নারীর শরীর কেন্দ্রিক সম্মানের ধারণা

নারীর শরীরের ওপর বাড়তি পবিত্রতা আরোপ করা এবং শরীরে অবস্থিত মান সম্মানের ধারণা, তা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত আদিখ্যেতা একটি পুরুষতান্ত্রিক ধারণা। নারীকে আরো ভালভাবে বোঝানো যে, তোমার শরীর দেখা গেলেই তোমার সম্মান শেষ, তোমার মান মর্যাদা সব শেষ! এই শরীর কেন্দ্রিক সম্মান নিয়ে আহারে উহুরে করা লোকজনার অভাব হয় না। কিছু অশিক্ষিত অসভ্য লোক সবসময়ই জমা হবে আহারে উহুরে জানাতে।  যেন নারীর শরীর দেখা গিয়েছে বলে সেই নারীর খুউউউব অসম্মান হয়ে গেছে। কেন ভাই, শরীর কী শুধু নারীর আছে? পুরুষের নাই?

নারীর শরীর মানেই যেন তাদের কাছে একটি সেক্স অবজেক্ট। শরীর মানেই যে সেক্স নয়, এই সাধারণ জ্ঞানটুকু তাদের নেই। যেন একটি নারীর শরীর দেখা গেলে তার মান সম্মান খোয়া যায়, যেন একটি নারী নগ্ন হলে তার খুব অসম্মান হয়; এই ধরণের চটুল ধারণা যখন মুক্তচিন্তার নামধারীরাই প্রচার করে, তখন তাদের মুক্তচিন্তার নমুনা দেখে হাসি পায়। সমস্যা তাদের না, তারা বেড়ে উঠেছেই এসব ধারণা নিয়ে। নারীর সম্মান রক্ষার্থে তারা এক একজন যেন বাঙলা সিনেমার নায়ক, নারীর শরীর নিয়ে কেউ কিছু বললে তারা হামলে পরে সেই নারীর ইজ্জত বাঁচাবে!

শোনেন ভাই, রাজনৈতিক স্যাটায়ার একটি প্রচলিত সমালোচনার ধারা। এই স্যাটায়ার কেমন হবে, তা আপনার ঠিক করতে হবে না। আপনার তা দেখে আঘাত লাগে? আপনার অনুভূতি আহত হয়? তাইলে দেখবেন না। ব্যাস। মুহাম্মদ যীশুকে নিয়ে স্যাটায়ারে আপনি হাততালি দেন, আর হাসিনাকে নিয়ে করলে আপনার অনুভূতিতে লাগে, এইটা আপনাদের কেমন মুক্তচিন্তা ঠিক বুঝি না। ছাত্রলীগের প্যাদানি খাওয়ার ভয় কী আল্লার বান্দাদের চাপাতির চেয়েও ভয়ানক?

এটা শার্লি এবদোর একটা কার্টুন। আঙ্গেলা মেরকেলকে নিয়ে করা। নারী বলে তাকে ছাড় দেয়া হবে কেন? নারী কী অবলা? যে তাকে এই ছাড় দিতে হবে?

পুরো পৃথিবী ব্যাপী শার্লি এবদোকে আমরা কেন সমর্থন দিয়েছিলাম? শার্লি এবদো যীশুকে নগ্ন করে স্যাটায়ার করে, মুহাম্মদকে করে। তারা কাউকে ছাড় দেয় না। তারা পুতিনকে করে, ওবামাকে করে, আঙ্গেলা মেরকেলকেও করে। সাদাদের করে, কালোদের করে। ইহুদীদের করে, খ্রিস্টানদের করে, মুসলমানদেরও করে। কেউ তাদের কাছে কোন এক্সট্রা খাতির পায় না। কেন? কারণ তারা কাউকে সমালোচনার, স্যাটায়ারের উর্ধ্বে মনে করে না। মুহাম্মদকে নিয়ে স্যাটায়ার করলে আপনি হাততালি দেবেন, আর হাসিনাকে নিয়ে করলে গোস্বা করবেন, আমরা কী এই মুক্তমনা চেয়েছিলাম?

ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প যখন নির্বাচন করছিলেন, ট্রাম্পের কিছু ন্যুড স্ট্যাচু বানানো হয়েছিল রাস্তায় রাস্তায়। ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ভয়াবহ। কিন্তু তাতে কী? বাক স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের এই আধুনিক সময়ে কেউ এই ধরণের স্যাটায়ার সমালোচনার ধারাকে বন্ধ করতে পারে না। ট্রাম্প বিরোধীরা একে একে ট্রাম্পের এই স্ট্যাচু নিয়ে ঠাট্টা মশোকরায় মেতে উঠেছিল। হাসাহাসি করেছিল ট্রাম্পের আনুবীক্ষনিক নুনু নিয়ে।

সেই সাথে আঁকা হয়েছিল একটি পেইন্টিং, যা বহু দামে বিক্রিও হয়েছে।

ট্রাম্পের অনুসারীরাও কম যায় নি। তারাও বানিয়েছিল হিলারীর নগ্ন ছবি। মহিলা বলে তাকে ছাড় দেয়া হবে কেন? রাজনীতিবিদদের নিয়ে স্যাটায়ার, সমালোচনা তো হবেই।

ঐদিকে খোদ জার্মানিতে, বোডমান ল্যুডভিগশাফেন শহরে পেটের লেঙ্ক নামক একজন বানিয়েছিলেন চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মেরকেলের একটি নগ্ন ভাষ্কর, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন গ্রুপ সেক্স।

সেই সাথে, নিয়মিত মেরকেলের নানা ধরণের স্যাটায়ার করা হয়। হবেই তো। একজন রাজনীতিবিদ জনগণের জীবনযাপনের সাথে সম্পর্কিত। জনগণের ভবিষ্যত, সুখ দুঃখ, ট্যাক্স এবং আয় উপার্জনের সাথে জড়িত। জনগণ যদি মনে করে, কোন বিশেষ রাজনৈতিক নেতার কারণে সে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, বা হবে, তাহলে কোন ভয়ভীতি ছাড়াই সে সেই রাজনীতিবিদ, ছেলে হোক মেয়ে হোক হিজরা হোক, সমালোচনা করতে পারে। স্যাটায়ার করতে পারে। কটাক্ষ করতে পারে। কটূক্তি করতে পারে। নগ্ন মূর্তিও বানাতে পারে। সভ্য দেশে আপনি একটু দুষ্টু স্যাটায়ার করলে আপনাকে কেউ কোপাবে না। কেউ আপনাকে ফাঁসি দেবে না। এগুলো তাদের অধিকার। একেই বাক স্বাধীনতা বলে। ব্যক্তি নির্ধারণ করবে সে কীভাবে কার সমালোচনা করতে চায়। কেউ করবে প্রবন্ধ লিখে, কেউ করবে ন্যুড ছবি এঁকে। যার ভাষা যেমন।

আপনার তা পছন্দ না? বেশ তো, দেখবেন না। কাহিনী শেষ!

Facebook Comments