পাহাড়ের কান্না!

রাঙ্গামাটি জেলার লঙ্গদু উপজেলায় আদিবাসীদের শত শত ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে বীর বাঙালি সেটেলাররা। অনেককেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ইতিমধ্যে মারাও গেছেন কয়েকজন। এবারেই যে প্রথম এই ধরণের ঘটনা ঘটলো তা নয়, বহু যুগ ধরেই চলে আসছে এসব। জনসংখ্যা এবং অত্যাচারের হিসেব করলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, পাকবাহিনী বাঙালির ওপর এত দীর্ঘদিন ধরে এতো অত্যাচার করতে পারে নি, যতটা বাঙালি করেছে আদিবাসীদের ওপর। ঠিক যেন সেই একাত্তরের রক্তাক্ত নয়মাসেই বসবাস করছে বাঙলাদেশের আদিবাসীরা, বছরের পর বছর ধরে। একই ঘটনার নিয়ে কয়েকদিন পরে পরে লিখতে হয়, এরপরে আবারো আরেক ঘটনা চলে আসে। এই ধরণের ঘটনা ঘটলেই আমার মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা, যখন ভারতে বাবরী মসজিদ পোড়ানোকে কেন্দ্র করে বাঙলাদেশে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল।

কি অদ্ভুত কাণ্ড। কোথাকার কোন ভারতের কোথাকার কোন ইট পাথরের মসজিদ ভেঙ্গেছিল, তাই নিয়ে আমার প্রতিবেশী হিন্দুদের বাড়ি কেন পোড়ানো জরুরি তা বালক আমার মাথায় ঢোকে নি। আজও বুঝতে পারি না। চোখের সামনে দেখেছি, নির্বিবাদী ভাল মানুষ বলে পরিচিত মুসলমানরা কীরকম রক্তপিপাসু দানব হয়ে উঠেছিল রাতারাতি। যেই হিন্দু ছেলেটার সাথে ছোটবেলা একই মাঠে খেলেছে, সেই ছেলেটিকে খুন করার জন্য কেমন আকুলতা ছিল তার ওখে মুখে। যেই হিন্দু মেয়েটাকে ভালবাসতো এলাকার এক মুসলমান, বিধর্মী হওয়ার কারণে বিয়ে করতে পারে নি, সেই মেয়েটাকে রেইপ করার জন্য কীরকম ভয়ঙ্কর দানব হয়ে উঠেছিল আমারই এলাকার বড় ভাই মুসলমানটি। কারণ কী? কোথাকার কোন বাবরি মসজিদ কে বা কাহারা ভেঙ্গেছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার! কী লজ্জার ব্যাপার!

আর এখানে কী ঘটেছে? দীঘিনালার চারমাইল নামক একটা জায়গায় যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন নামে একজনের লাশ পাওয়া গেছে। নুরুল ইসলাম নয়ন ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালাতো। নুরুল ইসলামের বাড়ী লঙ্গদুতে। তার লাশ পাওয়া যাওয়াতে বাঙালি সেটেলারদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে। কে মেরেছে কীভাবে কী হয়েছে তা না জেনেই শতশত বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে বাঙালি বীরেরা। এরকম তো সবসময়ই ঘটে আসছে, ঘটে চলছে। কোন ঘটনা দুর্ঘটনা ঘটলেই সংখ্যালঘুদের ওপর চোটপাট করা, তাদের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া এখন তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।

মেইন্সট্রিম মিডিয়া বরাবরের মতই বেশিরভাগ ঘটনা চেপে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে কিছুটা এখন জানা যাচ্ছে। বহু সংখ্যক সেনাকর্মকর্তা, যারা আদিবাসী নির্যাতনের জন্য সরাসরি দায়ী, তারা এখন আমাদের সুশীল সমাজে পরিণত হয়েছে। মিডিয়ায় তাদের মুখ বারবার দেখি। বাঙলাদেশের সেনাবাহিনীর ভেতরে সেই শুরু থেকেই পাকি প্রেতাত্মা ঢুকে বসে আছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক মেজর মো. রেজাউর রহমান বাঙলাদেশের আদিবাসীদের খাপ্পা উপজাতি বলে সম্বোধন করে ফেইসবুকে লেখে, সরকারের একটা আদেশ পেলেই হলো, উপজাতিদের ‘অ্যানিহিলেট’ করতে’ তাঁদের নাকি মাত্র এক মাস সময় লাগবে৷ তার ভাষা থেকে অন্তত এইটুকু পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আদিবাসীদের সম্পর্কে আসলে বাঙলাদেশের রাষ্ট্র কী ধারণা পোষণ করে, এবং সেনাবাহিনী আসলে কী করতে চায়। একজন আর্মির মেজর যখন এই বক্তব্য দেয়, তা কিন্তু কোন উত্তেজিত সাধারণ নাগরিকের এলেবেলে বক্তব্য নয়। সেনাবাহিনীতে তাদের কী শিক্ষা দেয়া হয়, তাদের কী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তা এই ধরণের কথা থেকেই স্পষ্ট হয়ে আসে। এক সেনাসদস্য তো প্রকাশ্যেই বলেছিলেন,তাঁরা পাহাড়ের মাটি চান, পাহাড়ের মানুষদের নয়৷  মনে করে দেখুন তো, একাত্তরে এই একই বক্তব্য কে বা কারা দিয়েছিল? সেই টিক্কা খান কী এখন একজন? নাকি হাজার হাজার?

পুলিশ, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্রের নির্দেশেই যখন ঘরে আগুন দেয়া হয় আদিবাসীদের, তখন হতবাক হয়ে ভাবতে, হয়, এই রাষ্ট্র কী আমার? এই লজ্জা কী আমাদেরও নয়?

মনে আছে কল্পনা চাকমার কথা?

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রতিটি জাতীয়তাবাদী মানুষ, প্রতিটি ধার্মিক মানুষ নিজের মনের খুব গোপন জায়গাতে অন্য জাতির, অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি অবজ্ঞা, ঘৃণা, ক্ষোভ জমা করে রাখেন। এই দেশটি বাঙালির, বা এই দেশটি মুসলমানের, এই ধারণা তাদের ভেতরে এক ধরণের মালিকানাবোধের জন্ম দেয়। তাই কিছু হলেই হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়, আর আদিবাসীদের শোনানো হয়, এই দেশটি তাদের নয়। এগুলোর সাথে যখন রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী এবং পুলিশ, সেই সাথে মোল্লাশ্রেণি যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি হয় ভয়াবহ। রাষ্ট্র বাঙালি মুসলমানদের শেখায়, এই দেশটি বাঙালির, এই দেশটি মুসলমানের। এগুলো যখন শেখানো হচ্ছে, যারা শিখছে তারা সুবোধ বালকের মত বসে তো থাকবে না। তারা ব্যবহার করতে চাইবে এই ক্ষমতার।

ছোটবেলা থেকেই জাতি ধর্মে বিভক্ত করে রাখা এইসব মানুষদের শেখানো হয়, শিখিয়ে শিশুদের এক একটি সাম্প্রদায়িক সাপে পরিণত করা হয় যারা যাদের বিষধর দাঁতগুলো লুকিয়ে রাখে। সাম্প্রদায়িক আক্রমণের সময় সেই দাঁতগুলো বেড়িয়ে পরে। তারা আসলে নানা অজুহাতে বিধর্মীদের উপরে আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে থাকে। সুযোগ পেলেই কুকুরের মত তখন তারা ঝাঁপিয়ে পরে অন্যদের উপর। আর এই সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন জুড়ি নেই। রাজনৈতিক দলের দোষ দিয়েই বা কী লাভ, যেখানে রাষ্ট্রের চরিত্রই নোংরা এবং ফ্যাশিস্ট!

রাষ্ট্র হিসেবে বাঙলাদেশের এই ভয়ঙ্কর চরিত্রের পরিবর্তনের সময় হয়েছে। জাতীয়তাবাদী, ধর্মবাদী সকল প্রচার প্রচারণা, সেনাবাহিনী এবং পুলিশের সকল মাতব্বরি বন্ধ না করতে পারলে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাঙলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্রই তুলে নেবে আদিবাসীরা, ঠিক যেমনটা নিয়েছিল একাত্তরে বাঙালিরা।

ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব একটা মারপিট করা মানুষ না। ছোটবেলা অল্পবিস্তর মারপিট করেছি, একটু জ্ঞান হবার পরে এবং গৌতম বুদ্ধের ওপর কিছু বই পড়ার পরে অহিংস নীতি গ্রহণ করেছিলাম। এমনকি, কেউ আমাকে আক্রমণ করলেও আমি তাকে হত্যা করতে চাইবো না। কারণ আমি মনে করি সেটা কোন সমাধান নয়। সেটা আরো হত্যার রসদ যোগাবে। হত্যার বিরুদ্ধে হত্যা চলতেই থাকবে। যুদ্ধ, মারণাস্ত্র, সেনাবাহিনী, পুলিশ, কাউকে শারীরিকভাবে আক্রমণ, এই সবই আমার নীতিবিরুদ্ধ।

কিন্তু বাঙলাদেশের আদিবাসীদের ওপর বাঙলি সেটেলারদের বর্বর নির্যাতন দেখে আজকাল মনে হয়, ছোটবেলা অহিংস নীতি গ্রহণ না করলে এখন আমি আদিবাসীদের সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিতাম। এবং তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতাম। এই চিন্তা এমনিতে তৈরি হয় নি। অসম্ভব ঘৃণা থেকেই এই চিন্তার জন্ম।  তাই আমার মত ক্ষমতাহীন মানুষ, আমি শুধু বাঙালি জাতিসত্বার প্রতি ঘৃণা জানাতে পারি। বাঙলাদেশ এই জন্য স্বাধীন হয় নি। এই বাঙলাদেশ এখনো পরাধীন। এই স্বাধীনতার অর্থহীন, এই স্বাধীনতা আদিবাসীর রক্তে রঞ্জিত। এই স্বাধীনতা আমি চাই না।

Facebook Comments