ধর্ম, নাস্তিক্য ও মানবতন্ত্র – শিবনারায়ণ রায়

আমি আকৈশাের নাস্তিক। ঠিক কখন নাস্তিক্য আমার চেতনায় আকার পায় বলা শক্ত, কিন্তু স্মৃতির সড়ক ধরে যত পিছনেই যাই না কেন এমন কোন কাল আমার নজরে আসে না যখন ঈশ্বর, দেবদেবী, আত্মা, প্ৰেত, পরকাল ইত্যাদি, কিংবা মানুষীকল্পনাজাত নয় এমন কোন অতিপ্রাকৃতের অস্তিত্বে আমার আস্থা ছিল, অথবা পূজাপ্রকরণে আমার অনীহা গভীর ছিল না। এবং যদিও বহু শুভানুধ্যায়ীর মুখে বারবার শুনেছি যে রক্ত শীতল হয়ে এলে তুরীয়ের প্রয়ােজন (এবং ভাগ্যে থাকলে, উপলব্ধি) নাকি আপনি ঘটবে, শাস্ত্রনির্দিষ্ট বাণপ্রস্থের কোঠায় বেশ কয়েক বছর আগে পা দেবার পরও অদ্যাবধি আমার লােকায়ত প্রতিন্যাসে শৈথিল্য ঘটে নি। এমনকি অজ্ঞাবাদের বিদগ্ধ প্রলােভনও আমাকে কিঞ্চিমাত্র আকৃষ্ট করে না।
অথচ যে-পরিবারে আমি জন্মেছি এবং যে-পরিবেশে আমার শৈশব, কৈশাের এবং যৌবনের অন্তত কিছুটা অংশ কেটেছে, সেখানে ধর্মবিশ্বাসে অভ্যস্ত হওয়া আমার পক্ষে খুব স্বাভাবিক ছিল। মা ছিলেন খাস কলকেতিয়া মেয়ে ; ইহকাল এবং পরকালের দাবির মধ্যে সুস্থিতি রচনায় তাঁর ছিল সহজ নৈপুণ্য ; সংসারকে তিনি বশ করেছিলেন রান্নাঘর এবং নিরলস সেবার সূত্রে ; আর তাঁর ঠাকুরঘরে ছিল বেসুমার দেবদেবীর রাজত্ব। বিরাট পরিবার এবং আত্মীয় অভ্যাগতদের বিচিত্র দাবিদাওয়া মিটিয়ে যেটুকু বাড়তি সময় তাঁর মিলত তা ছিল ব্ৰতপার্বণ, উপবাস অনুষ্ঠানে ঠাসা। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের ভিন্ন রূপও আমার একেবারে অপরিজ্ঞাত থাকে নি। শৈশবকৈশােরে একদিকে যেমন শুনেছি পুরােহিতের মুখে শনি-সত্যনারায়ণ-লক্ষ্মীর পাঁচালি এবং গ্রহস্বস্ত্যয়নের মন্ত্র, অন্যদিকে তেমনি শুনেছি সুগম্ভীর পিতৃকণ্ঠে বেদ-উপনিষদ পাঠ। খােলা বারান্দায় প্রত্যুষের অপসৃয়মান অন্ধকার; পিতার ভাস্করলােভন দেহের আর্জবে প্রথম আলাের রেখাঙ্কন ; তাঁর বিশুদ্ধ উচ্চারণে সংস্কৃতের উদাত্ত ধ্বনিতরঙ্গ, পদার্থ না বুঝেও অনুভব করতাম এমন এক উপস্থিতির যা মধুময় এবং অসংকুচিত, প্রােজ্জ্বল, স্বয়ম্ভর এবং নির্ভীক।।
পরিবেশের মধ্যেও ছিল ধর্মের দুই সমান্তরাল ধারা। স্কুলরূপী গােয়ালটির দিন শুরু হ’ত ভবতারিণীর কাছে প্রার্থনা দিয়ে। পাড়ায় ছিল ছােটোবড়াে মন্দির এবং বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন সার্বজনীন পূজা-পার্বণের প্রাচুর্য ; পরিজন পড়ােশীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন মাদুলি-তাবিজের চলন্ত বিজ্ঞাপন। উত্তর কলকাতার এই বাঙালী হিন্দুমধ্যবিত্ত অঞ্চলের বেশিরভাগ বাসিন্দাই ছিলেন কালীভক্ত ; তাদের হাম্বাধ্বনির মধ্যে শক্তির পরিচয় কতােখানি ছিল জানি না, কিন্তু তাতে যুথচারিতা এবং সংবেশনের প্রকাশ ছিল সুস্পষ্ট। কৃষ্ণভক্ত এবং রামভক্তদের পাড়া ছিল যথাক্রমে আরও কিছুটা উত্তরে এবং পশ্চিমে ; সামান্য খানিকটা পুবের দিকে এগােলে আল্লাভক্তদের দেখা মিলতাে। সে দিকটা আমাদের কাছে ছিল নিষিদ্ধ, কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনের দৌলতে কালীভক্ত এবং আল্লাভক্তদের মধ্যে সংঘর্ষ ক্রমশই সে-যুগে প্রবলতর হয়ে উঠছিল। সেই দাঙ্গাহাঙ্গামার যেসব বিবরণ বয়স্কজনদের মুখে আমরা শুনতাম তা পৌরাণিক সুরাসুর যুদ্ধের মতােই রঞ্জিত, রােমহর্ষক, এবং পৈশুন্যসৰ্পিল।।
অপরপক্ষে পারিবেশিক অন্য ধারাটির সঙ্গেও কিছুটা আমার পরিচয় ঘটে কিশাের বয়সে। এটির প্রধান সূত্র ছিল রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রনাথের গানে পূজা, প্রেম এবং তাঁর গল্প, উপন্যাস নাট, এমনকি কবিতার সঙ্গে তুলনা করলেই বােঝা যায় রবীন্দ্রসংগীতে ধর্মচেতনার অভিস্রবণ প্রায় অনবচ্ছিন্ন। ঔপনিষদিক ব্ৰহ্ম থেকে পৌরাণিক শিব, বৈষ্ণবের রাধাকৃষ্ণ থেকে বাউলের মনের মানুষ তার বিভিন্ন গানে কখনন পরিশ্রুত, কখননা কেলাসিত, কখনাে পরস্পরে অভিসারী, কখনাে বা পর্যায়বৃত্ত। পিতা, প্রভু, সখা, প্রেমিক, কবি, নৰ্তক, রহস্যময়ী নানা রূপে তাঁর দেবতা তার কল্পনায় প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছেন, এ
রিণামে সেইসব রূপ নাস্তিকের চেতনাতেও অন্তর্লিখিত হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মর শােভন এবং সহিষ্ণু রূপও অল্পবয়সেই আমি দেখেছি।
ফলত ধর্মে অনুরাগ থাকলে কৈশােরে যৌবনে একটি না একটি ধর্মীয় বিকল্প অবলম্বন করা আমার পক্ষে কঠিন ছিল না। এমন কি আর-পাঁচজন শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুর মতাে আমিও বিকল্পবােধকে অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন বিশ্বাসের মধ্যে অপাটবমুক্ত বিহারের কৌশল অর্জন করতে পারতাম। নিজের নিক্সন নিজে বিশ্লেষণ করতে পারি এমন সামর্থ্য আমার নেই; সুতরাং আমার নাস্তিক্যের পিছনে যদি কোন গৃঢ়ৈ থেকে থাকে তার নির্দেশ আমি দিতে পারব না। যতটুকু বুঝতে পারি আমার মধ্যে প্রথম থেকেই জিজ্ঞাসাবােধ অত্যন্ত প্রবল, এবং ধর্মবিশ্বাসে আশ্ৰয় না নেবার প্রধান কারণ সম্ভবত আমার মধ্যে এই বিপ্রতীপ প্রশ্নশীলতার উপস্থিতি। ধর্মবিশ্বাসে সব প্রশ্নের উত্তর মেলে ; কিন্তু অল্পবয়স থেকেই লক্ষ্য করতে শুরু করি যে সেসব উত্তরের মধ্যে না আছে সুসংগতি, না যায় তাদের মেলানাে দৈনন্দিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে। ধর্মীয় উত্তর প্রশ্নোৰ্ব্বতা দাবি করে, এবং এই দাবিকে মেনে নেওয়া আমার কাছে কোনদিনই সংগত ঠেকে নি।
অবশ্য ধর্মের কোন সামান্যাভিধান পাওয়া শক্ত এটা কৈশােরেই নজরে আসে, এবং একদিকে ইতিহাসচর্চা ও অন্যদিকে নানাদেশে ঘঘারার ফলে এ তথ্য ক্রমেই আরাে স্পষ্টতর হয়েছে যে সমাজসভ্যতার মতাে ধর্মের রূপও বিচিত্র। প্রতি ধর্মের শাখাপ্রশাখাও বহু, এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলের চাইতে অমিলই বেশি প্রত্যক্ষ। এই বৈচিত্র্য লক্ষ্য করার পরও সম্ভবত বলা চলে যে অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষ যাকে ধর্ম আখ্যা দিয়ে থাকেন তার কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ আছে। এই সব লক্ষণের একটি বিস্তারিত তালিকা পেশ করা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু নাস্তিকেরা যেসব কারণে ধর্মবিরােধী সেগুলিকে কিছুটা পরিস্ফুট করার জন্য এইসব লক্ষণের মধ্যে কয়েকটির উল্লেখ ও আলােচনা সংগত মনে করি। তারপর সেই প্রকরণে আমার কিছু জিজ্ঞাসা উপস্থাপিত করব।

দুই

সব ধর্মের কেন্দ্রেই কতকগুলি স্বকীয় প্রত্যয় বর্তমান, এবং প্রত্যেক বিশেষ বিশেষ ধর্মের অনুরাগীরা দাবি করে থাকেন যে তাদের ধর্মের স্বকীয় প্রত্যয়গুলি অপ্ৰতর্ক, অনপেক্ষ, সর্বজনীন এবং স্বয়ংসিদ্ধ। এই দাবির সমর্থনে কোন যুক্তি প্রমাণ মেলে না; যখন কেউ কেউ যুক্তি খাড়া করবার চেষ্টা করেন, তখন বিশ্লেষণ করলেই চোখে পড়ে তা যুক্তি নয়, যুক্ত্যাভাস মাত্র। তথ্যসংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আবিষ্কার উদ্ভাবনের সূত্রে বিশ্বজগৎ এবং তার উপাদান ও পৃথিবীর অধিবাসী এবং তাদের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান গত তিনজার হাজার বছরের মধ্যে অনেক পরিবর্ধিত এবং পরিশ্রুত হয়েছে। কিন্তু এই বিশ্বজগতের আড়ালে তার স্রষ্টা, শাসক বা নিয়ামক হিসেবে ঈশ্বর আল্লা বা যিহােবা নামে যাকে বিভিন্ন ধর্মে কল্পনা করা হয়েছে তার সম্পর্কে ধর্মবিশ্বাসীদের প্রধান নির্ভর আপ্তবাক্য। শুধু বিনাবিচারে ঈশ্বর, আল্লা বা যিহােবর অস্তিত্ব মেদে নওয়াই যথেষ্ট নয় ; তারই সঙ্গে ধার্মিকরা দাবি করেন যে বেদ অভ্রান্ত, বা ভগবদগীতা কৃষ্ণরূপী ঈশ্বরের নিজস্ব বাণী, বা যিহােবা মােজেসকে অথবা আল্লা মহম্মদকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর নির্দেশ প্রচারের জন্য, বা যীশু ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র, বা চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রভৃতি ব্যক্তি এক-একটি অবতার পুরুষ ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমনকি ঈশ্বর, আল্লা অথবা যিহােবা জাতীয় কাউকে যিনি আত্মসমর্থনে টানেন নি, সেই বুদ্ধ এমন পূর্ণজ্ঞান অর্জন করেছেন বলে দাবি করা হয়ে থাকে যে জ্ঞান প্রশ্নাতীত এবং প্রমাণাতীত।।
এখন এই ধরনের দাবি মেনে নিলে তারই অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে আরাে অনেক দাবি স্বীকার করতে হয়। ধর্মের যাঁরা প্রবর্তক এবং প্রচারক প্রমাণ-নিরপেক্ষ প্ৰাধিকারের সূত্রে অতিপ্রাকৃত যে-কোন ঘটনাই তাদের ক্ষেত্রে সম্ভব। ফল ভক্তদের কাছে বুদ্ধ হয়ে ওঠেন রহস্যাবৃত এক জাদুকর, মমাজেস অনুচরদের নিয়ে অনায়াসে হেঁটে সাগর পেরিয়ে যান, কৌমার্য অক্ষত রেখেই মেরী জন্ম দেন যীশুকে, মহম্মদ সশরীরে স্বর্গে ঘুরে আসেন, কৃষ্ণ একই সঙ্গে বহু নারীতে উপগত গন, রামকৃষ্ণ ভক্তকে বিশ্নরূপ দৰ্শন করান, অরবিন্দের মৃত্যুর পরে তাঁর নাভিকুণ্ড থেকে অলৌকিক জ্যোতি উৎসারিত হতে থাকে, সাঁইবাবা হাত ঘুরিয়ে আঙটি, ঘড়িজাতীয় নাড়ু দেখান। অতিপ্রাকৃত এবং আপ্তবাক্যকে মেনে নিলে তখন আর আভ্যন্তরীণ সংগতি কিংবা প্রতিষঙ্গের প্রশ্ন তােলা চলে না। অতি-প্রাকৃতের সমর্থনে কোন যুক্তিপ্রমাণ মেলে না, এটাই ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে নাস্তিকের প্রধান দার্শনিক আপত্তি নয় ; তার প্রধান আপত্তি ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্নের দাবি সম্পর্কে জিজ্ঞাসার সূত্রে বিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশ ; সেই জিজ্ঞাসাকে ধর্মবিশ্বাস রুদ্ধ করে বলেই নাস্তিকের বিচারে ধর্ম ক্ষতিকর। প্রকৃত বস্তু বা ঘটনায় অপ্রকৃতের আরােপ বা উৎপ্রেক্ষণ ধর্মমাত্রেরই বৃত্তি ; তার ফলে সত্য-অসত্যের ভেদ অস্পষ্ট হয়ে আসে, প্রকল্পর বিচার ও পরীক্ষা নিষ্প্রহেন হয়ে পড়ে, জ্ঞানের বিকাশ ব্যাহত হয়।
কিন্তু ধর্ম যদি শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃত এবং আত্মবাক্যের প্রশ্লোৰ্ধতা দাবি করত তাহলে মানুষের ইতিহাসে তার প্রভাব হয়তাে এতটা মারাত্মক হ’ত না। দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ক্ষমতা প্রয়োজন, এবং ক্ষমতার অন্যতম প্রধান সূত্র হচ্ছে সংগঠন। কোন একটি ধর্মের মূল প্রত্যয়গুলি যাঁর কল্পনায় প্রথম আকার পায় তিনি যখন লােকালয়ে সেই প্রত্যয়গুলির প্রধান উদ্যোগী হন তখন তাঁর কিছু ভক্ত এবং অনুরাগী জোটে, এবং তার স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের নিয়ে একটি ধর্মীয় সংগঠন গড়ে ওঠে। এই সংগঠন নানা ধরনের হতে পারে এবং সেই ধর্মের প্রভাব ব্যাপক হবে কি হবে না এবং যদি হয় তা হতে কতটা সময় লাগবে, তার একটা কাজ চলা গোছের হিসেব করতে গেলেও নানা তথ্য জানা দরকার। কিন্তু মােটামুটি বলা চলে যেসব প্রত্যয়ীরা সম্প্রচারে সম্পূর্ণ বীতস্পৃহ এবং অকারণে পর্বত, গহ্বরে বা অরণ্যে অথবা মরুভূমিতে স্বেচ্ছায় বাস করেন, তাদের ধর্ম ব্যাপক কোন প্রভাব ফেলে কি না সন্দেহ। অপরপক্ষে অধিকাংশ ভাবশীল ধর্মের প্রচার প্রতিপত্তির ভিত্তি হচ্ছে সংগঠন, এবং প্রতিষ্ঠাতা নিজে যদি সংগঠক না হন তাহলে তাঁর অন্তত কয়েকটি তেমন ভক্তের প্রয়ােজন ঘটে যাঁরা তাঁকে ওজস্বী ভাষায় বহুজনের সম্মুখে সম্প্রচারিত করবেন, এবং যাঁদের সংগঠনের সামর্থ্য অসমান্য। যীশুর এইরকম কয়েকটি প্রচারক ভক্ত জুটেছিল যারা তাকে কেন্দ্র করে অজস্র প্রতিপ্রাকৃত ঘটনা এবং অতিকথা রচনা ও রটনা করেছিলেন। ভারতবর্ষে এ-জাতীয় উদাহরণের কোন অভাব নেই। গত শতকের শেষদিকে রামকৃষ্ণকে প্রাধিকারী খাড়া করে বীর্যবান ও বাগ্মী ভক্ত বিবেকানন্দ যে-সংগঠনটি গড়ে তােলের মার্কিনের বিভিন্ন শহরে এখনাে তার শাখাগুলি সক্রিয়। তাঁর মডেল ছিলেন সম্ভবত জেসুইরা, আবার তার প্রতিষ্ঠানকে মডেল করে সম্প্রতিকালে অনেকগুলি হিন্দু মিশনারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে মার্কিনী তরুণ-তরুণী মহলে যাদের বিশেষ রবরবা!
এখন ধর্ম যখনই সংগঠনভিত্তিক হয়ে ওঠে তাতে কতকগুলি লক্ষণ ফুটে উঠতে থাকে যাদের কোন যুক্তিতেই সমর্থন করা দুঃসাধ্য। যে ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, কল্পনা এবং প্রত্যয়সমষ্টির উপাদানে একটি বিশেষ ধর্ম রচিত হয়েছিল তার প্রাধিকারকে বিচারোর্ধ্ব করবার প্রয়ােজনে তার ওপরে দেবত্বারােপ অবশ্যম্ভাবী। ধর্মের সঙ্গে দর্শনের এটিই অন্যতম প্রধান পার্থক্য। বুদ্ধ নিজে নির্বাণের কথা বললেও চেলারা পরে সঙ্গে তাঁর এবং সঙ্ঘের শরণ নিয়েছেন ; অনাত্মাবাদীকে দেবতা বানিয়ে ভূপ, চৈত্য, বিহার ইত্যাদি পরবর্তীকালে নির্মিত হয়েছে। তাঁর জীবনে নানা অতিপ্রাকৃত ঘ|টনার সমাবেশ মুখ্যত ভক্তদের প্রয়ােজনেই কল্পিত। অপরপক্ষে সক্রেটিসের ক্ষেত্রে দেবত্বারােপ বা তার জীবনে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সমারােহ হয়নি কারণ তিনি কোন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নন, এবং প্লেটো তার গুরুর প্রাধিকারের ভিত্তিতে কোন ধর্মীয় সংগঠনে গড়ে তােলায় উদ্যোগী ছিলেন না। ভারতবর্ষে, এমনকি বাংলাদেশেও ব্রাহ্মধর্ম যে বিশেষ জনসমর্থন পায় নি তাঁর অন্তত একটি কারণ রামমােহন মহাব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ হয়েও কোন অতিপ্রাকৃত শক্তি দাবি করেন নি। এবং তার প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ সত্ত্বেও দেবেন্দ্রনাথ, কেশবচন্দ্র অথবা শিবনাথ শাস্ত্রী তাকে দেবতা বা অবতাররূপে উপস্থিত করার প্রয়াস করেন নি। আসলে ব্রাহ্মধর্মের মূলেই একটি স্ববিরােধ চোখে পড়ে। রামমােহন একদিকে বৈজ্ঞানিক শিক্ষা, প্রায়ােগিক দর্শন এবং আরােহী অনুসন্ধানের প্রবল সমর্থক ; অন্যদিকে তিনি উপনিষদের তত্ত্বকে এমন প্রাধিকার দিয়েছেন যা ঘোষিতভাবে অপ্ৰতর্ক। ব্ৰহ্মজ্ঞানের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোন রফা অকল্পনীয়। কারণ প্রথম ক্ষেত্রে জ্ঞান শাশ্বত এবং অব্যয় রূপে কল্পিত, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে জ্ঞান স্বীকৃতভাবেই সীমাবদ্ধ, বিচারসাপেক্ষ, পরিবর্তনশীল, সেখানে নতুন তথ্য আহরণ বিচার-বিশ্লেষণের ফলে প্রচলিত প্রকল্প ভ্রান্ত বা অসম্পূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে, এবং ফলে সেখানে জ্ঞান অস্মীভূত নয়, তা বিবর্ধমান। ব্রাহ্মধর্ম দুইয়ের মধ্যে রক্ষা করতে গিয়ে ধর্ম হিসেবেও বিশেষ প্রসার লাভ করে নি, দর্শনরূপেও গড়ে ওঠে নি। অপরপক্ষে রামকৃষ্ণে দেবত্বারােপ করে বিবেকানন্দ শুধু স্বদেশে নয়, বিদেশেও ভক্ত আকর্ষণ করেছিলেন এবং তার পরিকল্পিত সংগঠনের নিয়মানুগত্য, বিত্তসম্পদ এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি বর্তমানে অনেক রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের চাইতেও বেশি।
ধর্মীয় সংগঠন গড়ে উঠলে তখন তার কাজ শুধু প্রচারে আবদ্ধ থাকে না। সেসব প্রত্যয় এবং তাদের সঙ্গে জড়িত অতি প্রাকৃত কাহিনী-কিংবদন্তী ধর্ম-সংগঠনের আদিম মূলধন, তাদের যাথার্থ সম্পর্কে কেউ সংশয়ী হলে তার কণ্ঠরােধ করার জন্য সংগঠন উদ্যোগী হয়ে ওঠে। ধর্ম-সংগঠনের কর্মসূচীর একদিকে যদি থাকে আপ্তবাক্যের প্রচার, অন্য দিকে তাহলে দেখা যায় জিজ্ঞাসুনিধনযজ্ঞ। প্রচারের রূপটা মােটামুটি স্পষ্ট, কিন্তু নিধনক্রিয়া সবক্ষেত্রে সমান প্রত্যক্ষ নয়। খৃষ্টধর্ম এবং ইসলামের ইতিহাসে দুটি দিকই অত্যন্ত প্রবল ; বাইবেল এবং কোরানের প্রচার শুধু শব্দের জাদুর উপরে নির্ভর করেনি, তার জন্য বারবার অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়ােগ ঘটেছে। যাঁরা অন্য ধর্মের লোক অথবা অবিশ্বাসী তাদেরই শুধু জবরদস্তি করে নিজের ধর্মে ভেড়াবার চেষ্টা হয় নি, নিজের ধর্মের মধ্যে যাঁরা কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যানে কিছু সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ব্যত্যয়ী বলে তাদেরও প্রভূত অত্যাচার সইতে হয়েছে। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ধর্মের এই হিংস্ৰ অসহিষ্ণুতা আমাদের যুগে বর্তেছে ফ্যাসিজম এবং কমিউনিজম নামা দুই রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। অন্তত এদিক থেকে শেষােক্তরা ধর্মীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী।
আপাতদৃষ্টিতে হিন্দুধর্মে এই হিংস্রতা তত স্পষ্ট নয়। তার কারণ নানা, কিন্তু কারণ যা-ই হােক হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রেও অন্তত দুটি প্রাসঙ্গিক লক্ষণ অগ্রাহ্য করা অসংগত। এই উপমহাদেশের ইতিহাসে ভাবনাচিন্তার ক্ষেত্রে এক সময়ে চার্বাক এবং বৌদ্ধদৰ্শনে জিজ্ঞাসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। চার্বাক বা লােকায়ত চিন্তার প্রতি সহিষ্ণুতার বিশেষ চিহ্ন এদেশে দেখা যায় না, বস্তুত ঐ চিন্তার সূত্রাদি যেভাবে বিকৃত এবং প্রায় অবলুপ্ত হয়েছে তা থেকে ধর্মীয় হিংস্ৰতার ও অসহিষ্ণুতারই প্রমাণ মেলে। বৌদ্ধজিজ্ঞাসা সম্ভবত বুদ্ধ এবং বােধিসত্ত্ব পূজার প্রভাবে নিজে থেকেই ক্ষীণ হয়ে আসে। দ্বিতীয় দিকটি এর চাইতেও বেশি ভয়াবহ। হিন্দুধর্মের মুখ্য বাহন সমাজ-সংগঠন, আচারবিচার, পূজা প্ৰায়শ্চিত্ত ইত্যাদি। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের উচ্চজাতি বলে ঘােষণা করে এসেছেন অধম জাতিদের সম্পর্কে তাদের ধারণা এবং শেষােক্তদের প্রতি উচ্চজাতিদের আচরণ সব চাইতে অসহিষ্ণু এবং সহিংস ধর্মদেরও সম্ভবত হার মানায়। এদেশের ইতিহাসে তার প্রচুর পরিচয় বর্তমান ; বস্তুত সমকালীন ভারতবর্ষেও অস্পৃশ্যদের প্রতি হিন্দু উচ্চজাতিদের ধর্মীয়-সামাজিক অসহিষ্ণুতা বিশেষ কমেছে ঐলে মনে হয় না। আইনের চোখে কেউই আর অস্পৃশ্য নেই বটে ; সংবিধান অনুসারে তফসিলভুক্ত গােষ্ঠীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু যেখানে ব্রাত্যগােষ্ঠীর কোন মানুষ সামাজিক জীবনে উচ্চবর্ণের মানুষের সাথে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে সেখানেই উচ্চবর্ণের লােকেরা প্রবল আঘাত হেনেছে। সংবাদপত্রে প্রায় প্রত্যহই হরিজনদের বা ‘দলিতদের উপরে সুপরিকল্পিত আক্রমণের বিবরণ প্রকাশিত হয়।
ধর্মবিশ্বাসীরা তুরীয় এবং অপাৰ্থিবের কথা বললেও নথিপত্র থেকে দেখা যায় পার্থিবের প্রতি তাদের আকর্ষণ কিছুমাত্র কম নয়। ব্যক্তিগত ব্যতিক্ৰম নিশ্চয় আছে, কিন্তু সংগঠন গড়ে উঠলেই জমিজমা, বিত্তপ্রতিপত্তির প্রয়ােজন ঘটে; তখন আশ্রমকে কেন্দ্র করেই আকার নেয় জমিদারি, লেনদেন, মুনাফা ইত্যাদি। বৈষয়িক স্বার্থের খাতিরে ধর্মপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সমর্থক হয়ে ওঠেন-তেমন শক্তি সঞ্চয় করতে পারলে তারাই হন সেই ব্যবস্থার প্রধান ধারক এবং পরিচালক। অন্যথায় রাজা, জমিদার, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তারা খাতির পাতানাের উদ্যোগী হন। এই ক্ষেত্রে পুর্ব এবং পশ্চিমের অভিজ্ঞতায় খুব একটা ফারাক দেখা যায় না। চাই শুধু প্রচুর বিষয়সম্পত্তি করে নি; এদেশে মঠমন্দিরকে কেন্দ্র করেও বিস্তর জমিদারি ও মহাজনী কারবার গড়ে উঠেছে। সম্প্রতিকালে এই প্রক্রিয়ায় ছেদ ঘটেছে মনে করার কারণ দেখি না। শাদা, কালাে, হলদে, গেরুয়া, লাল, নানা রঙের উর্দি চাপিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এখনন পরমার্থের নামে বিস্তর অর্থ সংগ্রহ করছেন এবং সেই অর্থ নানারকম মুনাফাজনক শশাষণের ব্যবসায়ে খাটিয়ে যাচ্ছেন।
ধর্মের বিরুদ্ধে নাস্তিকের মুখ্য অভিযােগের একটি হল এই যে পাহারাওয়ালা এবং সৈন্যবাহিনীর চাইতেও অনেক বেশি সাফল্যের সঙ্গে ধর্মপ্রতিষ্ঠানরা প্রতিষ্ঠিত অসাম্যভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখায় সাহায্য করে এসেছেন। সব সমাজেই কম বেশি অসাম্য, অত্যাচার, শশাষণ এবং পীড়ন বর্তমান। তার ফলে যে বিক্ষোভ হওয়া স্বাভাবিক, ক্ষমতাশালীরা তাকে দমন করার জন্যে পাহারাওয়ালা এবং সেনাবাহিনীকে নিযুক্ত করবেন, এটা প্রত্যাশিত। কিন্তু গায়ের জোরে দমনের চাইতে মনের ভিতর থেকে বিক্ষোভকে সংবেশিত করা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের কাছে ঢের বেশি। কাম্য। এই কাজটি ধর্মের মারফৎ সব চাইতে সাফল্যের সঙ্গে করা চলে। ‘আদিম পাপ”-এ কিংবা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস যদি ব্যাপক এবং দৃঢ়মূল করা যায় তাহলে গ্লানিকর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিরর্থ হয়ে পড়ে। যা আছে তা দৈবাদিষ্ট ও অসংগত নয় এটা যদি একবার মেনে নেওয়া যায়, তাহলে পরিবর্তনের জন্য আর কোন উদ্যোগ উৎসাহ প্রবল হতে পারে না। জিজ্ঞাসা সম্মােহিত হলে ধর্মবিশ্বাসীদের যেমন সুবিধে হয়, প্রতিষ্ঠিত অসাম্য এবং শােষণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ভিতর থেকেই ভােগবৃত্ত হলে সেই ব্যবস্থায় যাঁদের কায়েমী স্বত্ব আছে তারা নিশ্চিন্ত বােধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে ধর্মের “অবদান” সুবিদিত।
জিজ্ঞাসার চাপে যদি আমি নাস্তিক হয়ে থাকি, সেই নাস্তিক্য প্রবলতর হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি ধর্মীয় প্রতিন্যাসের চেহারা লক্ষ করে। ছেলেবয়েস থেকে পথঘাটে দেখেছি ভিখারী, কুষ্ঠরােগী, অর্ধাহারী অনাহারী স্ত্রী-পুরুষ। কেন তাদের এমন অবস্থা এই প্রশ্নের উত্তর শুনেছি পূর্বজন্মের পাপকর্মের এই নাকি ফল। পূর্বজন্মে কে কী করেছে ইতিহাসে তার কোন হদিশ মেলে না। অপরপক্ষে সমাজব্যবস্থার বিশ্লেষণ করলে এইসব দুঃখের কিছুটা হেতু নিৰ্ণয় সম্ভব; এবং হেতু জানলে দুঃখ দূরীকরণের, অন্ততপক্ষে লাঘবের প্রচেষ্টা করা যায়। বড়াে হয়ে দেখেছি ব্যাপক দুর্ভিক্ষ এবং মহামারী, যুদ্ধ এবং সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড, শুনেছি জার্মানীতে ইহুদিনিধনের ভয়াবহ কাহিনী, পড়েছি নিগ্ৰোদের ওপরে শ্বেতকায় মার্কিনীদের অত্যাচারের কথা, সােভিয়েট ইউনিয়নে দাসশিবিরের বিবরণ। এসব দেখা জানা পড়ার পরও যাঁরা বােঝতে চেয়েছেন জগতে সবকিছুর পিছনেই কোন মঙ্গলময় উদ্দেশ্য আছে, শেষ পর্যন্ত সব অত্যাচার, অবক্ষয়, যন্ত্রণার পিছনে কোন পরমকারণিক অস্তিত্ব সক্রিয়, তাদের ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করা সম্ভবপর ঠেকে নি। বরং মনে হয়েছে মার্কস, ফ্রয়েড, রাসেল প্রভৃতির রচনায় মানবীয় অবস্থার কয়েকটি নির্ভরযােগ্য সূত্রের নির্দেশ পাওয়া যায়, এবং এই সূত্রগুলি পথনির্দেশক হলেও প্রশ্নো নয়। শরীরের মতাে সমাজের ক্ষেত্রেও কারণ জানা থাকলে অস্বাস্থ্য থেকে স্বাস্থ্যের দিকে যাওয়ার চেষ্টা সম্ভবপর ; এবং কোন পরমজ্ঞান দাবি না করেও (অথবা দাবি না করার ফলেই) চিকিৎসক যেমন দায়িত্বশীল ও সক্রিয় হতে পারেন, একজন বিবেকী নাস্তিকও নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতন থেকেই তেমনি অসাম্য এবং অত্যাচারের প্রতিকারের কাজে নিজেকে নিযুক্ত করতে পারেন। তাঁর নির্ভর দেবতা, গুরু, মন্ত্র অথবা অতিপ্রাকৃত শক্তি নয় ; তার নির্ভর অভিজ্ঞতা, যুক্তি, মমতা, উদ্যোগ, সহযােগিতা এবং নিজের ও সকল মানুষের প্রতি অনড় দায়িত্ববােধ।

তিন

কিন্তু যদিও আমি চিন্তার দিকে থেকে সম্পূর্ণভাবেই নাস্তিক, তা হলেও ধর্মকে স্রেফ এক ধরনের মানসিক আফিম বলে খারিজ করা আমার কাছে যুক্তিসংগত ঠেকে না। কেন ঠেকে না সেকথা বলার ভিতর দিয়ে ধর্ম সম্বন্ধে আমার কয়েকটি জিজ্ঞাসা স্পষ্টতর হয়ে উঠবে আশা রাখি।
ধর্মীয় প্রত্যায়াবলীর সমর্থনে যে সব যুক্ত্যাভাস খাড়া করা হয়ে থাকে তারা যদি নিতান্তই নড়বড়ে এবং ধর্মপ্রচারের ইতিহাসে জিজ্ঞাসার উপস্থচ্ছেদ এবং মর্ষকাম ও ধর্ষকামের প্রাবল্য যদিও সবিশেষ প্রত্যক্ষ, তবু অন্তত তিনটি কারণে ধর্মকে আমি ব্যামমাহমাত্র মনে করি না। প্রথমত এমন কয়েকজন ব্যক্তিকে আমি দেখেছি এবং জানি যারা ঘঘাষিতভাবে ধর্মবিশ্বাসী, কিন্তু যাঁদেৱ চরিত্রে এবং আচরণে এমন সব গুণ উপস্থিত (যেমন করুণা, সততা, প্রসন্নতা, সৃষ্টিশীলতা, সেবাবৃত্তি, সাহস, সমভাব, ইত্যাদি, যা আমার বিচারে অন্তিমূল্যবান। তার অর্থ নয় যে এইসব গুণ ধর্মবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত। কিন্তু অন্তত এই বিশেষ স্ত্রীপুরুষদের ক্ষেত্রে এইসব গুণকে তাদের ধর্মবিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা বােধ হয় যায় না। ফলে মনে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মের সঙ্গে এইসব গুণের সম্পর্ক কী? “চতুরঙ্গের জ্যাঠামশায়ের চরিত্রে যেসব গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তাদের উদ্ভব এবং পােষণের জন্য কোন ধর্ম-বিশ্বাস প্রয়ােজন হয় না। আমার সমকালীন ও ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত যে অল্প কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার চরিত্রে ও চিন্তায় প্রভাব ফেলেছেন—যেমন বট্রান্ড রাসেল, মানবেন্দ্রনাথ ও এলেন রায়, রাজশেখর বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আলবের কামু প্রভৃতি–তারা কেউই ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু যে অল্প কয়েকজন পরিচিত ধর্মবিশ্বাসীকে আমি শ্ৰদ্ধা করি, তাঁরা কি ধর্মের আশ্রয় ছাড়া তাঁদের সদগুণগুলিকে শুনাস্তিক্যের আক্ৰমণ থেকে রক্ষা করতে পারতেন? ধর্মবিশ্বাস যদি তাদের এইসব গুণাবলীর রক্ষণে এবং বিকাশে সাহায্য করে থাকে তাহলে নিজে নাস্তিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের সেই বিশ্বাসকে আমি অশ্রদ্ধা করতে পারি না।
দ্বিতীয় কারণটি প্রথমটির চাইতে স্থানে কালে অনেক বেশি ব্যাপক। গত পাঁচহাজার বছরের ইতিহাসে একদিকে যেমন ধর্মীয় মূঢ়তা এবং অসহিষ্ণুতার অজত্ব নজির মেলে, অন্যদিকে তেমনি শিল্পে, সংগীতে, কাব্য ধর্মের বিস্তীর্ণ এবং গভীর প্রভাব নিতান্তই প্রত্যক্ষ। আধুনিক যুগকে যদি বাদ দিই তাহলে সম্ভবত একথা বলা চলে যে মানুষের সৃজনশীল কল্পনা এবং বিবিধ শিল্পকর্মে তার রূপায়ণ অনেকখানিই ধর্মবিশ্বাসের দ্বারা চিহ্নিত। সারনাথের বুদ্ধ, মথুরার বিষ্ণু, এলিফ্যান্টার শিব, অথবা মমপুরের মহিষমর্দিনীকে বাদ দিয়ে এই উপমহাদেশে ভাস্কর্যের ইতিহাস অকল্পনীয় । ধৰ্মীয় স্থাপত্যের অসংখ্য বিস্ময়কর উদাহরণ দেখতে পাই মধ্যযুগীয় ইয়োেরাপের উৎকাঙক্ষায়ী গথিক ক্যাথিড্রালগুলিতে, পশ্চিম এশিয়ার নীলাভ মসজিদ মিনারেটগুলিতে, সাঁচী স্থূপে, ভুবনেশ্বর-কোনারক-খাজুরাহের রূপােকীর্ণ মন্দিরগুলিতে। শুধু যে ভারতীয় সংগীতের একটি প্রধান অংশ ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত তা নয়, ইয়ােররাপীয় সংগীতেও ধর্মীয় প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে প্রবল ও ফলপ্ৰসূ। ইয়ােরােপীয় সংগীত যাঁরা উপভােগ করেন তাদের দার্শনিক চিন্তা যে-ধরনেরই হােক না কেন মােৎসার্ট, বেটোফেন দ্বাগনার কিংবা স্ট্রাভিনন্সকির তুলনায় বাখ তাদের কম প্রিয় নন। এরই সঙ্গে লক্ষণীয় যে সব দেশেই প্রাগাধুনিক যুগের কাব্যে ধর্ম খুব বড়াে অংশ জুড়ে আছে। দান্তের মহাকাব্য আজও আমাকে তেমনি মুগ্ধ করে যেমন করে অনেক বৈষ্ণব পদাবলী অথবা রামপ্রসাদের শ্যামাসংগীত। ফলত কোন নাস্তিক যদি সুবেদী এবং রসিক হন, শিল্প, সংগীত এবং সাহিত্যের যদি তার অনুরাগ থাকে, তাহলে তিনি লক্ষ করতে বাধ্য যে ঐ জগতের অনেকটাই একদা ধৰ্মাশ্রিত ছিল, এবং আধুনিক যুগেও এই সম্পর্ক পুরােপুরি ছিন্ন হয় নি। বিশ শতকের কবিদের মধ্যে যারা আমার বিশেষ প্রিয় তাদের মধ্যে যেমন আছেন সুধীন দত্ত, এলুয়ার ও নেরুদা তেমনি আছেন রবীন্দ্রনাথ, রিলকে ও এলিয়ট। অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রাঙ্কন, সংগীত, সাহিত্য অতীতেও রচিত হয়েছে। বর্তমান যুগে এই বিয়ােগ অনেক বেশি ব্যাপক এবং পরিস্ফুট। তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থাকে, ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিল্পকল্পনার সম্পর্ক কী ধরনের? এই সম্পর্ক কি সমাপতনের? দু’এর মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে যে সন্নিধি দেখা দিয়েছিল তা কি আসলে আপতিক? অথবা এরা উভয়েই এক মানসউৎস থেকে উদ্ধৃত ? একের কৃশায়ণ অথবা অভিক্রান্তির ফলে অন্যটি প্রবল অথবা দুর্বল হয়? এলিয়ট, ম্যারিতা প্রমুখ অনেকে অভিযােগ করেছেন আধুনিককালে আটকে ধর্মবিশ্বাসের জায়গায় বসাবার চেষ্টা হয়েছে এবং তাদের মতে এ-চেষ্টা নিতান্তই অপচেষ্টা। এলিয়ট শুধু ধর্মবিশ্বাসী নন, তিনি এ যুগের একজন প্রধান কবি এবং সাহিত্যসমালােচক। তার এই অভিযােগকে সাহিত্যানুরাগী নাস্তিক কতটা গুরুত্ব দেবেন?
তৃতীয় কারণটি দ্বিতীয় কারণটি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যদিও প্রথম কারণটির সঙ্গে তার যােগ আছে। প্ৰত্যেক ধর্মের কেন্দ্রে যেসব প্রত্যয় থকে তাদের মধ্যে অনেকগুলিই নীতিজাতীয়, অর্থাৎ বিশ্বাসীদের কাছে সেগুলি উচিত অনুচিতের নির্ণায়ক। এইসব নীতির মধ্যে প্রচুর বিরােধ থকে এবং ফলে বাকছল ও ভণ্ডামিতে অভ্যস্ত না হলে ধর্মাচরণ নিতান্ত কঠিন কাজ। তা সত্ত্বেও বােধহয় বলা চলে যে প্রতি ধর্মের কেন্দ্রেই কতকগুলি নৈতিক নির্দেশ বিদ্যমান এবং বিশ্বাসীদের জীবনে এইসব নির্দেশের প্রভাব বহুপ্রসারী। মানুষের ক্ষেত্রে নীতিকে বাদ দিয়ে কী ব্যক্তিগত কী সামাজিক জীবন দুই-ই অকল্পনীয় ; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এমনকি এই আধুনিক যুগেও ধর্মের প্রাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নীতি নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের কথা ভাবতে পারেন না। মানুষের বােধবুদ্ধির কাছে অহিংসানীতির আবেদন প্রত্যাশিত ; কিন্তু জীবনে যাঁরা অহিংসানীতির অনুসরণে উদ্যোগী তাদের মধ্যে অধিকাংশই ধর্মীয় সূত্রে এই নীতি গ্রহণ করেছেন। কেউবা এই আদর্শে দীক্ষিত হয়েছেন বৌদ্ধ অথবা জৈন ধর্মের সূত্রে, কেউবা খৃষ্টধর্ম বা বৈষ্ণবধর্মের শূত্রে। অহিংস নাস্তিক মানবতন্ত্রী অবশ্যই আছেন, কিন্তু এখনাে পর্যন্ত সংগঠনমূলক কাজে তাদের উপস্থিতি কম চোখে পড়ে। সেবানীতির ঔচিত্য সহজ বুদ্ধিতেই বােঝা যায় ; কিন্তু দুঃস্থিত জনের সেবায় যাদের জীবন নিয়ােজিত তাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তি খুব বেশি মেলে না যারা আপন আপন ধর্মবিশ্বাস থেকে সেবাব্রতের নির্দেশ পান নি। গৃহযুদ্ধের প্রচণ্ড আবর্তের মাঝখানে আমি দেখেছি করুণাময়ী ক্যাথলিক সেবিকাকে যিনি গভীর নিষ্ঠায় সর্বজনের পরিত্যক্ত কুষ্ঠরােগীদের একাকী শুশ্ৰষা করছেন। মহামারীর কেন্দ্রে দেখেছি বৌদ্ধ ভিক্ষুকে যিনি বিসূচিকাক্রান্ত রােগীদের সেবা এবং চিকিৎসা করছেন। তাদের সাহস, করুণা, সেবাবৃত্তি, সংগঠনসামর্থ্য ও দক্ষতা আমাকে তাদের প্ৰতি শ্ৰদ্ধান্বিত করেছে। কাব্য, ভাস্কর্য, সংগীতের মতােই অহিংসা এবং সেবাকে আমি জীবনে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করিবীন্দ্রনাথ, রােদা অথবা আলাউদ্দিন খাঁর মতাে মাদার টেরেসার ভিতরেও আমি মনুষ্যত্বের প্রকৃষ্ট প্রকাশ দেখতে পাই। কোন ধর্ম বিশ্বাস যদি এই নীতিবােধৰ সঁহায়ক হয়, তাকে অগ্রাহ্য করা অন্তত আমার বিচারের অসংগত ঠেকে।।
অর্থাৎ যদিও আমি মনে করি দেবতা, ঈশ্বর, আত্মা অতিপ্রাকৃত ইত্যাদি মানুষের কল্পনামাত্র এবং মানুষের পূর্বে ও পরে অথবা মানুষকে বাদ দিয়ে এদের কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই, তবুও ধর্মকে শুধুমাত্র ক্ষতিকর মনে করা আমার বিচারে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নয়। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, সেসব গুণ এবং ক্রিয়াকে মূল্য দিয়ে থাকি ধর্মীয় প্রত্যয় এবং চেতনার সঙ্গে তাদের কোন আবশ্যিক ও সার্বিক যােগ আছে কিনা। এ জাতীয় প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর মেলা সহজ নয়, কিন্তু এ-প্রশ্ন নিয়ে যাঁরা মুক্তমনে বিচার করবেন তাদের কয়েকটি কথা স্মরণে রাখা দরকার। প্রথমত, ইতিহাসে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন কিছু ব্যক্তির পরিচয় মেলে যাঁরা পূর্বোক্ত গুণরাজির অধিকারী, কিন্তু যাঁরা ধার্মিকতার দ্বারা চিহ্নিত নন। এপিকুরসের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিশেষ তথ্য মেলে না ; কিন্তু জীবনকে একটি উদ্যানের মতাে করে গড়ে তােলার যে আদর্শ তিনি উপস্থিত করেছিলেন তা থেকে তার চরিত্রের কিছুটা নির্দেশ মেলে এবং সেটি ধার্মিকতার নয়। জিজ্ঞাসু সক্রেটিস অথবা বিদ্ৰোহী স্পার্টাকুস কি ধর্মীয় বিশ্বাসের দ্বারা অনুপ্রেরিত হয়েছিলেন? অথবা নিশ– শতকী বাংলায় প্রায়নিঃসঙ্গ সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর? আমার ব্যক্তিগত পরিচিতদের মধ্যে নাস্তিক এবং বিবেকী ব্যক্তি হিসেবে মনে পড়ে মানবেন্দ্রনাথ রাকে এবং তার স্ত্রী ও সহকর্মী এলেন রায়কে, অন্ধ্রপ্রদেশের গান্ধীবাদী “গো”কে, মহারাষ্ট্রের তারকুণ্ডেকে, গুজরাটী ভাবুক এ.বি শাহ-কে, কলকাতার মিলকুমার বসু এবং গৌরী আইয়ুবকে। এইসব উদাহরণ থেকে কোন সাধারণ সূত্র প্রমাণিত হয় না। শুধু এইটুকু বােধহয় বলা চলে সে ধর্মীয় প্রত্যয় ছাড়াও বিবেকের উপস্থিতি ও সক্রিয়তা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্বারা সমর্থিত! তা থেকে কি এই অনুমান অসংগত যে অহিংসা, সেবা, করুণা, বীর্যবত্তা, সততা, দায়িত্ববােধ, ইত্যাদি গুণ অনেকের ক্ষেত্রে ধর্মবিশ্বাসের দ্বারা সমর্থিত হতে পারে, কিন্তু তাদের উৎস ধর্মবিশ্বাস নয়? সেই উৎস কি মানব-অস্তিত্বের এমন কোন গঢ় দিক যা থেকে নীতিবােধ এবং ধর্ম উভয়েই নিজের নিজের সমর্থন সংগ্রহ করে? এবং প্রস্তাব কি বিচার্য নয় যে মানুষ-নামক জৈব সামাজিক প্রাণীটি জন্মসূত্রেই বিকল্প চেতনা ও দায়িত্ববােধের দ্বার চিহ্নিত, এবং ধর্ম, সমাজসংগঠন, নীতি শিক্ষা, আইনকানুন, ইত্যাদি এই বােধকে পুষ্ট, বিস্তীর্ণ অথবা বিকৃত করতে পারে?
দ্বিতীয়ত শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসে ধর্মবিশ্বাস একটি বড়াে ভূমিকা নিয়ে থাকলেও নির্ধারিত কোন ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয় এমন শিল্পসাহিত্য পূর্বেও রচিত হয়েছে, এবং গত দুশাে বছর ধরে বিভিন্ন সমাজে ধর্মবিশ্বাস থেকে বিযুক্ত শিল্পসাহিত্যক্রমে প্রধান হয়ে উঠেছে। তন্ত্রের দ্বারা প্রভাবাস্থিত হবার আগে বৌদ্ধধর্মে নারীকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় নি। সচীর তােরণে যে তুলনাবিহীন যক্ষীমূর্তি রূপ পেয়েছে অথবা অজন্তার গুহাগাত্রে একদা যে নারীরূপের বন্দনা ঘঘাষিত হয়েছিল, তার প্রেরণা কি নির্বাণতত্ত্বে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিশ্বাস? মেঘদূত অথবা অমরুশতক কি ধৰ্মীয় কাব্য? কাটুম্বুস, প্রপারটিউস, লি পাে অথবা পোর্ক কি ধৰ্মীয় কবি দার্শনিক কবি লুক্রোটিউস ততা ঘােষিতভাবেই নাস্তিক, জড়বাদী, এপিকুরসপন্থী। কিন্তু শেক্সপীয়র অথবা গােয়েটের মহৎ সাহিত্যকর্মের ভিত্তি কি কোন নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস? টম জোনস, ট্রিস্ট্যান শ্যান্ডি, জ্যাক ও তার প্রভু থেকে শুরু করে দাল, ফ্লোবেয়ার, পুস্ত, কাফকা, লরেন্স, টমাস মান, কাম, সার্জ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা সৈয়দ ওয়ালিউল্লার বিভিন্ন বিচিত্র উপন্যাসরাজির যে বিস্ময়কর পরম্পরা তার সঙ্গে কোন ধর্মবিশ্বাসের কি আদৌ সম্পর্ক আছে? হুগনার অথবা ঐভিনস্কীর সংগীত কি কোন ধর্মবােধ থেকে উৎসারিত? অথবা ব্রানসীর ভাস্কর্য, রেনােয়া কিংবা পিকাসাের ছবি? রবীন্দ্রনাথের অনেক গানে তাঁর ধর্মবিশ্বাস উদভাসিত, কিন্তু তাঁর ছবি সম্বন্ধে একথা কি বলা চলে ?
বস্তুত যেসব শিল্পসাহিত্য সংগীতের প্রেরণা এবং উপজীব্য প্রত্যক্ষভাবেই ধর্মীয় দেশকাল পেরিয়ে যখন তারা ভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন স্ত্রী-পুরুষদের মনে আবেদন করে, তখন সেই আবেদনের প্রকৃতি কি ধৰ্মীয় সহানুভূতি থেকে স্বতন্ত্র নয়? সাত্র-এর ক্যাথিড্রাল সুবেদী দর্শকচিত্তে সে সম্রমাম্বিত বিস্ময়ের উদ্রেক করে তা কি শুধু বিশ্বাসী খ্রীস্টানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ? খাজুরাহাের মহাদেও মন্দিরের ঐশ্বর্যে সাড়া দেবার জন্য শৈব হওয়া কি প্রয়ােজন? আমাদের তৃষিত চেতনায় বৃষ্টির ধারার মতাে যখন রবীন্দ্রসংগীত নামে তখন তার রস গ্রহণের জন্য রবীন্দ্রনাথের ধর্মবিশ্বাসে অংশক হওয়া কি সকলের পক্ষেই নিতান্ত জরুরী? | ফলত ধর্মের জগৎ এবং শিল্পের জগৎ দীর্ঘকাল ধরে পরস্পর থেকে গ্রহণ করে। থাকলেও এ দুটি কি আলাদা জগৎ নয়? সম্প্রতিকালে এ দুয়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিচ্ছেদ দেখা দিয়েছে। কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে, অন্তত পশ্চিমে, অবসন্নতা প্রকট হয়ে ওঠা সত্ত্বেও একথা কি আদৌ বলা চলে যে শিল্পের ক্ষেত্রে গত একশশা-দেড়শাে বছরে নবনবােন্মেষশালী প্রতিভার অভাব ঘটেছে? শুদাল-বালজাক-জৰ্জ এলিয়টডিকেন্স টলস্টয়-ফ্লোবেয়ারের পর এসেছেন প্রস্ত, জিদ, টমাস মান, ভার্জিনিয়া উলফ, ফকনার, কাম্য, সাত্র ; দেগা-রেনােয়া-গাের্গার পরে মাতিস, পিকাসাে, জ্যাকসন পােলক, সিডনি নল্যান ; হাউল্টম্যান-ইবসেনের পর পিরান্ডেললা, ব্রেষ্ট, বেকেট, হথ, পিটার হ্রাইস। আসলে ধর্ম এবং শিল্পের নিগূঢ় সাধারণ উৎস কি সেই আশ্চর্য মানবীয় শক্তি নয় যার নাম কল্পনা যা নেই তাঁকে এই শক্তি রূপ দেয়, এবং সেই রূপ এমন প্রাণময় হতে পারে যে যা আছে তার চাইতে এই কল্পিত রূপ আমাদের কাছে বেশি প্রত্যক্ষ ঠেকে।এই কল্পনাশক্তি ধর্ম ও শিল্প উভয়ক্ষেত্রেই দীর্ঘকাল সক্রিয় ছিল, কিন্তু উৎসে একতা এবং বহু শতাব্দীর সহযােগ সত্ত্বেও এই দুই ক্ষেত্রের কল্পজগতের মধ্যে কিছু কি মৌলিক ফারাক আগাগােড়াই ছিল না? শিল্পের কল্পজগতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কি নিরাসক্ত এবং অপ্ৰয়ােগবাদী নয়? অর্থাৎ শিল্পে যেখানে এবং যখন শিল্পরূপ স্বতন্ত্রভাবে স্বীকৃত হয় সেখানে এবং তখন এই প্রয়ােগহীন নিরাসক্ত সম্ভোগই কি তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে চিহ্নিত করে না? অপরপক্ষে ধর্মের কল্পজগৎ অনেকটাই কি প্রত্যাশাপূরণের আশার দ্বারা বিধৃত নয়? যজ্ঞই হােক আর পূজাই হােক তার পিছনে ললাভের উপস্থিতি কি একেবারেই অপ্রত্যক্ষ—বিত্তের লােভ, ক্ষমতার লােভ, যশের লােভ, অন্যায় করে শাস্তি না পাওয়ার লােভ, স্বর্গের লােভ, পুনর্জন্ম থেকে মুক্তির লােভ, শান্তির লােভ, এইসব নানাবিধ লােভই কি প্রার্থনারূপে প্রকাশিত হয় না? অবশ্য প্রার্থনাহীন ধর্মও আছে, কিন্তু সে-ধর্ম খুব কম মানুষকেই আকৃষ্ট করে। পূজা, প্ৰাৰ্থনা, লাভের প্রত্যাশা—এসব বাদ দিলে ধর্মের কল্পজগৎ শীর্ণ হয়ে পড়ে। লােকেরা বুদ্ধ, রাম, হনুমান, খ্রীস্ট, মহম্মদ ইত্যাদির শরণ নিয়ে থাকে, কিন্তু কালিদাসের যক্ষ অথবা শেক্সপীয়রের হ্যামলেট আমাদের সঙ্গে যে সম্পর্ক স্থাপন করে তা নিরাসক্ত এবং প্রয়ােগপ্রত্যাশামুক্ত। অর্থাৎ ধর্মের সঙ্গে শিল্পের যে ব্যবধান আধুনিক ইতিহাসে প্রত্যক্ষভাবে বিবর্ধমান সেটির সূত্র হয়তাে সমকালীনে সীমাবদ্ধ নয়, হয়তাে আগাগােড়াই দুই কল্পজগতের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম এবং অর্থপূর্ণ পার্থক্য বিরাজমান।

চার

এখন কল্পনা যদিও একটি বিশিষ্ট মানবীয় শক্তি তবু উপাদান-সংগ্রহ এবং সক্রিয়তার জন্য তাকে মানুষের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, অনুভব, বৃত্তি এবং ভাবের উপরে নির্ভর করতে হয়। নানা ধর্মের মধ্যে মানবকল্পনার যেসব বিচিত্র প্রকাশ চোখে পড়ে তা থেকে দু’একটা সম্ভাব্য সূত্রের এবং সেইসব সূত্রের সঙ্গে জড়িত প্রশ্নের উল্লেখ করে এই আলােচনায় আপাতত ইতি টানব।।
সন্ত্রাসবােধ এবং তা থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা সম্ভবত সব প্রতিষ্ঠিত ধর্মেরই একটি সামান্য লক্ষণ। এই সন্ত্রাসবােধ স্বাভাবিক, এবং এ থেকে কোন মানুষই যে কোনদিন সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবেন এমন আশা আমার অন্তত নেই। মানুষের তুলনায় যে বিশ্বপ্রকৃতিতে তার বাস তা এতই বিরাট যে অধিকাংশ মানুষের পক্ষে তার সম্পর্কে কোন নির্ভরযােগ্য ধারণা করাই কঠিন আংশিকভাবে ছাড়া এই বিশ্বপ্রকৃতির মানবীয় নিয়ন্ত্রণ অকল্পনীয়। ভূমিকম্পে, প্লাবনে, ঝড়ঝঞায় প্রকৃতির প্রবল এবং উদ্দেশ্যহীন শক্তি বারবার ব্যক্ত হয়, এবং এই অভিজ্ঞতার ফলে মানুষের অসহায়তা হ্রাসচিহ্নিত হয়ে ও
ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা ছাড়াও মানুষের সন্ত্রাসের অন্য বহু কারণ আছে। মৃত্যু প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই অনিবার্য; যৌবনের পরে জরাকেও কেউ ঠেকাতে পারে না ; অধিকাংশ মানুষের জীবনের ব্যাধি প্রায় নিত্যসঙ্গী। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, দুর্বলের উপরে প্রবলের অত্যাচার, আহার এবং আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা—পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এইসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরােক্ষে পরিচিত। দেহের ঘেরের দ্বারা আমরা প্রত্যেকেই অপর থেকে বিচ্ছিন্ন, অথচ বাঁচবার প্রয়ােজনে আমাদের যেমন আহার এবং আশ্রয় দরকার তেমনি দরকার স্নেহ-ভালােবাসা-বন্ধুত্বের নির্ভরযােগ্য পারস্পরিক সম্পর্কের। এই সবই দুর্লভ, কিন্তু যদিবা তেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা যে টিকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যাধি এবং মৃত্যু প্ৰিয়জনকে সরিয়ে দেয়; মনের নানা মর্ষকামী এবং ধর্ষকামী গঢ়ে বন্ধুতাকে রূপান্তরিত করে শত্ৰুতায়, নৈকট্যের জায়গায় আনে অনতিক্রম্য ব্যবধান। ভয় তাই মানুষের অস্তিত্বের অংশ এবং এই ভয় থেকে মুক্তি মানুষ মাত্রেরই কাম্য।
আর এই ভয়ের সর্বজনীন অভিজ্ঞতা এবং তা থেকে উদ্ধারের এই যে সার্বজনিক কামনা—উভয়কে নিজের অঙ্গীভূত করে বলেই কি ধর্মের আবেদন এত ব্যাপক এবং গভীর? যে-সংসারে সবই অনিশ্চিত, সেখানে রবীন্দ্রনাথের মতাে আশ্চর্যভাবে সৃষ্টিশীল প্রতিভা বহু সময়ে মনে করেন তার জীবনে “কিছুই তাে হল না, সেখানে সব মানুষের না হোক বেশিরভাগ মানুষেরই চাই এমন কোন নিশ্চয়তা যা অবলম্বন করে সে বাঁচতে পারে। এই অনাক্রম্য নিশ্চয়তা শুধু ধৰ্মই দিতে পারে, কারণ ধর্ম যে কল্পনাকে রচনা করে তা অপ্রতক্য কিন্তু নিরাসক্ত নয়। তাকে বিচার করা যায় না, কিন্তু তার উপরে নির্ভর করা যায়। ধর্ম একদিকে মানুষের ভয়, অসহায়তা, যন্ত্রণা এবং ব্যর্থতার একটা ব্যাখ্যা দেয়, অন্যদিকে ধর্ম এই দশা থেকে উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি আনে। প্রতিশ্রুতির আবেদনকে প্রবলতর করার জন্য প্রায় সব ধর্মের মানুষের আত্মপ্রত্যয়কে ক্ষীণ করে হীনতাভাবকে বাড়াবার চেষ্টা হয়। মানুষ মােহমুগ্ধ জীব, অথবা আদিম পাপে তার জন্ম—জাগতিক দুঃখের এই ধরনের ব্যাখ্যার পর আশ্বাস দেওয়া হয় বুদ্ধ, শিব, বিষ্ণু, মহম্মদ অথবা খ্রীস্টের শরণ নিলে আর ভয় থাকবে না। এঁরা প্রত্যেকেই শাহরণ ও দুঃখহরণ—এঁরা করুণা করলে পাপ-তাপ দূরীভূত হয়। যাঁরা হয়তােবা ঐতিহাসিক চরিত্র ধর্মের জাদুতে তারাও দেবতা হন, এবং যেহেতু ভয় থেকে উদ্ধারের ভরসাটাই আসল কথা সেকারণে এই দেবত্বারােপে ভক্তদের আপত্তি কচিৎ উচ্চারিত হয়।
প্রশ্ন হল, ভয়ের অভিজ্ঞতা এবং ভয় থেকে উত্তরণের কামনা যদি মানব অক্তিত্বের সাধারণ লক্ষণ হয় তাহলে ধর্মীয় প্রত্যয়ের উচ্ছেদ কি আদৌ কল্পনায় ? আমরা জানি যে জ্ঞান, কর্ম, শিল্পসাধনা অথবা সেবার সূত্রে কিছু মানুষ ভয়কে সংযত করতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা পারে কিযদি না পারে তাহলে ধর্মপ্রত্যয়ই কি তাদের একমাত্র অবলম্বন? ঈশ্বরােনাস্তি সত্ত্বেও ঈশ্বর এবং তার ছাপােষাদের উদ্ভাবন কি মানুষের পক্ষে অবশ্যম্ভাবী যাঁরা প্রচলিত অর্থে ধর্মবিশ্বাসী নন সেই কম্যুনিস্টরাও যখন ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিকতায় এক ধরনের ঐশী সংকটতারণের নিশ্চয়তা আরােপ করেন তখন তার দ্বারা তারা কি মানবীয় দুর্বলতারই প্রমাণ দেন না? ধর্মের স্তোভবাক্য ছাড়া মানুষের চলবে না এ-প্রস্তাব আমার মতাে যারা মানুষের আত্মসৃজনক্ষমতায় বিশ্বাসী তাদের পক্ষে অবশ্যই গ্রহণযােগ্য নয়। কিন্তু প্রত্যয় প্রমাণ নয়, এবং ফলে মনের মধ্যে এ-সম্পর্কে জিজ্ঞাসা থেকে যায়।
ভয় যদি মানুষের অস্তিত্বের একদিক হয়, বিকাশের উৎকাঙক্ষা তার অন্যদিক। মানুষ শুধু স্মৃতি আর বর্তমানের ভিতরে নিজেকে নিবদ্ধ রাখে না, তার অতীত এবং সমকাল ভবিষ্যতের কল্পনার সঙ্গে যুক্ত। কোন অবস্থাই মানুষের কাছে শেষ অবস্থা নয়, তা থেকে প্রকৃষ্টতর অবস্থার কথা সে ভাবতে পারে, এবং সেই অবস্থার দিকে যাবার চেষ্টা করতে পারে। এই উৎকাঙক্ষা মানুষের সহজাত বৃত্তি, কোন স্তোভবাক্য বা ঐশ্বরিক-ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির উপরে এটি নির্ভর করে না। মানুষের ইতিহাসে নানাভাবে এই উৎকাঙক্ষা প্রকাশিত হয়-শিল্পসাহিত্যে, অন্বেষণ-উদ্ভাবনে, সমাজসংস্কার ও সমাজবিপ্লবে, ধৰ্মকল্পনায়। এই উৎকাঙক্ষার স্বাক্ষর চক্রযান ও অর্ণবপােতের উদ্ভাবনে, ইলােরার কৈলাস মন্দিরে, নভশূক ক্যাথিড্রালে, স্যার টমাস মােরের “ইউটোপিয়া” গ্রন্থে, নানা দেশের লােকগীতিতে, সমাজতান্ত্রিক এবং নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন এবং আদর্শে, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী পরিকল্পনায়। ধর্মের ক্ষেত্রে এই উৎকাঙক্ষা যে কদাচিৎ নয় তার প্রচুর উদাহরণ মেলে। তাহলে যে হীনতাবােধ, নির্বেদ, বস্তুরতি এবং মর্ষকাম বেশিরভাগ ধর্মে প্রবলভাবে প্রত্যক্ষ তার প্রকরণে এই উৎকাঙক্ষা কি করে টেকে? হয়তাে একদিকে সন্ত্রাসবােধ আর তা থেকে অভয়ের স্তোভবাক্য এবং অন্যদিকে বিকাশের উকাঙক্ষা ও উদ্যম প্রতি ধর্মের মধ্যেই বিরাজমান ; হয়তাে এই বৈপরীত্য ধর্মের মধ্যে গতি সঞ্চার করে।
প্রবলভাবে মানুষের ক্ষতি করে যখন ভয় এবং তা থেকে মুক্তির সংবেশনী প্রতিশ্রুতি ধর্মে প্রাধান্য পায়। অপরপক্ষে, যে ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে বিকাশের সততাবৃত্ত আকল্প সক্রিয় তাদের অগ্রাহ্য করা অসংগত।
কিন্তু বিকাশের উৎকাঙক্ষা যদি কোন ধর্মে প্রাধান্য পায় তাহলে সেই ধৰ্ম কি আর ধৰ্মরূপে বহুজনকে আকৃষ্ট করতে পারে ? শ্রুতি অথবা ধর্মপ্রতিষ্ঠাতার অপ্ৰতর্ক প্রাধিকার, নীতিনির্দেশের পিছনে অতিপ্রাকৃতের সংস্থান, পূজাপ্রকরণের দ্বারা লােভনীয়কে লভ্য করার প্রত্যাভূতি এবং ভয়কে জয় করার আশ্বাস অর্থাৎ ধর্মের লােকসমর্থন যেসব সুত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়—বিকাশের উৎকাঙক্ষা বৃদ্ধি পেলে তার চাপে এগুলির কি অবক্ষয় ঘটবে না? যদি ঘটে তা নিয়ে মাথাব্যথা তাদেরই যাঁরা ধর্মের ক্ষেত্রে মাতব্বর, এবং সেই মাতব্বরীর জোরে সমাজে বিত্ত এবং প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। অপরপক্ষে যাঁরা ধর্মের আদিব্যিক প্রকল্পকে অগ্রাহ্য করেও ধর্মের মধ্যে উৎকাঙক্ষীয় বৃত্তির কিছুটা প্রকাশ দেখে তার কোন কোন রূপকে তারিফ করে থাকেন, তারা এই ঘটনাকে স্বাগত করনে বলেই মনে হয়। প্রেমে, সেবায়, সৃষ্টিতে, সততায় এবং পারস্পরিক সহযােগে এই মানবীয় উৎকাঙক্ষা যদি উৎসারিত হয় তাহলে প্রতিষ্ঠিত ধর্মসমূহের অভিক্রান্তি আদৌ কোন শূন্যতা সৃষ্টি করবে এমন আশঙ্কার কারণ দেখি না।

টীকা

১। বুদ্ধপ্রসঙ্গে একটি চমৎকার কাহিনী আছে যেটি বুদ্ধের প্রতি আমাদের যেমন শ্ৰদ্ধান্বিত করে তেমনি তাঁর শিষ্যদের আভিমুখ্যের উপরেও আলােকপাত করে। সারিপুত্ত একদিন বুদ্ধের কাছে এসে বললেন, প্রভু অতীতে, বর্তমানে, ভবিষ্যতে এমন কোন জ্ঞানী জন নি বা জন্মাবেন না যিনি আপনার চাইতেও জ্ঞানী। বুদ্ধ শুনে স্মিতহাস্যে বললেন, সারিপুত্ত, তুমি নিশ্চয়ই অতীতের যত মহাজ্ঞানী ছিলেন তাদের জেনেছ এবং তাদের জ্ঞানের সারমর্ম অনুধাবন করেছ। সারিপুত্ত বললেন, না প্ৰভু। তাহলে তুমি নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের সমস্ত মহাজ্ঞানীদের জেনেছ এবং তাদের জ্ঞানকে তােমার মন দিয়ে গ্রহণ করেছ। না প্রভু। তাহলে অন্তত আমি যেটুকু জেনেছি তার সবটাই জেনেছ। না প্ৰভু, তাও পারি নি। তবেই দেখ সারিপুত্ত, তুমি অতীতের অথবা বর্তমানের জ্ঞানীদের কথা জান না। তাহলে কেন তুমি এই সৎসাহ সংকীর্তনে প্রবৃত্ত হয়েছ? (T. W. R. Davids, Dialogues of the Buddha, iii. 87)
মৃত্যুর পূর্বে বুদ্ধ তার প্ৰিয়শিষ্য আনকে বলেন, যারা নিজেদের কাছে নিজেরাই প্ৰদীপ হয়ে উঠবে, বাইরের কোন কিছুর উপরে নির্ভর না করে নিজের নিজের দীপশিখার আলােকেই নিজেদের জীবন পরিচালিত করবে, আমার জীবদ্দশাই বা কি, আমার মৃত্যুর পরেই বা কি, তারাই তাে চরম শিখরে উঠবে। (ঐ, ১৫৩)।
সম্ভবত বুদ্ধ নিজে কোন নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চান নি। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশাতেই ধনী বণিকদের পৃষ্ঠপােষণায় সংঘ বিস্তর অর্থ সংগ্রহ করে। তাঁর মৃত্যুর একশাে বছর পরেই তাঁর ভক্তদের মধ্যে থেরবাদী এবং মহাসংঘিকদের বিরােধ প্রকট হয়ে ওঠে। তারপরে অশােকের সমর্থনপুষ্ট সংঘ থেরবাদের সমালােচক বৌদ্ধদের বিতাড়িত করে। সম্রাটের পৃষ্টপােষণায় দেশময় স্তুপ, চৈত্য, বিহার প্রতিষ্ঠিত হয় ; তুপ পূজা এবং বুদ্ধের নানা প্রতীক পূজা ব্যাপক প্রসার লাভ করে। আগে থেকেই বুদ্ধ-পূর্ববর্তী, পঞ্চবিংশ বুদ্ধের কল্পনা থেরবাদীদের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছিল। মহাযানী বৌদ্ধরা বুদ্ধকে দেবতা বানায়, অসংখ্য বােধিসত্ত্ব উদ্ভাবন করে, বিভিন্ন দেবদেবীকে বৌদ্ধধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে। তা না হলে হয়তাে এদেশে বৌদ্ধধর্মের কয়েক শতাব্দী ব্যাপী প্রবল জনপ্রিয়তা সম্ভব হত না। বুদ্ধ যখন শেষ পর্যন্ত বিষ্ণুর নবম অবতারে পর্যবসিত হলেন, তখন বােঝা গেল বুদ্ধের স্বকীয়তা এদেশ থেকে লােপ পেয়েছে। বৃথাই তিনি সারিপুত্তকে সাবধান করেছিলেন। হিন্দুধর্মের সর্বগ্রাসী পাচকরস বৌদ্ধধর্মকে জারণ করে অবশিষ্ট বৌদ্ধদের একটি নগণ্য সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু সমাজের এককোণে রেখে দেয়। ২। ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা হিন্দুয়ানী এদেশে দৃঢ় এবং ব্যাপক প্রতিষ্ঠা পাবার আগে ভারতীয় মনীষীদের মধ্যে কেউ কেউ নাস্তিক ও জড়বাদী ছিলেন। পরবর্তী ধুর্যরজীদের প্রবল বিদ্বিষ্ট হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও তার কিছুটা আভাস রয়ে গেছে। বৃহস্পতির মতে স্বৰ্ণ পরলােক, আত্মা, মােক্ষ, চতুবৰ্ণ এসবই অসত্য; কিছু ব্যক্তি জীবিকা অর্জনের জন্য বেদ এবং যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠানাদি উদ্ভাবন করেছে (M. Monier Williams: Indian Wisdor1893, 120-22)। বুদ্ধের সমসাময়িক অজিত কেশকম্বলিন সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে,যেনষ ক্ষিতি, অপ, তেজ এবং মরুতের সমাবেশ মাত্ৰ, মৃত্যুতে এই সমাবেশ ভেঙে গিয়ে প্রতিটি উপাদান আপন আপন ক্ষেত্রে মিশে যায়, দেহহীন আত্মা বলে কিছু নেই, অমরত্বের কথা অর্থহীন (দীঘ নিকায়, ১,৫৫)। জাবালি রামকে বলেছিলেন, চতুর ব্রাহ্মণদের ধাপ্লাবাজিতে ভুলাে না ; মূঢ়জনই প্ৰেত, পরলোেক, পূজা, বলি, প্ৰায়শ্চিত্ত ইত্যাদিতে আস্থা রাখতে পারে। চার্বাক’ বা লােকায়ত পন্থীদের যেটুকু সামান্য বিবরণ ‘সর্বদর্শনসংগ্রহ থেকে মেলে তা স্পষ্টতই বিদ্বিষ্ট ও বিকৃত, কিন্তু অর্থশাস্ত্র” ও “কামসূত্রের”র কিছু উল্লেখ-উদ্ধৃতি থেকে অনুমান করা চলে যে কোন এক সময়ে লােকায়তবাদী চিন্তা অন্তত শিক্ষিত নাগরিকদের উপরে বেশ কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। জড়বাদী দর্শনের যে-গ্রন্থটি পরবর্তীকালে পাওয়া যায় সেটির নাম “তাপপ্লবিংহ”। এটির রচয়িতা জয়রাশী অষ্টম শতকে জীবিত ছিলেন। তাঁর সমকালের প্রধান ধর্মগুলির পিছনে যে যুক্তির কোন সমর্থন নেই এটিই তিনি বিচার করে দেখাবার চেষ্টা করেছিলেন। ৩। অন্যবিধ প্ৰত্যয়তন্ত্রের মতাে বিশেষ বিশেষ ধর্মের কেন্দ্রে যে নীতিবােধ কাজ করে কখনাে কখনাে তা ধর্মবিশ্বাসীকে প্রতিষ্ঠিত অন্যায় সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে প্রেরণা দেয়। প্রতিষ্ঠিত শশাষণ এবং শাসনব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন ধৰ্মীয় সংগঠনের কুটুম্বিতা বা আঁতাতের কথা আগে বলেছি, এবং সভ্যতার ইতিহাসে এই সহযােগের উদাহরণ অজস্ৰ মেলে। কিন্তু অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অভ্যুত্থান, এবং রাষ্টিক-আর্থিক-সামাজিক অন্যায়ের ধর্মভিত্তিক সমালােচনার উদাহরণও নিতান্ত নগণ্য নয়। ধর্মীয় অভ্যুত্থানণ্ডল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুক্তির দ্বারা চালিত অথবা পরিশীলিত নয় ; মেসায়া অথবা দৈবশক্তিসম্পন্ন উদ্ধারকর্তার আবির্ভাবে বিশ্বাস এইসব আন্দোলনের বিশিষ্ট লক্ষণ ; এগুলি অনেকক্ষেত্রেই সহিংস এবং অধিকতর শক্তিশালী কায়েমীস্বার্থের বা রাষ্ট্রের দ্বারা হিংস্রভাবে বিধ্বস্ত। কিন্তু এইসব আন্দোলনের পিছনে ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলন-অভ্যুত্থান সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়েছে এবং এদের চরিত্র ও ফলাফল নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে ও হচ্ছে। হুেবার, কোন, রেডফিল্ড, হম, রাডিন, লানটারনারি, মুয়েহলমান প্রভৃতি গবেষণাদি এই প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য। ৪। এই প্রবন্ধটি ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর পাঠক-পাঠিকাদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি চিঠি পাই। সেইসব চিঠিপত্রে যে প্রসঙ্গগুলি উথাপিত হয়েছিল তাদের সম্পর্কে কয়েকটি কথা সংক্ষেপে পুনশ্চরূপে এখানে যােগ করতে চাই। মূল প্রবন্ধেও প্রসঙ্গগুলি আলােচিত হয়েছে, কিন্তু পাঠক-পাঠিকারা যেভাবে প্রশ্ন তুলেছেন অথবা মন্তব্য করেছেন তা মনে রেখে চারটি শিরােনামে আমার বক্তব্য স্পষ্টতর করার চেষ্টা করছি।
ক। ধর্ম ও বিজ্ঞান : সব ধর্মেরই একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে বিশ্বজগতের উৎপত্তি এবং রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা, সেটি তার পৌরাণিক অংশ। জগতের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বােঝার জন্য সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়ের ব্যাখ্যা মানুষের পক্ষে জরুরী। যখন জগৎ-সম্পর্কে যথেষ্ট নির্ভরযােগ্য তথ্য সংগৃহীত হয় নি এবং কাল্পনিক ব্যাখ্যাকে যাচাই করে নেবার চিপদ্ধতি, ভাষা, সাধিত প্রভৃতি উদ্ভাবিত হয় নি, তখন পৌরাণিক ব্যাখ্যার ভিতর দিয়েই মানুষের জ্ঞানান্বেষণ ও যুক্তিশীলতা প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক চিন্তার উদ্ভব ও বিকাশ পৌরাণিক ব্যাখ্যাকে কালবিরুদ্ধ করে। ধর্ম যে ব্যাখ্যা দেয় সেটিকে ধর্মবিশ্বাসীরা মনে করে প্রশ্নাতীত, প্রমাণাের্ধ্ব, নিত্য। পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ বেরিয়েছিল কিংবা যিহােবা ছয় দিনে বিশ্বজগৎ রচনা করেছিলেন, এসব কল্পকাহিনীকে বিশ্বাসীরা চিরন্তন সত্য বলে মনে করেন এবং কেউ সে-সম্পর্কে সংশয়ী হলে তাকে ঐহিক এবং পারলৌকিক, সামাজিক এবং দৈহিক শাস্তির ভয় দেখান। অপরপক্ষে বৈজ্ঞানিককে বিস্তর অধ্যবসায় করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, এবং কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই চরম সত্য বলে উপস্থাপিত হতে পারে না। তথ্য এবং প্রযুক্তির প্রতি নিষ্ঠা বৈজ্ঞানিকের বিশিষ্ট ছারিকি। যে ব্যাখ্যা তিনি উপস্থাপিত করেন বা গ্ৰহণ করেন তা যে পরে ভ্রান্ত বা অসম্পূর্ণ বলে প্রমাণিত হতে পারে এ সম্পর্কে সচেতনতা তার সত্যানুসন্ধানেরই অঙ্গ। এই কারণে ধার্মিক ব্যাখ্যার পিছনে যে মনােভাব আর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পিছনে যে মনােভাব এই দুইয়ের মধ্যে রফা সম্ভব নয়। ধর্মবিশ্বাসীরা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকে দমন করার চেষ্টা আগাগােড়াই করে এসেছেন এবং যেখানে তাদের হাতে দমন করবার ক্ষমতা নেই সেখানে বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে আধ্যাত্মিক বাকছল দিয়ে ঝাপসা করার চেষ্টা করেছে।
বৈজ্ঞানিক মনােভাবের জন্য যে মানসিক বয়ঃপ্রাপ্তির এবং নিত্যজাগ্রত প্রশীলতা প্রয়ােজন, অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এখনাে তা গড়ে ওঠে নি। অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষ এখনাে পর্যন্ত আদিম মানুষ এবং শিশুর মতাে নিশ্চিত চরম উত্তর চায়—শিশুরা ভাবে এটি তাদের মা-বাবা দিতে পারে, বয়স্ক শিশুরা ভাবে এটি দিতে পারে পুরাণকাহিনী, ধৰ্ম, গুরু, সাধুসন্ত। বৈজ্ঞানিক জানেন তথ্য নির্ভর সব উত্তরই আংশিক এবং শর্তাধীন—কোন ব্যাখ্যাই বিচারাের্ব বা অপরিবর্তনীয় নয়। প্রশ্ন যেখানে সীমাবদ্ধ, খণ্ডিত, সুনির্দিষ্ট সেখানে তার নির্ভরযােগ্য উত্তর সম্ভব (যেমন ম্যালেরিয়া প্রভৃতির ব্যাধির কারণ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে), কিন্তু যেখানে সে-প্রশ্ন বহুমুখী ও ব্যাপক সেখানে তথ্য-সংগ্রহে, ব্যাখায়, প্রমাণে ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থাকতেই পারে। বৈজ্ঞানিক সে কথা ভেবে ছাত্রদের স্তোভ দেবার জন্য ব্ৰহ্মজ্ঞতা দাবি করেন না, অপরপক্ষে চরম উত্তর অপ্রাপ্য বলে তিনি মন এবং হাত গুটিয়েও বসে থাকেন না। উপযােগী তথ্যসংগ্রহে, বিষয়মুখিতার অনুশীলনে, ধারণা এবং সাধিত্রের সূক্ষ্মাতাসাধনে, প্রকল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি নিজেকে নিয়ত নিয়ােজিত রাখেন এবং অপর বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্য ও সমালােচনা বিশেষ যত্নের সঙ্গে অনুধাবন করেন। ধার্মিকরা তাদের বিশ্বসাদি বিচারে ও অপরিবর্তনীয় মনে করার ফলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের মধ্যে একত্র হয়ে পর পর্ম নিয়ে চর্চার উদাহরণ কচিৎ চোখে পড়ে। এবং ইতিহাসে ধর্মযুদ্ধের ভয়ংকরতাই অনেক বেশি প্রাবল্যে বারবার দেখা যায়। অপরপক্ষে বৈজ্ঞানিকরা পরস্পরের যুক্তি, তথ্য, প্রমাণাদি বিচার করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মতৈক্যে পৌছতে পারেন এবং তাদের বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যাখ্যা ক্রমেই অধিকতর নির্ভরযােগ্যতা ও সর্বজনগ্রাহ্যতা অর্জন করে। প্রকৃত শিক্ষার সূত্রে বৈজ্ঞানিকতার এই মনােভাবের প্রসারের ফলে যখন পৃথিবীর অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষ বৈদ্ধিক বয়ঃপ্রাপ্তি লাভ করবে তখন জ্ঞানের দিক থেকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার কালবিরুদ্ধতা তাদের কাছে সহজেই ধরা পড়বে।
খ। ধর্ম ও শিল্প-সাহিত্য ; উভয় ক্ষেত্রেই কল্পনা-উদ্ভাবনার ভূমিকা প্রধান। যা আছে, যা অভিজ্ঞতা-জাত এবং অভিজ্ঞতা-সমর্থিত তা থেকে উপাদান নিয়ে মন এমন সব রূপ রচনা করে, রচনার পূর্বে যারা ছিল না। কল্পনা অনস্তিত্বকে অস্তিত্ববান করে। শিল্প বিভিন্ন মাধ্যমের ভিতর দিয়ে সেই রূপকে অপরের কাছে প্রত্যক্ষ করে তােলে। সেই কল্পনাপ্ৰসূত রূপ যে অভিজ্ঞতাপ্রসূত জগতের চাইতেও প্রকৃত, নানা মন্ত্রতন্ত্র, পূজাপ্রকরণের দ্বারা এই বিশ্বাসকে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করে।
এখন শিল্পসাহিত্যের একটা বড়াে অংশ দীর্ঘকাল ধরে ধর্মকে সমর্থ করেছিল এবং ধর্মের দ্বারা সমর্থিত হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা এ দুটির মধ্যে কোন অচ্ছেদ্য বা সম্পূরক সম্বন্ধ আছে। কিন্তু তথ্য অথবা যুক্তি এই অচ্ছেদ্যতার ধারণাকে সমর্থন করে কিন্তু অতীত কালেও বেশ কিছু স্থাপত্য, ভাস্কর্য, প্রতিকৃতি ও প্রাকৃতিক চিত্র, গাথাকাহিনী, সংগীত, কবিতা, নাটক উপন্যাস পাওয়া যায় যাদের বিষয়বস্তু ও প্রতিন্যাস স্পষ্টই ঐহিক, যাদের সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক যদি আদৌ থাকে তা নিতান্তই ক্ষীণ। অপরপক্ষে গত তিনশাে বছর কাল ধরে শিল্প স্পষ্টতই ধর্মীয় বিষয় এবং মনােভাব থেকে সরে এসেছে ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও এই অভিমূখ্য স্পষ্ট। অর্থাৎ ধর্মের উপরে নির্ভরতা শিল্পের পক্ষে মােটেই অপরিহার্য নয়, যদিও ধর্মের আবেদন ও প্রসারের জন্য শিল্পের সহযােগ সম্ভবত বিশেষ প্রয়ােজনীয়। | শিল্প এবং ধর্ম দুই-ই কল্পনাজাত হলেও দুইয়ের মধ্যে অন্তত দুটি মৌলিক পার্থক্য আছে বলে মনে করি। শিল্প যে কাল্পনিক রূপের জগৎ রচনা করে এবং আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ করে তােলে সেটিই একমাত্র প্রকৃত জগৎ, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার জগতের চাইতে অধিকতর সত্য জগৎ—এমনতর দাবি শিল্পের আবেদনের জন্য নিষ্প্রয়ােজন। শিল্প একটি স্বয়ম্ভর জগৎ রচনা করে আমাদের প্রাত্যহিক জগতের পাশাপাশিই যেটিকে আমরা তার নিজগুণে গ্রহণীয় বিবেচনা করি। এটি বিশুদ্ধ যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে সব চাইতে স্পষ্ট, কিন্তু স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্ৰকলা, নৃত্য, অভিনয় এমনকি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এটি অভিজ্ঞতসিদ্ধ। অয়দিপাউস, দ্ৰৌপদী, হ্যামলেট, ফাউস্ট, অথবা কাফকার “কে”—এরা প্রত্যেকেই এদের স্রষ্টার কল্পিত চরিত্র ; এদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের প্রত্যহিক অভিজ্ঞতার কিছু মেলে, অনেকটাই মেলে না ; কিন্তু এদের প্রত্যেকের স্ৰষ্টা নিজের নিজের কল্পনা ও শিল্পনৈপুণ্যের জোরে এদের ভিতরে এমন শক্তি সঞ্চার করেছেন যে এদের চারিত্র্য এবং কাহিনী আমাদের কাছে প্রবলভাবে প্রত্যক্ষ। অপর পক্ষে সেই কারণে এদের সান্নিধ্যে আমাদের পরিচিত জগৎকে মায়া অথবা তুচ্ছ অথবা অসত্য মনে করার কারণ ঘটে না। শিল্পের জগৎ অভিজ্ঞতার জগৎকে গ্রাস করে না, তাকে নিজের অধীন করে না, তা থেকে উপাদান সংগ্রহ করে তার পাশাপাশি নিজের গৌরবে উপস্থাপিত হয়। অপরপক্ষে ধর্মের কল্পিত জগৎ সংসারে আস্তিত্বিক হীনতা আরােপ করে, তার কল্পিত নায়ক-নায়িকাকে ত্ৰাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ করে, তাদের উপরে দেবত্ব অথবা অলৌকিকত্ব আরােপ করে সেই কল্পিত জগৎকেই পরম সত্য বলে দাবি করে। সেই জগৎ অসহিষ্ণু, সর্বগ্রাসী এবং ফলে এক ধর্মের কল্পিত জগতের সঙ্গে আরএক ধর্মের কল্পিত জগতের সংঘর্ষ অনিবার্য। একই পাঠকের পক্ষে অভিজ্ঞানশকুন্তলা, আরব্যরজনী এবং কিং লিয়রের জগতে বিস্ময়াকুল চিত্তে প্রবেশ করা স্বাভাবিক। চারুদত্ত হ্যামলেট, হিলহেলম মাইস্টার কিংবা মাদাম বােভারির জগতে আমরা আমন্ত্ৰিত ; সেখানে অনুভব, সম্ভোগ, বিচার বিশ্লেষণ, প্রবেশ-প্রস্থানের স্বাচ্ছন্দ্য আছে, আনুগত্যের জন্য কোনাে জুলুমবাজী নেই। কিন্তু মােজেস-এর জগৎ, বৃস্টের জগৎ, কৃষ্ণের জগৎ, অথবা মহম্মদের জগৎ একত্রতা বা সার্বভৌমতা দাবি করে। একাগ্রয়িতা বা নিঃশর্ত আনুগামিতা ছাড়া ঐ জগতে অপরের প্রবেশ ধর্মবিশ্বাসীদের মতে নিষিদ্ধ। জিজ্ঞাসুরূপে ওইসব জগৎকে আমরা বােঝবার চেষ্টা করলে বিশ্বাসীরা বলেন পূর্ণ বিশ্বাস না থাকলে ওই জগতে ঢকা অন্যের অসাধ্য। এমনকি যারা ধৰ্মজগতের পােপ, খলিফা, পেট্রিয়ার্ক, শঙ্করাচার্য মার্কা প্রাচীন মহাসত্বের মালিক নন, নিতান্তই অৰ্বাচীন ছােটোখাটো সম্প্রদায়ের নেতা রামকৃষ্ণ, সৎসঙ্গ, হরেকৃষ্ণ, ডিভাইন লাইট, আনন্দময়ী, সত্যসাঁই ইত্যাদি—তাদের জগৎ ও একচেটিয়াপন্থী এবং পরস্পরের জগতের প্রতি অসহিষ্ণু।
দ্বিতীয় পার্থক্য হল ধর্মীয় কল্পনা শুধু স্বকীয় জগৎ রচনা করে তৃপ্ত নয়, তাতে স্পষ্ট নির্দেশ থাকে, ঐ জগৎকে যারা চরম সত্য বলে মানে তাদের কী কী করণীয় এবং কী কী অকরণীয়। এবং যারা বিশেষ বিশেষ ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব ও অধিকার নিজেদের উপরে আরােপ করেছেন তারা সংগঠিত পরাক্রমে ব্যবস্থা করেন যাতে ঐ সব বিধিনিষেধ প্রতিপালিত হয় এবং পালিত না হলে পাপীজন যথাযথ শান্তি পায়। টমাস মান এই বিষয়টি নিয়ে একটি চমৎকার গল্প লিখেছিলেন। গল্পটির নাম—“দি টেলস্ অব দি ল”। এটি মােজেস এবং ওল্ড টেস্টামেন্টের দশমহানির্দেশ সম্পর্কিত। ইহুদিদের মধ্যে যারা মােজেস-এর নির্দেশ মানে নি মােজেস-এর আজ্ঞায় যােতয়া ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার নামে তাদের সকলকে হত্যা করেন। মােজেস নিজের হাতে নির্দেশগুলি পাথরে খােদাই করে তাঁর অনুযাত্রিকদের বলেন, অদৃশ্য ইয়াহওয়ে এই নির্দেশগুলি দিয়েছে। গল্পের শুরুতে মান মােজেস সম্পর্কে লিখেছেন :
His birth was disorderly. Therefore he passionateiy boned order, the immutable, the bidden and the forbodden…He was sensual, therefore he longed for the spiritual, the pure and the holy–in a word, the invisible—for this alone seemed to him spiritual. holy and pure.১।
গল্পের শেষে তিনি নবধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মােজেসকে দিয়ে বলিয়েছেন:
And the Lord says. I shall raise foot and shall trample him unto the mire, to the bottom of the earth I shalheast the blasphemer, one hundred and twelve fathoms deep…and all the people said Amen.
শিল্পসাহিত্য এই ধরনের কোন ব্যবহারিক নির্দেশ দেয় না, এবং শিল্পী-সাহিত্যিক সংগঠন তৈরি করে বেয়াড়া পাঠক-পাঠিকাদের কোন শাভিবিধান করেন না। হ্যামলেটের অপ্রেমে দ্বিধাদ্বন্দ্বে-যন্ত্রণায় আমরা অংশভাক হই, কিন্তু আমাদের কী করণীয় সে-সম্পর্কে এই নাটক থেকে কোন নির্দেশ পাই কি? খাজুরাহাে, কোনারকের মিথুনমূর্তি থেকে আমাদের মনে গভীর আনন্দ সঞ্চারিত হয়, কিন্তু আমাদের কর্তব্য সম্বন্ধে কোন উপদেশ ঐসব মন্দিরে লিখিত নেই। (শাকারেরা ঐসব ভাস্কর্যের যেসব ব্যাখ্যা করেন, সেসব তাদের ধর্মতত্ত্ব থেকে নির্গত, শিল্পকর্মের ভিতরে সেই ব্যাখ্যার কোন সমর্থনই মেলে না।) কোন গান, ছবি, নাটক, কাহিনী বা উপন্যাস যদি কারাে ভালাে না লাগে তার জন্য সেই ব্যক্তিকে কোন পাপ অর্সায় বলে কেউ মনে করে না। অবশ্য যতক্ষণ সেটিকে শিল্প হিসাবে ভাবা যায় ততক্ষণ একথা খাটে, তাকে ধর্মীয় বস্তু বা ধর্মশাস্ত্র হিসেবে। ধরলে তখন ধর্মের অন্য অসহিষ্ণু দাবি সেক্ষেত্রেও করা হয়। কিন্তু কর্তব্য নিরূপণের দায়িত্ব থেকে মুক্ত বলেই শিল্প শিল্প। কর্মের ও বস্তুজগতের চৌহদ্দির বাইরে শিল্পের যে সিদ্ধতা ও শুদ্ধতা ক্রোচে তাকেই বলেছেন তার বিশিষ্ট ইস্থেটিক”, গুণ। এই শিল্পকাস্তির জন্যই শিল্প এই মূল্যবান। ধর্ম শিল্পকে নিজের প্রচারের কাজে ব্যবহার করে, কিন্তু বিশেষ বিশেষ ধর্মসম্প্রদায় লােপ পাবার পরে, এবং ঐ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন স্ত্রী-পুরুদের কাছেও, ঐ ধর্মমতের সংশ্লিষ্ট শিল্প গভীর আবেদন করতে সক্ষম।
গ। ধর্মীয় অভিজ্ঞতা: ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, শাস্ত্ৰ, গুরু, আচার-অনুষ্ঠান এসব বাইরের জিনিস, আসল ব্যাপার হচ্ছে এক ধরনের অপরােক্ষানুভূতি যা ধর্মের উৎস। এই ধৰ্মীয় অভিজ্ঞতা ব্যাপারটি নাকি বড়াে হয়, যাদের হয়েছে তারাই শুধু জানেন, অনাদের কাছে এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। একদা-প্রসিদ্ধ মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’ প্রবন্ধগ্রন্থের লেখক প্রয়াত কৌতুকী শিবরাম চক্রবর্তীর অনুসরণে আমিও বলতে পারতাম যে যা গুহ্য তা বরং ওহাতেই নিহিত থাক। কিন্তু আমি কৌতূহলী হয়ে আমার চেনাজানার মধ্যে ঐসব বিশ্বাসীদের নিয়েছি, আপনার কি সেই অপরােক্ষানুভূতি হয়েছে? অথবা আপনার, অথবা আপনার? না, অন্তত আমার পরিচিতদের মধ্যে কেউই ব্ৰহ্মাস্বাদের দাবি করেন নি। তবে বলেছেন, যাদের হয়েছে তাদের কথা নাকি তারা জানেন। কিন্তু আমার না জানা এবং তাদের জানা এইসব মহাত্মাদের যেটুকু বিবরণ গ্রন্থাদি ও পরিচিত ব্যক্তিদের সূত্রে পেয়েছি তা থেকে অনুমান করি অধ্যাত্মজ্ঞান বলে কিছু থাক বা নাই থাক এইসব তুরীয়মার্গীরা সকলেই সম্মােহন বিদ্যায় পারঙ্গম এবং ভেলকিবজিতে ওস্তাদ।।
তবু তত্ত্ব হিসেবে হয়তাে স্বীকার করা চলে নানা ধরনের বিশিষ্ট অভিজ্ঞতার মধ্যে একজাতের অভিজ্ঞতাকে ‘ধর্মীয় অভিজ্ঞতা নামে দেওয়া যায়। আকাশ, সমুদ্র, হিমালয়ের আনস্ত্যের সান্নিধ্যজাত বিস্ময়, প্রথম প্রেমের গভীরতার উপলব্ধি, শিল্পসৃষ্টির অভিনিবেশ ও আনন্দ, জটিল বৌদ্ধিক সমস্যার আকস্মিক বিদ্যুৎক্ষিপ্ৰ সমাধান, মাদকসেবনের কল্যাণে সেবকের চেতনায় বিবিধ অবাস্তব রূপ ও ঘটনাবলীর সাময়িকরিশমানতা—এসব বিভিন্ন জাতীয় অভিজ্ঞতা আমাদের প্রাত্যহিক খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, কাজকর্মের অভিজ্ঞতা থেকে বেশ কিছুটা অন্য ধরনের। হয়তাে বা ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এদেরই মতাে বিশিষ্ট এবং স্মরণীয় কোন অভিজ্ঞতা যা সকলের প্রাত্যহিক জীবনে না ঘটতে পারে। কিন্তু কোন অভিজ্ঞতাকে সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা হিসেবে মানার অর্থ নয় যে বিশ্বাসী ঐ অভিজ্ঞতার যে অর্থ আরােপ করেছেন সেটি বিনা প্ৰমাণ-পরীক্ষায় মেনে নেওয়া হচ্ছে। মদ্যপানের মাত্রা বাড়ালে মাতাল ব্যক্তি চোখের সামনের বস্তুকে দ্বিগুণিত রূপে দেখেন ; তাঁর দেখাটা মােটেই অবিশ্বাস্য নয়, শারীরবৃত্তে তার ব্যাখ্যাও মেলে, কিন্তু যে বস্তুটি তিনি দেখেছেন সেটি বাস্তবে দ্বিগুণিত হয় না। সিদ্ধিসেবী তার পায়ের নিচের পথকে ঢেউ খেলানাে ভাবতে পারেন, হাওয়ায় উজ্জীন গােলাপি হাতির লাবণ্য তাকেগৰ্দগদচিত্ত করতেও পারে, কিন্তু ফলে সমতল পথে চড়াই উৎরাই রচিত হয় না, গােলাপি হাত্তি হওয়ায় ওড়ে না। যাঁদের সচরাচর ‘মরমী’ বলা হয়। তারাই সম্ভবত ধর্মীয় অভিজ্ঞতায় সিদ্ধাঠাদের সেই অভিজ্ঞতার উপাদান নিয়ে তাদের কল্পনা নানা রূপ রচনা করে এবং অনেক সময় প্রতীকের সূত্রে কিংবা কবিতায়, গানে, ছবিতে আকার নিয়ে সেই রূপ অন্যদের কাছে পৌঁছােয়। এসব থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতার সততা ও কল্পনার সমৃদ্ধতার পরিচয় মেলে, কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার বাইরে কোন দেবতার বা তুরীয় লােকের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে না। ধর্মীয় অভিজ্ঞতা অবশ্যই মনস্তত্ত্বের আলােচ্য বিষয়, কিন্তু ঐ অভিজ্ঞতার। ভিত্তিতে কোনাে অধিবিদ্যাত্মক প্রস্তাব দাঁড় করানাে অযৌক্তিক।

শিবনারায়ণ রায়

 

লেখক পরিচিতিঃ শিবনারায়ণ রায় (Sibnarayan Ray) (২০ জানুয়ারি, ১৯২১ – ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮) বিংশ শতাব্দীর স্বনামধন্য বাঙালি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, এবং সাহিত্য সমালোচক। একজন রাডিকেল মানবতাবাদী মানবেন্দ্রনাথ রায়, এবং বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল, রায়ের উপরে মন্তব্য করে একদা বলেছেন “… শিবনারায়ণ রায় দাঁড়িয়েছেন সেই মতের পক্ষে যেটাকে আমি পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। … … তার লেখা আমাদের সময়ের অধিকাংশ লেখকের চেয়ে বেশি যুক্তিগ্রাহ্য হিসেবে প্রকাশিত।”

সম্পাদকের কথাঃ শ্রদ্ধেয় শিবনারায়ণ রায়ের এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল “দুই বাংলার যুক্তিবাদীদের চোখে ধর্ম” বইতে। প্রচুর পরিশ্রমের পরে লেখাগুলোকে নাস্তিক্য ডট কমে ক্রমান্বয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। বই থেকে নেয়ার কারণে বানান ভুল থেকে গেলে ভুলগুলো দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এবং সংশোধন করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.