গীতার সময়কাল

[মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত]

লেখকঃ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভগবতগীতার ঐতিহাসিকত্ব সম্বন্ধে কতকগুলি প্রশ্ন আমাদের মনে স্বতই উদয় হয়; যথা গীতার প্রণেতা কে? তাহার প্রণয়নকালই বা কি? এইসকল প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া কঠিন; তবে, আনুমানিক প্রমাণে সম্ভব-অসম্ভব বিবেচনায়, যাহা সঙ্গত বোধ হয়, তাহা পাঠকের সম্মুখে ধারণ করাই আমার অভিপ্রেত। ভগবতগীতা মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের অন্তর্গত। ব্যাসদেব মহাভারতের রচয়িতা বলিয়া প্রসিদ্ধ, সুতরাং ব্যাসদেবই গীতার প্রণেতা বলিয়া সাধারণ লোকের ধারণা।ঐরূপ ধরিয়া লওয়া ভিন্ন গত্যন্তর নাই, কেননা গীতাকারের নামধাম ভারত সাহিত্যে কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। গীতার রচনাকৌশলে প্রকাশ পায় যে, উহাতে ভগবৎ প্রচারিত ধর্ম সঙ্কলিত হইয়াছে, কিন্তু গীতা গ্রন্থখানিকে কি ভগবৎ প্রচারিত বলা যাইতে পারে? ইহাতে অবশ্য অনেক পরমার্থ তত্ত্ব সন্নিবিষ্ট আছে, অনেক সারবান ধর্মোপদেশ আছে, কিন্তু তাহা বলিয়া যে ইহার সকল কথাই অভ্রান্ত রূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে, তাহা নহে। ঈশ্বর প্রণীত গ্রন্থের যে সকল লক্ষণ প্রত্যাশিত, তাহা ইহাতে সর্বাংশে বিদ্যমান আছে, আমি একথা স্বীকার করিতে প্রস্তুত নহি। দ্বিতীয়ত যদি শ্রীকৃষ্ণ সত্যই গীতার রচনাকার হন, তবে গীতাকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সমসাময়িক বলিতে হয়। কিন্তু কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ যে গীতা রচনার বহু পূর্বে সংঘটিত, সে বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহ নাই। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বেদ সঙ্কলনের সমকালীন ঘটনা, খ্রিষ্ট পূর্ব সহস্রাধিক বৎসরের পূর্ববর্তী, ইহা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন। এবং গীতার জন্ম বৈদিক সময়ের অনেক পরে, বোধকরি ইহাও কেহ অস্বীকার করিবেন না। গীতা শ্রুতি নহে, স্মৃতির মধ্যে গণ্য।

গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বরাবতার বলিয়া আপনার পরিচয় দিতেছেন। যদি শ্রীকৃষ্ণ তাহার আবির্ভাব কালে ঈশ্বরাবতার রূপে আর্য সমাজে গৃহীত হইতেন তাহা হইলে, সে সময়ে অথবা তাহার তিরোভাবের পরে ধর্ম রাজ্যে ঘোরতর বিপ্লব উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা, যেমন খ্রিষ্ট আবির্ভাবকালে হইয়াছিল, যদি তাহা হইত তবে পরবর্তী শত শত বৎসরের সাহিত্যে তাহার কোনো না কোনো নিদর্শন থাকা সম্ভব। কিন্তু তাহা কোথায়? ব্রাহ্মণ বল, আদিম উপনিষদ বল, কোথাও এ কথার কোন প্রসঙ্গ নাই। শতপথ ব্রাহ্মণ যাহা কুরুপাঞ্চাল দেশে বিরচিত, যাহাতে মহাভারতের অনেক বীরের নাম প্রাপ্ত হওয়া যায়, শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বরাবতার বলিয়া কোথাও তাহার উল্লেখ নাই। ছান্দোগ্য উপনিষদে তিনি ঘোর আঙ্গিরসের শিষ্য, দেবকী পুত্র বলিয়া কথিত, ঈশ্বরের অবতার বলিয়া পরিচিত নহেন। এসকল গ্রন্থের পর অনেককাল পর্যন্ত, কৃষ্ণ মহাপুরুষ বলিয়া খ্যাত কিন্তু দেবতা বলিয়া অর্চিত নহেন। পাণিনিতে “বাসুদেবারজজুনাভ্যাং” বলিয়া একটি সূত্র আছে, তাহা হইতে এইটুকু পাওয়া যায় যে, তখনকার কালে কৃষ্ণার্জুন ভক্ত কোনো উপাসক সম্প্রদায় ছিল, কিন্তু গীতাতে দেবমণ্ডলীর মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের যেরূপ একাধিপত্য সূচিত , তদনুযায়ী বিশ্বাস ওই সূত্র হইতে প্রমাণিত হয় না। পাণিনির মহাভাষ্যেও কৃষ্ণের ঈশ্বরত্বের কোনো নিদর্শন নাই।
এই ত একপ্রকার প্রমাণ। এখন দেখা যাউক গীতোক্ত ঘটনাটি কতদূর সম্ভব। দুইপক্ষের সেনা বুহ্যিত হইয়া পরস্পর প্রহার করিতে উদ্যত, এমন সময়ে যে একপক্ষের সেনাপতি উভয় সৈন্যের মধ্যে রথস্থাপন পূর্বক অষ্টাদশ অধ্যায় যোগশাস্ত্র শুনিতে বসিবেন, এই কথাটা বড় সম্ভবপর বলিয়া বোধ হয় না। এই সুযোগে কৌরব সেনাপতিগণ কৃষ্ণার্জুনের প্রতি অসংখ্য বান নিক্ষেপ করিতে কেনই বা ক্ষান্ত থাকিবেন? উত্তরে বলা যাইতে পারে, অর্জুনের ন্যায় প্রভাবশালী পুরুষ এক নজরে সমস্তটা বুঝিয়া লইয়াছিলেন, অধিক বাক্য ব্যায়ের প্রয়োজন হয় নাই। আমি ত গীতা হইতেই দেখিতে পাই যে, অনেক সময় কৃৃষ্ণোপদেশের ভাষার্থ গ্রহণে অর্জুন নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করিয়াছেন।সে যাক আবার এরূপ যুক্তিও শুনিয়াছি যে, আরম্ভে হয়ত গীতার অষ্টাদশ অধ্যায় ছিল না, অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র আয়তন ছিল, শেষের কয়েক অধ্যায় উত্তরকালে প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে, কিন্তু এ কথার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। যদি এক ভাগ প্রক্ষিপ্ত হইয়া থাকে, তবে অন্য ভাগ প্রক্ষিপ্ত হইবার বিচিত্র কি? ফলে এ কথা স্বীকার করিলে, সমগ্র গ্রন্থখানি অপ্রামাণিক হইয়া পড়ে। যাহারা প্রচলিত বিশ্বাস সমর্থন করিবার জন্য এইরূপ ওকালতি করিতে তৎপর আমি তাহাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করিতে প্রস্তুত নহি।

আর এক কথা। ধর রণক্ষেত্রে সত্যসত্যই এরূপ ধর্মালোচনা চলিয়াছিল, কিন্তু ব্যাসদেব তো আর সেই সময়ে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি কেমন করিয়া সমস্তটা শুনিলেন? ইহার উত্তর এই যে, ব্যাসদেব তুল্য মহর্ষি যোগবলে দূর হইতে সকলি জানিতে পারিয়াছিলেন। এ উত্তরের কোন প্রত্যুত্তর নাই। যুক্তিক্ষেত্রে ঐশি শক্তির অবতারণা করিলে , অসম্ভবকে সম্ভব করা কিছুই কষ্টসাধ্য নহে। শিলা জলে ভেসে যায় ,বানরে সঙ্গীত গায় সকলি সম্ভব।দৈবশক্তি প্রয়োগের কাছে কোনো শক্তিই টিকিতে পারে না।যাহারা গীতার প্রাচীনত্ব রক্ষা করিবার জন্য সমুৎসুক হইয়া এইরূপ এক যুক্তি অবলম্বন করেন আমি তাহাদের দোষ দিতেছি না- শাস্ত্র যত প্রাচীন হয়, সেই পরিমাণে তাহা আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। আমি কেবল সত্যের উপরোধে এই স্থানে ভিন্নমত প্রকাশ করিতে বাধ্য হইতেছি।দুপক্ষেরই যুক্তি তুলনা করিয়া আমার বিচারে দাঁড়ায় এই যে, স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই গীতা প্রণয়ন করেন নাই, অন্য কোনো ব্যক্তি গীতার প্রণেতা। যুদ্ধপক্ষ সমর্থন উপলক্ষ করিয়া লোকসমাজে বিশুদ্ধ জ্ঞান ধর্ম প্রচার করা তাহার উদ্দেশ্য, কিন্তু অনেক কথা যে গ্রন্থকারের নিজের মত, তিনি ভগবানের মুখ হইতে কথা প্রসঙ্গে বাহির করিতেছেন ইহাই সম্ভব। বঙ্কিম চন্দ্রের সহিত এই বিষয়ে আমার এক মত। গীতার ভাষ্য, ভাব ও মতামত আলোচনা করিয়া দেখিলে ঐ গ্রন্থ কোন সময়কার নয়, তাহা একপ্রকার নিঃসন্দেহে ধারণা হয়। কোন সময়কার নয় ,তাহা আগে স্থির হইলে , সাহিত্যক্ষেত্রে গীতার স্থান ও তাহার প্রণয়নকাল আপনা আপনি একটা দাড়াইয়া যায়।

প্রথম ঋগ্বেদ সংহিতা । যে সময়ে বৈদিক ঋষিগণ প্রাকৃতিক দেবতাদের স্তব স্তুতি পূর্ণ সুক্তাবলি রচনা করিতেছিলেন, সে কাল গীতার বহু শতাব্দ পূর্ববর্তী , ইহা সর্বাদিসম্মত।
বৈদিক সুক্তসকল সঙ্কলিত হইয়া ঋক, যজুঃ, সাম এই সংহিতা ত্রয়ে বিভক্ত হইয়াছিল, ইহা প্রসিদ্ধ।এই সময়ে আমরা আরেক রাজ্যে প্রবেশ করি। তখন ঋগ্বেদের যে কবিদের উচ্ছ্বাস , তাহা আর নাই। তখন এই দেশে পৌরোহিত্যের প্রভাব দিগ্বিদিক প্রসারিত হইতেছে।সাহিত্যেও পৌরোহিত্যের প্রভা প্রতিফলিত। সে সময়ে যে সাহিত্য ভাণ্ডার প্রস্তুত হয়, তাহার ক্ষেত্র ব্রহ্মাবর্ত- পশ্চিমে শতদ্রু হইতে পূর্বে গঙ্গা যমুনার সঙ্গম প্রয়াগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়ও গীতার আবির্ভাব কাল নহে।গীতার জন্ম ইহারও অনেক পরে। গীতার অনেক স্থলে ত্রিবেদেরই উল্লেখ দেখা যায়, চতুর্থ যে অথর্ব বেদ তাহার কোনো উল্লেখ নাই, ভগবান একস্থলে ঋক, যজুঃ,সাম রূপে আত্মবর্ণন করিয়াছেন। বিভূতিযোগাধ্যায়ে বেদের মধ্যে আপনাকে সামবেদ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু কোথাও অথর্ব বেদের কোনো কথাই নাই। ইহা হইতে বলা যাইতে পারে, অথর্ব বেদ ব্রাহ্মণ্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত হইবার পূর্বে গীতার প্রণয়নকাল সাব্যস্ত হয় এবং এই কারণে কোনো কোনো পণ্ডিত গীতার প্রাচীনত্ব অনুমান করেন, কিন্তু এই অনুমান যুক্তিসঙ্গত মনে করা যায় না।অথর্ব বেদ বহুকাল পর্যন্ত সাহিত্য সমাজে বেদ বলিয়া লব্ধ প্রতিষ্ঠ হয় নাই। উহাতে জাতুবিদ্যা(জাদু) , ভৈষজ, প্রভৃতি নানা বিষয় আছে যাহা যাজ্ঞিক ক্রিয়া কর্মের উপযোগী নহে। কর্ম কাণ্ডে ব্যবহারযোগ্য বিষয় উহাতে অতি অল্পই আছে এবং যাহা আছে তাহা শেষভাগে প্রক্ষিপ্ত। এই হেতু শ্রৌতগ্রন্থাবলির মধ্যে অথর্ব বেদের কোনো মাহাত্ম্য নাই। ঋগ্বেদের ব্রাহ্মণে উহার কোনো উল্লেখ নাই। অনেক শতাব্দী পর্যন্ত -অধিক কি অমরকোষেও অথর্ব বেদ বেদের মধ্যে ধর্তব্য নহে। যদিও পাতঞ্জল ভাষ্যে এবং কোনো কোনো উপনিষদে অথর্ব বেদের উল্লেখ আছে তথাপি মহাভারত ও পৌরাণিক যুগে আসিয়া না পৌছিলে উহার বৈদিক প্রতিপত্তি অনুভূত হয় না। বিষ্ণু পুরাণে অথর্ব বেদের একজন স্বতন্ত্র পুরোহিত নির্দিষ্ট হইয়াছে। গোপথ ব্রাহ্মণে অথর্ব বেদ ব্রহ্মবেদ বলিয়া কীর্তিত। কিন্তু মহাভারত ও পুরাণের পূর্বে ব্রাহ্মণ, সূত্র প্রভৃতি অন্যান্য প্রাচীন শাস্ত্রে উহার বেদাসন নির্দিষ্ট হয় নাই। অতএব বোধা যায় যে, অথর্ব বেদ বেদের মধ্যে গণ্য হইবার পূর্বে বহুকাল অতিক্রান্ত হয়। এখনো পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যের অনেকানেক অগ্রগণ্য ব্রাহ্মণেরা ঐ বেদকে বেদ বলিয়া গ্রহণ করিতে প্রস্তুত নহেন। এইসকল কারণে অথর্ব বেদের কোনো উল্লেখ নাই বলিয়া গীতার প্রাচীনত্ব সপ্রমাণ হয় না।

উপনিষদসকল বেদের শেষ ভাগ, এইজন্য উপনিষদকে বেদান্তও বলে। বেদের যে সকল অংশ ব্রাহ্মণ নামে অভিহিত , তাহা উপনিষদ অপেক্ষাও প্রাচীনতর সন্দেহ নাই।
উপনিষদ আবার এক সময়কার রচনা নহে। উহাদের রচনা ও বিষয়ভেদে কালবিভাগ করা যাইতে পারে।কতকগুলি উপনিষদ অপেক্ষাকৃত প্রাচীন, কতকগুলি আধুনিক , কতক বা এই দুই কালের ,মধ্যবর্তী। উপনিষদ সমস্ত চার শ্রেণীতে বিভক্ত করা যাইতে পারে। ইহাদের শীর্ষ স্থানীয় আদিম উপনিষদগুলি গদ্যে প্রণীত, সে গদ্য আধুনিক সংস্কৃত গদ্যের অনুরূপ নহে, ব্রাহ্মণগদ্যের আদর্শে রচিত। বৃহদারণ্যক , ছান্দোগ্য, তৈত্তিরিয়, ঐতরেয়,কৌশিতকি এই শ্রেণীভুক্ত। কেনোপনিষদ গদ্যে-পদ্যে বিরচিত।কেনোপনিষদ হইতে আমরা ছন্দোবদ্ধ পঞ্চোপনিষদে আসিয়া পড়ি। কঠোপনিষদ, ইষোপনিষদ, শ্বেতাশ্বতর,মূণ্ডক, মহানারায়ণী এইসমস্ত দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। তৃতীয় শ্রেণির উপনিষদগুলি আবার গদ্যে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে।এই গদ্য আধুনিক সংস্কৃত গদ্যের ধরণে রচিত। মৈত্রায়ণী ও অপর কয়টি উপনিষদ এই শ্রেণির অন্তর্গত। চতুর্থ শ্রেণীর মধ্যে যে সমস্ত উপনিষদ পরিগণিত তাহা অথর্ব উপনিষদ, গদ্যে পদ্যে বিরচিত। যতগুলি পাওয়া গিয়াছে সর্ব সমেত প্রায় সপ্তবিংশতি সংখ্যক হইবে। ইহাদের অনেকগুলি আধুনিক, এমনকি আল্লোপনিষদ নামক গ্রন্থবিশেষ ইহার মধ্যে স্থানলাভ করিয়াছে। প্রশ্ন, মুণ্ডক,মাণ্ডুক্য এই উপনিষদত্রয় অথর্ব উপনিষদের অন্তর্ভুক্ত।ইহাদের দার্শনিক ভিত্তি বেদান্ত। এই শেষোক্ত শ্রেণির মধ্যে যে সকল তত্ত্বের উপদেশ সন্নিবেশিত তাহা চারপ্রকার-
১/আত্মতত্ত্ব
২/ যোগসাধন
৩/সন্ন্যাস
৪/অবতারবাদ ও কৃষ্ণ, বিষ্ণু,শিবের দেবত্ব প্রতিষ্ঠা।

গীতার কালনিরূপন করিতে হইলে ইহাকে কঠাদি দ্বিতীয় শ্রেণির পরবর্তী বলিয়া অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। এই শ্রেণির উপনিষদের উপদেশ ও ভাবার্থ গীতার অনুকরণীয়; এমনকি ইহাদের কতিপয় শ্লোক গীতার মধ্যে সশরীরে সমানীত দেখা যায়।
অথর্বোপনিষদের সহিত গীতোক্ত উপদেশের সমধিক সাদৃশ্য উপলব্ধ হয়। অপরাপর তত্ত্ব ছাড়িয়া অবতারবাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে আমরা কিয়ৎ পরিমাণে গীতার কালনির্ণয়ের সন্ধান পাইতে পারি। গীতায় যে অবতারবাদের কথা আছে তাহা বেদে নাই,ব্রাহ্মণে নাই, আদ্যোপনিষদ্গুলিতেও নাই।ঈশ্বরের অবতার কল্পনা- কৃষ্ণ, বিষ্ণু,শিবের ঈশ্বরত্ব স্থাপন সাম্প্রদায়িকভাবে আর্য ধর্মের এইরূপ পরিবর্তন অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের পরিচায়ক। এই হিসাবে গীতাকে অথর্বোপনিষদের সমকাল বর্তী বলিয়া নির্দেশ করা অসঙ্গত বোধ হয় না।

গীতার পূর্বে যে আমাদের দর্শন শাস্ত্রসকল প্রণীত হইয়াছিল- সাংখ্য দর্শন, যোগ ও বেদান্ত দর্শন – শুধু মুখে মুখে অসম্বদ্ধ , অসম্পূর্ণ কথায় নয় , কিন্তু শাস্ত্র বা সূত্রাকারে গীতার সময় সে সমস্ত প্রচলিত ছিল, গীতার মধ্য হইতেই তাহার কতক আভাস পাওয়া যায়। গীতার সাংখ্য তত্ত্ব সকল বিস্তারিত রূপে উপদিষ্ট – সাংখ্য দর্শনকে গীতার দার্শনিক ভিত্তি বলিলেও অত্যক্তি হয় না। গীতার সময় সাংখ্য শাস্ত্র সূত্রাকারে গঠিত হইয়াছিল , এরূপ অনুমান করিবারও কারণ আছে। তাহার সাক্ষী অষ্টাদশ অধ্যায়ের ১৩ শ ,১৮ শ শ্লোক দেখ। ১৩ শ শ্লোকের সাংখ্য কৃতান্ত অর্থাৎ সাংখ্য সিদ্ধান্ত এবং ১৯শ শ্লোকোক্ত গুণসংখ্যান অর্থাৎ গুণের সংখ্যাকরণ , ভাষ্যকারেরা এই বাক্যগুলি সাংখ্য শাস্ত্র অর্থে ব্যবহৃত বলিয়া বিবেচনা করেন। ইহা হইতে নিষ্পন্ন হইতেছে যে, তখনকার কালে সাংখ্য দর্শন বাধাবাধি শাস্ত্রাকারে পরিণত হইয়াছে।

যোগ দর্শন ও ইহার আদরের বস্তু । ইহার এক নামই যোগশাস্ত্র। জ্ঞানযোগে সাংখ্য, কর্ম যোগে যোগশাস্ত্র – গীতার অবলম্বন। আমরা দেখিতে পাই যে, পাতঞ্জল দর্শনের যোগ সাধন প্রণালী গীতোপদেশের অন্তর্ভুক্ত, ভগবানে চিত্তসংযোগ প্রভৃতি ভগবদ্ভক্তিসূচক কতকগুলি কথা, যাহা কিছু নতুন, তাহাই গীতার নিজস্ব সম্পত্তি। চতুর্থ অধ্যায়ের প্রারম্ভে যোগশাস্ত্র সম্বন্ধে শ্রীকৃষ্ণ বলিতেছেন, “ পুরাতন যোগশাস্ত্র কালপ্রভাবে নষ্ট হইয়াছে – হে পরন্তপ, তুমি আমার ভক্ত ও সখা , সেই পুরাতন যোগ উত্তম রহস্য- আমি অদ্য তোমাকে বলিলাম।“

বেদান্ত দর্শনের সহিত গীতার যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ , তাহা আর অধিক বলিবার আবশ্যক নাই। -সে সম্বন্ধ পদে পদে প্রতীয়মান হয়। পঞ্চদশ অধ্যায়ের এক স্থানে ভগবান ‘বেদান্তকৃত’ বলিয়া আপনার পরিচয় দিতেছেন। শ্রীধর স্বামী তাহার এই অর্থ করেন, “ আমি তৎসম্প্রদায় প্রবর্তক জ্ঞানদাতা গুরু” । যদি শ্রীকৃষ্ণকে বৈদান্তিক সম্প্রদায়ের গুরু বলিয়া স্বীকার করা যায়, তাহা হইলে গীতার সময়ে বেদান্ত দর্শনের অস্তিত্ব ও লোকসমাজে প্রচার সহজেই প্রতিপন্ন হয়। তাহা ছাড়া ১৩ শ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোকোক্ত ‘ব্রহ্মসূত্রপদৈগীতং’ কথাগুলি এই প্রসঙ্গে বিচারযোগ্য , উহা পরে আলোচিত হইবে।

উল্লিখিত দর্শন ত্রয়ের মধ্যে সাংখ্যই প্রাচীনতম। কপিল মুনি সাংখ্যশাস্ত্রের আদিগুরু বলিয়া প্রসিদ্ধ। তিনি বৌদ্ধযুগেরও পূর্বে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন বলিয়া ধারণা হয়, কেন না বৌদ্ধ ধর্মে সাংখ্য শাস্ত্রের প্রভাব বিলক্ষণ পরিলক্ষিত হয়, আর বৌদ্ধদের মধ্যে প্রবাদ এই যে, বুদ্ধদেবের জন্মভূমি যে কপিলাবস্তু, কপিলের নাম হইতেই তাহার নামকরণ হয়। সে যাহা হউক, কপিলের স্বরচিত কোনো গ্রন্থ বিদ্যমান নাই। আমরা এ পর্যন্ত যে সমস্ত সাংখ্য সূত্র পাইয়াছি তাহা অপেক্ষাকৃত আধুনিক। গীতার সময় দর্শন শাস্ত্রসকল কি আকারে প্রচলিত ছিল, তাহা ঠিক করিয়া বলা যায় না। যদি এমন মনে করা যায় যে, সে সময়ে পাতঞ্জল দর্শন বিদ্যমান ছিল ,তাহা হইলে গীতার প্রণয়নকাল খ্রি পূ দুই শতাব্দীরও উত্তরকাল হইয়া পড়ে।
কিন্তু যদিও এই বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত্ব নহে , তথাপি সমস্ত বিবেচনা করিয়া দেখিলে গীতার প্রাচীনত্ববাদে বিশেষ সন্দেহ জন্মে। যখন দেখা যায়, গীতোক্ত দর্শন তত্ত্ব, তাহার পূর্ব গামী দর্শন হইতে সংগৃহীত – সেই সমস্ত দর্শনের সমন্বয় সাধনেই গীতার বিশেষত্ব , তখন গীতার কাল নিদানপক্ষে দর্শন সূত্র সংকলের পরবর্তী বলিয়া প্রতিপন্ন হয়।
বর্ণাশ্রম ধর্ম রক্ষণের প্রতি গীতার বিশেষ লক্ষ। বর্ণ সঙ্করের উৎপত্তি হইতে সমাজ বিপ্লবের আশঙ্কা উহাতে পদে পদে সূচিত হইতেছে। পরধর্মের তুলনায় স্বধর্মের শ্রেষ্ঠতা ,পরধর্মাবলম্বনে বিনাশের মূল – এইরূপ উপদেশ আর্য সমাজের আদিম অবস্থার কথা নহে। বৌদ্ধ ধর্মের অভ্যুদয়ে ঐ সমাজে যে ঘোরতর জাতিবিপ্লব উপস্থিত হয়, সেই বিপ্লব নিবারণ করা ঐ সমস্ত উপদেশের উদ্দেশ্য বলিয়া গৃহীত হইতে পারে। এ অনুমান যদি সত্য হয়, তাহলে গীতাকে বুদ্ধের আবির্ভাবের পরবর্তী বলিয়া অবশ্য স্বীকার করিতে হয়। এতদ্ভিন্ন ভূতোপাসনা,সাকারবাদ,ভক্তিযোগের কথাসকল আধুনিক কালের অনুকূল সাক্ষ্য প্রদান করে।

সূত্রসাহিত্যের পর মহাভারত ও মনুসংহিতার উল্লেখ করিতে হয়। ইহাদের প্রভাবও গীতার স্থানে স্থানে উপলব্ধি করা যায়। সৃষ্টি প্রকরণ, বর্ণাশ্রমের কর্ম বিভাগ ইত্যাদি বিষয়ে মনুর সহিত গীতার সাদৃশ্য লক্ষিত হইবে। কমলাসনস্থ ব্রহ্মা,গদাচক্রধারী বিষ্ণু,সেনাপতি স্কন্দ,সমুদ্রমন্থন প্রসূত উচ্চৈঃশ্রবাঃ ও ঐরাবত,নাগরাজ বাসুকি,গরুড় মকরাদির কথা হইতে মহাভারত ও পৌরাণিক আখ্যানসকল স্মরণপথে উদিত হয়। মহাভারতে আছে ভীষ্মদেব দেহত্যাগের পূর্বে সদগতি লাভার্থ শরশয্যায় উত্তরায়ণ প্রতিক্ষা করিয়া রহিলেন।গীতাও উপদেশ দিতেছেন যে, যোগীর উত্তরায়ণে মৃত্যু হইলে ব্রহ্মপ্রাপ্তি ও দক্ষিণায়নে প্রাণত্যাগ হইলে সংসারে পুনরাবর্তন হয়। মোক্ষ অর্থে নির্বাণ শব্দের প্রয়োগ মহাভারতেও দৃষ্ট হয়। মহাভারতের সাদৃশ্য হইতে গীতার কাল নির্ণয়ের বিশেষ কোনো সাহায্য হয় কিনা দেখা যাউক।

মহাভারত যদি এক সময়কার রচনা হইত ,যদি তাহার রচনাকাল অকাট্য প্রমাণদ্বারা নিরূপন করা সুসাধ্য হইত, তাহা হইলে গীতা মহাভারতের অন্তর্গত বলিয়া তাহার কালনির্ণয়ে আমরা অনেকটা কৃত কার্য হইতে পারিতাম, কিন্তু সে পথ বন্ধ। বঙ্কিম বাবু তাহার কৃষ্ণ চরিত্রে মহাভারতের মধ্য হইতেই দেখাইয়াছেন যে, মহাভারতের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্তর আছে। প্রথমটি আদিম কঙ্কাল, তাহাতে পাণ্ডবদিগের জীবনবৃত্ত এবং আনুষঙ্গিক কৃষ্ণ কথা ভিন্ন আর কিছুই নাই। ইহা চতুরবিংশতি শ্লোকাত্মিকা ভারত সংহিতা। তাহার পর আরেক স্তর আছে, তাহা প্রথম স্তর হইতে ভিন্ন লক্ষণাক্রান্ত। প্রথম শ্রেণির লক্ষণাক্রান্ত যে সকল অংশ , সেই অংশই প্রাথমিক বা আদিম, এবং দ্বিতীয় শ্রেণির লক্ষণযুক্ত অংশগুলি পরে রচিত হইয়া তাহার উপর প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে, এরূপ বিবেচনা করা যাইতে পারে। প্রথম স্তরে ও দ্বিতীয় স্তরে এক গুরুতর প্রভেদ এই যে, প্রথম স্তরে কৃষ্ণ ঈশ্বরাবতার বা বিষ্ণুর অবতার বলিয়া সচরাচর পরিচিত নহেন, নিজে তিনি আপনার দেবত্ব স্বীকার করেন না এবং মানুষী ভিন্ন ঐশি শক্তি দ্বারা কোনো কর্ম সম্পন্ন করেন না। কিন্তু দ্বিতীয় স্তরে তিনি স্পষ্টত বিষ্ণুর অবতার বা নারায়ণ বলিয়া পরিচিত এবং অর্চিত, নিজেও নিজের ঈশ্বরত্ব ঘোষণা করেন, কবিও তাহার ঈশ্বরত্ব প্রতিপন্ন করিবার জন্য বিশেষপ্রকারে যত্নশীল। ইহা ভিন্ন মহাভারতে আরো এক স্তর আছে, তাহা তৃতীয় স্তর। এই তৃতীয় স্তর অনেক শতাব্ধী ধরিয়া গঠির হইয়াছে। এই কারণে অনেক ভালোমন্দ কথা ইহার মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে।
পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরাও মহাভারতকে স্তরে স্তরে বিভক্ত করেন-
১/আদিম কঙ্কাল (কাব্য)
২/চতুর্বিংশতি সাহস্রী সংহিতা (মহাকাব্য)
৩/ স্মৃতি বা ধর্ম শাস্ত্রের আকার
৪/পরবর্তী প্রক্ষিপ্তাংশ
তাহাদের মতে খ্রি পূ ৫ম শতাব্দী হইতে তৃতীয় বা চতুর্থ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মহাভারতের ব্যপ্তিকাল। প্রায় সহস্র বৎসরে সহস্র শ্লোক লক্ষাধিক শ্লোকে পুষ্টিলাভ করিয়াছে- বীররসাত্মক কাব্য তাহার এই বর্তমান ধর্ম শাস্ত্রের আকারে পরিণত হইয়াছে।এইকাল মধ্যে কৃষ্ণ সামান্য নর, নরোত্তম,নারায়ণ- মনুষ্য হইতে ক্রমে দেবতার পদে সমারূঢ় হইয়াছেন।
এই সংশোধনের মধ্যে গীতা কোন স্তরে স্থাপিত হইতে পারে? পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, ভগবতগীতা ভীষ্ম পর্বের অন্তর্গত, কিন্তু গীতা মহাভারতের প্রক্ষিপ্তাংশ কিনা এবং কোন সময়েই বা প্রক্ষিপ্ত এই বিষয় লইয়া পণ্ডিত মণ্ডলীর মধ্যে বিস্তর বাদানুবাদ চলিতেছে। অতএব ভীষ্ম পর্বের অন্তর্গত বলিলেও গীতার কাল নির্ণয় অধিকদূর অগ্রসর হয় না। মহাভারতের একটি শ্লোক এই প্রসঙ্গে উত্থাপিত হইতে পারে-তাহা এই-
“যদাশ্রৌষং কশ্মলেনাভিপন্নে
রথোপস্থে সীদমানেহরজ্জুনে বৈ।
কৃষ্ণং লেকান দরশয়ানং শরীরে
তদা নাশংসে বিজয়ায় সঞ্জয়।।
ধৃতরাষ্ট্রবিলাপ আদি, ১ম, ১৭৯
“যখন শুনিলাম অর্জুন দুঃখাভিভূত হইয়া রথোপস্থ অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন এবং কৃষ্ণ তাঁহাকে স্বীয় শরীরে বিশ্বরূপ দর্শন করাইয়াছিলেন, তখন হে সঞ্জয় আমি বিজয়ের আশা পরিত্যাগ করিলাম।“ কিন্তু ইহাতে কি প্রমাণ হইতেছে? ইহাতে তো গীতার নামোল্লেখ নাই। এমন হইতে পারে যে, এই শ্লোকোক্ত ঘটনা অবলম্বন করিয়া পরবর্তী কোনোকালে গীতা রচিত হইয়াছিল, যেমন মহাভারতের শকুন্তলাখ্যান অবলম্বন করিয়া কালিদাসে অভিজ্ঞানশকুন্তলম রচিত।তাহা ছাড়া উক্ত শ্লোক কোন স্তরের অন্তর্গত , তাহা নিরূপন করাও সহজ নহে। মহাত্মা কাশিনাথ ত্র্যম্বক তেলেংগ বাহ্যাভ্যন্তর নানাবিধ প্রমাণ সংগ্রহ করিয়া তাহার গীতানুবাদের উপক্রমণিকায় গীতার জন্মকাল অন্তত খ্রি পূ ৩য় শতাব্দী অনুমান করেন। গীতার ভাষ্য, ছন্দ, রচনাপ্রণালী, দর্শন,বেদ, যজ্ঞ বর্ণাশ্রম সম্বন্ধে উহার মতামত ইত্যাদি বিষয় লইয়া আভ্যন্তরিক প্রমাণ। গীতার কালনির্ণয়ে উপযোগী বাহ্যপ্রমাণ যাহা পাওয়া যায় , তৎসম্বন্ধে তাহার যুক্তির সারাংশ এই-
“তিনি বলেন, শংকরাচার্য গীতার ভাষ্যকার- শংকরাচার্য খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর লোক, অতএব, গীতা গ্রন্থখানি অষ্টম শতাব্দীর পূর্বে ছিল ইহা নিশ্চিত।
‘কাদম্বরী’ প্রণেতা বাণভট্ট সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে জীবিত ছিলেন, ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়।কাদম্বরীতে ভগবৎ গীতার উল্লেখ আছে। তাহার একস্থানে রাজবাটি বর্ণনায় মহাভারতের সহিত রাজার প্রাসাদের উপমা দেওয়া হইয়াছে এবং ‘অনন্তরগীতাকরণনানদিতনর’ এই শব্দগুলি সেই প্রাসাদের বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত। এই বিশেষণ প্রাসাদের প্রতি প্রয়োগ এবং মহাভারতে প্রয়োগ করা যাইতে পারে এবং তদনুসারে তার দুই ভিন্নার্থ হয়। প্রাসাদে প্রযুক্ত হইলে এই অর্থ হয় যে, সেখানকার লোকেরা অনন্তগীত (সঙ্গীত) শ্রবণে আমোদিত। মহাভারতের সম্বন্ধে এই যে, লোকেরা সেখানে অনন্ত গীতা অর্থাৎ ভগবৎ গীতা শ্রবণে আনন্দিত; ইহা হইতে প্রতিপন্ন হইতেছে যে, কাদম্বরী রচনার সময় মহাভারত ও গীতা পাঠ জনসাধারণে প্রচলিত ছিল।
বাণভট্টের হর্ষ চরিতে কালিদাসের নামোল্লেখ আছে, সুতরাং বাণভট্টের পূর্বে কালিদাসের জন্মকাল বলা যাইতে পারে। কালিদাস খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীতে আবির্ভূত , ইহা একপ্রকার স্থির সিদ্ধান্ত। কালিদাসের কাব্যে গীতার বচন হইতে উদ্ধৃত শ্লোক দৃষ্ট হয়।দুই একটি উদাহরণ দিলেই ইহা স্পষ্ট বুঝা যাইবে। মহাত্মা তেলেংগ রঘুবংশ হইতে একটি দিয়াছেন, তাহা দশম সর্গে দেবতাদের বিষ্ণুস্তবের ৩১ তম শ্লোক-
“অনবাপ্তমবাপ্তব্যং ন তে কিঞ্চন বিদ্যতে।
লোকানুগ্রহ এবৈকো হেতুস্তে জন্মকরম্মাণোঃ ।।
অর্থাৎ, কি আছে অলব্ধ কিংবা অপ্রাপ্য তোমার,
নিত্য পরিপূর্ণ প্রভু বিশ্বের আধার?
জনম করম তবু করিছ গ্রহণ
কেবল লোকের হিত করিতে সাধন।।
[নবীনচন্দ্র দাস]

ইহা হইতে গীতার অনেক স্থানের শ্লোক ও ভাবার্থ স্মরণ হয়।
ভগবানের যে কোনো ধর্তব্য নাই, লোকানুগ্রহের জন্যই যে তিনি কর্মে নিযুক্ত, তাহা দ্বিতীয়াধ্যায়ে ২০ শ হইতে ২৪ শ শ্লোকে উক্ত হইয়াছে। ভগবানের ‘দিব্য জন্ম কম্ম’ এই বাক্যগুলি শব্দশ অন্যত্র প্রাপ্য হওয়া যায়।
বিষ্ণুস্তবের আরেকটি শ্লোক আমার মনে হইতেছে-
“ত্বয্যাবেশিতচিত্তানাং ত্বতসমরপিতকরমমণাম।
গতিস্ত্বং বিতরাগাণাম অভূয়ঃসন্নিবৃত্তয়ে।।
অর্থাৎ, বিষয়বিরাগমতি যেই যতিগণ,
যোগবলে নিজ চিত্ত নিবেশি তোমায়;
সর্ব কর্ম তোমা পরে করে সমর্পণ,
মোক্ষগতি পায় তারা তোমারই ক্রিপায়।।
[নবীনচন্দ্র দাশ]

গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ে আছে,
“যে তু সরবাণি করমানি ময়ি সন্নস্য মতপরাঃ।
অনন্যেনৈব যোগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে।।
তেষামহং সমুরদ্ধতা মৃত্যুসংসারসাগরাত ।
ভবামি ন চিরাত পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম।।

এ দুয়ের মধ্যে আশ্চর্য সাদৃশ্য ,তাহা বিনা ঋণ গ্রহণে উৎপন্ন হইতে পারে না।
আবার কুমারসম্ভবের ৬ষ্ঠ সর্গে ৬৭ তম শ্লোকে সপ্তর্ষিদের মুখে হিমালয় স্থাবর বলে বর্ণিত। গীতার বিভূতিযোগাধ্যায়েও ভগবান “স্থাবরাণাত হিমালয়ঃ” বলিয়া আত্মবর্ণন করিতেছেন। মল্লিনাথ ঐ শ্লোকের ব্যাখ্যায় যথার্থই লিখিয়াছেন, “’স্থাবরাণাঃ হিমালয়ঃ’ ইতি গীতাবচনাত”

এই কয়েকটি উদাহরণ হইতে কালিদাশের কাব্যে গীতার আভাস সহজেই উপলব্ধ হয়, সুতরাং গীতা পঞ্চম শতাব্দীরও পূর্ববর্তী ইহা নিষ্পন্ন হইতেছে।
এই পর্যন্ত গীতানুবাদকের সহিত আমাদের এক মত। অতঃপর তিনি প্রতিপন্ন করিতে চাহেন যে, গীতা বেদান্ত সূত্র অপেক্ষাও প্রাচীন।এই মত সমর্থনে তিনি যে সকল যুক্তি প্রয়োগ করিয়াছেন, আমরা তাহা অনুসরণ করিতে পারিলাম না।বাদরায়নের বেদান্ত সূত্র প্রাচীন শাস্ত্র সন্দেহ নাই, কিন্তু গীতার মধ্যে তাহার কোনো নামোল্লেখ নাই। কোনো কোনো সূত্রে প্রমাণ স্বরূপ স্মৃতির কথা আছে বটে, কিন্তু সে কোন স্মৃতি, তাহার নির্দেশ নাই। ভাষ্যকারেরা বলেন, সে স্মৃতি গীতা , কিন্তু সে তাহাদের নিজের মত, তাহার পৃষ্ঠপোষক প্রমাণাভাব। অন্যান্য পণ্ডিতেরা ইহাতে মতভেদ প্রকাশ করিয়া থাকেন। বেদান্তসূত্রের অপর নাম ব্রহ্মসূত্র-গীতা স্বয়ং একস্থানে সেই নাম কীর্তন করিয়াছেন-
ঋষিভিরবহুরধা গীতংছন্দোভিরবিভিধৈঃ পৃথক।
ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভিরবিনিশ্চিতৈঃ।।
“ ঋষি গণ কর্তৃক বিবিধ ছন্দে এবং হেতুবিশিষ্ট সুনিশ্চিত ‘ব্রহ্মসূত্র’ পদ দ্বারা উহা পৃথক রূপে বহুধা গীত হইয়াছে।“

ভট্ট মক্ষমুলার তাহার প্রণীত ষড়দর্শনে এইরূপ অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, এই সূত্রে ‘ব্রহ্মসূত্র’ পদে বেদান্ত সূত্র বুঝিতা হইবে। ‘হেতুমদ্ভিরবিনিশ্চিতৈঃ’ এই দুই বিশেষণ সূত্র শাস্ত্রের প্রতি লক্ষ করিয়াই ব্যবহৃত হওয়া সম্ভব। বেদান্ত সূত্রে যে স্মৃতির প্রমাণ কথিত আছে, তাহা গীতা ভিন্ন অন্য কোনো স্মৃতি হইতে পারে, এই বিষয়ে ভাষ্যকারদের মধ্যেও মতভেদ, কিন্তু তাহারা যাহাই বলুন, গীতোক্ত ব্রহ্মসূত্র বেদান্তসূত্র অর্থে গৃহীত হওয়া যতদূর সঙ্গত , তাহার বিপরীত পক্ষে তাহাদের ব্যাখ্যা তেমন প্রতীতিজনক নহে।
অতএব গীতার কালনির্ণয় সম্বন্ধে তেলেংগমহোদয় যে সকল যুক্তি প্রয়োগ করিয়াছেন, তাহাতে দোষ ধরিবার নাই, এমন নহে। সে যাহা হউক তিনি গীতার যে জন্মকাল নিরূপন করিয়াছেন, তাহা অপেক্ষাও উহাকে দূরে ফেলা কোনোক্রমেই যুক্তি সঙ্গত বোধ হয় না- বরং আরো উত্তরকালীন বলিলেও বলা যাইতে পারে। অনেকানেক সমীচীন ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের পক্ষপাতী। গীতার সময় প্রাচীন যোগশাস্ত্র লুপ্তপ্রায়, ইহাতে তাহার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা হইতেছে। কপিল সাংখ্যও এতদূরে গিয়া পড়িয়াছে যে, কপিলমুনি সিদ্ধ যোগীর পদে সমারূঢ় হইয়াছেন। ব্যাসদেবও অসিত দেবলের সঙ্গে দেবর্ষি মধ্যে পরিগণিত। তাহা ছাড়া গীতার ভাষ্যও বৈদিক নহে, সামান্য ব্যতিক্রম বাদে আধুনিক সংস্কৃত ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করিয়া দেখিলে গীতার প্রণয়নকাল বহু প্রাচীন বলিয়া অনুমান করা যায় না। উপনিষদের অথর্ব ভাগ, মহাভারতের দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের গঠনকাল যাহা, গীতার রচনাকাল মোটের ওপর তাহাই ধরা যেতে পারে- বৈদিক ও পৌরাণিক যুগের মধ্যবর্তী- খ্রিষ্টাব্দ প্রবর্তনের কিছুকাল অগ্র পশ্চাৎ উহা বলাই সঙ্গত। যাহা হউক, এ সকলই অনুমানের উপর নির্ভর, আমি এই বিষয়ে কোনো অভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি, একথা বলিতে সাহস করি না।

Facebook Comments

2 thoughts on “গীতার সময়কাল

  • August 12, 2019 at 7:34 pm
    Permalink

    বেশি পড়তে প্রয়োজনবোধ করলাম না। প্রথম দুইটা যুক্তিই বাকি টুকু না পড়ার জন্য যথেষ্ট। কেননা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কখনোই বৈদিক সময়ের নয়। আর এই গীতা যখন বলা হচ্ছিলো, তখন কৃষ্ণ আর অর্জুনের সময়কে স্থির করে দেয়া হয়েছিল। যেজন্য তাদেরকে কেউ আক্রমণ করতে পারেনি। এখন আপনার কাছে আমার দ্বিতীয় কথার বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারেই থাকবে না, সেটা আমি জানি। কিন্তু আইন্সটাইনের আপেক্ষিকতার তথ্য থেকে তাত্ত্বিকভাবে সময়কে স্থির করা সম্ভব। যা এখনও বিজ্ঞানীরা practically প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি।

    Reply
    • August 13, 2019 at 6:00 pm
      Permalink

      সময়কে স্থির করে দেওয়া হয়েছিল তা গীতা বা মহাভারতে কোথায় বলা আছে, তথ্যসূত্র দিন। তথ্যসূত্র না দিতে পারলে এই ধরণের কথা বৃথা প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

      Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: