যতই নিচে নামো ঘৃণা, যতই গভীরে যাও বিষ।

সাজিদ মিয়া একজন ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমান। পড়ালেখা শেষ করে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছে। বেতন ভাল, বছরে দুইবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ দেয়া হবে অফিস থেকেই। নতুন অফিসে যোগ দেয়ার তিনমাসের মাথাতেই সাজিদ মিয়াকে এক সেমিনারে যোগ দেয়ার জন্য অফিস থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সুযোগ দেয়া হলো। সাজিদ মিয়া তো মহা খুশি। একে বলে গাছে না উঠতেই এক কাদি। খুব আনন্দের সাথে ভিসা করালো, কেনাকাটা করলো। নতুন জামা স্যুট টাই পড়ে প্লেনে চলে চলে আসলো স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। কোনদিন আগে সে দেশের বাইরেই যায় নি। নেপাল ইন্ডিয়াও নয়। এবারে এক লাফে একদম আমেরিকা। দারুণ ব্যাপার!

অফিস থেকেই তাকে একজন টুরিস্ট গাইড দেয়া হলো। গাইডের কাজ হচ্ছে, সবকিছু সাজিদ মিয়াকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো। তো সাজিদ মিয়া দুইদিন সেমিনার করে বাকি চারদিন ঘুরেফিরে কাটাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। সেমিনারের কাজ সব শেষ করে পরের দিন সকালবেলা হোটেল থেকে রেডি হয়ে খুব আনন্দের সাথে ঘুরতে বের হলো। আজকে সে ওয়াশিংটন দেখবে, ঘুরবে ফিরবে আনন্দ করবে। এত সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শহর দেখে সাজিদ মিয়া মহা আনন্দিত। আমেরিকা আসলেই উন্নত দেশ। উন্নত হবেই না বা কেন? কত ছিমছাম সাজানো গোছানো সব।

আমেরিকা এসেছে আর হোয়াইট হাউজ দেখবে না? তা কীভাবে হয়? সে তার গাইডকে নিয়ে গেলো হোয়াইট হাউজে। তার সৌভাগ্য যে, দেখলেন ঐদিনই ট্রাম্পের একটি জনসমাবেশ হচ্ছে হোয়াইট হাউজের খানিকটা দূরে। সেখানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! শুনেছে সুন্দরবনে গেলেও নাকি বাঘের দেখা মেলে না। আর আজকে তার ভাগ্য কত ভাল যে ট্রাম্পকেও নিজের চোখে দেখতে পাবে। সাজিদ মিয়ার খুশিতে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম প্রায়। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সে গেল ট্রাম্পের বক্তব্য শুনতে। এরকম সুযোগ কালেভদ্রে মেলে। ট্রাম্প স্টেজে দাঁড়িয়ে, খুব স্মার্টলি খুব জোরালো ভাষায় বক্তব্য রাখছে। বক্তব্যগুলো যা বললো তা সারমর্ম করলে হয় এরকমঃ

  • ১) মুসলমানরা অভিশপ্ত সম্প্রদায়। মুসলমানদের যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা করো।
  • ২) মুসলমানদের মনে আমি পুলিশ এবং সেনাবাহিনী দিয়ে ভীতি সঞ্চার করে দেবো। অতএব তোমাদের প্রতিবেশী মুসলমানদের কাটো জোড়ায় জোড়ায়।
  • ৩) মুসলমানদের স্ত্রী এবং কন্যাদের বানাও নিজেদের বাসার দাসী।
  • ৪) মুসলমানরা সমস্ত সৃষ্টির মাঝে সর্বনিকৃষ্ট জীব।
  • ৫) মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্ব পর্যন্ত করা যাবে না।
  • ৬) মুসলমানরা এই দেশে থাকতে চাইলে তাদের আলাদা ট্যাক্স দিতে হবে।
  • ৭) মুসলিমদের জন্য ওঁত পেতে বসে থাকো, তাদের শূলে চড়িয়ে হত্যা কর।
  • ৮) মুসলিমরা অপরাধী এবং অভিশপ্ত সম্প্রদায়। তাদের কখনো বিশ্বাস করো না।

সাজিদ বোকার মত এই কথাগুলো শুনছিলো, আর অবাক হয়ে ভাবছিল, এসব সে কী শুনছে! এগুলো কী সে সত্যিই শুনছে নাকি এগুলো কল্পনা? ঘেন্নায় তার গা রিরি করে উঠলো। এ কী অসভ্য দেশ, এ কী অসভ্য বর্বর প্রেসিডেন্ট! কোন দেশের প্রেসিডেন্ট এরকম কথা বলতে পারে? যেই দেশে মুসলমানরাও নাগরিক, সেই দেশের প্রধান এত ঘৃণা উদগীরণ করতে পারে? তার প্রায় কান্না পাচ্ছিল। সব চাইতে খারাপ লাগলো যা দেখে, এত হাজার হাজার শ্রোতা সেখানে, কেউ একজনও এইরকম অসভ্য বর্বর কথাগুলোর প্রতিবাদ করলো না। বরঞ্চ সবাই খুশিতে হাততালি দিতে লাগলো। সাজিদ নিজে একজন মুসলিম। কিন্তু মুসলিম বলে নয়, একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবলেও এই কথাগুলো পৃথিবীর সবচাইতে অসভ্য বর্বর ইতর কুৎসিত কথা! এই দর্শক স্রোতাদের মধ্যে কী একজনও মানবিক মানুষ নেই, যিনি এই কথাগুলোর প্রতিবাদ করবেন? কী আশ্চর্য ব্যাপার! সে অবাক হয়ে তার টুরিস্ট গাইডকে জিজ্ঞেস করলো, এসব কী! পৃথিবীর সভ্য দেশগুলোর একটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খোদ প্রেসিডেন্ট এত ইতর হলো কীভাবে? কীভাবে সম্ভব? এই দেশের জনগণই বা এত অসভ্য কীভাবে? একজনও প্রতিবাদ করছে না!

টুরিস্ট গাইড বুঝলো, এ এক বিপদের কথা! মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে একজন নিম্নমানের ইতর লোক, এটা বাইরের দেশের লোক এসে জেনে যাচ্ছে, তা তার দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। তো টুরিস্ট গাইড মুখটি ভালমানুষের মত করে বলতে লাগলো,

  • মাঝখান থেকে কোন কথা ধরলে তো হবে না। আগের পরের কথাগুলো শুনতে হবে।  ট্রাম্পের কথাগুলো আসলে মাঝখান থেকে এক লাইন শুনলে ভুল বোঝা হবে। পুরোটা শুনলে আসল অর্থ বোঝা যাবে।
  • অনুবাদে ভুল আছে। আপনি আমেরিকান ইংরেজি কতটুকু জানেন? সঠিকভাবে আমেরিকান ইংরেজি বুঝতে আপনার আমেরিকায় কমপক্ষে বিশ বছর থাকতে হবে।
  • ট্রাম্পের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করতে হবে। এখন মুসলিমদের সাথে আমেরিকান আর্মির যুদ্ধ চলছে! এইগুলো যুদ্ধের সময়ের বক্তব্য। এর সাথে মানবতা মেলাবেন না।
  • এই বক্তব্য কোন প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে সেটা বুঝতে হবে। প্রেক্ষাপট না বুঝলে কথাটির আসল মানে বোঝা যাবে না।
  • এই বক্তব্যের শানে নুজুল বা ব্যাখ্যা শুনতে হবে। আসলে ট্রাম্পের কথার শব্দগুলোর সঠিক অনুবাদ করা হয় নি। যেখানে ট্রাম্প বলেছেন ‘হত্যা কর’, সেখানে আসলে সে বুঝিয়েছেন, ‘আদর করো’।
  • আসলে এই কথাগুলো সে বলে নি, এগুলো আসলে হিলারীর ষড়যন্ত্র। সেই একটি ঔষধ খাইয়ে মাতাল করে ট্রাম্পকে দিয়ে কথাগুলো বলিয়ে নিয়েছে।
  • যেই মাইকে বলা হয়েছিল সেই মাইকের যান্ত্রিক সমস্যার কারণে ভুল শব্দ শোনা গিয়েছে।
  • আপনি ভুল শুনেছেন। রাতে ওয়াইন খেয়ে নিশ্চয়ই আপনার মাথায় সমস্যা হয়েছে, সেই কারণে ভুল শুনতে পাচ্ছেন।
  • আপনি এতো ট্রাম্প বিদ্বেষী কেন? ট্রাম্প বিদ্বেষের জন্য হিলারির থেকে কত পান? পারবেন ট্রাম্পের সমতুল্য একটি বক্তব্য দিতে?

টুরিস্ট গাইড ভদ্রলোকের এহেন যুক্তির বালাই দেখে সাজিদ মিয়া বিরক্তি বোধ করলো। শুধু বিরক্তিই নয়, কেমন জানি ঘেন্না বোধ হলো। বোধ করবেই না বা কেন? ট্রাম্প যেমন এইসব বাজে কথা বলছে, নোংরা অসভ্য বর্বর সব বক্তব্য দিচ্ছে, আর এই টুরিস্ট গাইড আবার সেই অত্যন্ত বাজে কথাগুলোকে জাস্টিফাই করছে! কী ভয়াবহ অসভ্য লোক এরা। এরা মানুষ নামের কলঙ্ক।

রাগে ক্ষোভে লজ্জায় অপমানে সাজিদ মিয়া ঠিক করলো, সে আর এই দেশে থাকবে না। সে দেশে ফিরে যাবে। সেইদিনই ফ্লাইট বুকিং দিয়ে দেশে ফিরে আসলো সাজিদ মিয়া। দেশে ফিরতেই শুনলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে একজন ইহুদী ভদ্রলোক ঢাকায় তাদের অফিস পরিদর্শনে এসেছে। সাজিদ মিয়াকে দায়িত্ব দেয়া হলো, ইহুদী ভদ্রলোককে ঢাকা শহর একটু ঘুরিয়ে দেখাতে। ইহুদী ভদ্রলোক খুবই শিক্ষিত এবং রুচিশীল মানুষ, বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা থাকার কারণে উনি নিজে নিজেই বাঙলা শিখে ফেলেছেন। খুব সুন্দর বাঙলায় কথাও বলেন। শুধু কী বাঙলা, উনি আরবিতেও ডিগ্রী নিয়েছেন, ইংরেজি জার্মান ফ্রেঞ্চ ম্যান্ডারিন হিব্রু হিন্দি স্প্যানিশ সহ প্রায় ১৮ টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। এরকম মানুষের সাথে আলাপ করাও সৌভাগ্যের বিষয়।

তো সাজিদ মিয়া ইহুদী ভদ্রলোককে নিয়ে ঘুরতে বের হলো, ঢাকা শহরের এমনিতেই যাচ্ছেতাই অবস্থা। ট্রাফিক জ্যাম রাস্তায় পানি মোড়ে মোড়ে গর্ত। এইসব ঠেলে একটা গাড়ি নিয়ে তারা ঘুরতে লাগলো ঢাকা শহর। বায়তুল মোকাররম মসজিদের কাছে আসতেই তারা ফেঁসে গেল এক বিশাল ট্রাফিক জ্যামে। সেই সময় বায়তুল মোকাররমে জুম্মার নামাজের পরে খুতবা পরা হচ্ছে। বায়তুল মোকাররমের খতিব সুরেলা কণ্ঠে কোরান হাদিসের বাণী থেকে একের পড় এক উদৃতি দিচ্ছেন।

ইমাম সাহেব বললেন, আল্লাহ তালাহ পবিত্র কোরানে বলেছেন,

  • কোরান ৯:৫ – অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাটিতে তাদের সন্ধনে ওৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।
  • কোরান ২:২১৬ – তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে কোন একটা বিষয় পছন্দের নয় অথচঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহ ভাল জানেন, তোমরা জান না।
  • কোরান ৯:২৯ – তোমরা যুদ্ধ কর ‘আহলে-কিতাব’ এর ঐ লোকদের (ইহুদী এবং খৃষ্টান) সাথে যাহারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তার রসুল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহন করেনা সত্য ধর্ম ইসলাম, যতক্ষণ-না করজোড়ে তারা জিযিয়া কর প্রদান করতে বাধ্য থাকে।
  • কোরান ৫:৫১  – হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।
  • কোরান ৪৮:২০ – আল্লাহ তোমাদেরকে বিপুল পরিমান যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (war booty/গনিমতের মাল/নারীসহ অন্যান্য) ওয়াদা করেছেন, যা তোমরা লাভ করবে যুদ্ধে পরাজিত মুশরিকদের কাছ থেকে।
  • কোরান ৪৮:১৬ – তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ-না তারা মুসলমান হয়ে যায়।
  • কোরান ৮:৩৯ – তোমরা কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না ভ্রান্তি শেষ হয়ে যায় এবং আল্লাহ র সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।>
  • কোরান ৮:১২ – …আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব, কাজেই তাদের গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাটো জোড়ায় জোড়ায়।
  • কোরান ৮:১৭ – সুতরাং তোমরা তাদেরকে (কাফের) হত্যা কর নি, বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি মাটির মুষ্টি নিক্ষেপ কর নি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং যেন ঈমানদারদের প্রতি এহসান করতে পারেন যথার্থভাবে।
  • কোরান ৯:৭৩ – হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং মুনাফেকদের সাথে; তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হল দোযখ এবং সেটা হল নিকৃষ্ট ঠিকানা।
  • কোরান ৯:১২৩ – হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তি কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক। আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকিনদের সাথে রয়েছেন।
  • কোরান ৯৮:৬ – আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।

তিনি আরও বলতে লাগলেন, পবিত্র হাদিস শরীফে রয়েছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেছেন,

২৮১৮. ‘উমার ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ্ (রহ.)-এর আযাদকৃত গোলাম ও তার কাতিব সালিম আবূন নাযর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) তাঁকে লিখেছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা জেনে রাখ, তরবারির ছায়া-তলেই জান্নাত।

পরিচ্ছদঃ ৩৭০ : দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে
১৩/১৮২৯। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যে পর্যন্ত মুসলিমরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করবে। এমনকি ইহুদী পাথর ও গাছের আড়ালে আত্মগোপন করলে পাথর ও গাছ বলবে ‘হে মুসলিম! আমার পিছনে ইহুদী রয়েছে। এসো, ওকে হত্যা কর।’ কিন্তু গারক্বাদ গাছ [এরূপ বলবে] না। কেননা এটা ইহুদীদের গাছ।’’ (বুখারী-মুসলিম) 

এভাবে ইমাম সাহেব বলেই যাচ্ছিল। বলছিলেন, আর উপস্থিত মুসলমানরা একসাথে মাশাল্লাহ সুভানাল্লাহ বলে ইমাম সাহেবকে সম্মতি জানাচ্ছিলেন। এই কথাগুলো ইহুদী ভদ্রলোকও শুনছিলেন। বাঙলা বুঝতে ইহুদী ভদ্রলোকের কোন সমস্যাই হচ্ছিল না। উনি আরবিও পারেন অনেক ভাল। সাজিদ মিয়া আসলে একটু লজ্জাই পাচ্ছিলেন। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন, ইহুদী ভদ্রলোকের কপালটা কেমন ঘেমে উঠেছে। মনে হলো, উনি একটু থরথর করে কাঁপছেন। ভদ্রলোক কেমন জানি মনমরা হয়ে গেলেন। কিছুই বললেন না। সাজিদকে একটিবারের মতও কোন প্রশ্ন করলেন না। তাই থাকতে না পেরে সাজিদ মিয়াই থতমত করে বলতে লাগলেন,

  • মাঝখান থেকে কোন কথা ধরলে তো হবে না। আগের পরের কথাগুলো শুনতে হবে।  কোরান হাদিসের কথাগুলো আসলে মাঝখান থেকে এক লাইন শুনলে ভুল বোঝা হবে। পুরোটা শুনলে আসল অর্থ বোঝা যাবে।
  • অনুবাদে ভুল আছে। আপনি আরবি কতটুকু জানেন? সঠিকভাবে কোরানের আরবি বুঝতে আপনার সৌদি আরবে কমপক্ষে বিশ বছর থাকতে হবে।
  • কোরান হাদিসের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করতে হবে। সেই সময়ে মুসলিমদের সাথে কাফেরদের যুদ্ধ চলছিল! এইগুলো যুদ্ধের সময়ের বক্তব্য। এর সাথে মানবতা মেলাবেন না।
  • এই বক্তব্য কোন প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে সেটা বুঝতে হবে। প্রেক্ষাপট না বুঝলে কথাটির আসল মানে বোঝা যাবে না।
  • এই বক্তব্যের শানে নুজুল বা ব্যাখ্যা শুনতে হবে। আসলে কোরানের কথার শব্দগুলোর সঠিক অনুবাদ করা হয় নি। যেখানে আল্লাহ বলেছেন ‘হত্যা কর’, সেখানে আসলে আল্লাহ বুঝিয়েছেন, ‘আদর করো’।
  • আসলে এই কথাগুলো আল্লাহ আর আল্লাহর নবী বলেন নি, এগুলো আসলে ইহুদী নাসারা নাস্তিকদের ষড়যন্ত্র। তারা ষড়যন্ত্র করে এইসব আয়াত কোরানে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
  • যেই মাইকে বলা হয়েছিল সেই মাইকের যান্ত্রিক সমস্যার কারণে ভুল শব্দ শোনা গিয়েছে।
  • আপনি ভুল শুনেছেন। রাতে ওয়াইন খেয়ে নিশ্চয়ই আপনার মাথায় সমস্যা হয়েছে, সেই কারণে ভুল শুনতে পাচ্ছেন।

এই কথাগুলো সাজিদ মিয়া হড়বড় করে বলে গেলেন। দেখলেন, ইহুদী ভদ্রলোক তার দিকে কেমন জানি সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সেই দৃষ্টিতে কেমন জানি ঘেন্না মেশানো, কেমন জানি করুণা মেশানো। এই দৃষ্টির সামনে সাজিদ মিয়া কেমন জানি ছোট হয়ে যাচ্ছিলেন। নিজের কাছেই নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। এই দৃষ্টির সামনে থাকতে না পেরে তিনি তাই বলেই ফেললেন, আপনি এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? আরে মশাই, আপনি এতো ইসলাম বিদ্বেষী কেন? ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে ইউরোপে এসাইলাম পেতে চান নাকি?

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ গল্পটির প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক। জীবিত বা মৃত কারো সাথে গল্পটির মিল পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ধর্মীয় অনুভূতি নিজ দায়িত্বে রাখুন, আহত বা নিহত হলে কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা চলবে না।

Facebook Comments