হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস-রহস্যঃ রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ

পূর্ববর্তী পর্বঃ- হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস-রহস্যঃবেদ ; হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস-রহস্যঃ বেদাঙ্গ ; হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস-রহস্যঃ ধর্মশাস্ত্র

রামায়ণ এবং মহাভারত হিন্দুদের দুই বিখ্যাত কাব্য এবং  ধর্মগ্রন্থ। পূর্বালোচিত ধর্মগ্রন্থগুলির মত এই দুই গ্রন্থেও গোমাংসের কথা পাওয়া যায়।

রামায়ণে

রামায়ণে  সীতা গঙ্গা নদী পার হওয়ার সময় গঙ্গাকে গরু নিবেদন করার কথা বলেন-

” জানকি গঙ্গার মধ্যস্থলে গিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন,গঙ্গে! এই রাজকুমার তোমার কৃপায় নির্বিঘ্নে এই নির্দেশ পূর্ণ করুন। ইনি চতুর্দশ বৎসর অরণ্যে বাস করিয়া পুনরায় আমাদের সহিত প্রত্যাগমন করিবেন। আমি নিরাপদে আসিয়া মনের সাধে তোমার পূজা করিব। তুমি সমুদ্রের ভার্যা , স্বয়ং ব্রহ্মলোক ব্যাপিয়া আছ । দেবী! আমি তোমাকে প্রণাম করি। রাম ভালয় ভালয় পৌছিলে এবং রাজ্য পাইলে আমি ব্রাহ্মণগণকে দিয়া তোমারই প্রীতির উদ্দেশ্যে তোমাকে অসংখ্য গো ও অশ্ব দান করিব , সহস্র কলস সুরা ও পলান্ন দিব।তোমার তীরে যেসকল দেবতা রহিয়াছেন , তাহাদিগকে এবং তীর্থস্থান ও দেবালয় অর্চনা করিব।” [ বাল্মীকি রামায়ণ / অযোধ্যা কাণ্ড/ দ্বিপঞ্চাশ সর্গ ; অনুবাদক – হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য]

যমুনা নদী অতিক্রম করার সময় সীতা যমুনাকেও গরু নিবেদন করার কথা বলেন-

” এই বলিয়া রাম সীতাকে অগ্রে লইয়া লক্ষ্মণের সহিত যমুনাভিমুখে চলিলেন এবং ঐ বেগবতী নদীর সন্নিহিত হইয়া উহা কি প্রকারে পার হইবেন ভাবিতে লাগিলেন। অনন্তর তাহারা বন হইতে শুষ্ক কাষ্ঠ আহরণ এবং উশীরদ্বারা তাহা বেষ্টন করিয়া ভেলা নির্মাণ করিলেন। মহাবল লক্ষ্মণ জম্বু ও বেতসের শাখা ছেদন পূর্বক জানকীর উপবেশনার্থ আসন প্রস্তুত করিয়া দিলেন। তখন রাম সাক্ষাৎ লক্ষ্মীর ন্যায় অচিন্ত্যপ্রভাবা ঈষৎ লজ্জিতা প্রিয় দয়িতাকে অগ্রে ভেলায় তুলিলেন এবং তাহার পার্শ্বে বসন ভূষণ, খন্ত্রি এবং ছাগচর্ম সংবৃত পেটক রাখিয়া লক্ষ্মণের সহিত স্বয়ং উত্থিত হইলেন এবং সেই ভেলা অবলম্বন করিয়া প্রীতমনে সাবধানে পার হইতে লাগিলেন।জানকি যমুনার মধ্যস্থলে আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া কহিলেন , দেবী আমি তোমায় অতিক্রম করিয়া যাইতেছি , এক্ষণে যদি আমার স্বামী সুমঙ্গলে ব্রত পালন করিয়া অযোধ্যায় প্রত্যাগমন করিতে পারেন , তাহা হইলে সহস্র গো ও শত কলস সুরা দিয়া তোমার পূজা করিব । সীতা কৃতাঞ্জলিপুটে এইরূপ প্রার্থনা করত তরঙ্গবহুলা কালিন্দীর দক্ষিণ তীরে উত্তীর্ণ হইলেন।” [ বাল্মীকি রামায়ণ/ অযোধ্যা কাণ্ড/পঞ্চপঞ্চাশ সর্গ ; অনুবাদক হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য] [1]

পঞ্চানন তর্করত্ন এর অনুবাদ করেছেন এভাবে- “অনন্তর সম্যক জ্ঞানবতী সীতা দেবী সেই যমুনা নদীর অধ্যদেশে যাইয়া তাহাকে বন্দনা করিলেন। “দেবী! আমি আপনার উপর দিয়া পরপারে যাইতেছি; আপনি আমার মঙ্গল কামনা করুন, – আমার পাতিব্রত্য ব্রতের রক্ষাকারী হউন। ইক্ষ্বাকুবংশীয়রাজগণ পালিতা অযোধ্যা নগরীতে রাম মঙ্গলে মঙ্গলে ফিরিয়া আসিলে , আমি আপনাকে সহস্র গো ও একশত সুরাপূর্ণ কলসদ্বারা পূজা করিব।“ এই বলিয়া তিনি কৃতাঞ্জলিপুটে প্রার্থনা করত দক্ষিণতীরে গিয়া উপস্থিত হইলেন।“  [ বাল্মীকি রামায়ণ/ অযোধ্যাকণ্ড/ পঞ্চান্ন সর্গ ; অনুবাদক- পঞ্চানন তর্করত্ন]

এছাড়া রাম যখন ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে গিয়ে উপস্থিত হন তখন ভরদ্বাজ তাকে গরু দ্বারা আপ্যায়ণ করেছিলেন-

তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা রাজপুত্রস্য ধীমতঃ।

উপানয়ত ধর্মাত্মা গামর্ঘ্যমুদকং ততঃ।। ১৭

নানাবিধানন্নরসান্ বন্যমূলফলাশ্রয়ান্।

ভেভ্যো দদৌ তপ্ততপা বাসঞ্চৈবাভ্যকল্পয়ৎ।। ১৮

মৃগপক্ষিভিরাসীনো মুনিভিশ্চ সমন্ততঃ।

রামমাগতমভ্যর্চ্চ্য স্বাগতেনাগতৎ মুনিঃ।। ১৯

প্রতিগৃহ্য তু তামর্চ্চাপুবিষ্টং স রাঘবম্।

ভরদ্বাজোহব্রবীদ্বাক্যং ধর্ম্মযুক্তমিদং তদা।। ২০

চিরস্য খলু কাকুৎস্থ পশ্যাম্যহমুপাগতম্।

শ্রুতং তব ময়া চৈব বিবাসনমকারণম্।। ২১

অর্থ- মুনি, পক্ষী ও মৃগগণে চতুর্দিকে পরিবৃত হইয়া সমাসীন সেই সতত-তপোনুষ্ঠায়ী ধর্মাত্মা ভরদ্বাজ ঋষি সম্যক পরিজ্ঞাত ধীমান রাজ নন্দন রামের কথা শুনিয়া তাহাকে “তুমি ত সুখে আসিয়াছ?” বলিয়া অর্চনা করত অর্ঘ্য উদক ও গো উপঢৌকন দিলেন। পরে তিনি তাহাদিগকে ফলমূলসম্ভূত নানাবিধ ভোজ্য প্রদান করিয়া তাহাঁদিগের বাসস্থান নিরূপন করিলেন। পরে রঘুনন্দন রাম সেই সকল দ্রব্য প্রতিগ্রহ করিয়া উপবিষ্ট হইলে , ভরদ্বাজ ঋষি তাহাকে এই ধর্মযুক্ত কথা বলিলেন, “ কাকুৎস! তোমাকে সমাগত দেখিয়া, আমার বহু কালের ইচ্ছা পূর্ণ হইল! তুমি যে অকারণে বিবাসিত হইয়াছ, তাহাও আমি শুনিয়াছি… [বাল্মীকি রামায়ণ/ অযোধ্যা কাণ্ড/ চুয়ান্ন সর্গ ; অনুবাদক – পঞ্চানন তর্করত্ন]

হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনুবাদে রয়েছে, “ মহর্ষি ভরদ্বাজ রামের এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহাকে স্বাগতপ্রশ্ন পূর্বক অর্ঘ্য, বৃষ, নানাপ্রকার বন্য ফলমূল ও জল প্রদান করিলেন এবং তাহার অবস্থিতির নিমিত্ত স্থান নিরূপন করিয়া অন্যান্য মুনিগণের সহিত তাহাকে বেষ্টনপূর্বক উপবিষ্ট হইলেন।“ [2]

মহাভারতে

মহাভারতের নানাস্থানেই গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণের কথা পাওয়া যায়।

রন্তিদেবের ভোজনশালাঃ

রন্তিদেব নামে এক ধার্মিক রাজার কথা বারবার মহাভারতে উক্ত হয়েছে। তিনি প্রচুর পশু হত্যা করে মানুষদের খাওয়াতেন। আশ্চর্যজনকভাবে সেই পশুগুলোর মধ্যে প্রচুর গরুও ছিল। আর সেই গোমাংস খাওয়ার জন্য মানুষের লাইন পড়ে যেত। পাচকেরা তখন বাধ্য হয়ে বলতেন বেশি করে ঝোল নিতে, কারণ খুব বেশি মাংস নেই।  

কালিপ্রসন্নের মহাভারতের বন পর্বের ২০৭ তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে-

“পূর্বে মহারাজ রন্তিদেবের মহানসে প্রত্যহ দুই সহস্র পশু হত্যা করিয়া প্রতিদিন অতিথি ও অন্যান্য জনগণকে সমাংস অন্নদান পূর্বক লোকে অতুল কীর্তি লাভ করিয়াছেন।“

কালিপ্রসন্নের মহাভারতের দ্রোণ পর্বের ৬৭ তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে-

“ নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! সংস্কৃতিনন্দন মহাত্মা রন্তিদেবকেও শমনসদনে গমন করিতে হইয়াছে। ঐ মাহাত্মার ভবনে দুইলক্ষ পাচক সমাগত অতিথি ব্রাহ্মণগণকে দিবারাত্র পক্ক ও অপক্ক খাদ্যদ্রব্য পরিবেশন করিত। মহাত্মা রন্তিদেব ন্যায়োপার্জিত অপর্য্যাপ্ত ধন ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করিয়াছিলেন। তিনি বেদাধ্যয়ণ করিয়া ধর্মানুসারে শত্রুগণকে বশীভূত করেন। ঐ মহাত্মার যজ্ঞসময়ে পশুগণ স্বর্গলাভেচ্ছায় স্বয়ং যজ্ঞস্থলে আগমন করিত। তাহার অগ্নিহোত্র যজ্ঞে এত পশু বিনষ্ট হইয়াছিল যে, তাহাদের চর্মরস মহানস হইতে বিনির্গত হইয়া এক মহানদী প্রস্তুত হইল। ঐ নদী চর্মণবতী নামে অদ্যপি বিখ্যাত রহিয়াছে।“

এর পরে বলা হয়েছে –

“সংস্কৃতিনন্দনের ভবনে (রন্তিদেবের) এত অধিক অতিথি সমাগত হইত যে মণিকুণ্ডলধারী সূদগণ একবিংশতিসহস্র বলীবর্দের মাংস পাক করিয়াও অতিথিগণকে কহিত, অদ্য তোমরা অধিক পরিমাণে সূপ ভক্ষণ কর, আজি অন্যদিনের ন্যায় অপর্য্যাপ্ত মাংস নাই। “ [দ্রোণ পর্ব/ ৬৭]

তবে হিন্দুরা একটা সময় গোমাংস খাওয়া ত্যাগ করেছিল। মহাভারতেও এর উল্লেখ আছে-

“পূর্বকালে মহাত্মা রন্তিদেব স্বীয় যজ্ঞে গোসমুদায়কে পশু রূপে কল্পিত করিয়া ছেদন করাতে উহাদিগের চর্মরসে চর্মণবতী নদী প্রবর্তিত হইয়াছে। এক্ষণে উহারা আর যজ্ঞীয় পশুত্বে কল্পিত হয় না। উহারা এক্ষণে দানের বিষয় হইয়াছে।” [অনুশাসন/৬৬]


গোমেধ যজ্ঞঃ

মহাভারতের অনেকস্থলেই গোমেধ যজ্ঞের কথা বলা আছে-

  1. “এই পৃথিবীতে যে সমস্ত তীর্থ আছে , নৈমিষেও সেই সকল তীর্থ বিদ্যমান রহিয়াছে। তথায় সংযত ও নিয়তাসন হইয়া স্নান করিলে গোমেধ যজ্ঞের ফলপ্রাপ্তি ও সপ্তম কুল পর্যন্ত পবিত্র হয়।“ [বন/৮৪]  
  2. “ মনুষ্যের বহুপুত্র কামনা করা কর্তব্য; কারণ তাহাঁদিগের মধ্যে কেহ যদি গয়ায় গমন , অশ্বমেধ যজ্ঞানুষ্ঠান অথবা নীলকায় বৃষ উৎসর্গ করে , তাহা হইলে বাঞ্ছিত ফল লাভ হয়। [বন/ ৮৪]
  3. “তৎপরে তত্রস্থ শ্রান্তিশোক বিনাশন মহর্ষি মতঙ্গের আশ্রমে প্রবেশ করিলে গোমেধযজ্ঞের ফল লাভ হয়।” [বন/৮৪]

শ্রাদ্ধে গোমাংসঃ

মহাভারতে শ্রাদ্ধে গোমাংস দেওয়ার কথা বলা আছে-

” শ্রাদ্ধকালে যে সমস্ত ভোজ্য প্রদান করা যায় তন্মধ্যে তিলই সর্বপ্রধান। শ্রাদ্ধে মৎস্য প্রদান করিলে পিতৃগণের দুই মাস, মেষমাংস প্রদান করিলে তিন মাস, ও শশ মাংস প্রদান করিলে চারি মাস, অজমাংস প্রদান করিলে পাঁচ মাস, বরাহ মাংস প্রদান করিলে ছয় মাস, পক্ষীর মাংস প্রদান করিলে সাত মাস, পৃষৎ নামক মৃগের মাংস প্রদান করিলে আট মাস, রুরু মৃগের মাংস প্রদান করিলে নয় মাস, গবয়ের মাংস প্রদান করিলে দশমাস, মহিষ মাংস প্রদান করিলে একাদশ মাস এবং গোমাংস প্রদান করিলে এক বৎসর তৃপ্তি লাভ হইয়া থাকে। ঘৃত পায়স গোমাংসের ন্যায় পিতৃ গণের প্রীতিকর ; অতএব শ্রাদ্ধে ঘৃতপায়েস প্রদান করা অবশ্য কর্তব্য। … ” [ অনুশাসন/ ৮৮ ]

বিশুদ্ধচিত্তে গোহত্যাঃ

মহাভারত অনুসারে, যোগবলে যারা বিশুদ্ধচিত্ত লাভ করেছেন তারা গোহত্যা করলে কোনো পাপ হয় না-

“যাহারা যোগবলে এইরূপ বিশুদ্ধচিত্ত হইয়াছেন , তাহারা যোগবলে গোহত্যা করিলেও করিতে পারেন। কারণ তাহাদিগকে গোবধ জনিত পাপে লিপ্ত হইতে হয় না।” [শান্তি / ২৬৩]

নহুষের গোবধঃ

“রাজপুরোহিত ,স্নাতক ব্রাহ্মণ, গুরু ও শ্বশুর এক বৎসর গৃহ বাস করিলেও মধুপর্ক দ্বারা তাহাঁদিগের পূজা করা কর্তব্য”। [ অনুশাসন/ ৯৭]

প্রাচীনকালে অতিথিদের মধুপর্ক দ্বারা আপ্যায়ণ করার বিধান ছিল। মধুপর্কে গোমাংসের প্রয়োজন হত।মহাভারতে মধুপর্কের জন্য নহুষের গোবধ করার কথা পাওয়া যায়। তবে নহুষের সময়ের ঋষিরা নহুষের এই কর্মের বিরোধীতা করেন-  

” পূর্বে মহারাজ নহুষ মধুপর্ক দান সময়ে গোবধ করাতে মহাত্মা তত্ত্বদর্শী ঋষিগণ তাহারে কহিয়াছিলেন, মহারাজ তুমি মাতৃতুল্য গাভী ও প্রজাপতিতুল্য বৃষকে নষ্ট করিয়া যাহার পর নাই গর্হিত কারযের অনুষ্ঠান করিয়াছ ; অতএব তোমার যজ্ঞে হোম করিতে আমাদের প্রবৃত্তি নাই , তোমার নিমিত্ত আমরা অতিশয় ব্যথিত হইলাম।” [ শান্তি/ ২৬২]

শান্তি পর্বের ২৬৮ তম অধ্যায়েও নহুষের গোবধের কথা পাওয়া যায়। এখানে নহুষ গোহত্যা করতে গেলে কপিল ঋষি তার বিরোধ করেন। তা নিয়ে স্যূমরশ্মি ঋষি ও কপিল ঋষির মধ্যে এক দীর্ঘ তর্কের সূচনা হয়-  

“একদা মহর্ষি ত্বষ্টা নরপতি নহুষের গৃহে আতিথ্য স্বীকার করিলে তিনি শাশ্বত বেদ বিধানানুসারে তাহারে মধুপর্ক প্রদানার্থ গোবধ করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এমন সময়ে জ্ঞানবান সংযমী মহাত্মা কপিল যদৃচ্ছাক্রমে তথায় সমাগত হইয়া নহুষকে গোবধে উদ্যত দেখিয়া স্বীয় শুভকরি নৈষ্ঠিক বুদ্ধিপ্রভাবে , “হা বেদ!” এই শব্দ উচ্চারণ করিলেন। ঐ সময় স্যূমরশ্মি নামে এক মহর্ষি স্বীয় যোগবলে সেই গোদেহে প্রবিষ্ট হইয়া কপিলকে সম্বোধনপূর্বক কহিলেন, মহর্ষে! আপনি বেদবিহিত হিংসা অবলোকন করিয়া বেদে অবজ্ঞা প্রদর্শন করিলেন, কিন্তু আপনি যে হিংসাশূণ্য ধর্ম অবলম্বন করিয়া রহিয়াছেন, উহা কি বেদবিহিত নহে? ধৈর্যশালী বিজ্ঞানসম্পন্ন তপস্বীরা সমুদায় বেদকেই পরমেশ্বরের বাক্য বলিয়া কীর্তন করিয়াছেন। পরমেশ্বরের কোন বিষয়েই অনুরাগ , বিরাগ বা স্পৃহা নাই। সুতরাং কি কর্মকাণ্ড, কি জ্ঞানকাণ্ড তাহার নিকট উভয়ই তুল্য। অতএব কোন বেদই অপ্রমাণ হইতে পারে না।“   

স্যূমরশ্মির কথার প্রত্যুত্তরে কপিল বলেন,  

“আমি বেদের নিন্দা করিতেছি না এবং কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড এই উভয়বিধ বেদের তারতম্য নির্দেশ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। কি সন্ন্যাস, কি বানপ্রস্থ, কি গার্হস্থ , কি ব্রহ্মচর্য লোকে যে ধর্ম অনুসারে কার্য করুন না কেন, পরিণামে অবশ্যই তাহার গতিলাভ হইয়া থাকে।সন্ন্যাসাদি চারিপ্রকার আশ্রমবাসীদিগের চারি প্রকার গতি নির্দিষ্ট আছে। তন্মধ্যে সন্ন্যাসী মোক্ষ, বানপ্রস্থ ব্রহ্মলোক, গৃহস্থ স্বর্গলোক এবং ব্রহ্মচারী ঋষিলোক লাভ করিয়া থাকেন। বেদে কার্য আরম্ভ করা ও না করা উভয়েরই বিধি আছে। ঐ বিধি দ্বারা কার্যের আরম্ভ ও অনারম্ভ উভয়ই দোষাবহ বলিয়া প্রতিপন্ন হইতেছে। সুতরাং বেদানুসারে কার্যের বলাবল নির্ণয় করা নিতান্ত দুঃসাধ্য। অতএব যদি তুমি বেদশাস্ত্র ভিন্ন যুক্তি বা অনুমান দ্বারা অহিংসা অপেক্ষা কোন উৎকৃষ্ট ধর্ম স্থির করিয়া থাক, তাহা কীর্তন কর।…“   

গোবধের পরিপ্রেক্ষিতে দুই ঋষির মধ্যে দীর্ঘ তর্ক চলতে থাকে।

বিচুখ্যের গল্পঃ

মহাভারতে বিচুখ্য নামক এক রাজার কথা বলা হয়েছে। গোমেধ যজ্ঞে গোহত্যা দেখে সেই রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন। শান্তি পর্বে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বিচুখ্যের কাহিনী বলেন-

” হে ধর্মরাজ! মহারাজ বিচুখ্য প্রাণীগণের প্রতি সদয় হইয়া যাহা বলিয়া গিয়াছেন এক্ষণে সেই পুরাতন ইতিহাস কীর্তন করিতেছি,শ্রবণ কর। পূর্বে ঐ নরপতি গোমেধ যজ্ঞে যজ্ঞভূমিস্থ নির্দয় ব্রাহ্মণগণ ও ক্ষতদেহ বৃষকে দর্শন এবং গোসমূহের আর্তনাদ শ্রবণ পূর্বক দয়ার্দ্র হইয়া কহিয়াছিলেন , আহা! গোসমূদায় কি কষ্টভোগ করিতেছে। অতঃপর সমুদায় লোকে গোসমূহের মঙ্গল লাভ হউক।… ” [ শান্তি/ ২৬৫]

এই কাহিনী হতে জানা যায় একসময় গোমেধ যজ্ঞে ব্রাহ্মণেরা গোহত্যা করতেন। কিন্তু গরুর প্রতি করুণা ও গোহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এখানে লক্ষ্য করা যায়।

পুরাণে

পুরাণগুলি হতেও গোমাংসের অনুমোদন পাওয়া যায়।

কালিকা পুরাণ

কালিকা পুরাণের অনেক স্থলেই গরু ও মহিষ বলির দেওয়ার কথা বলা আছে।

 মহিষ বলি সংক্রান্ত শ্লোকগুলি দেখুনঃ

“যখন ভৈরবী দেবী অথবা ভৈরবীকে মহিষ বলি প্রদান করিবে তখন সেই বক্ষ্যমাণ মন্ত্র দ্বারা পূজা করিবে।“ [৬৭/৫৮]

“অর্চনা দ্বারা অপরাপর মহিষ প্রভৃতির বলির শরীর বিশুদ্ধিলাভ করে, এই নিমিত্ত দেবী তাহা হইতে রক্ত গ্রহণ করেন।“ [৬৭/৯৬]

“সাধক মহিষ এবং মনুষ্যের রক্তের কিঞ্চিত অংশ মধ্যমা এবং অনামিকা দ্বারা উদ্ধৃত করিয়া মহাকৌশিক মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক পূর্ব হইতে নৈঋত কোণে পুতনাদি দেবতার উদ্দেশ্যে মৃত্তিকার উপর বলি প্রদান করিবে।“ [৬৭/১৪৬-১৪৭]

বলিপ্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “ শর্করা, লবলী, নারংগক, ছাগল, মহিষ, মেষ, নিজের শোণিত, পক্ষী আদি পশু, নয় প্রকার মৃগ- এইসকল উপকরণ দ্বারা নিখিল জগতের ধাত্রী মহামায়ার পূজা করিবে, যাহাতে মাংস ও শোণিতের কর্দম হয়।“ [৫৫/৪৭-৫০]

হে পুত্রদ্বয়! চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে বিশেষ চতুর্দশী তিথিতে ছাগ মহিষ প্রভৃতি বলি মধু ও মৎস্য দ্বারা ভৈরবীরূপী আমাকে তুষ্ট করিবে; আমি ইহাতেই সন্তুষ্ট হইব। (৬৭/২০৩)

গরু বলি সংক্রান্ত শ্লোকঃ

“ পক্ষী সকল, কচ্ছপ, গ্রাহ, মৎস্য, নয় প্রকার মৃগ, মহিষ, অজ, আবিক, গো, ছাগ, রুরু, শূকর,খড়গ, কৃষ্ণ সার, গোধিকা, শরভ, সিংহ, শার্দূল, মনুষ্য এবং স্বীয় গাত্রের রুধির , ইহারা চণ্ডিকা দেবী ও ভৈরবাদির বলিরূপে কীর্তিত হইয়াছে। [৬৭/৩-৫]

“গো এবং গোধিকার রুধিরে দেবীর সাংবাৎসরিক তৃপ্তি হয়।“[৬৭/৯]

বিষ্ণু পুরাণ

বিষ্ণু পুরাণ ৩/১৬ এ বলা হয়েছে –

“ হে মহারাজ! যে যে মাংস দ্বারা পিতৃগণের তৃপ্তি লাভ হয় তাহা আপনার নিকট কীর্তন করিতেছি শ্রবণ করুন। শশক, শকুল, বন্য শূকর, ছাগ, হরিণ, রুরু নামক মৃগ, গবয়, মেষ, গো, বার্ধ্রীণস ও গণ্ডারদিগের মাংস পিতৃগণের অতিশয় প্রীতিকর।“ [ অনুবাদক- শ্রীরামসেবক বিদ্যারত্ন]

(চলবে…)


বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ-  লেখাটিতে কালিপ্রসন্ন সিংহ কর্তৃক অনূদিত মহাভারত ব্যবহৃত হয়েছে।

তথ্যসূত্র-

[1] আরও দেখুন-

कालिन्दीमध्यमायाता सीता त्वेनामवन्दत।

स्वस्ति देवि तरामि त्वां पारये न्मे पतिर्व्रतम्।।2.55.19।।

यक्ष्ये त्वां गोसहस्रेण सुराघटशतेन च।

स्वस्ति प्रत्यागते रामे पुरी मिक्ष्वाकुपालिताम्।।2.56.20।।

कालिन्दीमध्यम् the middle of the river Kalindi (Yamuna), आयाता on reaching, सीता Sita, एनाम् to this river, अवन्दत made reverential salutation, देवी O goddess, त्वाम् you, तरामि crossing, स्वस्ति let safety be ours, मे my, पति: husband, व्रतम् vow, पारयेत् may fulfil, रामे Rama, स्वस्ति safely, इक्ष्वाकुपालिताम् ruled by Ikshvaku kings, पुरीम् city of Ayodhya, प्रत्यागते on his return, त्वाम् you, गोसहस्रेण with the offer of a thousand cows, सुराघटशतेन च with a hundred pots of wine, यक्षे will worship. 

On reaching the middle of the river Yamuna, Sita made reverential salutations to her saying O goddess, I am crossing you, may safety be ours and may my husband fulfil his vow After Rama’s (safe) return to the city (of Ayodhya) ruled by the Ikshvaku kings, I shall worship you with a thousand cows and a hundred pots of wine. [source]

[2] तस्य तद्वचनं श्रुत्वा राजपुत्रस्य धीमतः।

उपानयत धर्मात्मा गामर्घ्यमुदकं ततः।।2.54.17।।


धर्मात्मा sage Bharadwaja, धीमतः of the sagacious, तस्य that, राजपुत्रस्य prince’s, तत् वचनम् those words, श्रुत्वा having heard, ततः then, गाम् bull, अर्घ्यम् for arghya, उदकम् water, उपानयत brought.


Sage Bharadwaja heard the words of sagacious Rama and offered a bull, water (for washing feet) and arghya (offering to a guest).  [ source]

Facebook Comments

অজিত কেশকম্বলী II

"মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।"

One thought on “হিন্দু ধর্ম ও গোমাংস-রহস্যঃ রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ

  • September 8, 2019 at 6:04 am
    Permalink

    onek kichu janlam

    Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: