ইসলামী জিহাদ কী স্বাধীনতা সংগ্রাম?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া জার্মানিকে চারভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। একভাগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে, একভাগ রাশিয়ার, একভাগ ব্রিটেনের এবং আরেকভাগ ফ্রান্সের। বার্লিনকে সে সময়ে চারভাগ করা হয়, যেহেতু বার্লিন ছিল মাঝামাঝি জায়গায়। এই চারভাগে তিন মিত্র বাহিনী এবং রাশিয়া ভাগাভাগি করে শাসন চালায়। অসংখ্য অত্যাচারের ঘটনাও ঘটেছে সে সময়ে। বিশেষ করে রাশিয়ানদের অত্যাচারের ঘটনাগুলো ছিল ভয়াবহ রকমের।

এই পর্যন্ত যাদের সাথে আলাপ করেছি, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা তার পরবর্তী সময়ে জীবিত ছিলেন, তাদের বেশিরভাগই জানিয়েছেন, এই চারভাগের মধ্যে রাশিয়ানদের নির্যাতন ছিল বর্ণনাতীত। ব্যক্তিগতভাবে রাশিয়ান আর্মি দ্বারা গণধর্ষণের শিকার এক ভদ্রমহিলার সাথেও আলাপ হয়েছে। তিনি বলেছেন রাশিয়ান আর্মির অত্যাচারের কথা। তার স্বামীকে হত্যা করে একজন একজন করে রাশিয়ান সৈনিক তাকে দিনের পর দিন কীভাবে ধর্ষণ করেছে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন তিনি। ব্রিটেনের অংশের এক সাবেক নাৎসি সৈনিকের দেখা পেয়েছিলাম এখানে আসার পরে, যিনি গত চারমাস আগে মারা গেছেন। তিনি শেষবার দেখা হওয়ার সময় স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন ব্রিটেনের একটা দ্বীপের কারাগারে চারবছর যুদ্ধবন্দী হিসেবে কাটাবার কথা। তিনি কোন অভিযোগ করেন নি, বলেছেন নাৎসিরা যেই অত্যাচার করেছে তার তুলনায় ব্রিটেনে আমাদের প্রায় রাজকীয় সম্মানই দেয়া হয়েছিল। এতটা আমরা আশা করি নি। আমরা ভেবেছিলাম আমাদের নিয়েই জবাই করে ফেলবে। আমাদের দিয়ে ক্ষেত খামারে কাজ করিয়েছে, যাওয়ার আগে আবার সেসব কাজের বেতনও দিয়েছে। ভদ্রলোক নাৎসি বাহিনীর ছিলেন, আমার দেখা উনিই একমাত্র সরাসরি নাৎসি যোদ্ধা। ভদ্রলোকের সাথে আবার দেখা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি মারা গেলেন। আমার অনেক প্রশ্ন ছিল, অনেক কিছু জানার ছিল। উনার স্মৃতিশক্তি ভাল ছিল না, কিন্তু তারপরেও টুকটাক জবাব দিতেন।

ব্যক্তিগতভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমার অন্যতম প্রিয় বিষয়, এই বিষয়ে পড়তে এবং যারা জীবিত ছিলেন তাদের মুখ থেকে সরাসরি বর্ণনা শুনতে আমার ভাল লাগে। সে সময়ে ইহুদীদের ওপর কেমন নির্যাতন হয়েছিল, তাদের প্রতিটা ঘটনা আমার জন্য খুবই আগ্রহ উদ্দীপক। এখানে আসার পরে আমার সব চাইতে আগ্রহের কাজ ছিল এখানকার ইহুদীদের সাথে আলাপ করা। তবে সেই সাথে, জাপানে সে সময়ে কেমন মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, এই বিষয়ে আমার তেমন পড়া হয় নি। মিত্রবাহিনীর হাতে জাপানের পতনের আগে জাপানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল, সেটাও আমার জন্য আগ্রহের। একসময়ে সময় নিয়ে এগুলো সম্পর্কে জানবো। পড়বো অবশ্যই।

কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, জার্মানি, জাপান, এই দুই দেশেই, যেই দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেন সহ মিত্র বাহিনী আক্রমণ করে প্রায় ধ্বংস করে ফেলে, তছনছ করে দেয়, এই দুটো দেশই বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। অন্যতম সফল দেশ। তাদের অর্থনীতি মজবুত, তাদের দক্ষতা এবং মেধা সীমাহীন। তারা পরিশ্রমী, তারা অন্যকে দোষারোপ করার চাইতে কাজে বেশি আস্থা রাখে।

সেই সাথে ভিয়েতনাম। তাদের শিক্ষার হার হিংসে করার মত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী সেখানে কম তাণ্ডব চালায় নি। অসংখ্য হত্যা নির্যাতনের সাক্ষী ভিয়েতনাম। কিন্তু তারা সেই পুরনো প্যাঁচালে হায় হায় করে দিনরাত পার করে দেয় নি। তারা কাজ করেছে। এখন উন্নতি করছে। কয়েকজন ভিয়েতনামী বন্ধু আছে, তারা কীরকম পরিশ্রমী দেখলে অবাক হতে হয়। তারা সফল হবে, এতে অবাক হবার কিছু নেই।

সবসময়ই শুনি, মুসলমানরা নাকি সারা পৃথিবীতে খুবই নির্যাতিত। এই সীমাহীন নির্যাতনের কারণেই নাকি আজকের এইসব আল কায়েদা, বোকো হারাম, আইসিসের জন্ম হয়েছে। কই, এইসব দেশে কোন আল কায়েদা তৈরি হয় নি। আইসিস, বোকো হারাম কিংবা হামাস নেই, কোন জিহাদি সংগঠন নেই। সাম্রাজ্যবাদকে দোষারোপ করে এরা বসে থাকে নি। এরা নিজের মেধা যোগ্যতা কর্মক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এখন উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে পাকিস্তান, সৌদি আরব, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন সহ সমস্ত ইসলামিক দেশগুলোই সর্বত্র ইহুদী ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত তত্ত্ব আবিষ্কারে সদা ব্যস্ত। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য অন্যকে দোষারোপ করার এই মানসিকতা খুবই ভয়াবহ বিষয়।

এই পর্যন্ত যতগুলো মুসলিম প্রধান বা ইসলামিক দেশের লোকজনার সাথে পরিচয় হয়েছে, প্রায় সকলেই নিজেদের সমস্ত কিছুর জন্য ইউরোপ আমেরিকাকে দোষারোপ করতে দেখেছি। সবকিছু নাকি ইসরাইলের ষড়যন্ত্র! আর সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলা করার জন্য তাদের শিক্ষা নেই, শিক্ষার আগ্রহ নেই, মেধা নেই, যোগ্যতা নেই, পরিশ্রমও নেই। অন্যদিকে দেখুন, জার্মানির মত দেশ, জাপানের মত দেশ, ভিয়েতনামের মত দেশগুলো। এখন কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে গেছে? তারা কী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী বাহিনী তৈরি করে ট্রেনে বাসে টাওয়ারে বোমা মেরেছে?

যদি সাম্রাজ্যবাদই ইসলামী সন্ত্রাসবাদের একমাত্র কারণ হতো, তাহলে জার্মানি, জাপান আর ভিয়েতনামের হওয়ার কথা ছিল সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী দেশ। তারা পৃথিবীর অন্যতম সভ্য, শিক্ষিত এবং উন্নত জাতি হিসেবে এখন গণ্য হয়। আর মুসলমানদের দেশগুলোর কী অবস্থা? সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর অস্ত্র ব্যবসা আর বিভিন্ন পলিসি অবশ্যই অত্যন্ত বাজে, সেটা কেউই অস্বীকার করছে না। কিন্তু তার সাথে লড়াই করার পদ্ধতি কোনটা? উন্নত শিক্ষা, প্রযুক্তি আর জ্ঞান, নাকি মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক এবং বর্বর কেতাব কোরান এবং জিহাদ?

আর বাঙলাদেশে যে প্রতিদিন হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে, বৌদ্ধ আর আদিবাসী নির্যাতন হচ্ছে কারা করছে? নাস্তিকদের জবাই করা হচ্ছে, আহমদীয়াদের, শিয়াদের ওপর বোমা মারা হচ্ছে। বাঙলাদেশের মুসলমানরা কী হিন্দু আর আদিবাসীদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে এরকম করছে? এটা কী বাঙালি মুসলিমদের ওপর সীমাহীন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ? সংখ্যাগুরু হোক কিংবা সংখ্যালঘু, সব দেশেই তো মুসলিমরা কোপাকুপি করছে। এই সেদিনই ভারতের মত হিন্দু প্রধান দেশে এক মোল্লা সোনু নিগমের আক্রমণ করার পুরষ্কার ঘোষণা করলেন। তারা এতই নির্যাতিত হয়ে থাকলে এরকম ঘোষণা দেয়ার সাহস সে কীভাবে পেলো? বাঙলাদেশে ডেইলি যেখানে ওয়াজ মাহফিলে হিন্দুধর্ম নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা হয়, বাঙলাদেশে একজন হিন্দু কি এরকম ঘোষণা দিতে পারবে? কোন মোল্লার বিরুদ্ধে এরকম পুরষ্কার ঘোষণা করতে পারবে? এত সাহস হবে তাদের? সন্ত্রাসের এই সাহস শুধু মুসলমানরা কোথায় পাচ্ছে?

Facebook Comments
%d bloggers like this: