নাস্তিকদের পাসপোর্টে ধর্মের জায়গায় কী লেখা? মুসলমান নাম কেন?

পাসপোর্ট অফিসে গিয়েছিলাম। কর্মরত ব্যক্তি আমার ফরমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, কারণ আমার পাসপোর্ট ফরমে ধর্মের জায়গায় লেখা নাস্তিক। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ধর্মের জায়গায় এইটা কী লিখছেন?
আমি বললাম, এর মানে হচ্ছে নাস্তিক, যে প্রচলিত কোন ধর্ম কিংবা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না।
তার তখন রীতিমত চেয়ার ভেঙ্গে পরে যাবার মত অবস্থা। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বললো, আপনের নাম দেখি মুসলমানগো লাহান।
আমি তাকে বললাম, নামের কোন হিন্দু মুসলমান নাই। নাম হচ্ছে নাম। নামের বাঙলা, হিন্দি, আরবি, ইংরেজি ইত্যাদি আছে। নামকরণ নানান সংস্কৃতি এবং ইতিহাস, সর্বোপরি ভাষার উপরে নাম নির্ভর করে। যেমন অনিন্দ্য নামটা, কিংবা অনন্যা নামটা, কিংবা রুদ্র নামটা, এগুলো মোটেও হিন্দু নাম নয়। এগুলো বাঙলা নাম। আবার ধরেন আবদুল্লাহ, মুহাম্মদ, খাদিজা, আলী, আবু বকর, ওমর, এগুলো মোটেও ইসলামী নাম নয়, এগুলো সবই আরবি নাম। আইয়্যামে জাহিলিয়ার সময়কার পৌত্তলিক নাম। কারণ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন মুহাম্মদ, প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন খাদিজা, এরপরে আলী, আবু বকর, ওমর এরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের আগেই তাদের এরকম নাম ছিল। ইসলাম পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই তাদের নাম সেগুলো রাখা হয়েছিল। তাদের পৌত্তলিক বাপদাদারা এরকম নামই রেখেছিল। সেটা ছিল আইয়্যামে জাহিলিয়াতের যুগ, পৌত্তলিক আরবের যুগ। তার মানে এগুলো আসলে ইসলামী নাম বলা হলেও পৌত্তলিক নামই। ইসলাম আরবে না এসে বঙ্গে আসলে মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী সাথীদের নাম বাঙলাও হতে পারতো। তখন হয়তো মুহাম্মদ হয়ে যেত প্রসনজিৎ। আবার ধরুন মুহাম্মদের পিতার নাম আবদুল্লাহ, যে মুহাম্মদের জন্মের আগেই মারা যান। মুহাম্মদের কাছে ওহী আসে ৪০ বছর বয়সে। তাহলে তার বাবার নাম আবদুল্লাহ বা আল্লাহর দাস হলো কীভাবে? অর্থাৎ আল্লাহ শব্দটার উপরেও ইসলামের একাধিপত্য নাই। আল্লাহ বা আল-ইলাহ তৎকালীন আরবের একজন বড় দেবতার নাম ছিল, যার তিনজন মেয়েও ছিল-লাত মানাত উজ্জা, কাবা ঘরে সেই দেবতার একটা বিশাল মূর্তি ছিল। মুহাম্মদ সেই আল্লাহ শব্দটাই ইসলামে গ্রহণ করেছেন, নিজের একেশ্বরের নামকরণ করেছেন তা থেকে।
সে বললো, আপনি আল্লায় বিশ্বাস করেন না কেন? আল্লাহ নাই এরকম প্রমাণ দেখাইতে পারবেন? বিজ্ঞান কী প্রমাণ করতে পারছে আল্লাহ নাই?
আমি বললাম, যা নাই তা অপ্রমাণ করা যায় না। আপনি অপ্রমাণ করতে পারবেন না যদি আমি বলি আমার পোষা আঠারোটা মেয়ে জ্বীন আছে। আল্লাহর অস্তিত্ব অপ্রমাণ করা যায় না, তাই সে থাকতেও পারে, যুক্তি এরকম হলে বলতে হয় রাম গরুড়ের ছানা, হাট্টিমাটিম টিম, মনসা দেবী শীতলা দেবী ওলা দেবী কালী শিব জিউস থর এগুলো কিছুই বিজ্ঞান অপ্রমাণ করে নি, তাই থাকতেও পারে! কিন্তু বিজ্ঞানের খেয়ে দেয়ে অনেক কাজ আছে এসব নেই তা প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা ছাড়া। যে দাবী উপস্থাপন করে, তথ্যপ্রমাণ তারই দাবী করতে হয়। অন্য কেউ তা প্রমাণ বা অপ্রমাণ করবে না। নাস্তিকদের অবস্থান অনেকখানি মুক্ত। ঈশ্বরে অবিশ্বাস উপযুক্ত প্রমাণের অভাবেই, ঠিক যেমন আমরা শেওড়া গাছের পেত্নীতে অবিশ্বাস করি। আমরা বলি না “বিজ্ঞান কি পেরেছে শেওড়া গাছের পেত্নীকে মিথ্যা অপ্রমাণ করতে?” আসলে শেওড়া গাছের পেত্নী আর ঈশ্বরের ধারণার মধ্যে খুব তফাত নেই।
সে চোখ কপালে তুলে বললো, আপনে নাস্তিক ধর্ম গ্রহণ করছেন, তাইলে নাস্তিক ধর্মের নাম লইলেন না কেন?
আমি বললাম, নাস্তিক্যবাদ কোন ধর্ম না ভাই। এটা কোন আচার সর্বস্ব কিংবা আসমান থেকে টুপ করে পরা কোন কেতাব সর্বস্ব বিষয় না। এটা এক ধরণের যৌক্তিক দার্শনিক অবস্থান। এই ধর্মের কোন নাম নেই। যে যেই ভাষাভাষী, সে সেভাবেই তার নাম রাখতে পারে, কিংবা অন্য ভাষার নামও রাখতে পারে। কোন বাধা নেই। নাস্তিক্যবাদ কোন নামের অধিকার নিয়ে মাতব্বরি ফলায় না, সেই এখতিয়ার বা যুক্তি কোনটাই কোন ধর্ম কিংবা নাস্তিক্যবাদের নেই। তবে ধর্ম পালটালে বা নতুন ধর্ম গ্রহণ করলে যদি নামও পালটানো জরুরী হয়ে থাকে, তবে মুহাম্মদ, আলী, খাদিজা, ওমর, আবুবকর, এরা ইসলাম গ্রহণ করার পরে কী নাম পালটেছিল? নাকি তাদের পুরনো পৌত্তলিক ধর্মের নামই বলবত রেখেছিল?
তার চেহারা দেখে তখন মনে হচ্ছিল সে চিৎকার করে কান্না শুরু করবে। আমতা আমতা করতে করতে বললো, সবই বুঝলাম। কিন্তু আপনে নাস্তিক ধর্ম নিছেন, তাইলে নাম পালটাইলেন না কেন?
তখন বুঝতে পারলাম, এর সাথে আর বাক্যব্যয় অর্থহীন সময় নষ্ট। যত কথাই বলি না কেন, সে ঘুরায়ে ফিরায়ে একই কথা বলবে। কে জানি বলছিল, কবুতরের সাথে দাবা খেলা অর্থহীন। কারণ তুমি যতই চৌকশ চৌকশ চাল চালো না কেন, গ্র্যান্ডমাস্টারদের তুখোড় তুখোড় সব গুটি চেলে কিংবা একদমই নতুন কোন চাল দিয়ে বাজিমাত করো না কেন, তোমার প্রতিপক্ষ সেই ঘুরে ফিরে দাবার বোর্ডে হাগু করা ছাড়া আর কিছু করতে পারবে না। তাই ঝাড়ি দিয়ে বললাম যা লেখা আছে সেইটা কম্পিউটারে তুলেন। এত বক বক কইরেন না। ধর্ম এমন কেন সেই প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছে দেয়া লাগবে না। সে মিনমিন করতে করতে কম্পিউটারে নাম এবং ধর্ম এন্ট্রি করলো।
এই প্রশ্নটি অসংখ্যবার অত্যন্ত স্বল্প আইকিউ সম্পন্ন ছাগু, সেমিছাগু, বলদ, চটি পেইজের এডমিনগণ রেগুলার ইনবক্সে করে থাকে। “ভাই আপনে নাস্তিক, তাইলে আপনের মুসলমান নাম কেন?” অথবা “মানুষ যদি বান্দর থেকে আইসা থাকে, এখনো বান্দর আছে কেন?” কিংবা “আল্লাহ না থাকলে কোরআন নাজিল হইলো ক্যামনে?” মমিন মুসলমানের এমন টাইপের প্রশ্ন আসলে এতটাই নির্বোধ যে, এগুলো নিয়ে বড়জোর হাসাহাসি হতে পারে। একই উত্তর বারবার লিখতে লিখতে কীবোর্ডের ছাল উঠে যায়, কিন্তু হায়! তাদের অণ্ডকোষ সাইজের মগজে কিছুই ঢোকে না। হে আল্লাহ, তুমি এদের এত কম আইকিউ ক্যামনে দিলা? মগজের অধিকাংশ অঞ্চল যদি চটি দিয়ে ঠাসা থাকে, তাহলে অবশ্য যুক্তি বোঝা আসলেই দুষ্কর ব্যাপার।

আমার এক কথা বারবার বলতে ক্লান্ত লাগে, কিন্তু মাথায় ঘিলুহীন লোকগুলোর একই কথা বারবার বলতে কোন ক্লান্তি নেই! আমি জানি এখনো ব্যাপারটা মাথায় ঢোকে নি, তাই আবারো বলছি। ইসলামিক নাম, হিন্দু নাম বলে কিছু নেই। নাম ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্যের উপরে নির্ভর করে। কোন ধর্ম কোন নামের দাবীদার হতে পারে না। কারণ সেই নামগুলো ঐ বিশেষ ধর্মের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই ছিল। এমনকি যিশু নামটিও খ্রিষ্টানরা খ্রিষ্টান নাম বলে দাবী করতে পারে না। গৌতম নামটিও পারে না বৌদ্ধরা বৌদ্ধ নাম বলে দাবী করতে। ইরাকে একজন মন্ত্রী ছিলেন, অত্যন্ত ক্ষমতাবান মন্ত্রী, নাম তারেক আজিজ। লাফ দিয়ে ওনাকে মুসলমান ভাবার দরকার নাই। উনি খ্রিষ্টান ক্যাথলিক ছিলেন। আরব অঞ্চলে খ্রিষ্টান, ইহুদী অনেকের নাম শুনলেই প্রথম অবস্থায় মনে হবে মুসলমান। কিন্তু তাদের নাম মোটেও মুসলমান নাম নয়, তাদের নামগুলো আরব নাম। আবার ভারতবর্ষে অনেক বাঙলা নামধারী ব্যক্তিই মুসলমান ছিলেন এবং আছেন।
তাই মাথা খাটাতে হবে, অণ্ডকোষ সাইজের মগজের অধিকারী মমিনগণ একটু মগজ খাটান। আর ইসলামিক নাম, হিন্দু নাম বলে যারা চেঁচামেচি করে, লুঙ্গি উঁচু করে নিজেদের মুসলমানিত্ব প্রদর্শনে সদা ব্যতিব্যস্ত থাকে, যারা নামের ভেতরে মুসলমানিত্ব, ভাষার ভেতরে মুসলমানিত্ব, রাষ্ট্রের ভেতরে মুসলমানিত্ব, পোশাকের ভেতরে মুসলমানিত্ব কায়েমের স্বপ্ন দেখে, সর্বত্রই ধর্মের আধিপত্যের পক্ষে কথা বলে, তাদের পূর্বপুরুষরাই বাঙলাকে হিন্দুয়ানী ভাষা বলেছিল।

বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলেছিল, এখনো বলে।

Facebook Comments