প্যালেস্টাইনে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের প্রতিবাদ করার অধিকার আপনার আছে কী?

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। ২০১২ সালে এই নিয়ে অনেকবারই লিখেছি, কিন্তু এরপরেও বারবার বলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে আমি নাকি ‘যথেষ্ট’ পরিমাণ লিখি নি। যারা বলছেন, তাদের প্রফাইলে ঢুকলেই দেখতে পাচ্ছি, হিন্দুদের মালাউন বলে গালাগালি করে তাদের দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পরামর্শ তারা দিয়েছেন। কিংবা আদিবাসীদের সমূলে নিধন করতে আর্মিদের উষ্কে দিচ্ছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ হিসেবে দেশের বৌদ্ধদের জবাই করার প্রত্যয়ও তারা ব্যক্ত করেছেন। সেই সাথে, নানা দেশের ছবি সংগ্রহ করে সেগুলোকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ছবি বলে ফেইসবুকে প্রচার করছেন।

তাই বলে কি আমি রোহিঙ্গাদের ওপর আক্রমণের সমর্থন করছি? না, তা তো করছি না। কিন্তু শুধুমাত্র প্যালেস্টাইনে কিংবা ভারতে কিংবা মিয়ানমারে মুসলিমের ওপর নির্যাতন হলে যেই হাহাকার শুনি, যেই কান্নাকাটি শুনি, সেই একই কান্নাকাটি হাহাকার হ্যাশট্যাগ অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখতে চাই। চাকমা মারমা সাওতালদের ওপর যখন বাঙালি সেটেলার মুসলমান আক্রমণ করে, বৌদ্ধ হিন্দুদের ওপর যখন পাশবিক নির্যাতন চালায়, এই বাঙলাদেশেই, সেসব ফেলে যখন প্যালেস্টাইনের মুসলিমদের নিয়ে দিনের পর দিন হ্যাশ ট্যাগ দেখি, কাশ্মীরের মুসলিমদের জন্য উচ্চস্বরে কান্নাকাটি শুনি, তখন অবাক হই। নিজের দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন করে এরা কাশ্মীর বা প্যালেস্টাইনের লোকদের নিয়ে এরকম মেতে থাকে কীভাবে? শুধু তারা মুসলিম বলে? নির্যাতিত মানুষের ধর্ম দেখে কী আমাদের প্রতিবাদ করা উচিত? বাঙলাদেশে এত অসংখ্য নির্যাতন নিপীড়ণ নিয়ে তারা এত চুপ থাকে কীভাবে? তাতেই শেষ নয়, অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান আবার আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন সমর্থনও করেন! হিন্দুদের ভারতে পাঠিয়ে দেয়াও।

কিন্তু এই সংখ্যালঘু নির্যাতন থামাবার উপায় কী?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতন থামাবার একমাত্র উপায় হচ্ছে, নিজের দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন স্বীকার করে নিয়ে সেটা সংশোধনের পথ খুঁজে বের করা। ধর্ম এবং জাতিসত্ত্বার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র যেন কাউকে অবহেলা না করে, কারোর অধিকার হরণ না করে, সেটা নিশ্চিত করা। এটা না করলে আপনি মিয়ানমারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করার অধিকার অর্জন করেন না। আপনি যখনই বলবেন, বাঙলাদেশে হিন্দু বৌদ্ধ আদিবাসীরা খুব সুখে আছে, তখনই পৃথিবীর যেকোন দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে আপনার সকল বক্তব্যই আবর্জনায় পরিণত হবে। আপনি শুধু হাস্যরস সৃষ্টি করতেই পারেন। এটাকে হিপোক্রেসি বলে। আর হিপোক্রেটদের থেকে আর যাই হোক, প্রতিবাদ আশা করি না।

পৃথিবীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতনের ওপর ভিত্তি করে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। প্রথম দেশটিতে সবচাইতে ভয়াবহ সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়, এভাবে ক্রমান্বয়ে। তালিকাটি নিম্নরূপঃ

১। সিরিয়া
২। সোমালিয়া
৩। সুদান
৪। আফগানিস্তান
৫। ইরাক
৬। ডি আর কঙ্গো
৭। পাকিস্তান
৮। মিয়ানমার
৯। বাঙলাদেশ
১০। ভারত

দশটি দেশের মধ্যে ডি আর কঙ্গো, মিয়ানমার এবং ভারত ছাড়া বাকি সাতটি দেশ মুসলমান অধ্যুষিত। অনেকগুলোর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এই তালিকার বাইরে যেসব ইসলামিক দেশ আছে, যেমন সৌদি আরব, সেখানে আসলে সংখ্যালঘু বলেই কিছু অবশিষ্ঠ নেই। অন্য কোন ধর্মের মানুষের প্রকাশ্য ধর্ম পালনের অধিকার পর্যন্ত নেই। মন্দির বা উপাসনালয় তৈরি করা তো দুরের কথা।

এবারে অন্যদের দোষারোপ না করে ভাবুন, আপনাদের প্যালেস্টাইনের মুসলমান এবং কাশ্মীরের মুসলমানের অধিকারের দাবী জানাবার নৈতিক অধিকার রয়েছে কিনা। ভাবুন, ভাবা প্রাকটিস করুন।

Facebook Comments