আমি কেন ধর্ম মানি না – ১

লেখকঃ শ্যামল চ্যাটার্জ্জী 

শুরু করি ফিরদৌসি তাজিক কবিতার সংকলন থেকে চারটি লাইন দিয়ে। 

“ঝুঁকি নিতে হবে সব বোঝার জন্য
পৃথিবীর সব বাধা
আরোহণ কর – আগুয়ান হও
পরোয়া না করে বাঁধা।”

এ বড় অদ্ভুত দায়। ‘ঈশ্বর নেই’ প্রমান দিতে হয় তাদের যারা ঈশরে অবিশ্বাসী। যারা ঈশ্বরে বিশ্বাসী তাদের যুক্তিটা ভারী অদ্ভুত। বেদ, বাইবেল, কোরাণ ইত্যাদি ধর্ম তাদের প্রমান্য। যদিও এইসব গ্রন্থের বয়স সাড়ে ছয় হাজারের বেশী নয়। কিন্তু এই সাড়ে ছয় হাজার বছরের আগেও মানুষ ছিল। তখন কী তাহলে ঈশ্বর ছিল না? এইক্ষেত্রে ঈশ্বরবিশ্বাসীদের যুক্তি ছিল লিপিবদ্ধ ছিল না। এই যুক্তি নিয়ে বিরোধ নেই। কিন্তু প্রমান্য হিসেবে তারা বলে ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’। একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায় এই যুক্তি কতটা হাস্যকর।

‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’ – এই কথা নিয়েই এগোনো যাক। আমি যদি বলি ঘোড়ার ডিম আছে। আপনারা কেউ বিশ্বাস করবেন কি? নিশ্চয় না। সেটাই স্বাভাবিক। দেখাতে বলবেন মানে অস্তিত্বের প্রমান চাইবেন। মানুষের বিশ্বাস গড়ে ওঠে যুক্তিকে নির্ভর করে। অর্থাৎ যুক্তি ছাড়া বিশ্বাস গড়ে ওঠে না। আরো স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে কোন কিছুর ঘটনা বা প্রমানের ব্যাপারে কার্য কারণ সম্পর্ক থাকে। আর ঈশ্বর বিশ্বাসীরা ঈশ্বর প্রমান দিতে কোন প্রমান্য না দিয়ে ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’ এই বাক্যটি হাজির করেন। এছাড়াও কোন বিতর্কে যেতে চান না। বরঞ্চ ঈশ্বর বিশ্বাসীরা কোণঠাসা হয়ে গেলে তাদের নখ দাঁত বেড়িয়ে আসে ধর্মের শান্তির আলখাল্লার ভিতর থেকে। এর উদাহরণ আছে ঝুড় ঝুড়ি।

বিজ্ঞানের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিরোধের কথা আমাদের সবারই জানা। যেমন সক্রেটিশকে হেমলক পান করতে হয়েছিল, জিওদ্রানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, আর্কের জোয়ানকেও একই কারনে শাস্তি পেতে হয়েছিল। আমাদের দেশও এর বাইরে নয়। উদাহরণ তো এই বাংলাতেও আছে। যা আমরা সবাই জানি। ধর্মীয় কুয়াচারের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার কারণে রামমোহন আর বিদ্যাসাগরকেও অনেক হেনস্থা হতে হয়। ধর্মকে ভিত্তি করেই ধর্মীয় আচার গড়ে ওঠে বা গড়ে তোলা হয়। তার সুনির্দিষ্ট কারন আছে। তার ব্যাখ্যায় পরে আসব। ধর্মের সেই হিংস্র চরিত্র আজো বর্তমান। তার উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনারা সবাই জানেন। এবার ভূমিকা ছেড়ে প্রসঙ্গে আসা যাক।
ধর্মের উৎপত্তি অজ্ঞনতা থেকে এবং ভয় থেকে। থুড়ি একটা ভুল হয়ে গেল। ধর্ম নয় ঈশ্বর চিন্তা হবে। ধর্ম চিন্তা মানুষের মনে অনেক পরে আসে। আদিমকালে মানুষ প্রাকৃতিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। তাদের ধারণা ছিল সমস্ত প্রাকৃতিক কার্য ঘটে কোন এক আধিভৌতিক কারণে। নিয়ানডারথাল কাল থেকেই মানুষ চিন্তা করতে শুরু করে বা মস্তিষ্কের ব্যবহার করা শুরু করে। ফলে একদল মানুষের চিন্তায় আসে পৃথিবীর এই সমস্ত কাজের পিছনে অবশ্যই কোন কার্য-কারন-সম্পর্ক আছে। ফলে আমরা বলতেই পারি অ-বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু একই সময় থেকে।

সমাজ পরিবর্তনের সাথে ঈশ্বর চিন্তায় ভর করে গড়ে ওঠে ধর্ম। শুরুতে যদিও ধর্মের কোন নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না বলেই মনে হয়। যাযাবর জীবনযাত্রা থেকে যখন স্থায়ী জীবনযাত্রায় মানুষ আসার কিছুকাল পরেই আজকের এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের জন্ম। মূলত ভৌগলিক ও সামাজিক কারনে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম গড়ে ওঠে তাদের চরিত্র আলাদা হয়। মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে জানিয়ে রাখি ধর্মের কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে মূলত দুটি কারনে,

এক) অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন ও
দুই) উন্নত চিন্তার সাথে কায়েমী স্বার্থের সংঘাত।

ধর্ম চিন্তারর এই পরিবর্তনকে মূলতঃ পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়। 
১) আদিম,
২) প্রাচীন,
৩) ঐতিহাসিক,
৪) প্রাক আধুনিক ও
৫) আধুনিক।

এই আধুনিক ধর্মের সৃষ্টি এখন হয় নি। এই সম্পর্কে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। শুধু বলতে পারি এই ধর্মে ‘ঈশ্বর’ জাতীয় কিছুর কোন স্থান নেই। ভিত্তি হবে মূল্যবোধ।
ঈশ্বর বিশ্বাসের তিনটি অঙ্গ আছে। 
১) বিশ্বাস (Belief)
২) প্রার্থনা (Worship) এবং
৩) সংগঠন (Organisation)
ধর্মের সাংগঠনিক রূপটি কিন্তু শুরুতে ছিল না। প্রাক আধুনিক যুগে এটি চূড়ান্ত রূপ পায়। পৃথিবীতে যত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মমত আছে তার কোনটার বয়স ৩০০০ বছরের বেশি নয়। হিন্দুধর্ম ৩০০০ হাজার। পৃথিবীতে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সংখ্যা আনুমানিক ৪৩০০।

যদিও হিন্দু ধর্ম কী? তার উত্তর জানা নেই। এইটুকু বলা যেতে পারেই বেদকে ভিত্তি করে যে ধর্মাচারণ করা হয়। তাকেই হিন্দু ধর্ম হিসেবে পরিচিত। আমার মতে ‘হিন্দু ধর্ম’কে বৈদিক ধর্ম বলা উচিত। খ্রীস্টধর্ম ২০০০ বছর, ইসলাম ১৩০০ বছর, বৌদ্ধ ধর্ম ১৪০০ বছর ইত্যাদি ইত্যাদি। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী বৌদ্ধ-ধর্ম মতালম্বী হিন্দু। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী বৌদ্ধ-জৈন ধর্ম হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বৌদ্ধ বা জৈনরা তা আদৌপে মানতে রাজি নয়।

বিবর্তনের কিছু কথা –
আজ থেকে প্রায় দেড়-দু হাজার কোটি বছর আগে এক মহা বিস্ফোরণের সৃষ্টি আজকের এই কোলাহলের পৃথিবী। সৃষ্টিলগ্নে পৃথিবীর চেহারা বা প্রকৃতি (Character) আজকের মত ছিল না। এরপর বহু কোটি বছর কেটে যায়। প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বছর আগে আগে পৃথিবীর মাটি সৃষ্টি হয়। এই সময়কালকে বলা হয় প্রিক্যামিবিয়াল যুগ। আরো দেড়শ কোটি বছর পরে বা আজ থেকে ৩০০ কোটি বছর আগে জন্ম নেয় এক কোষী প্রাণের। এরপর কেটে যায় আরো ২৬ কোটি বছর। প্রৃথিবীতে আসে বহু কোষী প্রাণী। এই সময় বহু ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বিবর্তন প্রক্রিয়া চলে। বহু প্রাণীর সৃষ্টি হয় আবার লুপ্ত হয়েও যায়। মানুষের সৃষ্টি এরও বহু কোটি বছর বাদে। যে যুগকে বলা হয় নব ভূ-তাত্ত্বিক যুগ। বলাটা বোধহয় একটু ভুল হল। বলা উচিত নব ভূ-তাত্ত্বিক যুগের শেষ পর্বে সৃষ্টি হয়েছিল মানব জাতির আদি রূপ। তা আজ থেকে সাড়ে ছ কোটি বছরের আগের কথা। আজ থেকে প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে মানবজাতির ক্ষেত্রে ঘটল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। মানবজাতির পূর্বসুরী বা এক বিশেষ জাতের বানর দু পায়ে ভর দিয়ে হাঁটে শিখল। বলা যেতে পারে পরিবেশের তাগিদে হাত হল মুক্ত। আর এইখান থেকেই মানুষের জয়যাত্রা। এই ধারা থেকেই আসে পিথেকানথ্রোপাস, যাকে আমরা চিহ্নিত করি আদি বন মানুষ বলে। এইখানে বলে রাখা ভাল এদের বা এর আগের পূর্বসুরীদের আমরা ‘আদি মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করি না। চিহ্নিত করি নিয়ানডারথ্যালদের। যাদের আবির্ভাব আজ থেকে দেড় লক্ষ বছর আগে। প্রশ্ন তাহলে কেন নিয়ানডারথ্যালদের আগের মানুষদের আদি মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করি না। তার কারন এর আগের ধারার প্রজাতিদের চেতনার স্তর ছিল সাধারণ জীব জন্তুর মত। নিয়ানডারথ্যালরাই প্রথম চিন্তা ভাবনা শুরু করে এবং তাকে সুসংহত করার চেষ্টা করে। মনে রাখতে এইটা একেবারে প্রাথমিক স্তর। এই চিন্তা ভাবনা আরো সমৃদ্ধ হয় বা একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে আসে ক্রোম্যাগন মানুষের আমলে। তা আজ থেকে মাত্র ৪০ হাজার বছর আগে। নিয়ানডারথ্যালের আগের প্রজাতিদের সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে (Struggle for existence)। এই লড়াই ছিল যেমন প্রকৃতির সঙ্গে (যেমন বন্যা, ভূমিকম্প, দাবানল ইত্যাদি) আবার অন্য কোন হিংস্র পশু বা গোষ্ঠীর সাথে। প্রাকৃতিক কারনগুলি নিয়ে তাদের কোন ভাবনাই ছিল না। কিন্তু এই ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই তারা কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। আর তার প্রাথমিক সুসংহত রূপ পায় নিয়ানডারথ্যালদের আমলে। তখন থেকে এই প্রাকৃতিক কারণগুলি নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়।

নিয়ানডারথ্যাল বা তার আগের মানুষেরা ছিল যাযাবর। শিকারই ছিল তাদের জীবন নির্বাহের মূল উপায়। এই সময় তাদের মধ্যে কোন পারিবারিক সম্পর্ক ছিল না। যৌনমিলন ছিল অবাধ। কোন শ্রেনীও ছিল না। একটা পর্যায়ের তারা বুঝতে পারল এই যাযাবর জীবনের পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ ঘন ঘন স্থান পরিবর্তনের সাথে ভৌগলিক পরিবর্তন আর নতুন নতুন সংঘাত টিকে থাকার পক্ষে অসুবিধাজনক। কিন্তু চাষবাস না জানার ফলে কোন এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প বাঁচার কিছু অন্বেষনের ফলে কৃষি চিন্তা আসে। আর এই চিন্তা প্রথম আসে নারীদের কাছ থেকে। কারন তাদের জীবন থেকেই তারা এটা বুঝতে পারে। এই যাযাবর জীবনকালে তারা কোন স্থানে কিছুকাল থেকে আবার অন্য স্থানে যেত। সেই কিছু সময় যেখানে থাকত তারা সেখানে ফলমূল খেত। ফলের আঁটি বা বিচি অদূরেই ফেলত। সেখান থেকে সেই ফলের গাছ হত। আর এইখান থেকেই শুরু প্রথম কৃষি চিন্তার। এইখানে বলা প্রয়োজন এই অস্থায়ী বসবাসের সময়টা কিন্তু বেশ কয়েক বছরের। আমার নিজস্ব ধারনা এই যে তারা মনে করত অভুক্ত খাবার বা খাবারের অযোগ্য আঁটি বা বিচি উচ্ছিষ্ট, এর কোন সৃষ্টি ক্ষমতা নেই। কিন্তু ঐ আঁটি বা বিচি থেকে যখন আবার গাছ হওয়া দেখে তাদের ধারণা জন্মায় মৃত্যর পরও জীবন আছে এবং জন্ম আছে, পরজন্মের তত্ত্বের ভ্রূণ বলা যেতে পারে। আর এই চিন্তার উন্মেষ নিয়ানডারথ্যাল আমলেই প্রথম দেখা যায়। আর এইখানে শেষ করছি বিস্তারিত বিবর্তনের কথা। যদিও বিবর্তনের ইতিহাস অনেক বড়। যদিও বিবর্তনের রাস্তা ধরেই আমরা আমাদের মূল আলচনা করবো। আসলে বিবর্তন কাল কোন আজ কাল পরশুর গল্প নয়। আর একটা পর্যায়ের সময় অতিক্রম না করলে এই বিবর্তনকে বোঝা বা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। একটা উদাহরণ দিয়ে এই পর্যায়ের আলোচনা শেষ করি। ধরা যাক, আপনি আজ একটা কালো ছাতা কিনলেন। কিন্তু কিছুকাল বাদে সেই ছাতার রঙ পরিবর্তন হয়ে পাংশুটে বা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আর এই পরিবর্তনটা সাধারণভাবে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু একটা সময়ের পর আমরা বুঝতে পারি। 
এখন এই পর্যন্ত। পরের পর্ব শুরু করবো আদিম ধর্ম দিয়ে।

আদিম ধর্ম

নিয়ানডারথ্যাল আমলের প্রথম চিন্তা ভাবনা করতে শুরু করে। এই সময় কোন ভাষা ছিল না। ছিল কিছু শব্দ, সংকেত আর দৈহিক ভাবভঙ্গী। যা দিয়ে নিজেদের মধ্যে একজন অপরজনকে তার ভাব প্রকাশ করত। এই সময়েই তাদের মধ্যে ঈশ্বর চিন্তার ভ্রূণ জন্ম নেয়। স্বাভাবিক নিয়মেই প্রাকৃতিক কারনগুলি তাদের কাছে ছিল অজানা। তাদের ধারণা ছিল দিনরাত্রি হওয়া থেকে ঝড় বৃষ্টি সবকিছুই কোন এক বিশেষ শক্তিধরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর এই ধারণা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ছিল। পাশাপাশি একেবারে সময় ধরে একই সময় একই চিন্তা শুরু হয় নি। চিন্তার উন্মেষ বা শুরু বিভিন্ন সময়কালে হয়েছে। তার কারন ছিল মূলত ভৌগলিক। ভৌগলিক বিচারে বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ছিল বিভিন্ন। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রকৃতির সাথে মূল সংঘাত এক হলেও রূপ ছিল বিভিন্ন। ফলে সেই সময়ের চিন্তার বৈপরিত্য ছিল। ভাষার সৃষ্টি অনেক পরে। এখানেও একই ব্যাপার বিভিন্ন ভাষার সৃষ্টিও বিভিন্ন সময়ে। এরপর তাদের কল্পিত সেই শক্তিধরের নামকরণও হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নাম বিভিন্ন সময়ে। এই কালে জন্ম-মৃত্যু কিংবা প্রাকৃতিক কারনগুলি সম্পর্কে সেই সময়কার মানুষের যে ধারণা গড়ে ওঠে তাকে ঐতিহাসিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত্ববিদেরা নানাভাবে তার ব্যাখ্যা করেছেন।
ধর্ম বা ঈশ্বর চিন্তা সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই আসে সর্বপ্রানবাদ। পুরা প্রস্তর যুগের শেষভাগে অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগের মানুষেরা মনে করত সবকিছু সহ সমস্ত জড় বস্তুর মধ্যে প্রাণ বা শক্তি আছে। আর এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন জড় বস্তু, যেমন পাহাড়, পাথর ইত্যাদিকে পুজা করার পদ্ধতি চালু হয়। এর সাথে গাছ, নদী ইত্যাদিকেও পুজা চালু হয়। এই ধারণাই সর্বপ্রানবাদ। এরমধ্যেই লুকিয়ে ছিল ‘পরেমেশ্বর’র ধারণা।

Reconstruction of Neanderthal woman (makeup by Morten Jacobsen)

Comparison of faces of Homo sapiens (left) and Homo neanderthalensis (right)

এরপর আসে টোটেমবাদ। টোটেমবাদ সেই অর্থে ধর্মের সাথে যুক্ত নয়। টোটেম হচ্ছে বিশেষ কোন বস্তু যেমন গাছ বা প্রানী। তারা ভাবত এই বস্তু কোন মানুষ বা মনুষ্যগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ। এই চিন্তার কয়েক বৈশিষ্ঠ্য আছে। যেমন বিশেষ নাম বা প্রতীক দিয়ে চিহ্নিত করা। একে হত্যা করে খাওয়া বা স্পর্শ করাও ছিল নিষিদ্ধ। একে অনুকরণ করে বেশ কিছু আচরণবিধিরও সৃষ্টি হয়। সময়কালে এর পরিবর্তন ঘটে। যেমন এককালে হিন্দু ধর্মে (যদিও প্রথমে হিন্দু ধর্ম বলে কিছুই ছিল না) গোমাংস খাওয়ার চল ছিল। পরবর্ত্তীকালে তা বন্ধ হয়। গরুকে দেবতা হিসবে স্বীকৃতি পায়। আবার একই কারনে মুসলিমরা শুয়োরের মাংস খান না। আবার এও মানতে চায় না মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছ বা রকেট জাতীয় কিছু পাঠিয়েছে।

এবার আসি আদিম ধর্মের তৃতীয় ভাগে তা হল ম্যাজিক। না এই ম্যাজিক বলতে ‘হোকাস ফোকাস গিলি গিলি গে নয়’। ম্যাজিক কথাটির অর্থ কী? 
the use of charms spells etc in seaking or foretending to forces. – Webstor – New World dictionary. 
মোদ্দা কথায় এক বিশেষ ধরণের আবেদন। কোন বিশেষ ক্ষেত্রে তারা বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী করে, বিচিত্রভাবে চিৎকার করে তাদের কল্পিত সর্বময় অলৌকিক শক্তিকে তুষ্ট করার চেষ্টা করত। একটা কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন সেই সময় তাদের কল্পিত অলৌকিক শক্তির রূপ কখনই মঙ্গলময় ছিল না, ছিল দানবের। ঈশ্বরের মঙ্গলময় রূপ আসে প্রাতিষ্ঠনিক ধর্মের হাত ধরে। ফ্রয়েডের ধারণাটা ছিল কিন্তু অন্যরকমের। তিনি বলেছেন আদি মানুষেরা প্রকৃতির বিশেষ কিছু প্রতিকূলতার হাত থেকে বাঁচার জন্য আদি মানুষেরা কিছু আচরণবিধি তৈরি করেন। যেমন কোন বিশেষ ফল খেলে শরীর খারাপ, ভূমিকম্পের সময় গুহায় থাকা নিরাপদ নয়, অমাবস্যা, গ্রহণ ইত্যাদি, এমন কি দিনরাত্রি সম্পর্কেও ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এই সবকে কেন্দ্র করে জীবনযাত্রার কিছু নিয়ম বা বিধিনিষেধ চালু করেছিল। আবার এই নিয়ম সর্বত্র এক ছিল না, এক থাকাও সম্ভব নয়। 
যাই হোক এই ভয়ই মানুষের মনে অনুসন্ধিৎসার জন্ম দিয়েছিল। যাকে বলা যেতেই পারে বিজ্ঞানমানসিকতার ভ্রূণ। আবার এই ভয়ই মানুষের মনে এনেছিল ভগবানের।

আমাদের কাছে নিশ্চয় একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে সভ্যতার বিকাশের নির্দিষ্ট কারনেই মানুষ নিজেই এক অলৌকিই ক্ষমতাসম্পন্ন ;ঈশ্বর; সৃষ্টি করে। 
এবার কয়েকটা বিষয় সম্পর্কে আরো একটু ভাবা যাক। যেমন ভাষা সৃষ্টির আগে মানুষ তারা নানা ধরণের আওয়াজ বা শব্দ, অঙ্গভঙ্গী, সংকের ইত্যাদি ব্যবহার করে তাদের ভাব প্রকাশ করত। উল্লেখযোগ্য হল তারা ছবি এঁকেও তাদের ভাব প্রকাশ করত। বিভিন্ন গুহা চিত্র তার প্রমান।বিভিন্ন শব্দ সংকেত ব্যবহার করে যেমন বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করত আবার অলৌকিক শক্তিকে তুষ্ট করত। সেই ধারা আজও আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি। যেমন উলু দেওয়া বা শাঁখ বাজানো কিংবা শিঙা বাজানো অথবা কাঁসর বা ঘন্টা বাজানো। আদিম মানুষেরা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গী করে কল্পিত শক্তিকে তুষ্ট করার চেষ্টা করত। পরবর্তীকালে এই অঙ্গভঙ্গী একটা সুনির্দীষ্ট রূপ পায়। যাকে আমরা নৃত্য বা নাচ বলি। মানুষ যখন ভাষার ব্যবহার শিখল তখন এতে এল নতুন মাত্রা। বিভিন্ন শব্দের বদলে এল ভাষার প্রয়োগে তুষ্ট করার পদ্ধতি। আর এই পদ্ধতি ছিল ছান্দিক। যাকে আমরা সংগীত বলি। আর ছান্দিক হওয়ার কারন হচ্ছে। কল্পিত শক্তিকে তারা বিভিন্ন শব্দ দিয়ে তুষ্ট করার চেষ্টা করত যা মুখ দিয়ে নয়, বলা যেতে বিভিন্নভাবে শব্দ সৃষ্টি করে। আর এটা ছিল একটা ছন্দে তালে। ফলে এরমধ্যে যখন মৌখিক শব্দ ভাষায় রূপান্তর প্রয়োগ হল তখন তাকেও স্বাভাবিকভাবেই ছান্দিক হতে হয়।

এখানে আরেকটা ব্যাপারে আমাদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। তা হলো সেই সময় কোন শ্রেণী ছিল না। না ছিল কোন বর্গের বিভাগ কিংবা জাতপাত। এই কারণেই সেই সময় তাদের কল্পিত শক্তির কোন নির্দিষ্ট আকার ছিল না। শুধু তাই নয় কল্পিত শক্তির কাছে কোন ব্যাক্তিগত আবেদনও ছিল না। ছিল গোষ্ঠী কেন্দ্রিক আবেদন শুধুমাত্র। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে সেই সময়কার মানুষ কোন উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত ছিল না। তাদের জীবন নির্বাহ বা ক্ষুণবৃত্তি নিবৃত্তি হত শিকার আর বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে। আর এই সংগৃহীত খাদ্য বন্টন হত তাদের যার যেমন প্রয়োজন ছিল। সেই সময় উদ্বৃত্ত থাকত না বা থাকলেও তা সংরক্ষণের কৌশল জানা ছিল না। সেই সময়কার ঈশ্বর চিন্তা এবং তাকে ঘিরে যে সব আচরনবিধি ছিল, তা কখনই প্রভূত্ত্বের হাতিয়ার হিসেবে নির্দিষ্ট করা যাবে না। তাদের চিন্তা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যতই হাস্যকর মনে হোক, – বরঞ্চ নির্দিষ্ট করে বলা যায় যে তারা সেই সময়ের নিরিখে তারা যে চিন্তা করেছিল প্রাণ ও প্রকৃতির রহস্য কী? তা ভুল ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানের শুরুটাও হয়েছিল। তাদের অবস্থান থেকে এই অনুমানেই আসা স্বাভাবিক।

একটা পর্যায়ের পর আদিম মানুষেরা ছোটখাট কৃষিকাজ শুরু করে। অস্থায়ী বসবাসের কারনে সেই অর্থে সেই সময়ের নিরিখে উন্নত কৃষি কাজ তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই কৃষিকাজ একটা সুসংহত রূপ পায় যখন মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী একটা নির্দিষ্ট এলাকা ভিত্তিক থাকতে শুরু করে। আর এই স্থায়ীভাবে থাকা গড়ে ওঠে মূলত নদীর ধারে। কারণ তখন সেই সময়কার মানুষেরা বুঝে ছিল যে কৃষি উৎপাদন ব্যাতীত জীবনধারণ সম্ভব নয়। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষনীয় যে দু দুটো পরিবর্তন ঘটে গেল। 
এক) একটা গোষ্ঠীর একটি নির্দিষ্ট এলাকা। আর 
দুই) উৎপাদন ব্যবস্থা শুরু হল। 
মাথায় রাখতে হবে এই পর্যায়েও কিন্তু কোন শ্রেনী ছিল না। 
পরিবেশ ও বিভিন্ন প্রতিকূলতা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন স্থানের এলাকাগুলির পরিকাঠামোগুলো বিভিন্ন রকমের মত হত। 
আর এই ঘটনার বা এই সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয় ১০ হাজার বছর আগে। আর সুসংহত রূপ পায় ৭-৮ হাজার বছর আগে। মানুষ তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বুঝতে পারে যে কোন সময় (all the season) কৃষি উৎপাদন সম্ভব নয়। আর এই সময়ের কিছু আগে মানুষ আগুনের ব্যবহার রপ্ত করে। এরফলে ঘটে আরেকটা উত্তরন। আর এই আগুনকেই কিন্তু তারা অপদেবতা ভাবত। কিন্তু ব্যবহার করায়ত্ত হবার পর আগুন থেকে ভীতি দূর হয়। যদিও অপদেবতার ধারণা তখন বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই আগুনের যে নিজেদের কাজে লাগে তার থেকে আগুনের একটা মঙ্গলময় রুপও ফুটে ওঠে। ফলে মানুষের মনে স্থান নিল অপদেবতার পাশাপাশি মঙ্গলময় দেবতা।

দেবতার আগে অপদেবতার চিন্তা আসে একথা আগেই বলেছি। অপদেবতাকে সন্তুষ্ট রাখতে পারলে ক্ষতির আশঙ্কা কম বা হবে না এই ধারনা শুরু থেকেই ছিল। তাই তারা কাজে যাওয়ার আগে তারা তাদের কল্পিত শক্তির কাছে প্রার্থনা করত। নানাবিধ ফলমূল ও অনান্য আরো কিছু উৎসর্গ করে সেই কল্পিত শক্তিকে সন্ততুষ্ট করার চেষ্টা করত। আবার সেই কাজে সফল হলে, তাকে অভিনন্দন জানাতো একই কায়দায়। আজও সেই ধারা বর্তমান। যেমন, মানত করা। তারা কীভাবে সেই কাজে সফল হল তা তারা নানাভাবে অঙ্গভঙ্গী করে উপস্থাপন করত। যাকে আমরা বলতেই পারি আদিম নৃত্য। আবার গুহার দেওয়ালের গায়ে এঁকে রাখত। আমার নিজস্ব ধারনা আঁকত তার কারন কীভাবে শিকার বা অন্য কিছুতে তার সফল হল তা অন্য কাউকে শেখানোর জন্য। যাইহোক, আমরা পেলাম অপদেবতার ধারণা, আবার মঙ্গলময় দেবতার ধারণা। কিন্তু মঙ্গলময় দেবতাও তাকে উৎসর্গিত দানে খামতি থাকলে অসন্তুষ্ট হন। আর চিন্তা মানুষের মনে ছিল না, প্রোথিত করা হয়। এই নিয়ে পরে ধাপে লিখব। যে ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিলাম জানাতে সেটা আগে বলে নি। এই ব্যাপারটা আগে বললেই ভাল হত। কিন্তু পরে বললেও ক্ষতি নেই। নিয়ানডারথ্যাল আমল থেকেই মৃত্যুর পরই শেষ নয় এই চিন্তা উদ্ভব। বলা যেতে পারে আত্মা চিন্তার অঙ্কুর। এই সময় মৃত্যুর পর কবর দেওয়া আর তারসাথে তার ব্যবহৃত জিনিষের সাথে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও দেওয়া হত। এই ধরনের মৃতদেহ সৎকার এর আগে ছিল না। বসতি থেকে দূরে কোথাও ফেলে বা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হত। পরজন্মের চিন্তা আরো কিছু পরে আসে।

আগেও বলেছি সেই কথা আবারো বলছি। মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে বসবাসের কারনে উন্নত কৃষি উৎপাদনে সক্ষম হন। এটাও বলা যেতে পারে উন্নত কৃষি উৎপাদনের জন্যই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে বাধ্য হয়। কিছুকাল পর শ্রমের নিরিখে শ্রম বিভাজন সৃষ্টি হয়। যেমন এক দল শিকার, অপর দল কৃষিকাজ। প্রাথমিক স্তরে এই দুই ভাগে ভাগ হয়। নব্য প্রস্তর যুগের মধ্য থেকে শেষ ভাগ জুড়ে মানুষ ধাতুর আবিষ্কার করে। এইখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন যে এই ধাতুর আবিষ্কার সর্বত্র এক ভাবে হয় নি। যা হওয়াও সম্ভব নয়। কারণ ভৌগলিক কারনে সর্বত্র সব আকরিক পাওয়া যায় নি। এইসব পরিবর্তনে যেমন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছিল তারই হাত ধরে ধর্মের ক্ষেত্রেও এক বিরাট পরিবর্তন আসে। এই সময় নারীরা কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু এইকাজে নারীরা স্থায়ীভাবে করতে পারল না। কারন তারা মাসে একটা সময় ঋতুমতী হয় আবার সন্তান গর্ভে এলে কৃষিকাজের মত কাজ করতে সক্ষম হত না। এই সময় মানুষ আরো কিছু কাজ শুরু করে। যেমন মাটির জিনিষ, মূলত মাটির পাত্র। তাছাড়াও হাতিয়ার যা শিকারের জন্য প্রয়োজন হত। এই হাতিয়ার ছিল মূলত পাথরের। যা ছিল শুধু গদা টাইপের। তারও উন্নত ঘটে। যেমন পাথরের ছুড়ি। ব্যবহারিক জীবনের পরিবর্তন চিন্তার জগতেও পরিবর্তন আনে। শ্রম বিভাজনের ফলে কিছু সামাজিক জটিলতার সৃষ্টি হয়। এই সময়কার এই জটিলতা দূর করার জন্য কিছু বিধিনিষেধ বা কিছু নিয়ম সৃষ্টি হয়। আর এই নিয়মের সাথে কিন্তু যুক্ত থাকে তাদের সেই কল্পিত সর্বশক্তিমান। যাকে আমরা বলতেই পারি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের।

প্রাথমিক স্তরে সমাজ জীবনে উৎপাদন বলতে কৃষি, হাতিয়ার আর মাটির তৈরি জিনিষপত্র। এই জিনিষপত্রর কোন ব্যাক্তি মালিক ছিল না। গোষ্ঠীর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হত। এই সমস্ত কিছু রক্ষণাবেক্ষণের ভার ছিল কোন একজনের উপর। এই একজন কখনো সেই গোষ্ঠীর কোন বয়স্ক মানুষ বা কোন বলশালী ব্যাক্তি। সেই ব্যাক্তির উপরই ভার থাকত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনার। এখানে আরো একটা ব্যাপার জানানো প্রয়োজন। তা হল, সেই সময় খাদ্যবস্তু হিসেবে শিকার করে ও বন থেকে এবং কৃষি উৎপাদন করে সংগ্রহ হত তা ভাগ হত যার যা প্রয়োজন সেই অনুসারে। এই সময়টাই হল আদিম সাম্য ব্যবস্থা। এরই পরবর্তী কালে মানুষ যখন ধাতুর ব্যবহার শিখল, তখন শ্রমের নিরিখে শ্রম বিভাজন আরো জটিল হল। এই উৎপাদন যখন একটু উন্নত হল তখন গোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা পরিমান অধিক উৎপাদন হতে শুরু করে। প্রাথমিকস্তরে এই অধিক উৎপাদিত বস্তু গোষ্ঠীর সম্পত্তি হিসেবেই গণ্য হত। কিন্তু পাশাপাশি সমষ্টিগতর সম্পত্তির পাশাপাশি কিছু পরিমান ব্যাক্তিগত সম্পত্তিরও সৃষ্টি হয়। এই ব্যাক্তিগত সম্পত্তির পরিমান স্বাভাবিক কারনেই গোষ্ঠীদের মধ্যে একটি ফারাক সৃষ্টি করে। এই বিত্তের ব্যবধান চিত্তের ব্যবধান গড়ে তোলে।

সেদিনের সেই গোষ্ঠীপতিরা আজকের মোল্লা – পুরুর – যাজকদের পূর্বসুরী। একটা পর্যায়ের পর গোষ্ঠীপতিদের সাথে সমাজের অনান্যদের একটা সামাজিক ব্যবধান সৃষ্টি হয়। সেইসময়কার ‘কবর’ দেখে এই অনুমান করা গেছে। শুধুমাত্র গোষ্ঠীপতি নয় সামাজিক বৈভব্যের ফারাকেরও চিহ্ন সুনির্দিষ্ট সেখানে। এদের কবরের সঙ্গে দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রয়োজনের সামগ্রীর থেকে বেশী জিনিষ এমন কী কঙ্কালও পাওয়া গেছে। পরবর্তীকালে মিশরের পিরামিডগুলো তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যা ছিল মূলত রাজাদের। এই কবরের সাথে দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রয়োজনের সামগ্রী দেওয়ার অর্থই হল মৃত্যুর পরও কিছু আছে, যাকে আমরা আত্মা বলে থাকি। এই সময় শবদাহর পদ্ধতিও চালু হয়। আমার মুলতঃ পচন ও তা থেকে দূর্গন্ধ থেকে মুক্তি পাবার জন্য। কারন সেই সময় অনেক জায়গায় কবর দেওয়ার চল ছিল না। নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হত বা পশুপাখিদের খাবার হিসেবে বাসস্থান থেকে দূরে কোন জঙ্গলে ফেলে আসত। “আত্মা” বিষয়টি ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে আছে। বিশেষত হিন্দু ধর্মে। আত্মার সম্পূর্ণ মুক্তি প্রাপ্তি নিয়ে এক জটিল ধারনা আর কোন ধর্মে নেই।

আত্মা ব্যাপারটি আমার কাছে বেশ মজার। আমাদের জগৎ বলতে শুধু পৃথিবী নয় বা শুধু এই সৌর জগৎ নয় এর বাইরেও অনেক কিছু আছে যা একটা নিয়মে চলছে। ধর্মীয় ব্যাক্তিদের ধারণা এই নিয়মের পরিচালন করছেন করেন একজন ‘পরম’ ব্যাক্তি। যদিও প্রাথমিক স্তরে মানুষের এই ধারণা ছিল খুবই সীমাবদ্ধ। ফলে ধর্মীয় ব্যাক্তিদের ধরণাও ছিল সীমাবদ্ধ। পৃথিবীর আকৃতি কেমন ছিল তারই ধারনা ছিল না। ইতিহাসের সময়ের নিরিখে কিছু দিন আগেও মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবীটা স্থির আর সূর্য তার চারিদিকে ঘুরছে। বিজ্ঞানচর্চার প্রাথমিক স্তরেও ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বের ধারণাই বহাল ছিল। খ্রিস্ট্রীয় দ্বিতীয় শতকে এই ভূকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের ব্যাখ্যা দেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ (জ্যোতিষবিদ নয়) ক্লডিয়াস টলেমি। তার এই তত্ত্ব বহুদিন টিকে ছিল। ১৫৪৩-এ জীবনের শেষভাগে এসে নিকোলাস কোপারনিকাস লিখলেন তার যুগান্তকারী বই ‘দ্য রেভেলিউশন অব হেভেনলি স্ফেয়ারস’। তিনি জানালেন টলেমির তত্ত্ব ঠিক নয়। তিনি আনলেন সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব। জানালেন সূর্যটা স্থির আর পৃথিবীটাই বৃত্তাকারে সূর্যর চারিদিকে ঘুরছে। এরপর জোহান্স কেপলার কোপারনিকাসের তত্ত্বকে সমর্থন করেন। শুধু বলেন বৃত্তাকার নয় উপবৃত্তাকার পথে ঘুরছে। ব্যস, ধাক্কা খেল ধর্ম। কারন পৃথিবী আর সূর্যর সম্পর্কের কারন নিয়ে বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব ছিল না। কোপারনিকাসের তত্ত্ব আসার পর ধাক্কা খেল ধর্ম শুরু হল বিতর্ক। ধর্মীয় ব্যাক্তিরা বুঝলেন যে ধারণার উপর তারা দাঁড়িয়ে আছেন তা সর্বৈব ভুল। ফলে বইটি হল নিষিদ্ধ।
বড়লোকের বইমুখী উড়নচন্ডী ছেলে জিওদ্রানো ব্রুনো তেমন কিছ পড়ার না পেয়ে লাইব্রেরীর কোনে ধুলোয় পড়ে থাকা কোপারনিকাসের বইটা পড়ে ফেলেন। ব্যাস বিপত্তি শুরু এখান থেকেই। উড়নচন্ডীদের যেমন কাজ হয় সেই ধারা অনুযায়ী ব্রুনো কোপারনিকাসের কথা সবাইকে বলতে শুরু করে। খেপে উঠল শান্তির বাণীবাহক ধর্মের প্রচারকেরা ১৬০০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী প্রকাশ্য দিবালোকে জিওদ্রানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়। এই ধারা এখনো বর্তমান একটু অন্য মোড়কে। ইতিমধ্যে গ্যালিলিও গ্যালিলির হাতে আসে কোপারনিকাস আর কেপলারের তত্ত্ব। ১৬০৪-এ উনি অঙ্কের সাহায্যে প্রমান করেন যে কোপারনিকাস আর কেপলাররা ঠিক। কিন্তু তেমন সোরগোল হল না। তাত্ত্বিক ব্যাপারটা সাধারণ মানুষের কাছে তেমন বোধগম্য নয়। তারপর হাতেনাতে দূরবীনের সাহায্যে প্রমান করেন এবং ১৬১৩-তে তার বিখ্যাত বই ‘হিস্ট্রি এণ্ড ডেমোনেস্ট্রেশনস কনসার্নিং সানস্পট এণ্ড দেয়ার ফেনোমেনো’। এরপর গ্যালিলির অবস্থা কেমন হয়েছিল তা পাঠকেরা ভালই জানেন। সেই ব্যাখ্যায় আর যাচ্ছি না। পরের পর্বে মজার আত্মায়।

এবার জেনে নি আত্মা কী?

আত্মার ধারণাটা অনেক পুরোনো। তথ্যের ভিত্তিতে ব ল যেতে পারে এই আত্মার ধারণা এসেছিল নিয়ানডার্থালদের যুগে, তা প্রায় আড়াই লক্ষ বছর আগে। নিয়ানডার্থালদের

আগে পিথেনকানথ্রোপাস বা সিনানথ্রোপাস যুগে আত্মা বা ধর্মাচারণের কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। নিয়ানডার্থালদের যুগের আত্মার ধারণা সমাজ পরিবর্তনের হাত ধরে পরিবর্তন ঘটেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের আত্মার ধারণার সাথে নিয়ানডার্থাল যুগের আত্মার কোন মিল নেই।

সাধারণভাবে প্রাণের পিছনে রয়েছে এই আত্মাটি নামক ব্যাপারটি। মোদ্দা কথা, যতক্ষণ কারো শরীরে থাকে ততক্ষন সে জীবিত, মৃত্যুর সাথে সাথে আত্মা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যায় কিংবা বলা যেতে পারে আত্মা বেড়িয়ে গেলেই মৃত্যু হয়। যদিও প্রাথমিককালে মানুষ ছাড়া আর কোন প্রানী বা জীবজগতের কোন কিছুর মধ্যে আত্মা আছে তা স্বীকার করা হত না।

আত্মা নিয়ে বিভিন্ন ধর্মমতের বিভিন্ন মত আছে। সাথে হরেকরকমের গল্প। তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে নিষ্প্রয়োজন। আমরা একটু সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করি। তাহলেই বুঝতে পারব এই আত্মার অসারতা।

শুরু করি, আমাদের জন্ম দিয়ে। আমরা সকলেই জানি যে স্ত্রী ও পুরুষের যৌনমিলনের ফলে একটি ডিম্বানু ও একটি শুক্রাণুর মিলন হওয়ার ফলে একটি প্রাথমিক কোষের সৃষ্টি হয়। তারপর বিভাজিত হয়ে দেহাকৃতি পায় মাতৃগর্ভে। সহজ সরল প্রশ্ন এখানেই। এই দেহে আত্মার প্রবেশ কখন হয়? জননকোষের মিলনের সময় নাকি শিশুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়?

বিভিন্ন ধর্মমতে আত্মা নিয়ে বিভিন্নতা থাকলেও মূল সুরটি এক। তা হল, এই আত্মাই হল আমাদের জীবনের মূল যোগসূত্র। যার দ্বারা আমরা পরিচালিত। এখানে একটা কথা বলা দরকার ধর্মীয় মতে সারা জগৎ পরিচালিত হচ্ছে এক সর্বশক্তিমান দ্বারা। যাকে বলা হচ্ছে পরামাত্মা। এই পরমাত্মা দ্বারা আবার পরিচালিত হচ্ছে আমাদের আত্মা। এই আত্মাকে সৃষ্টি করা যায় না, ধ্বংস করা যায় না। আত্মা অজয়, অমর, অক্ষয়। তাহলে তো সরল মনে এই প্রশ্ন আসতে বাধ্য। মুক্ত আত্মার কোথায় থাকে, কোন ঘুসুড়িরামের গোডাউনে। মুক্ত আত্মা বলতে কী? যে জন্ম নিচ্ছে সে তো তার দেহে আত্মার প্রবেশের ফলেই সে প্রাণ পাচ্ছে, সেই আত্মা আসছে কোথা থেকে? আবার মৃত্যুর পর যখন দেহ ছেড়ে আত্মা চলে যাচ্ছে। সেই ছেড়ে যাওয়া আত্মাই বা যাচ্ছে কোথায়?

আত্মার উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রন নেই। কিন্তু মহাভারতের ভীষ্মদেবের কথা জানার পর মনে হয়েছে উনি তো খোদার উপর খোদগিরি করে গেলেন। উনার ইচ্ছামৃত্যু। তারমানে উনার কন্ট্রোলে আত্মা। একটু ভাবুন এইরকম নানা প্রশ্ন আপনাদের মনেও আসবেই আসবে।

বিবর্তন তত্ত্ব মানতে গেলে আত্মার অস্তিত্ব এবং পুনর্জন্মকে বিব্রত হতেই হবে। সাধারণ একটা ধারণা আছে যে একমাত্র জীবিত অর্থাৎ যার মধ্যে প্রান আছে তারমধ্যেই আত্মা আছে। খুব সহজ সরলভাবে বলা যেতেই পারে জীব জগতের সচল থাকার শর্ত হল আত্মার উপস্থিতি। আজ থেকে ৪৭০ কোটি বছর আগে সূর্যের কোন আকস্মিক বিস্ফোরনে নানান গ্রহ ও গ্রহাণুপুঞ্জের সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে একটি আমাদের এই পৃথিবী। আমাদের মনে রাখতে হবে সেই সময় এই গ্রহ ও গ্রহাণুপুঞ্জগুলি কঠিন অবস্থায় ছিল না। ছিল প্রচণ্ড উতপ্ত আর তরলীকৃত অবস্থায়। তারপর ধীরে ধীরে ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধে। আর এই সময়কাল প্রায় ২০০ কোটি বছর। কিন্তু কোন প্রানের অস্তিত্ব ছিল না। এই সময় বিশেষ ভৌত অবস্থায় বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের মধ্যে নানারকম রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রথমে যৌগ পদার্থের সৃষ্টি হয়। আর এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয় প্রাথমিক স্তরের জীব কোষ। বিজ্ঞান আমাদের জানায় পৃথিবীর প্রথম প্রানের হদিশ মেলে এক কোষী অ্যামিবার ভিতর। এরপরও বহু বছর ধরে চলে এই ক্রিয়াবিক্রিয়া বা পরিবর্তন। প্রথমে উদ্ভিদ তারপর সরীসৃপ, সপুষ্পক উদ্ভিদ, পাখী। এরপর স্তন্যপায়ী প্রানী এবং যে ধারার ক্রম বিবর্তনের পথ ধরে মানুষ এসেছে তারা। আর যাকে আমরা আদিম মানুষ বলি বিবর্তনের পথ ধরে সেই হোমোস্যাপিয়েন্সের উদ্ভব আজ থেকে ২৫-৩০ হাজার বছর আগে। আর আধুনিক মানুষ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করি নব্য প্রস্তর যুগের মানুষকে। যা প্রায় আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে। মোদ্দা কথা আত্মা প্রথমে একটা কল্পনা ছিল। থাকার কারণ ছিল অজ্ঞতা। পরবর্তীকালে এই ভ্রান্ত ধারণাকে কেন্দ্র করে নানাবিধ রূপ দিয়ে জন্মান্তর ধারণা এনে ব্যাক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার কাজে ব্যবহৃত করে। আর ধর্মের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে। ব্যাপারটা একটু খোলসা করে। আমাদের জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট আনন্দের সব কিছুই নাকি নির্ভর করে আগের জন্মের কৃতকর্মের জন্য। আমাদের জীবনের এই কর্মকান্ড কে ঘটায়? নিজের চিন্তা না অলৌকিক কোন শক্তি? আমাদের শেখানো হয় বা বোঝানোর চেষ্টা করা হয় তা আমাদের খুব চেনা কথায় বলি, ‘তোমার কর্ম তুমি কর, লোকে বলে করি আমি’। তাহলে এই তত্ত্ব যদি মেনে নি, তাহলে ভাল কাজের সাথে খারাপ কাজের দায় সেই অলৌকিক শক্তি। আর আত্মা নাকি এই অলৌকিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত। এবার একটা মজার ব্যাপার বলে আত্মা পর্ব শেষ করবো। আমাদের জানানো হয়েছে আত্মা অমর অক্ষয় নিরাকার, একে ধ্বংস বা সৃষ্টি করা যায় না। তাহলে মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে কে সুখ ভোগ করে বা নরকে গিয়ে কে কষ্ট ভোগ করে। আরো একটা কথা বলি আগের জন্মে কী করলে এই জন্মে আমাদের না খেয়ে থাকতে হয় আর কী করলে পরজন্মে হিটলার হওয়া যায়?

ধর্মে আত্মার প্রভাব বিশাল। সে কথায় আবার পরে আসব।

ফিরে আসি বিবর্তনের কথায়।

ধাতুর আবিষ্কার সমাজ বিবর্তনের এক উলম্ফন। ধাতু আবিষ্কারের সাথে সৃষ্টি হয় লাঙ্গল, ধাতুর অস্ত্র। যা আগের থেকে অনেক বেশী কার্যকর। এরপর চাকা, যা সমাজের গতি সঞ্চারিত করল। মানুষ শিখল নদীতে বাঁধ দিতে। যা উন্নত করল সেচ ব্যবস্থাকে। শিখল আরো অনেক কিছু যা মানব সভ্যতাকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল। মানুষের চিন্তাশক্তিকে করল সুদূর প্রসারী। এত কিছু হওয়ার ফলে উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। সমাজের প্রয়োজনের অধিক সম্পত্তি জমা হতে থাকে। আর এর দখল থাকত গোষ্ঠীপতির। ক্রমশ এই সম্পত্তি গোষ্ঠীপতির ব্যাক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই সময়ে সমাজে শ্রম বিভাজন ঘটে গেছে। সবাইকে একই কাজে নিয়োজিত হতে হয় না। বিভিন্ন শ্রমে ব্যাক্তিগত কুশলতার মাধ্যমে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়। মনে রাখতে হবে এই সময় কিন্তু কোন পরিবারের সৃষ্টি হয় নি। সমাজের মধ্যে কর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন উপগোষ্ঠী তৈরি হতে থাকে। ফলে সেই সময়কার ছোট ছোট সমাজের মধ্যে ঐ গোষ্ঠীগুলোর ভিতর এক আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয়। এই সময়ই চালু হয় নিম্নস্তরের বিনিময় প্রথা। কর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উপগোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও একজন প্রধান থাকত। সমাজের অধিপতি বা গোষ্ঠীপতি আত্মসাৎ করে যেমন ব্যাক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করে। ঠিক তেমনই উপগোষ্ঠীর প্রধানদেরও ব্যাক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি হয়। আর এইখান থেকেই সৃষ্টি হয় আদিম শ্রেনী বৈষম্য। ফলে সমাজ ব্যবস্থা হয়ে পড়ে বেশ জটিল। নিয়মকানুন লেনদেন ইত্যাদি। আর এইসব নিয়ন্ত্রনের জন্য ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণের অবশ্যাম্ভাবী হয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় নতুন নেতৃত্বদায়ী শক্তি, সৃষ্টি হয় নতুন শোষণ কেন্দ্রের। এই সব কিছু শুরু হয় নব্য প্রস্তর যুগের শেষ ভাগে আর সুস্পষ্ট আকার ধারণ করে ঐতিহাসিক যুগে। আবার এই ব্যাক্তিগত সম্পত্তিই শোষনের মূল কারন। ব্যাক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার্থে ধর্ম হয়ে ওঠে মূল হাতিয়ার। আর এইকারণেই আদিম ধর্মেরও রূপ পালটায়।

সমাজের প্রাথমিক এই উন্নয়নের ফলে সমাজের কিছু গুণগত পরিবর্তন হয়। ছোট ছোট গ্রামগুলি আকারে বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি থাকা জনপদগুলি মিলে যায় বা শক্তিশালী গোষ্ঠী তার থেকে কম শক্তিশালী গোষ্ঠীকে দখল করে। প্রথমে গোষ্ঠীপতিই তৎকালীন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রধান ছিল। কিন্তু সমাজে একই ব্যাক্তি ধর্মীয় প্রধান ও গোষ্ঠী প্রধানের কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় ব্যাক্তি শাসকের ও ধর্মীয় গুরুর। এই শাসকের সাথে সহায়ক হিসেবে কাজ করত ধর্মীয় গুরু। ইতিহাসের পাতা ওলাটালে আমরা দেখতে পাব এই শাসক আর ধর্মীয় গুরুদের সংঘাত হয়েছে। আর তার মূল কারন ছিল সমাজের উদ্বৃত সম্পত্তির মালিকানা। পরবর্তীকালেও এই একই ঘটনা বহু ঘটেছে। শাসক আর পুরোহিতদের মদত দিত কিছু আজ্ঞাবহ। এই আজ্ঞাবহদের বুদ্ধি ছিল সাধারণের থেকে অনেক বেশী। সমাজ পরিচালনের ক্ষেত্রে সৃষ্ট হয় নতুন জটিলতা। আর তার সাথে যুক্ত হয় ধর্ম, যা ছিল কিছু ক্ষেত্রে ভ্রান্ত ধারণা আবার কিছু ক্ষেত্রে ঠিক জেনে ভ্রান্ত ধারণা দেওয়া। এই নতুন শাসক গোষ্ঠী সৃষ্টির সাথে সাথে মুষ্টিমেয়র অধীনে চলে যায় জনগনের ব্যাপকতর অংশ। নব্য প্রস্তর যুগের শেষভাগেই ধনী ও দরিদ্রের বিভাজন স্পষ্ট হতে শুরু করে। সমাজের দরিদ্র অংশকে দাসের কাজ করতে হয়। যদিও ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সেই স্তরের বিরোধ ছিল না। কিন্তু উৎপাদন শক্তি বৃদ্ধির ফলে শাসক শ্রেনী ও শাসকের আজ্ঞাবহদের হাতেই সঞ্চিত হতে থাকে অধিক সম্পত্তি। সমাজের উদ্বৃত সম্পদকে আরো বেশি করার জন্য প্রয়োজন হয় আরো বেশি শ্রমশক্তির। তাই দরিদ্র অংশকে আজ্ঞাবহ দাস ও এই অংশকে নিজ স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য শৃঙ্খলার নামে ধর্মকে প্রধান হাতিয়ার করে। সমাজে উৎপাদিত সম্পদের পুরোটার উপর আধিপত্য কায়েম করার প্রচেষ্টার শুরুও এই সময় থেকেই। এই লক্ষ্যকে পূরণ করার জন্যও ধর্মই হাতিয়ার হয়ে ওঠে। হাজির করা হল পাপপূণ্য, পূর্বজন্ম, পরজন্ম, কর্মফল ইত্যাদির ধারনা। এই ধর্মীয় বোধ শুধুমাত্র আজ্ঞাবহ করে তোলে না, নিজেদের মধ্যেও বিরোধ গড়ে তোলে। দেখা দিতে শুরু করে সামাজিক বিভেদ ও বিরোধ। সেই সময়ের চালচিত্র দেখলেই তা পরিষ্কার। সে গ্রিসেই হোক বা হরপ্পা-মহেঞ্জদারোই হোক। এইখানেই গড়ে উঠেছিল ততকালীন আধুনিক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা। এই নগরে থাকার অধিকার ছিল একমাত্র রাজা, পুরোহিত আর তাদের অনুগামী বিত্তশালীদের। এরাই সমাজের উঁচু অংশ। আর দরিদ্র বা দাসদের থাকতে হত নগরের বাইরে। এই সময়ের কোন এক সময় সৃষ্টি হয় লিপির। যা ছিল যুগান্তকারী ঘটনা।

শাসক শ্রেনী তাদের ক্ষমতা কায়েম রাখার জন্য বা দরিদ্রশ্রেনীকে নিজেদের অনুগত রাখার জন্য নিত্য নতুন বিধান ধর্মীয় বিধান সৃষ্টি করেছিল। তারা প্রচার করল রাজা আর পুরোহিতই হল একমাত্র ঈশ্বর প্রেরিত দূত। আর এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই আজো অবতারের সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ঐতিহাসিক যুগে রাজা বা পুরোহিতের উপর বিশ্বাস বা আনুগত্য সৃষ্টির জন্য তৈরি হতে লাগল নানাধরণের ধর্মীয় অবিশ্বাস্য গল্প বা গাথা। এই যুগের মধ্যভাগে চিন্তাপ্রকাশের ক্ষেত্রে ভাঁটার সময় সামাজিক পরিস্থিতিই অগ্রগতির পরিপন্থী হয়ে উঠেছিল। দরিদ্রের দাসত্বের মানিসিকতাই মূল কারণ। এই যুগেই জন্ম নেয় “পরিবার”। এর পিছনের কারন ছিল ব্যাক্তিগত সম্পত্তি। উদ্বৃত সম্পত্তির ভাগ ছিল এক অদ্ভুত রকমের। মোটা অংশটা গোষ্ঠীর সম্পত্তির নামে ভোগ করত গোষ্ঠীপতি, পরবর্তীকালে রাজা। ক্ষুদ্র অংশ থাকত উৎপাদনকারীর কাছে। এই উৎপাদনকারীর মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির কে মালিক হবে সেটা ছিল এক সমস্যার। কোন সন্তানের মাতৃ পরিচয় স্বাভাবিক এবং সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কোন পুরুষের দ্বারা এই জন্মলাভ, তা নির্ণয় করা, সেই সময় দূরূহ ব্যাপার। কারণ ঐতিহাসিক যুগের শুরু সময় পর্যন্ত যৌনমিলন ছিল অবাধ। আর এই সমস্যাকে দূর করার জন্য সৃষ্টি হল পুরুষতান্ত্রিক পরিবার ও বিবাহ। পুরুষেরা একাধিক বিবাহ করতেও পারলেও, নারীদের সেই অধিকার ছিল না। তাই নারীদের বিধান হল ‘সতীত্ব’। তারই হাত ধরে নারীদের মনে এই ধারণার প্রোথিত করা হয়, ‘পতি পরেমেশ্বর’। “বেহুলা – লক্ষীন্দরের আখ্যান এর প্রমান। এই ধারা এখন বর্তমান। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ছেলেদের গায়ে কলঙ্ক লাগে না, এই রকম আর কি। নারীরা এই নিয়ম মেনে নেই তার কারন একটাই। নারীদের সম্পর্কে বলা হয় ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’। প্রথমে কিন্তু একাধিক পুরুষের জন্য এক বা একাধিক নারীর নির্বাচিত হত যৌন মিলনের জন্য। বলা যেতে পারে নারীদের তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য করা হত এই নিয়ম মেনে নিতে। পরবর্তীকালে সামাজিক বিবাদ দূর করার জন্য একাধিক পুরুষের বদলে একজন পুরুষই নির্বাচিত এক বা একাধিক নারীর জন্য। মনে রাখা উচিত নারীরাই সমাজের সবচেয়ে শোষিত অংশ। তাদেরও উৎপাদন যন্ত্র হিসেবে ভাবা হত। ফলে তারাও সামাজিক নিয়মে ব্যাক্তিগত সম্পত্তি। মহাভারতের দৌপ্রদী এর উদাহরণ। আরো একটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার যে সেই সময় পুরুষেরা ইচ্ছে করলেই যে কোন নারীর সাথে যৌন মিলনে যেতে পারত। তাতে নারীদের ইচ্ছে থাক বা না-থাক।

ধনী আর দরিদ্র শ্রেনীর বিভাজনকে ঘিরে স্বাভাবিক সামাজিক কারনেই সৃষ্টি হয় দু ধরনের ভগবান। একজন হয় গরীবের। যে গরীবের কাছে তাদের মুক্তির প্রতীক। আরেক জন যে শাসক গোষ্ঠীর, যার দ্বারা এই ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে তাদের অনুগামী রাখা যাবে। পরবর্তীকালে সমাজে অর্থনৈতিক বিচারে বিভিন্ন স্তর সৃষ্টি হয়। একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখতে পাব এই বিভিন্ন স্তরের মানুষের ঈশ্বর প্রার্থনা আলদা। আর একে নির্ভর করেই সৃষ্টি হল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রভূত্বকে কায়েম রাখার জন্যই ধর্মকে ও ধর্মের নিরিখে সামাজিক আচারবিধিকে লিখিত রূপ দিলেন। আর সময়কাল ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার বছরের বেশী নয়। এই লিখিত ধর্মীয় বিধিতে স্বাভাবিক নিয়মেই আরো কিছু বিধি নিষেধ সংযোজিত হল। পূর্ব জন্মের কর্মফলের নিরিখে বর্তমান জন্মে কেউ ধনী আর কেউ গরীব তাতে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হল। দাসদের কাছে এই বিধান খুব কার্যকরী বা অভিপ্রেত ছিল না। ফলে নানা সময়েই বিভিন্ন জায়গায় দাসদের বিদ্রোহ দেখা যায়। সেই কারনেই ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী দাসদের বা রাজধর্ম-বিরোধীদের হত্যা করা ধর্মীয় অনুমোদন পায়। ঋগবেদের ১০ মণ্ডলে এর উল্লেখ আছে। আবার সক্রেটিশ উদাহরণও প্রাসঙ্গিক। কারণ সেই সময় সক্রেটিশ সেই সময়কার নগরবিধি ও ধর্মীয় অনুশাষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগ ছিলেন রাজার তল্পিবাহক পুরোহিত ও পণ্ডিতেরা। সেই কারণে ধর্ম বিরোধী তকমা দিয়ে সক্রেটিশকে হত্যা করা হয়। সমাজের অগ্রগতির সাথে উৎপাদন ব্যবস্থা জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছিল। ফলে সামাজিক ব্যবধান ও গড়ে উঠেছিল মানুষে নানুষে। মানুষের ভ্রান্ত ধারণা থেকে গড়ে ওঠা ধর্মীয় আচরণবিধি পরিণত হয় অনুশাসনে।

শ্রেণী কর্তৃক শাসনকে কায়েম করার জন্য ধর্মীয় আচরণবিধি পরিণত হয় অনুশাসনে। আর এই অনুশাসনকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সৃষ্টি হয় শাস্ত্রাদি ও ধর্মগ্রন্থ। রাজাকে সমাজের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো হয়। সাথে পুরোহিতকুলকেও একটা বিশেষ স্থান দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে রাজা ও পুরোহিতদের মধ্যে স্বাভাবিক দ্বন্ধ থাকলেও নিজ নিজ স্বার্থে তারা আপোষ করে চলত। মানুষের জীবন-নির্বাহের আচরণবিধি ছিল ধর্মীয় অনুশাসনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর এই ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দিতে সামাজিক কারনেই হাজির হয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। সেই সময়ের শাসকেরা সেই সময়ই বুঝতে পেরেছিল শোষনকে কায়েম ও টিকিয়ে রাখতে গেলে মানুষের মধ্যে বিভাজন ঘটাতেই হবে। তাই তারা সুচতুরভাবে ধর্মকে এই বিভাজনের কাজে ব্যবহার করে। একটু ভাল করে খেয়াল করুন। সব ধর্মেই লেখা আছে আমরা সকলেই ঈশ্বর বা ঐজাতীয় কিছুর সন্তান বা দ্বারা সৃষ্ট। কিন্তু নানাবিধ কুব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও ব্যবধান গড়ে তোলে। তাছাড়াও সমাজের মধ্যে আর্থিক বৈষম্যর কারণও নির্ধারণ করা হল ধর্মীয় শাস্ত্রাদির দ্বারা। একটা ব্যাপারে আমাদের পরিষ্কার থাকা উচিত যে তা হল মানবজীবনের বিবর্তন এবং মানব সভ্যতার বিকাশ সর্বত্র একসাথে ও একইভাবে হয় নি। মূলতঃ ভৌগলিক পরিবেশ ও তার কারনে প্রতিকূলতাও ছিল বিভিন্ন। আর বিবর্তন এবং সভ্যতার বিকাশ গড়ে ওঠে বিভিন্নভাবে। বিভিন্ন ধর্মমত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বিভিন্ন জায়গায় সেখানকার সামাজিক-ভৌগলিক অবস্থানের নিরিখে।

আসল কথা হল ‘ধর্ম’ যখন ধর্মীয় অনুশাসন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যদা পেল, সেই সময় থেকে সব কিছুই বিচার হত ধর্মীয় শাস্ত্রের মাপকাঠিতে। সে মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের রাজসভায় চার্বাকরা হোক কিংবা ভ্যাটিকানে জিওদ্রানো ব্রণোই হোক। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন প্রথমে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মধ্যে সংঘাত হত মূলত আধিপত্য বজায়ের জন্য। যার ধারা আজো আছে। যার বিকট রূপ মৌলবাদ। কিন্তু এক সময় শাসকরা এই বিভিন্ন ধর্মমতকে একটা সহবস্থানে নিয়ে আসে। বিভিন্ন ধর্মমতকে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে রেখে মানুষের মধ্যে একটা শান্তিপূর্ণ বিভেদ বজায় রাখার কৌশল হিসেবে কাজে লাগায়। আবার নিজেদের কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখার জন্য ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে দাঙ্গা বাধাতেও দ্বিধা করে না।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে বারবার যুক্তিবাদী চিন্তাধারা গতি রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু রোধ করা যায় নি। আর এর দুইয়ের সংঘাতেই সৃষ্টি হয়েছে দুই দলের মানুষ। এক) যারা যুক্তিতে বিশ্বাসী আর আরেক দল, যারা বিশ্বাসে বিশ্বাসী।

যারা যুক্তিতে বিশ্বাসী তারা ধর্মে বিশ্বাসী নয়। আমি যুক্তিতে বিশ্বাসী বলে ধর্মে বিশ্বাসী নই।

Facebook Comments

4 thoughts on “আমি কেন ধর্ম মানি না – ১

  • July 30, 2019 at 7:27 am
    Permalink

    অনেকদিন পরে নাস্তিক্য ডট কমে এসে অনেকগুলো ভালো লেখা পড়লাম ।

    Reply
  • September 17, 2019 at 5:22 pm
    Permalink

    নাস্তিকরা যে আসলেই আবাল সেটা এই সব হযবরল লেখা পড়লেই বুঝা,তারাই কিনা আবার যুক্তির কথা বলে ।

    Reply
  • September 20, 2019 at 1:43 pm
    Permalink

    সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার যুগে আপনারা আত্মার সন্ধান পান না কারণ আপনার সফটওয়্যার এর বিবেক নামক যে ফোল্ডার আছে
    তা ভাইরাসে আক্রান্ত। সফটওয়্যার যেমন বিভিন্ন কমান্ডের লিখিতরূপ আত্মাও তেমনি বিভিন্ন কমান্ডের লিখিত রূপ। বরং আত্মা সফটওয়্যার এর সর্বোচ্চ ভার্সন। আত্মা প্রথম অবস্থায় যে অবস্থানে থাকে তাকে বলে আলমে আরওয়াহ। পরবর্তীকালে মাতৃগর্ভে মানব হার্ডওয়ার একটি নির্দিষ্ট লেভেলে গেলে
    ডাউনলোড হয়। পরবর্তীকালে আত্মা তার অপারেটরকে চিনতে পেরে সঠিকভাবে নিজকে ডেভলপ করতে পারলে পরের লেভেলে আত্মার স্থান হয় ইল্লিনে, অন্যথায় সিজ্জিনে।

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: