আগে স্বপ্ন না বিশ্বাস?

লেখকঃ সোহম কর

সম্পাদক আসিফ মহিউদ্দীনের ‘কারো বিশ্বাসকে আঘাত করা ঠিক নয়?’ শীর্ষক প্রবন্ধের উপর ভিত্তি করে একটি আলোচনা করতে চাইছি। ‘সকল বিশ্বাসকেই যদি সম্মান করতে হয়, শ্রদ্ধা করতে হয়, তাহলে গোলাম আজম বা বাঙলা ভাইয়ের বিশ্বাসকেও শ্রদ্ধা করতে হবে, আবার হিটলারের বিশ্বাসকেও শ্রদ্ধা করতে হবে। সকল বিশ্বাসকে সম্মান করা শুধু বোকামি নয়, বিপদজনকও বটে।’

শীর্ষক প্রবন্ধটি থেকে উপরের এই লাইনগুলো উল্লেখ করলাম। যুক্তির বাঁধনে সম্পাদক চমৎকারভাবে পুরো বিষয়টিকে বুঝিয়েছেন। আমার ইচ্ছে আছে, এই বিশ্বাস ও যুক্তির মধ্যে যদি স্বপ্ন নামক এই বিষয়টিকেও যদি সম্পৃক্ত করা যায়। সংসদ বাংলা অভিধান অনুযায়ী মোট চারটি মানে দেওয়া আছে এই ‘স্বপ্ন’ শব্দটির। ১। ঘুমের মধ্যে প্রত্যক্ষবৎ অনুভূত বিষয়। ২। কোনও বিষ্যের প্রত্যক্ষবৎ অনুভব। ৩। কল্পনা (সুখস্বপ্ন)। ৪। নিদ্রা (শয়নে-স্বপনে)। কিন্তু আমি ঠিক ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা বলছি না। মানুষ তার ভবিষ্যত নিয়ে যে সুখকর বা অসুখকর কল্পনা করে, আমি তার কথা বলছি। ভবিষ্যতে সে কী দেখতে চায়? ভবিষ্যতে সে তার সমাজ বা ব্যক্তিগত জীবনকে কীভাবে পরিচালনা করতে চায়? এই বিষয়ে মানুষের যে চিন্তাভাবনা তার কথা বলছি। যার পোশাকি নাম দিবাস্বপ্ন। এই ধরনের স্বপ্ন, মানুষের মনে অতীতের ইতি টেনে দেয় এবং তার সঙ্গে এক চিন্তাশীল ভবিষ্যতের পথ বাতলে দেয়। যে বিষয়টা শিল্পীদের মধ্যে বেশি করে হয়। সেটা না হলে তো আর ফিকশনের সৃষ্টি হয় না। এখন এই স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে আর শুধু সৃজনশীল মানসিকতার মানুষজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হয়তো কালেই ছিল না। না হলে এতগুলো বিশ্বযুদ্ধ হত না। এর বিস্তার ছড়িয়ে গেছে সমস্ত শ্রেনীর মানুষের মধ্যেই। যেমন ছড়িয়ে গেছে ধর্মীয় মৌলবিদের মধ্যেও। এ প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ছে, কলকাতার বিখ্যাত কবি-গল্পকার-ঔপ্যনাসিক নবারুণ ভট্টাচার্য জীবনের শেষ জীবন পর্যন্ত একটা সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতেন। ওঁকে একবার জিগ্যেস করা হয়েছিল, ‘আপনি এখনও এসব নিয়ে ভাবেন, এর তো কোনও পয়েন্ট নেই।’ উনি বলেছিলেন, পয়েন্ট না থাকাটাই সবচেয়ে বড়ো পয়েন্ট। আমি সেই ড্রিমের কথা বলছি। একটা মানুষের মধ্যে ড্রিম না থাকলে সে কী করে বেঁচে থাকবে।

ঠিক এই ধরনের চিন্তা বা স্বপ্নগুলোই এখন মৌলবাদিদের মগজে ঘোরা ফেরা করছে। সেটা যেমন বাংলাদেশে আবার তেমনই ভারতেও। বাংলাদেশকে যেমন আর একটি পাকিস্তান বানানোর স্বপ্ন দেখছেন কেউ কেউ। আবার তেমনই ভারতকেও হিন্দুস্থান বানানোর স্বপ্ন দেখছে। তবে আমার মনে হয়, এটাই বিরোধ। এই ধরনের স্বপ্নগুলো কিছু কিছু মানুষের কাছে সোনার পাথর বাটির মতো। তারা প্রায়শয়ই এইভাবেই চিন্তা করে থাকেন, আহা আমাদের দেশে শুধুই হিন্দু থাকবে বা ইসলাম থাকবে। এটা অনেক পরে গিয়ে বিশ্বাসে পরিণত হয়। আগে তারা স্বপ্নটাকে লালন করে। এখন এই অবচেতন বা সচেতন মনে এই স্বপ্নগুলো গজিয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ থেকেই। যেমন —

* কোনও পুরুষের স্বপ্ন, সে হয়তো একদিন তার পাশের বাড়ির মেয়েটিকে বিকিনি পড়ে দেখবে। এখন এই স্বপ্নটা দেখতে দেখতেই মনের ভীতর বিশ্বাস জন্মায়। মেয়েটিকে একদিন বিকিনি পড়ে দেখা যাবেই।
* কোনও হিন্দুর বাড়ির সামনে একটি মসজিদ আছে। তার প্রতিদিন আজান শুনতে ভালো লাগে না। সে প্রায়ই স্বপ্ন দেখে, যদি সে প্রতিদিন সকালে উঠে হরিনাম শুনতে পেতো। আর এভাবেই স্বপ্ন একদিন বিশ্বাসে পরিণত হয়।
* ছোটবেলা থেকে মানুষকে বোঝানো হয়, বড়দিনের আগের রাতে স্যান্টা আসবে। গিফট দিয়ে যাবে। এবং সে সেই স্বপ্ন দেখে। কিছুদিন পরে তার সেই বিষয়টা বিশ্বাসে পরিণত হয়।

মানুষ কখন কী অবচেতন মনে ভাবছে, তার নাগাল মনে হয় মানুষের কাছেও থাকে না। কাজেই যখন সেই নাগাল পাওয়া যায়, তৎক্ষনাত সেই স্বপ্নকে যুক্তির জালে ছেঁকে নেওয়া দরকার। স্বপ্ন অযৌক্তিক হতেই পারে, কিন্তু অযৌক্তিক বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নয়। তখন সেটা আর বিশ্বাস থাকে না। অন্ধবিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়।

Facebook Comments
%d bloggers like this: