নির্যাতিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মিথ

সেই ছোটবেলা থেকেই মসজিদে কিংবা ওয়াজ মাহফিলে শুনে এসেছি, মুসলমানরা নাকি সারা পৃথিবীতে খুবই নির্যাতিত। শুনে খুব খারাপ লাগে, আহারে বেচারা মুসলমানরা। সবাই মিলে মিশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কত শত্রুতাই না করছে। কত ষড়যন্ত্রই না করছে। ছোটবেলা ওয়াজ মাহফিলে হুজুরেরা ওয়াজ করতো, কেঁদে কেটে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাত, হে আল্লাহ, মুসলমানদের তুমি এই সব জালিমের হাত থেকে রক্ষা করো। শুনে শুধু যে কষ্ট পেতাম তাই নয়, ভেতরে জিহাদের জোশ জেগে উঠতো। কারা এই সব জালিম, যারা মুসলমানদের শত শত বছর ধরে নির্যাতন করে যাচ্ছে? একবার সামনে পেলে একদম দেখিয়ে দিতাম! কিন্তু তাদের দেখতে পেতাম না। চারপাশে সব দিকেই মুসলমান দেখতাম। কারণ বাঙলাদেশ তো মুসলমানদেরই দেশ। এই দেশে কারা ঠিক মুসলমানদের অত্যাচার করছে ঠিক বুঝতাম না। হিন্দুরা? বৌদ্ধরা? নাকি খ্রিস্টান বা ইহুদীরা? নাকি ভুত?

ছোটবেলা শুনতাম ইউরোপে নাকি মুসলমানদের ওপর অনেক অত্যাচার নির্যাতন চালানো হয়। তারপরেও নাকি ইউরোপে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার অমুসলিম ইসলামের ছায়াতলে চলে আসার খবর পেতাম, আমাদের এলাকার হুজুর, মসজিদের বড় ভাইয়েরা সেগুলো বেশ গর্ব করেই বলতো। কিন্তু সেখানে মুসলমানদের ওপর সীমাহীন নির্যাতনের খবর পেতাম। আমেরিকা আর ইসরাইলে নাকি রাস্তায় মুসলমানদের ধরে ধরে হত্যা করা হতো। কথাগুলো এলাকার যেই বড় ভাই বলতো, ডিভি লটারি সে কিন্তু প্রতিবছরই পূরণ করতো। একবারও মিস হয় নি। শেষমেশ অন্য আরেকজনার ডিভি লটারি টাকা দিয়ে কিনে সে আমেরিকা চলে গেল। এখন শুনেছি বউ বাচ্চা নিয়ে বেশ সুখে শান্তিতেই আছে। কিন্তু মুসলমানদের ওপর যেখানে এত অত্যাচার হয়, সেই দেশে সে কেন গেল আজও বুঝলাম না। তার তো সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। যেখানে মুসলমানরা সুখে শান্তিতে বসবাস করে। সে যাইহোক। সেইসব কথা তুললে এখন তিনি ক্ষিপ্ত হন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি, গত একশ বছরে অমুসলিমদের হাতে যত মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে, তার তিনগুন মুসলিমরাই মুসলিমদের হত্যা করেছে। শিয়া সুন্নী কোন্দল, ইরাকে গ্যাস দিয়ে হত্যা, তালেবানদের দ্বারা হত্যা, পাকিস্তানীদের দ্বারা বাঙালি নিধন, দরফুরসহ গোটা আফ্রিকায় অসংখ্য মুসলিমকে মুসলিমরাই হত্যা করেছে। অথচ নিজেদের দোষ তাদের চোখে পরে না, তারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বামপন্থীদের সাথে গলা মিলিয়ে পাশ্চাত্যকে গালাগালি করেই নিজেদের কর্তব্য শেষ করে।
নিজেদের ব্যার্থতার জন্য অন্যকে দায়ী করে আত্মতুষ্টির এই মনস্তত্ব বেশ জটিল। একটা সময় ইউরোপের অনেকটা মুসলিমদের দখলে ছিল, যেই স্মৃতি রোমন্থন করে আজও তারা সুখ পায়। এবং তারা মনে করে ইউরোপ আসলে তাদেরই, চক্রান্ত করে তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। তাই আজও তারা খেলাফতের স্বপ্নদোষে বিভোর হয়, অথচ শিক্ষা বিস্তারে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
আফ্রিকার অধিকাংশ মুসলিম প্রধান দেশে শিক্ষার হার ২৫% এর কম। আরবের ধনী দেশ গুলোর শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। পাকিস্তান আফগানিস্তানে মাদ্রাসাগুলো গনিত ও বিজ্ঞানের চাইতে আত্মঘাতি বোমা হামলার প্রশিক্ষণ দিতে বেশি আগ্রহী। তারা মনে করে, ইসলামের খেলাফত আমলের মত এখনও তারা নাঙ্গা তলোয়ার হাতে নিয়ে ছুটে ছুটে কল্লা কেটে দেশ দখল করে চানতারা মার্কা পতাকা উড়াবে। কিন্তু আহাম্মকগুলো বোঝে না, সেই দিন আর নাই। ইউরোপ এগিয়ে গেছে জ্ঞান বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে, এবং এটা ছাড়া কোন সম্প্রদায়ই মাথা তুলে দাড়াতে পারবে না। আর আল্লা যে আকাশ থেকে কিছু কেরামতি করে মুসলিমদের জাতে তুলে দেবে, সেই আশাতে থাকলে মার খেয়ে কেঁদেই যেতে হবে। আর অন্যকে দোষ দিয়ে নিজের দোষ শাক দিয়ে ঢাকতে হবে।

ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের গল্প শুনে। বড় হওয়ার পরে তাই এই পর্যন্ত দেশে দেশে মুসলমানদের ওপর কী পরিমাণ নির্যাতন হয়েছে তা যাচাই করতে বসে গেলাম। অদ্ভুত তথ্য পেলাম। কয়েকটা উদাহরণ দেই।

যেমন ধরুন, ১৯৭১ সালে বাঙলাদেশে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়ে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যা করে। যার অধিকাংশই ছিল মুসলমান। যারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল তারাও মুসলমানই। আবার ধরুন, মাওলানা মওদুদীর নির্দেশে এবং উস্কানিতে পাকিস্তানে প্রায় ১০ লক্ষ আহমদিয়াকে হত্যা করা হয়। তারা মুসলমানই ছিল। এবারে আরও কিছু পরিসংখ্যান দেখা যাক। পরিসংখ্যানগুলো গণহত্যার অল্পবিস্তর পরিসংখ্যান।

  1. সাদ্দাম হোসেন- ৬ লক্ষ (১৯৭০-২০০৩ )
  2. সুহার্ত- ৫ লক্ষ ( ১৯৬৫-৬৬, ১৯৬৯-বর্তমান)
  3. মোল্লা ওমর/ তালিবান- ৪ লক্ষ (১৯৮৬ – ২০০১)
  4. হাসান তারাবি – ১ লক্ষ (১৯৮৯ – ১৯৯৯)
  5. ইরাক ইরান যুদ্ধ – ১০ লক্ষ (১৯৮০-১৯৮৮)
  6. কুয়েত যুদ্ধ – ১.৪০ লক্ষ (১৯৯০-১৯৯১)
  7. আলজেরিয়া – ৭ লক্ষ ( ১৯৫৪-১৯৬২)
  8. আলজেরিয়া – ২ লক্ষ (১৯৯১ – বর্তমান)
  9. সোমালিয়া – ৪ লক্ষ (১৯৯১- বর্তমান)
  10. নাইজেরিয়া – ১১ লক্ষ (১৯৯৩ – বর্তমান)
  11. লেবানন – ১.৫ লক্ষ ( ১৯৭৫ – বর্তমান)
  12. ইথোওপিয়া – ১৫ লক্ষ ( ১৯৭৫ -১৯৭৯)
  13. সিয়েরালিয়ন – ২ লক্ষ (১৯৯১ – বর্তমান)
  14. আই এস – বাশার – ২.২ লক্ষ ( ২০১১ – চলছে)

এগুলো ছাড়া পাকিস্তানে রোজ বাচ্চাদের স্কুলে বোমা হামলা, এবং মুসলমানদের হাতে খ্রিস্টান ইহুদী বৌদ্ধ হিন্দুদের মৃত্যুর আরেকটি বড় পরিসংখ্যান দেয়া যেতে পারে। সেগুলো না হয় বাদই দিচ্ছি। উপরের সবগুলো যুদ্ধেই কোন না কোন ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো, চীন ইত্যাদি দেশগুলো জড়িত ছিল। ঠিক যেমনটা ছিল বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও। কিন্তু বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ইসলামপন্থীরা ভারত রাশিয়ার চক্রান্ত বলে চালাবার যত চেষ্টাই করুক না কেন, পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান দুই ভাইয়ের মধ্যে গণ্ডগোল লাগিয়ে দেয়ার কথা যতই বলুক না কেন, সত্যি হচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানের অপশাসনে অতিষ্ট হয়েই বাঙলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিল। আর হত্যার পেছনে দায়ী ছিল পাকিস্তানের ইসলামপন্থী সামরিক শাসকই।

সব সময় বলতে শুনি, সবই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ভারত ইসরাইল ইত্যাদির চক্রান্ত। কিন্তু অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের অস্ত্র বিক্রি করবে সব জায়গায়, সেটাই স্বাভাবিক। তারা দুই পক্ষের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করবে। কিন্তু যদি বলা হয়, দুই পাকিস্তান একসাথে সুখে শান্তিতে ছিল, ভারত মাঝখান দিয়ে ঢুকে চক্রান্ত করে দুই ভাইয়ের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়েছে, তা হবে ডাহা মিথ্যা কথা। যখন এই পশ্চিমা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করা হয়, তখন সব চাইতে বড় সত্য, পশ্চিম পাকিস্তানের গণহত্যা এবং তাদের অত্যাচারকে কৌশলে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাই করা হয়। যারা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করে, তারা আসলে অসৎ উদ্দেশ্যেই করে।

এসব নিহতদের প্রায় সকলেই মুসলমান। এছাড়া কোটি কোটি মুসলমান আহত হয়েছে, গৃহহীন উদ্বাস্তু হয়েছে, নারী এবং শিশুরা হয়েছে ধর্ষিত, লাঞ্ছিত। তাদের আর কোন ভবিষ্যৎ নেই, কোন আশা নেই। অনেকেই ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন, সুন্দর জীবনের আশায়। এই সকল হত্যাকান্ড,অপকর্ম কিন্তু মুসলমান মুসলমানদের সাথে করেছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের পর থেকে প্রায় দেড়কোটি মুসলমানদের হত্যা করা হয়, যার প্রায় ৮৫ ভাগই করেছে কোন না কোন মুসলিম শাসক, বা অন্য মুসলমানরা। শিয়ারা সুন্নিদের মেরেছে, সুন্নিরা শিয়াদের মেরেছে। আবার দুই পক্ষ মিলে মিশে আহমদিয়াদের মেরেছে। এ ওকে মেরেছে সে তাকে মেরেছে। এভাবেই চলে যাচ্ছে। বাঙলাদেশের মত দেশে প্রতি মাসেই হিন্দু বৌদ্ধ আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের কথা না হয় বাদই দিলাম, পাকিস্তানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার কথাও না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু মুসলমানদেরই আসলে কারা হত্যা করছে? কারা নির্যাতন করছে? মামদো ভুত?

এবারে ধরুন, গত এক’শ বছরে ইসলামের সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তি কে বা কারা? একটি লিস্ট করি।

  • সাইয়েদ কুতুব – আধুনিক ইসলামী সন্ত্রাসবাদের জনক। মুসলিম ব্রাদারহুড এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মিশরের ইসলামী আন্দোলনের প্রধান সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন দলের মুখপত্র ইখওয়ানুল মুসলিমিন’এর সম্পাদক ছিলেন। তাকে তৎকালীন সরকার ফাঁসির আদেশ দেয় এবং এভাবেই তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।

  • হাসান আল বান্না – ১৯৩০-এর শুরুতে হিটলার যখন জার্মানির ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন হাসান আল বান্নার সাথে নাৎসীদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি হিটলারকে ওয়াদা করেন এই বলে যে, জেনারেল রোমেলের প্যাঞ্জার ডিভিশন যখন কায়রো আর আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবেশ করবে, তখন ব্রিটিশ বাহিনী যাতে সম্পূর্ণ নির্মূল হয় তা মুসলিম ব্রাদারহুড নিশ্চিত করবে। তিনি হিটলারের মাইন কাম্ফ অনুবাদ করে আমার জিহাদ নামে সমগ্র মিশরে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

  • মাওলানা মওদুদী – জামাতে ইসেলামীর প্রতিষ্ঠাতা এবং আধুনিক ইসলামী সন্ত্রাসবাদের আরেকজন জনক। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (২৫ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ – ২২ সেপ্টেম্বের ১৯৭৯), যিনি মাওলানা মওদুদী, বা শাইখ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন মুসলিম গবেষক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিংশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। তিনি ছিলেন ২০ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম স্কলারদের মধ্যে একজন। তিনি ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ ব্যক্তি যাহার গায়েবানা জানাজার নামাজ কাবাতে পড়া হয়।

উপরে যাদের ছবি এবং নাম দিলাম, তারা আধুনিক ইসলামের সবচাইতে প্রখ্যাত আলেম, প্রখ্যাত ব্যাখ্যাকারী, প্রখ্যাত স্কলার। এরা প্রায় প্রতিটি লোকই সাজাপ্রাপ্ত আসামী, এমনকি, মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত খুনী। এদের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মুসলিম নির্যাতিত হয়েছে। প্রায়শই বলা হয়, ইসলামের পক্ষের লোকদের নাকি সবাই খালি নির্যাতন করে। আচ্ছা, এদের বিচার করে কী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে? নাকি এরা নির্যাতন করেছে লক্ষ কোটি মুসলিমকে? তাহলে ইসলামের শত্রু কে? কারা আসলে মুসলিমদের নির্যাতনের জন্য দায়ী?

ইহুদীরা? হিন্দুরা? খ্রিস্টানরা? ইউরোপ আমেরিকা? ইসরাইল?

নাকি খোদ আল্লাহ?

Facebook Comments