পরিপ্রেক্ষিত, প্রেক্ষাপট এবং অন্যান্য

– ভাই, মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তো আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীকে খতম করার আহবান করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, আমরা ওদের ভাতে মারবো, পানিতে মারবো। তাইলে কোরানের আয়াতে যুদ্ধের সময় কাফের বিধর্মীদের ওপর আক্রমণের নির্দেশ তো খারাপ কিছু না। কাফের কতলের আয়াতগুলো তো যুদ্ধের সময় ধরে বিবেচনা করতে হবে। বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের সময় তো এরকম কথাই বলা স্বাভাবিক।

– আচ্ছা, আসুন আলাপ করি। প্রথমেই যা আমাদের খুব ভাল করে বুঝে নেয়া দরকার, যুদ্ধ কী, যুদ্ধ কাদের সাথে কাদের হয়। সেই সাথে, জাতি বা সম্প্রদায় বা ধর্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কীভাবে নানা অপরাধ সংঘটিত হয়।

১ যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যা

যুদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর মধ্যে সুসংগঠিত এবং কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘর্ষ। কোন পক্ষ একতরফাভাবে সশস্ত্র আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে গেলে এবং তার প্রত্যুত্তরে অপর পক্ষ কোন পদক্ষেপ না নিলে তাকে যুদ্ধ বলা যায় না। আবার, যুদ্ধাপরাধ কাকে বলে? যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে কোন যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত চলাকালীন সময়ে কোন ব্যক্তি কর্তৃক বেসরকারী জনগনের বিরুদ্ধে সংগঠিত, সমর্থিত নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়িত অপরাধ কর্মকান্ডসমূহ। আন্তর্জাতিক মানবাধিক আইন অনুসারে যুদ্ধকালিন সংঘাতের সময় বেসরকারী জনগনকে খুন, লুন্ঠন, ধর্ষণ, কারাগারে অন্তরীন ব্যক্তিকে হত্যা, সেই সাথে হাসপাতাল, উপাসনালয় ইত্যাদিকে কোন ধরনের সামরিক উস্কানি ছাড়াই ধ্বংস করাকেও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাহলে জেনোসাইড বা গণহত্যা কাকে বলে?
গণহত্যা বলতে নির্দিস্ট একটি ভৌগোলিক অংশে জাতি, বর্ণ, নাগরিকত্ব বা ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে একযোগে বা অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হত্যা করাকে বোঝায়। এফবিআই এর মতে গণহত্যা হল সেই হত্যাকান্ড যখন কোন একটা ঘটনায় চার বা তার অধিক সংখ্যক মানুষ মারা যায় এবং হত্যাকান্ডের মাঝে কোন বিরতি থাকে না। গণহত্যা সাধারণত একটি নির্দিস্ট স্থানে ঘটে, যেখানে এক বা একাধিক মানুষ অধিকাংশ সময় উপরে বর্ণিত কারণ বশত অন্যদের মেরে ফেলে।
Genocide is intentional action to destroy a people (usually defined as an ethnic, national, racial, or religious group) in whole or in part.

রেফারেন্সঃ

উদাহরণঃ
১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসি বাহিনী ইহুদীদের ওপর ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নৃশংস নির্যাতন এবং গণহত্যা চালায়। ইতিহাসে এই গণহত্যাকে হলোকাস্ট বলে।
২) ১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৫ সালে রুশ ককেসাস সেনাবাহিনী পূর্ব আনাতোলিয়ায় অগ্রসর অব্যাহত রাখলে, তুরস্কের তৎকালীন উসমানীয় সরকার স্থানীয় জাতিগত আর্মেনীয়দের স্থানান্তর এবং উচ্ছেদ শুরু করে। ফলশ্রুতিতে প্রায় ১৫ লক্ষের মত আর্মেনীয় মৃত্যুবরণ করেছিল যা আর্মেনীয় গণহত্যা বলে পরিচিত। সে সময় তারা নারী, শিশু ও বয়স্ক লোকজনদেরকে পাঠিয়ে দেয় মরুভূমিতে, যেখানে তারা পরে মারা যান।
৩) ১৯৭১ এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নৃশংস গণহত্যা চালায়। ধারণা করা হয়, এই গণহত্যায় ৩০ লক্ষ বাঙালি হত্যা করা হয়েছিল।

উপরের যেই তিনটি উদাহরণ দিলাম, এই তিনটি ইতিহাসে অন্যতম বড় তিনটি গণহত্যা। এর সাথে আরও বড় গণহত্যার লিস্ট করা যেতে পারে, যেমন ইউরোপীয়দের আমেরিকা যাওয়ার পরে সেখানে কোটি কোটি নেটিভ আমেরিকানদের ওপর শত শত বছর ধরে চলা নৃশংস গণহত্যা এবং উচ্ছেদ। বা এখনকার মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা নৃশংস গণহত্যা। লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি গণহত্যার সময়ই গণহত্যাকারীরা নানাধরণের প্রেক্ষাপট, পরিপ্রেক্ষিত, ইতিহাস বিকৃতি এবং মিথ্যাচারের অভিযোগ আনে।

এই গণহত্যাগুলো পরিষ্কার এবং ইতিহাসে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখিত। কেউ যদি কুট কৌশল করার জন্য কিংবা বাজে তর্কের জন্য বলে, বাঙালির ওপর গণহত্যা হয়েছিল, পাকিস্তানীদের ওপরেও বাঙালি গণহত্যা চালিয়েছে, পাকিস্তানীদেরও মেরেছে, তাহলে সেই তর্ক অত্যন্ত অসভ্য এবং মিথ্যাচার। কারণ বাঙালি মুক্তিবাহিনী কোন অবস্থাতেই কোন বেসামরিক পাকিস্তানীকে, পাকিস্তানী নারী শিশু বৃদ্ধ বা অসুস্থ মানুষকে হত্যা করে নি। এমনকি, জাতিয়তা বা বর্ণ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের উল্লেখ করে পাকিস্তানী পেলেই হত্যা করার কোন ঘোষণা দেয় নি। বরঞ্চ আক্রমণকারী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই ছিল সেই যুদ্ধ। সেনাবাহিনীর সাথে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধ বলেই গণ্য। সেনাবাহিনী যত সেনাকেই মারুক, একে কোনভাবেই গণহত্যা বলা সম্ভব নয়, যদি না একটি পক্ষ আত্মসমর্পন করে এবং আত্মসমর্পনের পরেও সেই সেনাবাহিনীকে হত্যা করা হয়।

আশাকরি কাকে গণহত্যা বলে, কাকে যুদ্ধাপরাধ বলে, কাকে যুদ্ধ বলে সেই বিষয়গুলো এখন পরিষ্কার।

২ জাতিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদ

ধরুন, কাল ইউরোপে কোন বাঙালি একটি বোমা বিস্ফোরণের সাথে জড়িত ছিল বলে জানা গেল। এর প্রতিশোধ নিতে ইউরোপে যদি এখন বলা শুরু হয়, যেখানেই বাঙালি পাও হত্যা করো, তাহলে ব্যাপারটা হবে ভয়াবহ অপরাধ। কারণ অপরাধ যদি করেও থাকে, করেছে একজন মাত্র বাঙালি। তার জন্য সমস্ত বাঙালি, সেই সাথে নারী শিশু বৃদ্ধা প্রতিবন্ধী সমস্ত বাঙালিকে দোষারোপ করা যায় না। যদি কেউ তা করে, তাকে আমরা জাতিবিদ্বেষ বা বর্ণবাদ বলতে পারি।

কোন বাঙালি যদি অপরাধ করেও থাকে, আইন অনুসারে সেই অপরাধীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে শাস্তি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু একজনার অপরাধে পুরো বাঙালি জাতি ধরে কেউ হত্যা ধর্ষণ বা আক্রমণের হুমকি বা নির্দেশ দিতে পারে না। যদি বলা হয়, বাঙালি পুরুষদের হত্যা করে তাদের স্ত্রী কন্যাদের গনিমতের মাল বানাও, তা হবে মানবতার চরম অবমাননা।

একই কথা প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রেই। কোন মুসলমান যদি জঙ্গি হয়, তার জন্য ঢালাও ভাবে সকল মুসলমানকে কেউ হত্যা করতে বলতে পারে না। কোন রোহিঙ্গা যদি ইয়াবা ব্যবসায়ী হয়, তার জন্য জাতি ধরে কেউ বলতে পারে না, রোহিঙ্গারা সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী! বললে তা হবে বর্ণবাদী আচরণ। এবং তা হবে খুবই ভয়াবহ অপরাধ।

সেই সাথে, কেউ ইহুদী বা বৌদ্ধ বা হিন্দু বা খ্রিস্টান বা শিখ বা আহমদিয়া বা শিয়া বা সুন্নি বা নাস্তিক বা আস্তিক বা সমকামী বা বিষমকামী বা নারী বা পুরুষ কাউকেই হত্যা করতে বলতে পারে না। ধরুন আমার এক খ্রিস্টান বন্ধু আমার টাকা ধার নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। আমি এই অবস্থায় বলতে পারি না, খ্রিস্টানরা খারাপ, তাদের হত্যা করো। যদি বলি, তা হবে চরম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং ঘৃণিত। কোন বা কিছু ব্যক্তির অপরাধের কারণে ধর্ম বর্ণ গোত্র সম্প্রদায় ধরে ঐ ধর্ম বর্ণ গোত্র সম্প্রদায়ের সকলের বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়া, হত্যা করতে চাওয়া, নারী শিশুদের গনিমতের মাল বানাবার চেষ্টা করা অবশ্যই বর্ণবাদী এবং সাম্প্রদায়িক আচরণ।

এবারে আসুন জেনে নিই, ইসলামে কাফের, মুশরিক, মুরতাদ এবং মালাউন কাকে বলে।

কাফের– ইসলাম অনুসারে সকল মুসলিম হচ্ছে মুমিন আর সকল অমুসলিম হচ্ছে কাফের। মুমিন শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসী বা অমুসলিম শব্দের আরবী হচ্ছে কাফের। কেউ যখন বলবে, কাফেরদের মারো, তখন তা ধর্ম বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সমগ্র অমুসলিমকেই বলবে।

মুশরিক– ইসলাম অনুসারে যারা মূর্তিপূজা করে তাদের মুশরিক বা বাঙলায় পৌত্তলিক বলে। পৌত্তলিক মানেই আরবীতে মুশরিক। কেউ যখন বলবে, মুশরিকদের জবাই করো, তখন তা ধর্ম বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সমগ্র পৌত্তলিক বা মূর্তিপুজারীদেরকেই বলবে।

মুরতাদ– মুরতাদ হচ্ছে সেই লোক যে প্রথমে ইসলাম গ্রহন করেছিলো কিন্তু পরে ইসলাম ত্যাগ করে। হাদীস অনুসারে মুরতাদের শাস্তি হচ্ছে তাকে হত্যা করা।

মালাউন– মালাউন শব্দের অর্থ লানত প্রাপ্ত বা অভিশাপ প্রাপ্ত। এটা স্পষ্টতই একটা গালি। আল্লাহ তালাহ নিজেই কোরআনে অমুসলিমদের লানতপ্রাপ্ত এবং অভিশপ্ত বলে গালাগালি করেছেন।

এবারে আসুন মুসলমানদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন থেকে কয়েকটি আয়াত পড়ি-

  • কোরান ৯:৫ – অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাটিতে তাদের সন্ধনে ওৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।

- এখানে লক্ষ্য করে দেখুন, মুশরিকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুশরিক মানে মূর্তিপুজারী। এখানে কিন্তু কয়েকজন দুষ্টু বা অপরাধী মুশরিক বা অমুক তমুকের নাম ধরে হত্যা করতে বলা হয় নি। বলা হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ধরে। মুশরিকদের। তার মধ্যে যে কেউ হতে পারে। এই কথাটি এমনভাবেও বলা যেতো যে, কোন মুশরিক যদি তোমাদের আক্রমণ করতে আসে, তখন তাকে হত্যা করো। সেরকম হলে এই নিয়ে আলোচনার কিছু থাকতো না।

  • কোরান ৯:২৯ – তোমরা যুদ্ধ কর ‘আহলে-কিতাব’ এর ঐ লোকদের (ইহুদী এবং খৃষ্টান) সাথে যাহারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তার রসুল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহন করেনা সত্য ধর্ম ইসলাম, যতক্ষণ-না করজোড়ে তারা জিযিয়া কর প্রদান করতে বাধ্য থাকে।

- এখানে লক্ষ্য করে দেখুন, ‘আহলে-কিতাব’ এর ঐ লোকদের (ইহুদী এবং খৃষ্টান) সাথে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে কিন্তু কয়েকজন দুষ্টু বা অপরাধী ইহুদী এবং খৃষ্টান বা অমুক তমুকের নাম ধরে হত্যা করতে বলা হয় নি। বলা হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ধরে। ইহুদী এবং খৃষ্টানদের। তার মধ্যে যে কেউ হতে পারে। নারী শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধা প্রতিবন্ধী। বেসামরিক লোকজন।

  • কোরান ৫:৫১  – হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।

- এখানে লক্ষ্য করে দেখুন, ‘আহলে-কিতাব’ এর ঐ লোকদের (ইহুদী এবং খৃষ্টান) সাথে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে কিন্তু কয়েকজন দুষ্টু বা অপরাধী ইহুদী এবং খৃষ্টান বা অমুক তমুকের নাম ধরে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয় নি। বলা হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ধরে। ইহুদী এবং খৃষ্টানদের। তার মধ্যে যে কেউ হতে পারে। নারী শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধা প্রতিবন্ধী। বেসামরিক লোকজন। সকলেই খারাপ?

  • কোরআন ৮:৫৫ – “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট জীব তারাই যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং অবিশ্বাস করে।”

- এখানে লক্ষ্য করুন, আল্লাহ ধর্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে অমুসলিমদের নিকৃষ্টতম জীব বলে আখ্যায়িত করে গালাগালি করেছেন।

  • কোরান ৪৮:২০ – আল্লাহ তোমাদেরকে বিপুল পরিমান যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (war booty/গনিমতের মাল/নারীসহ অন্যান্য) ওয়াদা করেছেন, যা তোমরা লাভ করবে যুদ্ধে পরাজিত মুশরিকদের কাছ থেকে।

- নারী শিশু কী যুদ্ধের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে? তাদের কেন গনিমতের মাল বানানো হবে?

  • কোরান ৪৮:১৬ – তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ-না তারা মুসলমান হয়ে যায়।
  • কোরান ৮:৩৯ – তোমরা কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না ভ্রান্তি শেষ হয়ে যায় এবং আল্লাহ র সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।>
  • কোরান ৮:১২ – …আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব, কাজেই তাদের গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাটো জোড়ায় জোড়ায়।
  • কোরান ৮:১৭ – সুতরাং তোমরা তাদেরকে (কাফের) হত্যা কর নি, বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি মাটির মুষ্টি নিক্ষেপ কর নি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং যেন ঈমানদারদের প্রতি এহসান করতে পারেন যথার্থভাবে।
  • কোরান ৯:৭৩ – হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং মুনাফেকদের সাথে; তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হল দোযখ এবং সেটা হল নিকৃষ্ট ঠিকানা।
  • কোরান ৯:১২৩ – হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তি কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক। আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকিনদের সাথে রয়েছেন।
  • কোরান ৯৮:৬ – আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।

২৮১৮. ‘উমার ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ্ (রহ.)-এর আযাদকৃত গোলাম ও তার কাতিব সালিম আবূন নাযর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) তাঁকে লিখেছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা জেনে রাখ, তরবারির ছায়া-তলেই জান্নাত।

পরিচ্ছদঃ ৩৭০ : দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে
১৩/১৮২৯। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যে পর্যন্ত মুসলিমরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করবে। এমনকি ইহুদী পাথর ও গাছের আড়ালে আত্মগোপন করলে পাথর ও গাছ বলবে ‘হে মুসলিম! আমার পিছনে ইহুদী রয়েছে। এসো, ওকে হত্যা কর।’ কিন্তু গারক্বাদ গাছ [এরূপ বলবে] না। কেননা এটা ইহুদীদের গাছ।’’ (বুখারী-মুসলিম) 
- লক্ষ্য করুন, এখানে কিন্তু এক বা দুইজন ইহুদীর কথা বলা হয় নি, বলা হয়েছে সমস্ত ইহুদীদের কথা।

নিচের হাদিসটি পড়ুন।
পরিচ্ছদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ

৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) ... ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি' (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
Ibn 'Aun reported: I wrote to Nafi' inquiring from him whether it was necessary to extend (to the disbelievers) an invitation to accept (Islam) before meeting them in fight. He wrote (in reply) to me that it was necessary in the early days of Islam. The Messenger of Allah (ﷺ) made a raid upon Banu Mustaliq while they were unaware and their cattle were having a drink at the water. He killed those who fought and imprisoned others. On that very day, he captured Juwairiya bint al-Harith. Nafi' said that this tradition was related to him by Abdullah b. Umar who (himself) was among the raiding troops.
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

৩ ন্যায়/অন্যায় যুদ্ধ

যুদ্ধ দুই ধরণের হতে পারে। ন্যায় যুদ্ধ এবং অন্যায় যুদ্ধ। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সকল যুদ্ধই দিনশেষে অন্যায় যুদ্ধই, কিন্তু সেই আলোচনা অন্য সময় করা যাবে। আপাতত পয়েন্টে থাকি। পয়েন্ট হচ্ছে ন্যায় যুদ্ধ এবং অন্যায় যুদ্ধ।

ধরুন আপনি এবং আপনার পাশের বাড়ির ভদ্রলোক এই দুইজনার মধ্যে জমিজমা নিয়ে খুব শত্রুতা। আপনারা প্রায়ই রাস্তায় মারামারি করেন, একে অপরকে গালাগালি করেন। আপনাদের মধ্যে কে ন্যায় করছেন কে অন্যায় করছেন সেই হিসেব আলাদা। পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে তা সিদ্ধান্তে আসা যাবে। কিন্তু এই শত্রুতার জের ধরে একদিন সেই ভদ্রলোক আপনার কন্যাকে ধর্ষণ করে ফেললো। কিংবা ধরুন আপনাকে হত্যা করে আপনার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গিয়ে যৌনদাসী বানালো। সেই ভদ্রলোক যদি শুরুতে ন্যায় যুদ্ধও করে থাকে, তারপরেও পরবর্তীতে আপনাদের পারস্পরিক শত্রুতার জের ধরে স্ত্রী কন্যাকে রেইপ করা অবশ্যই অন্যায়। সাথে সাথেই ঐ ব্যক্তি অন্যায় করছেন বলে বুঝে নিতে হবে।

ন্যায় যুদ্ধ আত্মরক্ষামূলক। অন্যায় যুদ্ধ আগ্রাসনমূলক। আত্মরক্ষা মূলক নাকি আগ্রাসন মূলক তা বোঝা যায়, কোন যুদ্ধে কারা বেসামরিক সিভিলিয়ান কিংবা নারী শিশুকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানায়। যুদ্ধ সাধারণত হয় দুটো সামরিক বাহিনীর মধ্যে। তাদের তৈরি করাই হয় যুদ্ধ করার জন্য। তাই যুদ্ধের ময়দানে একদল আরেকদলকে যখন হত্যা করে,আধুনিক নিয়মকানুন মোতাবেক তাকে আমরা যুদ্ধে হতাহত ধরি। কিন্তু সেই যুদ্ধে যদি বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করা হয়, নারী শিশু প্রতিবন্ধী অসহায় মানুষকে কতল করা হয়, তা যে পক্ষই করুক, তাকে অন্যায় বলেই ধরে নিতে হবে। যারা এগুলো করবে তারা অন্যায় করবে। সেটার প্রেক্ষাপট যাই থাকুক না কেন।

আবারো বলছি। প্রেক্ষাপট যাই থাকুক না কেন, বেসামরিক মানুষকে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত করা অন্যায়। মেয়েদের যুদ্ধবন্দী বানানো, তাদের ধর্ষণ করা, যৌন দাসী বানানো, মানব ইতিহাসে সবচাইতে বড় অন্যায়গুলোর একটা।

৪ মুক্তিযুদ্ধ

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এমন কোন উদাহরণ কী রয়েছে, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বেসামরিক মানুষকে আক্রমণ করতে উষ্কানি দিয়েছেন? কোন ন্যায় যুদ্ধের সময়ে যেসব বক্তব্য দেয়া হয়, সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে শুধুমাত্র সামরিক আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বলা হয়। জাতি বা ধর্মবিশ্বাস বা সম্প্রদায় ধরে বক্তব্য দেয়া হয় না। কারণ তাতে নারী শিশু বৃদ্ধ অন্তর্ভূক্ত থাকে। বেসামরিক মানুষ থাকে। এমন অনেক মানুষ থাকেন যারা সরাসরি ঐ যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত নন।

আসুন পড়ি, শেখ মুজিবুর রহমান আসলে সাতই মার্চের ভাষণে কী বলেছিলেন।

এরপরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় – তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু – আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না।

উপরের লাইনগুলো সাতই মার্চের ভাষণের। পড়ে দেখুন। দূর্গ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে যদি আর একটাও গুলি চলে তার পরিপ্রেক্ষিতে। শত্রুর মোকাবেলা করতে বলা হচ্ছে। শত্রু কে? ভাতে পানিতে মারার কথা বলা হচ্ছে। কাকে? সমস্ত পাকিস্তানীকে? পাকিস্তানের নারী শিশু বৃদ্ধাকে? পাকিস্তানের নিরীহ কৃষককে? না! এমনকি, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকেও বলা হচ্ছে, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো। কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।

বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের আগ্রাসন ছিল জাতি ধরে। ইহুদীদের বিরুদ্ধে হিটলারের গণহত্যা ছিল জাতি-সম্প্রদায় ধরে। সেইখানে আনা ফ্রাঙ্কের মত নিষ্পাপ মেয়ে ছিল। যার সাথে ইহুদী খ্রিস্টান বা রাজনীতির কোন সম্পর্কই ছিল না। এরকম হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনী বাঙালি মাত্রই হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছিল। বিশেষ করে হিন্দু বাঙালিদের। বলা হয়েছিল, মাটি প্রয়োজন, মানুষ না হলেও চলবে।

অন্যদিকে, মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের কোন ঘোষণায় কোনদিনই পাকিস্তানী বা মুসলমান মাত্রই হত্যা করতে বলা হয় নাই। জাতি বা সম্প্রদায় ধরে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয় নি। বলা হয়েছে শুধুমাত্র আগ্রাসী সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে, সুনির্দিষ্টভাবে। এমনকি, পাকিস্তানী নারীদের ধরে গনিমতের মাল বানাতেও কেউ বলে নি।

যদি মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ এরকম বলতো, পাকিস্তানী মাত্রই জবাই করো, বিহারীদের মা বোনদের গনিমতের মাল হিসেবে ভোগ করো, তাহলে সেই বক্তব্য হতো ভয়াবহ নোংরা এবং বর্ণবাদী, জাতি বিদ্বেষী। সেরকম হলে আমি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধেরও বিরোধীতা করতাম। কিন্তু এরকম বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের সমকালের সরকার থেকে কেউই দেন নি।

৫ পরিপ্রেক্ষিত

ধরুন, আগামীকাল মিয়ানমারের প্রধান স্টেট কাউন্সিলর আন সান সু কি নিচের প্রেস রিলিজটি ঘোষণা করলেন। কারণ হিসেবে বললেন, কিছু রোহিঙ্গা মুসলমান মিয়ানমারে সন্ত্রাস এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত, তাই সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত তার নিতে হয়েছে।
বলতে হবে, নিচের প্রেস রিলিজটি একটি মানবিক মননশীল মানবতাবাদী দয়ালু হৃদয়বান কারো দ্বারা লিখিত, নাকি হৃদয়হীন পাষণ্ড বর্বর অসভ্য ইতর ছোটলোক বর্ণবাদী সাম্প্রদায়িক কারো দ্বারা লিখিত?
– অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে রোহিঙ্গাদের হত্যা কর যেখানে পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাটিতে তাদের সন্ধনে ওৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, দেশ ছেড়ে চলে যেতে চায়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই শান্তির পায়রা আন সান সু কি পরম ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।
– তোমাদের উপর রোহিঙ্গা নিধান ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে কোন একটা বিষয় পছন্দের নয় অথচঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। বস্তুত সু কিই ভাল জানেন, তোমরা জান না।
– তোমরা যুদ্ধ কর রোহিঙ্গাদের সাথে যাহারা বৌদ্ধ ধর্মে ঈমান রাখে না এবং গ্রহন করেনা একমাত্র সত্য ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মমত, যতক্ষণ-না করজোড়ে তারা জিযিয়া কর প্রদান করতে বাধ্য থাকে।
– হে বৌদ্ধগণ! তোমরা রোহিঙ্গাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সু কি জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।
– সু কি তোমাদেরকে বিপুল পরিমান যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (war booty/গনিমতের মাল/নারীসহ অন্যান্য) ওয়াদা করেছেন, যা তোমরা লাভ করবে যুদ্ধে পরাজিত রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে।
– তোমরা রোহিঙ্গাদের সাথে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ-না তারা বৌদ্ধ হয়ে যায়।
– তোমরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না ভ্রান্তি শেষ হয়ে যায় এবং সু কির সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
– …আমি রোহিঙ্গাদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব, কাজেই তাদের গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাটো জোড়ায় জোড়ায়।
– সুতরাং তোমরা তাদেরকে (রোহিঙ্গাদের) হত্যা কর নি, বরং বুদ্ধই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি মাটির মুষ্টি নিক্ষেপ কর নি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন বুদ্ধ স্বয়ং যেন বৌদ্ধদের প্রতি এহসান করতে পারেন যথার্থভাবে।
– হে বৌদ্ধ, রোহিঙ্গাদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং রোহিঙ্গাদের সাহায্যকারীদের সাথে; তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হল দোযখ এবং সেটা হল নিকৃষ্ট ঠিকানা।
– হে মিয়ানমারবাসীগণ, তোমাদের নিকটবর্তি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক। আর জেনে রাখ, প্রভু বুদ্ধ তোমাদের সাথে রয়েছেন।
– মিয়ানমারের জনগণের মধ্যে যারা রোহিঙ্গা, তারা নরকের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।

কী, উপরের কথাগুলো খুব ভয়াবহ এবং নৃশংস মনে হচ্ছে এখন? একটু লক্ষ্য করলেই বুঝবেন, এগুলো আসলে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনেরই আয়াত। কয়েকটি শব্দ শুধু পাল্টে দিয়েছি। শুধু কাফেরদের জায়গায় রোহিঙ্গা লিখে, মুসলমানদের জায়গায় বৌদ্ধ লিখে, আল্লাহর জায়গায় বুদ্ধ এবং নবীর জায়গায় আন সান সু কি লিখে। ভেবে দেখুন, সামান্য কয়েকজন অপরাধী রোহিঙ্গা মুসলমানের জন্য সমস্ত রোহিঙ্গাকে এভাবে হত্যা করতে বলাটা কতটা সাম্প্রদায়িক? এই একই কথাগুলোর কয়েকটি শব্দ বদলে দিয়ে ইসরাইল যদি কাল প্যালেস্টাইনি মুসলমান হত্যা করতে শুরু করে? এবং কারণ হিসেবে বলে, প্রেক্ষাপট পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে হবে, তখন? শানে নুযূল, ব্যাখ্যা, পরিপ্রেক্ষিত আর প্রেক্ষাপট কী শুধু আল্লাহ আর নবীর বাপের সম্পত্তি নাকি?

৬ বানু কুরায়জা গণহত্যা

বানু কুরাইজা নামক ইহুদী গোত্রের সাথে মুহাম্মদ এবং তার বাহিনী ঠিক কী করেছিল তা কী আপনি জানেন? ৭০০-৯০০ পুরুষ সদস্যকে একদিনে জবাই করা হয়েছিল। নারী শিশুদের বানানো হয়েছিল দাস। বানু কুরাইজা গোত্রের নেতাদের সাথে মুহাম্মদের নানাবিধ ঝামেলার কারণে, চুক্তিভঙ্গের কারণে যে সকল পুরুষ শিশুর গোপনাঙ্গে চুল উঠেছে, তা পরীক্ষা করে সকলকে হত্যা করা হয়েছিল। ঠিক পাক বাহিনী যেভাবে আমাদের লুঙ্গি খুলে মুসলমানি হয়েছে কিনা দেখে দেখে হত্যা করতো সেভাবে। ঝামেলা বা চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে নেতাদের সাথে। কিন্তু বেসামরিক সকল বালক বালিকা নারী শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধা প্রতিবন্ধী মানুষ কী অপরাধ করেছিল? সেটা কী গণহত্যা ছিল না?

আবার কোরানের আয়াতগুলো খেয়াল করুন। কাফের, অবিশ্বাসী, মুরতাদ, পৌত্তলিক, ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে হত্যার হুকুম দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কাফেরদের জোড়ায় জোড়ায় কাটো। কাফের কারা? ইহুদী খ্রিস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব পর্যন্ত করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেন? সব ইহুদী খ্রিস্টান খারাপ? তাহলে একই ভঙ্গিতে খ্রিস্টান প্রধান দেশের কোন রাষ্ট্রপ্রধান যদি মুসলিমদের সম্পর্কে এরকম কথা বলে, ধরুন ডোনাল্ড ট্রাম্প কাল বললো, মুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব পর্যন্ত করা যাবে না, সেটা কী খুব নোংরা বক্তব্য হবে না?

যদি এমনটা বলা হতো, আক্রমণকারী শত্রুদের জোড়ায় জোড়ায় কাটো, তাহলে বক্তব্যগুলো বিবেচনায় আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু শব্দগুলো খেয়াল করুন। কাফের, মুশরিক। বানু কুরাইজা সহ আরো বেশ কিছু ইহুদী গোত্রের সাথে কী করা হয়েছিল পড়ুন। তাদের নারীদের গনিমতের মাল বানিয়ে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়েছিল কিনা, জেনে নিন। সেই সকল নারীদের কী অপরাধ ছিল? সেই সব শিশুদের?

আজ যদি কোন জঙ্গি মুসলমানের অপরাধের কারণে সমস্ত মুসলমানকে অপরাধী, জঙ্গি, নিকৃষ্ট জীব, অভিশপ্ত, নোংরা, নরকের জ্বালানি বলা হয়, আজ যদি মুসলমান হওয়ার কারণে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের কতল করতে কেউ ঘোষনা দেয়, জোড়ায় জোড়ায় কাটতে বলে, মুসলিম মেয়েদের গনিমতের মাল বলে ভাগ বাটোয়ারা করে ধর্ষণ করতে বলে, আমি সেই সময়ও তার প্রতিবাদ জানাবো। কারণ কী? কেন করবো?

কারণ জাতি, সম্প্রদায়, ধর্মবিশ্বাস এগুলো উল্লেখ করে কোন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, কতলের হুমকি দেয়া, গনিমতের মাল বানানো, সভ্য সমাজে সবচাইতে বড় অপরাধগুলোর মধ্যে একটা বলেই বিবেচনা করতে হবে। সেই কাজ অসংখ্যবার করা, করার উষ্কানি দেয়া, করতে অনুপ্রাণিত করা কোন গ্রন্থকে আমি শান্তির কেতাব বলে কীভাবে মেনে নিই?

Facebook Comments