সমালোচকের গুরুত্ব।

The moment you declare a set of ideas to be immune from criticism, satire, derision, or contempt, freedom of

thought becomes impossible.

-Salman Rushdie

 

সমালোচনা এবং একটি সমাজের প্রগতি পরস্পর সম্পর্কিত। মানব সভ্যতার সেই শুরুতেই, যখন চিন্তার উদ্ভব হয়েছিল, সন্দেহের উদ্ভব হয়েছিল, প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছিল, সমালোচনার বয়সও ঠিক ততটাই।  সমালোচনা করাই হয় প্রগতির জন্য। যেকোন ধারণা, তত্ব, যেকোন চিন্তাকে সমালোচনার মাধ্যমে ক্রমশ শুদ্ধ করে তুলতে না পারলে প্রগতির চাকার ঘোরা বন্ধ হয়ে যায়, সমাজ বদ্ধ হয়ে যায়, অন্ধকার যুগের সুচনা হয়। বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, অর্থনীতি থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে সমালোচনাই উৎকর্ষের পথ দেখায়। সমালোচনাই হচ্ছে সেই ছাকনী, যা সমাজকে ক্রমশ পরিশুদ্ধ করে, প্রগতির চাকা চালু রাখে, সভ্যতা নির্মান করে। একজন সমালোচক সবসময়ই জনমানুষের শত্রুতে পরিণত হন। একজন সমালোচক রবীন্দ্রনাথ হন না, কিন্তু একজন সমালোচকই রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথে পরিণত করেন। একজন সমালোচক শামসুর রাহমান হন না, কিন্তু একজন সমালোচকই শামসুর রাহমানকে শামসুর রাহমানে পরিণত করেন। একজন সমালোচক আইনস্টাইন হন না, তবে একজন সমালোচক বা আপক্ষিক তত্বের গবেষকই আইনস্টাইনকে আইনস্টাইনে পরিণত করেন।

মূলত একটা বিষয়ে সমালোচনা করতে গেলেই সেই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত এবং ব্যাপক অধ্যয়নের প্রয়োজন পরে। আমার সবচাইতে নির্বোধ সমালোচককেও আমি ভালবাসি, কারণ সে আমার সমালোচনা করতে গিয়ে আমার সম্পর্কে জেনেছে, আমাকে গবেষণা করেছে। আমাকে ঘেটেঘুটে দেখেছে, আমার সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছে, আমাকে ভেঙ্গে চুড়ে দেখেছে। তাই আমার অবস্থানের ভিত্তি আমার সমালোচনাকে উপরেই নির্ভর করে। একই ভাবে, ধর্মের সমালোচকরাই সর্বাধিক ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করেন। আর তাই ধর্ম সম্পর্কে নাস্তিকরাই সবচাইতে ভাল জানেন। আপনি যদি আওয়ামী লীগের খারাপ দিক সম্পর্কে জানতে চান, তবে অতি অবশ্যই আপনার আওয়ামীবিরোধী শিবিরের মতামত জানতে হবে। অন্ধ আওয়ামী লীগার কখনই আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সৎ মতামত দিতে পারবে না। ঠিক একইভাবে, আপনি জামাতের সমালোচনা জানতে পারবেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির কাছ থেকেই, কোনক্রমেই জামাত শিবির সদস্যদের কাছ থেকে নয়। অথচ আমাদের প্রজন্ম তৈরি করা হয়েছে জ্বী হুজুর প্রজন্ম হিসেবে। ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে স্কুল মাদ্রাসায় শেখানো হয়, মৌলানা সাহেব গুনগুন করে আরবী পড়বে, বাঙলা উর্দু মিলিয়ে বয়ান দিবে, আর কিছুক্ষণ পরে পরে জনগন বলে উঠবে “মাশাল্লাহ হুজুর” সুভানাল্লাহ, ভাল বলেছেন”; এই মাশাল্লাহ সুভানাল্লাহ সংস্কৃতি আমাদের সৃজনশীলতা নষ্ট করে, আমাদের একটা মেধা ও বুদ্ধিহীন প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীতে পরিনত করে, যারা মঞ্চে বসা লোকটার সাথে সাথে রোবটের মত মাথা ঝুলানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।

সমালোচকের মুখ যতবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, ততবার প্রগতি রুদ্ধ হয়ে গেছে। সেই প্রাচীন আমলে এরিস্টোটলের সমালোচনাকে পাপ মনে করা হতো। সর্বজ্ঞানের একমেবাদ্বিতীয়াম ঈশ্বর এরিস্টোটল যা বলে গিয়েছিলেন, তার বিরোধীতা করতে গিয়ে প্রচুর বিদগ্ধ মানুষ মারা গেছেন। তাই ইউরোপের জন্য এরিস্টোটলের পরবর্তী একটা দীর্ঘ সময়কে আমরা বলি অন্ধকার যুগ।এই সময়ে নির্যাতিত হন ব্রুনো, গ্যালিলিও, কোপারনিকাসের মত গুনী মানুষ, ধর্ম অবমাননার কারণে। কারণ বাইবেল ও চার্চ ছিল পুরো মাত্রায় এরিস্টোটলের অনুসারী, আর তারা তার বিরোধীতা করেছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যে সেই সময়টায় চমৎকার জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছিল। তারা গ্রীক এবং ভারতীয় দর্শন সহ নানান দর্শন গ্রহণ করে, তা অনুধাবন এবং সমালোচনা করে উৎকর্ষের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের খলিফাদের চোখে ধীরে ধীরে তারা পরিণত হন কাফের নাস্তিক মুরতাদে। তারা সেই সকল জ্ঞানীদের ক্রমশ হত্যা করে আরেক অন্ধকার যুগের সুচনা করেন, যেটা এখন পর্যন্ত চলছে। যদিও বর্তমান সময়ে সেই সকল কাফের নাস্তিক মুরতাদ জ্ঞানীদের ছাড়া ইসলামিস্টদের গর্ব করার মত আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। সেই সময়ের প্রচলিত ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধাচরণ করা কাফেররা হয়ে উঠেছেন আধুনিক ইসলামিস্টের ইসলামের স্বর্ণযুগের এবং খিলাফতের স্বপ্নদোষ।

সেই সময়েই দার্শনিক আল কিন্দিকে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে শাস্তি দেয়া হয়। ইবনে বাজার মত মহান চিন্তাবিদকে নাস্তিক্যবাদের অভিযোগে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়, কারণ ছিল, তিনি বলেছিলেন, “খাঁটি দর্শনের সঙ্গে ইসলামের সামঞ্জস্য হতে পারে না”; ইবনে রুশদকে কাফের এবং নাস্তিক খেতাব দেয়া হয়, নির্যাতন করা হয় নির্মমভাবে। ইবনে সিনা থেকে শুরু করে আল আল-রাজী সকলের বিরুদ্ধেই নানা ধরণের অভিযোগ ওঠে। আল রাজি সে সময়ে রচনা করেন কয়েকটি বই, যেগুলো হচ্ছেঃ

১) The Prophets’ Fraudulent Tricks – ‘নবীর ভন্ড চাতুরি’

২) The Stratagems of Those Who Claim to Be Prophets – ‘নবীর দাবিওয়ালাদের ছল চাতুরি

৩) On the Refutation of Revealed Religions ‘প্রত্যাদিস্ট ধর্মসমূহ খন্ডন প্রসঙ্গে’

 

একইভাবে সে সময়ের প্রায় সমস্ত জ্ঞানী, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসকের বিরুদ্ধেই আনা হয় ধর্মবিরোধীতার অভিযোগ। তাদের হত্যা করে, নির্যাতন করে সমালোচনার মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়, একই সাথে প্রগতিরও। অথচ এই কয়েকজন দার্শনিক-বিজ্ঞানী-চিকিৎসক ছাড়া মুসলমানদের গর্ব করার মত কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তারা বেমালুম সেই সব নির্যাতনকে ভুলে গিয়ে এই সকল কাফের নাস্তিক মুরতাদকে মুসলিম বলে চালিয়ে দিয়ে গর্ব করে। তারা প্রায়শই যুক্তিতর্কে কোনঠাসা হলে বা ঐতিহাসিক সত্যগুলো সামনে নিয়ে আসলে বলে থাকেন, সেই সময়ের খলিফাদের শাসন ছহি ইসলাম নহে। কিন্তু তাদের ছহি ইসলাম টা যে আসলে কি বস্তু, আজ পর্যন্ত তার কোন হদিস পাওয়া গেল না। এমনকি মুহাম্মদ নিজেও সম্ভবত ছহি ইসলামের অনুসারী ছিলেন না, তা না হলে তিনি কিভাবে যুদ্ধবন্দী-দাসী-শিশু ভোগ করেছেন! সমানে কাফের মেরেছেন, মূর্তি ভেঙ্গেছেন। আবার বলার সময় মুখ উলটে বলেছেন, যার যার দ্বীন তার তার!!

এমনকি ওমর খৈয়াম, আল্লামা ইকবাল, কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। কি আশ্চর্য্য, আজ তারাই মুসলিমদের গর্বের ধন। তাদের ছাড়া মুসলিমদের একদিনও চলে না। আমি জানি, কাল যদি আমার মত নাস্তিকও কোন গুরুত্বপুর্ণ কাজ করে বসি, কিছু বছর পরে ইসলামিস্টরা আমাকে নিয়েও লাফালাফি শুরু করবে। তখন আমাকেও বানানো হবে ইসলামের মহান ত্রানকর্তা!!!

কিন্তু সমালোচনা, জ্ঞান আহরণ, যুক্তিবাদীতা বন্ধ করা যাবে না। সমালোচনার ধারা অব্যাহত রাখতে হবে, চাছাছোলা সমালোচনা করেই প্রগতির চাকা চালু রাখতে হবে, শুদ্ধতার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। একজন সমালোচক কখনই জনপ্রিয় হতে পারবেন না, জনপ্রিয়তা তার মোক্ষও নয়। তবে সে সমাজের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন নিশ্চিতভাবেই। তাতে যদি তার মৃত্যুও ঘটে, সেটাই হবে তার বিজয়। কারণ এই তালিকায় তিনি একা নন, এই তালিকায় রয়েছেন আরো অনেক জ্ঞানী দার্শনিক বিজ্ঞানী চিকিৎসক বৃন্দ, যাদের অবদানে এই সভ্যতা এই পর্যন্ত এসেছে।

 

Facebook Comments