ফেরাউন বা ফারাওন সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর।

বেশ কয়েকদিনই ফেইসবুক লাইভে কিছু ইসলামপন্থী পাঠক আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন ফেরাউন সম্পর্কে। ফেরাউন কীভাবে এতবছর সমুদ্রের নীচে থাকার পরেও, তার দেহ অক্ষত রয়েছে! কেন পচে গলে মিশে যায় নি। এই প্রসঙ্গে উনারা কোরানের একটি আয়াত উল্লেখ করেন নিয়মিত, এবং ফারাওনের বা ফেরাউনের লাশের সমুদ্রের গভীরে অক্ষত থাকাকে আল্লাহর অলৌকিক কুদরত হিসেবে প্রচার করেন।

যেহেতু সকল প্রশ্নকেই আমি সম্মান জানাই, এবং মানুষের মনে সৃষ্টি হওয়া সকল জিজ্ঞাসাকেই আমি সম্মান করি, তাই এই প্রশ্নটি সম্পর্কেও আগের মত জবাব দিচ্ছি। আশাকরি আমার ইসলামপন্থী বন্ধুগণ লেখাটি পড়বেন, এবং আমি কোথাও ভুল বলে থাকলে ধরিয়ে দেবেন, নতুবা লেখাটির বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করবেন। তবে ইতর ধরণের গালাগালি কিংবা হুমকি ধামকি, দোজখের ভয় অথবা বেহেশতের হুরের লোভ লালসা না দেখালেই খুশি হবো। এই ধরণের কোপাকুপির ভয় দেখানো নিকৃষ্ট মাফিয়াদের কাজ, আপনারা দীর্ঘদিন ধর্মের মাফিয়া চক্রে থেকে থেকে সবকিছুতেই চাপাতির কোপকে একমাত্র যুক্তি বলে মনে করেন। যেটা আমার কাছে মূল্যহীন।

যাইহোক, প্রথমেই ইসলামপন্থীদের দাবীটি লক্ষ্য করা যাক। এই ভিডিওটিতে উর্দুতে ইসলামপন্থীদের দাবীটি উল্লেখ করা হয়েছে।


এই নিয়ে অসংখ্য ইসলামিক লিঙ্ক খুঁজলে পাবেন, আমি এটাকে মূল ধরেই উত্তর লিখছি। এই ভিডিওটিতে এবং অন্যান্য অসংখ্য ভিডিওতে যা দাবী করা হচ্ছে, তা হচ্ছে,

কোরান শরীফে আল্লাহ বলেছেন, ফেরাউন, যে কিনা মুসা নবীর পেছনে ধাওয়া করেছিলেন, এবং আল্লাহর কুদরতে সমুদ্রে ডুবে মারা গিয়েছিলেন, তার লাশ সমুদ্রের ভেতরে আল্লাহর কুদরত হিসেবে রয়ে যাবে। ফেরাউনের একটি ‘মমি’ দেখিয়ে ভিডিওটিতে এটাও দাবী করা হচ্ছে, এই লাশটি উদ্ধার করা হয়েছে সমুদ্র থেকে। যেটা আবিষ্কার হয়েছে ১৮৮১ সালে, এবং বর্তমানে মিশরের রয়েল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। লাশটির অক্ষত থাকাই নাকি আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ।

এই বিষয়ে মরিস বুকাইলির বইতে অবশ্য কিছু ভিন্ন কথা পাওয়া যায়। সেটাতে পরে আসছি। শুরুতে এই ভিডিওটির জবাব দেয়া দরকার।

ফেরাউন কে?
প্রথমেই আমাদের জানা থাকা জরুরি যে, ফেরাউন কে বা কী। ফেরাউন বা ফারাওন কোন একক ব্যক্তি নয়। ফারাও হলো গ্রিক-রোমান কর্তৃক বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন মিশরীয় রাজবংশের রাজাদের প্রচলিত উপাধি। পুরুষ রাজা, এমনকি ফেরাউন শব্দটা মহিলা শাসকদের হ্মেত্রেও ব্যবহার করা হত। তাই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ফেরাউন কোন লোক নয়, একটা উপাধি। আমাদের দেশে যেমন এখন রাষ্ট্রপতি।

তাহলে কোন ফেরাউনের কথা কোরানে বলা হচ্ছে?
ফেরাউন আর মুসার যেই উপকথা, সেই উপকথা আসলে বিভিন্ন জায়গার আঞ্চলিক উপকথা, যা কয়েকটি প্রধান ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ঠিক কোন ফেরাউনের কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে ধর্মবিশারদ ঐতিহাসকদের মধ্যে নানা মতভেদ আছে। সেই আলোচনা আরেকদিন করা যাবে।

মমি কী?
মমি হলো একটি মৃতদেহ যা জীবের শরীরের নরম কোষসমষ্টিকে পচে গলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। প্রাচীন মিশরে, উত্তর চিলিতে এবং দক্ষিণ পেরুতে মানুষ মৃতদেহ মমি করার কৌশল জানতো।

কার মমির কথা এই ভিডিতে বলা হচ্ছে?
১৮৮১ সালে যেই মমিটি পাওয়া যায়, সেই মমিটি দ্বিতীয় রামিসেসের। এই ফেরাউনের জন্ম (প্রায়) খ্রিস্টপূর্ব ১৩০৩; মৃত্যু জুলাই বা আগস্ট ১২১৩ খ্রিস্টপূর্ব; শাসনকাল হচ্ছে, ১২৭৯–১২১৩ খ্রিস্টপূর্ব।
উনাকে রামিসেস দ্য গ্রেট বা মহান রামিসেবলা হতো। তিনি ছিলেন মিশরের উনবিংশতম রাজবংশের তৃতীয় ফারাও রাজা। ভিডিওটি খুব ভালভাবে শুনলে দেখবেন, ভিডিওটিতে দাবী করা হচ্ছে, এই মমিটি নাকি আবিষ্কার করা হয়েছে সমুদ্র থেকে। যা ডাঁহা মিথ্যা কথা। ভিডিওটি ৪ মিনিট ১০ সেকেন্ড থেকে আরেকবার শুনুন।

বলা হচ্ছে, ফেরাউনের লাশ, যা ১২৩৫ খ্রিস্টপূর্বে সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল, ৩১১৬ বছর সমুদ্রের ভেতরে থাকবার পরেও আল্লাহর কুদরতে লাশটি অক্ষত রয়ে গেছে! এটা ডাঁহা মিথ্যাচার।

সত্য হচ্ছে, ৯০ বা ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুর পরে এই ফেরাউনের মমি তৈরি করে তা ভ্যালি অব দ্য কিংসের একটি সমাধিতে কবরস্থ করা হয়; পরবর্তীতে তার দেহকে একটি রাজ সংগ্রহশালায় স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ১৮৮১ সালে তা আবিষ্কৃত হয়, এবং বর্তমানে এটি কায়রো জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

সত্য হচ্ছে, এই ফেরাউনের এই মমিটি কখনোই সমুদ্রের তলদেশে ছিল না। ইসলামের সাথে মেলাবার জন্য খুব কৌশলে তথ্য বিকৃত করা হয়েছে। সাথে রেফারেন্স দিচ্ছি, লেখার সাথের লিঙ্কে ক্লিক করে পড়ে নেবেন সঠিক তথ্য।

এখন আসুন মরিস বুকাইলির দাবীতে। মমির শরীরে লবণ থাকার কারণে মরিস বুকাইলি দাবী করেন, এই লবণ যেহেতু পাওয়া গেছে, সেহেতু মমিগুলো অনেকদিন সমুদ্রের তলদেশে ছিল। সেটাও একটা ডাঁহা মিথ্যা কথা। মমি করার একটি ধাপেই পানি বা জলবায়ু যেটা আসলে পচন তরান্বিত করে, তা শুকাবার জন্যেই এক ধরণের লবণ ব্যবহার করা হতো।

মমি তৈরির প্রক্রিয়াঃ
কয়েকটি ধাপে এই মমি বানানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো। প্রথমে মৃতব্যক্তির নাকের মাঝে ছিদ্র করে মাথার ঘিলু ও মগজ বের করা হতো। শরীরের বিভিন্ন পচনশীল অঙ্গ যেমন: ফুসফুস, বৃক্ক, পাকস্থলি ইত্যাদি বের করা হতো। এসব অঙ্গ বের করার পর আবার পেট সেলাই করে দেয়া হতো। এক্ষেত্রে তারা খুব সতর্কতা অবলম্বন করতো। কারণ পেট সেলাই করতে গিয়ে যদি পেটের ভেতর বাতাস ঢুকে যায়, তাহলে মৃতদেহ পচে যাওয়ার আশঙ্কা ছিলো। অতঃপর মৃতদেহ ও বের করা অঙ্গগুলোতে লবণ মেখে শুকানো হতো। যখন সব ভালোভাবে শুকিয়ে যেতো, তখন গামলা গাইন গাছের পদার্থ ও বিভিন্ন প্রকার মসলা মেখে রেখে দেওয়া হতো। চল্লিশ দিন পর লিনেনের কাপড় দ্বারা পুরো শরীর পেঁচিয়ে ফেলা হতো। এরপর তারা মমিগুলোকে সংরক্ষণ করে রাখতো।

সেই মমি করবার লবণকে মরিস বুকাইলির মত ভণ্ড প্রতারক ধর্মব্যবসায়ী সমুদ্রে থাকা বলে দাবী করেছেন, এবং প্রচার করেছেন মমিগুলো সমুদ্রের নীচে ছিল। সত্য হচ্ছে, মিশরের মানুষ তাদের মমি করবার কৌশল ব্যবহার করেই এই মমিগুলো বানিয়েছেন। এখানে আল্লাহর কোন কুদরত ছিল না, বা অলৌকিক উপায়ে আল্লাহর মোজেজায় মৃতদেহগুলো অক্ষত রয়ে যায় নি।

মুহাম্মদ তাহলে এই মমি করবার কথা কীভাবে জানলেন?
মুহাম্মদ মূলত হিব্রু বাইবেল ওরফে ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং আরো কিছু উপকথাকে একত্রিত করে এই আয়াতটি লেখেন। উনার একজন শিক্ষক ছিলেন, ওয়ারাকা ইবনে নওফেল। মুহাম্মদের সাথে খাদিজার বিবাহের সময় উনিই ঘটকালি করেন। উনি ছিলেন একাধারে বাইবেল এবং অন্যান্য নানা ধর্মের বিশেষজ্ঞ। উনি আরবিতে প্রথম নিউ টেস্টামেন্ট বাইবেল অনুবাদ করেন বলেও শোনা যায়। এমনকি, উনিই প্রথম বিশেষজ্ঞ যিনি মুহাম্মদকে বলে দেন যে, মুহাম্মদ নবী মনোনীত হয়েছেন। উনার কাছ থেকেই মুহাম্মদ বাইবেল এবং পুরনো নানা ধর্মের গল্পগুলো শুনতেন, তা বুঝতে সমস্যা হয় না। অনেকেই সন্দেহ পোষণ করতেন যে, মুহাম্মদের কাছে আসা নানা আয়াত নাকি আসলে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের থেকে পাওয়া।

শুধু তাই নয়, মেরাজের যেই গল্প, সেই গল্প অতি প্রাচীন। মুহাম্মদ সেই প্রাচীন উপকথাকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন মাত্র। সেটাও নিশ্চিতভাবে নওফেলের কাছ থেকে। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এক্সোডাসের কাহিনী মুহাম্মদ ওয়ারাকা ইবনে নওফেল থেকেই জেনেছিলেন। এবং একই সাথে, মিশরে যে মমি করে রাখা হতো ফারাওনদের, সেটাও।

তাহলে?
ইসলামপন্থীরা জোর গলায় এই দাবীগুলো বলে যাচ্ছে, কোন রকমের এভিডেন্স এবং তথ্য ছাড়াই। কিন্তু যত জোরেই দাবী করা হোক না কেন, অন্ধ উজবুকের মত যতই হাত পা ছোড়া হোক না কেন, সত্য হচ্ছে, এগুলো আল্লাহর কুদরতে না, মিশরীয়দের মমি করবার কৌশল জানা থাকবার কারণেই তারা এগুলোর মমি করে রাখতো। এটা ছিল তখনকার সময়ের ধর্মের অংশ। তারা মনে করতো, খুব দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করতো, এই রাজারা একদিন আবার জীবিত হবেন।

কিন্তু দৃঢ়ভাবে অন্ধভাবে বিশ্বাস করলেই তো সেটা সত্য হয়ে যায় না, তাই না?

Facebook Comments