একটি তরবারির আয়াতের (The sword verse) পর্যালোচনা, প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য

মূল তালিকা

ভূমিকা

২১ শে এপ্রিল ২০১৯ সালে  খ্রিস্টীয় ইস্টার রবিবারে শ্রীলঙ্কায় একযোগে কয়েকটি গির্জা ও হোটেলে   ইস্লামিস্ট জেহাদিদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন প্রায় ২৯০ জন নিরাপরাধ ব্যাক্তি ও আহত হন প্রায় ৫০০ জন। সকলেই জানেন যে এই জিহাদি হামলা কোন ভাবেই শেষ হামলা নয়, The Religion of Peace নামের ওয়েব সাইট যারা ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে সংঘটিত সব  ইসলামি জেহাদি হামলার সংখ্যার হাল নাগাদ খতিয়ান রাখেন,  তাদের হিসাবে ১১ ই সেপ্টেম্বর  ২০০১ থেকে ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই অব্দি মোট ৩৫,৩৮০ টি জেহাদি হামলার খবর রেকর্ড করা হয়েছে। আর ইতোমধ্যেই এই জাতীয় হামলার ব্যাপারে আমাদের তথাকথিত মোডারেট মুসলিম ভাইদের রেডিমেড আপ্ত বাক্যটি “ এরা সহি মুসলিম নয়, ইসলাম সন্ত্রাস সমর্থন করে না” আপনাদের বহুবার শোনা হয়ে গেছে। বস্তুত এই মোডারেট মুসলিমদের প্রছন্ন সমর্থনের জন্যই, এই ইসলামি জেহাদি হামলার রেকর্ড বেড়েই চলবে। কোন গুরুতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে  সমাজে যখন একটি সম্মিলিত চেতনা (Collective consciousness) গড়ে ওঠে তখন ঐ সমাজে সেই অন্যায়টি করা দুরূহ হয়ে পড়ে। উদাহরন স্বরূপ বলা যায় একটি উন্নত পশ্চিমা দেশে ঘুষ-দুর্নীতি যতটা না আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তার চেয়ে অনেক বেশি সন্মিলত সামাজিক চেতনায়  প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনুন্নত দেশে, বিশেষত মুসলিম দেশগুলোতে এর চিত্র ভিন্ন, এসব দেশে নাস্তিক-মুরতাদ হত্যা বা বোরখা-হিজাবের পক্ষে সম্মিলিত চেতনা  থাকলেও  ঘুষ-দুর্নীতি বা মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোন সামাজিক চেতনাবোধ গড়ে ওঠেনি। একই ধারায় জেহাদি হামলায় ইসলামের সংশ্লিষ্টতার কারনে এর বিরুদ্ধে কোন মুসলিম সমাজেই একটি  সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। 

শ্রীলঙ্কায়  এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী  মৌলোভী  জাহারান হাশিম একজন ইসলামি দাওয়াতি ব্যাক্তিত্ব, জাতীয় তওহিদ জামাত নামক ইসলামি দলের প্রধান, সোশ্যাল মিডিয়ায় তামিল ভাষায় একজন জেহাদি বক্তা, আই এস ও জাকির নায়েকের কট্টর সমর্থক । ইনি ও ইনার দল জিহাদি প্রচারণার পাশাপাশি যে সকল কার্যক্রম করতেন তার অন্যতম হল বৌদ্ধ মূর্তি ভাঙ্গা বা বিকৃত করন ও সুফিবাদি মুসলিমদের উপর হামলা করা ( “মূর্তি গড়তে আসিনি, মূর্তি ভাঙতে এসেছি”  – মওলানা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের বক্তব্য দ্রষ্টব্য )।  শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রুয়ান ভিজেওয়ারদানের বক্তব্যে জানা যায় যে মৌলোভী  জাহারান হাশিমের দলের সাথে  বাংলাদেশ ও ভারতের জামাতুল মুজাহিদিনের যোগাযোগ রয়েছে। জনাব জাহারান হাশিম তার অন লাইন খুতবায় মানুষকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন ঃ মুসলিম  অথবা যাদের সাথে মুসলিমদের চুক্তি রয়েছে আর তৃতীয় শ্রেণীতে আছে অচুক্তিবদ্ধ অমুসলিম কাফের  যাদের হত্যা করতে হবে। তিনি আর বলেন “ মূর্তি উপাসক ও কাফিরদের যেখানে পাও হত্যা কর”। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে কোরআন শরীফের তরবারির আয়াতটি (The sword verse) মনে পড়ে গেল।

তরবারির আয়াত (The sword verse) – সুরা তওবা আয়াত নং ৫ (৯:৫)

অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

এই আয়াতের যদি আক্ষরিক অর্থ করা হয় তাহলে এর দ্বারা আল্লাহ কর্তৃক  নিম্নক্ত  নির্দেশাবলী প্রতীয়মান হয়ঃ

  • আল্লাহ মুসলিমদের মুশরিকদের  হত্যা করতে আদেশ দিয়েছেন, পৃথিবীর যেখানেই তাদের পাওয়া যাক না কেন।
  • মুশরিকদের হত্যা করার জন্য বসে না থেকে সক্রিয় ভাবে তাদের খুঁজে বের করে হত্যা করতে হবে।
  • তাদের বন্দী বা হত্যা করার জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাকতে হবে।
  • তাদের আবাসস্থল অবরোধ করতে হবে।
  • যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহন না করে ততদিন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে যাতে ইসলাম গ্রহন ছাড়া আর কোন উপায় না থাকে।

এই আয়াতের, “মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” এই অংশটি কোরান শরীফের সবচেয়ে অমানবিক ও বর্বর আয়াত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে এই আয়াতকে মানবিক প্রমান করতে বা নিদেন পক্ষে এই আয়াতে যে নির্বিচারে সকল কাফির- মুশরিকদের হত্যা করতে বলা হয় নাই  এটা প্রমান করতে মোডারেট  ইস্লামিস্ট  ভাইদের (Muslim apologists) শত শত লেখা  আর ইউটিউব ভিডিও আপনারা হয়ত দেখে থাকবেন। অপরপক্ষে,  এই তরবারির আয়াত জঙ্গি-জিহাদি ও  ইসলামি রাজনৈতিক দলদের বহুল ব্যাবহারিত  মূলমন্ত্র। সুরা তাওবা নবি মোহাম্মদ (দঃ) এর মাদানি জীবনের শেষ দিকে নাজিলকৃত প্রধান সুরা বিধায় এর নির্দেশনা নবির তথা আল্লাহর চূড়ান্ত নির্দেশ বলে মেনে নিতে হবে। এই সুরায় নবি মোহাম্মদ (দঃ) মুমিন মুসলমানদের সাথে কাফির- মুশরিক বা অমুসলমানদের  কি সম্পর্ক হবে, তাদের খুন করবার বিধান , জিহাদের গুরুত্ব ও একটি ইসলামি রাষ্ট্র বাবস্থার ধারনা দিয়েছেন। ইসলামে পুরুষদের উপর জিহাদের গুরুত্ব আর নারীদের উপর পর্দার গুরুত্ব হযরত ওমরের নিচের এই ফরমানেই সহজে বোধগম্য।  

(সুত্রঃ তাফসীরে জালালাইন দ্বিতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা ৬১৯, প্রকাশনায় ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রকাশকাল ২০১০)

সুরা তওবার এই অপরিসীম গুরুত্ব ও বর্তমান জামানায় এর প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে এই সুরার ৫ নং আয়াতের বিস্তারিত তাফসীর ও কার্যকারিতা একটি পূর্নাঙ্গ আলোচনার দাবি রাখে। এই বিবেচনায়, এই তরবারির আয়াতের প্রেক্ষাপট, আগের আয়াত, পরের আয়াত পাঠকদের কথা স্মরণ রেখে সহজ ভাবে উপস্থাপনা করাই আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। সন্মানিত পাঠককুলকে অনুরোধ  করব দয়া করে তথ্যসুত্রে দেওয়া রেফারেন্স সমুহ অধ্যয়ন করে আরও বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করবেন ও আমার লেখাটির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করবেন।

নবী মহাম্মাদ (দঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও টাইম লাইন

  • ৫৭০ – মক্কায় জন্ম
  • ৫৭৬ – মাতার মৃত্যুর পর এতিম
  • ৫৯৫ – ধনী ব্যাবসায়ী খাদিজার সাথে বিবাহ
  • ৬১০- ৪০ বছর বয়সে প্রথম ওহী নাজিলের খবর
  • ৬১৯ – নবির নিরাপত্তা প্রদানকারী চাচা আবু তালিবের মৃত্যু
  • ৬২০ – বোরাকে চড়ে মিরাজ গমন ও আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ
  • ৬২২ – মক্কা হতে মদিনায় হিজরত ও আশ্রয় লাভ 
  • ৬২৩ – মক্কার বাণিজ্য কাফেলার উপর হামলা ও লুট করার আদেশ প্রদান
  • ৬২৪ – বদরের যুদ্ধ (জয়লাভ)
  • ৬২৪ – মদিনার ইহুদি গোত্র বানু কাইনুকাকে ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ
  • ৬২৪ –  নবী মহাম্মাদ (দঃ) এর বিরুদ্ধে কবিতা লেখায় ইহুদি কবি আবু আফাক এর হত্যার আদেশ 
  • ৬২৪ –  কবি আবু আফাক এর হত্যার বিরুদ্ধে কবিতা লেখায় মহাম্মাদ (দঃ) কর্তৃক কবি আসমা বিনতে মারওয়ানকে হত্যার আদেশ
  • ৬২৪ – নবি মহাম্মাদ (দঃ) কর্তৃক ইহুদি কবি  কাব বিন আশরাফকে  হত্যার আদেশ
  • ৬২৫ – উহুদের যুদ্ধ (পরাজিত)
  • ৬২৫ – মদিনার ইহুদি গোত্র বানু নাদিরকে ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ
  • ৬২৭ – খন্দকের যুদ্ধ (জয়লাভ, প্রকৃত অর্থে কোন যুদ্ধ হয় নাই)
  • ৬২৭ – মদিনার ইহুদি গোত্র বানু কুরাইযার ৯০০ পুরুষ হত্যা। নারি ও শিশুদের মালে গনিমত হিসাবে ভাগ বাটোয়ারা ও ইয়ামেনে দাস-দাসীর বাজারে বিক্রয় বিনিময়ে মুসলিমদের জন্য অস্ত্র ক্রয়
  • ৬২৮ (৬ হিজরি)  – মক্কায় হজ্জ পালনের নিরাপত্তার জন্য মক্কার মুশরিকদের সাথে হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর
  • ৬২৮ – খাইবার আক্রমন, ইহুদি নিধন ও জীবিতদের উপর জিজিয়া কর আরোপ
  • ৬২৯ – খ্রিস্টান ভুমিতে মুতা যুদ্ধের আদেশ (পরাজিত)
  • ৬৩০ (৮ হিজরি)  – আকস্মিক হামলায় মক্কা বিজয়
  • ৬৩১ (৯ হিজরি) –  খ্রিস্টান ভুমিতে দ্বিতীয় অভিযান তাবুকের যুদ্ধে নেতৃত্ব দান (কোন যুদ্ধ হয় নাই, কোন শত্রু সেনা ছিল না )
  • ৬৩২ (১০ হিজরি) – নবীর ইন্তেকাল

উপরে বর্ণিত ঘটনার আলোকে তরবারির আয়াত  সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ  দিক ঃ

  • মাদানি সুরা তওবার প্রথম অংশ নাজিল হয় যখন নবি তাবুক যুদ্ধের অভিযান থেকে ফিরে আসছিলেন।
  • ইমাম বুখারির মতে এটি নবির উপর নাজিলকৃত সর্বশেষ সুরা (অন্য বর্ণনায় সুরা নাস সর্বশেষ সুরা)

(সুত্রঃ তাফসীর ইবনে কাসীর,চতুর্থ সংস্করণ জানুয়ারী ২০০৪,  অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ৮,৯,১০,১১ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৩)

  • কোরানের একমাত্র সুরা যার শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই। কিছু সাহাবী এটিকে সুরা আনফালের সাথে এক সুরা মনে করেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস হযরত আলির বরাত দিয়ে বলেন ঃ বিসমিল্লাতে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, আর এই সুরাতে কাফিরদের বিরুদ্ধে তরবারি ব্যাবহারের আদেশ রয়েছে এজন্য বিসমিল্লাহ লিপিবদ্ধ হয়নি যেন আল্লাহপাকের গজবের নিদর্শন প্রতিভাত হয়।
  • সুরা তাওবার প্রায় ১২ টি নামের বর্ণনা তাফসীরে জালালাইনে আছে। এই সুরার অন্য প্রচলিত নাম বারাআত বা সম্পর্কছেদ, মোকাশকাশা বা ঘৃণা সৃষ্টিকারী  ইত্যাদি।

প্রশ্নঃ তরবারির আয়াত (The sword verse) বা সুরা তওবার নং ৫ আয়াত কি যুদ্ধকালীন বা যুদ্ধের নিয়ম সংক্রান্ত আয়াত ?

উত্তরঃ না, এটি মোটেও যুদ্ধকালীন বা যুদ্ধের নিয়ম সংক্রান্ত আয়াত নয়। তরবারির আয়াতটি নাজিল হয় নবম হিজরিতে ও নবি যখন তাবুকের যুদ্ধ হতে মদিনায় ফিরছিলেন। এই আয়াতটিতে “মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” বলতে নবি মক্কা ও এর আশেপাশের কাফিরদের বুঝিয়েছেন। এর আগের বছর অর্থাৎ অষ্টম হিজরিতেই প্রায় বিনা যুদ্ধে নবি মক্কা বিজয় করেছেন আর সেখানকার কাফির- মুশরিকরা বিনা শর্তে মুসলিম বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল এবং মক্কায় নবির হুকুমতই জারি ছিল, নবির পক্ষ থেকে আত্তাব ইবনে আসিদ ছিলেন মক্কার দায়িত্বপ্রাপ্ত । কাজেই এই তরবারির আয়াতটি নবির সাথে সম্পূর্ণ শান্তি অবস্থায় থাকা কাফিরদের বিরুদ্ধে একতরফা হত্যার হুমকি। এই আয়াতটি মোটেও তাবুক যুদ্ধের নিয়ম সংক্রান্ত আয়াত নয়, উপরুন্তু তাবুক যুদ্ধে বাস্তবিক কোন যুদ্ধ হয়নি, যা পরে আলোচনায় আসবে।

তাবুকের যুদ্ধ ঃ

(তাবুকের যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য আহ্বান, সাহাবীদের জিহাদে যেতে গড়িমসি ইত্যাদি বিষয় সুরা তওবায় উঠে আসলেও তরবাবির আয়াতের সাথে এর সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই, পাঠক যারা শুধু তরবাবির আয়াতের তাফসীরের ব্যাপারে জানতে ইচ্ছুক তারা তাবুকের যুদ্ধের এই অধ্যায় বাদ দিয়ে যেতে পারেন)  

অষ্টম হিজরিতে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) মক্কা বিজয়ের পর অত্র ও আশেপাশের এলাকায় মুসলিম বাহিনীর আধিপত্য নিশ্চিত হয় ও হুনায়ুনের যুদ্ধ ও অন্যান্য ছোট ছোট যুদ্ধের মাধ্যমে পুরা অঞ্চল মুসলিম বাহিনীর করায়াত্ত হয়ে যায়। এর  বেশ আগে থেকেই নবি মোহাম্মাদ (দঃ) বিভিন্ন দেশে দুত পাঠিয়ে উনার নবুয়ত ও আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান, এই সব দেশের মধ্যে বাইজেনটাইন বা রোমান সম্রাট হেরাক্লিস, পারশ্য সম্রাট, মিসরের মুকাওকিস, হাবাসা সম্রাট, বাহারাইনের গভর্নর অন্যতম। বলা বাহুল্য ইনারা কেও নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর এই দাবি মেনে নেন নি। তবে নবি ও তার সাহাবীরা রোমান সম্রাজ্য থেকে হামলার ভয়ে ভীত থাকত। এর পূর্বে জর্ডানের নিকট মুতার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী রোমানদের কাছে শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়েছিল যেই যুদ্ধে মোহাম্মাদ (দঃ) এর পালক পুত্র ও নবিপত্নি জয়নাব বিনতে জাহাশের প্রাক্তন স্বামী জায়েদ ইবনে হারিথা, নবির চাচাত ভাই জাফর ইবনে আবু তালিব সহ বহু সাহাবী নিহত হয়, পরিশেষে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃেত্ব মুসলিম বাহিনী প্রান রক্ষা করে মদিনায় ফিরে যায় এবং ফিরে আসা সেনারা বিদ্রুপের মুখে পড়ে। এক সময় মদিনায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রোমানরা মদিনা আক্রমন করতে পারে। এইসব মাথায় রেখে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) সকল মুসলিমকে জান-মাল কোরবানি করে তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেন এবং নবি জীবনে সর্ববৃহৎ ৩০,০০০ সেনা নিয়ে তাবুক যাত্রা করেছিলেন। তবে বিবিধ অজুহাতে মুসলিমরা এই যুদ্ধে না যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। রোমানদের ব্যাপারে ভীতি ছাড়াও যে সব কারন ছিল তার মধ্যে উত্তপ্ত আবহাওয়া, যাত্রা দূরত্ব, সেই সময় খাদ্য সল্পতা, খরা ও খেজুর পাকার মৌসুম ইত্যাদি। নবি রোমানদের কাছে পরাজিত হবেন এই মর্মে মুনাফিকদের রটনাও নবিকে বিচলিত করে তুলেছিল। সুরা তওবার বিভিন্ন আয়াতে তাই এই জিহাদে সামিল হওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি, লোভ,ভয়, হুমকি সবই ফুটে উঠেছে।

“আর তাদের কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না। শোনে রাখ, তারা তো পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এই কাফেরদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে।” [ সুরা তাওবা ৯:৪৯ ]

আয়াতটি নাজিল হয়েছে জাদ ইবনে কাইস এর ক্ষেত্রে, যিনি মুসলমান হলেও তাকে মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয় কিন্তু তিনি তার নিজ গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ লোক । নবি যখন তাবুকের যুদ্ধের জন্য সকলকে জান মাল কোরবান করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন, এরই অংশ হিসাবে নবি জাদ ইবনে কাইসকে বলেন “ওহে আবু ওয়াহাব (জাদ ইবনে কাইস এর নাম) তুমি কি কিছু রোমান নারিকে যৌন দাসী ও পুরুষদের দাস হিসাবে লাভ করতে চাও?” উত্তরে  জাদ ইবনে কাইস বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার লোকজন নারিদের প্রতি আমার বিশেষ আসক্তির কথা জানে। আমি আশঙ্কা করছি যে শ্বেতাঙ্গ রোমান রমণীদের দেখে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারব না। কাজেই আমাকে আর লোভ দেখাবেন না, বরং আমাকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে অবহতি দিন, আমি আমার সম্পদ দিয়ে আপনার জিহাদে সাহায্য করব।  

“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কি হল, যখন আল্লাহর পথে বের হবার জন্যে তোমাদের বলা হয়, তখন মাটি জড়িয়ে ধর, তোমরা কি আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অতি অল্প।“ [ সুরা তাওবা ৯:৩৮ ]

“যদি বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তুদ আযাব দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারবে না, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।“ [ সুরা তাওবা ৯:৩৯ ]

“তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং জেহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দিয়ে, এটি তোমাদের জন্যে অতি উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পার।“ [ সুরা তাওবা ৯:৪১

“পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর জান ও মালের দ্বারা আল্লাহর রাহে জেহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচন্ডতম। যদি তাদের বিবেচনা শক্তি থাকত।“ [ সুরা তাওবা ৯:৮১

নবি মোহাম্মাদ (দঃ) তাবুকে পৌছিয়ে সেখানে কোন রোমান সৈন্য সমাবেশ দেখতে পাননি এবং বুঝতে পারেন যে রোমান আক্রমনের গুজবটি অতিরঞ্জিত। (Ref: The Life of Muhammad: Al-Waqidi’s Kitab Al-Maghazi (Routledge Studies in Classical Islam ) Edited by Rizwi Faizer, Published by Routledge 2011. Page 16451.Kindle version; Baladhuri, Ansab I, 368. ). নবি তাবুকে ১০ দিনের কম অবস্থান করেন এবং উমরের সাথে পরামর্শ করে কোন যুদ্ধ না করেই মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন, তবে পথে বেশ কিছু গোত্রকে জিজিয়া করের আওতায় নিয়ে আসেন। (হালের বানানো নবির জীবনী যেমন মুবারকপুরি রচিত আর- রাহীকুল মাখতুম কিতাব ও বিভিন্ন ইসলামি বক্তা দাবী করেন যে রোমান বাহিনী নবির বাহিনী দেখে পালিয়ে গিয়েছিল, এটা পুরোটাই গাঁজাখুরি ধাপ্পাবাজি, এর কোনই ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। প্রদত্ত রেফারেন্স ছাড়াও ইবনে ইসহাক বা আল তাবারির লেখায় তাবুকে বাইজেনটাইনদের সাথে যুদ্ধের অথবা রোমান সেনাদল পালিয়ে যাওয়ার কোন বর্ণনা নাই , আধুনাকালের সিরাত লেখক আর প্রায় সব ইসলামিক ওয়েব সাইট সমুহ সম্পূর্ণ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাবুক অভিযানকে ইসলামের গৌরবগাঁথা হিসাবে বর্ণনা করেন)  

নবির মদিনায় ফিরে আসার খবরে তাবুক যুদ্ধে না যাওয়া সাহাবীগণ নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর রোষানলে পড়ার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন এবং নবির কাছে নানা অজুহাত পেশ করতে থাকেন। ইসলামে ও নবির কাছে জিহাদ যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, এই অজুহাতকারিদের প্রতি নাজিলকৃত আয়াতগুলো লক্ষ্য করলে বুঝা যায়।

“তুমি যখন তাদের কাছে ফিরে আসবে, তখন তারা তোমাদের নিকট ছল-ছুতা নিয়ে উপস্থিত হবে; তুমি বলো, ছল কারো না, আমি কখনো তোমাদের কথা শুনব না; আমাকে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে দিয়েছেন। আর এখন তোমাদের কর্ম আল্লাহই দেখবেন এবং তাঁর রসূল। তারপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে সেই গোপন ও আগোপন বিষয়ে অবগত সত্তার নিকট। তিনিই তোমাদের বাতলে দেবেন যা তোমরা করছিলে। “[ সুরা তাওবা ৯:৯৪ ]

“এখন তারা তোমার সামনে আল্লাহর কসম খাবে, যখন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা কর-নিঃসন্দে হে এরা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের বদলা হিসাবে তাদের ঠিকানা হলো দোযখ।“ [ সুরা তাওবা ৯:৯৫ ]

নবি অবশ্য তিন জন মুমিন সাহাবী কাব বিন মালিক, মোরারা বিন রাবি ও হেলাল বিন উমাইয়ার তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার তওবা গ্রহন করেন, তবে এর আগে তাদেরকে ৫০ দিনের জন্য নিজ বিবি, পরিবার-পরিজন ও সমাজ থেকে বয়কট মানসিক শাস্তি দেওয়া হয়। সুরা তওবা নামকরনের এটাই শানে নাজুল। কাজেই নবি জেহাদকে কতোটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন এ থেকেই পাঠকরা অনুধাবন করতে পারবেন।

তরবারির আয়াত (The sword verse) বা সুরা তওবা আয়াত নং ৫ এর প্রেক্ষাপট ও তাফসীর বিশ্লেষণ

সুরা তওবার আয়াত ১ থেকে ৪ঃ

১। সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।

২। অতঃপর তোমরা পরিভ্রমণ কর এ দেশে চার মাসকাল। আর জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবে না, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদিগকে লাঞ্ছিত করে থাকেন।

৩। আর মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরেকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা কর, তবে তা, তোমাদের জন্যেও কল্যাণকর, আর যদি মুখ ফেরাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না। আর কাফেরদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দাও।

৪। তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।

সুরা তাওবার প্রথম ৫ টি আয়াতে বর্ণিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও বাক্যের বিশ্লেষণঃ

“সম্পর্কচ্ছেদ”

সুরা তওবা শুরু হয়েছে নবি তথা আল্লাহর তরফ থেকে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণার মাধ্যমে এবং ৫ নং তরবারির আয়াতে কতল করার হুমকির  পূর্বে ৪ মাসের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী আলোচনায় দেখা যাবে যে আল্লাহ ও নবির সাথে এই সম্পর্কচ্ছেদের আওতায় চুক্তি ভুক্ত বা অচুক্তিভুক্ত সকল বিধর্মীই অন্তরভুক্ত, যেমনটি বলা হয়েছে নিম্নে বর্ণিত তাফসীরে মাযহারিতে। তবে এই তাফসিরে ভুলে তাবুক যুদ্ধের চুক্তি ভঙ্গকারী বলা হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে হবে  হুদাইবিয়ার চুক্তি । চুক্তির বিষয়টি পরে বিস্তারিত ভাবে আলোচনায় আসবে।

(সুত্রঃ তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা এ, বি, এম, মাঈনুল ইসলাম, প্রকাশক ঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৪, প্রথম প্রকাশঃ জুন ১৯৯৯) 

“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও”

মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও – এই বাক্যের “যেখানে পাও” এই অর্থ নিয়ে ইসলামি স্কলারদের ভেতর মতবিরোধ আছে। কারন মক্কার হারাম শরিফের সীমানার ভিতরে রক্তপাত প্রাক-ইসলামি যুগ থেকেই নিষিদ্ধ, যে কারনেই এর নাম হারাম শরিফ কারন এর সীমানার ভিতর রক্তপাত হারাম। তবে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) বিশেষ ক্ষমতাবলে নিজেই এই হারাম শরিফে রক্তপাত ঘটিয়ে এই নিয়মের ব্যাতিক্রম করেছেন। নীচে দেওয়া তাফসীরে মাযহারিতে এর বিবরন দেওয়া আছে।

(সুত্রঃ তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা এ, বি, এম, মাঈনুল ইসলাম, প্রকাশক ঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩২, প্রথম প্রকাশঃ জুন ১৯৯৯)  

মক্কা বিজয়ের পর নবি বেশ কিছু কাফের পুরুষ ও অন্তত একজন নবিকে বিদ্রুপ করে কাব্য ও সঙ্গীত করা রমণীকে হত্যা করান। এদের মধ্যে ইবনে খাতাল ভেবে ছিলেন কাবার চাদর ধরে থাকলে পবিত্র ভুমিতে উনি রক্ষা পাবেন, উনার এই চেষ্টা সফল হয়নি।

(ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম এর তাফসীরে সুরা তাওবা থেকে নেয়া, এর অনুবাদ মাওলানা নাসিম আরাফাত, নানুতবী রহঃ প্রকাশনা থেকে অক্টোবর ২০১২ সালে প্রকাশিত। পৃষ্ঠা ৬০)

হারাম শরিফের বা কাবা শরিফের ভিতর রক্তপাতের এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ১৯৭৯ সালে যখন কট্টর সালাফিপন্থি  জিহাদি জোহাইমান আল ওতায়বি সৌদি আরবে সহি ইসলাম রক্ষাকল্পে কাবা শরিফ দখল করেন, তখন এর অভ্যন্তরে হামলা চালানোর ফাতওয়া দিতে গিয়ে সৌদি ওলামারা বিভক্ত হয়ে পড়েন।

Juhayman al-Utaybi 

হজ্জের মৌসুমের ৪ মাস হজ্জ পালনের জন্য ও সফররত হাজিদের নিরাপত্তার জন্য প্রাক-ইসলামি সময় থেকে রক্তপাত ও হত্যা নিষিদ্ধ ছিল, যা সকল গোত্রই সন্মান করত ও মেনে চলত। তবে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এই নিয়মের তোয়াক্কা করেন নি আর এই নিষিদ্ধ মাসেও যুদ্ধ ও হত্যা করে এই প্রথাটি ভঙ্গ করেন। তাই তাফসিরকারকগন নবির বেঁধে দেওয়া ৪ মাস সময়কে প্রাক – ইসলামিক পবিত্র নিষিদ্ধ মাস থেকে ভিন্ন করে নিয়েছেন। এই বিষয়টিও আমরা তাফসীরে মাযহারীতে দেখতে পাই।

(সুত্রঃ তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা এ, বি, এম, মাঈনুল ইসলাম, প্রকাশক ঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৫, প্রথম প্রকাশঃ জুন ১৯৯৯)  

নিষিদ্ধ মাস বলতে কুরানে কি বুঝানো হয়েছে আর ৪ মাস অতিবাহিত হলে কাফের মুশরিকদের হত্যা করতে আর নতুন করে নোটিশ দেওয়া লাগবে না এটি পরিস্কার করে উল্লেখ করা হয়েছে সাইদ কুতুবের ফী যীলালিল কোরানের নবম খণ্ডে, উপরে উল্লেখিত পৃষ্ঠা নং ৫৭ তে। সাইদ কুতুব আর একটি গুরুত্বপূর্ন  বিষয় উল্লেখ করেছেন যে সুরা তাওবার এই সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণার সাথে সাথে মুলত মুশরিকদের সাথে মুসলমানদের যে কোন চুক্তি করার ধারণাই বাতিল হয়ে গেছে। আধুনিক বিশ্বব্যাপী ইসলামী জিহাদের জনক আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযযাম হয়ত এরই ভিত্তিতে তার বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেনঃ “Jihad and the rifle alone; no negotiations, no conferences, and no dialogues”

অবশ্য মক্কা বিজয়ের আগেও নবির পাঠানো সাহাবীরা নাখালায় মক্কার বাণিজ্য কাফেলায়  লুট করে হামলা চালিয়ে কুরাইশ আমর বিন আল হাদ্রামিকে নিষিদ্ধ মাসে হত্যা করে বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। মক্কার কুরাইশদের বোকা বানিয়ে হত্যা করার জন্য নবির সাহাবি মাথা কামিয়ে হজ্জ যাত্রীর বেশ ধরেন, যার ফলে মক্কার কাফেলা এই মুসলিম সাহাবিদের কাছ থেকে হামলা প্রত্যাশা করেন নি। নিষিদ্ধ মাসে হত্যা করে নবি শুধু মক্কার কুরাইশ নয় এমনকি মদিনার মুসলিমদেরও সমালোচনায় পড়েন আর মদিনার ইয়াহুদিরা এই হত্যাকে অশুভ ইঙ্গিত বলে আরও ভীতির সঞ্চার করেন। এই বিশাল ঝামেলা সামলাতে নাজিল হয় সুরা বাকারার ২১৭ নং আয়াত যার মাধ্যমে আল্লাহ যদিও স্বীকার করে নিয়েছেন যে নিষিদ্ধ মাসে হত্যা করা গর্হিত তবে কুফরী করা ও ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ বলে বর্ণনা করেছেন।  

“সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্দ্বকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে-হারা মের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ। বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।“ [ সুরা বাকারা ২:২১৭ ]

(নাখালায় নিষিদ্ধ মাসে হত্যা ও মক্কার বাণিজ্য কাফেলায়  লুট করার বর্ণনা ঃ The Life of Muhammad: A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, A Guillaume.  Oxford University Press, First published in 1955, Seventeenth Impression 2004. Page 288)

“তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক।“

এই বাক্যের ব্যাখ্যা নিচে ইবনে কাসির তার তাফসীরে উল্লেখ করেছেন।

(তাফসীরে ইবনে কাছীর চতুর্থ খণ্ড, অধ্যাপক আখতার ফারুখ অনুদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় সংস্করন (উন্নয়ন), মার্চ ২০১৪ ঃ পৃষ্ঠা ৫২৭) 

নবি মোহাম্মাদ (দঃ) কর্তৃক সকল কাফের- মুশরিকদের মক্কায় হজ্জ সর্বকালের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষনা 

প্রেক্ষাপট ও আনুসাংগিক ইতিহাসঃ

পাঠককুল নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে ইসলাম ধর্ম আবির্ভাবের বহু পূর্ব হতেই মক্কায় পৌত্তলিকরা হজ্জ পালন করে আসছিলেন। বর্তমান ইসলাম ধর্মের হজ্জ প্রায় অভিন্ন ভাবে সেই ইসলাম পূর্ব পৌত্তলিক নিয়মেই পালন করা হয়। কাবার চারিপাশে তাওআফ, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ বা হজরে আসওয়াদ বা কাল পাথর চুম্বন এই সবই হজ্জ পালনের বহু আগে থেকেই প্রচলিত পৌত্তলিক নিয়ম। আজ একজন ধর্মপ্রাণ মুমিন মুসলমান যে ভক্তি আর বিশ্বাস নিয়ে ধাক্কা ধাক্কি করে কাল পাথর চুম্বন করেন হাজার বছর আগে মক্কায় সকল কাফের- মুশরিক, এমন কি নবি মোহাম্মাদ ও তার পূর্বপুরুষগন একই আবেগে ও ভক্তিতে এই রীতি পালন করে আসছিলেন। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা গোত্র তাদের নিজ নিজ দেব দেবীর মূর্তি আর কোরবানির পশু নিয়ে আসতেন কাবায় পাপ মোচনের এই অত্যাবশ্যকীয় ধর্মীয় রীতি পালনের উদ্দেশ্যে। ইসলাম পূর্ব  পৌত্তলিকরা যখন কাবা তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করতেন তখন উচ্চ কণ্ঠে আবৃত্তি করতেন এই বলে “ এই পবিত্র উপসনালয়ের মালিক! আমি ঘোষণা করছি যে আমি এসেছি। আমি আসিনি এ কথা বল না। যদি তুমি চাও আমাকে ও আমার বাবাকে ক্ষমা কর। অন্যথায় তোমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমায় ক্ষমা কর। কারন তুমি দেখেছ আমি আমার তীর্থ যাত্রা সম্পন্ন করেছি।“ইসলামি নিয়মে অনুরূপ ভাবেই বলা হয় ঃ   লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক, লা শারিকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিয়ামাতা, লাকা ওয়াল মুল্‌ক, লা শারিকা লাকা। অর্থাৎ- হাজির হে আল্লাহ হাজির, আপনার মহান দরবারে হাজির। আপনার কোন শরিক নেই। সব প্রশংসা, নিয়ামত এবং সব রাজত্ব আপনারই।

প্রাক ইসলামি মক্কার সমাজে হজ্জের অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ

বর্তমান সৌদি রাষ্ট্রের মত ইসলাম পূর্ব মক্কাবাসির আয়ের একটি প্রধান উৎস ছিল কাবাকে কেন্দ্রিক হজ্জ নির্ভর। মক্কায় কোন ফসল উৎপাদন হত না। হজ্জকে কেন্দ্র করে যে সব ব্যাবসা বাণিজ্য হত তা বলতে গেলে মক্কাবাসির অর্থনৈতিক জীবনের প্রাণবায়ুর মত। এই কারনে মক্কাবাসি ছিল ভিন্ন ধর্মমতের -প্রতি খুবই সহনশীল। মক্কার আশেপাশের এমনকি দুরদুরান্তের গোত্ররা তাদের নিজ নিজ  দেব দেবীর মূর্তি নিয়ে মক্কায় বিনা বাধায় হজ্জ করতে পারতেন। কাবার ভিতরেই ছিল ৩৬০ টি দেব দেবীর মূর্তি এমনকি খ্রিস্টীয় মাতা মেরির ছবিও ছিল। মক্কার কুরায়েশদের নবি মোহাম্মাদ (দঃ) কে বিরোধিতার একটি প্রধান কারন ছিল অর্থনৈতিক। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) তার নবুয়তের প্রাথমিক পর্যায়ে মক্কায় ইসলাম ধর্মের প্রচার করতে প্রায়ই হজ্জ করতে আসা বিভিন্ন গোত্রকে মূর্তি পুজা না করে এক আল্লাহর আধিপত্য আর তার নিজেকে রাসুল হিসাবে মেনে নিতে বলতেন। বলা বাহুল্য এতে কুরায়েশরা মক্কায় হজ্জ কাফেলার আগমন বন্ধ ও এর ফলে বাণিজ্যিক ক্ষতির আশঙ্কা করতেন। নবির এই প্রচারনায় তারা বাধা প্রদান করতেন কখনবা মক্কায় আগত হাজীদের কাছে নবি মোহাম্মাদকে  পাগল বলে তার কথা গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য বলতেন।

নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর পক্ষ হতে  কাফের- মুশরিকদের প্রতি ঘোষণাঃ

নবি মোহাম্মাদ (দঃ) মক্কা বিজয়ের পরের বছর অর্থাৎ নবম হিজরিতে নিজে হজ্জে না গিয়ে আবু বকরকে মুসলিমদের হজ্জের আমির নিযুক্ত করেন। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী সেই বছর মক্কায় ইতোমধ্যে কাফের- মুশরিককগন তাদের কোরবানির পশু নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। কিছু বর্ণনায় আছে আগের প্রথা মতে কিছু কাফের- মুশরিককগন বিবস্ত্র অবস্থায় কাবা তাওআফ করতেন, যা নবি অপছন্দ করে সেই বছর নিজে হজ্জ করেন নি, বরং আবু বকরকে হজ্জে পাঠিয়ে কাফের- মুশরিকদের পরের বছর থেকে হজ্জ নিষিদ্ধ করন সহ চার মাসের আল্টিমেটাম ও ইসলাম গ্রহন না করলে কতল করার ঘোষণা পাঠ করতে পাঠান। কিন্তু পরে নবি তাঁর এই ঘোষণার গুরুত্ব অনুধাবন করে তাঁর পরিবারভুক্ত হযরত আলিকে নবির নিজ উট আযবার সাওআর করে পাঠিয়ে দেন। নবির এই সিদ্ধান্তে আবু বকর হয়তবা মনঃক্ষুণ্ণ বা শঙ্কিত বোধ করেছিলেন তাই তিনি আলিকে জিজ্ঞাসা করেন যে নবি আলিকে হজ্জের নেতা করে পাঠিয়েছেন কিনা ? তবে আলি আবু বকরকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে উনি শুধু নবির পক্ষ থেকে সুরা তওবার উক্ত ঘোষণা দিতে এসেছেন। আবু বকর পরে নবিকে জিজ্ঞাসা করেন যে তার ব্যাপারে আল্লাহ কোন আয়াত নাজিল করেছেন কি যার জন্য এই ঘোষণা পুনরায় আলিকে দিয়ে করানো হল? নবি আবু বকরকে বলেন যে এই ঘোষণার জন্য তাঁকে জিব্রাইলের মাধ্যমে আদেশ পাঠানো হয়েছে এবং চুক্তি বাতিলের ঘোষণা নিজ পরিবাবের মাধ্যমে দেয়াই শ্রেয়। এই ব্যাপারে কিছু প্রসিদ্ধ তাফসিরকারকগনের উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলঃ কাফের- মুশরিককগন বিবস্ত্র অবস্থায় কাবা তাওআফ করার প্রথা নিয়ে আধুনিক ইসলামি জিহাদের জনক ও ওসামা বিন লাদেনের শিক্ষক আব্দুল্লার ইউসুফ আযযামের সুরা তওবার তাফসির থেকে নিম্নের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল (আব্দুল্লার ইউসুফ আযযামের পরিচয় পরে উল্লেখিত আছে)  

তাফসীরে মাযহারিতে উল্লেখিত নবির পক্ষ থেকে হযরত আলির ঘোষণার মুল বক্তব্যঃ

নিম্নে বর্ণিত অংশটি তাফসীর ইবনে কাসীর,চতুর্থ সংস্করণ জানুয়ারী ২০০৪,  অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ৮,৯,১০,১১ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৫ তে উল্লেখিত)   

বিঃদ্রঃ পাঠকদের এই মর্মে ভুল ধারনা হতে পারে যে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) হয়ত শুধমাত্র বিবস্ত্র কাফের- মুশরিককদের হজ্জ নিষিদ্ধ করেছেন, বস্তুত, বিবস্ত্র হোক আর বস্ত্র পরিহিত হোক নবম হিজরির পর সকল কাফের- মুশরিকদের হজ্জ পালনের অধিকার চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নবম হিজরির পরের বছর থেকে শুরু করে আজ অবধি এই নিয়ম বলবৎ আছে।  হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মক্কার কাফের- মুশরিকরা নবি মোহাম্মাদ (দঃ) সহ তার দলের সকল মুসলিমের হজ্জ করার অধিকার বজায় রাখলেও, নবি, কাফের- মুশরিকদের যুগ যুগ ধরে পালন করা হজ্জ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। এর কারণটি অবশ্য সুরা তওবার ২৮ নং আয়াতে বলা পরিস্কার ভাবে বলা হয়েছেঃ

হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। আর যদি তোমরা দারিদ্রে?র আশংকা কর, তবে আল্লাহ চাইলে নিজ করুনায় ভবিষ্যতে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।  সুরা তাওবা ৯:২৮

(সুত্রঃ তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা এ, বি, এম, মাঈনুল ইসলাম, প্রকাশক ঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৮, প্রথম প্রকাশঃ জুন ১৯৯৯) 

উপরের লেখায় আধুনিক ইসলামি জিহাদের জনক ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম সুরা তাওবার এই ২৮ নং আয়াতের তাফসির করতে যেয়ে সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন যে কাফের- মুশরিককদের হজ্জ নিষিদ্ধ করাতে মুসলিম উম্মা যে বাণিজ্য হারানোর আশংকা করেছিলি, নবি মোহাম্মাদ (দঃ) জিজিয়া, মালে গনিমত ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই সব সাহাবিদের আস্বস্থ্য করেন। ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম আল কায়েদার একজন প্রতিষ্ঠাতা এবং জিহাদের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান রূপকার। উনি উপরের আলোচনায় জিজিয়াকে মুসলমানদের আয়ের নুতন উৎস বলেই ক্ষান্ত হননি বরং কোরান ও সুন্নার আলোকে অমুসলিমদের করজোড়ে লাঞ্ছনার মাধ্যমে জিজিয়া নিতে উৎসাহ দিয়েছেন আর গনিমতের মালকে বলেছেন পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট উপার্জন।

সুরা তওবা আয়াত নং ৫ আয়াত বা তরবারির আয়াত (The sword verse) ও কাফের- মুশরিকদের হত্যার বিধান ছাড়াও আহলে কিতাব তথা ইহুদি – নাসারা ও মুনাফিকদের কতল করার বিধান সংবলিত আরও  তিনটি তরবারির আয়াতের বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হল  (সুত্র তাফসীর ইবনে কাসীর,চতুর্থ সংস্করণ জানুয়ারী ২০০৪,  অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ৮,৯,১০,১১ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪৪-৬৪৫)

(kill the mushrikun wherever you find them) Abrogating every peace treaty in the Quran. It is said that it abrogates, “by setting them free or ransom.” (47:4) It is also said that it is abrogated by it and so setting them free and ransom are permitted. (seize them) means to capture, and the one taken is the captive.

Ibn-Juzayy (Ref:Surat at Tawba Tafsir. Ibn Juzayy: at-Tashil fi ‘ulum al-Qur’an ) ডাউনলোড লিঙ্ক)

মুসলিম আন্দালুসের প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার ইবন জুযে তার তাফসির গ্রন্থে তরবারির আয়াতের “মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” নিয়ে বলছেন যে, এই আয়াত কুরানের পূর্বের সকল শান্তি চুক্তিকে বাতিল করে দেয়। এবং এই তরবারির আয়াত দ্বারা পূর্ববর্তী সুরা মুহাম্মাদের ৪ নং আয়াতের “অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ লও” এই অংশটি রহিত বা মানসুখ করে দিয়েছে।

“অতঃপর যখন তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের গর্দার মার, অবশেষে যখন তাদরকে পূর্ণরূপে পরাভূত কর তখন তাদেরকে শক্ত করে বেধে ফেল। অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ লও। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করবে! একথা শুনলে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়, আল্লাহ কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না। [ সুরা মুহাম্মাদ ৪৭:৪ ]”

তরবারির আয়াতের “কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও।“ এই বাক্যের তাফসির।

as-Suyuti

This is an Ayat of the Sword which abrogates pardon, truce and overlooking. (seize them) is used as evidence for the permission to take captives. (and besiege them) is permission for besieging and raiding and attacking by night. Ibn Abi Hatim reported that Abu ‘Imran al-Jawfi said that ribat in the way of Allah is found in the words, “lie in wait for them on every road.” (if they make tawba and establish the prayer and pay the zakat, let them go on their way) Repentance from shirk is not enough to let them go their way until they establish the prayer and pay the zakat. Ash-Shafi’i took this as a proof for killing anyone who abandons the prayer and fighting anyone who refuses to pay zakat. Some use it as a proof that they are kafirun. (Ref:Surat at Tawba Tafsir. As-Suyuti: al-Iklil fi Istinabat at-Tanzil)

ডাউনলোড লিঙ্ক

তরবারির আয়াতের তাফসিরে আস-সুয়ুতি বলেছেন  যে এই তরবারির আয়াত কোরানের পূর্ববর্তী ক্ষমা করার, সন্ধি করার আয়াত বাতিল করে দিয়েছে। এই আয়াত বন্দি নেওয়া, অবরোধ করে রাতের অন্ধকারে আক্রমন চালানর পক্ষে দালিলিক প্রমান। মুশরিকরা শুধু মাত্র তাদের শিরক থেকে তাওবা করলেই তাদের ক্ষমা করা হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নামায কায়েম করে ও জাকাত প্রদান করে। ইমাম শাফেয়ী এই আয়াতটিকে যারা নামাজ পরিত্যাগ করে তাদের কাফের ফাতওয়া দিয়ে হত্যা করার দলিল হিসাবে পেশ করেছেন। এই নিয়ে ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম এর তাফসীরে সুরা তাওবাতে (পৃষ্ঠা ৫৫) বিস্তারিত আলোচনা আছে, যার কিছুটা উদ্ধৃত করা হলঃ

এই একই আয়াতের উপর ভিত্তি করে প্রথম খলিফা আবু বকর নবি মৃত্যুর পর যারা জাকাত দিতে অস্বীকার করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। এমনি অনেক অঞ্চল থেকে আযানের  লা ইলাহা ইল্লালাহু ধ্বনি ভেসে আসছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সাহাবা এমনকি উমর পর্যন্ত এই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে রিদার যুদ্ধ নামে পরিচিত

চুক্তি, চুক্তি ভঙ্গ, সম্পর্কচ্ছেদ ইত্যাদির প্রেক্ষাপট ও পর্যালোচনা

“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” এই তরবাবির আয়াতের পূর্বের আয়াত সমূহ বিশেষত সুরা তওবার এক ও চার নং আয়াতে কাফের মুশরিকদের সাথে চুক্তি, চুক্তি বাতিল, সম্পর্কচ্ছেদ ইত্যাদি বলা হয়েছে, যেমনটি পুনরায় উল্লেখ করা হলঃ

১। সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।

৪। তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।

গোত্র ভিত্তিক তৎকালীন আরব সমাজে গোত্র বিরোধ ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা আর গোত্রে গোত্রে যেমন শত্রুতা থাকত তেমনি গোত্ররা নিজেদের মধ্যে মিত্রতা স্থাপন করে চুক্তিবদ্ধ হতেন এবং এই চুক্তি সর্বত ভাবে মেনে চলতেন। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) আরবের এই প্রথা বেশ ভালভাবেই জানতেন। তিনি এও জানতেন যে কাফের মুশরিকদের তিনি যতই ঘৃণা করুন না কেন, চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় আরবরীতির বরখেলাপ করে তাদের কতল করা তৎকালীন মুসলমানরাও মেনে নিতে দ্বিধা করবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র জাজিরাতুল আরবে শুধুমাত্র ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিজের নবুওতকে পাকাপোক্ত করতে কাফের মুশরিকদের সাথে সকল চুক্তি বাতিল করা উনার জন্য আবশ্যক ছিল। মক্কা বিজয়ের পর আর সকল ইয়াহুদিদের হত্যা, উচ্ছেদ আর জিজিয়া করের আওতায় আনার পর নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার মত কোন শক্তি আর আরবে অবশিষ্ট ছিলনা, কাজেই পূর্বের সকল চুক্তি বাতিল করার প্রকৃষ্ট সময় ছিল সেটা। যদিও পরবর্তীতে হুনায়ুনের যুদ্ধে অবশিষ্ট কাফিররা ইসলামের ছায়াতলে আসা ঠ্যাকাতে শেষ ব্যার্থ চেষ্টা করেছিলেন।

চুক্তির ভিত্তিতে কাফের মুশরিকদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়ঃ

প্রথমত, যাদের সাথে মুসলমানদের নির্দিষ্ট মেয়াদে চুক্তি আছে, যেমন কুরায়েশদের সাথে ১০ বছর মেয়াদি হুদাইবিয়ার চুক্তি।

দ্বিতীয়ত, যাদের সাথে মেয়াদ উল্লেখ না করে অনির্দিষ্ট কালের জন্য চুক্তি আছে।

তৃতীয়ত, যাদের সাথে কোন চুক্তি নাই।

এই তিন শ্রেনির কাফেরদের মধ্যে কুরায়েশদের সাথে ১০ বছর মেয়াদি হুদাইবিয়ার চুক্তি নবি বাতিল করেন চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে ও তাদের হয় ইসলাম গ্রহন অথবা আরবভুমি ত্যাগের জন্য ৪ মাস সময় দেওয়া হয় নতুবা তরবারির আয়াত কার্যকর করা হবে। যাদের সাথে চুক্তি নাই বা অনির্দিষ্ট কালের জন্য চুক্তি আছে  তাদেরও  অনুরূপ শর্তে ৪ মাস সময় দেওয়া হয়। তবে বনু কিনানার দুটি গোত্র বনু যমারা ও বনু মুদলাজকে তাদের সাথে করা চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ দেওয়া হয় (৯ মাস চুক্তির মেয়াদ বাকি ছিল), যেহেতু তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধ কোন গোত্রকে সাহায্য করে নি। তবে মোদ্দা কথা হল যে কোন মেয়াদেই হোক পরিশেষে সকল কাফের মুশরিকদের সাথে সকল চুক্তিই বাতিল করা হয় ও সকলকে তরবারির আয়াতের আইনের আওতায় আনা হয়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন প্রকৃত পক্ষে সুরা বারাআত (তওবা) নাজিল হওয়ার ৪ মাস পরে আর কোন চুক্তিই বহাল থাকেনি, এখন বাকি শুধু ইসলাম ও জিহাদ ( ইবনে কাসিরের তাফসীর থেকে উদ্ধৃত এই উক্তিটি “নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর পক্ষ হতে  কাফের- মুশরিকদের প্রতি ঘোষণা” – এই অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে)

তাফসিরে জালালাইনেও কাফের- মুশরিকদের প্রতি একই সিদ্ধান্তর কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ চুক্তি মেনে চলুক বা ভঙ্গ করুক নির্দিষ্ট মেয়াদের পর মক্কায় আর কোন কাফের- মুশরিক থাকতে পারবে না।

(সুত্রঃ তাফসীরে জালালাইন দ্বিতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা ৬২৫, প্রকাশনায় ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রকাশকাল ২০১০)

(সুত্রঃ তাফসীরে ইবনে কাছীর চতুর্থ খণ্ড, অধ্যাপক আখতার ফারুখ অনুদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় সংস্করন (উন্নয়ন), মার্চ ২০১৪ )

নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস কোরান তাফসীরকারকদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা বহন করেন। নবি ও তার সাহাবীদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ইবনে আব্বাসকে সেই যুগেও কোরানের ব্যাখ্যার ব্যাপারে সবচেয়ে জ্ঞানী হিসাবে বিবেচনা করা হত, এমনকি খলিফা উমর কোরানের কোন বিষয় না বুঝলে ইবনে আব্বাসের সাহায্য নিতেন। বর্তমানের সালাফি পণ্ডিতরা মনে করেন ইসলামের যে কোন কিছুর ব্যাখ্যা নবির সময়কালিন ও পরবর্তী তিন প্রজন্ম যে ভাবে বুঝেছিলেন ঠিক সে ভাবেই বুঝতে হবে, এই ক্ষেত্রে এমনকি পরবর্তী ইসলামি পণ্ডিতদের ব্যাখ্যাও গ্রহণযোগ্য নয়। সেই হিসাবে, ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে ইবনে কাসিরে সুরা তওবার প্রথম কয়েকটা আয়াত যেখানে মুশরিকদের সাথে  চুক্তি বাতিল সংক্রান্ত রুলিং দেওয়া হয়েছে, সেটাকে অন্য যে কোন ব্যাখ্যার চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় এটা অতি পরিষ্কার যে চুক্তি  মেয়াদ যাই হোক না কেন, নবির দেয়া আল্টিমেটামের সময় পার হয়ে গেলে যদি কাফির- মুশরিকরা ইসলাম ধর্ম গ্রহন না করে, তবে তাদের হত্যা করতে হবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দিক ইবনে আব্বাসের উক্তিতে পরিস্কার হয়েছে যে, পূর্বে যে বিষয়টিকে চুক্তি পালনের শর্ত হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে (অর্থাৎ ৪ নং আয়াতের “তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর।“) তরবারির আয়াতদিয়ে তাও রহিত করা হয়েছে, এর অর্থ এই নয় যে তাদেরকে চুক্তিতে বহাল থাকা অবস্থায় হত্যা করার কথা বলা হয়েছে, বরং চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ও ইসলাম গ্রহন না করলে যেখানে পাও সেখানে হত্যা করতে বলা হয়েছে। তরবারির আয়াতের এই আইনগত হত্যার বিধানের ধারাসুমহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় অতি সহজ ভাবে বোধগম্য হয়েছে।

সাইদ কুতুব ফী যীলালিল কোরানের নবম খণ্ডে সুরা তাওবায় বর্ণিত চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে যা আলোচনা করেছেন, নিচে তা উল্লেখ করা হল।

সুরা তাওবার এই সম্পর্কচ্ছেদের বিষয় ও অমুসলিমদের সাথে কোন চুক্তি না করার এই ফরমান সালাফি জিহাদি সংঘঠনগুলো মুসলিম বিশ্বের শাসক যারা কোন কাফের রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে তাদের কাফির ফাতওয়া দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বৈধতা হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। এর একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হল ইসরাইলের সাথে মিশরের ক্যাম্প ডেভিড শান্তি চুক্তির পর মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে হত্যা। এই হত্যাকাণ্ডের এক প্রধান নেতা মিশরীয় ইসলামিক জেহাদের সদস্য খালেদ ইসলামবুলি আনোয়ার সাদাতের হত্যা ফেরাউনকে  হত্যার সাথে তুলনা করেছেন। খালেদ ইসলামবুলি যার পরে  আদালতের রায়ে ফাঁসি হয়,  জিহাদি দলের কাছে তিনি একজন শহিদ ও অনুপ্রেরনার উৎস, উনার নামে আল কায়েদার একটি ব্রিগেডের নামকরন করা হয়েছে।

নবি মোহাম্মাদ (দঃ) সাথে কুরাইশদের কথিত চুক্তিনামা ও চুক্তিভঙ্গ

পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ হয়, এতে মক্কার কুরাইশরা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে অন্যান্য আরব গোত্রের সমন্বয়ে মদিনায় মুসলিমদের আক্রমণের উদ্দেশে অভিযান চালায়। তবে নবির প্রখ্যাত পার্সিয়ান সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে পরিখা বা খন্দক খনন করার ফলে মক্কার সৈনিকরা মদিনা আক্রমন করতে পারে নি, তাই প্রায় বিনা যুদ্ধে এই অভিযান সমাপ্ত হয় ও কুরাইশরা মক্কায় ফেরত যায়। পাঠকরা যারা কুরাইশ কর্তৃক মুসলমান বাহিনীদের উপর আক্রমনের প্রকৃত কারন সম্পর্কে অবহিত নন, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই যে এই সব আক্রমনের মুল কারন অর্থনৈতিক। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর নেতৃত্বে মুসলমানরা নিয়মিত মক্কার বাণিজ্য কাফেলায় আক্রমন করে লুটতরাজ , হত্যাকাণ্ড, অপহরন করে মুক্তিপন আদায় ইত্যাদি  চালাত, যা ছিল মক্কার বাণিজ্য ও হজ্জ নির্ভর অর্থনীতির উপর চরম আঘাত। প্রাক ইসলামিক যুগ থেকেই মক্কা মদিনা সহ আশেপাশের সকল পেগান গোত্রই হজ্জ পালন করত।  নবি মোহাম্মাদ (দঃ) ও তার মুসলিম উম্মতের সাথে মক্কার কুরায়েশদের যুদ্ধ, বিবাদ, হত্যা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে মদিনার সাথে মক্কার যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে তাতে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় মদিনার বাসিন্দাদের জন্য নির্দ্বিধায় হজ্জ পালন হয়ত বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল। তার উপর, নবি মদিনায় হিজরতের ১৮ মাস পরে ইয়াহুদিদের পবিত্র জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদ থেকে কিবলা কাবার দিকে পরিবর্তন করেন। এর মুল কারন, নবি মোহাম্মাদ (দঃ) অনেক চেষ্টা করেও মদিনার ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের কাছে নিজেকে নবি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। কাজেই পরিবর্তিত কিবলা কাবায় হজ্জ করা মদিনার মুসলিম উম্মার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমতাবস্থায়, নবি উমরা করার জন্য স্বপ্নে আদিষ্ট হন। নবি ভালভাবেই  জানতেন সেই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা তার দলকে কাবায় প্রবেশে বাধা প্রদান করবে। নবি ৭০ টি কোরবানির জন্য চিহ্নিত পশু (গলায় স্যান্ডেল ঝুলিয়ে, অনেকটা যে ভাবে বর্তমানে কোরবানির গরুর গলায় মালা পরানো হয়)  সহ ১৪০০ সঙ্গী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। নবির আগমন রুদ্ধ করতে কুরাইশরাও অবস্থান নেয়, যার খবর নবি বেদুইনদের মাধ্যমে জানতে পারেন এবং মক্কায় হুদাইবিয়া নামক স্থানে ঘাঁটি গাড়েন। কুরাইশরাও  এই মুসলিম দলের কাবায় প্রবেশ ঠ্যাকাতে অবস্থান নেয়, এমনি একটি অশ্বারোহী দলের নেতৃত্বে ছিলেন খালেদ বিন ওয়ালিদ। বিগত যুদ্ধসমূহতে জান মালের ক্ষয় ক্ষতির কারনে মক্কার কুরাইশরা কোনভাবেই মুসলিম দলকে কাবায় ঢুকতে দিতে রাজি ছিলনা। এই দুই দলের মধ্যে অনেকটা দুতের মাধ্যমে এক ধরনের সমঝোতার চেষ্টা চলতে থাকে। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এই মর্মে কুরাইশদের খবর পাঠান যে উনি ও উনার দল শুধু হজ্জের উদ্দেশে এসেছেন, যুদ্ধের জন্য আসেননি। পরিশেষে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল বিন আমর এর সাথে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর বিখ্যাত  হুদাইবিয়ার চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে নবিকে আল্লাহর রাসুল  হিসাবে উল্লেখ করা থেকে বিরত করে আর আসল নাম মোহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ লেখা হয়।

হুদাইবিয়ার চুক্তির শর্ত সমুহঃ  

চুক্তির মূল বিষয় হল আগামী ১০ বছরের উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ ও সহিংসতা বন্ধ থাকবে। সেই বছর মুসলমানরা হজ্জ না করে ফিরে যাবে ও পরের বছর থেকে হজ্জ করতে পারবে। হজ্জের সময় তারা ৩ দিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবে ও খাপবদ্ধ তরবারি বহন করতে পারবে।

চুক্তির উপধারা সমুহঃ
  • যে কোন গোত্র ইচ্ছা করলে মোহাম্মাদের সাথে চুক্তি বদ্ধ হতে পারবে অনুরূপ যে কেও কুরাইশদের সাথেও চুক্তি বদ্ধ হতে পারবে। (এই সুযোগে বানু খুযায়া নবি মোহাম্মাদের সাথে চুক্তি বদ্ধ হন ও বানু বকর কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন) (ইবন ইসহাক)
  • কেও যদি তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কুরাইশদের মধ্য থেকে মুহাম্মদের দলে যোগ দেয়, তবে মুহাম্মদকে তাকে তার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠাবে।  তবে মুহাম্মদের দল থেকে কেও কুরাইশদের কাছে ফেরত গেলে তাকে মুহাম্মদের কাছে ফেরত পাঠানো হবে না।

(Ref: 1.The Life of Muhammad: A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, A Guillaume.  Oxford University Press, First published in 1955, Seventeenth Impression 2004. Page 748.  2.The History of al-Tabari, Volume VIII, Translated by Michael Fishbein, State University of New York Press, Chapter: The Victory of Islam 1997, Page 86.)

পরবর্তী বিভিন্ন তাফসীর ও আধুনাকালের বর্ণনায় আরেকটি ধারার সংযোজন দেখা যায় যেখানে উল্লেখ করা হয় যে কুরাইশ বা মুহাম্মদের সাথে  চুক্তিবদ্ধ মিত্র গোত্ররা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করলে কুরাইশ বা মুহাম্মদ কারো পক্ষ নিয়ে সাহায্য করবে না।  মুল ইবনে ইসহাক ও আল তাবারিতে  হুদাইবিয়ার চুক্তির শর্ত সমুহে এই ধারাটির উল্লেখ নাই। বানু খুযায়া ও বানু বকরের মধ্যে সহিংসতাকে চুক্তি ভঙ্গের অজুহাত হিসাবে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) পরবর্তীতে মক্কা আক্রমন করেন, তার বৈধতা দিতে গিয়ে, এই ধারাটির উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে।

হুদাইবিয়ার চুক্তির শর্ত সমুহ মুসলমানদের জন্য অবমাননাকর হিসাবে নবির এই চুক্তি সাক্ষরে বহু সাহাবীই ক্ষুব্ধ হন। বিশেষত নবির প্রতিশ্রুতি মত কাবাতে হজ্জ না করতে পারা আর নয়া ইসলাম অনুযায়ী পৌত্তলিকদের নিচু ও অপবিত্র ভাবা সত্ত্বেও তাদের সাথে এই অসম চুক্তি তারা মেনে নিতে পারছিল না। (উমর এই চুক্তি পর আবু জান্দালের ঘটনার সময় মুশরিকদের রক্তকে কুকুরের রক্তের সমতুল্য বলেছেন, ইবন ইসহাক ও আল তাবারিতে  দেখুন) উমর সরাসরি নবিকে জিজ্ঞাসা করে বসেন যে উনি আসলেই আল্লাহর নবি কিনা? এই চুক্তির সাথে সাথেই নবি হজ্জের নিয়ম অনুযায়ি পশু করবানি ও মস্তক মুণ্ডনের নির্দেশ তিনবার দেওয়া সত্ত্বেও কেওই তা পালন করছিলেন না। পরিশেষে নবি তার তাঁবুতে ঢুকে বিবি উম্মে সালামার কাছে এই অভিযোগ করলে, উনার বিবি নবিকে পরামর্শ দেন যেন উনি নিজেই পশু করবানি ও মস্তক মুণ্ডন করেন তাতে অন্যরা নবিকে অনুসরন করবে। এই বুদ্ধিটি সফল হয়েছিল। হুদাইবিয়ার চুক্তি নিয়ে অসন্তুষ্ট সাহাবাদের অন্তর ঠাণ্ডা করতে বিপুল গনিমতের মাল লাভের লোভ দেখিয়ে সুরা ফাতাহ বা “বিজয়” নাজিল হয়।

“আল্লাহ তোমাদেরকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়াদা দিয়েছেন, যা তোমরা লাভ করবে। তিনি তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করবেন। তিনি তোমাদের থেকে শত্রুদের স্তব্দ করে দিয়েছেন-যা তে এটা মুমিনদের জন্যে এক নিদর্শন হয় এবং তোমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন।“ [ সুরা ফাতাহ ৪৮:২০

হুবায়বিয়া থেকে ফিরে নবি মুহাম্মাদ ইয়াহুদি বসতি খাইবার বিনা উস্কানিতে আক্রমন করে বিপুল পরিমান মালে গনিমত লাভ করেন ও বহু ইয়াহুদি হত্যা করেন ও সুন্দরী ইয়াহুদি গোত্র প্রধানের কন্যা সাফিয়াকে বিবাহ করেন, তার স্বামী , পিতা ও অন্যান্য আত্মীয়দের হত্যা করার পর (ধর্ষিত সাফিয়া)। তবে, বানু কুরাইযার মত নবি খাইবারের সকল ইয়াহুদিদের হত্যা না করে বরং জিজিয়া করের আওতায় নিয়ে আসেন, এর ফলে খাইবারের বেঁচে যাওয়া ইয়াহুদিরা তাদের উৎপাদিত খেজুরের ৫০ ভাগ মুসলিমদের জিজিয়া দিতে থাকে। খাইবারের ইয়াহুদিরা সেঁচের মাধ্যমে কৃষিকাজে পারদর্শী ছিল যে কাজ নবির মুসলিম উম্মতরা (মুলত জিহাদে পারদর্শী) পারবে না বিধায় নবি এই বাবস্থা নেন। তবে নবি তাঁর মৃত্যুর পূর্বে মুসলিম ছাড়া সকল ধর্মের মানুষকে আরবভুমি থেকে উচ্ছেদ করার নির্দেশ দিয়ে যান, যার বাস্তবায়নে উমর তার শাসন আমলে খাইবারের অবশিষ্ট ইয়াহুদিদের বিতাড়িত করেন। হুবায়বিয়া চুক্তিতে নাখোশ সাহাবীদের মন রক্ষা করতে খাইবারের মালে গনিমতের ভাগ শুধুমাত্র হুবায়বিয়ায় উপস্থিত সাহাবীরাই পেয়েছিলেন।

(সুত্রঃ তাফসীরে জালালাইন ষষ্ঠ খণ্ড পৃষ্ঠা ১১৬, প্রকাশনায় ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রকাশকাল ২০১০)

কথিত চুক্তিভঙ্গের প্রকৃত ঘটনাঃ

ষষ্ঠ হিজরিতে হুদাইবিয়ার ১০ বছর মেয়াদি  অনাক্রমণ চুক্তি করার মাত্র ২ বছরের কম সময়ের মধ্যে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) আতর্কিত হামলায় মক্কা দখল করে নেন। এক দশকেরও বেশি সময় নিয়ে মক্কায় শান্তিপূর্ণ ভাবে ইসলাম প্রচার করে যেখানে মুসলিম ধর্মান্তরিতদের সংখ্যা ছিল কয়েক শত, মদিনা জীবনে তরবারির মাধ্যমে জিহাদ করে অল্প কয়েক বছরে লক্ষাধিক লোক ইসলামের ছায়াতলে চলে চলে আসেন। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) মদিনায় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপনের পথে প্রধান বাধা ইহুদী সম্প্রদায় বানু কাইনুকা, বানু নাদিরকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ ও বানু কুরাইজা গোত্রের ৯০০ পুরুষ হত্যা করার মাধ্যমে নির্মূল করেন। উপরুন্ত, হুদাইবিয়ার ১০ বছর মেয়াদি  অনাক্রমণ চুক্তির ফলে, কুরাইশদেরদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের আশঙ্কা না থাকায়,  বিনা বাধায়  নবি সহজেই খাইবার আক্রমন করে সেখানকার ইহুদী সম্প্রদায়কে হত্যা ও জিজিয়া করের আওতায় নিয়ে আসেন। বলাবাহুল্য, এই সব জিহাদের ফলে নবি ও তার সাহাবিগন বিপুল পরিমান গনিমতের মাল লাভ করেন। এ ছাড়াও হুদাইবিয়ার চুক্তির পর নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর নির্দেশে তাঁর সাহাবিরা মদিনায় আশেপাশের সকল বসতি ও গোত্রের উপর বহু অভিযান চালান ও ইসলামের তরবাবির আওতায় নিয়ে আসেন (যারা মনে করেন যে এই সকল অভিযানে ইসলামের কথা শুনে সকলে স্বেচ্ছায় ইসলামের ছায়াতলে কলেমা পড়ে যোগ দিয়েছিলেন, তারা দয়া করে আদি সিরাত যেমন ইবন ইসহাক, আল তাবারি ও ওয়াকিদির কিতাব আল মাঘাযি পড়ে দেখবেন ও প্রকৃত ইতিহাস জানতে পাড়বেন)। এই পরিস্থিতিতে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) সামরিক ভাবে মক্কার কুরাইশদের পরাজিত করার মত যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেন। এই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে যুদ্ধ ও লুটপাটের মাধ্যমে মালে গনিমত লাভ করা তৎকালীন মুসলিম উম্মার প্রধানতম পেশায় পরিনত হয়েছিল। বস্তুত, হাদিস- কোরানে যতই বেহেস্তের মদের নহর আর উদ্ভিন্য যৌবনা হুরের লোভ দেখানো হোক না কেন, তৎকালীন মুসলিম উম্মাহ যে গনিমতের মাল ও ইহজীবনের যুদ্ধবিন্দিনি পরনারী আর দাস-দাসি লাভে বেশী আগ্রহী ছিলেন সেটা নবি মোহাম্মাদ (দঃ) নিজেও জানতেন।  

উপরে বর্ণিত সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে, বানু খুযায়া (নবির সাথে মিত্রতার চুক্তি বদ্ধ)   ও বানু বকরের (কুরাইশদের সাথে মিত্রতার চুক্তি বদ্ধ)  মধ্যে ঘটে যাওয়া সহিংসতাকে চুক্তি ভঙ্গের অজুহাত হিসাবে মক্কা আক্রমনের সুবর্ণ সুযোগ নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর নিকট চলে আসে। এর ফলে, উনি হুদাইবিয়ার শান্তি চুক্তি বাতিল করে মক্কা আক্রমনের সুযোগ পেয়ে যান, একই সঙ্গে এই আপোষমূলক চুক্তি যা কিনা উমরের মত আরও অনেক সাহাবির কাছে নবি নবুয়তকে পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল সেই অসন্মান থেকে নিজেকে উচ্চ মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার মোক্ষম মওকা পেয়ে যান।

বানু খুযায়া (নবির সাথে মিত্রতার চুক্তি বদ্ধ)   ও বানু বকরের (কুরাইশদের সাথে মিত্রতার চুক্তি বদ্ধ)  মধ্যে ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিবরন

যদিও নবির মিত্র গোত্র বানু খুযায়ার উপর বানু বকরের আক্রমনে কুরাইশদের সহযোগিতার অভিযোগে নবি হুদাইবিয়ার শান্তি চুক্তি বাতিল করে মক্কা আক্রমন করেন তবে এই সহিংসতার সূচনা বস্তুত করে নবির মিত্র গোত্র বানু খুযায়া। প্রায় সকল তাফসির, অন লাইন ইসলামি লেকচার বা সকল ইস্লামিস্ট অভিন্ন ভাবে প্রকৃত সিরাত ভিত্তিক ইতিহাসকে খণ্ডিতভাবে নিজেদের স্বার্থে উপস্থাপন করেন। প্রকৃত বর্ণনাটি নিম্নরূপ ঃ

ইসলামপূর্ব তথাকথিত জাহেলিয়াতের সময় থেকেই বানু খুযায়া ও  বানু বকরের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। এর সূচনা হয় যখন নবির মিত্র গোত্র বানু খুযায়া বানু বকরের সাথে নিরাপত্তার চুক্তিবদ্ধ  মালিক বিন আব্বাদ নামের এক ব্যাবসায়ীকে তার বাণিজ্য পথে আক্রমন করে হত্যা করে ও তার মালামাল লুটে নেয়। এর প্রতিশোধে বানু বকর, বানু খুযায়ার একজনকে হত্যা করে এবং এই  হত্যার বদলায় বানু খুযায়া, বানু বকরের দিল উপগোত্রের দলপতির তিন পুত্র  সালমা, কুলথুম ও ধুয়াইবকে আরাফার হত্যা নিষিদ্ধ পবিত্রভুমিতে হত্যা করে। এই তিন সন্তান তাদের গোত্রের মান্যগণ্য বলে বিবেচিত ছিলেন। এই হত্যার বিচার বা রক্তপন ইসলাম আসার পর অমীমাংসিত ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে, বানু বকরের আলদিল উপগোত্রের নেতা নাওফাল বিন মুয়াওয়িয়া আল দিলি, বানু খুযায়াকে রাতের বেলা আক্রমন করে, এই আক্রমনে কিছু কুরাইশ বানু বকরের এই উপগোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল, এ ছাড়াও, কুরাইশদের কেও কেও রাতের অন্ধকারে সরাসরি আক্রমনে অংশ নিয়েছিলেন এই ভেবে যে তাদের কেও চিনতে পারবে না। উল্লেখ্য যে মুল কুরাইশ নেতৃত্ব তথা তাদের নেতা আবু সুফিয়ান এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এই যুদ্ধে আলদিল উপগোত্রের নেতা নাওফাল বিন মুয়াওয়িয়া আল দিলি, বানু খুযায়ার বেশ কিছু সদস্যকে পবিত্রভুমিতে আশ্রয় নেওয়ার পরও হত্যা করে। বানু খুযায়া এই খবর মদিনায় নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর নিকট পৌছে দেয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে হুদাইবিয়ার চুক্তি বাতিল করে মক্কা আক্রমন করা হয়। এখানে মুল বক্তব্য হল নবির মিত্র গোত্র বানু খুযায়া ও কুরাইশদের মিত্র বানু বকরের সহিংসতার শুরু করে বানু খুযায়া এবং এই কোন সঠিক বিচার বা তদন্ত না করেই নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এই ঘটনাটিকে নিজ স্বার্থে বাবহার করেছেন।

(Ref: 1. The History of Al-Tabari, Vol VIII, Chapter: The conquest of Mecca, page 160-163. Translated by Michael Fishbein,  State University of New York Press, 1997.  2. The Life of Muhammad: A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, A Guillaume.  Oxford University Press, First published in 1955, Seventeenth Impression 2004. Page 540-543. 3. The Life of Muhammad: Al-Waqidi’s Kitab Al-Maghazi (Routledge Studies in Classical Islam ) Edited by Rizwi Faizer, Published by Routledge 2011. Page 12748-12821.Kindle version)

কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান কর্তৃক সমঝোতা প্রস্তাব নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর প্রত্যাখ্যান  

বানু খুযায়া ও  বানু বকরের ঘটনার সুরাহা ও হুদাইবিয়ার শান্তি চুক্তি বহাল রাখার লক্ষ্য নিয়ে আবু সুফিয়ান মদিনায় নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর নিকট যান তবে এই উদ্যোগে নবি কোন সাড়া দেওয়া তো দুরের উনি আবু সুফিয়ানের সাথে কোন কথাই বলেন নি। আবু সুফিয়ান একে একে নবির প্রধান সাহাবিগন যেমন, আবু বকর, উমর ও আলির কাছে নবির সাথে সমঝোতার জন্য মধ্যস্ততা করার অনুরোধ করে ব্যার্থ হন (সাহাবিদের মধ্যে শুধু উমর দুরব্যাবহার করেন), সিরাতে বর্ণনায় এও আছে যে যখন আবু সুফিয়ান আলির বাসায় যান তখন হাসান হামাগুড়ি দেওয়া শিশু, আবু আবু সুফিয়ান নবি কন্যা ফাতেমাকে এই বলে অনুরোধ করেন যেন ফাতেমা শিশু হাসানকে শান্তির মধ্যস্ততা করতে বলেন। ফাতেমা বলেন যে শিশু হাসান সেই বয়সে পৌছাননি আর কেওই নবির ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেন না। আবু সুফিয়ান ব্যার্থ হয়ে মক্কায় ফেরত যান। মুলত, যেহেতু বানু খুযায়া ও  বানু বকরের ঘটনার কুরাইশদের কিছু লোক বিচ্ছিন্নভাবে বানু বকরকে সাহায্য করেছিলেন যার সাথে কুরাইশদের সামগ্রিক নেতৃত্বের কোন সম্পর্ক ছিলনা সেই কারনে আবু সুফিয়ান সহিংসতা পরিহার করার জন্যই শান্তির প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) তত দিনে মক্কা দখলের ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছিলেন বিধায় তিনি আবু সুফিয়ানের শান্তি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

আবু সুফিয়ানের এই মদিনা সফরের একটি ঘটনা অপ্রাসঙ্গিক হলেও উল্লেখ করছি। মদিনায় পৌঁছে আবু সুফিয়ান প্রথমে তার কন্যা নবির স্ত্রীদের একজন উম্মে হাবিবার বাসায় যান, যখন পিতা আবু সুফিয়ান কন্যা উম্মে হাবিবার খাটে বসতে যান, উম্মে হাবিবা বিছানার চাদর গুটিয়ে নেন। এতে আশ্চর্য হয়ে আবু সুফিয়ান বলেন “ তুমি কি এই জন্য চাদর গুটিয়ে নিচ্ছ যে চাদরটি আমার উপযুক্ত নয় নাকি আমি চাদরটি র উপযুক্ত নই” । কন্যা উম্মে হাবিবা এই বলে পিতাকে উত্তর দেন যে উনি একজন অপবিত্র মুশরিক আর এই চাদরে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) শয্যা গ্রহন করেন। এই উত্তরে পিতা আবু সুফিয়ান ব্যাথিত হয়ে বলেন “হে আমার কন্যা, আল্লাহর দোহাই (মক্কার কাফিরদের কাছেও আল্লাহ প্রধান দেবতা ছিলেন) আমাদের ত্যাগ করার পর তোমার উপর অশুভ ভর করেছে”। যদিও অপ্রাসঙ্গিক, এটি উল্লেখ করার কারন, নিজের নিকট আত্মীয় এমনকি রক্তের সম্পর্কের হলেও মুসলিম না হলে তার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করা ইসলামের বিধান ও শুধুমাত্র ধর্ম বিশ্বাসের পার্থক্যের কারনে পিতা ও কন্যার সম্পর্কের ভিতেরও কি বিপুল পরিমান ঘৃণা করাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে বিধান করা হয়েছে – seta ullekh kora। ইসলামের এই রুলিংটি , হালের সালাফি জিহাদি যেমন আইসিস, আল কায়েদা বহুল ভাবে ব্যবহার করেন এবং এরই ভিত্তিতে লক্ষ লক্ষ মুসলিম যুবক নিজ পরিবার ত্যাগ করে হিজরতের মাধ্যমে জিহাদে যোগদান করেন (তবে এই ক্ষেত্রে নামে মুসলিম অভিভাবকদের তাকফিরের মাধ্যমে হয় কাফির অথবা জেহাদে অংশ না নেওয়ায় সহি মুসলিম নয় বলে ফাতওয়া দেওয়া হয়)। এই কৌশলটি বা ধারাটি জিহাদিদের পরিভাষায় মিল্লাতে ইব্রাহিম বলা হয়। এই সংক্রান্ত আয়াতগুলো নিম্নরূপঃ  

আর ইব্রাহীম কর্তৃক স্বীয় পিতার মাগফেরাত কামনা ছিল কেবল সেই প্রতিশ্রুতির কারণে, যা তিনি তার সাথে করেছিলেন। অতঃপর যখন তাঁর কাছে একথা প্রকাশ পেল যে, সে আল্লাহর শত্রু তখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিলেন। নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম ছিলেন বড় কোমল হৃদয়, সহনশীল। [ সুরা তাওবা ৯:১১৪ ]

তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। কিন্তু ইব্রাহীমের উক্তি তাঁর পিতার উদ্দেশে এই আদর্শের ব্যতিক্রম। তিনি বলেছিলেনঃ আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করব। তোমার উপকারের জন্যে আল্লাহর কাছে আমার আর কিছু করার নেই। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তোমারই উপর ভরসা করেছি, তোমারই দিকে মুখ করেছি এবং তোমারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন। [ সুরা মুমতাহিনা ৬০:৪ ]

নবি মোহাম্মাদ (দঃ) কর্তৃক প্রথমে হুদাইবিয়ার শান্তি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ

হুদাইবিয়ার  চুক্তির একটি শর্ত হোল কেও যদি তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কুরাইশদের মধ্য থেকে মুহাম্মদের দলে যোগ দেয়, তবে মুহাম্মদকে তাকে তার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠাবে।  তবে মুহাম্মদের দল থেকে কেও কুরাইশদের কাছে ফেরত গেলে তাকে মুহাম্মদের কাছে ফেরত পাঠানো হবে না। বানু খুযায়া ও  বানু বকরের ঘটনার বহু আগেই নবি হুদাইবিয়ার চুক্তির বর্ণিত শর্তটি ভঙ্গ করেন যার বর্ণনা আপনার কোরানের আল মুমতাহিনা সুরায় পেয়ে যাবেন।

মুমিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আগমন করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে, তা তাদের দিয়ে দাও। তোমরা, এই নারীদেরকে প্রাপ্য মোহরানা দিয়ে বিবাহ করলে তোমাদের অপরাধ হবে না। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা চেয়ে নাও এবং তারাও চেয়ে নিবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটা আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। [ সুরা মুমতাহিনা ৬০:১০ ]

(সুত্রঃ তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা মুমিনুল হক, প্রকাশক ঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, একাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৪, প্রথম প্রকাশঃ জুন ২০০১। ইবনে ইসহাকে পৃষ্ঠা ৫০৯ এ উপরের বর্ণনার দ্বিতীয় নারি উম্মে কুলসুমের কথা বলা হয়েছে )

উপরের কোরানের আয়াত ও তাফসির অতি সুস্পষ্ট অর্থাৎ নবি মোহাম্মাদ (দঃ) হুদাইবিয়ার  চুক্তির বরখেলাপ করে ইসলাম গ্রহণকারী মুমিনা নারিদের মক্কায় তার স্বামী বা অভিভাবকদের কাছে ফেরত পাঠান নি। উপরুন্তু তিনি এই সব নারিদের কাফের স্বামীর সাথে বিবাহ বাতিল করে দিয়েছেন এমনকি যেসব হিজরত করা সাহাবি নবির সাথে মদিনায় ছিলেন তাদের মক্কায় অবস্থানরত কাফের স্ত্রীদেরও হারাম করে দেন, এর ভিত্তিতে উমর মক্কায় তার দুই কাফের স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দেন। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) কর্তৃক  হুদাইবিয়ার  চুক্তির এই শর্ত ভঙ্গের দুটি অজুহাত তাফসির বা অন্যান্য লেখায় পাওয়া যায়, প্রথমত,আল্লাহর নির্দেশে আয়াত বা অহি নাজিলের প্রেক্ষিতে এই চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে, আর দ্বিতীয় যুক্তিটি বেশ হাস্যকর, যুক্তিটি অনেকটা এই রকমঃ  চুক্তির শর্তে শুধু পুরুষদের বুঝানো হয়েছে কাজেই নারিদের ক্ষেত্রে এই শর্ত প্রযোজ্য নয়, অনেক বর্ণনায় জাকির নায়েকের দাহাহা মানে উটপাখির ডিম এই জাতীয় শব্দের খেলা খেলে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে শর্তের “কোন ব্যাক্তি” আরবিতে শুধুমাত্র পুরুষবাচক বুঝায় ইত্যাদি।   

উপরে বর্ণিত নারিদের বেলায় চুক্তি ভঙ্গের পূর্বে আবু বশির নামের আরেকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী মক্কা থেকে পালিয়ে মদিনায় নবির দলে যোগ দিতে আসে। তবে এই ঘটনায় নবি চুক্তি মোতাবেক আবু বশিরকে নিতে আসা মক্কার দুইজনের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে পথিমধ্যে আবু বশির এই দুই মক্কাবাসীর একজনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার তরবারির ধার পরীক্ষা করার কথা বলে সেই তরবারির আঘাতে হত্যা করে। নিহতের সঙ্গী আবু বশিরের থেকে পালিয়ে মদিনায় নবির কাছে এই ঘটনা জানায়। ইতোমধ্যে আবু বশির মৃত মক্কাবাসির মালামাল লুট করে মালের এক পঞ্চমাংশ নবিকে দেওয়ার জন্য হাজির হয় (ইসলামের বিধান অনুযায়ী সকল গনিমতের মালের পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তাঁর নবির প্রাপ্য, যেহেতু আল্লাহ নিজে কোন মাল গ্রহন করেননা, তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে নবি সেই মালে গনিমতের অংশ নিয়ে থাকেন – সুরা আনফাল দ্রষ্টব্য)। তবে এই ক্ষেত্রে নবি এই খুনের কোন বিচার করেন নি যদিও উনি উক্ত মালে গনিমত গ্রহন করেন নি এবং আবু বশিরকে আশ্রয় দেন নি বরং আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এই ঘটনায় যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতে পারে। মক্কায় সোহাইল বিন আমর যখন তার গোত্রের মক্কাবাসির হত্যাকাণ্ড জানতে পারেন, তখন এই হত্যার রক্তপনের জন্য কুরাইশ নেতাদের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান এই ঘটনায় নবি মোহাম্মাদকে দায় মুক্তি দেন ও আবু বাশির মুসলিম হলেও রক্তপনের দায় নবি মোহাম্মাদের উপর বর্তায় না বলে রায় দেন।

আবু বশির আল ইস নামের এক স্থানে আশ্রয় গ্রহন করে যা ছিল মক্কা থেকে সিরিয়ার বাণিজ্য পথের মধ্যে। এই স্থানে আবু বশির মক্কা থেকে পালিয়ে আসা আরও ৭০ জন মুসলিমদের নিয়ে এক ডাকাত দল গঠন করে আর নিয়মিত মক্কার বাণিজ্য কাফেলায় আক্রমন চালিয়ে ব্যাপক খুন খারাবি ও লুটতরাজ করতে থাকে। এই কাজে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কাবাসি নবিকে এই ডাকাত দলকে মদিনায় ফেরত নিতে বলেন, যা নবি মুহাম্মদ করেন, যদিও আবু বশির  মদিনায় আসার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। (Al-Waqidi’s Kitab Al-Maghazi, Routledge Studies in Classical Islam, Edited by Rizwi Faizer, Published by Routledge 2011. Page 10327-10399)

উপরের বর্ণিত ইসলাম গ্রহন করা আবু বশিরের ঘটনার সাথে বানু খুযায়া ও বানু বকরের ঘটনার তুলনা করলে দেখা যায়, একিই রকম ঘটনায় কুরাইশরা নবির বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তোলেন নি, যেখানে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) বানু খুযায়া ও বানু বকরের ঘটনায় গুটি কয় কুরাইশদের যুক্ত থাকার অভিযোগে হুদাইবিয়ার চুক্তি ভেঙ্গে মক্কা আক্রমন করেন এমনকি এই বিষয়ে নবি আবু সুফিয়ানের সমঝোতা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। আবু বশিরের ঘটনা বাদ দিলেও মক্কা থেকে পালিয়ে আসা নারিদের তাদের স্বামী বা অভিভাবকের কাছে ফেরত না দিয়ে নবিই প্রথম হুদাইবিয়ার  চুক্তির বরখেলাপ করেছেন।

ইসলামী এপলজিস্টগন প্রায় ঢালাও ভাবে কাফের বা ইয়াহুদিদের বিরুদ্ধে কথিত চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে তাদেরকে পায়কারী হারে জবাই করার যে অদ্ভুত বৈধতা দিয়ে থাকেন তার একটি বস্তুনিষ্ঠ জবাব দেয়ার জন্য এই চুক্তি ও চুক্তিভঙ্গের বিস্তারিত আলোচনা করা জুরুরি ছিল। প্রায় একই উপায়ে ইসলামী এপলজিস্টগন বানু কুরাইজার ৯০০ সাবালক পুরুষকে একদিনে জবাই করার বৈধতা দিয়ে থাকেন। আরও আশ্চর্য বিষয় হল এর প্রতি সমর্থন জানিয়ে অন্যান্য moderate ইস্লামিস্টগন এও বলেন যে সকল উন্নত দেশেও যে কোন চুক্তিভঙ্গের শাস্তি নাকি মৃত্যুদণ্ড, ভাবখানা এমন যে ছাত্র দেরি করে ক্লাসে আসলে বিদ্যালয়ের চুক্তিভঙ্গের জন্য তারও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া জায়েজ।   

জিহাদি ও রাজনৈতিক  ইসলামী আলেমদের দৃষ্টিতে সুরা তাওবার গুরুত্ব

তাফসীর ফী যীলালিল কোরানের নবম খণ্ড, মুল রচনা সাইয়েদ কুতুব

ইখওয়ানুল মুস্লেমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড বা বিশ্বব্যাপী জামাতে ইসলামের আদর্শিক গুরু তথা রাজনৈতিক ইসলামী মতবাদের প্রাণপুরুষ যার মতাদর্শে আল কায়েদার বর্তমান নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি, আল কায়েদার মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতা তথা ওসামা বিন লাদেনের আদর্শিক শিক্ষক ও যাকে আধুনিক জিহাদের জনক বলা হয় সেই আব্দুল্লাহ আযযামের আদর্শিক গুরু সাইদ কুতুব ( Al-Qaeda’s Egyptian Prophet: Sayyid Qutb and the War On Jahiliya ) তাফসীর ফী যীলালিল কোরানের নবম খণ্ডে সুরা তাওবার বিস্তারিত তাফসির করেছেন ও আধুনা মুসলিম তথা সমগ্র মানবজাতির জন্য এই সুরার বিধানের রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

পৃষ্ঠা ৩০

পৃষ্ঠা ৪৩ (উপরের বর্ণনায় সুরা তওবার ৪ ও ৫ নং আয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে)

(সুত্রঃ তাফসীর ফী যীলালিল কোরানের নবম খণ্ড, মুল রচনা সাইয়েদ কুতুব। অনুবাদ ও সম্পাদনা হাফেজ মুনির উদ্দিন আহমদ। আল কোরান একাডেমী লন্ডন, প্রকাশক খাদিজা আখতার রেজায়ী, সপ্তম সংস্করন আগস্ট ২০০৮)

ফী যীলালিল কোরানের নবম খণ্ডে সুরা তওবার ৫ নং আয়াতের সাথে সম্পর্কিত কিছু চুম্বক অংশ উল্লেখ করা হল। উপরের বর্ণনা পড়লে আপনারা এটা হয়ত স্বীকার করবেন যে সাইদ কুতুব রাজনৈতিক ভাবে বাস্তববাদী ছিলেন, যে কারনে প্রথমে উল্লেখিত অংশে সুরা তওবা মোতাবেক বর্তমানের মুসলমানরা যে দুনিয়ার সকল কাফের মুশরিকদের ৪ মাসের আল্টিমেটাম দিয়ে তাদের তরবারির আওতায় নিয়ে আসতে পারবে না সেটা স্বীকার করে নিয়েছেন, কিন্তু তাই বলে “ইসলাম শান্তির ধর্ম” এই অজুহাতে জিহাদকে ত্যাগ না করার ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন। ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলে একে জিহাদ বিবর্জিত এক ধরনের “রসালো ইসলাম” তৈরি করাকে এক সুদুর প্রসারী ইয়াহুদি-নাসারা চক্রান্ত বলে মনে করছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ওয়াযকারি মাওলানা মাহমুদুল হাসান গুনবী। সাইদ কুতুবের সুরা তওবা ভিত্তিক ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনটি মওলানা গুনবী সাহেব রাখ ঢাক না করেই বর্ণনা করেছেন। পাঠকদের জন্য উনার ইউ টিউব ভিডিও টির লিঙ্ক দেওয়া হল।

“যে বয়ানে রক্তকরন হবে, একবার শুনে দেখুন” (সঠিক বানান হয় রক্তক্ষরণ অথবা রক্ত গরম বুঝাতে চেয়েছিলেন)  

শেষ অংশে ইসলামের আলোকে মানবজাতিকে যে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে অর্থাৎ, মুসলিম, মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ  অমুসলিম বা কাফের ও অচুক্তিবদ্ধ অমুসলিম বা কাফের – সুরা তওবা ভিত্তিক মানব শ্রেণিবিন্যাস সাইদ কুতুব তুলে ধরেছেন। এই শ্রেণিবিন্যাসটি বস্তুত সকল জেহাদিরা সকল নিরপরাধ অমুসলিমদের নির্বিচারে হত্যার কোরান ভিত্তিক বৈধতা হিসাবে ব্যবহার করেন। লেখার শুরুতে উল্লেখিত শ্রীলঙ্কায় চার্চে বোমা হামলাকারী ইসলামী আলেম মৌলোভী  জাহারান হাশিম ঠিক এই শ্রেণিবিন্যাসটি তার খুদবায় বলেছেন। সেভাবেই তিনি অচুক্তিবদ্ধ অমুসলিম বা কাফেরদের হত্যা করা কোন অপরাধ মনে করেন নি।

সাইদ কুতুবের সবচেয়ে বিখ্যাত বইয়ের নাম মা-আলিম ফি আল তারিক ইংরাজিতে “মাইলস্টোন” বাংলায় “আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র” পাঞ্জেরী ইসলামিক পাব্লিকেশন্স  এটি প্রকাশ করেছে, এ ছাড়াও অনেক ইসলামি প্রকাশনা এই বইয়ের জিহাদ অধ্যায়টি আলাদা ভাবে মুসলিম ভাইদের হেদায়েতের সুবিধার্তে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেছেন। কোরান ও হাদিসের পর বিশ্বব্যাপী এই পুস্তিকাটি মুসলিম ব্রাদারহুড, জামাত-শিবির সহ সকল সালাফি জিহাদিদের কাছে একটি টেক্সট বইয়ের মত অবশ্যপাঠ্য। এই বইয়ে সাইদ কুতুব আধুনিক বিশ্বের সকল মানব রচিত নিয়ম-কানুন, আইন-আদালত, পার্লামেন্ট, রাষ্ট্র বাবস্থা, মতাদর্শকে নয়া জাহেলিয়াত হিসাবে গণ্য করেছেন এবং শুধুমাত্র কোরান হাদিসের আলোকে তাগুতি আইন বাতিল করে আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়া ভিত্তিক সমাজ বাবস্থাই মুসলমানদের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন। ইসলামি রাষ্ট্র বাবস্থায় সুরা তওবার অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে এই বইয়ের জিহাদ অধ্যায়ে সুরা তওবার আয়াত আলোচিত হয়েছে। নীচে বর্ণিত অংশগুলো সাইদ কুতুবের রচিত মাইলস্টোন” যা বাংলায় “আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র” অনুবাদক হাফেজ আবু তাসমিয়া, পাঞ্জেরী ইসলামিক পাব্লিকেশন্স  ঢাকা, হতে উদ্ধৃত।

পৃষ্ঠাঃ ৮২

পৃষ্ঠাঃ ১৬০

উপরের বর্ণনা ভালভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সুরা তাওবার বিধান অনুযায়ী জিহাদের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির উপর ইসলামী শাসন বাবস্থা কায়েম করার কথা বলা হয়েছে এবং ইসলাম ব্যাতীত কোন ভিন্ন মত বা বাবস্থা বরদাস্ত করা হবে না, এই ক্ষেত্রে কোন পরমত সহিষ্ণুতা বা উদারনীতি গ্রহন করা হবে না। ঠিক এই ইসলামী আকিদার ভিত্তিতেই সকল ইসলামি জিহাদি দল গুলো  যে কোন রাষ্ট্র, গোত্র, স্থাপনা,ভিন্ন মতের মসজিদ, মন্দির, গির্জা, সিনেমা হল, রমনা বটমুল, হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে মানবজীবনের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভুতি না দেখিয়ে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে হামলা চালায়।   

ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম এর তাফসীরে সুরা তাওবা

নিচে উদ্ধৃত অংশগুলো ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম এর তাফসীরে সুরা তাওবা থেকে নেয়া, এর অনুবাদ মাওলানা নাসিম আরাফাত, নানুতবী রহঃ প্রকাশনা থেকে অক্টোবর ২০১২ সালে প্রকাশিত । ইসলামি জিহাদ ও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সুরা তাওবার অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনা করে ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা যুবকদের মনে ইসলামি জেহাদি জোশ ও উদ্দীপনা জাগাতে  পেশওয়ারে মসজিদে বক্তৃতা মালার সমন্বয়ে সুরা তাওবার এই তাফসীর বর্ণনা করেন যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, সকল জেহাদি ও জামাতি আদর্শের সৈনিকদের জন্য সাইদ কুতুবের লেখার পাশাপাশি এইটিও অবশ্যপাঠ্য। ৪৬০ পৃষ্ঠার এই পুস্তকের শুধুমাত্র তরবারির আয়াতের সাথে সম্পর্কিত অংশ উদ্ধৃত করা হল, এতে উনার লেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়, পাঠকদের জন্য উনার পুস্তকের লিঙ্ক তথ্যসূত্রে উল্লেখিত থাকবে।

১৯৪১ সালে ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহন করা আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযযামকে বলা হয় আধুনিক বিশ্বব্যাপী ইসলামী জিহাদের জনক (Father of global jihad) Abdullah Yusuf Azzam উনি ওসামা বিন লাদেনের শিক্ষাগুরু ও ওসামাকে আফগান জেহাদে উনিই নিয়ে আসেন ও আল কায়েদা সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। লস্করে তাইয়েবা নামের পাকিস্থানি ইসলামি জিহাদি সংগঠনের উনি একজন সহ- প্রতিষ্ঠাতা। উনি পেশওয়ারে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা ইসলামি জেহাদি যুবকদের ট্রেনিং ও সহি ইসলামি শিক্ষা দিতেন। ১৯৮৯ সালে পেশওয়ারের মসজিদে খুদবা দিতে যাওয়ার পথে পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে দুই পুত্রসহ নিহত হন। ডাঃ আয়মান আল জাওাহিরির নেতৃত্বাধীন মিশরীয় ইসলামি জিহাদিদের এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ি করা হয়। জিহাদ ও এর জন্য সংগৃহীত বিপুল অর্থের খরচ, হিসাব,তস্রুফ ইত্যাদি সংক্রান্ত আভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারনে এই হত্যাকাণ্ডটি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। শিক্ষাগত যোগ্যতা ঃ দামাস্ক বিশ্ববিদ্যালয় হতে শরিয়া আইনে বি,এ ডিগ্রি ১৯৬৬, ১৯৭১ সালে মিশরের আল আযহার হতে ইসলামি আইনে মাসটারস (পুরস্কার প্রাপ্ত), একই বছর ইসলামি আইনের বিজ্ঞান ও দর্শনের (উসুলল ফিকহ) এর উপর পি,এইছ, ডি ডিগ্রি লাভ। উনি রাজনৈতিক ভাবে মুসলিম ব্রাদারহূড (বাংলাদেশ জামাতে ইসলামি তথা বিশ্ব ব্যাপী অনুরূপ সকল ইসলামি রাজনৈতিক দলের মাতৃ সংগঠন)  এর নেতা ছিলেন ও একই সংগঠনের নেতা সাইদ কুতুবের ইসলামি লেখায় অনুপ্রানিত ছিলেন, আকিদায় আব্দুল্লাহ আযযাম ছিলেন সালাফিপন্থি। ডঃ আব্দুল্লাহ আযযামের শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে কোন মোডারেট মুসলিম যদি বলে উনি ইসলাম তথা সুরা তওবা বুঝেন নি, তাহলে তাদের ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নাই। নীচের তাফসিরে অন্যান্য তাফসিরের মতই বক্তব্য পাওয়া যায়, তবে “আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক” এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উনি ইসলামের জন্য গুপ্তহত্যার কোরান ভিত্তিক বৈধতা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এই নির্দেশে ইয়াহুদি কবি কাব বিন আশরাফকে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কাপুরুষের মত হত্যাকেও মহিমান্বিত করা হয়েছে।

পৃষ্ঠা

 পৃষ্ঠা ৫৩

সুরা তাওবার তরবাবির আয়াতের ইসলামিক ডিফেন্স ও ইসলামিক বক্তাদের ব্যাখ্যাঃ Context of “Out of context”

তরবারির আয়াতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সকল তাফসির বিশ্লেষণ যতটা শ্রমসাপেক্ষ ছিল, এই আয়াতকে মানবিক ও যৌক্তিক প্রমান করতে ইস্লামিষ্টদের মিথ্যাচারকে প্রমান করা ঠিক ততোটাই সহজ। এর কারন প্রায় সকল ইসলামি বক্তা অথবা সকল ইস্লামিষ্টদের লেখায় মুলত এক ও অভিন্ন দাবী করা হয় যেঃ

 ১। তরবারির আয়াতটি যুদ্ধকালিন আয়াত কাজেই “অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” এটিকে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে না দেখে ইসলাম বিরোধীরা এটির ভুল ব্যাখ্যা করে থাকে। বিভিন্ন বক্তা এটি বর্ণনা করতে গিয়ে এও বলেন যে “ যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যা করবে নাকি শত্রুকে আদর-সোহাগ করবে? এটি বলার সাথে উনারা আমেরিকা, রাশিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্র যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে হত্যা এই উদাহরন দিয়ে বিপুল করতালি অর্জন করেন। উনারা “out of context” ব্যাকটি এতই ব্যবহার করেন যে বহু নিরক্ষর বা সল্প শিক্ষিত মুমিনদের অন্তত বিভিন্ন উচ্চারণে এই বাক্যবাণটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। তরবারির আয়াতটি যে মোটেও যুদ্ধকালিন নয় এবং মক্কা সম্পূর্ণ নবির দখলে ও শান্তিপূর্ণ থাকা অবস্থায়  অযুদ্ধরত কাফের- মুশরিকদের প্রতি এক তরফা ঘোষণা, তা ইতোপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

অন্যান্য যে সব দাবি করা হয়, সে গুলো একত্র করলে মোটামুটি নীচে বর্ণিত বিষয়গুলোর মধ্যে পড়ে।

২। “তরবারির আয়াতের হত্যার বিধান শুধুমাত্র হুদাইবিয়ার চুক্তি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য”।  এটিও সর্বইব মিথ্যা যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। মুল কথা হল কারো সাথে মুসলমানদের চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, দুইটি গোত্র বাদে সকল কাফের- মুশরিকদের ৪ মাসের আল্টিমেটাম বেঁধে দেওয়া হয়। তবে বনু কিনানার দুটি গোত্র বনু যমারা ও বনু মুদলাজকে তাদের সাথে করা চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ দেওয়া হয় (৯ মাস চুক্তির মেয়াদ বাকি ছিল), যেহেতু তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধ কোন গোত্রকে সাহায্য করে নি। তবে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে এরাও তরবারির আয়াতের হত্যার বিধানের আওতায় চলে আসবে। পাঠক যারা একটি আদেশের সহজ সাধারন আইনগত কার্যকারিতা বুঝতে সক্ষম, তারা অতি সহজেই  অনুধাবন করতে পারবেন যে সকল কাফের- মুশরিকরাই এক সময়ে এই তরবারির আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এর বাস্তব প্রমান এই যে নবির জীবদ্দসায়ই আরব উপদ্বীপে আর কোন কাফের- মুশরিক (পেগান ধর্মের) অবশিষ্ট ছিল না। আর বহুল উচ্চারিত তথাকথিত চুক্তি ভঙ্গের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে প্রকৃতপক্ষে প্রথম চুক্তি ভঙ্গকারী  স্বয়ং নবি মোহাম্মাদ (দঃ) নিজে, সেটাও আলোচনা করা হয়েছে। উপরুন্তু, কাফের- মুশরিকদের চুক্তি ভঙ্গকারী  হিসাবে ধরে নিলেও। কোন চুক্তি ভঙ্গ করলেই যে ঐ পুরো জাতি – গোষ্ঠীকে নির্বিচারে  হত্যা করা বৈধ, এই ধরনের আম আদেশকে মহিমান্বিত করাটাই বা কতটুকু মানবিক।  

৩। তৃতীয় এই যুক্তিটি মুল ধারার ইসলামি বক্তারা সাধারণত করেন না, যেহেতু এটি নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর করে যাওয়া উদাহরনের বিপরীত। এই যুক্তিটি আমি শুধুমাত্র ইয়াসির কাদির বক্তবে পেয়েছি। (ইয়াসির কাদি ইসলামের বিবিধ বিষয়ে সর্বচ্চো একাডেমীক ডিগ্রীধারী ইসলামি আলোচক ও apologist, সালাফি আলেমরা উনাকে সহি আকিদার মনে করেন না)। যুক্তিটি হল, তরবারির আয়াতটি শুধুমাত্র তৎকালীন মক্কার মুশরিকদের জন্য প্রযোজ্য, যেহেতু পরবর্তী আমলে, যেমন উমাইয়া, আব্বাসিয়, অটোম্যান ও মোঘল মুসলিম রাজ্যে মুশরিকরা বসবাস করেছে। এই যুক্তির সমস্যা হল এতে কোরানের আয়াতকে কালের ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য বেঁধে ফেলা, এতে কোরানের সার্বজনীনতা খর্ব করা হয়। অর্থাৎ কোরানের আয়াত তথা বিধি-বিধান সর্বকালের সকলের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) তার জীবনকালে জয় করা সকল অঞ্চলেই কাফের মুশরিকদের হয় কতল করেছেন অথবা তারা বাধ্য হয়ে অথবা নিজ স্বার্থে ইসলাম গ্রহন করেছে। নবি মোহাম্মাদ (দঃ) শুধুমাত্র আহলে কিতাব বা ইয়াহুদি-নাসারাদের থেকে জিজিয়া নিয়েছেন। পারস্য বিজয়ের পর উমর অগ্নি উপাসক যা জরথ্রুস্ত্রদেরও জিজিয়ার আওতায় নিয়ে আসেন।

৪। সুরা তওবার ৬ নং আয়াতকে অনেকেই ৫ নং আয়াতের হত্যার হুমকির বিপরীতে যুক্তি হিসাবে পেশ করে থাকেন। “আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।“ [ সুরা তাওবা ৯:৬ ]

একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় এই ৬ নং আয়াত নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের একটি পূর্বশর্ত বা কৌশল মাত্র। এটি কোন কাফির মুশরিকদের ধর্ম পালনের অধিকারের ঘোষণা নয় যে, আশ্রয় প্রার্থনা করলে বিনা বাধায় নিজ ধর্ম পালন করতে দেওয়া হবে।  এই আশ্রয় দেওয়াটি শর্তহীনও নয়। এখানে শর্ত হল  আল্লাহর কালাম শুনে যাতে সে বা তার গোত্রের লোকেরা ইসলাম ও তার নবি মোহাম্মাদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয় অথবা ইসলাম গ্রহন করার সুবিধা আর গ্রহন না করলে কি অসুবিধা এই খবর তার নিজ গোত্রের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, শুধুমাত্র এই শর্তেই কোন মুশরিক মুসলিমদের কাছে আশ্রয় চাইতে পারে। তরবারির আয়াতের আওতায় ৪ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর মুশরিকদের হাতে তিনটি রাস্তা খোলা থাকে ঃ হয় ইসলাম গ্রহন অথবা আরবভুমি ত্যাগ করে চলে যাওয়া অথবা নিজ ধর্মে বহাল থেকে মুসলিমদের হাতে নিহত বা বন্দি হওয়া, এই ক্ষেত্রে নবি তথা মুসলমানদের কোন বিরোধিতা না করে ঘরে লুকিয়ে থাকলেও রক্ষ্যা নেই কারন তরবারির আয়াতে বলা আছে “তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক।“ অর্থাৎ কোন ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ না নিলেও কাফির মুশরিকদের পাড়া মহল্লায় খুঁজে বের করে হত্যা করা হবে।  কোন কাফির মুশরিক যদি ৬ নং আয়াত অনুযায়ী মুসলিম দলের আশ্রয় প্রাথনা করে ও আল্লাহর কালাম শোনার পর ইসলাম গ্রহন না করে নিজ গোত্রের কাছে ফিরে যায়, তাতে যে তার জান মালের রক্ষার গ্যারান্টি হয়ে গেল এমন কথা ৬ নং আয়াতে বলা হয় নাই।

যদিও তরবারির আয়াতটি সম্পূর্ণ শান্তি বিরাজমান অবস্থায় নবি মোহাম্মাদের (দঃ) নিয়ন্ত্রনে থাকা মক্কার অযুদ্ধরত কাফির মুশরিকদের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে তথাপি ইসলামিস্টগন এই ৬ নং আয়াতে আল্লাহর কালাম শোনার পর কাফির মুশরিকদের নিরাপদ স্থানে পৌছে দেওয়ার বিধানকে  যুদ্ধকালিন তুলনাহীন ইসলামি দয়ার উদাহরন হিসাবে পেশ করে থাকেন। তবে ইতিহাসে বা সমসাময়িক বহু যুদ্ধে প্রতিপক্ষের প্রতি অস্ত্র ত্যাগ করলে সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করার উদাহরন প্রচুর এবং রক্তপাত এড়াতে প্রায় সকল যুদ্ধেই প্রথমে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়ে প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়, কাজেই ৬ নং আয়াতের বিধানকে যুদ্ধের বিধান হিসাবে ধরে নিলেও, এটি মোটেও নজিরবিহীন কোন ঘটনা নয়। ১৯৭১ সালে আত্মসমর্পণ করা প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানী সেনাদের নিরাপদেই তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল কোন শর্ত আরোপ ছাড়াই।  ৬ নং আয়াতের তাফসিরগুলো নিচে উল্লেখ করা হল।

Ibn Juzayy:

(If any of the mushrikun asks you for protection, give them protection) That comes from juwâr, i.e. they ask for security, so grant them security so that they can hear the Qur’an to see whether they will become Muslim or not. (then convey them to a place where they are safe) If they do not become Muslim, return him to his place. This is a firm judgement in the view of some people while other people say that it is abrogated by fighting.

ইবন জুজি তার তাফসিরে বলেছেন, কোন কাফির মুশরিক যদি ৬ নং আয়াত অনুযায়ী মুসলিম দলের আশ্রয় প্রার্থনা করে ও আল্লাহর কালাম শোনার পর ইসলাম গ্রহন না করে তবে তাকে নিজ গোত্রের কাছে  পৌঁছে দিতে হবে – এটি একদলের মতামত অপরপক্ষে অন্যরা মনে করেন পরবর্তী যুদ্ধের আয়াতের দ্বারা কোন মুশরিক ইসলাম গ্রহন না করলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিধান বাতিল হয়ে গেছে। 

[As-Sawi: If he wants to leave without becoming Muslim, then convey him to his people so that he can reflect on the matter. After that it is then permitted for you to fight them in order to establish the proof against them.]

বিখ্যাত মালেকি স্কলার আস সাউই তার তাফসির গ্রন্থ হাসিয়াত আল সাউই আলা আল- জালালাইনে বলেছেন, কোন কাফির মুশরিক আল্লাহর কালাম শোনার পরও যদি ইসলাম গ্রহন না করে তবে তাকে নিজ গোত্রের কাছে  পৌঁছে দিতে হবে। অতঃপর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বৈধ হবে এবং তাকে যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও সে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেনি, এটা তার বিরুদ্ধে প্রমান স্বরূপ ব্যবহার করা যাবে। 

as-Suyuti:

This ayat contains the obligation of granting protection to an idolater when he asks for it in order to listen to the Qur’an and talk to the people of Islam so that doubt will be removed from him. If he does not become Muslim, then he must be conveyed to a place where he is safe. It is not obligatory to grant protection for any other reason. The ayat contains the obligation of calling people to Islam before fighting them.

আল সুয়ুতি তার তাফসির গ্রন্থ আল ইকলিল ফি ইস্তিনাবাত আত-তানযিলে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইসলামের দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও যে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেনি তাকেও তার গোত্রের কাছে  নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে হবে। কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার বাধ্যকতা এই আয়াত বলা হয়েছে। কোন কাফির মুশরিককে শুধুমাত্র আল্লাহর কালাম শুনার জন্য আশ্রয় দেওয়া যাবে আর অন্য কোন কারনে আশ্রয়দানের কোন বাধ্যকতা নাই।   

সারকথা ৬ নং আয়াতের যে শর্তসাপেক্ষ আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদানের কথা বলা হয়েছে তা কোন ভাবেই তার পূর্ববর্তী তরবারির আয়াতের কতল করার বিধানকে বাতিল করে না। কোন তাফসিরকারকও  এ কথা বলেননি। ৬ নং আয়াতের বিধানটিকে এই অর্থে কাফির মুশরিকদের জন্য কিছুটা ছাড় হিসাবে ধরা যেতে পারে যে, কোন কাফির মুশরিকের মনে যদি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কোন জিজ্ঞাসা থাকে তবে তাকে সেটি জানার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইসলাম গ্রহন করলে সে কি সুবিধা পাবে আর না গ্রহন করলে তার ও তার গোত্র বা পরিবারের ভাগ্যে কি আছে এটা জেনে সেই কাফির মুশরিক ও তাদের গোত্র একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারবে। এই সুযোগ রাখার ফলে আরও বেশি বেশি গোত্র ইসলাম ও তার নবির ঘোষণা সম্বন্ধে জানতে পারবে ও হয় ইসলাম গ্রহন করবে অথবা বর্জন করে এর ফলাফল ভোগ করবে।

তরবারির আয়াতের পক্ষে ইসলামি টেলি – দাওয়াতি (Televangalist) ব্যাক্তিত্ব  ও আলেমদের উদাহরনঃ

১। জনাব জাকির নায়েক বর্তমানে সম্ভবত নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর পরে মুসলিম সমাজে সবচেয়ে জনপ্রিয়।

পাঠকদের অনুরোধ করব জনাব জাকির নায়েকের এই মাত্র সাড়ে তিন মিনিটের ভিডিওটি দেখার জন্য। অর্ধ সত্যের সাথে মিথ্যা মিশিয়ে একটি তিক্ত গরলকে কিভাবে মিষ্টি সরবত বানিয়ে বোকা দর্শক শ্রোতাদের গিলিয়ে দেওয়া যায়, বোধ করি এর চেয়ে ভাল উদাহরন আপনারা আর পাবেন না। এই ভিডিওটিতে উনি মুলত “ যুদ্ধক্ষেত্রের আয়াত যা out of context বা প্রেক্ষাপট” বিবেচনা না করে তরবারির আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বলে লেকচার দিয়েছেন। এই যুক্তি যে সর্বইব মিথ্যা তা পাঠকরা ইতোমধ্যে জেনে গেছেন। উনার ইংরাজি  বক্তব্যের মূল সারবস্তুর অনুবাদ পাঠকরা মিলিয়ে নেবেন। প্রথমত, উনি বলেছেন যে সুরা তওবার ৫ নং আয়াত নাজিলের আগেই আল্লাহতালা মুশরিকদের আল্টিমেটাম দিয়েছেন এই বলে ৪ মাসের মধ্যে তোমরা “সোজা হয়ে যাও” নতুবা “যুদ্ধঘোষণা” (Allah has given an ultimatum to the Mushriks of Mecca. You put things straight in 4 months or a declaration of war).  বোধসম্পন্ন পাঠকরা লক্ষ্য করুন জনাব জাকির নায়েক “৪ মাসের মধ্যে তোমরা সোজা হয়ে যাও” বলেছেন, প্রকৃত আয়াতের মুল কথা  হচ্ছে ঃ তওবা করে নামজ কায়েম করে ও জাকাত প্রদান করে ইসলাম গ্রহন কর নচেৎ দেশ ছেড়ে চলে যাও আর না গেলে যেখানে পাওয়া যাবে হত্যা করা হবে। কাফির মুশরিকদের যে জোর করে ইসলাম ধর্ম পালন করতে বলা হচ্ছে সেটি পুরোপুরি বাদ দিয়ে উনি বলছেন “৪ মাসের মধ্যে তোমরা সোজা হয়ে যাও”। এই ধরনের মধুর মৃদু শাসন সুলভ বাক্য ব্যবহার করে জনাব জাকির নায়েক “মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” এর মত বর্বর বক্তব্যকেও শরাবান তাহুরার মত সুমিষ্ট করে তুলেছেন। দর্শকদের মুহর্মুহ করতালিতে এটাই প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় যে বিষয়টি আপনারা শুধু জনাব জাকির নায়েক নয় বরং সকল ইস্লামিস্টদের মধ্যে কমন পাবেন, তা হল বার বার “যুদ্ধক্ষেত্র” এই শব্দটি ব্যবহার করা। এর কারণটি অতি সহজ, যে মানব মনস্তত্বের সার্বজনীন চেতনার সুযোগ (Exploit) উনারা নেন সেটি হল যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি হয় মারবেন নয় মরবেন, সবচেয়ে কোমল হৃদয়ের মানুষটিও এই মনস্তত্বের বাইরে নন। যার ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা বলে ইস্লামিস্টরা খুন-লুটপাট – মালে গনিমত – যুদ্ধবন্দিনি ধর্ষণ সব কিছুকেই জায়েজ করে নিতে চান।  জনাব জাকির নায়েক বলছেন “ In the battlefield Allah says: Where ever you find them kill them. This is in context of battlefield”. যে কথাটি জাকির নায়েক সাহেবরা আপনাদের বলেন না বা কথার মার প্যাচে আপনারা ভাবেন না, সেটা হল যুদ্ধ,  যুদ্ধক্ষেত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমরসজ্জায় সজ্জিত দুটি পক্ষ থাকে। সুরা তাওবার কাফের- মুশরিকরা কি নবির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল?  না তারা ঢাল তলোয়ার নিয়ে অবস্থান নিয়ে ছিল? তৎকালীন মক্কার কাফেররা নবি কর্তৃক মক্কা বিজয়ের পর কোন বিদ্রোহ – আন্দোলন করেছিল এমন কোন ঘটনাও জানা যায় না। এই সকল ইসলামবাজদের ক্রমাগত মিথ্যাচারের ফলে কোন সাধারন মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয় প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করা। জনাব জাকির নায়েকের বলা “চুক্তিভঙ্গ” আর ৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যা পূর্বেই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

২। শাইখ মুহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম (জন্ম:১লা মার্চ, ১৯৬০) হলেন একজন মুসলিম স্কলার, বক্তা এবং ইস্ট লন্ডন মসজিদের বর্তমান ইমাম ও খতীব।তিনি হলেন ইউরোপের সবচেয়ে বিখ্যাত স্কলারদের মধ্যে একজন,এবং বিশ্বের ওলামারা তাহাকে শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ এশিয়ান আলেম হিসাবে মনে করেন। তিঁনি যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ মুসলিমদের সবচেয়ে বড় জামায়েতকে সেবা প্রদান করেন। পাশাপাশি তিনি বাংলা ভাষার ইসলামিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল পিস টিভি বাংলার অনুষ্ঠানে নিয়মিত বক্তব্য রাখেন।

উইকিপিডিয়া থেকে উদ্ধৃত উপরের বর্ণনা থেকে শাইখ মুহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুমের ইসলামি জ্ঞানের যোগ্যতাকে কেউ প্রশ্ন করতে পারবেন না। জনাব জাকির নায়েককে অনেক সহি মুসলিমরাই মিথ্যাবাদী ভণ্ড –প্রতারক মনে করায়, একজন বাংলাভাষী প্রথাগত ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত আলেমের বক্তব্য উদাহরণ হিসাবে নেয়া যেতে পারে। প্রায় ৬০ মিনিটের এই তাফসির বর্ণনায় ৫১ মিনিট থেকে পরের ৩-৪ মিনিটে তরবাবির আয়াত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে উনি বলছেন “ হজ্জের মাসগুলো পার হয়ে গেলে, যারা মুশরিক আছ, তাদের সাথে ত তোমরা যুদ্ধাবস্তায় বিরাজমান আছ, চুক্তি শেষ এখন যুদ্ধের কথা। তাহলে তোমরা তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানের মত বিবেচনা করে, তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর, পাকড়াও কর, ঘেরাও কর, যেখানে ওৎ পেতে থাকতে হবে সেখানে পজিশন নিয়ে থাক…এখানে যুদ্ধের context ……out of context….ইসলাম রক্তপাত চায় না।“  শাইখ মুহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম সাহেবও এই  “যুদ্ধের context” এর মিথ্যাচার থেকে দূরে থাকতে পারলেন না। আর পারাটা সম্ভবও  নয়। তরবাবির আয়াতকে বড়জোর ছুরি-  চাকুর আয়াতে নামানো যেতে পারে তবে একে ফুলের আয়াত বানানোর চেষ্টা করাটাই বৃথা।  

প্রিন্ট মিডিয়ায় তরবাবির আয়াত ও অন্যান্য তাফসির বিকৃতি  

আধুনিক মানবতা ও মুক্ত চিন্তার আলোকে, হাদিস- কোরানের অনেক অপ্রিতিকর, হিংসাত্মক, অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিষয়গুলো সাধারন মানুষের পাশাপাশি বহু আলেম ওলামাদেরও লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। তার উপর ইসলামি জঙ্গিবাদের ক্রমবর্ধমান প্রচার ও প্রসারের ফলে অনেককেই  হাদিস- কোরান নিয়ে নতুন করে ভাবা শুরু করেছেন। অপর দিকে ধর্মভিত্তিক ব্যাবসা আর রাজনীতি চলে আসছে যুগের পর যুগ। এ থেকেই শুরু হয়েছে  হাদিস- কোরানের শব্দ বা বাক্য পাল্টানো, কখনবা তাফসিরের পুরো অধ্যায় গায়েব।

এখন দেখা যাক তরবারির আয়াত নিয়ে ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান কর্তৃক অনুবাদকৃত  ইবনে কাসীরের ২০১৪ র ভার্শনকে  ২০০৪ এর ভার্শনের থেকে কিভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে । ২০১৪ র পুনর্লিখিত  ভার্শনে  ৫ নং আয়াতের অনুবাদ ও তাফসিরের বর্ণনায় “যুদ্ধ” শব্দটি নতুন ভাবে সংযজন করা হয়েছে। এটি করা হয়েছে এই আয়াটিকে যুদ্ধের আয়াত বলে চালিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসাবে। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমানই সৌদি আরবের প্রখ্যাত দারুস সালাম প্রকাশনী থেকে ২০০৭ সালে বাংলা তাফসীর কুরানুল কারিমের তৃতীয় সংস্করনের পৃষ্ঠা ৩৫৩ তে সুরা তওবার ৫ নং আয়াতের সঠিক অনুবাদ করে তাতে  যে “যুদ্ধ” শব্দটি সংযজন করেন নি।

https://www.quraneralo.com/quran/Quran_Arabic+Bangla_Translation.pdf

বাংলা তাফসীর কুরানুল কারিমের তৃতীয় সংস্করন, দারুস সালাম প্রকাশনী থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত

২০১৪ সালে পুনর্লিখিত ভার্সন ঃ “তাদের সাথে যুদ্ধ কর এবং হত্যা কর। “৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যার শুরুতে যে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ “যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক আয়াত” – এটিও নয়া আমদানি। ইবনে কাসীরের তাফসীরের কোন অনুবাদেই এই শিরোনামটি নেই। অর্থাৎ তরবাবির আয়াতকে যুদ্ধের আয়াত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে এই অসাধুতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

(তাফসীর ইবনে কাসীরের  অপ্রিতিকর অংশ ছেঁটে ফেলা ২০১৪ এর সংস্করণ, আরবি আয়াতে “যুদ্ধ” শব্দ না থাকলেও এখানে যুক্ত করা হয়েছে )

২০০৪ সালের সংস্করণে ৫ নং আয়াতের তাফসিরে মোট চারটি তরবারির আয়াতের কথা লেখা আছে হযরত আলির বরাত দিয়ে, ২০১৪ সালে সম্পাদনা পরিষদ কর্তৃক পুনর্লিখিত ভার্সনে অতিরিক্ত ভায়লেন্স এড়াতে এই তরবারির আয়াতগুলো চেপে যাওয়া হয়েছে। উপরুন্তু, ইবনে আব্বাসের উক্তি “ প্রকৃতপক্ষে সুরা তাওবা নাজিল হওয়ার ৪ মাস পরে আর কোন চুক্তিই বহাল থাকে নি, এখন বাকি শুধু ইসলাম ও জিহাদ” থেকে “এখন বাকি শুধু ইসলাম ও জিহাদ” এই কথাটি ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

( ২০০৪ সালের সংস্করণে সঠিক অনুবাদে “যুদ্ধ” শব্দটি নেই এবং চারটি তরবারির আয়াতের বর্ণনা আছে )

(তফসিরে তাওযিহুল কুরআন পৃষ্ঠা ৫২২, প্রথম খণ্ড, মুল রচনা মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানি, অনুবাদ মাওলানা আবুল বাসার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম। প্রকাশক মাকতাবাতুল আশরাফ, এপ্রিল ২০১০। ব্রাকেটে “যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল” বলে যা লেখা হয়েছে, তা কোরানের আয়াতে নেই, অর্থাৎ নয়া সংযোজন। উল্লেখ্য, এই অনুবাদক নিজে কোরানে নতুন শব্দ “যুদ্ধ” সংযুক্ত করার সাহস দেখান নি)

কোন অনুবাদের ক্ষেত্রে মুল লেখকের লেখাকে পরিবর্তন করা একটি গর্হিত অপরাধ যদি না অনুবাদে উল্লেখ করা হয় ভাবানুবাদ অথবা সংক্ষিপ্ত সংস্করন। শুধু ইবনে কাসীরের তাফসীরের বাংলা চারটি তাফসীরের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমানের আছে ২০০৪ ও ২০১৪ র সংস্করন ,আছে তাফসীরে ইবনে কাছীর চতুর্থ খণ্ড, অধ্যাপক আখতার ফারুখ অনুদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় সংস্করন (উন্নয়ন), মার্চ ২০১৪ আরও আছে ডঃ আবু বকর মুহাম্মদ জাকারিয়া সম্পাদিত আরেকটি ইবনে কাসীরের তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীরের ইংরাজি অন লাইন ভার্শন থেকে  দাসী মারিয়ার সাথে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) এর যৌন সঙ্গম ও একে কেন্দ্র করে নবিপত্নিগনের সাথে মনমালিন্যের  এর পুরা বর্ণনাই বাদ দেওয়া হয়েছে অথচ , মুল ইবনে কাসীরের সুরা আত তাহারিম এর তাফসিরে এই নিয়ে দুই পৃষ্ঠা ব্যাপী বর্ণনা আছে । যদিও ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমানের অনুবাদে, তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি কর্তৃক জানুয়ারী ২০১০ সালে প্রকাশিত তাফসীর ইবনে কাসীরের ১৭ তম খণ্ডে , দাসী মারিয়ার সাথে যৌন সঙ্গম  উল্লেখ না করে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) “কথা বলছিলেন” বলা হয়েছে, তবে মার্চ ২০১৪ এর সংস্করনে দাসী মারিয়ার পুরো অধ্যায়ই গায়েব করে দেয়া হয়েছে , এই সংস্করনে শুধুমাত্র দুর্বল “মধু খাওয়ার” বর্ণনাটি রাখা হয়েছে। আগ্রহি পাঠকগণ “নবী মোহাম্মদ (দঃ) এর দাসী মারিয়া আল কিবতিয়া ও অতঃপর” লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন, এই লেখার সাথে প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ডঃ ইয়াসির কাদির এই সংক্রান্ত তথ্য বহুল ভিডিওর লিঙ্ক দেওয়া আছে।

২০১০ সালে প্রকাশিত তাফসীর ইবনে কাসীরের ১৭ তম খণ্ডে দাসী মারিয়ার ঘটনার উল্লেখ আছে

সুত্রঃ তাফসীর ইবনে কাসীর,নবম সংস্করণ জানুয়ারী ২০১০,  অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ১৭ তম খণ্ড)  

২০১৪ এর সংস্করনে দাসী মারিয়ার পুরো অধ্যায়ই বাদ দিয়ে শুধুমাত্র দুর্বল “মধু খাওয়ার” বর্ণনাটি রাখা হয়েছে।

সুত্রঃ তাফসীর ইবনে কাসীর, মার্চ ২০১৪,  অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ১৭ তম খণ্ড, সম্পাদনা পরিষদ কর্তৃক পুনর্লিখিত)  

মক্কা বিজয়ের পর নবি মোহাম্মাদ (দঃ) যে কয়জন কাফেরকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নবির ওহী লেখক আব্দুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারাহ যিনি লক্ষ্য করেন যে নবির ওহীর শব্দ ,বাক্য অনেক্ষেত্রেই আবি সারাহর পরামর্শ অনুযায়ী নবি পরিবর্তন করেন। এর ফলে আবি সারাহর মনে নবির নুবুয়ত নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয় এবং তিনি ইসলাম ত্যাগ করে মক্কায় চলে যান এবং এ কথা কুরাইশদের বলে দেন যে নবি মোহাম্মাদ (দঃ) কিছুতেই  আল্লাহর নবি হতে পারেন না। তিনি ছিলেন উসমানের দুধ ভাই এবং মক্কা জয়ের পর উসমানের সুপারিশে তাকে আর হত্যা করা হয় নি। এই ঘটনা বলার উদ্দেশ্য এই জন্য যে, কোরানের শব্দ পরিবর্তন, সংযজন, বিযোজন ইসলামের দৃষ্টিতে একটি গর্হিত অপরাধ। আল্লাহতালা নিজে তাঁর কোরান হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন। তরবারিরর আয়াতের অনুবাদ করার ক্ষেত্রে  ইসলাম সম্পর্কে, কোরানের পবিত্রতা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান থাকার পরেও উপরে উল্লেখিত ইসলামি পণ্ডিতগন জেনে শুনে কিভাবে কোরানের আয়াত পরিবর্তন করেন এটা কল্পনা করা দুরুহ, এর একটা ব্যাখ্যা এটা হতে পারে যে, এই কিতাব বেশি বেশি অধ্যয়ন করে ইনারা এর মোজেজার ব্যাপারে অবিশ্বাসীতে পরিনত হয়েছেন, তাই এর আয়াত পরিবর্তন করতে উনাদের হাত মোটেও কাঁপেনি।   

নিধার্মিকের  দৃষ্টিতে তরবারির আয়াত 

যে বাক্তির কোন ধর্মের প্রতি কোন অনুরাগ বা বিরাগ নাই অথবা ভিনগ্রহ থেকে যদি কেও এসে ভক্তিবাদি দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিয়ে নিরপেক্ষ ভাবে এই তরবাবির আয়াত বিশ্লেষণ করে, সে কিভাবে এর অর্থ করবে ? সুরা তওবা শুরুই হয়েছে একটি ঘৃণাবাচক  সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে ঃ “সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।“  যেই আল্লাহ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তথা মানবজাতি সহ সকল কিছুর স্রষ্টা, তিনি কি পারেন তার সৃষ্টির সাথে সর্বতোভাবে সম্পর্কচ্ছেদ করতে? একজন সাধারন পিতা বা মাতা কি তার সন্তানের সাথে এত সহজে সম্পর্কচ্ছেদ করে? শুধু তাই নয় সুরা তওবার তিন নং আয়াতে আল্লাহ তার নিজেকে মুশরেকদের থেকে দায়িত্বমুক্ত ঘোষণা করেছেন। “মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরেকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রসূলও।“ একজন মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ কি পারেন তার সৃষ্টি থেকে নিজেকে সকল দায়িত্ব মুক্ত হিসাবে ঘোষণা করতে ?  এটা যেন কোন পাষণ্ড কর্তৃক তার অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে জন্মানো শিশুকে ডাস্টবিনে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার মত। যখন একজন নিধার্মিক প্রথম কয়েক আয়াত পড়ে তরবারির আয়াতে পাঠ করবে “অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” তখন এটা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে এটা একজন সৃষ্টিকর্তার বানী হতে পারে না, কোন শীর্ষ সন্ত্রাসীর মুখে হয়ত এটা মানায় এমনকি কোন উগ্র রাজনীতিবিদ যদি তার নির্বাচনী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এইরূপ মন্তব্য করেন, উন্নত বিশ্বে তার জেল জরিমানা হওয়ার সম্ভবনা আছে।

যদিও তরবারির আয়াতটি কোন যুদ্ধের বা যুদ্ধকালিন আয়াত নয় তবুও তর্কের খাতিরে সেরকম ধরে নিলেও এই আয়াতের বর্বরতার ও স্বেচ্ছাচারিতার কোন কমতি করা দুষ্কর। যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমনের কিছু সুনির্দিষ্ট কারন উল্লেখ করা হয় যার মধ্যে প্রধানতম হল অপরপক্ষ দ্বারা আক্রান্ত হওয়া বা তার আশঙ্কা দেখা দেওয়া। মক্কা বিজয়ের পর তারই  শাসনাধীন মক্কার কাফির- মুশরিকরা নবির বিরুদ্ধে কোন আক্রমন,অস্ত্রধারন, সৈন্য সমাবেশ কিছুই করেনি, তারা তাদের যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করা পৌত্তলিক ধর্ম পালন করে আসছিল, অন্য কারও ধর্ম পালনে বাধা না দিয়ে। তাদের উপর তরবারির আয়াত নেমে আসার একমাত্র কারন হিসাবে সুরা তওবায় উল্লেখিত হয়েছে ইসলাম ধর্ম গ্রহন না করা। এমনকি যে কাবা শরীফে তারা ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের বহু আগে থেকেই যে হজ্জ পালন করে আসছিল সেই ধর্ম পালনের অধিকারটিও হরন করা হয়। এর কারন হিসাবে সুরা তওবার ২৮ নং আয়াতে কাফির- মুশরিকদের অপবিত্র হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবনে আব্বাসের মত প্রধান সাহাবী ও সবচেয়ে বেশী কোরানের জ্ঞান সম্পন্ন তাফসীরকারী মুশরিকদের কুকুরের চেয়ে অপবিত্র বলেছেন, যা ইবনে কাসীরের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ ঘাঁটলে হয়ত এরকম বর্ণবাদী আয়াত বা শ্লোক পাওয়া যাবে। কোন নিধার্মিক হয়ত কোনটাকে প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান দেবেন, তবে তাতে মুল বক্তব্যের খুব বেশি উনিশ বিশ হবে না। আধুনা বিশ্বে আমরা জাতি,ধর্ম, বর্ণ বা মতের বিভেদের কারনে জাতিগত নির্মূল অভিযান (Ethnic cleansing) দেখেছি,  তরবাবির আয়াতের প্রধান বক্তব্য “মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” এই একই প্রক্রিয়ার উদাহরণ, একে “আল্লাহর বানী” বা “যুদ্ধকালীন আয়াত” যে নামেই ডাকা হোক না কেন। কোন প্রগাঢ় ধার্মিক না জেনেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে এই অমোঘ বানী “মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও” পাঠ করে আসছেন আর তাঁর নিজের ও নিজ পরিবাবের শান্তি আর নিরাপত্তার জন্য সেই একই স্রষ্টার দরবারে হাত তুলছেন।

বিশ্বের  শতকরা নব্বই ভাগ তথাকথিত “মোডারেট মুসলিম” হয়ত তরবাবির আয়াতের প্রকৃত সত্য জানেন না অথবা জানার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। যারা এই তরবাবির আয়াতটি  ১৪০০ বছর আগের সালাফদের অনুসরণ করে বর্তমান দুনিয়ায় প্রয়োগ করেন সেই সব আইসিস, আল কায়েদা, বকো হারাম, আন্সারুল্লাহদের জেহাদি কর্মকাণ্ড এই সব “মোডারেট মুসলিম”দের বিচলিত করে না, কারন উনারা হাদিস- কোরান না পড়েই সব জেনে গেছেন তাই সহজেই এই জেহাদিদের হাতে লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ মানুষের  প্রানহানিতেও তাঁরা বিজ্ঞের মত বলতে পারেন “ এরা সহি মুসলিম নয়, ইসলাম সন্ত্রাস সমর্থন করে না” আর কেও যদি কষ্ট করে ইসলামি জ্ঞান লাভ করতে চান – চিন্তা নেই – সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন হায্রাত জাকির নায়েকের মুখে। ইসলামের গোলমেলে যে কোন বিষয়কে রসগোল্লা বানিয়ে খাইয়ে দেবেন এই জাকির নায়েক সাহেবরা, আর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে “মোডারেট মুসলিম” ভাই-বোনেরা তার নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বে আত্মতৃপ্তি নিয়ে ঘুমুতে যাবেন আর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মদদ দিয়ে যাবেন এই তরবারির আয়াতের জল্লাদদের।

তথ্য সুত্রঃ

১। The History of al-Tabari, Vol 9, The Last Years of the Prophet, Translated by Ismail K. Poonawala, Published by State University of New York Press, Albany, 1990; page 21.  See also: Attab ibn Asid

২। তাফসীর

Asbab Al-Nuzul by Al-Wahidi


{ وَمِنْهُمْ مَّن يَقُولُ ٱئْذَن لِّي وَلاَ تَفْتِنِّي أَلا فِي ٱلْفِتْنَةِ سَقَطُواْ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيطَةٌ بِٱلْكَافِرِينَ }

(Of them is he who saith: Grant me leave (to stay at home) and tempt me not…) [9:49]. This was revealed about Jadd ibn Qays the hypocrite. This is because when the Messenger of Allah, Allah bless him and give him peace, was preparing for the Battle of Tabuk, he said to him: “O Abu Wahb, would you not like to have scores of Byzantine women and men as concubines and servants?” He said: “O Messenger of Allah, my people know that I am very fond of women and, if I see the women of the Byzantines, I fear I will not be able to hold back. So do not tempt me by them, and allow me not to join and, instead, I will assist you with my wealth”.

ইসলামি ফাউনডেসন থেকে ২০০৪ সালে প্রকাশিত ইবনে কাসিরের বিখ্যাত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থের ৫ নং খণ্ডের ১৭ নং পৃষ্ঠা, তাফসীর ইবনে কাসীর,চতুর্থ সংস্করণ জানুয়ারী ২০০৪,  অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ৮,৯,১০,১১ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭১৯, তাফসীরে জালালাইন দ্বিতীয় খণ্ড , প্রকাশনায় ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রকাশকাল ২০১০ পৃষ্ঠা ৬৭৮ তেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়।

৩। ফিলিপ কে  হিট্টিঃ পৃষ্ঠা ১৪৭, আরব জাতির ইতিহাস। মল্লিক ব্রাদারস  ১৯৯৯।

বিভিন্ন তাফসীর ও সিরাত গ্রন্থের তথ্যসুত্র লেখার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। আল তাবারির তাফসিরের যে খণ্ডে সুরা তাওবা রয়েছে তার কোন বাংলা বা ইংরাজি সংস্করন না পাওয়ায় প্রধানতম এই তাফসীর ছাড়া অন্য প্রায় সকল প্রধান তাফসীরের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। একই বক্তব্য থাকার কারনে লেখার মধ্যে সকল তাফসীরের নাম উল্লেখ করা হয় নাই। যে সকল তাফসীর ও  সিরাতের সাহায্য নেওয়া হয়েছে নিম্নে তার তালিকা দেওয়া হল।

৪। তাফসীর ইবনে কাসীর,চতুর্থ সংস্করণ জানুয়ারী ২০০৪,  অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ৮,৯,১০,১১ তম খণ্ড)

৫। তাফসীর ইবনে কাসীর,অনুবাদক ঃ ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক ঃ তাফসীর  পাবলিকেশন কমিটি, ৮,৯,১০,১১ তম খণ্ড ২০১৪ সালে সম্পাদনা পরিষদ কর্তৃক পুনর্লিখিত

৬। তাফসীরে ইবনে কাছীর চতুর্থ খণ্ড, অধ্যাপক আখতার ফারুখ অনুদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় সংস্করন (উন্নয়ন), মার্চ ২০১৪

৭। সুরা আত – তাওবার তাফসির। অনুবাদক ঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের। সম্পাদনাঃ ডঃ ডঃ আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়া

৮। তাফসীরে জালালাইন দ্বিতীয় খণ্ড, প্রকাশনায় ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রকাশকাল ২০১০)

৯। তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা এ, বি, এম, মাঈনুল ইসলাম, প্রকাশক ঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৪, প্রথম প্রকাশঃ জুন ১৯৯৯) 

১০। তাফসীরে মাযহারী, কাযি ছানাউল্লাহ পানিপথি (রাঃ), অনুবাদকঃ মওলানা মুমিনুল হক, প্রকাশক ঃ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া, একাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৪, প্রথম প্রকাশঃ জুন ২০০১।

১১। ডঃ আব্দুল্লাহ আযযাম এর তাফসীরে সুরা তাওবা থেকে নেয়া, এর অনুবাদ মাওলানা নাসিম আরাফাত, নানুতবী রহঃ প্রকাশনা থেকে অক্টোবর ২০১২ সালে প্রকাশিত)

১২। তাফসীর ফী যীলালিল কোরানের নবম খণ্ড, মুল রচনা সাইয়েদ কুতুব। অনুবাদ ও সম্পাদনা হাফেজ মুনির উদ্দিন আহমদ। আল কোরান একাডেমী লন্ডন, প্রকাশক খাদিজা আখতার রেজায়ী, সপ্তম সংস্করন আগস্ট ২০০৮)

১৩।  

Surat at-Tawba: Repentance : Tafsir

Combined summary of Tafsir from

Ibn Juzayy: at-Tashil fi ‘ulum al-Qur’an

Jalalayn: Tafsir al-Jalalayn

As-Sawi: Hashiya (gloss) on the Jalalayn

Ibn Kathir: Mukhtasar Tafsir Ibn Kathir

As-Suyuti: al-Iklil fi Istinabat at-Tanzil

ডাউনলোড

১৪। তাফসীর কুরানুল কারিমের তৃতীয় সংস্করন ডাঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, সৌদি আরবের প্রখ্যাত দারুস সালাম প্রকাশনী থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত

১৫। তফসিরে তাওযিহুল কুরআন পৃষ্ঠা ৫২২, প্রথম খণ্ড, মুল রচনা মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানি, অনুবাদ মাওলানা আবুল বাসার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম। প্রকাশক মাকতাবাতুল আশরাফ, এপ্রিল ২০১০।

১৬। তাফসিরে মারেফুল কুরআনঃ  মুফতি মুহাম্মদ শফী রহঃ অনুবাদঃ মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহঃ প্রকাশনায়ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

১৭। তাফহীমুল কুরআনঃ সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী

সিরাতগ্রন্থ সমুহঃ

১৮। The Life of Muhammad: Al-Waqidi’s Kitab Al-Maghazi (Routledge Studies in Classical Islam ) Edited by Rizwi Faizer, Published by Routledge 2011.Kindle version

১৯। The Life of Muhammad: A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, A Guillaume.  Oxford University Press, First published in 1955, Seventeenth Impression 2004. )

২০। The History of al-Tabari, Volume VIII, Translated by Michael Fishbein, State University of New York Press, Chapter: The Victory of Islam 1997.)  :Other volumes used to cross check references.

২১। আর রাহীকুল মাখতূম’ শাইখ আল্লামা সফিউর রহমান মুবারকপুরি কর্তৃক রচিত

অন্যান্য পুস্তকঃ

২২। সাইদ কুতুবের লেখা  মা-আলিম ফি আল তারিক ইংরাজিতে “মাইলস্টোন” বাংলায় “আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র” পাঞ্জেরী ইসলামিক পাব্লিকেশন্স  এটি প্রকাশ করেছে।

Facebook Comments

shubochon

A free thinking human being and humanist

Leave a Reply

%d bloggers like this: