ঈশ্বরের মৃত্যু!

[সময়কাল, প্রাচীন যুগ]

পয়গম্বরঃ হুজুর, ঈশ্বর আমাকে মনোনীত করিয়াছেন মানবজাতির ত্রানকর্তা হিসেবে।
সম্রাটঃ তোমাকে কেহ ত্রানকর্তা বানাইলে আমার ফায়দা কি হে উল্লুক?
পয়গম্বরঃ আপনার জন্যেও রহিয়াছে সুসমাচার। মহান ঈশ্বর আপনাকে মানবজাতির রাজা মনোনীত করিয়াছেন, এবং বংশ পরম্পরায় আপনার সন্তানদের জন্য সিংহাসন বরাদ্দ রাখিয়াছেন।
সম্রাটঃ বাহ, খুবই মহান তোমার ঈশ্বর। তবে তোমার ধর্মই আজ হইতে রাজধর্ম এবং প্রজারা এই ধর্মই যুগযুগ ধরিয়া পালন করিবে। তুমি শুধু বিদ্রোহী,আমার বিরোধীদের নরকের ভয় দেখাইয়া দমন করো। যাহারা আমার সম্পদ লুট করিতে চাহে, তাদের দমন করো। যুগ যুগান্তর ধরিয়া যেন আমার রাজত্ব কায়েম থাকে, প্রজারা যেন আমার গোলামি করে, তা না করিলে ঈশ্বরের ভয়ঙ্কর শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করো।
পয়গম্বরঃ তথাস্তু!
অতপর ঈশ্বরের বানী আগমনঃ “ঈশ্বর মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তিনি বলিয়াছেন পৃথিবী সমতল, সূর্য ইহার চারদিকে পাক খায় এবং ঈশ্বরই আদমকে প্রেরণ করিয়াছেন। পয়গম্বর তার প্রিয় দোস্ত এবং সম্রাট ঈশ্বরের মনোনীত রাজা। ইহার অমান্যকারীদের জন্য রহিয়াছে জ্বলন্ত নরক এবং পালনকারীদের জন্য আরামের স্বর্গ”।

[সময়কাল, জ্ঞানের সুচনাপর্ব]
প্রহরীর আগমনঃ সম্রাট, জ্ঞানীরা বলিতেছেন পৃথিবী গোলাকার। ইহা ধর্মদ্রোহীতা, রাজদ্রোহীতা।
সম্রাটঃ কতল করো ঐ নাস্তিক কাফের রাজদ্রোহীদের।
[জ্ঞানীদের হত্যা, গনহত্যা, রক্তাক্ত পাঠাগার] (কিছুকাল পরে) প্রহরীঃ হুজুর, নাস্তিকদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়িতেছে। এখন উপায়? সবাইকে কতল করবো?
সম্রাটঃ এই কাফেরগুলো শান্তিতে থাকতে দেবে না দেখছি। উল্লুকের বাচ্চা, পৃথিবী গোল হলেই কি আর চারকোনা হলেই কি? ডাকো দেখি পয়গম্বরকে, তাকে বলো ঈশ্বরের বানী একটু এদিক সেদিক করে পৃথিবীকে গোলাকার করে দিতে।
[পয়গম্বরের আগমন এবং সমতল বলতে প্রাচীন কেতাবে যে আসলে সমতল বলিতে গোলাকার বোঝানো হয়েছিল তা ব্যাখ্যাকরণ]

[সময়কাল, মধ্যযুগ]
প্রহরীঃ হুজুর, ব্রুনো বলিয়াছে পৃথিবী নাকি সুর্যের চারধারে পাক খায়, শালা নাস্তিক কোথাকার।
সম্রাটঃ কতল করো হারামজাদাকে।
[ব্রুনোকে হত্যা, বইপত্র ধ্বংস] প্রহরীঃ হুজুর, ব্রুনো কি সব ছাইপাশ লিখে গেছে, তা পড়ে সবাই বলছে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে পাক খায়।
সম্রাটঃ এই দার্শনিক বিজ্ঞানী নাস্তিকগুলোর জ্বালায় শাসন করাই তো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ডাকো পয়গম্বরকে, তাকে বলো আগের ঈশ্বরের বানী রুপক ছিল, ভুংচুং দিয়ে যেন এ যাত্রা ঈশ্বরের ইজ্জত বাঁচায়। ঈশ্বর না থাকলে কিন্তু আমি, পয়গম্বর কেউই থাকবো না। এতদিন ভয় দেখিয়ে যা অর্থ জমিয়েছি, ঈশ্বরের ভয় না থাকলে জনগন টুকরো টুকরো করে মেরে সব ফেরত নিয়ে যাবে।
[পয়গম্বর ভুংচুং দিয়ে, শব্দের অর্থ পাল্টে প্রমাণ করিলেন, এই কথা পবিত্র কেতাবে আগে থেকেই লিখিত রহিয়াছে। এযাত্রা আবারো ঈশ্বরের সম্মান বাঁচালেন]

[সময়কাল, আধুনিক যুগ]
প্রহরীঃ হুজুর গো। কোথাকার কোন দাড়িওয়ালা বদমাইশ বলছে মানুষ নাকি বিবর্তনের ফল।
সম্রাটঃ আগেকার জ্ঞানীদের হত্যা করে বিশাল ফাঁপড়ে পরেছিলাম। এবারে আর কতল না করাই ভাল। বরঞ্চ কৌশলে কাজ করতে হবে। কিছু লোককে টাকা দিয়ে জ্ঞানী বলে প্রচার করো এবং তাদের দিয়ে বলাও ঈশ্বরের বানীই সঠিক। মানুষ স্বর্গ হইতে নামিয়াছে।

[সময়কাল, ভবিষ্যত]
প্রহরীঃ হুজুরগো, সকল জ্ঞানীরা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করছে যে বিবর্তনবাদ সত্য। এখন কি বিবর্তনবাদকে কতল করবো?
সম্রাটঃ ডাকো পয়গম্বরকে, তাকে বলো ধর্মগ্রন্থে বিবর্তনবাদ খুঁজে বের করতে। না বের করতে পারলে শালা পয়গম্বরকেই কতল করো।
পয়গম্বরঃ ঈশ্বর সেই প্রাচীনকালেই বিবর্তনের কথা সাংকেতিকভাবে বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু মূর্খ মানুষ জ্ঞানের অভাবে তা বুঝতে পারেনি। (অতঃপর ধর্মগ্রন্থে বিবর্তনবাদ আবিষ্কার এবং ঈশ্বরের জয়গান, সম্রাটের সিংহাসন আরো পাকাপোক্ত)

প্রহরীঃ বিদ্রোহ দানা বাঁঁধিয়াছে, জনগন ক্ষেপিয়াছে। তারা ঈশ্বরকে আর মানতে চাইছে না, সম্রাটকেও না। তারা সকলেই সন্দেহ করিতেছে, সকলেই অবিশ্বাস করিতেছে। তাহারা শোষনের বিরুদ্ধে কথা বলিতেছে। এবারে কাহাকে হত্যা করবো হুজুর?
সম্রাটঃ এবারে তবে পয়গম্বর আর ঈশ্বরকেই কোরবানী করা হোক। ক্ষমতার কাছে, অর্থের কাছে পয়গম্বর এবং ঈশ্বর বড়ই দুর্বল। অর্থই ঈশ্বর, অর্থ সম্পদই সকল ক্ষমতার কেন্দ্র।

এরপরে ঈশ্বরের মৃত্যু, কিন্তু মানুষ তারপরেও শোষিত সেই প্রাচীন আমলের মতই। কারণ নতুন ঈশ্বরের সৃষ্টি হয়েছে, যার নাম ডলার।

Facebook Comments
%d bloggers like this: