কোরান কি অবিকৃত? – শাহিনুর রহমান শাহিন

আমাদের দেশের অনেক মানুষ, বলা যেতে পারে অধিকাংশ মানুষ কোরানভিত্তিক শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। এর জন্য তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিতান্ত নিরীহ বাঙালি থেকে চরম নৃশংস মানুষে বদলে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। যাই হোক, এই চাওয়ার স্বপক্ষে প্রথমেই তারা যে কথাটি বলে থাকে, সেটা হলো অনেকটা এরকম –

“কোরানের একটি অক্ষরও বিকৃত হয়নি। নবী মুহাম্মদের কাছে আল্লাহ ওহী পাঠিয়েছেন। এবং সম্পূর্ণ অহীটুকু ছোট-বড়ো-মাঝারি কোন প্রকার পরিবর্তন ছাড়াই বর্তমান কোরান আকারে সংকলিত হয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই। এটা কোরানের অলৌকিকতার প্রমাণ, যা অন্য কোন গ্রন্থের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি”।

সম্পূর্ণ ভুল একটি কথা। কোরান মোটেও যথাযথভাবে সংকলিত হয়নি। বর্তমানের মতো অতীতেও অনেকে এর সমালোচনা করেছেন। প্রচলিত ইসলামিক সূত্রগুলো পর্যালোচনা করে আমরাও সহজে মোল্লাদের দাবীর অসারতা প্রমাণ করতে পারি। এই পোস্টে আমি কোরান বিকৃতির স্বপক্ষে কিছু রেফারেন্স দিচ্ছি। রেফারেন্সগুলো যেসব বই থেকে নেয়া হয়েছে, সেগুলো ডাউনলোডের লিঙ্কও উল্লেখ করছি। এছাড়া কমেন্ট সেকশনে প্রতিটি রেফারেন্সের স্ক্রিনশটও দিয়ে দিচ্ছি। আশা করছি, ঠান্ডা মাথায় ভাবলে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বুঝতে পারবেন যে, কোরান এমন কোন গ্রন্থ নয়, যার কিছু অংশ মুখস্ত না থাকলে মানুষকে জবাই করে ফেলা প্রয়োজন।

একঃ বর্তমানে প্রচলিত কোরান সংকলনের কৃতিত্ব দেয়া হয় তৃতীয় খলিফা উসমানকে। সকলেই জানেন, খলিফা উসমানকে বিদ্রোহী মুসলমানগণ হত্যা করেছিল। হত্যা করার সময় তাকে কোরান বিকৃতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। মৃত্যুর প্রাক্কালে তাকে এভাবে অভিযুক্ত করেছিলেন খলিফা আবু বকরের পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর। এই মুহাম্মদ ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যিনি মিসরের শাসক হিশেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আরো অনেকে এই ব্যপারে খলিফা উসমানের সমালোচনা করেছেন। আমরা ধীরে ধীরে এসব জানতে পারবো।
রেফারেন্স-
০১) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭ম খণ্ড ৩৩২-৩৩ পৃষ্ঠা।

দুইঃ কোরানের আয়াত-শব্দ-অক্ষর সংখ্যার কোন স্থিরতা নেই। প্রাচীন ও আধুনিক, সকল তথ্যসূত্রে এসব সংখ্যা নিয়ে প্রচণ্ড বিতর্ক হয়েছে। এমনকি বর্তমানেও প্রচলিত কোরানের আয়াত সংখ্যা নিয়ে একেকজন একেক কথা বলছেন। বিভিন্ন জনের মতামত অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ৬০০০/ ৬২০৪/ ৬২১৪/ ৬২১৯/ ৬২২৫/ ৬২২৬/ ৬২৩৬/ ৬২১৬/ ৬২৫০/ ৬২১২/ ৬২১৮/ ৬৬৬৬/ ৬২২১/ ৬৩৪৮ ইত্যাদির মধ্যে যে কোন একটি হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। আয়াতের পাশাপাশি অক্ষর ও শব্দের সংখ্যা নিয়েও প্রচুর মতানৈক্য রয়েছে।
রেফারেন্স-
০১) তাফসিরে ইবনে কাসির ১ম খণ্ড ৫০-৫১ পৃষ্ঠা।
০২) সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ ১ম খণ্ড ৭০ পৃষ্ঠা।
০৩) তাফসিরে জালালাইন ১ম খণ্ড ৩৯ পৃষ্ঠা।
০৪) কোরান হাদিস সংকলনের ইতিহাস ৬৯ পৃষ্ঠা।
০৫) উইকিপিডিয়া।

তিনঃ অনেকেই বলে থাকেন, নবী মুহাম্মদের উপর অবতীর্ণ হওয়া কোরানের বেশীরভাগই হারিয়ে গেছে। সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উমর ছিলেন দ্বিতীয় খলিফা উমরের পুত্র। নবী মুহাম্মদ তাকে ‘সৎ লোক’ হিশেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ১৬৩০টি নির্ভরযোগ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন, বর্ননাকারীদের মধ্যে যা চতুর্থ সর্বোচ্চ। আয়াত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ব্যপারে তিনি মন্তব্য করেছেন,

“ কোরান সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান আছে, এই কথাটি কারো বলা উচিত নয়। সে কীভাবে জানবে যে, পরিপূর্ণ জ্ঞান কী ছিল! কোরানের খুব বড়ো একটা অংশ এখন তার কাছে অপ্রচলিত। এর পরিবর্তে সে বলতে পারে, আমি কোরানের সেটুকুই পেয়েছি, যা এখন উপস্থিত রয়েছে। “

এই কথার স্বপক্ষে নবীপত্নী আয়েশা বলেছেন, খলিফা উসমান তার কোরানে সুরা আহযাবের সমগ্র অংশটুকু রাখেননি, যা ছিল দুই শতাধিক আয়াত দ্বারা সমৃদ্ধ। এছাড়া খলিফা উমর, সাহাবী আনাস বিন মালিক, উবাই বিন কা’ব, আবু ইউনুস, আবু ওয়াকিদ আল লাইহি, মাসলামা বিন মাখলাদ আল আনসারি প্রমুখ পৃথক পৃথক আয়াতের কথা উল্লেখ করেছেন, যা তারা পাঠ করতেন। এগুলো বর্তমানে প্রচলিত কোরানে উল্লেখ করা হয়নি।
সাহাবী আনাস বিন মালিক ছিলেন নবী মুহাম্মদের খাদেম। তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২২৩৬টি হাদিস বর্ননা করেছেন।
উবাই বিন কা’ব একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবী। বোখারি-মুসলিমের অনেক হাদিসে বলা হয়েছে, যে চারজন সাহাবী নিজের উদ্যোগে কোরান সংকলন করেছিলেন, তিনি তাদের মধ্যে একজন। আর নবী মুহাম্মদ যে চারজনের কাছে কোরান শিক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি তাদেরও একজন। এমনও হাদিস আছে, স্বয়ং আল্লাহ উবাই বিন কা’বের নাম উল্লেখ করে তাকে কোরান আবৃত্তি করতে বলেছেন।
অথচ উপরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আনাস বিন মালিক ও উবাই বিন কা’বের মতো সাহাবী উসমানের কোরানের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রেফারেন্স-
০১) আল ইতকান ২য় খণ্ড ১১-১৫ পৃষ্ঠা।
০২) কোরআন হাদিস সংকলনের ইতিহাস ৮১ পৃষ্ঠা; সহিহ মুসলিম ৬১৪৫ নং হাদিস।
০৩) সহিহ বোখারি ৩৪৮৮, ৩৫৩৬-৩৭, ৪৫৯৫-৯৬ ও ৪৬৩৭ নং হাদিস।
০৪) সহিহ মুসলিম ৬১৪৮-৪৯ নং হাদিস।

চারঃ প্রতিটি মুসলমানের কাছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বাক্য। এই বাক্যটি কোরানের আয়াত কিনা, এটা নিয়েও প্রচুর দ্বন্দ্ব রয়েছে। নবীপত্নী উম্মে সালমা, খলিফা আলী, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবু হুরাইরা প্রমুখের মতে এটি প্রতিটি সুরার প্রথম আয়াত (সুরা তাওবা বাদে)। অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিকের মতে, এটি কোরানের কোন আয়াত নয়। ইমাম শাফেয়ি বলেন, এটি শুধু সুরা ফাতিহার আয়াত।
সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ছিলেন নবী মুহাম্মদের চাচাত ভাই। তিনি তৃতীয় সর্বাধিক হাদিস (১৬৬০টি) বর্ননা করেছেন। স্বয়ং নবী মুহাম্মদ তাকে জ্ঞান দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। খলিফা আলীর সময়ে তিনি বসরার শাসক ছিলেন।
আবু হুরাইরা ছিলেন আহলে সুফফার সদস্য, যিনি সর্বাধিক সংখ্যক হাদিস বর্ননা করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তিনি বাহরাইন ও মদিনার শাসনকর্তা হিশেবেও দায়িত্বপালন করেছেন।
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ি সুন্নি ইসলামের চার মাযহাবের মধ্যে তিনটি মাযহাবের প্রবর্তন করেন। এদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।
রেফারেন্স-
০১) তাফসিরে ইবনে কাসির ১ম খণ্ড ৭৩-৭৪ পৃষ্ঠা।
০২) আল ইতকান ২য় খণ্ড ০১ পৃষ্ঠা; সহিহ মুসলিম ৬১৪৪ নং হাদিস।
০৩) কোরআন হাদিস সংকলনের ইতিহাস ৮১ পৃষ্ঠা।

পাঁচঃ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাশালী একজন সাহাবী। তিনিই বিখ্যাত আবু জেহেলকে হত্যা করেছেন। উবাই বিন কা’বের পাশাপাশি তিনিও সেই চারজনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিলেন, নবী মুহাম্মদ যাদের কাছে কোরান শিক্ষা নিতে বলেছিলেন। তিনি উসমান কর্তৃক সংকলিত কোরানের প্রচণ্ড সমালোচনা করেছেন। নিজের সংকলিত কোরানে তিনি সুরা ফাতিহা রাখেননি। অথচ এটি আমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত সুরা!
রেফারেন্স-
০১) তাফসিরে ইবনে কাসির ১ম খণ্ড ৫৬-৫৭ পৃষ্ঠা।
০২) সহিহ বোখারি ৩৪৮৮, ৩৫৩৬, ৪৬৩৪ ও ৪৬৩৬ নং হাদিস।
০৩) উইকিপিডিয়া।

ছয়ঃ সুরা নাস ও সুরা ফালাককে একত্রে ‘মাওযাতাইন’ বলা হয়। সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মতে, এটি কোরানের অংশ নয়। নিজের কোরানে তিনি এই সুরা দুটোকে কোন স্থান দেননি।
রেফারেন্স-
০১) তাফসিরে ইবনে কাসির ১৮শ খণ্ড ৩২৮ পৃষ্ঠা।
০২) তাফহিমুল কোরান ১৯শ খণ্ড ৩২০-২১ পৃষ্ঠা।
০৩) সহিহ বোখারি ৪৬১৩ নং হাদিস।

সাতঃ আবু মুসা আশ’আরি ছিলেন বিখ্যাত একজন সাহাবী। তিনি কুফা ও বসরার শাসক ছিলেন। রক্তক্ষয়ী সিফফিনের যুদ্ধের শেষে শান্তি আলোচনায় তিনি আলীর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি বলেছেন, সুরা তওবা তথা বারা’আতের মতো বড়ো আকারের একটি সুরা বাদ পড়ে গেছে। সুরা তাওবায় ১২৯টি আয়াত রয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, মুসাব্বিহাত (যেসব সুরার শুরুতে সাব্বাহ/ইউসাব্বাহ রয়েছে) এর সমপরিমাণ একটি সুরা আগে তারা পাঠ করতেন। সেটি এখন তাদেরকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে।
রেফারেন্স-
০১) সহিহ মুসলিম ২২৯০ নং হাদিস।
০২) আল ইতকান ১ম খণ্ড ১৩ পৃষ্ঠা।

আটঃ সাহাবী হুজাইফা ইবনে ইয়ামান কুফা ও মাদায়েনের শাসক ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বর্তমান কোরানে যে সুরা বারা’আত বা তাওবা পাঠ করা হয়, তা প্রকৃত সুরার এক চতুর্থাংশ মাত্র।
রেফারেন্স-
০১) আল ইতকান ২য় খণ্ড ১৫ পৃষ্ঠা।

নয়ঃ কোরানের বৃহত্তম সুরা হচ্ছে সুরা বাকারা। এখানে ২৮৬টি আয়াত আছে। আর সুরা আহযাবে ৭৩টি আয়াত রয়েছে। কিন্তু সাহাবী উবাই বিন কা’ব বলেছেন, সুরা আহযাবের আকার ছিল প্রায় সুরা বাকারার মতো। অবশিষ্ট আয়াতের ব্যপারে কেউ কেউ বলেছেন যে, খলিফা উসমান এগুলো সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছেন; আবার কেউ কেউ বলেছেন, এগুলো সম্ভবত আল্লাহর আদেশে রহিত হয়ে গেছে।
রেফারেন্স-
০১) তাফসিরে ইবনে কাসির ১৫শ খণ্ড ৭৩৩ পৃষ্ঠা।
০২) আল ইতকান ২য় খণ্ড ১৩ পৃষ্ঠা।

দশঃ সুরা আল খু’লা ও আল হাফদ নামের দুটি সুরা প্রচলিত কোরানের অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। আরেক জায়গায় পড়েছিলাম, এই সুরা দুটি উবাই বিন কা’বের কোরানে ছিল। কিন্তু রেফারেন্সের স্ক্রিনশট দিতে পারছি না।
রেফারেন্স-
০১) আল ইতকান ১ম খণ্ড ১৫ পৃষ্ঠা।

এগারঃ অসংখ্য সহিহ হাদিসে খলিফা উমর কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, বর্তমান কোরানে ব্যভিচারের শাস্তিস্বরূপ পাথর মেরে হত্যা করা সংশ্লিষ্ট রজমের আয়াত উল্লেখ করা হয়নি।
রেফারেন্স-
০১) সহিহ মুসলিম ৪২৬৯ ও ৪২৭১ নং হাদিস।
০২) সুনানে আবু দাউদ ৪৩৬৫ নং হাদিস।
০৩) সুনানে ইবনে মাজাহ ২৫৫৩ নং হাদিস।
০৪) আল ইতকান ২য় খণ্ড ১৬ পৃষ্ঠা।

বারঃ নবীপত্নী আয়েশা কর্তৃক একটি মজার হাদিসের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বয়স্ক লোকের দশ ঢোক দুধ পানের মাধ্যমে কোন মহিলাকে মাহরাম এবং ব্যভিচারের কারনে পাথর মেরে হত্যা করা সম্পর্কিত আয়াত নাকি কাগজে লেখা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই আয়াত ছাগলে খেয়ে ফেলে। এই কারনে এগুলো আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যা চিরতরে হারিয়ে যায়।
রেফারেন্স-
০১) সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৪৪ নং হাদিস।

তেরঃ খলিফা উসমানের কোরান অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাকরণের নিয়ম-কানুনের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি নিজে ব্যপারটি স্বীকার করেছেন এই বলে যে, উচ্চারনের সময় সঠিকভাবে উচ্চারণ করা হবে!
রেফারেন্স-
০১) আল ইতকান ৪র্থ খণ্ড ১৪৬ পৃষ্ঠা।
০২) তাফসিরে মাযহারি ৩৪৮-৪৯ পৃষ্ঠা।

চৌদ্দঃ নবী মুহাম্মদের সময়কার হেজাজে প্রভাবশালী গোত্র ছিল সাতটি। তাদের নিজেদের আঞ্চলিক ভাষা ছিল। তারা কোরান পাঠ করতো নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষায়। এবং তাদের মধ্যকার গোত্রকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ছিল দেখার মতো। সম্ভবত এই দ্বন্দ্ব/কোন্দল দূর করতে নবী মুহাম্মদ বলেছেন, কোরান সাতটি আঞ্চলিক ভাষায়ই অবতীর্ণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিভেদ আরো চরমে ওঠে। এক কেরাতের অনুসারীগণ অন্য কেরাতের অনুসারীদের কাফের বলে আখ্যায়িত করতে শুরু করে। খলিফা উসমান তখন অন্য ভাষাগুলো বাতিল করে দিয়ে কুরাইশদের ভাষায় কোরান সংকলনের নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য যে, উসমান নিজে ছিলেন কুরাইশি এবং কুরাইশ গোত্র ছিল তৎকালীন হেজাজের সর্বাধিক প্রভাবশালী গোত্র।
রেফারেন্স-
০১) সহিহ বোখারি ৩২৫৬, ৪৬১৯, ৪৬২৬, ৪৬৭২ ও ৪৬৯২ নং হাদিস।
০২) সহিহ মুসলিম ১৭৭২ নং হাদিস।
০৩) তাফসিরে জালালাইন ১ম খণ্ড ২৬ পৃষ্ঠা।

পনেরঃ কোরানের ৯২ নম্বর সুরা হচ্ছে সুরা লাইল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবু দারদা, আল কামা প্রমুখ সাহাবীর মতে, সিরিয়াবাসীগণ এই সূরায় কিছু শব্দ যোগ করেছে, যা বর্তমান কোরানে পাঠ করা হচ্ছে। সুরা লাইলের ০৩ নম্বর আয়াতটি দেখলে ব্যপারটি স্পষ্ট করে বোঝা যাবে।
আবু দারদা চারজন সাহাবীর একজন ছিলেন, যারা কোরান সংকলন করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে। কিছু সময়ের জন্য তিনি সিরিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন।
রেফারেন্স-
০১) সুরা লাইল ১-৩ নং আয়াত; সহিহ বোখারি ৪৫৭৯ নং হাদিস।
০২) তাফসিরে ইবনে কাসির ১৮শ খণ্ড ১৮৩-৮৪ পৃষ্ঠা।

ষোলঃ সুরা নূরের ২৭ নং আয়াতে ভুল শব্দ রয়েছে। এই দাবী করেছেন সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও উবাই বিন কা’ব। এছাড়া সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদও তার কোরানে এই শব্দ সংশোধন করে এর স্থানে অন্য শব্দ লিখেছেন, যা বর্তমান কোরানে নেই।
রেফারেন্স-
০১) সুরা নুর ২৭ নং আয়াত; তাফসিরে ইবনে কাসির ১৫শ খণ্ড ১৩৪-৩৫ পৃষ্ঠা।

সতেরঃ মানসুখ বা রহিত হয়ে যাওয়া আয়াত নিয়ে উবাই বিন কা’বের কোরানের সাথে বর্তমান কোরানের দ্বন্দ্ব দেখা যায়।
রেফারেন্স-
০১) সহিহ বোখারি ৪১২৯ ও ৪৬৩৯ নং হাদিস।

আঠারঃ কোরান নবী মুহাম্মদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ আমরা দেখি, নবী মুহাম্মদ স্বয়ং কয়েকটি আয়াত ভুলে গেছেন। পরবর্তীতে জনৈক সাহাবীর আবৃত্তি শুনে সেটি তার মনে পড়ে যায়।
রেফারেন্স-
০১) সহিহ বোখারি ৪৬৬৭-৬৮, ৪৬৭৩ ও ৫৮৯৬ নং হাদিস।
০২) সহিহ মুসলিম ১৭১০-১১ ও ৩৯২৯ নং হাদিস।

উপরে রেফারেন্স হিশেবে কয়েকটি বইয়ের নাম দিয়েছি। এখন এগুলো ডাউনলোডের লিঙ্ক দিচ্ছি। কেউ চাইলে বইগুলো ডাউনলোড করে পৃষ্ঠা ও হাদিস নম্বর মিলিয়ে নিতে পারেন।

এক। ইবনে কাসির রচিত “আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”; অনুবাদ ও প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
দুই। ইবনে কাসির রচিত “তাফসিরে ইবনে কাসির”; অনুবাদ ও প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
তিন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত “সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ”।
চার। জালালুদ্দিন মহল্লি ও জালালুদ্দিন সুয়ুতি’র “তাফসিরে জালালাইন”; ইসলামিয়া কুতুবখানা ।
পাঁচ। জালালুদ্দিন সুয়ুতি রচিত “আল ইতকান ফি উলুম আল কুর’আন”(ইংলিশ); অনুবাদ মুনির ফরিদ।
ছয়। স্কোয়াড্রন লিডার (অবঃ) একেএম এনামুল হক রচিত ‘কোরান হাদিস সংকলনের ইতিহাস’; প্রফেসর’স প্রকাশনী।
সাত। ইমাম বোখারি কর্তৃক সংকলিত “সহিহ বোখারি”; অনুবাদ ও প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
আট। ইমাম মুসলিম কর্তৃক সংকলিত “সহিহ মুসলিম”; অনুবাদ ও প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
নয়। ইমাম আবু দাউদ কর্তৃক সংকলিত “সুনানে আবু দাউদ”; অনুবাদ ও প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
দশ। ইমাম ইবনে মাজাহ কর্তৃক সংকলিত “সুনানে ইবনে মাজাহ”; অনুবাদ ও প্রকাশনায় তাওহিদ প্রকাশনী।
এগার। মাওলানা মওদুদি রচিত “তাফহিমুল কুর’আন”; আধুনিক প্রকাশনী।
বারো। কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী রচিত “তাফসিরে মাযহারি”; হাকিমাবাদ প্রকাশনী।
তের। অধ্যাপক ডঃ মুজিবুর রহমান অনূদিত “কোর’আনুল কারিম”; দারুস সালাম প্রকাশনী।
চৌদ্দ। উইকিপিডিয়া

………
শুরু থেকে আমি এই কথাটিই বারবার বলার চেষ্টা করছি যে, আমরা যা ভাবি, কোরান মোটেও সেরকম পবিত্র কিছু নয়। পৃথিবীতে পবিত্র বলে কিছু নেই। বরং কোরান ক্ষেত্র বিশেষে অন্যান্য গ্রন্থের চেয়ে বেশী বিতর্কিত, বেশী ত্রুটিযুক্ত। খুব শিগগীর আরেকটি স্ট্যাটাসে কোরানের ব্যাকরনগত ত্রুটি, আল্লাহ কর্তৃক আয়াত রহিত করে নতুন আয়াত পাঠানো ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে রয়েছে।

রেফারেন্সসমূহ

এক

দুই

তিন 

চার

Facebook Comments

Leave a Reply

%d bloggers like this: