ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে

ভূমিকা

ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি, আল্লাহ পাক আমাদের তাকদীর নির্ধারণ করে রেখেছেন। ঐ তাকদীরে কী লেখা তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। তাই আমরা বিশ্বাস করি, যেটি লেখা রয়েছে, আসলে সেটাই হবে। আল্লাহ পাক যা লিখে রেখেছেন, সেটি কখনো পরিবর্তন হওয়ার নয়। কারণ আল্লাহপাকই সব কিছু আগে থেকে জানেন।

এই বিষয়ে ছোটবেলা আমদের তেমন কোন জ্ঞান আসলে ছিল না, তাই গুরুজনরা যেমনটি বলতো, না বুঝলেও আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের মনে নানা প্রশ্ন ডালপালা মেলে। আমরা ধর্মগ্রন্থ থেকে পড়ি ফ্রি উইল বা স্বাধীন ইচ্ছার কথা, এবং একই সাথে তাকদীরে বিশ্বাস বিষয়ে কিছু সমস্যাতে পরি। কিছুতেই হিসেব মেলে না। সেই হিসেব নিয়েই আজকের আলোচনা। আশাকরি আগ্রহী পাঠকের মনে এই লেখাটি কিছু চিন্তার উদ্রেক করবে।

প্রশ্নগুলো হচ্ছে, ভাল বা সৎ কর্মের মাধ্যমে বা মন্দ কাজের ফলে আল্লাহ পাকের লিখিত তাকদীর পরিবর্তনযোগ্য কিনা! কারণ আমাদের জন্মের বহু কোটি বছর আগেই তা আল্লাহ পাক লিখে রেখেছেন।

এরকম বিষয় নিয়ে মাঝে মাঝেই আমি স্কুলে, বা আমাদের এলাকার মসজিদের হুজুরদের প্রশ্ন করতাম। কিন্তু তারা স্কুলের টিচার এবং আমাদের পরীক্ষার একটি উদাহরণ সামনে এনে বোঝাবার চেষ্টা করতেন, স্কুলের পরীক্ষক যেমন জানে, কে ভাল ছাত্র আর কে খারাপ ছাত্র, তারপরেও পরীক্ষা নেন, ঠিক একইভাবে আল্লাহ পাকও সবই জানেন, কিন্তু তারপরেও আমাদের পরিশ্রম করে যেতে হবে, ঈমান রাখতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু এই ধরণের তুলনা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচাইতে ভয়াবহ শিরকের অন্তর্ভূক্ত। কারণ আল্লাহ পাকের সাথে যেকোন কিছুকে তুলিনা দেয়াই ভয়াবহ অপরাধ বলে ইসলামে গণ্য। কিন্তু আমাদের সেই সকল শিক্ষকগণ যে সরাসরি শিরক করছেন, তা তাদের মুখের ওপর বলে অনেকবারই নির্যাতনের শিকার হয়েছি। সঠিক উত্তর পাই নি। বিষয়টি বুঝিয়ে বলছি।

ধরুন, একজন শিক্ষক জানেন, কোন ছাত্র ভালো রেজাল্ট করবে আর কোন ছাত্র খারাপ। তারপরেও তিনিও পরীক্ষা নেন। কিন্তু এই উদাহরণের সাথে আল্লাহ পাকের জানার কোন মিল নেই। খেয়াল করে দেখুন, একজন শিক্ষক পূর্ব অভিজ্ঞতা বা পূর্বের পড়ালেখা, বা অন্যান্য কাজের ওপর ভিত্তি করে শুধুমাত্র কিছু ধারণা করতে পারেন। সেই ধারণা কখনো সঠিক হতে পারে, কখনো বেঠিক। সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে, শিক্ষক সেই ছাত্রদের খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যত ভালভাবে জানবেন। যেমন, শিক্ষক যদি আগেই জানেন যে, কলিমুদ্দিন নামক একটি ছাত্র পরীক্ষার আগের রাতে কিছু বাসি খাবার খাবে, এবং তার ফলে পরীক্ষার আগের রাতে তার ডায়রিয়া হবে, সে পড়া ঠিকভাবে করতে পারবে না, ভাল ছাত্র হওয়ার পরেও তার কম নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। কারণ সে সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে নি। অন্যদিকে আরেকজন অপেক্ষাকৃত খারাপ ছাত্র হয়তো সুস্থ থাকার কারণে তার চাইতে ভালভাবে প্রস্তুতি নেয়ায় অপেক্ষাকৃত ভাল রেজাল্ট করবে।

এই ধরণের খুঁটিনাটি কোন শিক্ষকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সকল প্রতিযোগী একই রকম লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ পেয়েছে কিনা, তার ঐ শিক্ষকের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। ঐ শীক্ষক যদি আগেই জানেন, ঐ ভাল ছাত্রটির আগের রাতে বাসি খাবার খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া হবে, এবং সে খারাপ রেজাল্ট করবে, তাহলে ঐ পরীক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি এবং কে কত নম্বর পেয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। শিক্ষক কেন সব জানার পরেও কোন ব্যবস্থা নিলেন না, বা ঐ ভাল ছাত্রটিকে খাবারগুলো খেতে নিষেধ করলেন না, এই সবই তখন আলোচ্য হবে।

অর্থাৎ, শতভাগ নিশ্চিত করে তিনি কখনই কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু আল্লাহ পাকের এইসব সীমাবদ্ধতা নেই। তিনি সকল মানবীয় সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে। তাই তিনি শতভাগ নিশ্চিতভাবে সব জানেন, এবং তার জানাটা কোন ধারণা নয়। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করা এবং একদম ১০০% নিশ্চিত ভাবে জানা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যারা আল্লাহর এই জানার সাথে শিক্ষকের ধারণার তুলনা করেন, তারা স্পষ্টতই শিরক করেন। ইসলাম অনুসারে, আল্লাহ পাকের সাথে যেকোন শরীক করা, তুলনা করাই সর্বোচ্চ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।

আসুন মূল আলোচনার আগে ইসলামের দৃষ্টিতে তাকদীর কাকে বলে, তা ভালভাবে জেনে নিই।

তাকদীর (নিয়তি) কাকে বলে?

কাযা (ভাগ্য) ও তাকদীর (নিয়তি)- এর প্রতি ঈমান ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসের অন্যতম মূলস্তম্ভ। কোন মুসলিমের ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে বিশ্বাস করে যে, যা ঘটেছে সেটা এবং কেবলমাত্র সেটিই ঘটতোই ঘটতো। আর যা ঘটেনি সেটি কোন অবস্থাতেই কোন কিছুতেই ঘটতো না। কারণ আল্লাহপাক এমনটিই লিখে রেখেছেন যে, এমনটিই ঘটবে, এবং যা ঘটে নি তা ঘটবে না। এর কোন অন্যথায় হতে পারে না। যারা পূর্ণাঙ্গভাবে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করে যে, সবকিছু আল্লাহ্‌র কাযা ও তাকদীর অনুযায়ী ঘটে থাকে, শুধুমাত্র তারাই প্রকৃত মুসলিম। কারণ এটি ইসলামে বিশ্বাসের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। এটি বিশ্বাস না করলে কারো ইসলামে ইমান পূর্ণ হতে পারে না।

তাকদীর বিষয়ে কোরআন

আল্লাহ্‌ কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবেই বলেছেন, তিনি কিছু মানুষের অন্তরে মোহর মেরে দেন, কানসমূহ বন্ধ করে দেন, চোখে পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন। যার ফলে তারা ইসলামকে জানতে এবং বুঝতে পারে না। যার ফলশ্রুতিতে তারা কাফের হয়ে যায়।

আল্লাহ তাদের অন্তকরণ এবং তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।

সুরা বাকারা আয়াত ৭

আল্লাহ্‌ বলেছেন, তিনি সমস্ত বস্তুকেই তাকদীর অনুযায়ী সৃষ্টি করেছেন।

“আমি প্রত্যেক বস্তুকে তাকদীর অনুযায়ী সৃষ্টি করেছি।”

[সূরা ক্বামার, আয়াত: ৪৯]

এই পৃথিবীতে যত ধরণের ভাল ঘটনা ঘটে, বিপদ-আপদ ঘটে, ফিতনা-ফাসাদ আপতিত হয় আল্লাহ্‌ তাআলা সেসব ঘটার আগেই সে সম্পর্কে জানেন এবং সেটা তিনি লওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন। যা বিশ্বাস করা প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ্‌ বলেছেনঃ

“পৃথিবীতে ও তোমাদের জানের উপর যে বিপদই আসুক না কেন আমরা তা সৃষ্টি করার আগেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।”

[সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২]

ইসলাম ধর্ম অনুসারে প্রতিটি মুসলিমের অবশ্যই এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কোন কিছুই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে ঘটে না। হোক না সেটা আল্লাহর কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট অথবা মাখলুকের কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং (যা ইচ্ছা) মনোনীত করেন।”

[সূরা কাসাস, আয়াত: ৬৮]

আল্লাহ আরো বলেন, তিনি যেটি ইচ্ছা করেন সেটাই করেন বা ঘটান।

“এবং আল্লাহ যা ইচ্ছা সেটাই করেন”

[সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২৭]

আল্লাহ বলেন, তিনি যেভাবে ইচ্ছা মাতৃগর্ভেই আকৃতি দান করেন। এগুলো নিতান্তই তার ইচ্ছাধীন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যেসকল অসংখ্য শিশু নানা ধরণের শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়, সেগুলো আল্লাহ পাক ইচ্ছা করেই তাদের ঐরকম আকৃতি দান করেন।

“তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদেরকে আকৃতি দান করেন যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবে।”

[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬]

আল্লাহ পাক সেই সাথে আরো বলেন, আল্লাহ না চাইলে কেউ কিছু করতেও পারতো না।

“তোমার রব যদি ইচ্ছা করত, তবে তারা তা করত না”

[সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১১২]

“তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত আকৃতি দান করেছেন।”

[সূরা ফুরকান, আয়াত:২]

তাছাড়া গোটা মহাবিশ্ব আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন। অতএব, তাঁর মালিকানাভুক্ত রাজ্যে কোন কিছু তাঁর অজ্ঞাতসারে অথবা অনিচ্ছায় ঘটা সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।

কোরআন ১৮:১৭

যাকে আল্লাহ পথ দেখাবেন, সেই পথপ্রাপ্ত হবে। আর যাকে তিনি পথ ভ্রষ্ট করবেন, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।

কোরআন ৭:১৭৮

তাকদীর বিষয়ে হাদিস

সহিহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকূল সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টিকূলের তাকদীর লিখে রেখেছেন

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪৮/ তাকদীর (كتاب القدر)
হাদিস নম্বরঃ [6507]
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন‏
পরিচ্ছদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৭। আবূ তাহির আহমাদ ইবনু আমর ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সারহ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ তাঁআলা সমগ্র সৃষ্টির ভাগ্যলিপি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, সে সময় আল্লাহর আরশ পানির উপরে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহিহ মুসলিম ইসলামিক ফাউন্ডেশন খণ্ড ৬ পৃষ্ঠা ১৬৯

হাদীস একাডেমী প্রকাশিত তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ গ্রন্থে হাদীসগুলোর তাহক্বীক প্রধানত শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ) এর তাহক্বীক মিশকাতুল মাসাবীহ থেকে নেয়া হয়েছে। মিশকাতের বিখ্যাত শরাহ গ্রন্থ “মিরআতুল মাফাতীহ” হতে ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে।

তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ (১ম খণ্ড)

হাদিসে কুদসি, যাকে বলা হয় আল্লাহরই বানী, মুহাম্মদের মুখ থেকে নির্গত, সেখানে হযরত মুহাম্মদ বলেন:

“আল্লাহ তাআলা প্রথম সৃষ্টি করেছেন কলম। সৃষ্টির পর কলমকে বললেন: ‘লিখ’। কলম বলল: ইয়া রব্ব! কী লিখব? তিনি বললেন: কেয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক জিনিসের তাকদীর লিখ।”

[ আবু দাউদ (৪৭০০)] আলবানি সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

সহিহ হাদিসে কুদসি

আল্লাহ পাক আদমকে সৃষ্টি করার পরে তার পিঠ থেকে জান্নাতী এবং জাহান্নামী মানুষকে বের করেছিলেন, যা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ জান্নাতের জন্য কিছু মানুষ নির্দিষ্ট করে সৃষ্টি করেছেন, এবং জাহান্নামের জন্য কিছু মানুষকে। আল্লাহ পাক যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, মানুষের পক্ষে তা পরিবর্তন সম্ভব নয়।

গ্রন্থের নামঃ মুয়াত্তা মালিক
হাদিস নম্বরঃ [1660]
অধ্যায়ঃ ৪৬. তকদীর অধ্যায়
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১. তকদীরের ব্যাপারে বিতর্ক করা নিষেধ
রেওয়ায়ত ২. মুসলিম ইবন ইয়াসার জুহানী (রহঃ) হইতে বর্ণিত, উমর (রাঃ)-এর নিকট (‏وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ) (সূরা আ’রাফঃ ১৭২) আয়াত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হইল। তিনি বলিলেন, আমি শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হইয়াছিল। তিনি বলিয়াছিলেন, আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করিলেন এবং তাহার পৃষ্ঠে স্বীয় দক্ষিণ হস্ত দ্বারা মুসেহ করিলেন, অতঃপর আদমের পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহার সন্তানদেরকে বাহির করিলেন এবং বলিলেন, আমি ইহাদেরকে বেহেশতের জন্য সৃষ্টি করিয়াছি। ইহারা বেহেশতের কাজ করবে। অতঃপর পুনরায় তাহার পৃষ্ঠদেশে স্বীয় দক্ষিণ হস্ত বুলাইলেন এবং তাহার আর কিছু সংখ্যক সন্তান বাহির করিলেন এবং বলিলেন, আমি ইহাদেরকে দোযখের জন্য সৃষ্টি করিয়াছি। ইহারা দোযখের কাজ করবে। এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা হইলে আমল করায় লাভ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহু পাক যখন কোন বান্দাকে বেহেশতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তাহার দ্বারা বেহেশতীদের কাজ করান আর মৃত্যুর সময়েও সে নেক কাজ করিয়া মৃত্যুবরণ করে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাহাকে বেহেশতে প্রবেশ করাইয়া থাকেন। আর যখন কোন বান্দাকে দোযখের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তাহার দ্বারা দোযখীদের কাজ করাইয়া থাকেন। অতঃপর মৃত্যুর সময়েও তাহাকে খারাপ কাজ করাইয়াই মৃত্যুবরণ করান। আর আল্লাহ তখন তাহাকে দোযখে প্রবেশ করাইয়া থাকেন।

গ্রন্থের নামঃ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
হাদিস নম্বরঃ [95]
অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাক্বদীরের প্রতি ঈমান
৯৫-[১৭] মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে কুরআনের এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ ‘‘(হে মুহাম্মাদ!) আপনার রব যখন আদম সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের সব সন্তানদেরকে বের করলেন’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭: ১৭২) (…আয়াতের শেষ পর্যন্ত)। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি শুনেছি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তিনি জবাবে বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। অতঃপর আপন ডান হাত তাঁর পিঠ বুলালেন। আর সেখান থেকে তাঁর (ভবিষ্যতের) একদল সন্তান বের করলেন। অতঃপর বললেন, এসবকে আমি জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি, তারা জান্নাতীদের কাজই করবে। আবার আদামের পিঠে হাত বুলালেন এবং সেখান থেকে (অপর) একদল সন্তান বের করলেন এবং বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তারা জাহান্নামীদেরই ‘আমাল করবে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে ‘আমালের আর আবশ্যকতা কি? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজই করিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত সে জান্নাতীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে এবং আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। এভাবে আল্লাহ তাঁর কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজই করিয়ে নেন। পরিশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে, আর এ কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করেন। (মালিক, তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
[1] সহীহ : وَمَسَحَ ظَهْرَهٗ অংশটুকু ব্যতীত। মুয়াত্ত্বা মালিক ১৩৯৫, আবূ দাঊদ ৪০৮১, তিরমিযী ৩০০১; সহীহ সুনান আবূ দাঊদ। হাদীসের সানাদের রাবীগণ নির্ভরযোগ্য ও তারা বুখারী মুসলিমের রাবী। তবে এ সানাদে মুসলিম ইবনু ইয়াসার ও ‘উমারের মাঝে বিচ্ছিনণতা রয়েছে তথাপি হাদীসের অনেক শাহিদ বর্ণনা থাকায় হাদীসটি সহীহ। আর সহীহ সুনানে আবী দাঊদে আলবানী (রহঃ) হাদীসটিকে وَمَسَحَ ظَهْرَهٗ অংশটুকু ছাড়া সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ (১ম খণ্ড)

গ্রন্থের নামঃ সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [4630]
অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে।
৪৬৩০. আবদুল্লাহ্‌ কা’নাবী (রহঃ) ……. মুসলিম ইবন জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি উমার ইবন খাওাব (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেনঃ
إِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ
অর্থাৎ স্মরণ কর! তোমার রব আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তার বংশধরকে বের করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারুক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেঃ নিশ্চয়ই, আমরা সাক্ষী থাকলাম। (৭ঃ১৭২)
রাবী বলেনঃ কা’নাবী এ আয়াত তিলাওয়াত করলে উমার (রাঃ) বলেনঃ একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনি। জবাবে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মহান আল্লাহ্‌ আদম (আ)-কে সৃষ্টি করার পর, তার পিঠকে স্বীয় ডান হাত দিয়ে মাসেহ করেন। ফলে অনেক আদম সন্তান সৃষ্টি হয়। এরপর তিনি বলেনঃ আমি এদের জান্নাতে জন্য সৃষ্টি করেছি। এরা জান্নাতীদের ন্যায় আমল করবে। এরপর আল্লাহ্‌ তার হাত দিয়ে আদমের পিঠকে মাসেহ করেন। ফলে তার আরো সন্তান সৃষ্টি হয়। তিনি বলেনঃ আমি এদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তারা জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করবে। তখন এক ব্যক্তি বলেঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাহলে আমলের প্রয়োজনীয়তা কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ্‌ তা’আলা যখন কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জান্নাতীদের আমল করিয়ে নেন। ফলে, সে ব্যক্তি জান্নাতীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্‌ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যখন তিনি কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করান। ফলে সে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্‌ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আল্লাহ পাক মাতৃগর্ভে সন্তান থাকবার সময়ই ফেরেশতা পাঠিয়ে লিখে দেন, সন্তানটির রিজক, আমাল, আয়ু এবং দুর্ভাগ্য সম্পর্কে। যার আমলে ওই ফেরেশতা কাফের লিখে দেবেন, সে বড় হয়ে কাফেরই হবে। কোন মানুষের পক্ষে আল্লাহর লিখিত বিধান পরিবর্তন সম্ভব নয়।

গ্রন্থের নামঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
হাদিস নম্বরঃ [7454] অধ্যায়ঃ ৯৭/ তাওহীদ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৯৭/২৮. আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীঃ আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ কথা আগেই স্থির হয়ে গেছে। (সূরাহ আস্ সাফফাত ৩৭/১৭১)
৭৪৫৪. ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি ‘সত্যবাদী’ এবং ‘সত্যবাদী বলে স্বীকৃত’ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি হলো এমন বীর্য থেকে যাকে মায়ের পেটে চল্লিশ দিন কিংবা চল্লিশ রাত একত্রিত রাখা হয়। তারপর তেমনি সময়ে আলাক হয়, তারপর তেমনি সময়ে গোশতপিন্ডে পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ্ তার কাছে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। এই ফেরেশতাকে চারটি বিষয় সম্পর্কে লেখার করার জন্য হুকুম দেয়া হয়। যার ফলে ফেরেশেতা তার রিযক, ‘আমাল, আয়ু এবং দুর্ভাগা কিংবা ভাগ্যবান হওয়া সম্পর্কে লিখে দেয়। তারপর তার মধ্যে প্রাণ ফুঁকে দেয়া হয়। এজন্যই তোমাদের কেউ জান্নাতীদের ‘আমাল করে এতটুকু এগিয়ে যায় যে, তার ও জান্নাতের মাঝে কেবল এক গজের দূরত্ব থাকতেই তার ওপর লিখিত তাক্দীর প্রবল হয়ে যায়। তখন সে জাহান্নামীদের ‘আমাল করে। শেষে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ জাহান্নামীদের মত ‘আমাল করে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক গজের দূরত্ব থাকতে তার উপর তাকদীরের লেখা প্রবল হয়, ফলে সে জান্নাতীদের মত ‘আমাল করে, শেষে জান্নাতেই প্রবেশ করে। [৩২০৮] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯৪৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [6946] অধ্যায়ঃ ৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৩১৩০. আল্লাহ্‌ তা‘আলার বাণীঃ আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে। (৩৭ঃ ১৭১)
৬৯৪৬। আদম (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি সত্যবাদী এবং সত্যবাদী বলে স্বীকৃত আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি হল এরূপ বীর্য থেকে যাকে মায়ের পেটে চল্লিশ দিন কিংবা চল্লিশ রাত একত্রিত রাখা হয়। তারপর অনুরূপ সময়ে আলাক হয়, তারপর অনুরূপ সময়ে গোশতপিন্ডে পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ তা’আলা তার কাছে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। এই ফেরেশতাকে চারটি জিনিস সম্পর্কে লিপিবদ্ধ করার জন্য হুকুম দেয়া হয়। যার ফলে ফেরেশতা তার রিযিক, আমল, আয়ু এবং সৌভাগ্য কিংবা হতভাগ্য হওয়া সম্পর্কে লিখে দেয়। তারপর তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা হয়। এজন্যই তোদের কেউ জান্নাতীদের আমল করে এতটুকু অগ্রগামী হয়ে যায় যে, তার ও জান্নাতের মাঝখানে মাত্র এক গজেঁর দূরত্ব থাকতেই তার ওপর লিখিত তাকদীর প্রবল হয়ে যায়। তখন সে দোযখীদের আমল করে। পরিশেষে সে দোযখেই প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ দোযখীদের ন্যয় আমল করে। এমন পর্যায়ে পৌছে যে, তার ও দোযখের মধ্যে মাত্র এক গজের দূরত্ব থাকতে তার উপর তাকদীরের লেখনী প্রবল হয়, যদ্দরুন সে জান্নাতীদের ন্যায় আমল করে, ফলে জান্নাতেই প্রবেশ করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
হাদিস নম্বরঃ [3208] অধ্যায়ঃ ৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৫৯/৬. ফেরেশতাদের বর্ণনা।
৩২০৮. যায়দ ইবনু ওয়াহব (রহ.) হতে বর্ণিত। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, সত্যবাদী হিসেবে গৃহীত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা গোশতপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাঁকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাঁকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার ‘আমল, তার রিয্ক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়। কাজেই তোমাদের কোন ব্যক্তি ‘আমল করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার এবং জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত পার্থক্য থাকে। এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। তখন সে জাহান্নামবাসীর মত আমল করে। আর একজন ‘আমাল করতে করতে এমন স্তরে পৌঁছে যে, তার এবং জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত তফাৎ থাকে, এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতবাসীর মত ‘আমল করে। (৩৩৩২, ৬৫৯৪, ৭৪৫৪) (মুসলিম ৪৭/১ হাঃ ৩৬৪৩, আহমাদ ৩৬২৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৬৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৭৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ আন্‌-নওয়াবীর চল্লিশ হাদীস
হাদিস নম্বরঃ [4] অধ্যায়ঃ ১/ বিবিধ
পাবলিশারঃ ইসলাম হাউস
পরিচ্ছদঃ কোন পরিচ্ছদ নেই
৪। আবূ আব্দির রহমান আব্দুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন— রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম— যিনি সত্যবাদী ও যার কথাকে সত্য বলে মেনে নেয়া হয়— তিনি আমাদেরকে বলেছেন:
তোমাদের সকলের সৃষ্টি নিজের মায়ের পেটে চল্লিশ দিন যাবৎ শুক্ররূপে জমা হওয়ার মাধ্যমে শুরু হতে থাকে, পরবর্তী চল্লিশ দিন জমাট বাঁধা রক্তরূপে থাকে, পরবর্তী চল্লিশ দিন গোশতপিণ্ড রূপে থাকে, তারপর তার কাছে ফিরিশ্‌তা পাঠানো হয়। অতঃপর সে তার মধ্যে রূহ প্রবেশ করায় এবং তাকে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য হুকুম দেয়া হয়- তার রুজি, বয়স, কাজ এবং সে কি সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান।
অতএব, আল্লাহর কসম-যিনি ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ্ নেই-তোমাদের মধ্যে একজন জান্নাতবাসীর মত কাজ করে[1]- এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত ব্যবধান থাকে, এ অবস্থায় তার লিখন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে বলে সে জাহান্নামবাসীর মত কাজ শুরু করে এবং তার ফলে তাতে প্রবেশ করে।
এবং তোমাদের মধ্যে অপর এক ব্যক্তি জাহান্নামীদের মত কাজ শুরু করে দেয়- এমনকি তার ও জাহান্নামের মধ্যে মাত্র এক হাত ব্যবধান থাকে, এ অবস্থায় তার লিখন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে বলে সে জান্নাতবাসীদের মত কাজ শুরু করে আর সে তাতে প্রবেশ করে।
[বুখারী: ৩২০৮, মুসলিম: ২৬৪৩] [1] অর্থাৎ বাহ্যিক দৃষ্টিতে তার কাজটি সবার নিকট জান্নাতবাসীদের কাজ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতের কাজ করেনি। কারণ, তার ঈমান ও ইখলাসের মধ্যে কোথাও কোন ঘাটতি ছিল। [সম্পাদক] 

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
হাদিস নম্বরঃ [82] অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – তাক্বদীরের প্রতি ঈমান
৮২-[৪] ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সত্যবাদী ও সত্যবাদী বলে স্বীকৃত আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেরই জন্ম হয় এভাবে যে, তার মায়ের পেটে (প্রথমে তার মূল উপাদান) শুক্ররূপে চল্লিশ দিন পর্যন্ত থাকে। অতঃপর তা চল্লিশ দিন পর্যন্ত লাল জমাট রক্তপিন্ডরূপ ধারণ করে। তারপর পরবর্তী চল্লিশ দিনে মাংসপিন্ডর রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা একজন মালাককে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য পাঠন। সে মালাক লিখেন তার- (১) ‘আমাল [সে কি কি ‘আমাল করবে], (২) তার মৃত্যু, (৩) তার রিয্‌ক্ব (রিজিক/রিযিক) ও (৪) তার নেককার বা দুর্ভাগা হওয়ার বিষয় আল্লাহর হুকুমে তার তাক্বদীরে লিখে দেন, তারপর তন্মধ্যে রূহ্ প্রবেশ করান। অতঃপর সে সত্তার কসম, যিনি ব্যতীত প্রকৃত আর কোন ইলাহ নেই! তোমাদের মধ্যে কেউ জান্নাতবাসীদের ‘আমাল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার প্রতি তাক্বদীরের লিখা তার সামনে আসে। আর তখন সে জাহান্নামীদের কাজ করতে থাকে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে। তোমাদের কোন ব্যক্তি জাহান্নামীদের মতো ‘আমাল করতে শুরু করে, এমনকি তার ও জাহান্নামের মধ্যে এক হাত দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে। এমন সময় তার প্রতি সে লেখা (তাক্বদীর) সামনে আসে, তখন সে জান্নাতীদের কাজ করতে শুরু করে, ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। (বুখারী, মুসলিম)[1] [1] সহীহ : বুখারী ৩২০৮, মুসলিম ২৬৪৩, আবূ দাঊদ ৪৭০৮, ইবনু মাজাহ ৭৬, তিরমিযী ২১৩৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৭৪, আহমাদ ৩৯৩৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ (১ম খণ্ড)

আদম ও মুসার বাদানুবাদ

হযরত আদম এবং হযরত মুসার একবার একটি বিষয় নিয়ে বাদানুবাদ হয়েছিল, যা সহিহ হাদিস গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। এই বিষয়ে এই লেখাটিতে আরো বিস্তারিত পাবেন। হাদিসগুলো দেখুন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে বের হওয়া সহিহ মুসলিম হাদিসের ৬ নম্বর খণ্ড
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে বের হওয়া সহিহ মুসলিম হাদিসের ৬ নম্বর খণ্ড
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে বের হওয়া সহিহ মুসলিম হাদিসের ৬ নম্বর খণ্ড
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে বের হওয়া সহিহ মুসলিম হাদিসের ৬ নম্বর খণ্ড
তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ (১ম খণ্ড)

পরীক্ষায় লেভেল প্লেইং ফিল্ড

যেকোন পরীক্ষায় বা নির্বাচনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, পরীক্ষায় বা নির্বাচনে সকল পরীক্ষার্থী বা প্রার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছে কিনা। কোন পরীক্ষার্থীকে যদি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নকল সাপ্লাই দেন, বা সাহায্য করেন, বা উত্তর লিখে দেন, কানে কানে বলে দেন, সময় বেশি দেন, তাহলে সেটি কোন অবস্থাতেই পরীক্ষা বলে গণ্য হতে পারে না। স্বজনপ্রীতি যদি সামান্যতমও সেখানে থাকে, সেটি সঠিক পরীক্ষা বলে গণ্য হতে পারে না। বা নির্বাচন কমিশন যদি নির্বাচনের সময় কোন প্রার্থীর ব্যালট বক্সে সিল মেরে দেন, বা কোনভাবে সাহায্য করেন, সেটি অন্য প্রার্থীদের সাথে অন্যায় বা অন্যায্য কাজ বলেই বিবেচিত হবে। এরকম হলে বুঝতে হয়, আসলে এরকম পরীক্ষার কোন লেজিটেমেসি নেই।

এখানে একটু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, মুহাম্মদ কী নিজ কর্মগুণে নবী হয়েছিলেন, নাকি তার নবী হওয়া তার জন্মের আগে থেকেই বা শিশু বয়স থেকেই নির্ধারিত ছিল? সহিহ হাদিস অনুসারে, তিনি তার কর্মগুণে নবী হন নি, বরঞ্চ তার নবী হওয়া আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কারণ জিব্রাইল শিশু বয়সেই তার হৃদপিণ্ড পরিষ্কার করে পাপ মুক্ত করে দিয়েছিলেন। সেটি আল্লাহ পাক অন্য কোন সাধারণ মানুষের বেলাতে করেন নি। ভেবে দেখুন, আপনার হৃদপিণ্ড যদি জিব্রাইল এসে পরিষ্কার করে দিতো, আপনিও কোন পাপ করতেন না। একটি পরীক্ষাতে সকল পরীক্ষার্থীদেরকে সমান সুযোগ প্রদান করতে হয়, লেভেল প্লেইং ফিল্ড তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ পাকের পরীক্ষায় লেভেল প্লেইং ফিল্ড বলেই কিছু নেই। স্বেচ্ছাচারী আল্লাহ তার নিজ ইচ্ছামতই সব করেন। মুহাম্মদের শিশু বয়সেই, অর্থাৎ কোন ভাল কাজ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের আগেই তাকে নবী হিসেবে মনোনীয় করে ফেলেছেন। তার মানে মুহাম্মদের নবী হওয়াটি আগে থেকেই নির্ধারিত, কিন্তু আমার নবী হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, তা আমি যত ভাল কাজই করি না কেন। অর্থাৎ এখানে সকল পরীক্ষার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছে না। আল্লাহর ইচ্ছাই এখানে মুখ্য।

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [310] অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
৩১০। শায়বান ইবনু ফাররুখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এলেন, তখন তিনি শিশুদের সাথে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন এ অংশটি শয়তানের। এরপর হৎপিণ্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পূনঃস্থাপন করলেন। তখন ঐ শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, মুহাম্মাদ -কে হত্যা করা হয়েছে। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বক্ষে সে সেলাই-এর চিহ্ন দেখেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহিহ মুসলিম খণ্ড ১ পৃষ্ঠা ১৯৮, ১৯৯

সেই সাথে আরো প্রশ্ন জাগে, ফাতিমাকে জান্নাতে নারীদের সর্দারনী ঘোষণা, বা ইমাম হাসান হোসেইনকে জান্নাতের যুবকদের সর্দার ঘোষণা করা কী তাদের নিজ যোগ্যতাতে হয়েছিল, নাকি তারা শুধুমাত্র মুহাম্মদের পরিবার বলে স্বজনপ্রীতির অংশ হিসেবে তারা এই পদ লাভ করেছিলেন? আমি বা আপনি যদি মুহাম্মদের নাতী হিসেবে জন্ম নিতাম, তাহলে আমরাও তো জান্নাতের সর্দার হতে পারতাম। আমি মুহাম্মদের নাতী হয়ে জন্ম নিই নি, সেটি তো আমার দোষ নয়। আল্লাহই ইচ্ছা।

আবার ধরুন, আবু লাহাবের কথা। তাকে নিয়ে আল্লাহ পাক কোরানে একটি সুরা লিখে ফেলেছেন, যেটি হচ্ছেঃ

সূরা আল লাহাব/সূরা আল মাসাদ
১. ধ্বংস হোক! আবু লাহাবের উভয় হাত, আর সেও ধ্বংস হোক।
২. তার ধন-সম্পদ যা সে উপার্জন করেছে তা তার কোন কাজে আসবে না।
৩. তাকে অচিরেই লেলিহান আগুনে ঠেলে দেওয়া হবে।
৪. আর তার স্ত্রীকেও, লাকড়ীর বোঝা বহনকারিণী।
৫. তার গলায় থাকবে খেজুর গাছের ছালের তৈরি রশি।

কিন্তু আল্লাহ আগে থেকেই যদি এমন সুরা নাজিল করে ফেলেন, তাহলে তো আবু লাহাবের ইসলাম গ্রহণ করে মুমিন হয়ে যাওয়া সম্ভবই না। কারণ আবু লাহাব যদি এই সুরা নাজিলের পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফেলতো, তাহলে আল্লাহর লিখিত সুরা মিথ্যা হয়ে যেত! অর্থাৎ আবু লাহাবও এখানে বৈষম্যের শিকার হলো, কারণ আবু লাহাব শত চেষ্টা করলে, কখনই মুমিন হতে পারতো না। কারণ আল্লহর সেরকম কোন ইচ্ছা ছিল না।

আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস

য়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত শাইখ আবদুল হামীদ ফাইযী আল মাদানি কর্তৃক সঙ্কলিত হাদিস সম্ভার গ্রন্থ থেকে আরো কিছু হাদিস পড়ে নিই।

উপসংহার

এই সমস্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদিসসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিতভাবেই বলা চলে, সকল ঘটনা, সকল কর্ম, সকল অস্তিত্ব আল্লাহর ইচ্ছাই হয়। আল্লাহ আদম সৃষ্টির আগেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, আদমের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবজাতির সৃষ্টি করবেন। সেই বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই শয়তান আদমকে ধোঁকা দেয় এবং সেটিও আসলে আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে। একইসাথে, আল্লাহ পাক সমস্ত কিছুর তাকদীর পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, যার কোন অন্যথায় হতে পারে না। আল্লাহ যা চান সেটাই হয়, তিনি যা চান না, সেটা হয় না বা হওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ যাদের অন্তরে মোহর মেরে দেন, তাদের পক্ষে চাইলেও মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। আর আল্লাহ যাদের পথ দেখান, তারা চাইলেও পথভ্রষ্ট হতে পারবে না। এই সমস্ত কিছুই পূর্ব নির্ধারিত এবং আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। সামান্যতম কোন বিষয় আল্লাহর ইচ্ছে ছাড়া ঘটা সম্ভব নয়। সেই কারণে, উপরের সমস্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদিসগুলো মেনে নিলে, স্বাধীন ইচ্ছা বা ফ্রি উইলের সমস্ত কিছুই আসলে মানুষের সাথে আল্লাহ পাকের এক নির্মম প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

অথবা, বুঝে নিতে হয়, এগুলো পরস্পরবিরোধী ধারণা, যা লোভ এবং ভয়ের মাধ্যমে মূর্খ মানুষদের বোকা বানাবার জন্য আরেবের এক মরুদস্যু নিজেই তৈরি করেছিল।

Facebook Comments

2 thoughts on “ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে

Leave a Reply

%d bloggers like this: