ছোট থেকে বড় হওয়ার গল্প

আমার জন্ম হয়েছে খুবই ধার্মিক একটু হিন্দু পরিবারে। আমার পিতা ছিলেন একজন কলেজ শিক্ষক এবং তিনি অনুকুল ঠাকুরের একজন বিরাট ভক্ত। ছোটবেলা থেকেই পরিবার থেকে শেখানো হত কখনো মিথ্যা বলবা ঠাকুর পাপ দেয়, কাউকে মারবা না ঠাকুর রাগ করে, কারো কোন জিনিষ না বলে নিবানা ঠাকুর পিট্টি দিবে।

যখন প্রশ্ন করতাম ঠাকুর কোথায় ? তখন অনুকুল ঠাকুরের সেই ছবি দেখায় দিয়ে বলা হল এই হল ঠাকুর , উনি আমাকে পিট্টি দিবে। কিন্তু উনি কিভাবে ছবি থেকে বের হয়ে এসে পিট্টি দিবে বুঝতাম না তখন , মনে ভয় ছিল বাবা মা যখন সাথে না থাকবে তখন যদি দেয়। একটু বড় হবার পরে থেকে দেখতাম আমার বাবা প্রতিদিন ২ টাকা ৫ টাকা করে একটা বস্কের ভেতর জমাচ্ছেন প্রতিদিনের প্রার্থনা শেষ করে। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম এইগুলি টাকা দিয়ে কি হবে ? তিনি বললেন এগুলি ঠাকুরের আশ্রমে পাঠানো হবে । পাঠালে ঠাকুর খুশি হবেন , উনি খুশি হলে আমাদের সবার ভাল করবেন।

কিছুদিন যাওয়ার পরে স্কুলে যখন হিন্দু ধর্মের বই পরে জানতে পারলাম ঈশ্বর নাকি নিরাকার তার নাকি কোন চেহারা নাই , তখন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা বাবা ঈশ্বর তো নিরাকার তাহলে অনুকুল ঠাকুর কে? উনি বললেন অনুকুল ঠাকুর ঈশ্বরের একটি রূপ । তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম তাহলে শিব, কালী, দূর্গা, ব্রক্ষ্মা , বিষ্ণু উনারা কে? বাবা বললেন উনারা ঈশ্বরের আগের রূপ , কিন্তু পরে ঈশ্বর অনুকুল ঠাকুরের রূপেও পৃথিবীতে আসছেন।

ছোট মানুষ আমি , তখন তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম উনার নাম আমাদের ক্লাসের হিন্দু ধর্ম বইয়ে নাই কেন? উনি কি আসল ভগবান না? উনি রেগে গিয়ে বললেন “হারামজাদা দূর হ এইখান থেকে” । সন্দেহের ব্যাপারটা আসলে জন্ম নেয় ওইখান থেকেই । পরবর্তি জীবনে অবশ্য প্রচুর বার আমি বাবার অনুকুল ঠাকুরের জন্য জমানো আমি আমার প্রয়োজনে চুরি করেছি , উনি আসেন নি উনার প্রাপ্য টাকার ভাগ আমার কাছের থেকে বুঝে নিতে , মারামারিও করলাম অনেক কিন্তু ছোটবেলায় স্যার আর বাবা মার হাতে ছাড়া কারো হাতে ঠ্যাংগানিও খাই নাই। মূল বিষয়টা হল ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারটা যে ভুয়া সেটা আমার বোঝা হয়ে যায় ১০-১২ বছরের ভেতরেই । পরে স্কুলে আরো কিছুদিন মানে প্রায় ১০ ম শ্রেনীতে উঠার পরে আমাদেরই কিছু মুসলমান বন্ধু তাবলিগ জামাত করে ফেরার পরে বেশ ধার্মিক হয়ে যায় আর ওরা জানায় যে ঈশ্বর আছে । সেই ঈশ্বরের নাম আসলে আল্লাহ । তিনি খুবই দয়াবান , যারা মুসলমান হবে তাদের জন্য উনি প্রচুর আনন্দের ব্যবস্থা রেখেছেন মৃত্যুর পরে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম দোস্ত কি কি দেবেন আল্লাহ মৃত্যুর পরে ? ওরা বলল অনেক কিছু , তোকে সেবা করার জন্য ৭২ টা হুর পাবি, খাবার পাবি, সরবত পাবি। আমি জিজ্ঞেস করলাম হুর কি জিনিষ ? ওরা বলল হুর হল খুবই সুন্দর মেয়ে যারা জান্নাতে থাকে , ওদের সাথে অনেক সেক্স করতে পারবি। শুনে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল , কারন ঐ সময় আমার টিন এজ ক্রাস হিসাবে এক মেয়ে ছিল , ওর জন্য খারাপ লাগল। আমি এত গুলা মেয়ের সাথে থাকব , ও মনে অনেক কষ্ঠ পাবে, রাগ হবে। কারণ আমি যখন ওকে অন্য কোন ছেলের সাথে একটু হেসে কথা বলতে দেখতাম ,ঐদিন আমার মেজাজটাই খিচ খায়ে থাকত সারাদিন।

আমি জিজ্ঞেস করছিলাম আল্লা দেখতে কেমন , ওরা বলল তার চেহারা অনেক সুন্দর কিন্তু তা বর্ণনা দেয়ার মত না । আমি জিজ্ঞেস করলাম উনার কি কোন ছবি টবি আছে , তারা বলল না উনার কোন ছবি হয় না ,উনি নিরাকার। উনার কোন রূপ নাই, উনার মূর্তি পূজা করাও লাগে না।মূর্তি পূজা যে একটা হাস্যকর কন্সেপ্ট এও অনেক আগেই আমার বোঝা সারা হয়ে গেছিল। ব্যাপারটা আমার ভাল লেগে যায়। এছাড়াও ছোট বেলায় মহাভারত, রামায়ন, বেদ ইত্যাদি পরে হিন্দু ধর্মের জাত, পাতের ব্যাপারটা আমি জানতাম। হিন্দু ধর্মে যে ব্রাক্ষ্মন বাদে অন্য জাতকে ছোট করে দেখা হয় এবং অন্য ধর্মের ব্যক্তিদের নিকৃষ্ট প্রানী বলা আছে তাও জানতাম । ব্যাপারগুলা আমার ছোট বেলা থেকেই পছন্দের ব্যাপার ছিল।

অন্যদিকে ইসলামে কোন জাত পাতই নাই। সব মিলায়ে ইসলাম আমার কাছে খুবই ভাল লাগল। কিছুদিন পরে দেখলাম আমার ওই বন্ধু গুলা কেমন জানি হয়ে গেছে , আর আগের মত খেলাধুলা করে না । হিন্দু ছেলেদের কেমন জানি এড়ায় চলে। একদিন দেখা হলে জিজ্ঞেস করলাম একজনকে কিরে বন্ধু খেলতে আসিস না ক্যান, কই থাকিস , রাস্তায় দেখা হলেও কথা বলিস না ক্যান , কি হইছে ক? সে যা বলল তার মোটামুটি মানে দাঁড়ায় খেলাধুলা করা খারাপ, হিন্দুদের সাথে মেশাও খারাপ তাই আগের মত আর মিশি না তোদের সাথে। সাথে এও বলল দোস্ত তুই মুসলমান হয়ে যা আবার আমরা ভাল বন্ধু হয়ে যাব। আমি বললাম আমরা তো এখনও ভাল বন্ধু। ওরা বলল না , একজন মুসলমান আর অমুসলমান কোনদিন ও বন্ধু হতে পারে না।

শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম, যে কারনে আমি হিন্দু ধর্ম পছন্দ করতে পারছিলাম না । ঠিক একই কারন দেখি এখানে ও আছে। পরবর্তিতে বাংলা কোরান পড়ার ভাগ্য আমার হয় । তার পরে যা বুঝলাম এটা মোটামুটি হিন্দু ধর্মের কাছাকাছিই একটা ব্যাপার খালি মূর্তি পূজার ব্যাপারটাই নাই । তবে এখানে একজন ব্যক্তিকে প্রচুর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে , সে যা যা করে গেছে তার বন্ধু এবং শত্রুদের সাথে আর তার প্রতিদিনের জীবন যেমন ছিল সেভাবে জীবন কাটাতে বলা হয়েছে। ওইভাবে যদি জীবন কাটানো যায় , তাহলে শ্বর্গ নিশ্চিত। ব্যাপারটা মূর্তি পূজা না হলেও অনেকটা একজন ব্যক্তির ভাবমূর্তি পূজা করার মত । ওই ব্যক্তির ভাবমূর্তি পূজা করলে ঈশ্বর বা আল্লার করুনা পাওয়া যায়। সব দেখে শুনে মনে মনে বললাম মাফ চাই। বিজ্ঞান আর ইতিহাস আমার প্রিয় সাব্জেক্ট আগে থেকেই ছিল , এসবের সাথে ধর্মগ্রন্থের সাংঘসিক ব্যাপার গুলা আগে থেকেই জানা ছিল। সব মিলায়ে এইসব ধার্মিক ব্যাপার থেকে দূরে থাকাটাই নিজের পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করলাম। আসিফ ভাই আপনি অসাধারন , হুমায়ুন আজাদ স্যারের পরে এত শক্তিশালী লেখনি আর যৌক্তিক চিন্তার মানুষ বাংলাদেশের ভেতর আমি পাই নি। ধন্যবাদ আমার নিজের চিন্তাধারা শেয়ার করার সুযোগ দেয়ার জন্য।

লেখকঃ নলিনি রঞ্জন

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: