নাস্তিকের ধর্মচিন্তা – ড. আহমদ শরীফ

নাস্তিকের জীবচেতনা আছে, জগৎভাবনা আছে, ধর্মচিন্তা নেই। নাস্তিকের অবশ্য ধর্ম সম্বন্ধে চিন্তা আছে। ‘নাস্তিক’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অভিধা হচ্ছে ‘বেদের অপৌরুষেয়তায় আস্থাহীন’ অর্থাৎ যে বেদকে আসমানী বাণীরূপে মানে না, সেই নাস্তিক। এখন শব্দটি অর্থান্তর লাভ করেছে। এখন নিরীশ্বরকেই নাস্তিক বলা হয়, যারা নাস্তিক তারা শাস্ত্রের সত্যতায় আস্থা রাখে না। তাদের মতে ঈশ্বর যদি এক এবং চিরন্তন হন, তাহলে তিনি জনবহুল য়ুরােপে আফ্রিকার কালাে মানুষের মধ্যে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের কাছে কিংবা চীন-জাপান-অস্ট্রেলিয়া-নিউগিনিতে নবী-অবতার পাঠাননি কেন, কেবল পুরােনাে কেনান তথা আধুনিক ইজরাইল থেকে সুয়েজ অবধি একটা বিরল বসতি অঞ্চলে এবং ক্ষুদ্র জনগােষ্ঠীর মধ্যেই শুধু এক লক্ষ চব্বিশ চল্লিশ কিংবা দুইলক্ষ চব্বিশ/চল্লিশজন নবী পাঠালেন কেন? ভারতেই বা কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ ও রাম কৃষ্ণকে পাঠালেন কেন? মানুষের কাছে ঈশ্বরই যদি তাদের হিতাৰ্থে আদেশ-নির্দেশ পাঠাতেন, তাহলে সে-বাণীর মধ্যে পার্থক্য ও বৈপরীত্য থাকত না। আর থাকত না সাময়িকতা। অন্তর্যামী ঈশ্বর কেন কালে কালে স্থানে স্থানে স্ববিরােধী বিপরীতমুখী বাণী পাঠাবেন মানুষের মধ্যে বিরােধ-বিবাদবিচ্ছেদ এবং নিত্যকালের সংঘর্ষ-সংঘাত ঘটানাের জন্য? অজ্ঞ মানুষের কল্পনাপ্রসূত বলেই ঈশ্বর সাকার কি নিরাকার, নারী কি পুরুষ তা আজো নির্ণিত হয়নি। তিনি কেন কি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করলেন বিশ্বজগৎ সে সম্বন্ধেও কেউ একমত নয়। শাস্ত্র গ্রন্থগুলাের মধ্যে সমকালের পৃথিবীর মানুষের গৌত্রিক গােষ্ঠীক এবং অবস্থানগত ভৌগােলিক পরিচিতিও নেই। নেই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বয়ানও। তাছাড়া আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্ব, তথ্য এবং সত্যও দুর্লভ দুনিয়ার সব চালু শাস্ত্রগ্রন্থে। এজন্যে শাস্ত্ৰ গ্রন্থগুলােকে মানবমনীষা প্রসূত বলে সহজেই লােকে চিহ্নিত করে, আক্তিকমাত্রই স্বশাস্ত্র ব্যতীত অন্যদের শাস্ত্রকে ভুল, ত্রুটিপূর্ণ কিংবা সরাসরি বানানাে শাস্ত্ৰ বলেই জানে। শৈশব-বাল্যের মগজ-ধোলাইয়ের ফলে বিশ্বাস-সংস্কার পুষ্ট মানুষ তার ইহ-পরকালে প্রসৃত জীবনে জ্ঞান বুদ্ধি-যুক্তি প্রয়ােগে স্বশাস্ত্র যাচাই বাছাই করার সাহস পায় না আত্মপ্রত্যয়ের ও সাহসের অভাবে। অতএব, কেউ অন্য কারাে শাস্ত্র সত্য বলে জানে না, মানে না। কাজেই গড়ে শাস্ত্ৰমাত্ৰই মিথ্যা, বানান, কেবল একটি বিশেষ দলের কাছেই এক একটি শাস্ত্র সত্যমাত্র। ফলে যুক্তিযােগ কোন শাস্ত্ৰই সত্য বলে এমন কি সর্বকালের সর্বমানুষের জীবনে প্রয়ােজনীয় বলে প্রমাণ করা যায় না। বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসমাত্রই পুতুলে হাত-পা-চোখ-কান-নাকমুখ বসিয়ে তাকে জীবন্ত মানুষ প্রমাণ করার নামান্তরমাত্র। এখনকার শাস্ত্রগুলােকে সত্য আসমানী বাণীভিত্তিক মনে করলে মানতেই হবে যে ঈশ্বর একজন বহুরূপী এবং বিচিত্ৰ মতলবে স্ববিরােধী আদেশ-নির্দেশদাতা ঈশ্বরের নীতি-নিয়মে, কোন সঙ্গতি-সামঞ্জস্য নেই বলেই তাকে লীলাময় বলে। বহুকাল আগে ১৯০৪ (১৩১১ সনের) সালের ভাদ্রসংখ্যা মাসিক ‘নবনুর’ নামের সাহিত্য পত্রিকায় বেগম রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন লিখেছিলেন ‘আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্ৰ বলিয়া প্ৰকাশ করিয়াছেন…পুরাকালে যে ব্যক্তি প্রতিভাবলে দশজনের মধ্যে পরিচিত হইয়াছেন, তিনিই আপনাকে দেবতা কিংবা ঈশ্বর প্রেরিত দূত বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।…এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ রচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। …ঈশ্বর কি কেবল এশিয়ারই ঈশ্বর’?

নাস্তিক শাস্ত্র নির্দেশে চালিত নয় বটে, তবে নাস্তিকমাত্রই ন্যায়-অন্যায়, ভালােমন্দ, বিচার-বিবেচনা করেই কর্ম-আচরণ করে। আত্মরতি বশে পরের ক্ষতি করে না, জ্ঞান বুদ্ধি-যুক্তির আলােকে নৈতিক চেতনা নিয়ে সামাজিক, আর্থিক ও রাষ্ট্রিক ন্যায়ের অনুগত থাকে। নাস্তিক সমস্বার্থে সংযমে সহিষ্ণুতায় সহযােগিতায় সহাবস্থানের তত্ত্বে ও আবশ্যিকতায় আস্থা রাখে। নাস্তিক ‘Live and let others live’ আদর্শে গুরুত্ব দেয়। যে-ক্ষতি, যে-যন্ত্ৰণা যে-পীড়ন সে নিজের জন্যে অনভিপ্রেত বলে জানে, বােঝে ও মানে, তা সে তার প্রতিবেশীর জন্যেও অকারণে কামনা করে না, কাজেই নাস্তিক যুক্তিবাদী আত্মপ্রত্যয়ী আত্মমর্যাদাসচেতন বলেই সে অন্যায়-অপকর্ম থেকে বিরত থাকে। পক্ষান্তরে শাস্ত্রে আস্থাবান আস্তিক ঈশ্বর অন্তর্যামী বলে জেনে-মেনেও করে না হেন অপরাধ-অপকৰ্ম-অন্যায় নেই। আস্তিকেরা কেবল সামান্য পরিমাণে বা মাত্রায় লােকনিন্দার ও রােষের এবং বহুল মাত্রায় সরকারী শক্তির ভয়েই নানা অপকর্ম থেকে বিরত ও সংযত থাকার চেষ্টা করে মাত্র। তবু প্রলােভন প্রবল হলে সেই সব আস্তিক মানুষ করে না হেন অপকর্ম জগতে নেই।

মানুষের জীবন ঈশ্বর, না রাশিচক্র নিয়ন্ত্রণ করে, তাও নিয়তিতে ও জ্যোতিষগণনায় আস্থাবানেরা নিশ্চিত করে বলতে পারে না। আজ অবধি আমরা পৃথিবীর প্রাচীন ও আধুনিক ইতিবৃত্তে যত নাস্তিকের সন্ধান পাই, তারা মানুষ হিসেবে সাধারণভাবে উদার ও মহৎ, অনন্য ও অতুল্য। ভারতের বৈশেষিক, সাংখ্য, চার্বাক ও মীমাংসা দর্শন আর বৌদ্ধ-জৈন দৰ্শনও সাধারণ সংজ্ঞায় নাস্তিক্য দর্শন। কিংবা মিল বেন্থাম কোঁতে স্পিনােজো নিটসে কাৰ্লমাৰ্কস প্রমুখের দর্শনও মানুষকে মনুষ্যগুণরিক্ত হতে তথা মনুষ্যত্বের মানবিকতার-মানবতার অনুশীলনে নিরুৎসাহ করেন না। বহুজনহিতে বহুজনসুখে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক নীতি নিয়ম চালু করার কথাই বলেন। মানুষ মতবাদীর দলীয় জীবনে ভরসা রাখে, তাই স্বশাস্ত্ৰ-মানা চোরডাকু মিথ্যেবাদী, মস্তান-গুণ্ডা-খুনীদের ঘৃণ্য মনে করে না, সহ্য করে স্বদলীয় বলে। কিন্তু নিরপরাধ শিক্ষিত ধনী, গুণী, জ্ঞানী নাস্তিককে একেবারেই সহ্য করে না। হত্যা করে, পতিত না করে, বিতাড়িত না করে অন্তত পীড়িত-লাঞ্ছিত না করে আস্তিকেরা স্বস্তি পায় না। উল্লেখ্য যে গত শতকের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত প্রমুখ নাস্তিক ছিলেন, অনেকেই ছিলেন প্রত্যক্ষবাদী ও সংশয়বাদী এবং তাঁরা ছিলেন ভাব-চিন্তা-কর্ম-আচরণে-চরিত্রে, আদর্শে ও নৈতিক চেতনায় জ্ঞানেগুণে-মনীষায় মহৎ মানুষ। লেনিন-স্টালিন-মাও সে তুং-জওয়াহের লাল, সার্ত্র , বাট্টাও রাখেনি প্রমুখও নাস্তিক, কিন্তু মানবপ্রেমী, অমানুষ নন কেউ। আজো দুস্থ মানুষকে শােষণ-পীড়ন পেষণ-দমন-লাঞ্ছনামুক্ত করার জন্যে যারা প্রাণপণ সংগ্রামে রত, তারা হচ্ছে মানবদরদী নাস্তিক-নিরীশ্বর কম্যুনিস্টরাই। কমুনিস্টরা কি নিরীশ্বর বলে অমানুষ?

মনােবিজ্ঞানী ও দার্শনিকের মতে অজ্ঞ-অসহায় ক্ষতিভীরু মানুষের ভীরুতা থেকেই ঈশ্বতত্ত্বের উদ্ভব। তাই কল্পনাসৃষ্ট বিভিন্নকালের ও স্থানের ঈশ্বরে কোন সাদৃশ্য নেই। মানুষকে ও শয়তানকে কেন সৃষ্টি করা হল, মানুষকে কেন পাপ করার অধিকার দেয়া হল, শাস্তিই বা দেয়া হবে কেন? তাতে কার কি উপকার বা লাভ? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। যুক্তিবাদী আত্মপ্রত্যয়ী সাহসী মানুষমাত্রই তাই নাস্তিক নিরীশ্বর।

সম্পাদকের কথাঃ শ্রদ্ধেয় মুরতাদ ড. আহমদ শরীফের এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল “দুই বাংলার যুক্তিবাদীদের চোখে ধর্ম” বইতে। প্রচুর পরিশ্রমের পরে লেখাগুলোকে নাস্তিক্য ডট কমে ক্রমান্বয়ে যুক্ত করা হচ্ছে।

Facebook Comments

2 thoughts on “নাস্তিকের ধর্মচিন্তা – ড. আহমদ শরীফ

  • February 19, 2018 at 4:47 pm
    Permalink

    নাস্তিক্য বাদ আর যাই করুক মানুষ কে ঘৃনা করতে শিখায় না।মানুষ যতদিন তার পৌরাণিক ধর্মকে আকড়ে থাকবে ততদিন সে আধুনিক সভ্যতা থেকে পিছিয়ে থাকবে।যারা নাস্তিকতার নামে ধর্মকে গালাগালি করে তারা নাস্তিক নয় তারা গালিবাজ।।

    Reply
  • April 1, 2018 at 1:39 pm
    Permalink

    ড. আহমদ শরীফের
    “মতবাদ, ধর্মমত, মতামত”
    পূর্নাঙ্গরুপে ও যুক্তি সহকারে তার রচিত কোন বইতে পাওয়া যাবে?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: