ধর্ম মানুষকে সভ্য, ভদ্র এবং সৎ করে?

ছোটবেলা থেকে একটি কথা বারবার শুনে এসেছি। কথাটি হচ্ছে, হোক না ধর্মীয় অনেক গল্প কাহিনী মিথ্যা। তাও তো ধর্ম মানুষকে দোজখে শাস্তির ভয় দেখিয়ে পাপ থেকে বিরত রাখছে। অন্তত আল্লাহর ভয়ে তো অনেকেই খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকছে। তাহলে ধর্মের কিছু উপযোগিতা তো রয়েছেই। তাই মূর্খ মানুষকে সুপথে রাখার জন্যেও ধর্মের কিছু দরকার আছে। এরকম কথা আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবীরাও মনে করেন।

ছোটবেলা আমাদের স্কুলে শিক্ষকেরা খুব পেটাত। মাঝে মাঝে এমন পেটাত যে, জ্বর চলে আসতো। আমরা আমাদের গণিত শিক্ষককে বাঘের চাইতে বেশী ভয় পেতাম। তার ভয়ে জোর করে পড়া করতাম। কিন্তু সেই পড়া আসলে মাথায় ঢুকতো না। বিষয়টি সেই সময়ে বুঝতাম না, এখন বুঝছি। ইউরোপে শিশুদের গায়ে হাত দেয়া কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। শিক্ষক তো দূরের কথা, কোন বাবা মাও যদি শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করে, শিশুরা পুলিশে ফোন করতে পারে। পুলিশ এসে বাবা মাকে ধরেও নিয়ে যাবে। এরকম মাঝে মাঝেই ঘটে। বিশেষ করে তুরস্ক বংশোদ্ভূত জার্মানদের বেলায়। জার্মান ছেলেমেয়েদের তো এত কঠিন শাস্তির ভয় নেই। তাহলে তারা কী সবাই মদ গাজা খেয়ে ন্যাংটো হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে? নাকি তারা তাদের স্বাধীনতা উপভোগ করছে? আমরা তো ভাবতাম, এরকম হলে আমাদের সব ছেলেমেয়ে খুন খারাবী শুরু করে দেবে। তাদের মধ্যে থেকে এত পরিশ্রমী, মেধাবী ছেলেমেয়ে বেরুচ্ছে কীভাবে? মারপিটের ভয় ছাড়াই? আসলেই কী তাহলে আমাদের পুরনো ধারণাগুলো ঠিক ছিল? ভয়ঙ্কর শাস্তির ভয় কী আসলেই মানুষকে সৎ এবং শুদ্ধ করে তোলে?

আসলেই কী ধর্ম মানুষকে পাপ বা অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারছে? বিষয়টি বিশ্বাস না করে ফ্যাক্ট সহকারে এনালাইসিস করে দেখা দরকার।  আমরা খুব ভালভাবেই জানি, আধুনিক বিশ্বে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান বা ইহুদী ধর্ম অনেকটাই সংস্কার হয়ে যাওয়ার কারণে এই ধর্মের মানুষের মধ্যে খুব বেশি ধর্ম ভাব দেখা যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেলেও, সবচাইতে বেশি দেখা যায় মুসলমানদের মধ্যেই। মুসলমানরাই ধর্ম বিষয়ে আধুনিক পৃথিবীতে সর্বাধিক অন্ধ, সর্বাধিক অনুভূতিপ্রবণ।  গত ৩০ দিনে পৃথিবীব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে দেশের হুমকির সূচক (সিটিআই) শীর্ষক একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকাটি হচ্ছে সব চাইতে ভয়ংকর রাষ্ট্রের তালিকা। যে সব দেশে বসবাস করা যে কোন মানুষের জন্যেই আতঙ্কের।

তালিকায় সবার ওপরে উঠে আসায় সবচেয়ে ভয়ংকর রাষ্ট্র হয়েছে ইরাক। শীর্ষ ১০টি ভয়ংকর রাষ্ট্রের তালিকা হচ্ছে-
১) ইরাক (৯৭% মুসলিম)
২) নাইজেরিয়া (৫৯.৭ মুসলিম, ৪০.৩% খ্রিষ্টান) ,
৩) সোমালিয়া (৯৯.৮% মুসলিম),
৪) আফগানিস্তান (৯৯% মুসলিম),
৫) ইয়েমেন (৯৯% মুসলিম),
৬) সিরিয়া (৯০% মুসলিম) ,
৭) লিবিয়া (৯৭% মুসলিম),
৮) পাকিস্তান (৯৮% মুসলিম),
৯) মিসর ( ৯০% মুসলিম)
১০) কেনিয়া (৮২.৫% খ্রিষ্টান, ১১.১ মুসলিম) ।

উপরের সবগুলো দেশেই দুর্নীতির মাত্রা ব্যাপক, প্রায় দেশগুলোই দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানে রয়েছে। এসব দেশে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে প্রতিদিন। নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, সমকামী, এরা কেউই সাধারণ মানবিক অধিকারটুকু ভোগ করেন না। অনেকগুলো দেশেই নাস্তিকদের প্রকাশ্যে হত্যার উদাহরণ রয়েছে, নারীদের প্রকাশ্যে পাথর মারার উদাহরণ হয়েছে, সমকামীদের গাছে ঝুলিয়ে হত্যার উদাহরণ রয়েছে। এমনকি একই ধর্মের মধ্যেও ভয়াবহ যুদ্ধ, হত্যা, বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। মেয়েদের স্কুলে বোমা মারা থেকে শুরু করে বিধর্মীদের হত্যা করে তাদের স্ত্রী কন্যাকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ অসংখ্য। মেয়েরা ধর্ষিত হলেও ভয়ে তা গোপন করে, সেগুলো প্রকাশ করতে চায় না। কারণ ঘটনা জানাজানি হলে শরীয়া আইনে তাদের ওপরেই শাস্তি প্রয়োগের ঘটনা অসংখ্য। সামাজিক অসম্মানের বিষয় তো রয়েছেই। সমাজ ধর্ষিতাদেরই খারাপ চোখে দেখে। এই লিস্টে সুদান, কঙ্গো এবং সৌদি আরবও যুক্ত হতে পারে। সৌদি আরব, ইরান সহ কয়েকটি দেশে প্রকাশ্যে অন্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্রীয়ভাবেই নানান বাধা দেয়া হয়। প্রতিটি শিক্ষিত সভ্য মানুষ জানেন, এইসমস্ত দেশে মানবাধিকারের কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। ৯০ ভাগ মুসলমানের বাঙলাদেশ আসলে ৯০ ভাগ দুর্নীতিবাজ, অসৎ, ভণ্ড, বর্বর মানুষের দেশ।

অপরদিকে পৃথিবীর শীর্ষ নাস্তিক অধ্যুষিত দেশগুলো হচ্ছে,

১) সুইডেন ৮৫%
২) ভিয়েতনাম ৮১%
৩) ডেনমার্ক ৮০%
৪) জাপান ৭৬%
৫) নরওয়ে ৭২%
৬) চেক রিপাবলিক ৬১%
৭) ফিনল্যান্ড ৬০%
৮) ফ্রান্স ৫৪%
৯) জার্মানি ৪৯%
১০) হাঙ্গেরি ৪৮%

উপরের দেশগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী, আদিবাসী, সমকামীরা সামান্য কিছু উদাহরণ বাদ দিলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সমান অধিকার ভোগ করেন। এই সকল দেশে যে সকল মুসলমান বসবাস করেন, তারা মুসলিম হবার কারণে কোন নির্যাতনের শিকার হন না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এসব দেশেও ঘটে, ধর্ষণ থেকে শুরু করে ধর্মীয় বিভেদ ও বর্ণবাদের প্রভাব এসব দেশেও রয়েছে, তবে তার বিরুদ্ধে বেশিরভাগ মানুষই সোচ্চার। অন্তত আইনগতভাবে বেশিরভাগ দেশই ধর্ম নিরপেক্ষ এবং সকলের সমান অধিকারে বিশ্বাসী। এসব রাষ্ট্রগুলো সকল ধর্মের মানুষকে সমান মর্যাদা ও অধিকার দিতে বাধ্য। কোন নাস্তিক এসব দেশে কোন ধার্মিকের চাইতে বিন্দুমাত্র বেশি অধিকার ভোগ করে না। ধার্মিক হবার কারণে কাউকে হত্যা করার উদাহরণ পাওয়া যায় না, ধার্মিকদের বিরুদ্ধে কোন ব্লাসফেমি আইনও নেই। বরঞ্চ অনেকগুলো দেশে নাস্তিকদের ট্যাক্সের টাকায় ধার্মিকগণ তাদের ধর্ম পালন ও ধর্মপ্রচার করে থাকেন।

শুধু তাই নয়, উপরের অনেকগুলো দেশে পর্যাপ্ত অপরাধী না পাওয়ার জন্য ধীরে ধীরে জেলখানাগুলো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। নেদারল্যান্ড, যেই দেশে গাজা আইনত সিদ্ধ, সেখানে জেলখানা ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুইডেনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জেলখানা, কারণ? আসামীর সংকট। উপরের নাস্তিক অধ্যুষিত দেশগুলোতে প্রতি বছর সর্বাধিক পরিমাণ মুসলমান পাড়ি জমায়। কারণ এসব দেশে রয়েছে সমান অধিকার এবং সুযোগ। অন্যদিকে, সবচাইতে ভাল মুসলমানটি ঘোরতর দুঃস্বপ্নেও শরিয়া অধ্যুষিত কোন দেশে পরিবার নিয়ে যেতে চাইবে না। কারণ সেসব দেশ ভয়াবহ। সেই সব দেশের বেশিরভাগ মানুষই ধর্মান্ধ।

সত্য হচ্ছে, ধর্ম মানুষকে কখনই পাপ কিংবা অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে না। কাল্পনিক লোভ কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনে যদি কাজ হতো, তাহলে ধর্মান্ধ মুসলমানদের দেশগুলো হতো সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ। অন্যদিকে, জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা, প্রগতি, মানবাধিকার, সকলের সমান অধিকার বিষয়ক সেক্যুলার মানবিক চিন্তা ভাবনাই মানুষকে সৎ, এবং মননশীল করে তোলে।

Facebook Comments