হুমায়ুন আহমেদঃ পুস্তক ব্যবসায়ী পতিত বুদ্ধিজীবী!

বাঙলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে হুমায়ুন আহমেদ একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র, এতে কোন সন্দেহ নেই। হুমায়ুন আহমেদের মত বাঙালি মধ্যবিত্ত পাঠক প্রিয় লেখক এই বাঙলায় আর জন্মেনি, ভবিষ্যতে জন্মাবে এমনটাও আশা করা যায় না। তিনি এতটাই জনপ্রিয়, মানুষের হৃদয়ের এতটাই কাছে তার অবস্থান যে, তার একটি নাটকের কাল্পনিক ‘বাকের ভাই’ চরিত্রের জন্য ঢাকার রাস্তায় মিছিল হয়েছিল। তার ‘তুই রাজাকার’ গালিটাতে বাঙালী শিখেছিল রাজাকার আলবদরদের ঘৃণা করার কথা, যে সময়ে রাজাকার আলবদরদের কথা বলতেও মানুষ ভয় শিউরে উঠতো। এই ব্যাক্তিকে শ্রদ্ধা না করে, তার গুণমুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই, অন্তত সেই সময় পর্যন্ত। প্রয়াত আহমদ ছফা ছিলেন তার গুরু, যিনি হুমায়ুন আহমেদকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন, তিনিও হুমায়ুন সম্পর্কে দারুণ উৎসাহী ছিলেন। তিনি হুমায়ুনের মধ্যে প্রতিভার স্ফুরণ দেখেছিলেন, যেটা পরবর্তীতে পুরো বাঙলাদেশ দেখেছে। আহমদ ছফা এস এম সুলতান সম্পর্কে যেমন ভুল করেন নি, হুমায়ুনকে চিনতেও ভুল করেন নি।

লেখাটি হুমায়ুন আহমেদ জীবিত থাকাকালীন লেখা, মুক্তমনাতে প্রথম প্রকাশিত। কিছু পরিমার্জনার পরে পুনরায় প্রকাশ। কিন্তু জনপ্রিয় হওয়া যত সহজ, জনপ্রিয় হওয়ার পরে তার দায় বহন করা সম্ভবত ততটাই কঠিন। সবসময় সব পক্ষের মন রক্ষা করে কথা বলা সম্ভব নয়, আর হুমায়ুন আহমেদের মত জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্বকে নিয়ে নানা ধরণের মতামত পাওয়া যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর এই রকমের গুরুত্বপুর্ণ ব্যাক্তিত্ব কোথায় কি বক্তব্য দিচ্ছেন, তা নিয়েও আমাদের চিন্তার অবকাশ তৈরি হয়। কারণ এরকম জনপ্রিয় লেখকের সামান্য ভুল বা বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বাঙলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলন ব্যাহত হতে পারে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই হুমায়ুন আহমেদের বক্তব্যকে হালকা করে দেখার উপায় নেই, তার বক্তব্য অবশ্যই গুরুত্ত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

আমাদের দেশে বই প্রকাশ এবং বই বিক্রি একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাঠক তৈরি এবং প্রতিবছর টন টন বই উৎপাদন করে আমাদের সাহিত্যিকগণ বর্তমানে প্রচুর টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন, লেখালেখিকে একটি লাভজনক ব্যাবহায় পরিণত করেছেন। একটা সময়ে আমরা বই কিনতাম নতুন চিন্তা, নতুন ভাবনা জানার জন্য, ইতিহাস দর্শন সাহিত্যের চমৎকার সব অংশকে ভালভাবে বোঝার জন্য। কিন্তু বর্তমানে বই প্রকাশ একটা গুরুত্ত্বপুর্ণ বাণিজ্য, সাহিত্য রীতিমত একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে। এখন আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ বই কেনে ঘর সাজাবার উদ্দেশ্যে, দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়া করে হালকা চটুল সুড়সুড়িমার্কা বিনোদন পেতে। হুমায়ুন আহমেদ-ইমদাদুল হক মিলন এরা বহুদিন ধরেই এই ধরণের পাঠক ধরবার চেষ্টায় লিপ্ত, এই ধরণের মানুষের সংখ্যা বেশি হবার কারণে সাহিত্যের সত্যিকারের পাঠকদের কথা বিবেচনা না করে আমাদের জনপ্রিয় সাহিত্যিকগণ বর্তমানে জনপ্রিয় ধারার উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন। শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদ যার নাম দিয়ে ছিলেন ‘অপন্যাস’, আর এই ধরণের সাহিত্যিকের নাম দিয়েছিলেন ‘অপন্যাসিক’।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ খুব শিক্ষিত নয়। তারা জটিল কথাবার্তা বোঝে না, সহজ সাধারণ জীবন যাপন করেন। এই ধরণের মানুষের মনস্তত্ত্বে হুমায়ুন আহমেদ নাড়া দিতে পারবেন খুব সহজেই। আসলে এই ধরণের পাঠক আকর্ষণ করতে খুব মেধাবী সাহিত্যিকের প্রয়োজন নেই, হুমায়ুন আহমেদের মেধা যে তাই অপাত্রে যাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। এই সাধারণ মানের পাঠকদের প্রভাবিত করবার ক্ষমতা হুমায়ুন আহমেদের রয়েছে, আর তাই হুমায়ুন আহমেদ একটি ভিন্ন আঙ্গিকে গুরুত্ত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছেন। তার যেকোন কর্মকান্ড তাই সাধারণ মানুষের চিন্তা চেতনার উপরে প্রভাব ফেলতে পারে, আর তাই তার থেকে দায়িত্বশীলতা আশা করাটাও আমাদের কোন অযৌক্তিক দাবী নয়।

হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য লেখা লিখেছেন, বহু সিনেমা বানিয়েছেন। বাঙলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কয়টি চমৎকার উপন্যাস রয়েছে, তার মধ্যে হুমায়ুন আহমেদের লেখা এবং তার চলচ্চিত্র অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। আগুনের পরশমনির মত চলচ্চিত্র যেমন লক্ষ লক্ষ দর্শককে কাঁদিয়েছে, তেমনি তার উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রকে বাঙালী হৃদয়ে স্থান দিয়েছে। হিমু আর মিসির আলীর মত জনপ্রিয় এবং অনন্য চরিত্র সৃষ্টিও বাঙলাদেশের পাঠকের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে।

কিন্তু আমাদের দেশে বই বিক্রি আর সাহিত্যকে রীতিমত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করার জন্যেও হুমায়ুন আহমেদকে অনেকাংশে দায়ী করা হয়। তিনি জনপ্রিয় থাকতে চেয়েছেন, সকল ধরণের পাঠক সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে অনেক পানি ঘোলাও করেছেন। আমরা বুঝি, জনপ্রিয়তার নেশা কাটানো মুশকিল, এবং দেশের প্রগতিশীলদের থেকে শুরু করে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় হবার তার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে তাকে একজন পতিত বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করছে কিনা, সেটাও ভেবে দেখবার সময় হয়েছে।

ইতিপুর্বে আমরা দেখেছি আল মাহমুদের মত শ্রেষ্ঠ কবিকে মৌলবাদী শিবিরে যোগ দিতে, দেখেছি ফরহাদ মজহারকে নষ্ট হয়ে যেতে। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন ‘একজন রাজাকার সবসময়ই রাজাকার কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা চিরজীবন মুক্তিযোদ্ধা নয়’; তেমনি একজন প্রগতিশীল লেখকও সবসময় প্রগতির পক্ষে থাকবেন, সেটা নাও হতে পারে। তাই হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে আমরা আশংকা অমূলক নয়, কারণ একজন আল মাহমুদ আর একজন ফরহাদ মজহারের চেয়ে হুমায়ুন আহমেদ সাধারন পাঠকের কাছে অনেক শক্তিশালী, তার প্রভাব অনেক বেশি। তাই হুমায়ুন আহমেদের সামান্য অসতর্ক বক্তব্যকেও আমাদের আমলে নিতে হয়, এটা পাঠকের কাছে কিভাবে গৃহিত হচ্ছে তা ভাবতে হয়।

হুমায়ুন আহমেদকে জনপ্রিয়তা রক্ষা করে কথা বলতে হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতায় আক্রান্ত। পাকিস্তানের ভুত বিদায় নিয়েছে, কিন্তু আমরা আমাদের তরুণদের ভেতরে দেখা যায় নব্য পাকিস্তানের ছায়া। তারা স্লোগান দেয়, “বাংলা হবে আফগান, আমরা হবো তালেবান” অথবা মুসলমানিত্ত্বের কারণে তারা পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের সাপোর্টে পাকিস্তানের পতাকা গালে ছেপে স্টেডিয়ামে যায়, “ম্যারি মি আফ্রিদি” লিখে আমাদের তরুনীরা পাকিস্তানী ক্রিকেটারদের সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ায়, জাতি হিসেবে লজ্জায় মুখ দেখাবার উপায় থাকে না। ইসলামী ছাত্র শিবির আর জামাতে ইসলামীর কথা বলতে শুরু করলে শেষ করা যাবে না, তবে ছোট করে বললেও আমাদের দেশ মৌলবাদের জন্য একটা উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।

তাই যখন দেখি হুমায়ুন আহমেদের মত সাহিত্যিক প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্য দিচ্ছেন, বা তার বক্তব্য ধর্মান্ধ জামাত শিবিরকে শক্তিশালী করছে, তখন আতংকিত হতে হয়। অসহায় লাগে, নিজেদের বিপন্ন মনে হয়। হুমায়ুন আহমেদ তো আমাদের কাছে আগে থেকেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তার আর কত জনপ্রিয়তা প্রয়োজন? আর কত টাকার বই বিক্রি হলে তিনি সন্তুষ্ট হবেন?

কিন্তু তিনি আসলে কি বলেছেন বা কি এমন করেছেন যার জন্য আমাদের এই ভয়, এই আতংক? এই আতংক অমূলক প্রমাণিত হোক, সেই প্রত্যাশা অবশ্যই আমরা করি, হুমায়ুন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষাতার অসাম্প্রদায়িক বাঙলাদেশের পক্ষের সোচ্চার কন্ঠস্বর হয়ে উঠুক, এটা চাইবার পরেও তার কিছু কর্মকান্ড এবং লেখার দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখি।

‘ঘরে-বাইরে হুমায়ূন আহমেদ হাজার প্রশ্ন’ বইটিতে ‘সমাজ ও রাজনীতি’ অধ্যায়ে তিনি বলেন,

“মুক্তিযুদ্ধেও সময় যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেছেন তাদের মধ্যে আমার নানাও একজন, যিনি মুক্তিযুদ্ধাদের হাতে মারা গেছেন। আমার এই নানার মতো, মামার মতো ভদ্রলোক, পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত এত পরিপূর্ণ ভদ্রলোক এই জীবনে দেখিনি।
(অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া মানুষগুলো পরিপুর্ণ ভদ্রলোক হতে পারে! তারা খুব ভাল মানুষ হতে পারেন! হ্যা, এটা হতেই পারে, তবে এটা যখন প্রোপ্যাগান্ডা হিসেবে ব্যাবহৃত হবে, তখন সেটা জনগনের ভেতরে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিও সৃষ্টি করতে পারে!)।

আমার নানা একটি আদর্শ নিয়ে বড় হয়েছেন। একটি পূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন। কারণ বড় হওয়ার সময় এই অঞ্চলের হিন্দুদের দ্বারা প্রচণ্ড নির্যাতিত হয়েছিলেন। কোনো মিষ্টির দোকানে গেলে তাদের প্লেটে করে মিষ্টি দেয়া হতো না। তারা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাদের হাতে দেয়া হতো। এটা শুধু মুসলমানদের সঙ্গেই না, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গেও করতো। এটা ছিল হিন্দুদের কাস্ট সিস্টেম। এসব দেখে দেখে সে সময়ের মুসলমানরা বড় হয়েছেন এবং তাদের মনে হয়েছে একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। অনেক যুদ্ধের পর তারা তা পেয়েছেন। যখন তারা দেখলেন চোখের সামনে দিয়ে সেই রাষ্ট্র ভেঙে যাচ্ছে, তখন তারা মনে করেছেন আবার হিন্দু রাজত্ব শুরু হয়ে যাবে। তখন পাকিস্তানকে সাপোর্ট করা শুরু করেন। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির অন্যায়গুলো ক্রমেই চোখে পড়তে থাকে। তারা দেখলেন পাকিস্তানি আর্মিরা তো কেবল হিন্দু মারছে না, সমানে মুসলমানদেরও খুন করছে। আমার নানা দেখলেন , তার অতি আদরের বড় মেয়ের পুলিশ অফিসার স্বামীকে (আমার বাবা) বেধে নিয়ে আর্মিরা গুলি করে মেরে মেরে ফেলল। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কি হচ্ছে এসব? কোনদিকে যাবেন? তিনি কি পাকিস্তান আর্মির সঙ্গেই থাকবেন , নাকি কমন যে স্রোত আছে তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন?

এই নিয়ে কনফিউশন তৈরি হলো তার মধ্যে। তিনি এই কনফিউশন দূর করতে পারলেন না।
(তিনি কনফিউসড ছিলেন নাকি পাক আর্মীকেই সমর্থন করে গেছেন শেষ পর্যন্ত, সেটাকে হুমায়ুন আহমেদ খানিকটা টুইস্ট করে বলেছেন।)

এক্ষেত্রে তার যেমন দোষ ছিল, আমাদেরও ছিল। কারণ আমরা তাদের বোঝাতে পারিনি। কনফিউশন দূর করাতে পারিনি। তিনি মারা গেলেন মুক্তিযুদ্ধাদের হাতে। এখন আমরা তাকে ক্ষমা করব কি করব না সেই প্রশ্ন। শেখ মুজিব সাহেব তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। আমি ক্ষমার পক্ষপাতি। ”(ঘরে-বাইরে হুমায়ূন আহমেদ হাজার প্রশ্ন, পৃ.৩১-৩২)

মুক্তিযোদ্ধা পিতা এবং রাজাকার নানার চরিত্র হুমায়ুন আহমেদের ভেতরে চমৎকার ভাবে মিলে মিশে ঢুকে গেছে বললে সম্ভবত খুব ভুল বলা হবে না। আমার লেখার পরবর্তী অংশে আমি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবো কেন আমি এই কথাটুকু বললাম।

হুমায়ুন আহমেদ জনপ্রিয়তা রক্ষার কলাকৌশল খুব ভাল ভাবেই রপ্ত করেছেন। তার সাহিত্যের মান এখন কতটা উন্নত, তা সাহিত্যবোদ্ধাদের হাতে ছেড়ে দিতে হচ্ছে, তবে প্রতিবছর তিনি যেই হারে কেজিদরে একই জিনিস ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাঠককে খাওয়াচ্ছেন, তা দেখে তার নির্লজ্জ ব্যাবসাবুদ্ধি এবং নিজের নাম ভাঙ্গিয়ে পাঠকের সাথে প্রতারণার দায়ে তাকে অবশ্যই অভিযুক্ত করা যায়। তার এক শ্রেনীর ভক্ত তৈরি হয়ে গেছে, তারা তাকে রীতিমত পীর পুজা শুরু করে দিয়েছে। কোথাও হুমায়ুন আহমেদের কোনরুপ সমালোচনা হওয়া মাত্রই তারা জিহাদী জোশে সমালোচকের উপরে ঝাঁপিয়ে পরছে, তাকে আক্রমন করছে। এটা কোন সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থা নয়। লেখক তার লেখা লিখবে, সমালোচক তার সমালোচনাও করবেন। এই পীর পুজা এবং ভক্তবাদের বান ডাকা আবেগ উচ্ছাস হুমায়ুন আহমেদকে ক্রমশই অহংকারী করে তুলছে, বর্তমানে তিনি ভেবেই নিয়েছেন তিনি যেই ছাই পাশই লিখুন না কেন, পাঠক হামলে পরেই তা গলধকরণ করবে! হচ্ছেও সেটা।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া পিতার সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী নানার বংশধর এই জনপ্রিয় সাহিত্যিক একবার তিনি জামায়াতের শীর্ষপর্যায়ের এক নেতার ছেলের বিয়েতে দাওয়াত রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। এই নিয়ে শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মুনতাসির মামুন জনকন্ঠে একটি কলাম লিখেছিলেন। পরে যার কারণ হিসেবে হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, ঐ জামাতের নেতার পুত্র তার ভক্ত, তাই তিনি গিয়েছিলেন। অথচ কি আশ্চর্য, ঢাকার শনির আখড়ার খেটে খাওয়া দিনমজুরের পুত্রও হুমায়ুন আহমেদের ভক্ত, এরকম হাজারো হত দরিদ্র ঘরের কিশোর তরুণ পাঠক তার ভক্ত, তাদের বাসায় কখনও এই ধনী কথাশিল্পীর পদস্পর্শ পরলো না।

সেই সময়টা ইনকিলাব এবং সংগ্রামের মত পত্রিকার প্রবল প্রতাপের সময়। গ্রাম বাঙলা কিংবা মফস্বলের অসংখ্য মানুষ সেই সময় ইনকিলাব পড়ে। ইনকিলাবের পাঠক একটি বড় অংশ মানুষ আমাদের দেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীকেই ইসলামের শত্রু এবং পশ্চিমা দালালা মনে করেন, যা বলাই বাহুল্য। এই বড় অংশ মানুষ শামসুর রাহমানকে নিয়ে কুৎসা রটনা করেছে, জাহানারা ইমাম থেকে শুরু করে আহমদ শরীফকে নিয়ে, কবির চৌধুরীকে নিয়ে। এরকম অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে। এরপরে আমরা অত্যন্ত হতাশার সাথে দেখলাম, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সম্পর্কে ভয়ংকর রকম একটি অসতর্ক মন্তব্য দিয়ে হয়তো এক বিশেষ শ্রেনীর পাঠকের প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছেন, নিজের ভক্তকুলও বৃদ্ধি করেছেন। প্রগতিশীল ধ্যান ধারণার মানুষরা তো তার এমনিতেই ভক্ত, তিনি যা খাওয়াবেন সেটাই আমরা খেয়ে নেবো। তাই তিনি আর প্রগতিশীল সেক্যুলার ধ্যান ধারণার মানুষদের মন রক্ষা করার প্রয়োজন বোধ করছেন না। তার দৃষ্টি এখন গিয়ে ঠেকেছে বাঙালী পাঠকের সেই অংশের দিকে, যারা হয়তো এখনও বই পড়া ভালভাবে শেখেনি। তাদের সংখ্যা ব্যাপক এবং তাদের কাছে দুটো বই বিক্রি করার জন্য শহীদ জননীকে অসম্মান করতেও দ্বিধা হয় না আমাদের এই জনপ্রিয় সাহিত্যিকের।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেশদ্রোহিতার মামলা নিয়ে দিনের পর দিন ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের অমৃতবচন,
“ওনাকে কেউ তো খুন করেনি। উনিতো ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ওনাকে দেশদ্রোহী কখনোই বলা হয়নি। দেশদ্রোহী কথাটা ভুল ইনফরমেশন। তার বিরুদ্ধে কখনোই দেশদ্রোহীর মামলা হয়নি। তাছাড়া পুরো ব্যাপারটিই ছিল এত তুচ্ছ, আমরা জানি যে, পুরোটাই ছিল একটা সাজানো খেলা।… বাংলাদেশে মৌলবাদের সমস্যা- বড় কোনো সমস্যা এখনো হয়নি। জনগণ যদি ভোট দিয়ে মৌলবাদীদের নির্বাচন করে, তাহলে গণতান্ত্রিকভাবে কি তাদের বাদ দেওয়া যায়? হোক না তারা মৌলবাদী।”

তার এহেন বক্তব্যের উত্তরে শাহরিয়ার কবীর বলেছিলেন,
“জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা ছিল না, এটা বলা হুমায়ূন আহমেদের অজ্ঞতা। জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা ছিল, আমিও একজন আসামি ছিলাম। জাহানারা ইমামের বিষয়টি সাজানো খেলা, এটা অত্যন্ত আপত্তিকর কথা। ওই আন্দোলনের জন্য ওনাকে পুলিশ রাস্তায় পিটিয়েছে, হাসপাতালে যেতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এত বড় আন্দোলন আর কখনো হয়নি। জামায়াত শিবির ও যুদ্ধাপরাধীরাই এটাকে কেবল সাজানো খেলা বলতে পারে। হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন লেখকের এ ধরনের বক্তব্য জামায়াত শিবিরের পক্ষেই যায়।”

যেভাবেই হোক, যেমন করেই হোক, বইয়ের পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি করতেই হবে। আর তার জন্য স্রোতের সাথে সাথেই এগুতে হবে। তার এই কৌশলটি বাঙলার লেখক শ্রেনীর চরিত্র কিভাবে নষ্ট করবে, তা সহজেই অনুমেয়!

শুধু তাই নয়, শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদের উপরে সেই ভয়াবহ চাপাতি আক্রমনকেও তিনি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বলে পরোক্ষভাবে রায় দিয়েছিলেন! একজন লেখক যখন আরেকজন লেখকের উপরে নৃশংস চাপাতি আক্রমনকে স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন, তখন বুঝতে হয় তিনি সম্ভবত মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন, অথবা হুমায়ুন আজাদের বিপক্ষ শিবিরের বাহাবা কুড়াবার কামনায় এসব বলছেন।

একটি সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ
“তাহলে হুমায়ুন আজাদকে মরতে হলো কেন?” -এর জবাবে প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের এককালের বন্ধু ও সহকর্মী হুমায়ূন আহমেদ বলেন,
“কারণ যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।”

হুমায়ুন আহমেদের অধিকাংশ পাঠকই তরুণ তরুনী বা কিশোর কিশোরী, যারা এত প্যাচ ঘোচ বোঝে না। সাহিত্যের বিশুদ্ধতা বা উচুমানের সাহিত্য নিয়ে তাদের খুব বেশি আগ্রহও নেই। তারা চায় একটু সস্তা বিনোদন, অবসরটুকু ভালভাবে কাটাবার জন্য একটা সময় কাটানোর মত বই। তারা এই কথাটি পড়ে কি শিখবে? তারা শিখবে, এরপরে যখন তাদের কাছে কোন বই বা গ্রন্থ কুৎসিত মনে হবে, তারা তাদের ধার দেয়া চাপাতিটা নিয়ে তার লেখকের উপরে ঝাঁপিয়ে পরতে পারবো। তাকে কোপাতে পারবো, রক্তাক্ত করতে পারবো! কারণ হিসেবে তারা বলবে, লেখাটি এতটাই কুৎসিত ছিল যে আমরা এটা পড়ে তাকে কোপাতে বাধ্য হয়েছিলাম।

আমরা সর্বদাই বলে থাকি, লেখার বিরুদ্ধে লেখনীকেই শক্তিশালী করতে হবে। যুক্তির বিপক্ষে যুক্তি আর কথার বিরুদ্ধে কথা। কোনমতেই কারো বাক-স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ কোন সাফল্য নিয়ে আসে না। ধরে নিচ্ছি হুমায়ুন আজাদের সাহিত্য খুবই নিম্নমান সম্পন্ন, কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের লেখা যদি উচ্চমান সম্পন্নই হয়ে থাকে, তবে তিনি তার সুরুচি দিয়েই সেটার প্রতিবাদ করে তাকে বাতিল করে দিতে পারতেন। সেটা না করে তিনি সেই চাপাতিবাজ মৌলবাদীর চাপাতি মারাকেই যেভাবে সত্যায়িত করেছেন, সেটা সত্যিই আর মুখোশের আড়ালের মানুষটাকে বের করে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তার সাহিত্য বা চলচিত্র একটু বুদ্ধিমান পাঠক বা দর্শক অনেকের মনেই দ্বিধা দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। খুবই আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করতে হয়, তার উপন্যাস বা চলচিত্রে ‘রাজাকার’ বলে কোন চরিত্র নেই। রাজাকার আলবদর আলশামস এই বাহিনীগুলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ইসলাম এবং পাকিস্তানের নাম ভাঙ্গিয়ে ইতিহাসের অন্যতম গনহত্যার সহযোগীতা করেছিল। এই রাজাকার আলবদর আলশামস গোষ্ঠির চক্রান্তে ১৪ ডিসেম্বর আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা নির্মমভাবে নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হুমায়ুন আহমেদ সাহেব শর্ষিনার রাজাকার পীর সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানে সেই রাজাকারের আশ্রয়ে পুরো পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার ঋণ শোধ কিনা জানি না, তিনি তার সাহিত্য এবং চলচিত্রে রাজাকার আলবদরদের সচেতনভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। ইসলামী ভাবাদর্শের রাজাকারদের দেখালে আমাদের ধর্মপ্রান মানুষের ধর্মানুভুতিতে আঘাত লাগে কিনা, তার পাঠক সংখ্যা কমে যায় কিনা, সেই ভয়ে তিনি গোপন করে গেছেন রাজাকারদের কর্মকান্ড।

একজন সেক্টর কমান্ডারের নাম এসেছে তার “জোছনা এবং জননীর গল্পে”; অবাক হয়ে দেখতে হচ্ছে, শুধুমাত্র মেজর জিয়া এবং তার স্ত্রীর নাম। অন্য আরো অনেক জন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, তাদেরও স্ত্রী পুত্র ছিল। অথচ তারা হুমায়ুনের বইতে স্থান পাওয়ার মত যোগ্য হয়ে ওঠেন নি, কারণ মেজর জিয়ার নাম দেয়া হলে একটা রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকের সহানুভূতি পাওয়া যাবে, সেই দলের সমর্থকদের কাছে বইটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে। অন্য সেক্টর কমান্ডাররা পরে প্রেসিডেন্টও হন নি, বড় রাজনৈতিক দলও বানাতে পারেন নি। তাই হুমায়ুনও তাদের কথা এড়িয়ে গেছেন সচেতন ভাবে।

চ্যানেল আইয়ের এক সাক্ষাৎকারে তারই ছোটভাই জাফর ইকবাল সাহেব এ উপন্যাসের ব্যাপারে বলেছিল, ‘চরমভাবে আশাহত’! ‘রাজাকার’ ‘১৯৭১’ এ উপন্যাসে নেই, ‘আগুনের পরশমনি’তে নেই, ‘আনিল বাগচীর একদিন’ এ নেই, ‘শ্যামল ছায়া’তেও নেই(শ্যামল ছায়া চলচ্চিত্রে আছে একজন, এবং সে কিছুক্ষণ পরেই ভালো মানুষ হয়ে যায় নৌকা যাত্রীদের সাহায্য করে)।

এই সেদিন তিনি একটি লেখাতে বলেছেনঃ

“পৃথিবীর কোথাও আমি ছাত্রদের এবং শিক্ষকদের রাজনৈতিক দল করতে দেখিনি। এই অর্থহীন মূর্খামি বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার। এই মূর্খদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ড. আহমদ শরীফ এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অতি শ্রদ্ধেয় দুজন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাদা দলে ইলেকশন করেছি। এখন নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়। মূর্খ মনে হয়। আমাদের ক্যানসার ইনস্টিটিউটে মূর্খদের প্রবেশাধিকার নেই।”

আহমদ শরীফ এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কে এবং তাদের অবস্থান কোথায়, এটা আমাদের দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন। এখানে সাদা দল এবং শিক্ষক রাজনীতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেটা পড়লেই যে কারো মনে হবে, আরে তাই তো। হুমায়ুন আহমেদ সাহেব তো ঠিকই বলেছেন। আহমদ শরীফ এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীদের মত মূর্খ এবং ক্ষুদ্রের চেয়ে হুমায়ুন আহমেদ অনেক বড়, আহমদ শরীফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাদা দলে ছিলেন, সুতরাং তারা মোটেও ভাল লোক হতে পারেন না।

হুমায়ুন আহমদের বক্তব্য যে মিথ্যা, তা প্রমাণ করতে খুব পন্ডিত হতে হয় না। পশ্চিম ইউরোপ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছাত্র-শিক্ষকের রাজনীতি আছে। বাঙলাদেশের রাজনীতির সাথে সেই রাজনীতির গুনগত পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ছাত্র শিক্ষকরা নির্বাচিত হয়ে বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক ভুমিকা রাখছেন। আজকে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল বলে যাদের চিনি, অর্থাৎ যারা বিএনপি সমর্থকগোষ্ঠী এবং রাজনীতি করে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিকে নষ্ট করে দিতে গুরুত্ত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন (আওয়ামী গোষ্ঠীও সমান ভাবেই এই অপকর্মের জন্য দায়ী), কিন্তু এই অবস্থা সবসময় ছিল না। একটা সময়ে খুব প্রগতিশীল শিক্ষকগন সাদা দলের সাথে ছিলেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ক্রমশ এই সাদা দলটি বিএনপি জামায়াত মনষ্ক শিক্ষকদের দলে পরিণত হয়, এবং এখনকার অবস্থা দিয়ে কোনভাবেই সেই সময়ের রাজনীতি বোঝা সম্ভব নয়।

বিরাজনীতিকীকরণের হুমায়ুন আহমেদীয় প্রচার প্রপাগান্ডায় আমাদের তরুণরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। ফেসবুকে ঢুকে কারো প্রফাইল ঘাটলেই দেখা যায়, “আই হেইট পলিটিক্স”; রাজনীতি সম্পর্কে এই ধারণা সৃষ্টি আসলে যে রাজনীতির নষ্ট চক্রটাকেই টিকিয়ে রাখছে, লালন পালন করছে, সেটা বুঝতে বেশী কষ্ট করতে হয় না। আমাদের ‘সুশীল’ এবং ‘ভদ্রলোকরা’ রাজনীতিকে নষ্টদের হাতে ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিকে নোংরা বলে যখন হলুদ পাঞ্জাবী পরে রাত্রে বেলায় রাস্তায় ঘুরে মহাপুরুষ মহাপুরুষ খেলায় মেতে ওঠেন, চাঁঁদনী রাতে নগ্ন হয়ে জোছনায় গোছল করেন, আর আমাদের তেল গ্যাস পাচার হয়ে যায় পাশের দেশে, নদীকে কৌশলে হত্যা করে দেশকে মরুভুমি বানাবার ষড়যন্ত্র হয়, মৌলবাদের আখড়া বানিয়ে ফেলা হচ্ছে মাদ্রাসাগুলোকে, আর তারা চুপ করে থাকেন, এসব আমাদের তরুণদের উপরে আসলে কি প্রভাব ফেলছে সেটা ভেবে দেখা জরুরী।

আরেকটি সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন,

আমি মনে করি, ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে। আমি স্টিফেন হকিংয়ের একটা লেখা পড়লাম। প্রকৃতির মধ্যে কিছু নিদর্শন তো আছেই। তোমাকে একটা যুক্তি দিই, শোনো। এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় যুক্তি। তুমি মঙ্গল গ্রহে গিয়েছ। সেখানে গিয়ে তুমি দেখলে পাহাড়, পর্বত, পাথর। পাথর দেখে তুমি বলবে, বহুকাল থেকে, সেই আদ্যিকাল থেকে পাথরগুলো এভাবেই আছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তুমি দেখতে পেলে একটা নাইকন ক্যামেরা। তুমি সেটা হাতে নেবে। তখন তোমাকে বলতেই হবে, এর একজন স্রষ্টা আছে। ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে তুমি এ কথা ভাবতে পারবে না যে শূন্য থেকে এটা আপনা-আপনি এসে হাজির হয়েছে। কারণ, এটা একটা জটিল যন্ত্র। এবার, আরেকটু এগিয়ে গেলে। কোত্থেকে একটা খরগোশ বেরিয়ে এসে তোমার দিকে তাকাল। নাইকন ক্যামেরা কী করে? ছবি তোলে। খরগোশ কী করে? অনেক কাজই করে। খরগোশের একটা কাজ হলো দেখা। এই খরগোশের চোখ নাইকন ক্যামেরার চেয়ে হাজার গুণ বেশি জটিল। নাইকন ক্যামেরাটা দেখে তোমার যদি মনে হয় যে এর একটা নির্মাতা থাকা দরকার, তাহলে খরগোশের বেলায় এটা তোমার মনে হবে না কেন? আমার প্রথম যুক্তি যদি গ্রহণ করো, আমার দ্বিতীয় যুক্তিটাও তোমাকে গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমে মাথায় রাখা জরুরি যে, বাঙলাদেশের অধিকাংশ মানুষই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তারা বিজ্ঞান বলতে বোঝে একটি রেফ্রিজারেটর কিংবা টেলিভিশন, যা আসলে বিজ্ঞান নয়- প্রযুক্তি। এই ধরণের আধা শিক্ষিত একটা বড় জনগোষ্ঠীকে এই ধরণের কথা বলার পেছনে একটি উদ্দেশ্য আছে। আপনি উপরের বক্তব্য আবারো পড়ুন, পড়ে মনে হবে, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং নামক ভদ্রলোক এতটাই বোকা যে, মঙ্গলে নাইকন ক্যামেরা থাকবার এবং তা থেকে স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ দাবী করার কথাটি তিনি জানতেনই না।

যুক্তিটি এরকমঃ

  •  মঙ্গল গ্রহে নাইকন ক্যামেরার মত জটিল যন্ত্র থাকলে সেটা বানাবার জন্য আরও জটিল এবং উন্নত বুদ্ধিমত্তার কোন স্রষ্টা প্রয়োজন। অর্থাৎ মানুষ প্রয়োজন। মঙ্গল গ্রহে নাইকন ক্যামেরা পাওয়া গেলে তা থেকেই বোঝা যায় উন্নত বুদ্ধিমত্তার কোন মানুষ তা বানিয়েছে।
  •  সেই জটিল এবং বুদ্ধিমান প্রাণী অর্থাৎ মানুষ, তার মত জটিল এবং বুদ্ধিমান প্রাণী বানাবার জন্যেও একজন আরও জটিল এবং বেশি বুদ্ধিমত্তার স্রষ্টা প্রয়োজন। সেটাই হচ্ছে ঈশ্বর।

—তাহলে একই যুক্তি অনুসারে, যেই যুক্তিটি হচ্ছে জটিল এবং বুদ্ধিমান কিছু বানাতে অবশ্যই একজন স্রষ্টা প্রয়োজন, তবে ততোধিক বুদ্ধিমত্তার সেই স্রষ্টাকে কে বানিয়েছে? বুদ্ধিমত্তা বা জটিলতা যদি তার যে একজন স্রষ্টা থাকবার প্রমাণ হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর মত বুদ্ধিমান সত্ত্বা আপনা আপনি সৃষ্টি হয়ে গেছে সেটা কোন যুক্তিতে মানি? সে তো আরও জটিল, আরও বুদ্ধিমান!

হুমায়ুন এইসব বলে এক শ্রেণীর পাঠকের কাছে প্রিয় হয়েছেন। একজন বুদ্ধিজীবী কেন বুদ্ধিজীবী? সমাজের বা মানুষের প্রতি একজন বুদ্ধিজীবীর দায় কী? একজন রাজনীতিবিদের কাজ যেমন সব পক্ষকে খুশি রাখা, একজন বুদ্ধিজীবীর দায় কী? সবাইকে খুশি করে কথা বলা? যেন সবাই খুশি হয়ে তার বই কেনে? সবার প্রশংসায় ধন্য হওয়া? ভক্ত মুরিদ সংগ্রহ করা? নাকি একজন বুদ্ধিজীবীর অন্য কোন দায় আছে? যেটা হতে পারে, কোন অপ্রিয় সত্যকে সরাসরি বলে দেয়া। বা জনমতের তোয়াক্কা না করে নির্ভয়ে সমস্ত সত্য প্রকাশ করা। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বাঙলাদেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীই খুব সচেতনভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। তার কারণে তাদের পলিটিক্যালি কারেক্ট কথাটি বলতে হয়, অধিকাংশ জনগণের মতের বাইরে তারা আর কথা বলতে পারেন না, জনমানুষের সমস্ত অনুভূতিকে তাদের গণ্য করতে হয়। নইলে পুরষ্কার জোটে না, চাপাতির কোপ খেতে হয়। তার চাইতে এই সব অশিক্ষিত মূর্খ মানুষদের অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে বরঞ্চ অপবিজ্ঞান চর্চাই ভাল। হুমায়ুন আহমেদের বইয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা, কুসংস্কার জিয়িয়ে রাখার চেষ্টা, রহস্যময়তার নামে আজগুবী কেচ্ছাকাহিনী পাঠককে গেলানোর কথা না হয় নাই বললাম। হ্যা, তার অবশ্যই বাক-স্বাধীনতা থাকবে, সেই সাথে আমাদেরও স্বাধীনতা থাকতে হবে তার সমালোচনা করার। তিনি যা গেলাবেন আমাদের সেটাই গিলতে হবে, তিনি ক্রমশই মৌলবাদ আর ধর্মান্ধতার পক্ষে পরোক্ষ অবস্থান নেবেন আর আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত তার রাজাকার নানার আদর্শ তার বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে জাগ্রত হয়ে উঠবে আর তা দেখে আমাদের হাততালি দিতে হবে, এতটা মূর্খ তিনি জনগনকে ভাবতে পারেন না।

সবশেষে হুমায়ুন আহমদেরই গুরু, তাকে তুলে নিয়ে আসায় যার অবদান অনস্বীকার্য, সেই প্রয়াত বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফার একটি সাক্ষাৎকারের অংশ তুলে দিতেই হচ্ছে।

আহমদ ছফাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনি কী মনে করেন হুমায়ুন আহমেদ এখন শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের সমান জনপ্রিয় লেখক?”
জবাবে আহমদ ছফা মুচকি হেসে বলেছিলেন, “হুমায়ুন আহমেদ এখন শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের চেয়েও জনপ্রিয় লেখক। কিন্তু মেরিটের দিক দিয়ে সে নিমাই ভট্টাচার্যের সমান। হি রাইটস ওনলি ফর বাজার!”

বিঃদ্রঃ লেখাটি হুমায়ুন আহমেদ জীবিত থাকাকালীন লেখা, মুক্তমনাতে প্রথম প্রকাশিত। কিছু পরিমার্জনার পরে পুনরায় প্রকাশ। 

Facebook Comments