লাশের রাজনীতি এবং পৃথিবীর মানুষ

(লিখতে বসেছিলাম যুক্তিসমৃদ্ধ লেখা,মাথায় ঘুরছে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক লেখা।দেখি,একে যুক্তির আলোয় আনতে পারি কিনা)

বাংলা রাজনীতি আর ইংরেজী পলিটিকস এর মানে কি? ইন্টারনেট ঘেটে জানলাম,নানা মুনির নানা মত।মোটামুটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা হলঃ দেখভাল করার জন্য পদাধিকার অর্জন এবং তার প্রয়োগ (achieving & exercising positions of governance) দেখভাল করা বা governance মানে হলঃ কোন মানবগোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রের উপর সম্মিলিত উপায়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা(organized control over human community or particular state)।এগুলো হল বইয়ের কথা।এবার কিছু বাস্তবতা দেখা যাক।

পৃথিবীতে সবকালে,সব দেশেই কোন না কোন উপায়ের রাজনীতি চালু ছিল।কিছু নিয়মকানুন ছিল।আর সেসব রাজনীতির, নিয়মের যেগুলোর কারণে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে,সেগুলো উত্তম সভ্যতা বলে বিবেচিত হয়েছে।রাষ্ট্রের নীতি কিংবা নিয়ম এবং তার রাজনৈতিক ধারা, তার অর্থনীতি, মূল্যবোধ ইত্যাদী নিয়ন্ত্রণ করেছে। ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যাবে,সব মানুষ একত্রিত হয়ে এই নিয়মগুলো তৈরী করে নি।এটা সম্ভবও না।বেশীরভাগ সময়,সমাজের অল্পকিছু মানুষ একত্রিত হয়ে এসব নিয়ম তৈরী করে,বাকিরা সেটা গ্রহণ অথবা বর্জন করে।এক্ষেত্র,সেই অল্পকিছু মানুষের শিক্ষা, দূরদর্শীতার গভীরতা আর মূল্যবোধকেই বাকিরা মেনে নেয়। সমস্যা তখনই দেখা দেয়,যখন কোন ব্যক্তি সেইসব প্রচলিত নিয়মের সংস্কার চায়।চ্যালেঞ্জ করে।বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই,এধরণের লোকেরা সেই আইন তৈরীকারীদের শ্রেণীর লোক হয় না।তখন,আইন প্রণেতা শ্রেণী তাদের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুন রক্ষার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে।প্রথমে তারা বুঝিয়ে সুজিয়ে, লোভ দেখিয়ে,ওই চ্যালেঞ্জকারীকে নিজেদের শ্রেণীভুক্ত করে নিতে চায়।এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র ভয়,লোভ।কিন্তু যখন তারা সেটা পারে না,তখনই তারা নিজেদের সুন্দর মুখোশ খুলে ফেলে এবং চ্যালেঞ্জকারীকে সময় সুযোগ মতো দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়,লাশ বানিয়ে দেয়।অর্থ্যাৎ কিনা,প্রচলিত নিয়মকানুনের বিরোধিতা করলে,হয় তাকে বশে নিতে হবে,নয়তো সরিয়ে দিতে হবে!!!এই ঘটনার সত্যতা যে কোন আন্দোলনের,সংস্কারের ইতিহাস পড়লেই পাওয়া যাবে।প্রশ্ন হল,কেন???

কারণটা স্পষ্ট।আইন প্রণেতা দের ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বেশীরভাগসময়েই,আইনগুলো নিজেদের ভোগ বিলাসের স্বার্থে করে থাকে।তাদের উদ্দেশ্য,নিজেদের সম্পদ বাড়ানো,ভোগ বিলাস বাড়ানো।প্রমাণ চান??পৃথিবীর ইতিহাস দেখুন।সবকালে,সব দেশে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর কাছে অধিকাংশ সম্পদের অধিকার ছিল।এখনও আছে।the guardian ১৫/১/২০১৭ তারিখে একটি প্রতিবেদন করে,যে ৮ ব্যক্তির হাতে,পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ!এরচেয়ে যেটা ভয়ংকর,সেটা হল এই আট জনের বাইরেও ৫০০ জনের মত বিলিয়নিয়ার আছেন(সঠিক সংখ্যা গুগল সার্চেই পেয়ে যাবেন)।তাহলে সাধারণের হাতে কি থাকল????প্রকৃত পরিসংখ্যান,আরো ভয়ংকর হবে বলেই আমার ধারণা।

এবার,বাংলাদেশের কথায় আসি।গত এক যুগে বাংলাদেশ নামক দেশে বেশ কিছু মানুষ ধর্ম,সমাজ,সংস্কৃতির সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে অকালে প্রাণ দিয়েছেন।এদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।কেউ ছিলেন প্রবাসী বিজ্ঞানী।কেউ ছিলেন বিজ্ঞানভিত্তিক লেখক।একজনও রাজনৈতিক ছিলেন না।সমাজে তারা প্রথাবিরোধী হিসাবে পরিচিত ছিলেন।অনেকেই আহত হয়েছেন,দেশ ছেড়েছেন।গত একযুগে,এগুলো বেশী পরিমাণে ঘটেছে,যেটা আগে সংখ্যায় অনেক কম ছিল।

বাংলাদেশ উন্নতবিশ্বের দেশ না।কোন নেতৃত্বপ্রদাণকারী দেশ না।এর নাগরিকেরা যতই দাবী করুক,এদেশ সোনার দেশ।বাস্তবতা হল,এদেশের মাটির তলায় সোনাও নেই,প্লাটিনামও নেই।তেল সম্পদ প্রশ্নবিদ্ধ।গ্যাস আছে,পরিমাণ অপ্রতুল।অর্থাৎ, প্রকৃতিপ্রদত্ত কোন সম্পদে এদেশ পূর্ণ নয়।তাই,উন্নত দেশগুলোর কাছে এদেশ খুব একটা গুরুত্ব রাখে না।তার উপরে মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা বড় সমস্যা।তাও,জনসংখ্যার আধিক্য,বাজার অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র গুরুত্ব বহন করে।

এই সব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন একটি দেশেও সংস্কারের চিন্তা করতে গিয়ে কিছু মানুষ লাশ হয়ে গেছে।তারা বলতে চেয়েছিল,সম্পদ যেহেতু কিছুই নেই,বুদ্ধি বাড়াও।বিজ্ঞান চর্চা কর।চিন্তার স্বাধীনতা দাও।তুচ্ছ সম্পদের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার করে উন্নত হও।সমাজে জ্ঞান বিজ্ঞান মুক্ত কর।নাহলে এগুনো যাবে না।বর্তমান বিশ্বে এরকম উদাহরণ আছে।তাদের দেখে হলেও শিখ।

এই তত্ত্বের প্রয়োগ করতে গিয়েই শুরু হল খেলা।শাসকগোষ্ঠী বোঝে শুধুই অর্থ,ভোগ,বিলাস।এখন অর্থ আসছে দাতা দেশের ভিক্ষা থেকে।সেটা দিয়ে এসব চলছে।এসব আন্দোলন শুরু হলে সেসব বন্ধ হয়ে যেতে পারে।তার চেয়ে বড় কথা,তাদের যেই শাসন পদ্ধতি,তাতে শিক্ষিত মানুষ পেলেই সমস্যা।মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যাকে তারা অশিক্ষিত রেখে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখে।চিন্তার স্বাধীনতা আসলে সেটা সম্ভব হবে না।

ধনী দেশগুলোও ততটুকু ভিক্ষা দিচ্ছে,যতটুকু দিলে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হবে।এভাবে কৌশলে ধনী দেশের সাধারণ নাগরিকের অর্থ প্রথমে তৃতীয়বিশ্বে পার হবে,পরে জমা হবে এলিটগোষ্ঠীর হাতে।টাকাটা ঘুরবে,কাউকে দিতেও হবে না,নিয়ন্ত্রণও থাকবে।

বাংলাদেশের এলিট গোষ্ঠী সে লাভের বখরা পাবে।ভোগ বিলাস চালিয়ে যাবে।অধিকাংশের চাহিদা পূরণ করতে গেলে তো সময় লাগবে,বিজ্ঞানের অগ্রগতি একদিনে তো আর হয় না!জানার কোন শেষ নাই,জানার চেষ্টা বৃথা তাই!!

তাই,বাংলাদেশের মত অর্থহীন দেশে বেকুব কিছু মানুষ সম্মানজনক ভাবে বাচার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারাল।তাদের নিষ্ঠুরভাবে খুন করা হল।ধর্মকে ব্যবহার করা হল সবচেয়ে বেশী।কারণ,অন্ধ মানুষকে পরকাল দেখিয়ে বশ করা অনেক সহজ।আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই,এদেশের ৯৯% মানুষ জেনে কিংবা না জেনে সেইসব হত্যাকে সমর্থন দিয়েছেন।এটা তাদের ভুল হয়েছে।অবশ্যই ভুল হয়েছে।এই ভুলের ক্ষমা নেই।ইতিহাসে,ভিক্ষুকরা অাস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হয়েছে।যাদের নির্দেশে কিংবা সমর্থনে এসব হত্যকান্ড ঘটেছে,তাদের শেষটাও হবে নিজেদের তৈরী ফ্রাঙ্কেস্টাইনের হাতে।এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।তাতে হয়তো আরো খারাপ একটা শাসক শ্রেণী তৈরী হবে।তবে ঘটনা একই রকম থাকবে।ইতিহাস তাদের মনে রাখবে পিতার কাছে সন্তানের লাশ উপহার দেয়ার জন্য।স্ত্রীকে স্বামীহারা করার জন্য।সন্তানদের পিতৃহারা করার জন্য।

আমি আবেগী হয়ে কথাগুলো বলছি না।একথাগুলো ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত।যুক্তি দিয়েও প্রমাণ করতে পারব।অসংখ্য উদাহরণ আছে।

কিন্তু,এখন আমি সেটা করব না।আঘাত বাস্তবতার শিক্ষা দেয়।একদল মানুষের সেই শিক্ষার প্রয়োজন হয়েছে।আমার মত অভাগাদের যখন শিক্ষা হয়েছে!তাদেরও হওয়া উচিৎ। ততদিন,এই কলম অন্য কিছু লেখুক।

 

লেখকঃ কায়েস আলী 

Facebook Comments