হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস- রহস্যঃ ধর্মশাস্ত্র

পূর্ববর্তী পর্বঃ- হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস-রহস্যঃ বেদ ; হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস-রহস্যঃ বেদাঙ্গ


পূর্বে বেদ, বেদাঙ্গ প্রভৃতিতে প্রাচীন হিন্দুদের গোহত্যা ও গোমাংস খাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। এখন ধর্মশাস্ত্রগুলোর উপর দৃষ্টিপাত করা যাক। হিন্দুশাস্ত্রের অন্তর্গত ধর্মশাস্ত্রগুলিতে ধর্মাচার, বর্ণধর্ম, আশ্রম ধর্ম, বিভিন্ন আইন-কানুন ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে।

মনুসংহিতা


ধর্মশাস্ত্রগুলির মধ্যে মনুসংহিতা বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। একে প্রধান ধর্মশাস্ত্রও বলা যায়। এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতির উদ্ধৃতি দেওয়া যায়। বৃহস্পতি বলেছেন, “বেদার্থো পনিবন্ধৃ ত্বাৎ প্রাধান্যাং হি মনোঃ স্মৃতম্। মন্বর্থবিপরীতা যা সা স্মৃতিন প্রশস্যতে।।“ অর্থাৎ,  মনুর স্মৃতিই প্রধান, এতেই বেদের অর্থমাহাত্ম্য সন্নিবেশিত হয়েছে- ভগবান মনুর প্রামাণ্য সিদ্ধান্তের সাথে যে সকল স্মৃতি নিবন্ধের অর্থ-বিরোধ, মতবৈষম্য হয় , সেই সকল স্মৃতিসিদ্ধান্ত প্রশস্ত নয় – প্রামাণ্য নয়।

মনুসংহিতার বিভিন্ন স্থানে অনেক বিষয়েই বৈপরীত্য  দৃষ্ট হয়। এর কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে, অধিকাংশ হিন্দুশাস্ত্রের মত মনুসংহিতাও অনেক সময় ধরে, অনেকের হাতে রচিত হয়েছে। মনুস্মৃতিতে মাংসাহারের পক্ষে এবং বিপক্ষে , উভয়পক্ষেই বলা আছে।

মাংসাহার ও পশুহত্যার  পক্ষে মনুস্মৃতি

মনুসংহিতা ৫/২৮ এ বলা হয়েছে, “ পৃথিবীতে যত প্রাণি আছে সবাইকেই ব্রহ্মা জীবের অন্ন হিসেবে নির্দেশ করেছেন সুতরাং স্থাবর জঙ্গম সকল বস্তুই জীবগণের ভোজ্য।“ এর পরে বলা হয়েছে, “ হরিণ প্রভৃতি বিচরণশীল পশু নিশ্চল তৃণ আহার করে। দন্তশীল প্রাণী সর্বদাই দন্তহীন প্রাণিদের ভক্ষণ করে। হস্তহীন মৎস্য প্রভৃতি প্রাণি হস্তবিশিষ্ট মানুষদের ভোজ্য এবং ভীরু প্রকৃতির জীবগণ চিরকালই বীরপশুদের ভোজ্য।“ (৫/২৯) আরও বলা  হয়েছে, উদরপূর্তির জন্য ভোজ্যজীবকে প্রতিদিন ভোজন করলে ভোক্তার কোনো পাপ হয় না। কারণ একই বিধাতা কোনো কোনো জীবকে ভোজ্য ও কোনো কোনো জীবকে ভোক্তা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং প্রাণসংকট দেখা দিলে অন্য ভোজ্যের অভাবে ভক্ষ্য মাংস ভক্ষণ করা যেতে পারে।“ মনুসংহিতার অনেক স্থানে অহিংসার আদর্শের প্রভাব পাওয়া যায়। তবে ধর্মের জন্য, যজ্ঞের জন্য পশুহত্যাকে পাপ বলে বিবেচনা করা হত না। এ প্রসঙ্গে মনুসংহিতা হতে উল্লেখ করা যেতে পারে, “ স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা নিজের যজ্ঞকার্যের জন্য পশুদের সৃষ্টি করেছেন। সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্যই শাস্ত্রে যজ্ঞ বিহিত। সুতরাং যজ্ঞে যে পশুবধ করা হয় তার জন্য কোনো পাপ হয় না।“(৫/৩৯)  বেদবিহিত প্রাণীহত্যাকে অহিংসা বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। [1] যজ্ঞে নিহত পশু পরজন্মে উচ্চযোনি লাভ এমনও বলা হয়েছে- “ ধান-যব প্রভৃতি ওষধি, ছাগল প্রভৃতি পশু, বৃক্ষ, কচ্ছপ প্রভৃতি তির্যকজাত এবং চাতক প্রভৃতি পাখি যদি যজ্ঞের জন্য বিনষ্ট হয় তাহলে তারা পরজন্মে উচ্চযোনি লাভ করে।“ (৫/৪০)

মনু কোন কোন প্রাণী খাওয়া উচিত বা অনুচিত তার একটি তালিকা দিয়েছেন।

ভক্ষ প্রাণীদের তালিকায় বন্য মুরগি,[2] বন্য শুকর,[3] পাঁচ নখ বিশিষ্ট প্রাণীদের মধ্যে সজারু, শল্য, গোসাপ, গণ্ডার,কচ্ছপ ও খরগোস [4], উট [5] প্রভৃতি রয়েছে

অভক্ষ প্রাণীদের তালিকায় চড়ুই, জলকাক,হাঁস, চক্রবাক,গ্রাম্য মুরগি, সারস, রজ্জুবাল নামক জলচর পাখি, ডাক পাখি, শুক, টিয়া ও শালিক [6] পানকৌড়ি প্রভৃতি জলে ডুব দিয়ে মাছ খাওয়া পাখি, [7] বক, বলাকা বা ক্ষুদ্রবক, দাঁড়কাক, খঞ্জন, শ্যেন প্রভৃতি পাখি, কুমির প্রভৃতি মৎস্যভোজী জন্তু, গ্রাম্য শূকর [8] রয়েছে। চিল  প্রভৃতি কাঁচা মাংসভোজী পাখি, পারাবত প্রভৃতি গ্রাম্য পাখি, গাধা প্রভৃতি এক ক্ষুরবিশিষ্ট পশু খেতে নিষেধ করা হয়েছে।[9] একস্থানে মাছ খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে [10] কিন্তু এর পরেই বলা হয়েছে, “ পাঠান বা বোয়াল, রোহিত বা রুই, রাজীব নামক মাছ, সিংহতুণ্ড অর্থাৎ যার ঠোঁট সিংহের মত এবং শল্ক বা আশবিশিষ্ট যাবতীয় মাছ খাওয়া যেতে পারে। অবশ্য সমস্ত ভক্ষ্য মৎস্যই দেবগণ ও পিতৃগণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে তবেই ভক্ষণ করা উচিত।“ ( মনু ৫/১৬)

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল অভক্ষ্য প্রাণীদের তালিকার কোথাও গরুর নাম পাওয়া যায় না। গোমাংস যদি এতটাই বর্জনীয় ছিল প্রাচীনকাল থেকেই, তবে মনুর অভক্ষ্য প্রাণীদের তালিকায় গরুর নাম নেই কেন?

পিতৃদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রাণীর মাংস উৎসর্গ করা হত। এ প্রসঙ্গে মনুসংহিতায় বলা হয়েছে-

  • “… পাঠীন বা বোয়াল মাছের মাংসে পিতৃলোক দুমাস তৃপ্ত থাকেন। হরিণমাংসে তিন মাস, মেষ মাংসে চার মাস এবং দ্বিজাতিদের ভক্ষ্য পাখির মাংসে পিতৃলোক পাঁচ মাস পরিতৃপ্ত থাকেন।“ [মনু ৩/২৬৮]
  • “পিতৃগণ ছাগ মাংসে দুমাস, চিত্রিত হরিণ মাংসে সাত মাস, এণ জাতীয় মৃগমাংসে আট মাস, রুরু জাতীয় মৃগমাংসে নয় মাস, বন্য শূকর ও মহিষ মাংসে দশ মাস এবং খরগোশ ও কচ্ছপ মাংসে এগারো মাস তৃপ্ত থাকেন।“ [ মনু ৩/২৬৯-১৭০]
  • “গো-দুগ্ধ ও পায়সে পিতৃগণ সম্বৎসর কাল তৃপ্তি সুখ ভোগ করেন এবং বারধ্রীণস মাংসে বারো বৎসর পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। এখানে বারধ্রীণস বলতে সেইসব বৃদ্ধ শুকনো ছাগলদের বোঝায় যাদের জল পানের সময় দুই কান ও জিহবা জল স্পর্শ করে।“ [ মনু ৩/২৭১]
  • “কালশাক নামক শাক, মহাশল্ক নামক মাছ অর্থাৎ যে সব মাছের বড় বড় শল্ক বা আঁশ আছে সেইসব মাছ, গণ্ডারের মাংস , রক্তবর্ণ ছাগলের মাংস, মধু এবং মুনিজনভক্ষ্য ধান পিতৃলোককে অনন্তকালের জন্য তৃপ্তি সাধন করে।“ [ মনু ৫/২৭২]

পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যজ্ঞের জন্য পশুহত্যা অনুমোদিত ছিল। মনুস্মৃতি হতে সেই সংক্রান্ত কিছু শ্লোক উল্লেখ করা হল

  • “যজ্ঞের জন্য অথবা অবশ্যপোষ্যদের ভরণ পোষণের জন্য ব্রাহ্মণরা শাস্ত্র বিহিত মৃগ ও অন্যান্য পশুপাখি বধ করতে পারেন। কারণ পুরাকালে অগস্ত্যমুনিও এইরূপ আচরণ করেছিলেন।“ [ মনু ৫/২২]
  • “প্রাচীনকালে ঋষিগণ ব্রহ্মসত্র প্রভৃতি যে সব যজ্ঞকর্ম করেছেন তাতে তারা ভক্ষ্য মৃগমাংসে ও পক্ষীমাংসে পুরোভাগ বা পিঠে তৈরি করে হোম করেছেন। সুতরাং আধুনিক মানুষও ঐ সকল মৃগপক্ষী বধ করতে পারেন।“ [ মনু ৫/২৩]

দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত মাংস, মন্ত্রের মাধ্যমে সংস্কৃত প্রভৃতি মাংসকে বৈধ মাংস বলা হত। এমন মাংস ছাড়া অন্য মাংস খেতে নিরুৎসাহিত করেছেন মনু। [11] কিন্তু বৈধ মাংসের ক্ষেত্রে, পিতৃদের শাস্ত্রসম্মত মাংস দিয়ে সেই মাংস ভোজন না করলে মৃত্যুর পর একুশ জন্ম ধরে পশুযোনি লাভ করার কথা মনুস্মৃতিতে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে। [12]

এছাড়াও সচরাচর মাংসের ক্রয়-বিক্রয় চলতো তার প্রমাণ মনুসংহিতায় রয়েছে। বলা হয়েছে মাংস ক্রয় বিক্রয়ের লভ্যাংশের ছয় ভাগের এক ভাগ রাজাকে দিতে হবে-

“বৃক্ষ, মাংস, মধু, ঘৃত, ওষধি, গন্ধদ্রব্য, ফুল, ফলমূল, রসালো দ্রব্য প্রভৃতি ক্রয়বিক্রয়ের ফলে যে লাভ হয় সেই লভ্যাংশের ছয় ভাগের এক ভাগ রাজার প্রাপ্য।“ [ মনু ৭/১৩১]

মাংসাহার ও পশুহত্যার বিপক্ষে মনুস্মৃতি

মাংসভোজনের প্রতি অনিহাও মনুসংহিতার অনেক স্থানেই দেখা যায়। যেমন-

  • “যদি মাংসভোজনে অত্যন্ত স্পৃহা জাগে ঘৃতময়ী বা পিষ্টকময়ী পশুর প্রতিকৃতি তৈরি করে দ্বিজাতিগণ ভোজন করতে পারেন। কিন্তু দেবোদ্দেশ ছাড়া বিনা কারণে পশুহনন করা কখনও উচিত নয়।“ [ মনু ৫/৩৭][13]
  • “ শয্যায় শয়ণ করে, আসনের ওপর উবু হয়ে বসে, এক ঊরুর ওপর অন্য ঊরু স্থাপন করে, মাংস খেয়ে কিংবা জন্মগত বা মরণগত অশৌচের অন্ন খেয়ে বেদ অধ্যয়ণ করা উচিত নয়।“ [৪/১১২]

মাংস শব্দের ব্যুৎপত্তি এভাবে দেখানো হয়েছে মনুসংহিতায়-

“ আমি ইহলোকে যার মাংস ভোজন করছি পরলোকে সেই আমাকে ভক্ষণ করবে- এইভাবেই পণ্ডিতেরা মাংস শব্দের অর্থ প্রতিপাদন করেছেন।  মাং অর্থাৎ আমাকে সঃ অদ্যাৎ অর্থাৎ সে ভোজন করবে।“ [ মনু ৫/৫৫]

বৈধ মাংস অর্থাৎ যজ্ঞে, শ্রাদ্ধ প্রভৃতির মাংস ছাড়া অবৈধ মাংস খেতে নিষেধ করা হয়েছ মনুসংহিতায়। বলা হয়েছে-

  • “শাস্ত্রে বলা আছে, যে ব্যক্তি পিতৃ-দেবোদ্দেশ ছাড়া কেবলমাত্র নিজের জন্য পশুবধ করেন, মৃত্যুর পর ঐ নিহত পশুর গায়ে যত সংখ্যক লোম আছে সেই ব্যক্তির তত সংখ্যক জন্ম হত্যাজনিত পাপে বিনষ্ট হয়।“ [মনু ৫/৩৮]
  • “অবৈধ মাংসভোজীদের মৃত্যুর পর পরলোকে যে শাস্তি ভোগ করতে হয় ধনলোভী ব্যাধ মৃগহনন করলেও সেইরূপ শাস্তি ভোগ করে।“ [ মনু ৫/৩৪]

 মাংস না খেতে উৎসাহিত করে কোথাও বলা হয়েছে-

“ যে ব্যক্তি একশো বছর ধরে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন আর যে ব্যক্তি যাবজ্জীবন মাংস ভক্ষণ করেন না- দুজনেরই পূণ্যফল সমান।“ [ মনু ৫/৫৩]

তবে এর পরেই স্পষ্টভাবেই বলে দেওয়া হয়েছে বৈধ মাংস খাওয়ায় কোনও দোষ নেই-

“বৈধ মাংস ভোজনে, বৈধ মদ্যপানে, বৈধ মৈথুন সেবনে কোনো দোষ নেই। যেহেতু মাংস ভক্ষণ, মদ্যপান, মৈথুন মানুষের স্বভাবসিদ্ধ প্রবৃত্তি। কিন্তু এগুলো থেকে নিবৃত্ত হওয়া মহাপূণ্যের কারণ। সুতরাং এসব না করাই ভালো।।“ [ মনু ৫/৫৬]

এছাড়া চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে মাংস অযাচিতভাবে এলে তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়- “ শয্যা, গৃহ, কুশ, কর্পূর প্রভৃতি গন্ধদ্রব্য; জল, পুষ্প, মণি, দধি, যব প্রভৃতি শস্য; এবং মাছ, মাংস, ক্ষীর ও শাক – এসবই অযাচিতভাবে উপস্থিত হলে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়…” [ মনু ৪/২৫০-২৫১]

মনুসংহিতায় গোমাংস

মাংসাহারের প্রতি মনুসংহিতার অনেক স্থানে অনিহা দেখা গেলেও সংস্কৃত বা বৈধ মাংস খাওয়ায় কোনো বাধা ছিল না, তা আমরা আগেই দেখেছি। অন্যান্য প্রাণীর মাংসের পাশাপাশি গোমাংসভক্ষণও যে প্রচলিত তার প্রমাণ মনুসংহিতা হতে পাওয়া যায়। গৃহ্যসূত্রগুলিতে মধুপর্ক নামক যে অনুষ্ঠানের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে , মনুসংহিতাতেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়।

কাদের মধুপর্ক দান করতে হবে এ প্রসঙ্গে মনু বলেছেন –

রাজর্ত্বিকস্নাতকগুরূন্ প্রিয়শ্বশুরমাতুলান্।

অর্হয়েন্মধুপর্কেণ পরিসংবৎসরাৎ পুনঃ।।

অর্থ-“ রাজা, পুরোহিত, স্নাতক, গুরু, জামাতা, শ্বশুর ও মাতুল এই সাতজন সংবৎসরের পর গৃহে সমাগত হলে গৃহস্থ ব্যক্তি গৃহ্যোক্ত মধুপর্ক দিয়ে তাদের পূজা করবেন। “ [ মনু ৩/১১৯, অনুবাদক- চৈতালী দত্ত]

মধুপর্কে যে পশুহত্যার প্রয়োজন হত সেই প্রসঙ্গে মনুসংহিতায় বলা হয়েছে-

মধুপর্কে চ যজ্ঞে চ পিতৃদৈবতকর্মণি

অত্রৈব পশবো হিংস্যো নান্যত্রেত্যব্রবীন্মনুঃ।।

অর্থ- “মনু বলেছেন, মধুপর্কের জন্য, জ্যোতিষ্টোম প্রভৃতি যজ্ঞের জন্য এবং পিতৃ কর্ম ও দৈবকর্মের জন্যই পশু বিনাশ করবেন। এছাড়া অন্য কোনো উপলক্ষ্যে কখনোই পশুনাশ করা উচিত নয়।“ [ মনু ৫/৪১, অনুবাদক- চৈতালি দত্ত]

এষ্বর্থেষু পশূণ্ হিংসন্ বেদতত্ত্বার্থবিদ্ দ্বিজঃ।

আত্মনঞ্চ পশুঞ্চৈব গময়ত্যুত্তমাং গতিম্।।

অর্থ- “বেদবিদ, তত্ত্বজ্ঞ দ্বিজাতিগণ এই সকল মধুপর্ক প্রভৃতি নিয়মবিশেষে পশুনাশ করে নিজের ও পশুর উভয়েরই সদগতি সম্পাদন করেন।“ [মনু ৫/৪২, অনুবাদক- চৈতালি দত্ত]

মনুসংহিতায় মনু মধুপর্কে গরু দেওয়ার কথা বলেছেন-

তং প্রতীতং স্বধর্মেণ ব্রহ্মাদায়হরং পিতুঃ।

স্রগ্বিণং তল্প আসীনমর্হয়েৎ প্রথমং গবা।।

অর্থ- “সব ধর্মানুষ্ঠানে অভিজ্ঞ ব্রহ্মচারী পিতা বা আচার্যের কাছ থেকে  বেদ অধ্যয়ন করে কৃতবিদ্য উৎকৃষ্ট আসনে উপবিষ্ট মাল্যধারী পুরুষকে বিবাহের পূর্বে গো-মধুপর্ক দিয়ে প্রথমে পূজো করবেন।“ [ মনু ৩/৩, অনুবাদক- চৈতালী দত্ত]

রাজা বা স্নাতক এক বছরের পরেও যজ্ঞে উপস্থিত হলে তাদের অবশ্যই মধুপর্ক দিতে হত। এ বিষয়ে মনু বলেছেন-

রাজা চ শ্রোত্রিয়শ্চৈব যজ্ঞকর্মণ্যপস্থিতৌ।

মধুপর্কেণ সম্পূজ্যৌ ন ত্বযজ্ঞ ইতি স্থিতিঃ।।

অর্থ- “রাজা ও স্নাতক যদি সংবৎসরের পরেও যজ্ঞকর্মে উপস্থিত হন তাহলেও তাদের মধুপর্ক দিয়ে পুজো করতে হয়। কিন্তু যজ্ঞ ভিন্ন অন্যসময়ে উপস্থিত হলে মধুপর্ক দিতে হবে না- এটাই শাস্ত্রবিহিত সিদ্ধান্ত।“ [ মনু ৩/১২০ ; অনুবাদক- চৈতালী দত্ত]

গৃহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্রে আমরা দেখেছি শ্রাদ্ধে গোহত্যা করা হত। কিন্তু মনুসংহিতা ৪/১৭৬ এ বলা হচ্ছে কলিযুগে অষ্টকা প্রভৃতি শ্রাদ্ধে গোবধ না করতে-

পরিত্যজেদর্থকামৌ যৌ স্যাতাং ধর্মবর্জিতৌ।

ধর্মঞ্চাপ্যসুখোদর্কং লোকবিক্রুষ্টমেব চ।।

অর্থ- “ ধর্মবিরুদ্ধ অর্থ ও কামনা ত্যাগ করবেন। চুরি করেও অর্থোপার্জন ঘটে; কিন্তু তা ধর্মবিরুদ্ধ হওয়ায় ত্যাগ করবেন। যেরূপ ধর্ম আচরণ করলে পরিশেষে দুঃখ পেতে হয় এমন ধর্ম আচরণ করবেন না। যেমন, যে ব্যক্তির বহু পুত্র আছে তার কখনোই সর্বস্ব দান করা উচিত নয়। উপরন্তু যে প্রকার ধর্মাচরণে লোকে নিন্দা করে অথবা লোকের আক্রোশ ভাজন হতে হয় এমন ধর্ম আচরণ করবেন না। যেমন, কলিযুগে অষ্টক প্রভৃতি শ্রাদ্ধে কখনোও গোবধ করবেন না।“ [ মনু ৪/১৭৬; অনুবাদক- চৈতালী দত্ত ; কুল্লুক ভট্টের টীকা দেখুন]

এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় পূর্বে শ্রাদ্ধে গোহত্যা প্রচলিত ছিল, পরবর্তীকালে এতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

মনুসংহিতায় গরুর চামড়া ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়-

“ গোহত্যাকারী রূপ উপপাতকের জন্য প্রথম মাসে যবের মণ্ড ভক্ষণ করবে। মুণ্ণডিত মস্তক, ছিন্ন শ্মশ্রূ এবং গোরুর চামড়ায় দেহ আচ্ছাদিত করে গোরুর গোয়ালে বাস করবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাসে একদিন উপবাসের পর দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় কৃত্রিম লবণবর্জিত পরিমিত পরিমাণে হবিষ্য ভোজন করবে। তারপর সংযত ইন্দ্রিয় হয়ে গোমূত্রে স্নান করবে । এইভাবে তিনমাস পর্যন্ত দিনের বেলায় গাভী সকলের অনুগমন করবে এবং দণ্ডায়মান থেকে ঐ সকল গাভীর উত্থিত ধূলি আস্বাদন করবে। কণ্ডূয়নের মাধ্যমে গোরুরু পরিচর্যা করবে এবং গাভীদের প্রণাম করে রাত্রিবেলা বীরাসনে উপবিষ্ট থাকবে। গোসকল দণ্ডায়মান হলে শুচি ও ক্রোধহীন হয়ে দণ্ডায়মান হবে , গমন করলে তাদের পশ্চাদগমন করবে এবং গরুরা উপবিষ্ট হলে নিজেও উপবিষ্ট হবে। মাৎসর্য পরিহার করে প্রতিদিন এইভাবে তাদের সেবা করবে।“ [ মনু ১১/১০৯-১১২]

মনুসংহিতায় গরুর সম্মান

বিশেষ অনুষ্ঠানে গোহত্যা করা হলেও গরু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী বলেই বিবেচিত ছিল। এ প্রসঙ্গে নিচের শ্লোক গুলো লক্ষণীয়-

  • “শাস্ত্রে বলা আছে, স্নাতক ব্রাহ্মন কখনোই গোবৎস বন্ধনে রজ্জু উল্লঙ্ঘন করবেন না। মেঘ যখন বৃষ্টি বর্ষণ করে তখন তিনি দৌড়াবেন না এবং কখনোই নিজের প্রতিবিম্ব নীরিক্ষণ করবেন না।“ [ মনু ৪/৩৮]
  • “ সর্বদাই তিনি মৃত্তিকাস্তুপ, গরু, পাষাণময় দেবতা, ব্রাহ্মণ, ঘৃত, মধু, চৌমাথা এবং প্রজ্ঞাত বিশাল বৃক্ষকে ডানদিকে রেখে ভ্রমণ করবেন ।“ [মনু ৪/৩৯]
  • “ কি লৌকিক কি শাস্ত্রীয় কোনো বিষয়েই পণ রেখে কথা বলবেন না। উত্তরীয়ের বাইরে মালা পড়বেন না। বরং উত্তরীয় দিয়ে কণ্ঠস্থ মালাকে আবৃত করে রাখবেন। গরুর পিঠে আরোহণ করবেন না। কিন্তু গোযানে আরোণ নিষিদ্ধ নয়।“ [মনু ৪/৭২]

মনুসংহিতায় গোরক্ষকের সম্মানহীনতা

গরু উপযুক্ত সম্মান পেলেও গোরক্ষকেরর যে খুবই শোচনীয় অবস্থা ছিল তা,  মনুস্মৃতিতে লক্ষ্য করা যায়। বলা হয়েছে-

“ গো-রক্ষা করে যারা জীবিকা অর্জন করে, বাণিজ্যজীবী , পাচক, নর্তক, দাস, কর্মজীবী এবং বুদ্ধিজীবী ব্রাহ্মণকে শূদ্রের মতো সাক্ষ্য প্রশ্ন করা উচিত।“ [মনু ৮/১০২]

গোরক্ষক নামের যে অন্ধভক্ত বর্তমানে গরুর জন্য মানুষ হত্যা করে চলেছে, ধর্মশাস্ত্রে তাদের সম্বন্ধে কি বলা হয়েছে তা তাদের দেখা উচিত।

মনুর মতে গোহত্যা উপপাতক  

“ব্রহ্মহত্যা, নিষিদ্ধ সুরাপান, ব্রাহ্মণের সুবর্ণ হরণ, বিমাত্রিগমন এবং এইসব পাপীর সঙ্গে যদি এক বৎসর সংসর্গ করা হয় তাহলে এই পাঁচটিকে মহাপাতক বলে।“ [ মনু ১১/৫৫]

মহাপাতকের পর বড় অপরাধ হল অনুপাতক । যাদের অনুপাতক বলা হয়-

“ নিজের জাতির উৎকর্ষতা জানাবার জন্য মিথ্যা কথা বললে, রাজার কাছে অন্যের মৃত্যজনিত দোষ বর্ণনা করলে এবং গুরুর সম্পর্কে মিথ্যা বললে ব্রহ্মহত্যার সমান পাপ হয়। একে অনুপাতক বলে। “ [ মনু ১১/৫৬]  

কিন্তু গোহত্যাকে মনুসংহিতায় ছোটোখাটো অপরাধ হিসাবে দেখানো হয়েছে অর্থাৎ একে উপপাতক বলা হয়েছে। [14] কিন্তু পরবর্তীকালীন ধর্মগ্রন্থে গোহত্যাকে মহাপাতক বলে দেখানো হয়েছে। এর দ্বারা সহজেই বোঝা যায় প্রাচীকালে হিন্দুদের মধ্যে যে গোমাংসভক্ষণ সুপ্রচলিত ছিল তাকে ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বশিষ্ট সংহিতা

বশিষ্ট সংহিতায় মধুপর্কে পশুহত্যার কথা পাওয়া যায় এবং ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় অতিথি হিসাবে এলে তার জন্য বড় বৃষভ বা ছাগল হত্যা করার কথাও বলা আছে-

“সকল বর্ণই সত্যবাদী, অক্রোধ, দাতা ও হিংসাবিমুখ হইবে এবং সকলেই সন্তানোৎপাদন করিবে। পিতৃকার্য, দেবপূজা ও অতিথি সৎকারে পশুহিংসা করিতে পারিবে।  মনু বলিয়াছেন, “মধুপর্ক, যজ্ঞ, পিতৃকার্য ও দেবকার্য – ইহাতেই পশুহিংসা করিবে। অন্যথা পশুহিংসা করিবে না।“ প্রাণীহিংসা না করিলে কদাচ মাংস উৎপন্ন হয় না; প্রাণীহিংসাও স্বর্গজনক নহে; অতএব যাগযজ্ঞে যে প্রাণীহিংসা হয় , তাহা হিংসা হইলে তাহাতে স্বর্গ হইতে পারিত না। ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় অভ্যাগত হইলে , তাহার জন্য মহাবৃষভ বা মহাছাগ পাক করিবে; এইরূপে ইহার আতিথ্য করা নিয়ম।“ [বশিষ্ট সংহিতা, চতুর্থ অধ্যায় ; অনুবাদক শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন]

অত্রি সংহিতা

অত্রি সংহিতায় নীলবৃষ উৎসর্গ করার কথা পাওয়া যায়-

“ পুত্র ভূমিষ্ঠ হইলে লোক পিতৃঋণ হইতে মুক্ত হয় এবং সেইদিনই শুদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, যেহেতু ওই পুত্র নরক হইতে ত্রাণ করে। বহুপুত্র কামনা করা উচিত কেননা, যদি তার মধ্যে কোনো পুত্র গয়াগমন কেহ বা নীলবৃষ উৎসর্গ করে। নরকভীরু পিতৃ গণ “ যে সন্তান গয়া গমন করিবে সে আমাদিগের উদ্ধার কর্তা হইবে” বিবেচনা করিয়া তাদৃশ পুত্রের কামনা করিয়া থাকেন। [ ১ম অধ্যায়, অনুবাদক – পঞ্চানন তর্করত্ন ]

(চলবে…)


তথ্যসূত্র-

[1] এই স্থাবর জঙ্গমাত্মক জগতে শ্রুতিবিহিত যে পশুহিংসা , তাহাকে অহিংসাই বলিতে হইবে, যেহেতু, বেদ ইহা বলিতেছে , বেদ হইতে ধর্মের প্রকাশ হয়। (মনু ৫/৪৪)

[2] “ চড়ুই, জলকাক,হাঁস, চক্রবাক,গ্রাম্য মুরগি, সারস, রজ্জুবাল নামক জলচর পাখি, ডাক পাখি, শুক, টিয়া ও শালিকের মাংস ভক্ষণ করা উচিত নয়। অবশ্য বন্য মুরগি ভক্ষণ করা যেতে পারে।“ [মনু ৫/১২]

[3] “বক, বলাকা বা ক্ষুদ্রবক, দাঁড়কাক, খঞ্জন, শ্যেন প্রভৃতি পাখি, কুমির প্রভৃতি মৎস্যভোজী জন্তু, গ্রাম্য শূকর এবং অবিহিত মৎস্য ভক্ষণ করা  উচিত নয়। অবসহ্য বন্য শূকর খাওয়া যেতে পারে। “ [মনু ৫/১৪]

[4]  “ সর্প প্রভৃতি যে সব প্রাণী একাকী চড়ে বেড়ায়, যে সব পশুপাখি অভক্ষ্য বলে নির্দিষ্ট থাকে, যাদের নাম বা জাতি সঠিকভাবে জানা যায় না এবং বানর প্রভৃতি সমুদয় পঞ্চনখ বিশিষ্ট প্রাণীর মধ্যে সজারু,শল্য, গোসাপ, গণ্ডার, কচ্ছপ ও খরগোশ- এই ছয়টি প্রাণীকে ভোজন করা যেতে পারে। এক পাটি দাঁত বিশিষ্ট পশুদের মধ্যে উটের মাংস যজ্ঞে ভোজন করা যেতে পারে।“ [ মনু ৫/১৭-১৮]

[5] মনুসংহিতা ৫/১৮

[6] “ চড়ুই, জলকাক,হাঁস, চক্রবাক,গ্রাম্য মুরগি, সারস, রজ্জুবাল নামক জলচর পাখি, ডাক পাখি, শুক, টিয়া ও শালিকের মাংস ভক্ষণ করা উচিত নয়। অবশ্য বন্য মুরগি ভক্ষণ করা যেতে পারে।“ [মনু ৫/১২]

[7] “যে সব পাখি ঠোঁট দিয়ে ভোজ্য দ্রব্য মেরে খায়, শ্যেন প্রভৃতি যেসব পাখি ভোজ্যবস্তু নখ দিয়ে ছাড়িয়ে খায় এবং পানকৌড়ি প্রভৃতি যেসব পাখি জলে ডুবে মাছ খায় তাদের মাংস ভক্ষণ করা উচিত নয়। উপরন্তু পশুহত্যার স্থানে বিক্রির জন্য রাখা মাংস এবং শুকনো মাংস খাওয়া উচিত নয়।“ [মনু ৫/১৩]

[8]  “বক, বলাকা বা ক্ষুদ্রবক, দাঁড়কাক, খঞ্জন, শ্যেন প্রভৃতি পাখি, কুমির প্রভৃতি মৎস্যভোজী জন্তু, গ্রাম্য শূকর এবং অবিহিত মৎস্য ভক্ষণ করা  উচিত নয়। অবসহ্য বন্য শূকর খাওয়া যেতে পারে। “ [মনু ৫/১৪]

[9] “ চিল প্রভৃতি যে সব পাখি কাচা মাংস খায়, পারাবত প্রভৃতি গ্রাম্য পাখি ও গর্দভ প্রভৃতি একক্ষুর বিশিষ্ট পশু যারা যজ্ঞের অঙ্গ হতে পারে না এবং টিট্টিভ পাখির মাংস ভক্ষণ করা উচিত নয়।“ [মনু ৫/১১]

[10] “ যে যার মাংস খায় তাকে তার মাংসভোজী বলে। নকুলকে সরপাদ এবং বিড়ালকে মূষিকাদ বলে। কিন্তু মৎস্যভোজীকে সর্বমাংসভোজী বলে। সুতরাং মৎস্য ভক্ষণ ত্যাগ করা উচিত। যেহেতু একরকম মাছ খেয়ে সর্বমাংসভোজী  হওয়া পাপজনক।“ [মনু ৫/১৫]

[11] “ দেবতাদের উদ্দেশ্য না করে নিজের ভোজনের জন্য কৃসর অর্থাৎ তিল ও চাল সিদ্ধ অন্ন , সংযাব অর্থাৎ ঘৃত-ক্ষীর-গুড় সংযুক্ত গোধূম চূরণ, অপূপ বা পিঠা প্রস্তুত করবেন না। এমনকি যে পশু মাংস মন্ত্রের মাধ্যমে সংস্কৃত করা হয় নি, নিবেদনের পূর্বে নৈবেদ্য প্রভৃতি দেবোদ্দিষ্ট অন্ন কিংবা হোমের পূর্বে ঘৃত প্রভৃতি হবনীয় দ্রব্য ভোজন করা উচিত নয়।“ [মনু ৫/৭]

“মন্ত্রের মাধ্যমে পশুসংস্কৃত না করে দ্বিজাতিগণ কখনোই অসংস্কৃত পশুমাংস ভোজন করবেন না। কিন্তু প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পশুযাগ প্রভৃতিতে মন্ত্রসিদ্ধ মাংসভোজনে কোনো দোষ নেই।“ [মনু ৫/৩৬]

“অবৈধ মাংসভোজীদের মৃত্যুর পর পরলোকে যে শাস্তি ভোগ করতে হয় ধনলোভী ব্যাধ মৃগহনন করলেও সেইরূপ শাস্তি ভোগ করে।“ [ মনু ৫/৩৪]

[12] “ যে ব্যক্তি দেবলোক ও পিতৃলোককে শাস্ত্রসম্মত মাংস দিয়ে সেই মাংস ভোজন করে না মৃত্যুর পর সে একুশ জন্ম ধরে পশুযোনি লাভ করে।“ [ মনু ৫/৩৫ ; অনুবাদক- চৈতালী দত্ত]

[13] “ শুদ্ধাত্মা দ্বিজগণ কী গৃহস্থাশ্রমে, কী ব্রহ্মচর্যাশ্রমে, কি বাণপ্রস্থাশ্রমে সকল অবস্থাতেই বিপদে পড়লেও কখনোই বেদবিরুদ্ধ হিংসা করবেন না।“ [মনু ৫/৪৩]

“ যে ব্যক্তি প্রাণীদের বধ করে বা বন্ধন করে কষ্ট দিতে চান না এবং যিনি সকলের হিতকামী তিনি চিরকাল অনন্ত সুখ ভোগ করেন।“ [মনু ৫/৪৬]

“ ব্রহ্মচারী মধু ও মাংস খাবেন না। কর্পূর, চন্দন প্রভৃতি গন্ধদ্রব্য ব্যবহার করবেন না। মালা ধারণ করবেন না। গুড় প্রভৃতি রস গ্রহণ করবেন না এবং স্ত্রী সংসর্গ করবেন না…প্রাণীদের প্রতি হিংসা পোষণ করবেন না। ” [ মনু ২/১৭৭]

“অক্ষত্রিয় কোনো রাজার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করবেন না। পশুর মাংস বিক্রি করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে , যারা তিল থেকে তেল বের করে, যারা মদ বিক্রি করে, বারবণিতার আয় নিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করে- তাদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করবেন না।“  [মনু ৪/৮৪]

“যিনি অন্যের মাংসে পিতৃলোক ও দেবলোকের অর্চনা না করে নিজের উদরপূর্তি করে নিজের মাংস বৃদ্ধি করেন তার মত পাপী জগতে কেউ নেই।“ [ মনু ৫/৫২]

“ সম্পূর্ণ ভাবে মাংস পরিত্যাগ করলে যে উৎকৃষ্ট ধর্ম সঞ্চয় করা যায়, পবিত্র ফলমূল ভোজন করলে অথবা নীবার প্রভৃতি মুনজন সেবিত অন্ন ভোজন করলে সে মহাফল লাভ করা যায় না। “  [ মনু ৫/৫৪]

“ যে ব্যক্তি কখনোই কাউকে হিংসা করেন না তিনি যা ধ্যান করেন, যে সকল ধর্মানুষ্ঠান করেন এবং পরমার্থ তত্ত্বের অনুসন্ধানে যদি মনোনিবেশ করেন তবে সে সমুদয় দ্রব্যই তিনি অনায়াসে লাভ করতে পারেন।“ [মনু ৫/৪৭]

“যার অনুমতিতে পশু হনন করা হয়, যে পশুকে অস্ত্র দিয়ে খণ্ড খণ্ড করে, যে পশু বধ করে, যে মাংস ক্রয়-বিক্রয় করে , যে মাংস রান্না করে, যে মাংস পরিবেশন করে এবং যে মাংস ভক্ষণ করে – এই সাতজনকেই ঘাতক বলা হয়।“ [মনু ৫/৫১]

“প্রাণী হিংসা না করলে কখনোই মাংসের উৎপত্তি হয় না। কিন্তু প্রাণী হিংসা স্বর্গ প্রাপ্তির কারণ নয়। সুতরাং অবিহিত মাংসভোজন করা উচিত নয়।“ [মনু ৫/৪৮]

“স্থলজ ও জলজ শাকসমূহ, বনজ পুষ্পমূল ও ইঙ্গুদী প্রভৃতি ফল সমৃদ্ধ স্নেহ পদারথ ভোজন করবেন। কিন্তু বানপ্রস্থ চলাকালীন মধু, মাংস, ভূমিজাত ছত্রাক, মালব দেশের প্রসিদ্ধ শিগ্রুক নামক শাক, শ্লেষ্মাত্মক ফল অর্থাৎ চালতা ভক্ষণ করবেন না।“ [ মনু ৬/১৩-১৪]

“শুক্র-শোণিতের সংযোগে মাংসের উৎপত্তি। সুতরাং তা ঘৃণিত। উপরন্তু প্রাণীদের বধ বন্ধন রূপ যন্ত্রণা নিষ্ঠুর হৃদয় কর্মের পরিচায়ক। এই সকল ব্যাপার পর্যালোচনা করে সাধুগণ বিহিত ও অবিহিত সকল প্রকার মাংস ভক্ষণ থেকেই নিবৃত্ত হন।“ [ মনু ৫/৪৯]

“যে ব্যক্তি উক্ত শাস্ত্রবিধি সমূহ ত্যাগ করে পিশাচের মতো মাংস ভক্ষণ করেন না, লোকসমাজে তিনি অত্যন্ত প্রিয় হন এবং কখনোই রোগাক্রান্ত হন না।“ [মনু ৫/৫০]

[14] মনু ১১/৫৯-৬৭

Facebook Comments

অজিত কেশকম্বলী II

"মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।"

Leave a Reply

%d bloggers like this: