল মানিলেও কোন না কোন জন্মে স্বাধীন ভাবে কার্য্য করিতে হইবে মানিতে হইবে। আমাদের বর্ত্তমান জন্মও সেই জন্ম হইতে পারে; অর্থাৎ এ জন্মের সুখ দুঃখাদির সহিত পূর্ব্বজন্মকৃত কর্ম্মের কোনো সংশ্রব না থাকিতে পারে। অতএব “কর্ম্মফল” দ্বারা সকল সুখ দুঃখ বোঝান যায় না।

আর যদি পুনর্জন্মই থাকে, তবে নিষ্কাম ভাবে কর্ম করিলে, জন্ম হইবে না, কিন্তু সকাম ভাবে সেই কর্ম্ম করিলেই হইবে, ইহার যুক্তি কি?
শ্রীকৃষ্ণ, কর্ম্ম, অকর্ম্ম এবং বিকর্ম্মের তত্ত্ব কীর্ত্তন করিলেন বটে; কিন্তু তাহাতে আমাদের জ্ঞান লাভ কিছু মাত্র হইল না। সৎ কর্ম্মের অনুষ্ঠান এবং অসৎ কর্ম্ম পরিত্যাগ করা উচিত, সকলেই তাহা জানে। কিন্তু কোনটী সৎ কর্ম্ম এবং অসৎ কর্ম্মই বা কোন গুলি, তাহাই জানিবার জন্যে লোকে ধর্মশাস্ত্র পাঠ করে। গীতা পাঠে সে অভিলাষ পূর্ণ হইবার উপায় নাই। তবে স্থল বিশেষে (১৮ অধ্যায়) পাঠ করিলে এই রূপ বোধ হয় যে, মানব-ধর্ম্ম শাস্ত্রে, যে জাতির যে কর্ত্তব্য লিখিত আছে, তাহাই পালন করা গীতার মতে সকল লোকের উচিত। অর্থাৎ স্বদেশ রক্ষার্থ যুদ্ধ করা ব্রাহ্মণের পক্ষে অবিহিত; ক্ষত্রিয় তনয়ের বাণিজ্যাদিতে নিযুক্ত হওয়া, বা শূদ্রের বিদ্যা চর্চা করা অপেক্ষা, অধর্ম্মকর কার্য্য আর নাই। ইহাই গীতোপনিষদের শ্রেষ্ঠ উপদেশ!!!

১৮ শ্লোকের ব্যাখ্যা হইতে পণ্ডিতবর শ্রী প্রসন্নকুমার বিদ্যারত্ন শুষ্ক মাংসাদি নিষিদ্ধ দ্রব্যের আহারের এক উত্তম ব্যবস্থা বাহির করিয়া দিয়াছেন। তিনি বলেন,–“জ্ঞানী লোকে বিবেক জ্ঞান দ্বারা সকল কর্ম্মকেই আত্মার কর্ম্ম নয় বলিয়া জানেন। কর্ম্ম সকল দেহেন্দ্রিয়াদির ব্যাপার মাত্র। তাঁহাদের এইরূপ ধারণা, সুতরাং যদৃচ্ছা প্রাপ্ত কলঞ্জাদির (শুষ্ক মাংসাদির) ভক্ষণ তাহাদের দোষের জন্য হয় না। কিন্তু অজ্ঞ ব্যক্তিগণের ইহা দোষের জন্য হয়, কারণ তাহারা উহা নিজের কার্য্য বলিয়া ভাবেন।” শ্রীধর স্বামীরও এই মত। এখন গীতোক্ত এই মহোপদেশটী স্মরণ করিয়া জ্ঞানী হিন্দু মহোদয়বর্গ অম্লান বদনে ইংরাজের হোটেলে আহার করিতে পারেন। আর জ্ঞানী হওয়াও কিছু দুরূহ নয়। কেবল ভাবা যে, “মৃৎকৃত কর্ম্মের আমি কর্ত্তা নহি।” অজ্ঞানগণের বুদ্ধি কত স্থূল। তাহাদের হস্ত আহার্য্য দ্রব্য বদন মধ্যে নিক্ষেপ করে। দন্তচর্ব্বিত করিয়া পাকস্থলীতে প্রেরণ করে; তথায় হজম হইয়া যায়। অথচ তাহারা ‘আমরা আহার করিয়াছি’ ভাবিয়া অহঙ্কারে স্ফীত হয়। ঈদৃশ অহঙ্কারবিমূঢ় দুর্ব্বৃত্তগণের কর্ম্মবন্ধের বিষম নিগড়ই উপযুক্ত শাস্তি।

সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, সনাতন ধর্ম্মের পুনরুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু সমাজে উল্লিখিত জ্ঞানীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে। নচেৎ বিলাতি হোটেলের দেশী গ্রাহক বাড়িতে কেন? এবং হিন্দু পল্লির মধ্যস্থিত প্রহ্লাদ চৈতন্যের হরিধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত রঙ্গভূমির সম্মুখে মিঁয়া সাহেবেরা ক্যারি ক্যাটলেটের দোকান করিয়া বিলক্ষণ দুদশ টাকা রোজগার করিতে সক্ষম হইবে কি প্রকারে?

অতঃপর কৃষ্ণ বলিলেন,–“হে অর্জ্জুন, যজ্ঞার্থ আচরিত কর্ম্ম সকলের বন্ধন শক্তি নাই। তৎ সমুদায় সহজেই বিলয় প্রাপ্ত হয়।” কেননা যজ্ঞের সকল অংশই ব্রহ্ম; যথা :–“সক্‌স্রবাদি (যদ্দারা ঘৃতাদি অগ্নিতে অর্পন করা হয়) পাত্র সকল ব্রহ্ম, হবণীয় ঘৃতাদি ব্রহ্ম, অগ্নি ব্রহ্ম, এবং যিনি হোম করে, তিনিও ব্রহ্ম।” (৪অ-২৪)। যজ্ঞের লুঢ্যাদি মিষ্টান্ন সকল মূর্ত্তিমান ব্রহ্ম কি না, গীতোপনিষদে লিখিত নাই; কিন্তু “যজ্ঞবশিষ্ট অমৃত তুল্য অন্ন ভোজন করিয়া যে অনায়াসে ব্রহ্ম-পদ লাভ করা যায়,” স্বয়ং ভগবানই তাহা স্বীকার করিয়াছেন। অতএব যিনি গীতার উপাসক হইয়া মধ্যে মধ্যে এইরূপ “ব্রহ্ম যজ্ঞের অনুষ্ঠান দ্বারা বন্ধুবান্ধবগণকে পরিতোষের” সহিত ভোজন না করান, তাঁহার ইহ লোকে সুখ নাই; এবং পরকালে অনন্ত দুঃখ ভোগ করিয়ে হয়।” নায়ং লোকোহস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোন্যঃ কুরুসত্তম।

এই সকল জ্ঞানপ্রদ উপদেশাবলী শ্রবণ করিয়াও কুরুসত্তম সব্যসাচীর অজ্ঞানান্ধকার কিঞ্চিন্মাত্রও দূরীভূত হইল না, তখন ভগবান কেশি নিসূদন হরি, কাতরস্বরে বলিলেন, মহামতি পার্থ, আমি বেশ বুঝিতে পারিয়াছি যে, তোমার জ্ঞানরাশি আজিও সম্যক প্রকারে পরিষ্ফুটিত হয় নাই। “প্রণিপাত, প্রশ্ন, এবং সেবা দ্বারা এখন কিছুকান ধরিয়া জ্ঞানার্জ্জন কর।” “জ্ঞানের উদয় হইলে আর তুমি বন্ধুবধজনিত মোহে অভিভূত হইবে না।” (৪অ–৩৫)। যেহেতু জ্ঞান দ্বারা পিতৃপিতামহিদিগকে আপনাতে অভিন্নভাবে দর্শন করিবে, এবং পরিশেষে আপনাকে আমাকে অভিন্নভাবে অবলোকন করিবে।” (৪অ–৩৫)। সুতরাং, তাহাদের হত্যা করিতে তোমার কিছুমাত্র সঙ্কোচ হইবে না। এইরূপ জ্ঞানকেই বোধ হয় চলিত ভাষায় টনটনে জ্ঞান বলে। উল্লিখিত অখণ্ডনীয় যুক্তি দ্বারা যুদ্ধের নির্দ্দোষতা পরিষ্কার রূপে সপ্রমাণ করিয়া কৃষ্ণ বলিলেন, হে ভরতর্ষভ, আর অধিক ভাবিবার আবশ্যক নাই; “জ্ঞানরূপ অসি দ্বারা হৃদয়স্থ সংশয়কে ছেদন করিয়া কর্ম্মযোগ অবলম্বন কর, এবং উপস্থিত যুদ্ধার্থে উত্থিত হও।” (৪অ–৪২)।

————–
(১) বৃন্দাবনের লীলার সময় কৃষ্ণের নিজের উপদেশটী স্মরণ রাখা উচিত ছিল।
(২) (৩) আর্য্য মিশন ইনিষ্টিটিউসন গীতার স্বধর্ম্ম এবং পর ধর্ম্ম শব্দদ্বয়ের অলীক অর্থ প্রচার করিয়া সাধারণকে প্রতারিত করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। স্বধর্ম=আত্মধর্ম্ম। পরধর্ম্ম=ইন্দ্রিয় ধর্ম্ম। বাচষ্পত্য, শব্দকল্পদ্রুম, প্রকৃতিবাদ প্রভৃতি অভিধানে, স্বধর্ম অর্থে স্বজাতি বিহিত আচার; এবং পর ধর্ম্ম=স্বোচিত বর্ণাশ্রম ধর্ম্মাদি ভিন্ন ধর্ম্মে। শঙ্কর মধুসূদন আদির টীকায় দেখা যায় :-যং বর্ণাশ্রমং প্রতি যো বিহিতঃ স তস্য স্বধর্ম্মঃ। উক্ত পুস্তকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়াদি বর্ণচতুষ্টয়েরও আজগুবী অর্থ লিখিত আছে। মিথ্যা কথা লেখা ভিন্ন কি গীতার সম্ভ্রম রক্ষার উপায় নাই?
(৪) আর্য্য মিশনের গীতায় “দুষ্কৃতাম” অর্থে “দুষ্কর্ম্মের” লেখা আছে। “দুষ্কৃতাম” শব্দের যথার্থ অর্থ “দুষ্টলোকদিগের।” দুষ্কৃতাম শব্দের অর্থ জানা নাই, অথচ শঙ্কর, শ্রীধরের অর্থ উল্টাইয়া দিয়া গীতার নূতন আধ্যাত্মিক অর্থ বাহির করিবার প্রয়াস।


তৃতীয় পরিচ্ছেদ

কখন বা কর্ম্মযোগের, কখন বা কর্ম্ম সন্ন্যাসের(১) প্রশংসা শুনিয়া অর্জ্জুন কিংকর্ত্তব্য বিমূঢ় হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে গোবিন্দ, কর্ম্মত্যাগ এবং কর্ম্মযোগের মধ্যে যাহা শ্রেয়স্কর, তাহাই আমাকে অবধারিত করিয়া বল। কৃষ্ণ বলেন,–কর্ম্মত্যাগ এবং কর্ম্মযোগ উভয়ই মুক্তির কারণ, কিন্তু তন্মধ্যে কর্ম্মযোগই শ্রেষ্ঠ। তয়োস্তু কর্ম্মসন্ন্যাসাৎ কর্ম্মযোগো বিশিষ্যতে। দীর্ঘজটা-শ্মশ্রুধারী, গঞ্জিকা সেবী, অলস কর্ম্মশূন্য সন্ন্যাসীগণের উপর গীতাকার বড়ই বিরক্ত। স্থানান্তরে তিনি বলিয়াছেন,–
অনাশ্রিত্য কর্ম্মফলং কার্য্যং কর্ম্ম করোতি সঃ।
স সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নি র্ন চাক্রিয়ঃ।।
“যিনি ফলে আকাঙ্খা না করিয়া কর্ত্তব্য কর্ম্ম করেন, তিনিই সন্ন্যাসী এবং তিনিই যোগী; কিন্তু যিনি, অগ্নি সাধ্য ইষ্ট (যজ্ঞাদি) ও পুর্ত্ত (পুষ্করিণী খননাদি) প্রভৃতি কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়াছেন, তিনি সন্ন্যাসীও নন, যোগীও নন।”
গৈরিক বসনধারী, পরভোগ্যোপজীবী জ্ঞানানন্দ স্বামী, প্রেমানন্দ স্বামী, বগলানন্দ স্বামী প্রভৃতি ঊণবিংশতি শতাব্দীর ধূমপায়ী পরম হংসগণ, এবং তাহাদের ভক্ত এবং প্রতিপালক হিন্দু মহোদয়গণকে আমরা গীতার এই শ্লোকটী স্মরণ রাখিতে অনুরোধ করি।

“জ্ঞানের ন্যায় পবিত্র বস্ত ইহ জগতে আর নাই।” “জ্ঞানাগ্নি সমস্ত কর্ম্মকে ভস্মসাৎ করিয়া ফেলে।” সেই জ্ঞান লাভের উপায় কি? কৃষ্ণ বলিলেন,–কর্ম্ম দ্বারা চিত্ত শুদ্ধ হয় এবং চিত্ত শুদ্ধ হইলে, জ্ঞান আপনা হইতে আসিয়া পড়ে। যুদ্ধ একটা কর্ম্ম, আর অর্জ্জুনও ক্ষত্রিয়, সুতরাং উক্ত বিহিত কর্ম্মের অনুষ্ঠান দ্বারা চিত্ত শুদ্ধ করিলেই, তিনি জ্ঞানবান্‌ এবং কর্ম্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইতে পারিবেন। পিতা, পিতামহ, শ্বশুর, শ্যালক, গুরু প্রভৃতিকে হনন কর্ম্ম দ্বারা সহজেই যে চিত্ত শুদ্ধ হয়, এবং তদ্দ্বারা সাংখ্য অর্থাৎ জ্ঞাননিষ্ঠগণের প্রাপ্য মোক্ষ নামক স্থানও লাভ করা যায়, বীরশ্রেষ্ঠ সব্যসাচী তাহা জানিতেন না। সুতরাং সাক্ষাৎ ভগবানের আশ্বাস বাক্যেও তাহার সংশয় ছিন্ন না হওয়ায় কৃষ্ণ পুনরায় বলিলেন,–“কর্ম্মের বন্ধন শক্তি আছে সত্য,” কিন্তু “বিশুদ্ধ চিত্ত আত্মদর্শী জ্ঞানী ব্যক্তি, সংসার যাত্রা নির্ব্বাহার্থ কর্ম্মানুষ্ঠান করিলেও তাহাতে লিপ্ত হয় না। তত্ত্ববিদ্‌ ব্যক্তি, দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শন, ঘ্রাণ, ভোজন, শয়ন, মল মূত্রাদি ত্যাগ করিয়াও ‘আমি কিছুই করি নাই’ মনে করেন। তিনি ভাবেন, ইন্দ্রিয়গণ স্ব স্ব বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতেছে। কর্ম্ম সকল ব্রহ্মে সমর্পণ করিয়া ফলাভিলাষ পরিত্যাগ পূর্ব্বক যিনি কর্ম্ম করেন, তিনি বন্ধন হেতুভূত পাপ পুণ্যাত্মক কোন কর্ম্মেই লিপ্ত হয় না।” (৫ম–৭-১০)। অষ্টাদশ অধ্যায়ে এই তত্ত্বটী বিশদরূপে বিবৃত আছে। “শরীর, বাক্য বা মন দ্বারা আমরা যে সকল কর্ম্ম করি, আমাদের আত্মা অর্থাৎ আমরা তাহার কর্ত্তা নহি।” “অধিষ্ঠান (অর্থাৎ শরীর) অহঙ্কার, ইন্দ্রিয়গণ, প্রাণাপানাদি বায়ুর ব্যাপার, এবং দৈব অর্থাৎ চক্ষুরাদির অনুগ্রাহক আদিত্যাদি দেবতা; এই পাঁচটীই আমাদের সকল কর্ম্মের কর্ত্তা। দুর্ম্মতিগণই নিরুপাধি আত্মার কর্ত্তৃত্ব নিরীক্ষণ করেন। যিনি আপনারে কর্ত্তা বলিয়া মনে না করেন, যাঁহার বুদ্ধি কার্য্যে আসক্ত হয় না, তিনি লোক সমুদায় বিনষ্ট করিলেও বিনাশ করেন না, এবং তাঁহারে বিনাশজনিত ফল ভোগও করিতে হয় না।” (১৮অ–১৩-১৭) (২)

আমাদের বুদ্ধি আজিও অসংস্কৃতাবস্থায় আছে; তদ্ধেতু ‘আমাদের কর্ম্মের জন্য আমরা বা আমাদের আত্মা ঈশ্বরের নিকট দায়ী’, এই ঘোর অহঙ্কার ভাব আমাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল রহিয়াছে। কিন্তু হে ‘তত্ত্বজ্ঞানী’ মহাপুরুষ, তুমিই ধন্য। কেননা, তুমি আহার, বিহার, শয়ন ও ভ্রমণ করিয়াও অম্লানবদনে বলিতে পার, ‘আমি করি নাই’। যাহা তুমি কর, তাহার কর্ত্তৃত্ব তুমি স্বীকার কর না, সুতরাং তোমার কর্ম্মের বন্ধন শক্তি নাই; তোমার পুনর্জন্ম কোথায়? তুমি জ্ঞানী, সুতরাং পাপপুণ্যের পার্থক্য তুমি দর্শন কর না। ব্রহ্মে কর্ম্মফল সমর্পণ করিয়া। পাপ পুণ্যাত্মক যে কোন কর্ম্মই কর না কেন। পদ্মপত্রে জলের ন্যায়, পাপ তোমাতে লিপ্ত হয় না। তুমি স্বহস্তে জগতের সমস্ত লোক বিনাশ করিয়া বিনাশ জনিত ফল ভোগ কর না। তোমার ন্যায় ভাগ্যবান কে? কিন্তু ভাই তত্ত্বজ্ঞানী, সময় বড় খারাপ পড়িয়াছে; এখন তোমার কিঞ্চিত সাবধানে চলা উচিত। খ্রীষ্টীয়ানদের আদালতে তোমার তত্ত্ব-জ্ঞানের সমুচিত সম্মান রক্ষা হইবার সম্ভাবনা নাই। সমস্ত লোকের কথা দূরে থাকুক, একটী বালকের প্রাণ নাশ করিলেই ফাঁসি কাষ্ঠে চড়াইয়া দেবে। তখন শ্রীধর স্বামীর টীকা পড়াইয়াই শুনাও, আর শ্রীপ্রসন্ন কুমার বিদ্যারত্ন স্বয়ং যাইয়াই বলুন–“আত্মার কখন বিনাশ নাই, আত্মাকে কেহ কখন বিনাশ করিতে পারে না, অজ্ঞানী ব্যক্তি মনে করেন হনন করিয়াছেন, জ্ঞানী ব্যক্তি দেখেন যে, কেহ হত হয় নাই,” বিবেক জ্ঞানবিহীন ম্লেচ্ছ বিচারপতি কি তাঁহাদের কথায় কর্ণপাত করিবেন? (৩)

শ্রুতিতে লিখিত আছে,–ঈশ্বর যাহাকে ইহলোকে উন্নীত করিতে ইচ্ছা করেন, তাহাকে সৎকর্ম্ম করান, এবং যাহাকে ইহলোক হইতে অধোনীত করিতে ইচ্ছা করেন, তাহাকে অসৎকর্ম্ম করান,” ইহা শুনিয়া কেহ হয় ত ভাবিতে পারেন, পুরুষ, পরমেশ্বর কর্ত্তৃক শুভাশুভ ফলপ্রদ কর্ম্মে প্রযুজ্যমান হন, সুতরাং তাহার স্বাধীনতা নাই। এই আশঙ্কা নিরাকরণার্থ কৃষ্ণ বলিলেন, “ঈশ্বর জীব লোকের কর্ত্তত্ব সৃষ্টি করেন নাই, কর্ম্ম সমূহও সৃষ্টি করেন নাই। স্বভাব অর্থাৎ মায়াই কর্ত্তৃত্বাদি রূপে প্রবৃত্ত হয়।” (৫ অ–১৪)। কৃষ্ণের ভক্তবৃন্দ কিন্তু তাঁহার মস্তকে সমস্ত ভার অর্পণ করিয়া বলিয়া থাকেন,–
ত্বয়া হৃষীকেশ হৃদি স্থিতেন।
যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করোমি।।
যাদব শ্রেষ্ট পুনরায় বলিলেন,–ঈশ্বর কাহার পাপ বা পুন্য গ্রহণ করেন না। নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং নচৈবং সুকৃতং বিভুঃ। অথচ গীতায়, আমাদের পাপ পুণ্য সমুদায় কর্ম্ম, ঈশ্বরকে অর্পণ করিতে পুনঃ পুনঃ আদেশ আছে।
যৎকরোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যত্তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম॥ (৯ অ–২)
“হে কৌন্তেয়, যাহা ভক্ষণ কর, যাহা হোম, যে বস্তু দান ও যেরূপ তপঃ সাধন করিয়া থাক; তৎসমুদায় আমারে সমর্পণ করিও।”
এই অধ্যায়ে কতকগুলি সুন্দর উপদেশ পূর্ণ শ্লোক আছে–
তদ্বুদ্ধয় স্তনাত্মান স্তন্নিষ্ঠাস্তৎ পরায়ণাঃ।
গচ্ছন্ত্য পুনরাবৃত্তিং জ্ঞাননির্ধূতকল্মষাঃ।।(৫ অ–১৭)
ঈশ্বরেই যাঁহাদিগের সংশয়রহিত বুদ্ধি, ঈশ্বরেই যাঁহাদিগের পরম আশ্রয়, তাঁহারা জ্ঞান দ্বারা নিষ্পাপ হইয়া মোক্ষ লাভ করেন।
শক্নোতীহৈব যঃ সোঢুং প্রাক্‌ শরীর বিমোক্ষণাৎ।
কাম ক্রোধোদ্ভবং বেগং স যুক্তঃ স সুখী নরঃ।।(৫ অ–২৩)
যিনি ইহ লোকে শরীর পরিত্যাগের পূর্ব্বে কাম এবং ক্রোধের বেগ সহ্য করিতে পারেন, তিনিই যোগী ও তিনিই সুখী।
লভন্তেঃ ব্রহ্ম নির্বাণমৃষয়ঃ ক্ষীণ কল্মষাঃ।
ছিন্ন দ্বৈধা যতাত্মানঃ সর্বভূতহিতে রতাঃ।।(৫ অ–২৫)
যাঁহারা পাপকে বিশাশ করিয়াছেন, সংশয়কে ছেদন করিয়াছেন, চিত্তকে বশীভূত করিয়াছেন, এবং সকলের হিতানুষ্ঠানে ব্যাপৃত আছেন, সেই তত্ত্বদর্শীগণই মোক্ষ লাভ করিবেন।
বিদ্যা বিনয় সম্পন্নে ব্রহ্মণে গবিহস্তিনি।
শুন চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিন।।(৫ অ–১৮)
পণ্ডিতগণ, বিদ্যা বিনয় সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গো, হস্তি, কুক্কুর ও চণ্ডালকে তুল্যরূপ দেখেন।
সুহৃন্মিত্রার্যুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু।
সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধির্বিশিষ্যতে।।(৬ অ–৯)
সুহৃৎ, মিত্র, অরি, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য, বন্ধু, সাধু ও অসাধু এই সকলের প্রতিই যাঁহার সমান জ্ঞান, তিনিই সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

ষষ্ঠ অধ্যায়ের নাম, ধ্যান যোগ। কি প্রণালী অবলম্বন করিলে অনায়াসে যোগাভ্যাস করা যায়, এবং কিরূপেই বা প্রশান্তত্মা সংযতচিত্ত ব্রহ্মচারী অন্তঃকরণকে সমাহিত করিয়া মোক্ষরূপ পরম শান্তি লাভ করিতে পারেন, তাহার সদুপায় এই অধ্যায়ে বর্ণিত আছে। “যোগী ব্যক্তি একাকী নির্জ্জনে নিরন্তর অবস্থান এবং আশা ও পরিগ্রহ পরিত্যাগপূর্ব্বক, অন্তঃকরণ ও দেহ বশীভূত করিয়া চিত্তকে সমাধান করিবেন। পবিত্র স্থানে, ক্রমান্বয়ে কুশ, ব্যাঘ্রাদি চর্ম্ম ও বস্ত্র দ্বারা প্রস্তুত অনতি উচ্চ, অনতি নীচ স্থিরতর আসন সংস্থাপন করিয়া তাহাতে উপবেশন করতঃ যোগাভ্যাস করিবেন। শরীর, মস্তক, গ্রীবা সরল ভাবে ধারণ এবং দৃষ্টিকে অন্যান্য দিক হইতে আকর্ষণ পূর্ব্বক স্বীয় নাসিকার অগ্রভাগে সন্নিবেশিত করিয়া যোগাভ্যাস করিবেন।”
যোগে আমাদের আদৌ বিশ্বাস নাই। বিজ্ঞান শাস্ত্র ইহার সমর্থন করে না। যোগশাস্ত্রোক্ত ক্রিয়া দ্বারা, আত্মার উন্নতি এবং অমানুষিক শক্তি লাভ হইতে পারে, তাহার কোনই প্রমাণ নাই। যোগ সম্বন্ধে আমাদের দেশের মুখোজ্জ্বলকারী শ্রী রমেশ চন্দ্র দত্ত C.I.E বলেন :–
“As a system of Philosophy, Yoga is valueless. Patanjali tried to blend the idea of the supreme Deity with the Philosophy of Kapil; but unfortunately he also mixed it up with much of the superstition and mystic practices of the age. In later times, the Philosophy of the Yoga is lost sight of, and the system has degenerated into cruel and indecent tantric rites, or into the impostures and superstition of the so-called Yogins of the present age.” এবং যোগ শাস্ত্র সম্ভূত তন্ত্রশাস্ত্র এবং তদুক্ত ক্রিয়া সম্বন্ধে বলেন :–
“Ignorance is credulous and feebleness bankers after power, and when a superstitious ignorance and senile feebleness had reached the last stage of degeneracy, men sought by unwholesome practices and unholy-rites, to acquire that power, which Providence has rendered attainable only by a free, open and healthy exercise of our faculties, moral, intellectual, and physical. Tantric literature represents the diseased state of human mind.”
Monier Williams বলেন :–
Yoga is scarcely worthy of the name of a system of Philosophy. All those mortifications (i.e., those undergone by the gogins) are explicable by their fancied attainment of extraordinary sanctity and super-natural powers.
পণ্ডিতবর A. Barth, The religions of India নামক গ্রন্থে যোগ সম্বন্ধে বলেন :–
Conscientiously observed, they can only issue in folly and idiocy; and it is, in fact, under the image of a fool or an idiot, that the wise man is often delineated for us in the Purans.
Gough সাহেব বলেন :–
ভারতের আদিম নিবাসী অসভ্যগণের নিকট হইতে আর্য্যগণ যৌগিকক্রিয়া সকল শিক্ষা করেন :–“It was from the semi savage race, with which they were coalscing, which they were elebating, that they now adopted the practice of fixing the body and the limbs in status-like repose and inducing cataleptic rigidity and insensibility as a higher state than the normal state of human life–the practice known as Yoga–union, the ectacy, the melting away of the consciousness into a state of characterless indetermination. The process seem to be accompanied with intervals of morbid nervous and cerebral exaltations in which the self-torturer loses all distinction between percception and imagination and appears to himself and others to be invested with super-human powers. The practice of self-torture is alien to the cheerful spirit of Vedic Worshippers, aspiring to health and wealth and length of days.” (Philosophy of Upanishads.)
“Among lower races and high above their level morbid ecstasy brought on by medication, fasting, narcotics, excitement or disease, is a state common and held in honor among the very classes specially concerned with Mythic idealism.” (Taylor’s Primitive culture, Vol. I.)

গীতায় এবং পাতঞ্জলের যোগশাস্ত্রে যোগাভ্যাস করিবার যে সকল উপায় বর্ণিত আছে, তাহাতে জানা যায় যে, যোগ এবং এক্ষণকার Mesmerism, Hyprotism বা Spiritualism একই পদার্থ। যোগ কেবল ভারতবর্ষে নয়, অতি প্রাচীন কাল হইতে প্রায় সকল অসভ্য ও অর্দ্ধসভ্য জাতির মধ্যে প্রচলিত আছে। পারস্যের মেজাইগণ, এমন কি গ্রীক চর্চ্চ সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রীষ্টীয়ান পুরোহিতগণও যোগাভ্যাস করিতেন। বর্ত্তমান শতাব্দীতে এই যোগই Mesmerism, Animal Magnetism, Will power ইত্যাদি নামে অভিহিত হইয়া ইউরোপে দেখা দেয়। তথায় বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতগণ কর্ত্তৃক পরীক্ষিত হওয়ায়, যোগের ফল সম্বন্ধে আমাদের কোন সন্দেহ নাই।(৪) পুনঃ পুনঃ পরীক্ষা দ্বারা স্থির হইয়াছে যে, যদি কেহ একদৃষ্টে কোন পদার্থের প্রতি চাহিয়া থাকেন বা কোন বিষয় প্রগাঢ়রূপে ভাবিতে থাকেন, তবে তাঁহার মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের ব্যাঘাত জন্মে; এবং তদ্ধেতু তিনি কৃত্রিম নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়েন। ইহাই, Hypnotic sleep বা যোগের সমাধি অবস্থা। ক্লোরোফরম্‌ আঘ্রাণ বা গঞ্জিকা প্রভৃতি সেবন দ্বারাও উক্ত অজ্ঞান অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। পাতঞ্জল দর্শনশাস্ত্রের অনুবাদক, পণ্ডিতবর শ্রীকালীবর বেদান্তবাগীশ ইহা স্বীকার করিয়াছেন। তিনি অবররণিকায় লিখিয়াছেন যে,–“ডাক্তারেরা মিস্‌মরাইজ (Mesmerise) করিয়া, অর্থাৎ কৌশলে অথবা (Chloroform) ক্লোরোফরম্‌ আঘ্রাণ করাইয়া ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির অঙ্গাদিকর্ত্তন করিয়া থাকেন। পরন্তু তাঁহারাও জানেন না যে, আমরা রোগীকে যোগীর তুল্য করিয়া কার্য্য সমাধা করিতেছি।” Hypnotic sleep বা কৃত্রিম নিদ্রা এবং যোগ, একই পদার্থ। স্বাভাবিক নিদ্রার ন্যায় কৃত্রিম নিদ্রাতাবস্থায়ও স্বপ্ন দেখা যায়। উক্ত অবস্থায় যে সকল স্বপ্ন দেখা যায়, বা ইঙ্গিত দ্বারা মনোমধ্যে যে সকল ভাব উদিত করা যায়, তাহা সত্য ঘটনা বলিয়া দৃঢ় বিশ্বাস হয়। স্বপ্নে যেমন কোন নূতন বিষয় জানা যায় না, কেবল পূর্ব্ব স্মৃতির উদয় হয় মাত্র, সেই রূপ Hypnotic sleep বা যোগাবস্থায় কোন নূতন জ্ঞান লাভ করা যায় না। পূর্ব্বে যাহা জানা ছিল, কিম্বা ইঙ্গিত দ্বারা যে বিষয় জানান যায়, কেবল তাহাই বলিতে পারা যায়। বিশেষ পরীক্ষা দ্বারা স্থিত হইয়াছে যে, Clairvoyance বা অদৃশ্য পদার্থ দর্শন করা, Clairaudience অন্যের শ্রুতির অগোচর শব্দ শ্রবণ করা, Will power ইচ্ছা শক্তি, Animal Magnetism বা মানবের আকর্ষণীশক্তি, Spiritualism, প্রেতাত্মাকে আহ্বান ইত্যাদি বিশুদ্ধ জুয়াচুরি। কোন লোকের উক্ত ক্ষমতা সকল নাই। ১৮৩৭ সালে ফ্রান্স দেশে এবং ১৮৬০ সালে ইংলণ্ডে বিদ্বান মণ্ডলী ঘোষণা করেন যে, যদি কেহ চক্ষু বদ্ধ করিয়া পড়িতে পারেন, তবে তাঁহাকে ৫০০০ পাঁচ সহস্র মুদ্রা পারিতোষিক দেওয়া যাইবে। ইউরোপে তখন Hypnotismএর বিশেষ চর্চ্চা হইত, এবং Mediumগণ, অজ্ঞলোকদিগকে নানা প্রকার বুজ্‌রুকী দেখাইয়া প্রভূত অর্থ উপার্জ্জন করিত। পুরস্কারের লোভে অনেকগুলি বিখ্যাত Medium পরীক্ষার্থ উপস্থিত হইয়াছিল, কিন্তু কেহই উক্ত কর্ম্ম সম্পন্ন করিয়া পুরস্কার লাভে সক্ষম হয় নাই।

একটী বিষয় বিবেচনা করিলে যোগের অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে সকল ভ্রান্তি দূর হইতে পারে। যোগ দ্বারা আমরা কোন্‌ তত্ত্ব জানিতে পারিয়াছি? বিজ্ঞানানুশীলন দ্বারা মানব সমাজের প্রভূত উপকার হইয়াছে। কিন্তু যোগ আমাদের কোন্‌ উপকারে আসিয়াছে? কলিকাতায় আজ কাল অনেক যোগী দেখিতে পাওয়া যায়, তাঁহারা গোপনে গোপনে ভ্রান্ত লোককে নানা বুজ্‌রুকী দেখাইয়া আপনাদের অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় দেন। ভাল, তাঁহারা এরূপ কার্য্য না করিয়া প্রাচীন ভারতের প্রকৃত ইতিহাস। কিম্বা যে সকল মহামূল্য সংস্কৃত গ্রন্থ লুপ্ত হইয়াছে; যোগবলে সেই সকল লুপ্তরত্নের উদ্ধার করিয়া ভারতের গৌরব বৃদ্ধি এবং জনসমাজের প্রভূত উপকার সাধন করিলে ত হয়। কত শত হিন্দু সন্তান দুশ্চিকিৎস্য রোগে আক্রান্ত হইয়া ম্লেচ্ছ-চিকিৎসক-প্রণীত জাতি ধর্ম্ম বিনাশক সুরা সংশ্লিষ্ট ঔষধাদি দ্বারা প্রাণ রক্ষা করিতেছেন। উক্ত রোগ সমূহের শাস্ত্রসম্মত অব্যর্থ ঔষধ বাহির করিলে ত কত উপকার হয়! অনেক যোগী বিদ্যালয় স্থাপন, ব্যবসায় অবলম্বন এবং শিষ্যবর্গের মস্তকে পদধূলি প্রদান করিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করেন, অথচ ঐরূপ তাঁহারা প্রকৃত হিতকর কর্ম্মে প্রবৃত্ত হন না। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, যোগীগণের জুয়াচুরি শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিমাণে কমিয়া আসিতেছে। মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ ৩০ বৎসর পূর্ব্বে বলিয়া গিয়াছেন, “পূর্ব্বে এ সকল অদৃষ্টচর ব্যাপারের (যৌগিক ক্রিয়া) যে রকম প্রাদুর্ভাব ছিল, এখন তাহার আধ্‌ গুণও নাই। আমরা সহরে কদিন কটা অবধূত দেখিয়ে পাই। ক্রমে হিন্দু ধর্ম্মের সঙ্গে সঙ্গে এ সকল জুয়াচুরীরও লাঘব হোয়ে আস্‌চে; ক্রেতা ও লাভ ভিন্ন কোন ব্যবসায়ই স্থায়ী হয় না। উৎসাহ দাতার বিহনে এ সকল ধর্ম্মানুষঙ্গিক প্রবঞ্চনা উঠিয়া যাইবে।” (হূতোম পেঁচার নক্সা)। “কিন্তু কলিকাতা সহরের প্রসব ক্ষমতা এত অধিক” যে এস অকল জুয়াচোরের সংখ্যা শীঘ্র কমিবে বলিয়া বোধ হয় না। কেহ কেহ হয় তো বলিতে পারেন যে, যোগীগণের অসাধারণ ক্ষমতার পরিচায়ক দুই একটী সত্য ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ দেখিতে পাওয়া যায়। রনজীৎ সিংহের হরিদাস যোগী ৪০ দিন অনাহারে মৃত্তিকাভ্যন্তরে বাস করিয়াছিলেন। আহার বন্ধ করিবা মাত্র প্রাণীগণ মারা যায় না। অনাহারে কুকুর প্রভৃতি ইতর জন্তুগণকেও প্রায় ৩০ দিন পর্য্যন্ত জীবন ধারণ করিতে দেখা যায়। (Kirk’s Physiology)(৫) সংবাদ পত্রে প্রকাশ যে, একজন জৈন পুরোহিত অনেক দিন অনাহায়রে কাটাইতে পারেন। যোগের একজন প্রধান ভক্ত ডাক্তার নবীন চন্দ্র পাল বলেন যে, যোগীগণ বায়ুভুক্‌ (Hybernating) প্রাণীগণের অনুকরণ করিয়া বহুদিন অনাহারে থাকিতে সক্ষম হয়।
সর্প বা ভেক বৃত্তি অবলম্বন করাই বুঝি যোগের চরম উদ্দেশ্য!!

নিরীশ্বর সাংখ্যদর্শন দেশে নাস্তিকতার স্রোত বৃদ্ধি করিতেছে দেখিয়া, ঈশ্বরে ভক্তি ও বিশ্বাস স্থাপন করিবার জন্য মহর্ষি পাতঞ্জল যোগশাস্ত্র প্রণয়ন করেন। কিন্তু আমরা তাহার উত্তমাংশটুকু পরিত্যাগ করিয়া অধম অংশ গ্রহণ করিয়াছি। Chamber’s Encyclopediaর “যোগ” প্রবন্ধলেখক বলেন,–But the great power it (Yoga Philosophy) has at all periods excercised on the Hindu Mind is less derived from its philosophycal sepculations or its moral injunctions, than from the wonderful effects which Yoga practices are supposed to produce.

যোগানুশীলন দ্বারা মস্তিষ্কের পীড়া জন্মে, ইহা আমরা যোগ শিক্ষার্থীগণকে স্মরণ রাখিতে অনুরোধ করি।

অতঃপর কৃষ্ণ বলিলেন,–অতিভোজনশীল বা একান্ত অনাহারী ব্যক্তির সমাধি হয় না (৬ অ–১৪)। কিন্তু যোগীশ্রেষ্ঠ বুদ্ধদেব অনাহারে বহুবৎসর তপস্যা করিয়া সমাধিলাভ করেন। মধুসূদন ভোজনের কিঞ্চিত পক্ষপাতী ছিলেন। “যাহারা উপবাসাদি দ্বারা শরীরস্থ ভূতগণকে এবং আত্মাকে ক্লেশিত করিয়া তপস্য করেন।” তাঁহাদিগকে তিনি “ক্রূর স্বভাবাপন্ন লোক বলিয়া নিন্দা করেন।” (১৭ অ–৬)। সমাধিস্থ হইবার উপায় সকল শ্রবণ করিয়া অর্জ্জুন বুঝিতে পারিলেন, যোগটা বড় সহজ ব্যাপার নয়।
তজ্জন্য তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,–“যে ব্যক্তি প্রথমে যোগে প্রবৃত্ত হইয়া পরে যত্নহীন হইয়া যোগভ্রষ্টচেতা হয়, সে যোগ সিদ্ধি প্রাপ্ত না হইয়া কি অবস্থা প্রাপ্ত হয়? সে কি যোগ ও কর্ম্ম (মোক্ষ ও স্বর্গ) উভয় হইতে ভ্রষ্ট হয়? কৃষ্ণ দেখিলেন, তাঁহার যোগটা যেরূপ গুরুতর ব্যাপার, কেবল ব্রহ্ম নির্ব্বাণের আশায় কেহই তাহাতে প্রবৃত্ত হইবে না, কিঞ্চিৎ ঐহিত সুখেরও প্রলোভন চাই। তজ্জন্য তিনি বলিলেন, “যোগ ভ্রষ্ট ব্যক্তি (অশ্বমেধাদি) পুণ্যকারীদিগের প্রাপ্য লোকে বহুবৎসর অবস্থান করিয়া পরে সদাচার ধন সম্পন্ন লোকের গৃহে জন্ম গ্রহণ করেন।” (৬অ–৪১)।

অবশেষে বাসুদেব বলিলেন, “যোগী তপস্বী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, এবং কর্ম্মিগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; কিন্তু হে পার্থ, যে ব্যক্তি আমাতে অন্তঃকরণ সমর্পণ করিয়া শ্রদ্ধা পূর্ব্বক আমারে ভজনা করেন, তিনি আমার মতে সকল যোগী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম।”

যদি ব্রহ্মোপাসক যোগী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন,–যদি কেবল মাত্র ঈশ্বরের উপাসনা যোগাপেক্ষা অধিকতর ফলপ্রদ হয়, তবে কষ্ট সাধ্য পীড়াদায়ক এবং বুদ্ধিভ্রংশকারী যোগাভ্যাসের আবশ্যক কি?

———-
(১) জ্ঞানাগ্নি দগ্ধ কৰ্ম্মাণং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ। জ্ঞানাগ্নি সর্ব্বকর্ম্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা, ইত্যাদি। জ্ঞানলাভ হইলে হিতাহিত বিচারশক্তি এবং কর্ত্তব্য কর্ম্ম করণেচ্ছা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, ইহাই লোকে জানে; কিন্তু গীতার গান এমনই পদার্থ যে, তাহা প্রাপ্ত হইলে কর্ত্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠান করা আবশ্যক হয় না, ভালমন্দ বিচার না করিয়া যে কর্ম্ম করিতে পারা যায়; অর্থাৎ অন্যে যাহাকে বুদ্ধিভ্রংশাবস্থা বলে, তাহাই গীতার জ্ঞানের চরমসীমা।
(২) সকল ধর্ম্মেই নিষ্কাম ভাবে কর্ম্ম করিতে উপদেশ দেয়। কিন্তু গীতার নিষ্কাম ধর্ম্মটা কিছু নূতন রকমের। নিষ্কাম ভাবে মন্দ কর্ম্ম এমন কি নরহত্যা পর্য্যন্ত করিলেও পাপ হয় না। ধার্ম্মিক লোকের পক্ষে অসৎ কর্ম্মও দোষাবহ নয়, এ কথা কেবল হিন্দুধর্ম্মেই শোনা যায়। কাশীর এক পরমহংস এরূপ পবিত্র ছিলেন, যে তাঁহাকে মদ্‌ গোমাংসাদি প্রদান করিলেও ভক্ষণ করিতেন; তাহাতে নাকি তাঁহার পবিত্রতা নষ্ট হইত না। শ্রীমদ্‌ ভাগবতে লিখিত আছে যে, “তেজস্বীদিগেরা গর্হিতাচরণ করিলেও দোষ হয় না।” অগ্নি যেমন সকলই ভোজন করে; তেমনি সাধুগণের কোন বিষয়ে দোষ স্পর্শ সম্ভব না।” যেমন, শ্রীকৃষ্ণের ব্যাভিচারাদি পাপকর্ম্মের দ্বারাও কোন দোষ হয় নাই। (দশম স্কন্ধ ৩৩ অধ্যায়)। ইহাই আমাদের ধর্ম্মশাস্ত্রের উপদেশ!!! নৈতিক অবনতির চরম সীমায় উপনীত না হইলে কেহ এরূপ কথা বলিতে পারে না।
(৩) ইণ্ডিয়ান নেসনের সুযোগ্য সম্পাদক ১৮৯৫ সালের ২৫শে মার্চ্চ তারিখের পত্রে লেখেন যে,–Anglicised বাবুরাই ১৮ অধ্যায়ের ১৭ শ্লোকের দোষ দেখিয়া থাকেন। তিনি বলেন,–“A work done under Divine inspiration is certainly neither a good work nor a bad work. If Cromwell Slew a whole army, he neither claimed merit for victory, nor felt himself tainted by sin.” “আদেশ” বাদে আমাদের বিশ্বাস নাই। প্রত্যেক মানবই তৎকৃত কর্ম্মের জন্য দায়ী। Cromwell বা বাবু কেশন চন্দ্র সেন যখন বলেন, “আমরা ঈশ্বরের আদেশে Charles I-এর মস্তক ছেদন, বা অবিধিপূর্ব্বক রাজ-জামাতা করিয়াছি, উক্ত কর্ম্ম সকলের জন্য আমরা দায়ী নহি,” জগৎ কি তাঁহাদের কথায় বিশ্বাস করে?
(৪) Read “Animal Magnetism” by Binet and Fero “International Science” series and “Hypnotism” by Heidenhain, translated by Wooldridge.
(৫) মৃত্তিকাভ্যন্তর হইতে তুলিবার পর দেখা যায় যে–“His body (হরিদাস যোগীর) was dried like a stick, and the tongue, which had been turned back into the throat had become like a piece of horn”–Monier William’s Buddhism

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

সপ্তম অধ্যায়ে হৃষীকেশ “জ্ঞান এবং বিজ্ঞান” বিষয় বর্ণনা করেন। তাঁহার বিজ্ঞানটা কিন্তু মান্ধাতার আমলের; কিঞ্চিৎ জীর্ণসংস্কার না করিলে কলেজের ছাত্রগণের নিকট তাঁহার সম্মান রক্ষা দুরূহ হইবে। তিনি বলিলেন, আমার মায়ারূপা প্রভৃতি আট ভাগে বিভক্ত। যথা;–ক্ষিতি, অপ্‌, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, অহঙ্কার, মন এবং বুদ্ধি। ত্রয়োদশ অধ্যায়ে স্বয়ংই আবার এই প্রকৃতিকে চতুর্ব্বিংশতি ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। যথা;–পঞ্চমহাভূত, অহঙ্কার, বুদ্ধি, মূল প্রকৃতি, একাদশ ইন্দ্রিয় এবং পঞ্চতন্মাত্র। দুই বিভাগের সামঞ্জস্য করা বড় সহজ নয়। আর উপর উক্ত বিভাগ (Division) গুলি ইংরাজী ন্যায় (Logic) অনুসারে incomplete ebong overlaspping হইয়াছে কি না, তাহাও ভক্তবৃন্দের বিচার করা উচিত।

শ্রীকৃষ্ণ মনে করেন, তিনি জলের রস (রসোহহম্‌ অপ্‌সু)। জলের রস পদার্থটা কি, কোন ভাষ্যকারই তাহা ব্যাখ্যা করেন নাই। শ্রীকৃষ্ণ পুনরায় বলিলেন, চারি শ্রেণীর লোকে আমাকে আরাধনা করেন; আর্ত্ত, অর্থাৎ রোগাদিতে অভিভূত, আত্মজ্ঞানাভিলাষী, অর্থাভিলাষী এবং জ্ঞানী। ইহারা সকলে পুন্যবান (সুকৃতিনঃ) এবং মহৎ (উদারাঃ) অর্থাৎ মোক্ষ-প্রাপ্ত হইবার উপযুক্ত। ম্যালেরিয়া প্রপীড়িত দরিদ্র বঙ্গ দেশের পক্ষে ইহা একটী শুভসংবাদ বটে। কেননা পীড়াগ্রস্থ বা ধনাকাঙ্খীর মোক্ষ নিশ্চিত হইলে, মুক্তির ভাবনা কাহার?

এই অধ্যায়ে আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার কিছু বাড়াবাড়ি। কিন্তু কি উদ্দেশ্যে আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার অবতারণা করা হইয়াছে, তাহা আর্য্য মিশনের গীতার বিজ্ঞাপন পাঠা জানা যায়। “বহির্লক্ষ্যের অর্থ লইয়াই হিন্দুধর্ম্ম বিদ্বেষিগণ আমাদের ধর্ম্মের নিন্দা এবং তৎপ্রতি বিদ্রুপ ও উফাসাত্মক নানাবিধ কটূক্তি করিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন যে হিন্দু ধর্ম্ম কিছুই নহে, কেননা তন্ত্র, মহাভারত, রামায়ণ, চণ্ডী লইয়াই ত হিন্দুর ধর্মশাস্ত্র; কিন্তু এ সকল গ্রন্থের বিষয় গুলি কি? ১ম, তন্ত্র–ইহাতে মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা এবং মৈথুন এই গুলি সাধনের উপকরণ। অথচ এই গুলি অপেক্ষা অপকৃষ্ট বস্তু আর নাই। ২য়, মহাভারত–ইহার বিষয় সামান্য ভূমি খণ্ডের জন্য ভ্রাতৃবিরোধ। ৩য়, শ্রীমদ্‌ভাগবৎ,–ইহাতে শ্রীকৃষ্ণের লীলা ও ষোলো হাজার গোপীর সহিত তাঁহার বিহার বর্ণনা। পাশ্চাত্য সভ্যতার ও শিক্ষার গুণে আজ কাল লোকে আর অন্ধ বিশ্বাস করিতে চাহে না। সুতরাং বহির্লক্ষ্যের অর্থ লইয়া লোকে যে শাস্ত্রকে অত্যন্ত অপকৃষ্ট বলিবে, তাহার বিচিত্র কি?” শাস্ত্রের দৃষ্টান্তে দেশে পাপের স্রোত বৃদ্ধি পাইতেছে; সুতরাং শাস্ত্রের বহির্লক্ষ্যের অর্থ প্রকৃত অর্থ নয়। তাহাদের গূঢ় তাৎপর্য্য আছে। তাহাই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা বা অন্তর্লক্ষ্যের অর্থ। যাহাই হউক, সনাতন-ধর্ম্ম প্রচারিণী সভার সভাপতি একজন পরম হিন্দু হইয়াও যে, এই গুলি স্বীকার করিয়াছেন, ইহাই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট।

১ম। হিন্দু শাস্ত্রের অন্ততঃ বহির্লক্ষ্যের অর্থ অর্থাৎ লোকে এবং টীকাকারগণ যাহা করিয়া থাকেন, তাহা অত্যন্ত জঘন্য, শাস্ত্রের দোহাই দিয়া লোকে পাপ কার্য্য করে। ২য়। পূর্ব্বে লোকের বিচার শক্তি ছিল না। যাহা শুনিত বা সংস্কৃত গ্রন্থে যাহা পড়িত, তাহাই অন্ধের ন্যায় বিশ্বাস করিত। ইংরাজি শিক্ষার অনুশীলক দ্বারা লোকের বিচার শক্তি বৃদ্ধি পাইয়াছে।
যদি এরূপ সপ্রমাণ করা যায় যে, আর্য্যমিশন যাহাকে বহির্লক্ষ্যের অর্থ বলেন, তাহাই প্রকৃত অর্থ; এবং তিনি যাহাকে অন্তর্লক্ষ্যের অর্থ বলিয়া প্রচার করিতে ইচ্ছুক তাহা মিথ্যা, তখন তাহার হিন্দু ধর্মের স্বপক্ষে বলিবার কিছুই থাকিবে না। অভিধানাদির সাহায্যে এবং শঙ্কর, শ্রীধর, মধুসূদন, রামানুজ প্রভৃতির টীকা হইতে শাস্ত্রের যাহা অর্থ হয়, তাহাই সত্য, তদ্বিপরীত অর্থই ভূল। তিনি ত নিজেই বলিয়াছেন, ইংরাজী শিক্ষা দ্বারা লোকের অন্ধ বিশ্বাস দূর হইয়াছে। সুতরাং কে আর পূজ্যপাদ ভাষ্যকারগণের অর্থ পরিত্যাগ করিয়া তাঁহার অর্থ গ্রহণ করিবে? শ্রীচৈতন্য দেব, একবার শ্রীধর স্বামীর ব্যাখ্যা খণ্ডন প্রয়াসী এক ভট্টাচার্য্যকে উপহাস করিয়া বলেন যে, ব্যাভিচারিণীরাই স্বামীর বাক্য অবহেলা করে। তাঁহার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার নমুনা শ্রবণ করুন।
চৈনাচিন কুশোত্তরম্‌ (৬অ–১১) “চৈল=মনিপুর, অচিন=স্বাধিষ্ঠান, কুশ=মূলাধার” ইত্যাদি, বলা বাহুল্য, চৈলাজিন কুশোত্তরং এর প্রকৃত অর্থ চৈলং বস্ত্রং অজিনং ব্যাঘ্রাদিচর্ম্ম চৈনাজিনে কুশেভ্য উত্তরে যস্য; কুশানাম্‌ উপরি চর্ম্ম তদুপরি বস্ত্রমাস্তীর্য্য ইত্যর্থঃ (শঙ্কর, শ্রীধর স্বামী)। ক্ষিত্যপ্‌তেজের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে। ক্ষিতি=মূলাধার। অপ্‌=স্বাধিষ্ঠান। তেজ=মনিপুর। মরুৎ=অনাহত। ব্যোম=বিশুদ্ধ। (আর্য্য মিশনের গীতা ৭অ–৪)। কখন বা চৈলাজিন হইয়া যোগীর আসন রূপে অবস্থিত কখন বা পঞ্চভূত রূপে জগৎ নির্ম্মাণে উন্মুখ মনিপুর স্বাধিষ্ঠানগণই বা কে? বিলাতি শরীরব্যবচ্ছেদ শাস্ত্রেত উহাতের কোন উল্লেখই নাই। তবে যোগের অসাধ্য কার্য্য কিছুই নাই। যোগ বলে আর্য্য মিশনের পঞ্চানন ঠাকুর কত অমূল্য বৈজ্ঞানিক সত্য বাহির করিয়াছেন দেখুন। ১৪ অধ্যায়ের ৮ শ্লোকের টীপ্পনিতে লিখিত আছে যে, “শ্বাস ঈড়া ছাড়িয়া পিঙ্গলায় যাইবার মুখে এবং পিঙ্গলা ছাড়িয়া ঈড়ায় যাইবে মুখে সুষুম্না দিয়া যায়”। “শ্বাসের গতি অনুসারে মনের গতির পরিবর্ত্তন হয়”। “সাধক গুরুপদিষ্ট উপায়ে শ্বাসে সর্ব্বদা লক্ষ্য রাখেন বলিয়া তাঁহার শ্বাসের চঞ্চলতা থাকে না। তিনি প্রাণকে যেখানে ইচ্ছা রাখিতে পারেন। বিলাতি বিজ্ঞান হইতে দেশী বিজ্ঞান কতদূর উচ্চ, পাঠকবর্গ এক্ষণে তাহা বেশ হৃদয়ঙ্গম করিতে সক্ষম হইয়াছেন। হাক্‌স্লি কার্ক প্রভৃতি পণ্ডিতগণ আজিও প্রাণটা কি তাহা স্থির করিতে পারেন নাই। তাঁহারা মনে করেন, lungs (ফুসফুস) এবং heart (হৃদয়) জীবনের দুইটি পা স্বরূপ; অর্থাৎ ইহাদের কার্য্যেতে জীবনের অবস্থান। কিন্তু বাঙ্গালী বৈজ্ঞানিক প্রাণের স্বরূপ তত্ত্ব অবগত হইয়া প্রাণকে শরীরের যেখানে ইচ্ছা সেখানে রাখিতে পারেন। তিনি জানিতে পারিয়াছেন যে, প্রাণ একটা বায়ু বিশেষ। “স্থান ভেবে ঊনপঞ্চাশ আখ্যা ধারণ করিয়া এই পাঞ্চভৌতিক দেহকে চালাইতেছে”। (১৬অ–২২ শ্লোকের টীকা)। চালান তাহাতে ক্ষতি নাই, তবে গ্রন্থকারকে না বায়ুগ্রস্থ করিয়া ফেলেন।

সপ্তম অধ্যায়ের ২৪ শ্লোকে ভগবান বলিলেন,–
অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্যন্তে মামবুদ্ধয়ঃ।
পরং ভাবমজানন্তো মমাব্যয়মনুত্তমং।।(১)
“আমি অব্যক্ত; কিন্তু নির্ব্বোধ মনুষ্যেরা আমার নিত্য, অব্যয়, এবং অতি উৎকৃষ্ট স্বরূপ (সচ্চিদানন্দ রূপ) অবগত না হইয়া আমাকে মনুষ্য, মীন্‌, কুর্ম্ম, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ইত্যাদি ভাবাপন্ন মনে করেন।” এই অধ্যায়ে ঈশ্বর ভিন্ন অন্য দেবতার আরাধনার অকিঞ্চিৎকরত্ব সম্বন্ধে কতকগুলি উপদেশ আছে, তাহা আমরা গীতানুরাগী হিন্দু মহোদয়গণকে পাঠ করিতে অনুরোধ করি।
“অন্যান্য উপাসকেরা স্বীয় প্রকৃতির বশীভূত হইয়া অর্থাৎ পুত্র লাভ, শত্রুজয়াদি বিষয় বাসনা দ্বারা অভিভূত এবং কামাদি দ্বারা হতজ্ঞান হইয়া ভূত প্রেতাদি ক্ষুদ্র দেবতার আরাধনা করিয়া থাকে”। (৭অ–২০)। আশ্বিন এবং কার্ত্তিক মাসে বঙ্গদেশে অনেক দেবতাই ষোড়শোপচারে পূজা পাইয়া থাকেন। তাহারাই এই গীতোক্ত ক্ষুদ্র দেবতা কি না তাহা ভক্ত মাত্রেরই বিশেষ করিয়া পরীক্ষা করা উচিত। কেননা বিপুল অর্থব্যয় এবং অশেষ শারীরিক এবং মানসিক কষ্ট ভোগ করিয়া ভূত পূজার ফল স্বরূপ পেতত্ব পাইতে হইলে অত্যন্ত ক্ষোভের বিষয় হইবে। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ংই বলিয়াছেন–“দেবতা পূজকগণ দেবলোকে, পিতৃপূজকগণ পিতৃলোকে গমন করেন; যাঁহারা ভূতের উপাসক তাঁহারা ভূত হন; কিন্তু যাঁহারা ব্রহ্মোপাসক তাঁহারা ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন”। (৯অ–২৫)। আর দেবতা পূজারই বা আবশ্যকতা কি? বাসুদেব ত পুনঃ পুনঃ স্পষ্টাক্ষরে বলি্তেছেন–“দেবতা পূজার ফল ক্ষণস্থায়ী। বেদত্রয় বিহিত কর্ম্মে মোক্ষ হয় না। দেবপূজকদিগের পুণ্য সত্বর ক্ষয় প্রাপ্ত হয়, এবং বারম্বার জন্ম গ্রহণ করিতে হয়। (৯অ–২০-২১)। কিন্তু–
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তোমাং যে জনা পর্য্যুপাসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাম্‌ যোগক্ষেমং বহাম্যহম্‌।। (৯অ–২২)
“যাহারা অনন্যমনে আমারে চিন্তা ও আরাধনা করে, আমি সেই সকল মদেকনিষ্ট ব্যক্তিদিগকে মুক্তি প্রদান করিয়া থাকি”।
“নিকৃষ্ট জাতি বা নিতান্ত পাপাত্মা শূদ্র বা স্ত্রীলোকও ব্রহ্মকে আশ্রয় করিলে উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিতে পারে” (৯অ–৩২)।
যদি ব্রহ্মোপাসনাই মোক্ষলাভের একমাত্র উপায় হয়, যদি ব্রহ্মকে আশ্রয় কইলে সকল পাপ সকল দুঃখের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, তবে কেন ভাই অনর্থক ভূতের উপাসনা করিয়া শরীর মন কলুষিত কর!
যাবানর্থ উদপানে সর্ব্বতঃ সংপ্লুতোদকে।
তাবান্‌ সর্ব্বেষু বেদুষু ব্রাহ্মণস্য বিজানিতঃ।। (২য়–৪৬)
“যেমন উদপানে (অর্থাৎ কূপ, বাপী, তড়াগ প্রভৃতি ক্ষুদ্র জলাশয়ে) যে সকল প্রয়োজন সিদ্ধ হয়; একমাত্র সংপ্লুতোদকে (মহাহ্রদে) সেই সকল প্রয়োজন সিদ্ধ হইয়া থাকে। সেইরূপ সমুদায় বেদে যে সকল কর্ম্মফল বর্ণিত আছে, সংশয়রহিত বুদ্ধি বিশিষ্ট ব্রহ্মনিষ্ট একমাত্র ব্রহ্মেই তৎসমুদায় প্রাপ্ত হইয়া থাকেন”।
“সাকার পূজা এবং নিরাকাএর পূজা” ইহার মধ্যে কোনটী গীতার অভিপ্রেত? বাসুদেব “মৎকর্ম্মকৃৎ,” “মদ্‌ভক্ত হও” “মৃত্যুর পর আমাকে প্রাপ্ত হইবে” ইত্যাদি কথা দ্বারা নরদেহধারী কৃষ্ণ মূর্ত্তির কি পূজা করিতে বলিতেছেন? কেহ কেহ এরূপ প্রশ্ন করিতে পারেন। সমাজের ভয়ে মুক্তকণ্ঠে বলিতে না পারুন, ভগবদগীতার রচিয়তা যে বেদের প্রতি আস্থা শূন্য ছিলেন, অর্থ শূন্য যজ্ঞাদি কর্ম্মকাণ্ড এবং প্রতিমাদি পূজার তাঁহার বিলক্ষণ বিদ্বেষ ছিল, মনোযোগের সহিত ভগবদগীতা পাঠ করিলেই তাহার বিলক্ষণ আভাষ পাওয়া যায়। ইতিপূর্ব্বেই আমরা তাহার অনেক পরিচয় দিয়াছি। দ্বাদশ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকের টীকায় হিন্দুশ্রেষ্ঠ শ্রীধর স্বামী নিজেই স্বীকার করিয়াছেন যে, “যাঁহারা সমস্ত কর্ম্মার্পণ দ্বারা একান্ত ভক্তি সহকারে সমাহিত চিত্ত হইয়া বিশ্বরূপ, সর্ব্বজ্ঞ, সর্ব্বশক্তিমান, সগুণ (২) ঈশ্বরের উপাসনা করেন তাঁহারাই শ্রেষ্ঠ।”

গীতার স্থানে স্থানে আদি দেব, বিশ্বকর্ত্তা পরমেশ্বরের যে বর্ণনা আছে, তাহা সান্ত সাকার মূর্তি নহে। বিস্ময়োৎফুল্ল নয়নে মহামতি পার্থ যে বিশ্বেশ্বরের বিশ্বরূপ দর্শন করিয়াছিলেন, তাহার আদি, অন্ত বা মধ্য কিছুই নাই। তিনি অখিল ব্রহ্মাণ্ডের গতি, ভর্ত্তা, প্রভু, সাক্ষী, নিবাস, শরণ (রক্ষক) এবং সুহৃৎ। তাঁহা হইতেই এই বিশ্ব সংসার উৎপন্ন হইয়াছে, তাঁহাতেই বিলীন হইবে। (৯অ–১৮)। সূত্রে যেরূপ মণিগণ গ্রথিত থাকে, বিশ্ব সংসার তদ্রুপ তাঁহাতে গ্রথিত আছে। তিনি অব্যক্ত রূপে সমস্ত বিশ্বে ব্যাপ্ত রহিয়াছেন। তাঁহাতে ভূত সকল অবস্থান করিতেছেন অথচ ইনি কিছুতেই অবস্থিত নন। (৯অ–৪)। অনাদি এবং নির্বিশেষস্বরূপ ব্রহ্মই জ্ঞেয়; সর্ব্বত্রই তাঁহার কর, চরণ, চক্ষু, মস্তক ও মুখ বিরাজিত আছে। তিনি সকলকে আবৃত করিয়া, অবস্থিতি করিতেছেন (১৩অ–১৪)।

প্রতিমাদি পূজারও যথেষ্ট নিন্দা গীতায় দেখিতে পাওয়া যায়। “নির্ব্বোধ মনুষ্যেরাই ব্রহ্মকে মীন, কুর্ম্ম, মনুষ্যাদির রূপধারী মনে করেন,” “নিকৃষ্ট দেবতা পূজার ফল ক্ষণ স্থায়ী। তমসাক্রান্ত অজ্ঞ লোকেই প্রতিমাদিতে ঈশ্বর বিদ্যমান আছেন মনে করেন।” (১৮অ–২২)। “ঈশ্বর ভিন্ন অন্য দেবতা শীঘ্র ফল দিবেন, এইরূপ বিফল আশা সম্পন্ন; ঈশ্বরের প্রতি বিমুখ হওয়াতে বিফল কর্ম্ম পরায়ণ নানা প্রকার কুতর্কাশ্রিত বিফল জ্ঞান যুক্ত বিচেতন (বিক্ষিপ্ত চিত্ত) ব্যক্তিরা হিংসা দ্বেষাদি রাক্ষসী; কাম দর্পাদি আসুরী প্রকৃতি আশ্রয় করিয়া ঈশ্বরকে সামান্য মানবরূপধারী জ্ঞানে অবমাননা করে। রাক্ষসী এবং আসুরী প্রকৃতি নিবন্ধনই তাহারা ঈশ্বরের স্বরূপ বুঝিতে পারে না (৯অ–১২)।
মহাত্মনস্তু মাং পার্থ দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ।
ভজন্ত্যনন্যমনসো জ্ঞাত্বা ভূতাদিমব্যয়ম্‌।। (৯অ—১৩)
“কিন্তু হে পার্থ, মহাত্মাগণ বৈরী (সাত্ত্বিক) প্রকৃতি আশ্রয় পূর্ব্বক আমারে সকল ভূতের (জগতের) কারণ ও অব্যয় (নিত্য বা অবিনাশী) রূপ অবগত হইয়া অনন্য মনে আরাধনা করে।”(৩)
অনেকেই গীতার পরম ভক্ত বলিয়া পরিচয় দেন, কিন্তু গীতার যাহা শ্রেষ্ঠ উপদেশ তাহাই লঙ্ঘন করিয়া কাষ্ঠ প্রস্তরাদি নির্ম্মিত নিকৃষ্ট দেবতার প্রতিমা পূজা করেন।(৪) পুত্রৈশ্বর্য্য লাভের আশায় হতজ্ঞান হইয়া, চিন্ময়, অশরীরী সচ্চিদানন্দ পরব্রহ্মের পূজা পরিত্যাগ পূর্ব্বক বহু হস্ত পদ শোভিত ভূত প্রেতাদি ক্ষুদ্র দেবতার উপাসনা করেন। গীতা-সমুদ্র-মন্থন-সমুদ্ভব অমৃতকণা পরিত্যাগ পূর্ব্বক হলাহল গ্রহণের জন্য আগ্রহ কেন? পদ্মনাভ মুখপদ্ম বিনিঃসৃত গীতামৃত পাঠ করিয়াও কি আপনাদের ভ্রান্তি দূর হইবে না? গীতার যাহা শ্রেষ্ঠ রত্ন, তাহাই পদদলিত করিয়া আপনাকে “গীতা-গত-প্রাণ” বলিয়া পরিচয় দেওয়া বৃথা।

অষ্টম অধ্যায়ের প্রারম্ভে অর্জ্জুন কৃষ্ণকে আটটী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। তন্মধ্যে অষ্টম প্রশ্ন এই, “সংযতচিত ব্যক্তিরা মৃত্যু কালে কি প্রকারের ব্রহ্মকে বিবিদত হন?” ভগবান বলিলেন;— “যিনি অন্তকালে আমারে স্মরণ করিয়া কলেরব পরিত্যাগ করেন, তিনি নিঃসন্দেহে আমার স্বরূপ প্রাপ্ত হন। যে ব্যক্তি একান্ত মনে অন্তকালে যে যে বস্তু স্মরণ করিয়া দেহত্যাগ করে, সে সেই সেই বস্তুর স্বরূপ প্রাপ্ত হয়” (৮অ—)। এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটী বিশদরূপে বুঝাইবার জন্য শ্রীমান কৃষ্ণানন্দ স্বামী অশেষ আয়াস সহকারে কতকগুলি নজির সংগ্রহ করিয়াছেন। যথা—(১) “তৈলপায়িকা অত্যন্ত ভয় প্রযুক্ত ভ্রমর কীট চিন্তাবশতঃ দুই তিন ঘণ্টার মধ্যে নিজদেহ পরিহার পূর্ব্বক ভ্রমর ভাবাপন্ন হয়।” (২) “নন্দিকেশরী সর্ব্বদা সদাশিবের ভাবনা করিতে করিতে, সেই দেহেই শিবরূপী হইয়াছিল।” এরূপ অপরূপ রূপান্তরের বৈজ্ঞানিক কারণ যিনি বাহির করিতে সমর্থ হইয়াছেন। তিনি বলেন, “যে যে বিষয়ের তীব্র চিন্তা মন মধ্যে ক্রিয়া করিতে থাকে, মনোময় সূক্ষ্ম শরীর তদ্‌ভাবাপন্ন হইয়া যায়।” তবে ত শ্রীক্ষেত্রবাসী যে সকল লোক মৃত্যুকালে দারুব্রহ্মের বিকলাঙ্গরূপ ধ্যান করিতে করিতে দেহত্যাগ করেন, তাহাদিগকে পর জন্মে হস্তপদাদি শূন্য হইয়া জন্মগ্রহণ করিতে হইবে। আর ম্রিয়মান্‌ ব্যক্তিকে লইয়া গঙ্গা যাত্রা করান কোন ক্রমেই উচিত নয়। কেননা স্রোতস্বিণী ভাগিরথীর পার্শ্বে শয়ন করিয়া পুণ্যসলিলার স্নিগ্ধ বারি পান, এবং তরঙ্গমালাসুশোভিতা বারিরাশি দর্শ্ন করিতে করিতে যদি কেবল জলের রূপই মনে পড়ে, তবে ত পরজন্মে তাহাকে জল হইয়া থাকিতে হইবে!
উল্লিখিত মহামূল্য বৈজ্ঞানিক সত্যের ব্যাখ্যা করিয়া হৃষিকেশ বলিলেন, হে অর্জ্জুন, এখন তুমি বেশ বুঝিতে পারিয়াছ যে, অন্তিম কালে আমাকে স্মরণ করিতে না পারিলে মোক্ষ হইবে না। আর চিত্ত শুদ্ধ না হইলে মরণ সময় আমায় স্মরণ হইবে না। চিত্ত শুদ্ধির উপায়ও তুমি জান। উপস্থিত সংগ্রামে আত্মীয় স্বজনকে হত্যা কর।(৫) অতএব কাল বিলম্ব না করিয়া;—
সর্ব্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুধ্য চ।(৬)
“সকল সময় আমাকে অনুস্মরণ কর এবং যুদ্ধ কর” এবং চিত্তশুদ্ধির এমন সহজ উপায় ইতিপূর্ব্বে আর কেহ কখন আবিষ্কার করিতে পারে নাই।

অষ্টম অধ্যায়ের শেষ ভাগে কৃষ্ণচন্দ্র পুনরায় বিজ্ঞানালোচনায় প্রবৃত্ত হইয়া বলিলেন, জগতের শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ দুইটী গতি (দেবযান এবং পিতৃযান) আছে। মৃত্যুর পর ব্রহ্মবেত্তারা এই দুই পথে গমন করেন। তন্মধ্যে একতর দ্বারা অনাবৃত্তি (মোক্ষ) ও অন্যতর দ্বারা আবৃত্তি (পুনর্জন্ম) হয়। আর্য্যমিশনের গীতার পরিশিষ্ট হইতে উদ্ধৃতাংশটী পাঠ করিলেই পাঠক বর্গ দুইটী গতির বিষয় বুঝিতে পারিবেন।
“যে সকল অরণ্যবাসী শ্রদ্ধাবান তপস্বী হইয়া ব্রহ্মোপাসনা করেন; তাহারা মরনান্তে প্রথমতঃ অর্চ্চিরধিষ্ঠাত্রী দেবতাকে প্রাপ্ত হন। অন্তর উত্তরোত্তর অহরভিমানিনী দেবতা, শুক্ল পক্ষ দেবতা, উত্তরায়ণ দেবতা, সংবৎসর দেবতা, সূর্য্য, চন্দ্রমা, এবং বিদ্যুদধিষ্ঠাত্রী দেবতাকে প্রাপ্ত হন। এই স্থানে কোন এক অমানব পুরুষ ব্রহ্ম লোক হইতে উপগত হইয়া মৃত জীবকে ব্রহ্ম লোক প্রাপণ করিতে পারে না। একারণ ব্রহ্ম লোক হইতে একজন অমানব পুরুষ আসিয়া তদ্গত জীবকে ব্রহ্ম লোক প্রাপণ করে।” (ছন্দোগ্য উপনিষৎ পঞ্চম প্রপাঠক)। বলা বাহুল্য এরূপ বিজ্ঞান হিন্দু শাস্ত্র এবং গঞ্জিকালয়ের উপযুক্ত। এবং এইরূপ বিজ্ঞানকেই ডাক্তার মহেন্দ্র লাল সরকার বলেন;—
Transcendental nonsense.
—————–
(১) এই শ্লোকের যথার্থ অর্থ হিন্দু সমাজে প্রচার হইল ঠাকুর পূজা; অতএব হিন্দু ধর্ম্ম বিনষ্ট হইবে, সৌভাগ্যক্রমে শ্রীশশধর তর্কচূড়ামণি অগ্রেই তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন। সুতরাং এই ঘোর বিপত্তির নিরাকরণার্থ তিনি এই শ্লোকের অনুবাদ না করিয়া এমন এক দেড় পত্র ব্যাপী বং অং (বঙ্গানুবাদ?) লিখিয়াছেন যে যাহার সহিত মূলের কিছুমাত্র সংশ্রব নাই।
(২) সগুণ শব্দের অর্থ সাকার এবং নির্গুণ অর্থে নিরাকার অনুবাদ করিয়া কোন কোন অনুবাদক সাধারণোকে প্রতারিত করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। শ্রীধর স্বামী এস্থলে নিরাকার সগুণ ব্রহ্মের কথাই বলিতেছেন। কেননা সাকার, অতএব সান্ত (সামা বিশিষ্ট) পদার্থের বিশ্বব্যাপী রূপ হইবে কি প্রকারে? নিরাকার নির্গুণ পরমেশ্বর কি, আমরা তাহা জানি না। বঙ্কিম বাবু বলেন, “আমরা নির্গুণ ঈশ্বর বুঝিতে পারি না, কেননা আমাদের সে শক্তি নাই। অতএব আইস, আমরা নির্গুণ ঈশ্বরের কথা ছাড়িয়া দিই। ঈশ্বরকে নির্গুণ বলিলে, স্রষ্টা, বিধাতা, পাতা, ত্রাণকর্তা কাহাকেও পাই না। এমন ঝকমারিতে কাজ কি?”
(৩) কেহ কেহ বলেন “উচ্চাধিকারীর” পক্ষেই নিরাকার উপাসনা প্রশস্ত। গীতায় কিন্তু স্পষ্টাক্ষরে লিখিত আছে যে, মহাপাপী শুদ্র, স্ত্রীলোকও ঈশ্বরকে ভজনা করিয়া মোক্ষ প্রাপ্ত হয়। অতি দুরাচার লোক ও ঈশ্বর পরায়ণ হইলে সাধু বা (উচ্ছাধিকারী) হন (৯অ—৩০)।
(৪) সত্য বটে, অজ্ঞ লোকে ঈশ্বরের স্বরূপ না জানিয়া, ঈশ্বরবোধে কোন বিগ্রহকে পূজা করিলে, অন্তর্যামী ভগবান তাহার পূজা গ্রহণ করেন [৯অ—২৩]। সকলের হৃদযজ্ঞ দয়াময় প্রভু জানেন, যে অজ্ঞ মানব তাঁহারই পূজা করিতেছে। কিন্তু গীতা পাঠা যিনি ঈশ্বরের স্বরূপ অবগত হইয়াও ইচ্ছা পূর্ব্বক মৃত্তিকাদি নির্ম্মিত মনুষ্য মূর্তির পূজা করেন, পরমেশ্বর কখনই তাহার পূজা গ্রহোন করেন না। অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্‌ “মূঢ় আমাকে সামান্য মানব জ্ঞানে অবজ্ঞা করিতেছে”, তিনি এরূপ বলেন।
(৫) (৬) তৎস্মরণং হি চিত্তশুদ্ধিং বিনা ন ভবতি। অতো যুধ্যস্ব চিত্তশুদ্ধ্যর্থং। শ্রীধর স্বামী।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

নবম অধ্যায়ে কৃষ্ণ বলিলেন, মুক্তি প্রদান করিবার সময় ঈশ্বর ভক্তের জাতি বিচার করেন। জাতি উচ্চ হইলে সহজে মুক্তি লাভ হয়। সুতরাং পাপী শূদ্রেও যখন ঈশ্বরপরায়ণ হইলে মুক্তি পায় তখন তোমার ন্যায় ভক্তিপরায়ণ ক্ষত্রিয় যে সহজে উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিবে, সে বিষয়ে সন্দেহ কি? (৯অ—৩৩)। হিন্দু শাস্ত্রের ঈশ্বর অনেকটা হিন্দু রাজাগণের ন্যায়, জাতি অনুসারে শাস্তি বা মুক্তি প্রদান করেন; কিন্তু বাইবেলের ঈশ্বরের নিকট সকল লোকই সমান। “God is no respecter of Persons.”

দশম অধ্যায়ের নাম বিভূতিযোগ। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ কিয়ৎক্ষণ কথোপকথনের পর আপনার বিভূতি ও ঐশ্বর্য্যের এক দীর্ঘ তালিকা প্রদান করেন। তাহা হইতে নমুনা স্বরূপে কিয়দংশ উদ্ধৃত হইল। তিনি বলিলেন,—“আমি, দৈত্য কুলে প্রহ্লাদ, হস্তিগণের মধ্যে ঐরাবত, অশ্বের মধ্যে উচ্চৈঃশ্রবা; সবিষ ভুজঙ্গের মধ্যে বাসুকি, নির্ব্বিষ ভুজঙ্গের মধ্যে অনন্ত, মৎসের মধ্যে মকর, অক্ষরের মধ্যে অকার, সমাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব, মাসের মধ্যে অগ্রয়াহণ,” ইত্যাদি। কেবল বলিলেন না তিনি রাসভের মধ্যে কোনটি! সেটা বোধ হয়, ভক্তের বুদ্ধিপরীক্ষার্থ।

একাদশ অধ্যায়ে অর্জ্জুন একটা মস্ত আবদার করিয়া বসিলেন, তিনি কৃষ্ণকে বলিলেন, তোমার বিশ্বরূপ দেখাও। কৃষ্ণ তথাস্তু বলিয়া তাহার পরম বন্ধুকে এক জোড়া দিব্য চক্ষু প্রদান করিলেন। পাণ্ডুনন্দন বিশ্বরূপ দর্শন করিয়া নয়ন মন সার্থ করিলেন। বিশ্বব্যাপী মূর্ত্তি বাক্য দ্বারা বর্ণনা করা অসম্ভব। কৃষ্ণানন্দের গীতাস্থ আলেক্ষ্য দর্শন করিলে পাঠকবর্গ অনেকটা আইডিয়া করিতে পারিবেন। ধনঞ্জয় দেখিলেন, কৃষ্ণের দেহ, বাহুতর বাহু, উদর, বাহু, উদর, মুখ, এবং নেত্র দ্বারা শোভিত। তাঁহার আদি, অন্ত, মধ্য কিছুই নাই এবং একাকী স্বর্গ, পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও সমস্ত দিগ্বলয় ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছেন। কুরুশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন কিন্তু কোন্‌ স্থান হইতে দর্শন করিয়াছিলেন, কোন ভাষ্যকারই তাহা লেখেন নাই। মহামতি পার্থ আরও দেখিলেন, যে মহাবীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ, এবং অন্যান্য মহীপালবর্গ, তাহাদের যোদ্ধৃগণের সহিত কৃষ্ণের বদনবিবরে প্রবেশ করিতেছেন এবং বিশাল চন্তাঘাতে তাহাদের উত্তমাঙ্গ সকল চূর্ণীকৃত হইতেছে। বাসুদেব, এই ভয়ঙ্কর মূর্ত্তিতেই বলিলেন, আমিই লোকক্ষয়কারী সাক্ষাৎ কালরূপী হইয়া লোকসংহারে প্রবৃত্ত হইয়াছি। তুমি ব্যতিরেকে প্রতি পক্ষীয় সমস্ত বীরগণই বিনষ্ট হইবে। অতএব তুমি যুদ্ধার্থ উত্থিত হইয়া জ্ঞাতিবর্গকে সমরে বিনষ্ট করিয়া যশোলাভ এবং সমৃদ্ধ রাজ্য উপভোগ কর, (১) আমি উহাদিগকে অগ্রেই নিহত করিয়া রাখিয়াছি, এক্ষণে তুমি বিনাশের নিমিত্ত মাত্র হও। হে অর্জ্জুন, আমি অগ্রেই ভীষ্ম, দ্রোণ, জয়দ্রথ প্রভৃতি বীরগণকে বিনাশ করিয়া রাখিয়াছি; তুমি কেবল তাহাদিগের গলা একটু একটু কাটিয়া দাও, আর অধিক কিছু করিতে হইবে না। তাহাতেই তোমার কার্য্য উদ্ধার হইবেক। তজ্জন্য কিছু মাত্র ব্যথিত হইও না। অনতিবিলম্বে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও, নিশ্চয়ই তোমার জয় হইবে।
এই সকল দেখিয়া শুনিয়া অর্জ্জুনের জ্ঞানমার্গ উন্মুক্ত হইল। এবং আমি হন্তা উহারা হত, এরূপ ভ্রান্তি দূর হইল। ইংরাজ বিচারপরিগণকে আমরা গীতার এই অংশটুকু পাঠ করিতে অনুরোধ করি। কারণ তাঁহারা অনেক সময় অমুক লোক অমুক লোককে হত্যা করিয়াছে ভাবিয়া নিরাপরাধীকে অনর্থক শাস্তি প্রদান করেন। কুসংস্কারবিশিষ্ট কতক গুলা দেশীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক, ‘একজন শ্বেতকায় একজন কৃষ্ণকায়কে হত্যা করিয়াছে’ বলিয়া মধ্যে মধ্যে চীৎকার করিয়া উঠে। ভক্তি এবং শ্রদ্ধার সহিত গীতাপাঠ করিলেই বুঝিতে পারিবেন যে, বৃন্দাবনের ননি চোরাই যত অনর্থের মূল। তিনিই যথার্থ হত্যাকারী, সাহেব নিমিত্ত মাত্র। যিনি নিমিত্ত মাত্র তাঁহার আবার অপরাধ কি?
বন্ধুর স্তব স্তুতিতে সন্তুষ্ট হইয়া নন্দদুলাল নিজ মূর্ত্তি ধারণ করিয়া বলিলেন,—হে অর্জ্জুন, “তোমা ব্যতিরেকে আর কেহ আমার তেজোময় বিশ্বব্যাপী মূর্ত্তি দর্শন করে নাই।” এই কথাটার জন্য বঙ্কিম বাবু কিছু গোলে পড়িয়াছিলেন; কেননা কুরুসভায় এবং অন্যান্য স্থানে সহস্র সহস্র লোককে এই বিশ্বব্যাপী মূর্ত্তি দর্শন করাইয়া আজ বলিলেন কি না—“আমার বিশ্বরূপ তুমি ভিন্ন আর কেহ দেখে নাই।” (কৃষ্ণচরিত্র—১৭৩ পৃষ্ঠা)। কিন্তু উপন্যাসরচকের কল্পনাময়ী লেখনী সঙ্গে সঙ্গেই একটা সুন্দর মীমাংসা করিয়া দিয়াছেন। সমস্ত বিশ্বরূপ গুলাই প্রক্ষিপ্ত। “অঙ্গুলীকণ্ডুয়ণনিপীড়িত প্রক্ষিপ্তকারির জাতি গোষ্ঠী সম্ভূত কোন কুকবি প্রণীত অলীক উপন্যাস।” (২)

ত্রয়োদশ অধ্যায়ের নাম প্রকৃতি, পুরুষ, বা ক্ষেত্র, ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগ যোগ। এই অধ্যায়ে “ক্ষেত্র, ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান এবং জ্ঞেয়” এই সকল বিষয়ের বর্ণনা আছে। “এই ভোগায়তন শরীরই ক্ষেত্র এবং এই ভারি আশ্চর্য্যের কথা যিনি বিদিত আছেন, বুধগণ তাঁহাকে “ক্ষেত্রজ্ঞ” নামে অভিহিত করেন।” সর্ব্বব্যাপী, সর্ব্বশক্তিমান, আদ্যন্তবিহীন, পরব্রহ্মই জ্ঞেয়, এবং বিষয়ে বৈরাগ্য, নিরহংকারিতা, জন্ম, জরা, মৃত্যুর দোষ দর্শন ইত্যাদি বিংশতি প্রকার জ্ঞান। “আমাদের আত্মা আমাদের শরীরাভ্যন্তরে বাস করিয়াও আমাদের সহিত কোন সম্পর্ক রাখেন না। সাক্ষীর ন্যায় আমাদের সকল কার্য্য নিরীক্ষণ করেন।” ইহাই নাকি একটা মস্ত জ্ঞানের কথা; এবং যিনি ইহা জানেন, তিনি যেরূপ কার্য্য করুন না কেন, এই বর্ত্তমান দেহ পাতে তাঁহাকে আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করিতে হয় না। অর্থাৎ তিনি ন্যায় পথ অতিক্রম করিয়া “ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা কোন প্রকার নিষিদ্ধ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলেও” তাঁহার কিছু মাত্র পাপ হয় না!!! এবং তিনি মোক্ষ প্রাপ্ত হন (শশধর তর্কচূড়ামণি ১৩অ—২৩ শ্লোকের বং অং)। “স পুরুষঃ সর্ব্বথা বিধিমভিলঙ্ঘ্য বর্ত্তমানোহপি পুনর্নাভিজায়তে। শ্রীধর। পরিত্রাণলাভের এমন সহজ উপায় আর কোন ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায় না। উল্লিখিত জ্ঞানের প্রশংসা গীতার নানা স্থানে পাওয়া যায়। চতুর্থ অধ্যায়ে লিখিত আছে যে,—যদ্যপি তুমি সকল অপেক্ষা অধিক পাপী হও, তথাপি এই জ্ঞানরূপ ভেলা দ্বারা সমস্ত পাপসমুদ্র হইতে উত্তীর্ণ হইবে।
ইহা সম্বন্ধে কোন ইউরোপীয় পণ্ডিত বলেন,—“What is this knowledge, that has such wonderful effects? The blasphemous assertion (অহং ব্রহ্ম) I am God.”(৩) “The perfect beatitude will be our reward, if we can only bring ourselves to the conclusion that there is no difference between God and man; between virtue and vice; cleanliness and filth; and heaven and hell!!!”
পাপের প্রকৃত প্রায়শ্চিত্ত অনুতাপ। কেবল মাত্র উপযুক্ত অনুতাপ দ্বারাই পাপ ধ্বংস হইতে পারে। গীতার লেখক এই মহামূল্য সত্য জানিতেন না।

চতুর্দ্দশ অধ্যায়ে গুণত্রয় লক্ষণ বর্ণিত আছে। জগতের যাবতীয় পদার্থেই নাকি গুণত্রয় বর্ত্তমান আছে। শ্রীমান কৃষ্ণানন্দ স্বামী বলেন যে, “তৃণ হইতে ব্রহ্ম পর্য্যন্ত ত্রিগুণময়ী মায়া রজ্জুতে গ্রথিত রহিয়াছে,” তর্কচুড়ামণি মহাশয় কিন্তু ইহা স্বীকার করেন না। তিনি মনে করেন, “দুর্ব্বাসা কপিলাদি মুনিগণ ত্রিগুণের অতীত” (১৮অ—৪২)। তবে যে মধ্যে মধ্যে (স্ত্রীলোক দেখিলে রেতঃপতন প্রভৃতি) “কদাচিৎ অসৎ প্রবৃত্তির কার্য্য দেখিতে পাওয়া যায়; উহা তাহাদের স্বভাবের পরিচায়ক নহে”। (বোধ হয় বাল্যকালের বদ্‌ অভ্যাসের ফল) “অর্থাৎ নিদ্রিত ব্যক্তির মশক তাড়না করার ন্যায় দৈহিক সংস্কারানুসারে হইয়াছে”। কৃষ্ণানন্দেরও বচন প্রমাণ আছে।—“পৃথিবীতে বা স্বর্গে অথবা দেবতাদিগের মধ্যে এমন কোন পদার্থ নাই যাহাতে এই তিন গুণ বিদ্যমান নাই” (১৮অ—৪০)। চূড়ামণি মহাশয়ের স্বপক্ষে ইহাও বলা যাইতে পারে যে, মানব কিঞ্চিত চেষ্টা করিয়াই আপনাকে ত্রিগুণাতীত করিতে পারে, তখন ব্রহ্মা এবং বড় বড় মহর্ষিগণ যে তাহা আজিও পারেন নাই, তাহা সম্ভবপর বলিয়া বোধ হয় না। ভাল, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী গুণ তিনটী কি?(৪) বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত শ্রীশশধর তর্কচূড়ামণি বলেন, উহারা শক্তি (Force)। পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সংজ্ঞানুসারে বিচার করিলেন, উহারা জড় পদার্থ (matter), শক্তি (Force) বা জড়ের গুণ (property) বলিয়া বোধ হয় না।
সংস্কৃত দর্শন শাস্ত্রাদিতেও উহাদিগকে জড় পদার্থ বলে না। উহারা শক্তি বা Force হইতে পারে না। কেননা শক্তি ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য পদার্থ নয়। তাহার গুরুত্ব, বা লঘুত্বাদি গুণ সকল নাই। কিন্তু সত্ত্বাদি গুণ সেরূপ নয়। “সত্ত্বগুণ=লঘ, দীপ্তি বিশিষ্ট এবং নিরুপদ্রব। এই গুণ হইতে জ্ঞানের উদয় হয়। রজোগুণ=অনুরাগাত্মক, অভিলাষ এবং আসক্তি হইতে সমুদ্ভূত; উত্তেজক এবং গতিশীল। তমোগুণ=আচ্ছাদক, ভারবিশিষ্ট এবং অজ্ঞানসম্ভূত।” এরূপ লক্ষণ বিশিষ্ট কোন পদার্থ শক্তি হইতে পারে না। উহাদিগকে জড়ের গুণও বলা যায় না। কেননা গীতাতেই সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক, এই ত্রিবিধ দান, ত্রিবিধ তপ ইত্যাদির উল্লেখ আছে। দান বা তপ ক্রিয়ামাত্র, উহারা জড় পদার্থ নহে; সুতরাং উহাদের property (গুণ) থাকিবে কি প্রকারে? ইহাদের সম্বন্ধে এতখানি লেখার আবশ্যকই ছিল না। কেননা শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই জানেন যে, প্রাচীন পণ্ডিতগণ (৪) ভ্রম প্রযুক্তই এই গুণত্রয়ের অস্তিত্ব কল্পনা করিতেন। তাহাদের অস্তিত্বের কিছুমাত্র প্রমাণ নাই।
গুণত্রয় বিভিন্ন ভাবাপন্ন হইলেও ইহাদের কার্য্য একই—দেহীকে বন্ধন। সত্ত্ব জ্ঞানাভিমানে, রজঃ কর্ম্মবন্ধনে এবং তমঃ অজ্ঞান দ্বারা জীবকে বন্ধন করে। অর্থাৎ গুণত্রয় হইতে পুনর্জন্ম হয়। ত্রিগুণের অতীত হইতে পারিলে আর জন্মান্তর পরিগ্রহ করিতে হয় না। আর যদি গুণত্রয়ের অস্তিত্বই না থাকে, তবে দেহীর পুনর্জন্ম হইবে কোথা হইতে?
হিন্দু ধর্ম্মের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাতা স্বধর্ম্মনিরত পণ্ডিতবর শ্রীশশধর তর্ক চূড়ামণির নিকট একবার সন্তানোৎপত্তির প্রক্রিয়াটা শুনুন। “অতীব সূক্ষ্ম কেবল শক্তিমাত্র স্বরূপে অবস্থিত জীব সকল ঘটনা ক্রমে বিবিধ খাদ্য দ্রব্য অথবা নিশ্বাস বায়ুর সহিত সংশ্লিষ্ট হইয়া পিতার দেহে প্রবেশ করে। পরে তাহা হইতে এমন অভিন্ন ভাবে পিতার আত্মার সহিত মিশাইয়া যায় যে, কোন প্রকারেও তাহাদের পার্থক্য অনুভব করা যায় আ, যেন এক হইয়া যায়। পরে যখন স্ত্রী আর পুরুষের যোগ হয়, তখন ঐ বিলীন শক্তি টুকু আবার বিশ্লিষ্ট হইয়া পিতার দেহের অনুমাত্র ভৌতিক পদার্থের আশ্রয় পূর্ব্বক মাতৃ জরায়ুতে প্রবেশ করিয়া, আবার মাতৃদেহে একেবারে সমবেত হইয়া যায়; পরে মাতা হইতে দেহের পুষ্টি সাধন পূর্ব্বক, আবার মাতা হইতে বিস্খলিত হইয়া জন্মগ্রহণ করে। এক একবার মহাপ্রলয়ের পর ব্রহ্ম আর প্রকৃতি হইতে ঠিক এরূপে জীবের উৎপত্তি হইয়া থাকে।”
এমন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বৈজ্ঞানিকগণ জীবিত থাকিতে আমরা ম্লেচ্ছদিগের গ্রন্থ পড়িয়া মরি কেন? আচ্ছা, তর্কচূড়ামণি মহাশয় কোন পথে (নাসারন্ধ্র বা বদন বিবর) পিতৃদেবের শরীরাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াছিলেন, তাহা কি তিনি জানিতে পারিয়াছেন? আমাদের বিশেষ অনুরোধ তিনি দন্ত দ্বারা অন্নাদি অধিক পরিমাণে চর্ব্বন না করেন। কেননা তাহাতে হয় ত তাঁহার ভাবি পুত্রের অতীব সূক্ষ্ম শরীর জড়িত থাকিতে পারে।

————————
(১) সকল সময় কৃষ্ণচন্দ্র নিষ্কাম ধর্ম্ম প্রচার করেন না। মুখে নিষ্কাম ধর্ম্মের যতই কেন প্রশংসা করুন না, লাভালাভের দিকে তিনি বিলক্ষণ দৃষ্টি রাখেন। এই জন্যই Tawney সাহেব বলেন;—a vein of insincerity runs through this exhortation.
(২) বঙ্কিম বাবুর মতে সমস্ত গীতা খানিই “প্রক্ষিপ্ত,” একাদশ অধ্যায় কি আবার প্রক্ষিপ্তের মধ্যে “প্রক্ষিপ্ত?’ প্রক্ষিপ্ত হউক বা না হউক, একাদশ অধ্যায় কোন কুকবি প্রণীত নয়। কাব্যাংশে এই অধ্যায়ই গীতার মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
(৩) সুখের বিষয়ে এই যে, “সকল মানবের আত্মা এবং ঈশ্বরের আত্মা এক অবিভক্ত পদার্থ” তাহা বৈদান্তিকগণ ছাড়া ভারতের অন্যান্য দার্শনিকগণও স্বীকার করিতেন না। সাংখ্যদর্শনে আত্মার বহুত্ব উত্তমরূপে প্রমাণীকৃত হইয়াছে।
জন্মমরণকরণানাম্‌ প্রতিনিয়মাৎ অযুগপৎ প্রবৃত্তেশ্চ।
পুরুষ বহুত্বং সিদ্ধং ত্রৈগুণ্য বিপর্য্যয়াচ্চৈব।।
ভারতের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ভক্তপ্রবর রামানুজ এইরূপে অদ্বৈতবাদের অযৌক্তিকতা দেখাইয়াছেন;—
All the Shastras tell us of two principles—knowledge and ignorance, virtue and vice, truth and falsehood. Thus we see pains everywhere, and God and human soul are also so. How can they be one? I am sometimes happy, sometimes miserable. He the spirit is always happy, such is the discrimination. How can the two distinct substances be identical? He is eternal light, with our anything to obscure it—pure one superintendent of the world. But human soul is not so. Thus a thunderbolt falls on the tree of no-distinction. How canst thou, oh slow of thought, say, I m He, who has established this immense sphere of Universe in its fulness? Consider thine own capacities with a candid mind. By the mercy of the Most High a little understanding has been committed to the. It is not for thee, therefore, O perverse one, to say, I am God. All the qualities of sovereignty and activity are eternally God’s. He is therefore a being endowed with qualities (সগুণ). How can he be devoid of qualities (নির্গুণ). Why again should this useless illusion be exercised? if you say as a sport—why should a being of unbounded joy engage in sport? To say that God has projected an illusion for deluding his creatures; or that a being essentially devoid of qualities (নির্গুণ) become possessed of qualities (সগুণ) under the influence of illusion (মায়া) is equally opposed to Godliness. You cannot, if you believe Him to be all truth, allow the possibility of his projecting a deceptive spectacle. Nor can you believe, if you believe Him to be all knowledge and all power, assent to the theory of His creating anything under the influence of Avidya (অবিদ্যা) or ignorance.
(Monies Williams’s Religious Thought and Life in India)
শ্রীচৈতন্যদেব অদ্বৈতবাদিগণকে তিরষ্কার করিয়া বলেন;—
“মায়াধীশ, মায়াবশ ঈশ্বরে জীবে ভেদ।
হেন জীব ঈশ্বর সহ কহত অভেদ।।”
পণ্ডিতবর Charles H. Tawney সাহেব গুণত্রয় সম্বন্ধে বলেন,—Here we have an instance of the ingenious puerility which often characterizes Hindu speculations.
(৪) সকল দর্শনেই গুণত্রয়ের অস্তিত্ব স্বীকার করে নাই।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

কেশব নিষ্কাম ধর্ম্মে প্রণোদিত হইয়া প্রিয় বন্ধুকে বিশ্বরূপ দর্শন করান নাই। তাহার কৌতূহল চরিতার্থ করাই তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না। সম্মুখ সংগ্রামে সমস্ত প্রতিপক্ষীয় বীরগণকে হত্যা করিয়া অনায়াসে জয়লাভ করিতে পারিবেন, ইহা সপ্রমাণ করিয়া তাহাকে যুদ্ধে নিয়োজিত করাই তাঁহার উদ্দেশ্য।কিন্তু অত্যাশ্চর্য্য বিরাট রূপ দর্শন করিয়াও সব্যসাচির মোহাপনোদন হইল না। তখন গোবিন্দ কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া বলিলেন, সখে, জগতে দুই প্রকার লোক আছে। কেহ বা দৈব সম্পৎ লক্ষ করিয়া, কেহ বা আসুরসম্পৎ লক্ষ্য করিয়া জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমোক্তগণ আমার প্রিয় এবং শেষোক্তগণ আমার দ্বেষ্য(১)। আমি জানিতে পারিয়াছি তুমি দৈবসম্পৎ লক্ষ্য করিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছ। তোমার ন্যায় ভাগ্যবান, ধনবান, ক্ষমাশীল, তেজঃসম্পন্ন লোক আর নাই। অতএব তুমি আর বৃথা শোক করিও না, আনন্দচিত্তে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও।
আর দেখ “যাহারা শাস্ত্রবিধি পরিত্যাগ করিয়া স্বেচ্ছাচার কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়, তাহারা কখন সিদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না” (১৬অ–২৩)। “অতএব তুমি কার্য্য এবং অকার্য্য নির্ণয় বিষয়ে (শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণাদি) শাস্ত্রই তোমার প্রমাণ হউক। তুমি শাস্ত্রোক্ত কর্ম্ম অবগত হইয়া তাহার অনুষ্ঠান কর” (১৬অ–২৪)। বেদাদি শাস্ত্র সকলের পুনঃ পুনঃ নিন্দা করিয়া সহসা তাহাদের প্রতি কৃষ্ণের প্রগাঢ় ভক্তির উদ্রেক দর্শন করিয়া শাস্ত্রানুরাগী কৃষ্ণভক্তগণ বিশেষ আনন্দিত হইতে পারেন। কিন্তু এস্থলে শাস্ত্রের গৌরব বর্দ্ধনে কৃষ্ণের কিঞ্চিত স্বার্থ আছে। তিনি ভাবিয়াছিলেন, অর্জ্জুন ক্ষত্রিয়, যুদ্ধই তাহার স্বধর্ম্ম। সুতরাং শাস্ত্রে ভক্তি জন্মিলে তিনি স্বধর্ম্ম পালন না করিয়া থাকিতে পারিবেন না।

বাসুদেব বঙ্কিম বাবুর উপাস্য দেবতা। তিনি তাঁহাকে পূর্ণব্রহ্ম বলিয়া মনে করেন। কিন্তু ভক্তের যে টুকু জ্ঞান আছে, দেবতার তাহাও নাই। বঙ্কিম বাবু বিনা বিচারে শাস্ত্রাজ্ঞা পালন সম্বন্ধে লিখিয়াছেন–“বিনা বিচারে ঋষিদিগের বাক্যসকল মস্তকের উপর এতকাল বহন করিয়া আমরা বিশৃঙ্খলা, অধর্ম্ম এবং দুর্দ্দশায় আসিয়া পড়িয়াছি। এখন আর বিনা বিচারে গ্রহণ করা কর্ত্তব্য নহে”।

কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্ত্তব্যো বিনির্ণয়ঃ।
যুক্তিহীনে বিচারেতু ধর্ম্মহানিঃ প্রজায়তে।।

বঙ্কিম বাবু দোষটা ফেলিয়াছেন ভাষ্যকার ঋষিগণের উপর। কিন্তু একটু অনুধাবন করিয়া দেখিলে শাস্ত্রকারগণেরও দোষ দেখিতে পাইতেন। কেবল শাস্ত্রের দোহাই দিয়া যুক্তিহীন বিচারে ধর্ম্মহানি হয়, ভারতবাসী এই মহা বাক্যের স্বার্থকতা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলে আজ গীতার এত আদর দেখিতে পাইতাম না।

বঙ্কিম বাবু সপ্তদশ অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোক হইতে মাংসাহারের নির্দ্দোষতা প্রমাণ করিয়া কুক্কুটাণ্ডলোলুপ বৈষ্ণবগণের বিশেষ ধন্যবাদার্হ হইয়াছেন। কেবল কুক্কুট কেন, বিলাতি ভট্টাচার্য্যগণের অনুমতি লইয়া ভগবতীর পবিত্র মাংসেও দেহের পুষ্টিসাধন করা যাইতে পারে, অগাধ শাস্ত্র-সমুদ্র মন্থন করিয়া ডিপুটীবাবু এই মহার্ঘ রত্নটী উত্তোলন করিয়াছেন। (ধর্ম্মতত্ত্ব–১০১ পৃষ্ঠা।)

মহামতি সব্যসাচি নিঃশব্দে সমস্ত উপদেশ শ্রবণ করিলেন। উত্তপ্ত মরুভূমিতে বারিবিন্দুর ন্যায় কৃষ্ণের অষ্টাদশাধ্যায়ব্যাপী দীর্ঘ বক্তৃতাও তাহার হৃদয় আর্দ্র করিতে পারিল না। তখন তর্ক এবং যুক্তি-মার্গ পরিত্যাগ পূর্ব্বক নিতান্ত হতাশ চিত্তে কাতরস্বরে বাসুদেব বলিলেন,–হে অর্জ্জুন “তুমি আমার কথা শোনো। তুমি মনোবৃত্তি দ্বারা সমস্ত কর্ম্ম আমাতে সমর্পণ করিয়া মৎপরায়ণ হও। তুমি যদি অহঙ্কার প্রযুক্ত যুদ্ধ করিব না এরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া থাক, তাহা হইলে উহা নিষ্ফল হইয়াছে। কেননা ক্ষত্রিয়-স্বভাব-সুলভ শূরতার বশীভূত হইয়া অবশ্যই তোমাকে যুদ্ধানুষ্ঠান করিতে হইবে (২) (১৮অ–৫৯)।
অতএব তুমি আমার স্মরণাপন্ন হও। তুমি আমাকে চিত্ত সমর্পণ কর। তুমি সমস্ত ধর্ম্মানুষ্ঠান পরিত্যাগ করিয়া একমাত্র আমার স্মরণাপন্ন হও। তোমার কিছুমাত্র ভাবনা নাই। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ এবং সমস্ত বিপদ হইতে মুক্ত করিব। তুমি আমার একান্ত প্রিয়তম; তি নিমিত্তই তোমাকে পরম গুহ্য হিতকর বাক্য কহিলাম; এখন তোমার যাহা ইচ্ছা হয়। কর।”
(বোধ হয় মিষ্ট কথায় কোন কাজ হইল না দেখিয়া) অবশেষে ক্রোধভরে যোগেশ্বর হরি বলিলেন, দেখ অর্জ্জুন নিশ্চিত জানিও যে, “অহঙ্কার প্রযুক্ত আমার কথা না শুনিলে তুমি নিঃসন্দহ বিনাশ প্রাপ্ত হইবে” (১৮অ–৫৮)। কেন এখন কি তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ অপগত হইয়াছে? অতি সুবোধ বালকের ন্যায় আর দ্বিরুক্তি না করিয়া মহামতি ধনঞ্জয় বলিলেন;–“হে মাধব, তোমার অনুগ্রহে মোহান্ধকার নিরাকৃত হওয়াতে আমি স্মৃতি লাভ করিয়াছি। আমার সকল সন্দেহ দূর হইয়াছে; এক্ষণে তুমি যাহা কহিবে, আমি অবশ্যই তাহার অনুষ্ঠান করিব।” এত ধস্তাধস্তির পর সহসা পার্থের মোহরাশির অপনোদন দর্শন করিয়া পাঠকবর্গ যারপর নাই আনন্দিত হইবেন, সন্দেহ নাই; তবে তিনি ভ্রান্তিনাশের কারণটা প্রকাশ করিয়া বলিলে অত্যন্ত সুখের বিষয় হইত। গ্রন্থারম্ভে তিনি যে সকল আপত্তির উত্থাপন করিয়াছিলেন, যথা;–পূজনীয় গুরুগণকে হত্যা করা অন্যায়; আত্মীয় স্বজনকে বধ করিয়া রাজ্য লাভেও সুখ হইবে না; কুল নাশ করিলে কুল অধর্ম্মে পরিপূর্ণ এবং কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হইবে; ইত্যাদি আপত্তি সকলের খণ্ডন হইল কি প্রকারে?

পদ্মনাভমুখপদ্মবিনিঃসৃত, পঞ্চমবেদস্বরূপ মহাভারতের উজ্জ্বল রত্ন শ্রীমদ্‌ভাগবদ্‌গীতোপনিষৎ পাঠ করিয়া আমরা কোন তত্ত্ব শিক্ষা লাভ করিলাম? এই প্রশ্নটী মনোমধ্যে উদয় হইলে কোন গুরুমহাশয়কর্ত্তৃক চাণক্য শ্লোকের ব্যাখ্যার গল্পটী মনে পড়ে। “পরদ্রব্যেষু লোষ্ট্রবৎ” পরের দ্রব্য লোষ্ট্রের ন্যায় জ্ঞান করিবে; অর্থাৎ অপরের ঢিল যেমন ইচ্ছা হইলেই অনায়াসে গ্রহণ করা যায়; সেইরূপ, আবশ্যক হইলে অপরের যে কোন দ্রব্যও গ্রহণ করা যাইতে পারে। বস্তুতঃ গীতা পুস্তকের অনেক স্থলই কতক গুলি সর্ব্বজনবিদিত সত্যের ব্যঙ্গকাব্য (Caricature) বলিয়া বোধ হয়। দুই একটী উদাহরণ দেখিলেই পাঠক বর্গ বুঝিতে পারিবেন।
১ম। আত্মার অমরত্ব;–ইহা গীতার আবিষ্কৃত নয়–উপনিষৎ হইতে গৃহীত। গীতায় তাহার কোন নূতন প্রমাণ নাই। “বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়” ইত্যাদি শ্লোকের অপেক্ষা Worlds worth এর Ode to Immortality কাব্যাংশে শ্রেষ্ঠ। আত্মার অবিনশ্বরত্ব হইতে গীতালেখক ব্যাসদেব একটী আশ্চর্য্য সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন;–“মানব মানবকে হত্যা করিতে পারে না”!!! “নায়ং হন্তি ন হন্যতে”। “কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তিহন্তি কম্‌”।
২য়। ফলে আকাঙ্খা না করিয়া নিঃস্বার্থভাবে হিতকর কার্য্যে নিযুক্ত হইতে সকল ধর্ম্মই উপদেশ দেন।
Xavier এর সুন্দর প্রার্থনাটী সকলেই ত অবগত আছেন;–
Then why O Blessed Jesus Christ
Should I not love thee well;
Not for the sake of willing Heaven,
Not for escaping Hell,
Not for the sake of gaining aught
Not hoping for reward,
But as theyself hast loved me
O ever–loving Lord.

কৃষ্ণের নিষ্কাম ধর্ম্মের ব্যাখ্যা এই যে;–নিষ্কামভাবে নরহত্যা করিলেও দোষ হয় না।
হত্বাপি স ইম্ললোঁকান্ন হন্তি ন নিবধ্যতে।র
(১) জাতিকর্ম্ম গর্হিত হইলেও পালন করা মানবের উচিত, (২) আমাদের কৃত কর্ম্মের জন্য আমরা দায়ী নই, (৩) বিনা বিচারে শাস্ত্রাজ্ঞাপালন করা উচিত; ইত্যাদি গীতোক্ত উপদেশমালাই বোধ হয় ডেলি নিউসের (Indian Daily News) ভূতপূর্ব্ব সম্পাদক ডেলি সাহেবের মতে ইউরোপের সমস্ত ঐশ্বর্য্য অপেক্ষা অধিকতর মূল্যবান।

ধর্ম্মশাস্ত্র মানবকে পরিত্রাণের উপায় শিক্ষা দেয়। ভগবদ্‌গীতায়ও পরিত্রাণের অনেকগুলি উপায় বর্ণিত আছে। যথা,–যিনি ভাবেন, কৃষ্ণের কর্ম্মফলে স্পৃহা নাই, কর্ম্ম কৃষ্ণকে স্পর্শ করিতে পারে না, তিনি কর্ম্ম বন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করেন। (৪অ–১৪)। যে যোগী উত্তরায়ণের শুক্লপক্ষে প্রাণত্যাগ করেন, তিনি ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হয়েন। কিন্তু যে যোগীর দক্ষিণায়ণের কৃষ্ণপক্ষে মৃত্যু হয়, তাঁহাকে সংসারে প্রত্যাগমণ করিতে হয় (৮অ–২৪)। যিনি রোগাদিতে অভিভূত, যাঁহার ধনোপার্জ্জনের ইচ্ছা বলবতী, (৭অ–১৬) বা যিনি যজ্ঞ বাড়ীতে উত্তমরূপে ভোজন করেন (৩অ–১৩)। (৪অ–৩০), সেই সকল লোকদের মোক্ষ সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই।

পণ্ডিতবর Cherles H. Tawney সমস্ত গীতা পাঠ করিয়া বলেনঃ–The conclusion of the whole matter is that the only doctrine appropriate to a member of the warrior caste is devotion by means of work, an unselfish discharge of the duties fo the caste, through on recommending this devotion to Arjun, Krishna appeals to selfish motive. (২অ–৩৭)। (১১অ–৩৩)। It is impossible to resist the conviction that a vein of insincerity runs through this exhortation.
“অষ্টাদশ শত বৎসর ভগবৎগীতা পাঠ করিয়া ভারতবাসী কি উপকার প্রাপ্ত হইয়াছেন?” কোন বিদেশীয় এই প্রশ্ন করেন।
Has it promoted popular education and good government? Has it educated the people in generous emotions? Has it obtained for windows the liberty of re-marriage? Has it driven away dancing girls from the temple? Has it abolished polygamy? Has it repressed vice and encourage virtue? Was it this philosophy which abolished female infanticide, the Meriah sacrifice, and the burning of the widows? Is it this which has kindled amongst the native inhabitants of India the spirit of improvement and enterprise which is now apparent? Need I ask the question! All this time the philosophy of quietism has been sound asleep; or with its eye fixed on the point of its nose, according to the directions of the Gita, it has been thinking itself out of its wits. What could be expected of the philosophy of Apathy, but that it should leave things to take their course.
ভগবৎগীতার যোগাদি সম্বন্ধে উপদেশ গুলি পাঠ করিতে করিতে Lord Macanlayএর কথা গুলি মনে পড়ে।
Words, and more words, and nothing but words, had been all the fruit of all the toil of all the most renowned (ancient) sages. The ancient philosophers promised what was impracticable:–They despised what was practicable:–they filled the world with long words and long beards.–and they left it as wicked and as ignorant as they found it.
(Macaulay’s essay on Lord Bacon.)

গীতার মাহাত্ম্য আমাদের পাপ চক্ষে বিশেষ কিছু দৃষ্ট হইল না।(৩) তজ্জন্য আমাদের লজ্জিত হইবার কোন কারণ নাই।
গীতামাহাত্ম্য পুস্তকে লিখিত আছে, যে কেবল গোপালনন্দন হরিই গীতার মহাত্ম্য সম্যকরূপে বিদিত আছেন। আর কুন্তীসূত অর্জ্জুন, ব্যাসদেব, ব্যাসের পুত্র শুকদেব যাজ্ঞবল্ক্য মুনি এবং জনক রাজা, কিঞ্চিতমাত্র জানেন। গীতার মাহাত্ম্য এরূপ গুপ্ততম যে, অন্যের কথা দূরে থাকুক, গণ্ডুষে সমুদ্র শোষণ করিতে পারেন, বা দ্রোণী মধ্যে রেতঃপতন হইলেও সন্তান উৎপন্ন হয়, এরূপ অব্যর্থবীর্য্য, অমিততেজা বড় বড় মুনিঋষিগণও ইহার লেশমাত্র অবগত নন। মহর্ষি সূত নৈমিষারণ্যে মহামুনি ব্যাসের নিকট শ্রবণ করিয়াছিলেন যে, ছয় আনার পয়সা ব্যয় করিলেই অতি সহজে সকল বিপদ হইতে মুক্ত হওয়া যায়; অর্থাৎ এক খানি গীতা কিনিয়া গৃহে রাখিলে, বেদ পুরাণাদি পাঠ, দান, ধ্যান, যজ্ঞাদি, তীর্থদর্শন আর করিবার আবশ্যক থাকে না। গীতা পাঠেই সমস্ত ফল লাভ হইতে পারে। ভগবান স্বয়ংই বলিয়াছেন;–যিনি গীতার এক অধ্যায় পাঠ করেন, তিনি রুদ্রলোকে চিরকাল বাস করেন। অর্দ্ধ অধ্যায় পাঠ করিলে শত মন্বন্তর সূর্য্যলোকে বাস, একটী দুইটী শ্লোক এমন কি, অর্দ্ধটী পাঠ করিলেও অযুত বর্ষ চন্দ্রলোকে বাস, কেহই নিবারণ করিতে পারে না। আর যদি ইহজীবনে গীতা পড়িবার অবকাশ নাই পাও, এবং চিরজীবন পাপ করিয়া মৃত্যুর পর যদি নরকে গমনও কর, যদি শ্রাদ্ধের সময় তোমার পুত্র একবার গীতা খানি পড়িয়া ফেলেন, তবে আর তোমায় পায় কে। একবারে চতুর্ভূজ রূপ ধারণ করিয়া অমরাবতীর অপ্সরাসেবিত মন্দাকিনীতটে মনের সুখে বিহার করিবে!!! এমন প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য ভারতের ঋষিকুলেই সম্ভবে।

——————
(১) ইতিপূর্ব্বে কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র নিজ মুখেই বলিয়াছিলে, “আমার দ্বেষ্য বা প্রিয় কেহই নাই।” ন মে দ্বেষ্যোহন্তি না প্রিয়ঃ।
(২) “অর্জ্জুনের প্রকৃতিই তাহাকে যুদ্ধে নিযুক্ত করিবে” ইহা নিশ্চিত হইলে, কৃষ্ণের এত বাক্যব্যয়ের আবশ্যক কি?
(৩) তবে দেশে বিদেশে গীতার এত সম্মান কেন? পুরাণাদি শাস্ত্র সকল এতদূর জঘন্য যে তাহাদের সহিত তুলনায় গীতার শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি হয়। John Davies বলেন:–It may be certainly affirmed, that if any one, after reading Puranas or other popular religious books, should then turn for the first time to the study of Bhagbat Gita, he mus be conscious of having come to a new country where nearly every thing is changed. The thoughts, the sentiments, and the methods of expression have another stamp. He feels that he has come to a higher region, where the air is much more pure and invigorating, and where the prospect has a wider range. He has come from a system which gives honour to gods who are stained by cruelty and lust, to a spiritual system which recognises only one God, who, if not set forth in such terms as Christians would utter, is yet a spiritual being, the source and maintainer of all life, and is to be worshipped with a purely spiritual worship.

(সমাপ্ত)


Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: